মিষ্টি প্রেমের গল্প

তোর জন্য – মিষ্টি প্রেমের কাহিনী | Sweet Love

মিষ্টি প্রেমের কাহিনী

তোর জন্য – মিষ্টি প্রেমের কাহিনী: মনের মানুষের ভালোবাসা পাবার জন্য আমরা কতই না ব্যাকুল থাকি। ইচ্ছা করলেই ফিরে যেতে পারি না আবার ছাড়তেও পারি না। কেমন যেন একটা দোটানায় পড়ে যেতে হয়। চলুন তবে আজকে এরকম একটি মিষ্টি গল্প পড়ি।

সূচনা পর্ব

এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আছি বললে ভুল হবে। ছিলাম দাঁড়িয়ে প্রায় ১ ঘন্টার মতো। কিন্তু ১ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরে এত বড় যে একটা ধমাকা দেখবো বুঝতে পারিনি।

এত বড় উপহার যে আমি নিতে পারছিনা আর।

হয়তো আমি অনেক ভাগ্যবতী তাই দীর্ঘ ৮ বছর পড়ে আজকে এত বড় একটা উপহার পেলাম। কতোটা ভাগ্যবান হলে মানুষ এমন উপহার পায় আমার জানা নেই।

আমি ইফতি জান্নাত। সবাই জান্নাত বলেই ডাকে। মা-বাবা কেউ নেই। আমার পরিবার বলতে শুধু আবির আংকেলের পরিবারের সবাই। আবির আংকেল হলেন আমার বাবার খুব কাছের বন্ধু। মা-বাবা মারা যাবার পরে তারাই আমার দায়িত্ব নিয়েছেন।

আজকে এয়ারপোর্টে যার জন্য দাঁড়িয়ে আসছিলাম। সে আর কেউ নয়। আবির আংকেলের একমাত্র ছেলে আয়ান মাহমুদ।

সে আমার থেকে ৬-৭বছরের বড় হবে। ভাইয়া বলেই ডাকতাম নয়তো আন্টি রাগ করতো। কিন্তু যখন আমার বয়স ১২ বছরে চলে তখন আমার মা-বাবা খুন হয়ে যায়। কারা করে আমি ছোট থাকায় কিছুই জানতাম না। আর আমাকে জানানোও হয়নি। যতবারই জিজ্ঞেস করছি কাউকে। ততবারই ধমক খাইছি। আমার মা-বাবা থাকা অবস্থায় আবির আংকেল ও ইয়াসিন (আমার বাবা)। আমার ও আয়ানের বিয়ে নিয়ে কথা বলেন। বড় হলে নাকি আমাকে আয়ান ভাইয়ার বউ করে আনবে। আর আমার বাবাও বউ সাজিয়ে আমাকে শশুড় বাড়িতে তুলে দিবে।

সেই স্বপ্ন আর আমার বাবার পূরণ করা হলোনা। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে।

বর্তমানে আমার বয়স ২০ বছর। আয়ান ভাইয়ার ২৬ বছরে চলে। কিছুদিন পরেই ২৭ এ পদার্পণ করবে। মানে কিছুদিন পরেই ভাইয়ার জন্মদিন।

আমি অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি। আয়ান ভাইয়া মাস্টার্স শেষ করে আসছে।

এতগুলো বছর কতোইনা স্বপ্ন বাধঁছিলাম মনে মনে। কখনো আয়ান ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারতাম না শর্মিলা আন্টি (আয়ানের মা) চাইতোনা, যে আমি আয়ান ভাইয়ার সাথে কথা বলি। মাঝে মাঝে যদি আমি ফোন ধরতামও আয়ান ভাইয়া কথা বলতোনা। লাইন কেটে দিতো। তবুও একাএকা অনেক স্বপ্ন বেঁধেছিলাম। নিমিষের মধ্যেই সবকিছু শেষ হয়ে গেলো।

যাকে নিয়ে কত স্বপ্ন বেঁধেছি, সবকিছুই ভেঙে গেলো।

আয়ান ভাইয়াকে জরিয়ে ধরে গালে চুমু খাচ্ছে একটা মেয়ে। আয়ান ভাইয়াও কিছু বলছেনা। তিনি হাসছেন। ওই মেয়েটা যে ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড তা বুঝতে আমার বেশি সময় লাগেনি।

আয়ান ভাইয়ার সাথে তার চারজন বন্ধু আসছে। দুইজন ছেলে আর দুজন মেয়ে।

তার মধ্যে তার ওই গার্লফ্রেন্ডও একজন।

তারা সেল্ফি তুলছেন। কিন্তু ওই মেয়েটা আয়ানের গাঁ ঘেঁষেই থাকছেন।

আংকেল, আন্টি আয়ান ভাইয়ার কাছে গেলেন। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে আছি তাদের থেকে দূরে। আন্টি আমাকে বারবার বলছেন আমি যেনো আয়ানের পাশ ঘেঁষে না থাকি।
এমনকি আমাকে এয়ারপোর্টেও নিয়ে আসতে চাননি। আবির আংকেল জোর করে নিয়ে আসছেন আমাকে। আমিও নির্লজ্জের মতো আসছি, ভাবছিলামতো আয়ানকে দেখে সব কষ্ট ভুলে যাবো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মা-বাবার সাথে চলে যাওয়াটাই হয়তো আমার সব কষ্টের ইতি ঘটাতে পারতো।

আয়ান ভাইয়া সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছেন। আমার দিকে একবারের জন্যও তাকাননি।

অথচ ৮ বছর আগে! তখন আমি কথা না বললে, রাগ করলে। ভাইয়া কতোভাবে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতো। কখনো কান ধরে উঠবস করতো, আবার কখনো চকলেট এনে দিত।

সেই আয়ান ও আজকের এই আয়ান মাহমুদের মধ্যে কত পার্থক্য।

কিছুক্ষন পরে সবার সাথে সাক্ষাৎকার করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

আয়ান ভাইয়া, তার বন্ধুরা ও তার কাজিনরা একটা মাইক্রোবাসে গেল।

আমি, শর্মিলা আন্টি ও আয়ান ভাইয়ার ফুফু ও খালাদের সাথে একটা গাড়িতে।

আবির আংকেল আমাদের সাথে ছিলেননা। তিনি আলাদা গাড়িতে গেলেন।

শর্মিলা আন্টিঃ এই মেয়ে! আগেও বলছি আর এখনও বলে দিচ্ছি। একদম আমার আয়ানের দিকে কোনো নজর দিবিনা। ওর পাশে ঘুরঘুর করবিনা। পা ভেঙে দিবো। বলে দিলাম(রাগ দেখিয়ে)

আয়ানের খালাঃ বাড়ির আশ্রিতা। আশ্রিতার মতোই থাকবে। আয়ানের পিছু ঘুরবে কেন! (হাসির ছলে)

আয়ানের ফুফুঃ আহা! মেয়েটাকে একবার যখন বলছো। ওতো শুনছে। ও যাবেনা আয়ানের কাছে। এত বারবার বলার কি আছে!

(আয়ানের ফুফু, আবির আংকেলের পরে তিনিই একমাত্র ভালোবাসেন আমায়। কিন্তু বেশি কথা খাটাতে পারেননা শর্মিলা আন্টির উপরে।

তাহলেই শর্মিলা আন্টি অপমান করে দেয়।

মানুষ যাই হোক, সম্মান আগে খুজে। তাই হয়তো ফুফুও সম্মানের কথা ভেবে মুখেমুখে তর্ক করেননা শর্মিলা আন্টির সাথে)


পার্টঃ ০২

তোমার এত দরদ দেখাতে হবেনা। এত দরদ থাকলে নিজের ছেলের জন্য নাওনা।

তোমার ছেলের জন্যই পারফেক্ট হবে।

কথাগুলো বলেই শর্মিলা আন্টি ও তার বোন হেসে দিলো।

ফুফু শর্মিলা আন্টিকে কিছু বলতে পারলোনা। কারন শর্মিলা আন্টির কাছেই তার হাত পেতে সাহায্য নিতে হয়। ফুফা কয়টা টাকাই বা রোজগার করে। ঘরে একজন অসুস্থ ছেলে যা রোজগার করে সবকিছুই ওষুধের জন্য শেষ হয়ে যায়।

আবির আংকেল তেমন দিতে পারেননা, তাহলে শর্মিলা আন্টির সাথে দিনভর ঝগড়া লেগেই থাকে।

তবুও শত অপমান সহ্য করেও ফুফু শর্মিলা আন্টির থেকে টাকা নেন। নয়তো ঘরে দুমুঠো খাবার খাবেন কিভাবে! ছেলেকেই বা কি খাওয়াবে!

তাই অপমান, উপহাস, ঠাট্টা সবকিছুই তিনি মুখ বুঝে সহ্য করেন।

ফুফুর ছেলে! ফুফুর ছেলের নাম রসিব। রসিব ভাইয়া কিছুদিন আগেও স্বাভাবিক ছিলেন। কিন্তু এক বছর আগে! তখন রসিব ভাইয়া আমাদের মতোই স্বাভাবিক ছিলেন। রসিব ভাইয়া অনার্স বর্ষে থাকতেন। একদিন কলেজ থেকে বাসায় আসার পূর্বে রাস্তায় কারা যেনো রসিব ভাইয়াকে ধাক্কা দিয়ে মাঝপথে ফেলে দেয় গাড়ির কাছে। ভাগ্য ভালো কিংবা খারাপ জানিনা। ভাগ্য ভালো থাকায় সে প্রানে বেঁচে আছে। আর খারাও থাকায় পা হারিয়ে প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।

তাই ফুফু এই অসুস্থ ছেলের জন্য সবকিছু সহ্য করেন। স্বামীর রোজগারের টাকা দিয়ে তো ওষুধই হয়না ভালোভাবে। ছেলেকে কি খাওয়াবেন ও নিজেরাই বা কি খাবেন!

শর্মিলা আন্টির কথাশুনে ফুফুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরলো।

আমার! আমিতো অভাগী। যে যা বলে তাই শুনতে হয়।

সবার কথা অনুযায়ী মনে হয়। নিজের ইচ্ছেতেই নিজের মা-বাবাকে খুন করে নিজে অনাথ সাঁঝছি।

আচ্ছা! আমি কেন চলে গেলাম না মা-বাবার কাছে! তাহলে এত ভালোভালো কথা কারো মুখ থেকে শুনতে হতোনা।

খুব ভালো থাকতে পারতাম মা-বাবার সাথে। একটা ছোট্ট পরিবারের ছোট সদস্য থাকতাম আমি।

কিন্তু আমার মা-বাবা তারা স্বার্থপরের মতো আমাকে রেখে চলে গেছে।

খুব সুখেইতো ছিলাম আমরা। তাহলে কার এমন কি ক্ষতি করছি! যার জন্য মা-বাবাকে আমার থেকে কেরে নিতে হবে? আমাকেও তাদের সাথে পাঠাতে পারতো,মনে মনে ভাবছিলাম আর চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে।

আয়ানের কাছে যেতে বারন করছি দেখে কান্না করছে! নাকি পা হারানো পঙ্গু ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছি বলে তার জন্য কান্না করছে! (শর্মিলা আন্টির বোন, শর্মিলা আন্টিকে কথাগুলো বললো)

আমি কি বলবো! কিছু বলার নাই আমার। সত্যিই তো আমি একজন আশ্রিতা। একে কেইবা বিয়ে করবে।

কিন্তু আয়ান ভাইয়ার খালার কথা শুনে ফুফুর দিকে তাকালাম।

ফুফুর দিকে তাকানোর থেকে না তাকানোই হয়তো ভালো ছিলো।

মানুষ কতোটা নিচে নামলে এমন একজন অভাগী মা’কে কথা শুনাতে পারে!

ফুফুর দিকে তাকানোর পরে নিজেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। তিনি নিজের ছেলেকে পঙ্গু বলা শুনে অনবরত চোখের পানি ঝরাচ্ছেন। মুখ বুঝে সহ্য করছেন।

আমি কিছু বলতে পারলাম না। নিরূপায় আমি, শুধু ফুফুর হাতটা শক্ত করে ধরলাম।

বাসার সামনে গাড়ি থামলো। গাড়ি থেকে নামার পরে দেখি আয়ান ভাইয়া ওই মেয়েটার গাঁ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। আয়ান ভাইয়া দাঁড়িয়েছে বললে ভুল হবে। মেয়েটাই নিজ থেকেই ভাইয়াকে জরিয়ে ছবি তুলছেন। দুজনকে মানিয়েছে ভালোই। একজন ফুল ড্রেস-আপে(আয়ান) আরেকজন হাফ ড্রেসে(তার গফ)

শর্মিলা আন্টিঃ এভাবে ভেবলার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন! একদম আমার ছেলের দিকে নজর দিবিনা বলে দিলাম। চোখ উঠিয়ে দিবো। (রাগীভাবে তাকিয়ে)
আমার মেয়েটাকে আয়ানের সাথে কতভালো মানাচ্ছে। (শর্মিলা আন্টির বোন)

এতক্ষনে বুঝলাম, ওই মিস. হাফ প্যান্ট তার মেয়ে! তার জন্যই এমন করছে আমার সাথে।

যাই হোক আয়ান ভাইয়াই আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। আমি কেন তার পিছনে ঘুরঘুর করবো।

এতদিন তো একটা আশার আলো নিয়ে ছিলাম। আয়ান ভাইয়া দেশে আসলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সবকিছু ঠিক হওয়ার বদলে আগের থেকে কয়েকগুন পরিবর্তন হলো।

শর্মিলা আন্টি যখন আমার সাথে জোরে রেগে রেগে কথাগুলো বললেন। তখন আয়ান ভাইয়া একবার তাকিয়ে ভিতরে চলে গেলো।
আয়ান ভাইয়া ও তার বন্ধুদের আপ্যায়নের দায়িত্ব আমার উপরে পরলো। তাও শর্মিলা আন্টি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার ছেলের খাবারে কিছু মিশিয়ে দেই কিনা তা দেখার জন্য।

আমি হাত দিয়ে কাজ করছি আর কান দিয়ে শর্মিলা আন্টির কথা শুনছি।

খাবারগুলো গুছানোর পরে যখন নিয়ে আসবো তখনই শর্মিলা আন্টি বাঁধা দিলেন।

শর্মিলা আন্টিঃ নাঁচতে নাঁচতে কই যাচ্ছিস। একদম আয়ানের কাছে ঘেষতে যাস না। (রেগে)

আর শোন, উপরের রুম থেকে সবকিছু গুছিয়ে নিস। বুঝোইতো কত আত্নীয় আসছে। তাদেরকে ভালোভাবে যত্ন করতে হবেতো।

আমিঃ কোথায় যাবো তাহলে?

শর্মিলা আন্টিঃ স্টোর রুমে যাবি। এত বলার কি আছে!

কেউ যদি কিছু জিজ্ঞেস করে, তোর কিছু বলার দরকার নাই। আমি সামলে নিবো।

মনে থাকবেতো?

আমিঃ হুম। (মাথা নিচু করে)

সবকিছু গুছিয়ে স্টোর রুমে গেলাম। রুমে যাওয়ার পরে মনটা অনেক ভালো হয়ে গেলো। কি সুন্দর রুম! দেখলেই ইচ্ছে হয় এর থেকে অন্যের বাসায় কাজ করে খাওয়া ভালো।
আচ্ছা আমিইবা এখন এ বাসায় পরে আছি কেন! আমার এত দিনের অপেক্ষা তো মুহুর্তেই শেষ হয়ে গেছে।

তাহলে এখানে আর পরে থাকার কোনো মানেই হয়না। হয়তো বাবা-মায়ের কাছে চলে যাবো। নয়তো দুচোখ যেদিকে যাবে সেদিকেই চলে যাবো।
নিশ্চয় একটা উপায় তো পাবোই।

আর না খেয়ে মরে যাওয়াও ভালো। অন্ততপক্ষে কারো অবহেলার পাত্রী তো হতে হবেনা।

আচ্ছা আবির আংকেলের কাছে বলে যাবো?

তার থেকে কারো কাছে না বলে যাওয়াটাই ভালো হবে। আবির আংকেলের কাছে বললে শর্মিলা আন্টির সাথে ঝগড়া হবে।

তার থেকে রাতের আধাঁরেই অজানা পথের খোঁজে চলে যাবো কারো কাছে না বলে। যেখানে কোনো অবহেলা থাকবেনা। না থাকবে কারো ঘৃনা, আমি অনাথ বলে।

আচ্ছা! অনাথ হলেই কি সবার অবহেলা দেখতে হবে! তারা তো নিজ থেকে কখনোই অনাথ হয়না।

শুনছি অনাথদের ভালোবাসতে হয়। কিন্তু সবকিছুই ভুল শুনছি। অবহেলা ছাড়া তাদের কপালে আর কিছুই থাকেনা। আমি নিজেই তার প্রমান।

রুমটা কোনোভাবে পরিষ্কার করলাম। কারন আজকেই হয়তো আমার শেষ দিন হতে পারে এ বাড়িতে।

নিজেকে স্টোর রুমের মধ্যেই রাখলাম, কারন বাহিরে বের হলে আবির আংকেল অনেক প্রশ্ন করতে পারে। জানতে পারলে শর্মিলা আন্টির সাথে ঝগড়া বাধাঁবে। আছিই আজকের দিন শুধু শুধু শর্মিলা আন্টিকে দোষারোপ করতে চাইনা। যেভাবেই হোক তার কাছে থেকেই বড় হইছি।

তাছাড়াও আয়ান ভাইয়ার আশেপাশে যেতেও বারন করছে। আর আমি যেতেও চাইছিনা। শুধু শুধু অবহেলা ও মায়া বাড়াতে চাইনা।

তার থেকে নিজে নিজে কল্পনা করা ভালো কিভাবে এই নরক থেকে পালানো যায়।

হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার রুমে আসছে। দড়জা লাগানোর শব্দ পেলাম। আমি ভয়ে ভয়ে দড়জার দিকে তাকালাম।

যা দেখলাম তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি।

মনে হচ্ছে এ বাড়িতে আমার আজকে শেষ দিন হবেনা। পৃথিবীতেই শেষ দিন হতে পারে।

আপনি!


পার্টঃ ০৩

আপনি!

জ্বি বেবি। তোমায় ছাড়া আমি থাকতে পারি বলো?তাইতো তোমার কাছে চলে আসছি।

সামনে এগোতে এগোতে কথাগুলো বললো রাফাত।

রাফাত হলো মিস হাফ প্যান্ট ওরফে মিরার ভাই।

আমার প্রতি তার বরাবরের মতোই একটা কুনজর আছে শকুনের মতো। আমায় দেখলে হয়তো হাত ধরার চেষ্টা করবে, অথবা বাজে কথা বলবে।

যদি শর্মিলা আন্টি ও তার বোনের কাছে কিছু বলতে যাই উল্টা আমাকে কথা শুনাবে, ভয় দেখাবে।

আজকে! হয়তো রাফাতের জন্য আমার শেষ দিনও হতে পারে।

আমিঃ প্লিজ ভাইয়া, কাছে আসবেননা। আমি আপনার বোনের মতো। (মিনতি করে)

রাফাতঃ চুপ কর! সব বোন হলে বউ কে হবে?

আর শোন তোর এমন আকুতি-মিনতিতে আমার কিছু আসবে যাবেনা। কত মেয়ের সংস্পর্শে ছিলাম, তারপরে ছুড়ে ফেলে দিছি।

তুমি ভয় পেয়োনা তোমাকে।

বাকি কথা বলতে পারলোনা রাফাত ভাইয়া। তার আগেই একটা শব্দ আসলো।

আমি শব্দটা অনুভব করলাম, কই থেকে আসলো। তাই ভয়ে ভয়ে সামনে তাকালাম, তাকিয়ে দেখি রাফাত ভাইয়া আমার থেকে অনেকদূরে দাঁড়িয়ে আছে। গালে হাত দিয়ে, রাগে লাল টমেটোর মতো হচ্ছে।

তার সামনে! আয়ান ভাইয়া দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।

আমার বুঝতে বাকি নেই আর, রাফাত ভাইয়া ওভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন! আর শব্দটাই বা কেন হইছিলো!

আয়ান ভাইয়ার সিগারেটের ধোঁয়ায় আমার কাশি শুরু হয়ে গেলো। সাথে সাথে আয়ান ভাইয়া সিগারেট পায়ের নিচে ফেলে পিষে ফেললো। এবং রাফাত ভাইয়ার দিকে এমনভাবে তাকাইছে মনে হচ্ছে তাকে ওই চোখ দিয়েই গিলে খাবে।

আয়ান ভাইয়ার বর্তমানের এই রূপ দেখে রিতীমত ভয় লাগছে।

কিন্তু আয়ান ভাইয়া আমার দিকে একবারের জন্যও তাকালেননা।

কিছুক্ষনের মধ্যেই স্টোর রুমে সবাই উপস্থিত হলো।

শর্মিলা আন্টিঃ কি হচ্ছে এখানে! আয়ান ভাইয়াকে দেখে আন্টি খানিকটা চমকে গেলেন। সাথে ভয়ও পেলেন।

আআআয়ানন! এখানে কি করছিস বাবা?

আয়ানঃ আমারও একই প্রশ্ন, রুমের অভাব হইছে অনেক(রেগে)? জান্নাত এখানে কি করছে?

শর্মিলা আন্টি, আয়ান ভাইয়ার কথাটা ঠিকভাবে হজম করতে পারলোনা। তিনি থতমত খেয়ে বললেন।

এই মেয়ের মতিগতি বুঝিনা। দেখ এই রুমে আসছে হয়তো এই আকামের জন্যই। এখানে আসলে তো কেউ কিছু দেখবেনা।

আয়ানঃ আচ্ছা মা! তোমার মনে হচ্ছেনা? তুমি একটু বেশিই বলে যাচ্ছো।

আর কতো ভালোমানুষি দেখাবে!

শর্মিলা আন্টিঃ তুই কি বলছিস বাবা! (ন্যাকা কান্না করে)। এই মেয়েটার জন্য আমার সাথে এভাবে কথা বলছিস!

আয়ানঃ সমস্যাই তো এখানে, তুমি আমার মা। তাই কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারিনা।

তোমায় আমি কোনোভাবে খারাপ কিছু বলিনি। শুধু এতটুকুই বলছি, নিজেকে শুধরে নাও। অনেক সময় আছে এখনও। এখন যদি আমার কথার গুরুত্ব না দাও, তাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

শর্মিলা আন্টিঃ তুই আবারো আমাকে ছোট করছিস(কান্না করে)। বাবা! এই মেয়েটা নিশ্চয় কিছু করছে। যার জন্য হঠাৎ তুই এভাবে বদলে যাবি।

আয়ানঃ আমি যদি বলি, তোমাদের কারনেই আজকে আমি বদলে গেছি তখন?

শুধু শুধু অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো বন্ধ করো।

শর্মিলা আন্টিঃ কি আমি দোষ চাপাচ্ছি! এই মেয়েটার জন্য তুই এমন কথা বলছো আমার সাথে তাইতো!

আজকে এর একটা হেস্তনেস্ত হবেই। হয়তো এই মেয়েটা থাকবে নয়তো আমি থাকবো।

সাপকে যতই দুধকলা দিয়ে পুষো, ছোবল তো মারবেই।

আয়ানঃ একটু বেশিই বললে না!

কিন্তু কথাটায় যুক্তি আছে সত্যিই এমন হয়। সাপকে দুধকলা দিয়ে পুষলে ছোবল তো মারবেই। কারন এটাই ওর নীতি, অন্যকে ছোবল মারা।

কথাগুলো আয়ান আবির সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো।

আয়ানের কথাটা শুনে রীতিমতো কেঁপে৷ উঠলো আবির আংকেল। আয়ান কি অন্য কিছু বুঝাতে চাইছে, ওর কথার মাধ্যমে?

আয়ানের কথায় আবির সাহেবের পুরনো স্মৃতি কড়া নাড়লো। কিন্তু আয়ানের তো তার ব্যাপারে কিছু জানার কথা না। যার জন্য ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন।

তাই তিনিও আয়ানের কথায় মাথা ঘামালেননা।

আবির আংকেলঃ এখানে এভাবে না দাঁড়িয়ে বিষয়টি মিটিয়ে নিলেই তো হয়।

এত রাগারাগির কি আছে?

শর্মিলা তুমিও ছেলেমানুষী করছো কেন! যাও এখান থেকে।

শর্মিলাঃ হ্যাঁ! সব দোষ তো আমারই। যার যা ইচ্ছা আমাকে বলো। আমিতো কারো কিছুইনা।

আয়ানঃ তোমাদের সাথে কথা বলাই বৃথা(রেগে) চলে যাচ্ছিলো কিন্তু দড়জা পর্যন্ত যাওয়ার পরে পিছু ফিরে, আমার হাত ধরে নিয়ে গেলো।

রাফাত ভাইয়াকে তার মা শান্তনা দিচ্ছেন। তবুও রাফাত ভাইয়া রাগে ঘৃনায় দেয়ালে ঘুষি দিলেন।

আয়ান ভাইয়ার বন্ধুরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। আয়ান ভাইয়া যখন আমাকে নিয়ে আসলেন, তখন তার বন্ধুরাও স্টোর রুম থেকে চলে আসছেন।

মিস.হাফ প্যান্টকে দেখা গেলোনা৷ ভালোই হইছে যতক্ষন সামনে থাকবে মাথাটা খারাপ করে দেয়।

ভাইয়ার রুমে নিয়ে আসলেন, আর সাথে সাথে দড়জা লাগিয়ে দিলেন।

দড়জার ওপাশে থেকে যে সবাই দড়জায় ঠোকা দিয়ে যাচ্ছে ভাইয়া শুনেও না শুনার ভান করে আছেন।

তিনি সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে পড়লেন।

আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। কি হচ্ছে আমার সাথে কিছুই বুঝতে পারছিনা।

আয়ান ভাইয়া! যে সকালেও আমার সাথে কথা বললো না। এমনকি একটু আগেও ফিরে তাকালোনা৷ আর হঠাৎ! এভাবে পরিবর্তন কেন হবে!

স্বপ্ন না সত্যি বুঝতে পারছিনা। স্বপ্ন হলে যেনো ঘুমটা না ভেঙে যায়৷ এভাবে স্বপ্ন দেখতে ভালোই লাগছে। আয়ান ভাইয়া সবার সামনে থেকে যেভাবে নিয়ে আসলো, মনে হচ্ছে আমার উপরে তার অধিকার সবথেকে বেশি।

আর এটা যদি সত্যি হয়! তাহলে তো খুশির ঠেলায় আমি বেহুশ হয়ে যাবো৷ হয়তো অতি খুশিতে মারাও যেতে পারি।

তাই স্বপ্ন কিনা সত্যি দেখার জন্য, ধীরে ধীরে সোফার কাছে গেলাম। আয়ান ভাইয়াকে স্পর্শ করলেই বুঝতে পারবো। এটা সত্যি নাকি স্বপ্ন!

আয়ান ভাইয়াকে যখনই স্পর্শ করবো তখন একটা ধমক দেয় ভাইয়া।

আয়ানঃ কি করছিস! (একটু জোরেই বললো)

আমিঃ আআআমি কিছু করিনি(ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে)

আয়ানঃ তাতো দেখতেই পারছি তুই কিছু করোনি। তাহলে এভাবে চোরের মতো আসছিস কেন! (ডেভিল হাসি দিয়ে)

আমিঃ আআসলে।

আয়ানঃ হুম! আসলে কি?(হেসে)

আজকে এমনিতেই একটা শকড এ আছি, তারমধ্যে যদি এমন হাসে। তাহলে সত্যি সত্যিই আমি অজ্ঞান হয়ে যাবো।

ধুর! এখনও বুঝতেই পারলাম না আমি স্বপ্ন দেখছি!

নাকি কোনো রূপকথার দেশে আছি! না চাইতেও সবকিছুই হয়ে যাচ্ছেবিরবির করে

আয়ান যতদিন বেঁচে আছে অন্য কোনো রাজ্যে যেতে পারবেনা। আয়ানের রাজ্যেই আছো।চোখ বন্ধ করে কথা গুলো বললো আয়ান ভাইয়া।

আমি আবারও শকড। হা করে তাকিয়ে আছি। এবার সত্যি সত্যিই স্বপ্ন মনে হচ্ছে।

আয়ানঃ এভাবে হাবলার মতো না তাকিয়ে থেকে, কাজ কর।

আমিঃ কিইইই(জোরে)

আয়ানঃ কান ঝালাপালা হয়ে গেলো৷ এভাবে চিৎকার করে।

কাজ করতে বলছি শুধু অন্যকিছু না, কাজেই এত চিল্লানোর দরকার নাই।

আমিঃ দড়জার দিকে যাবো তখনই, হাতে একটা টান অনুভব করলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি। আয়ান ভাইয়া হাত ধরে আছে।

আমি আবারও অবাকে চরম পর্যায়ে পৌছে গেলাম।

এবার নিশ্চিত আমি, এতক্ষন স্বপ্ন দেখছি। আয়ান ভাইয়া তো তাকায়ইনা আমার দিকে ভালোভাবে। আর আমার হাত ধরবে!

এটা ভাবলেও নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছুইনা।

আয়ান ভাইয়া আবারও আমার দিবাস্বপ্নকে ভেঙে দিলেন।

ওইই পিচ্চি! এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস এত?আর দড়জার বাহিরে যেতে চাচ্ছিস কেন! (রেগে)

আমিঃ আপনিই তো বললেন কাজ করতে। এখানে তো কোনো কাজ নাই। তাহলে কি করবো তাই রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলাম(মাথা নিচু করে)

আয়ানঃ এখানে কাজ নাই কে বলছে!

আমি যখন কাজের কথা বলছি তখন কাজটাও নিশ্চয় আমি দিবো৷

আমিঃ হুহ! কি কাজ?

আয়ানঃ আমার পা টিপে দিবে এখন। এটাই তোমার কাজ।

আমিঃ কিই! এটা কোনো কাজ হলো?

আয়ানঃ জ্বি এটাই কাজ। এত কষ্ট করে স্টোর রুমে গেছি পা ব্যাথা করে( বত্রিশ টা বের করে হাসছে)

আমার পা ধরলে তোমারও সুবিধা হবে আমারও সুবিধা হবে। তাই কিছু না ভেবে কাজে মনযোগী হও।

আমিঃ আমার কি সুবিধা! কিছু না বুঝে (হানি/বানিয়ের) হানির মতো দাঁড়িয়ে আছি।

আয়ানঃ এইযে বারবার লুকিয়ে লুকিয়ে আমার ছুঁতে আসছো।

তাই আমিই এখন অনুমতি দিচ্ছি। (চোখ টিপ মেরে)

এর সাথে যে আমি পারবোনা তা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি। তাই আমিও চুপচাপ কাজে মনযোগী হতে চাইছি। তাও শুধুমাত্র আমার সুবিধার জন্য না। আজকে আয়ান ভাইয়ার জন্যই আমি আমার আমিত্ব রক্ষা করতে পারছি।

যখনই পায়ের কাছে বসে পা ধরতে যাবো তখনই আয়ান ভাইয়া উঠে বসে। আর আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।

আজকে কি আমাকে কোনো সার্কাসের জোকারের মতো লাগছে! যে মানুষটা ভালোভাবে কথাই বলেনা। অথচ আজকে এত হাসি কিভাবে আসে!

নিশ্চয় কোনো কারন আছে।

আয়ানঃ এই মিস. পিচ্চি ভাবুনি। এত ভাবাভাবির দরকার নাই। তোর কাজ করতে হবেনা। এর জন্য মিরা আছে,! (বলেই ডেভিল মার্কা হাসি দিয়ে দড়জা খুললো)

মিরার কথাটা শুনে অনেক খারাপ লাগলো। তাই আমি বসেই রইলাম। কিন্তু দড়জার বাহিরে এত হট্টগোল দেখে আর বসে থাকতে পারলাম না।

আবির আংকেলঃ কি হচ্ছে আয়ান? এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।

শাহিনঃ কি হচ্ছে আয়ান এইসব! মাথা ঠিক আছেতো তোর?(আয়ানের এক বন্ধু)

ব্লা ব্লা ব্লা।

আরও অনেকে অনেক প্রশ্ন করলো।

আয়ান ভাইয়া হাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছে।

আমি ভাইয়ার পাশে এসে দাড়ানোর পরে সবাই চুপ হয়ে গেলো।

মিরা! রেগে গোল আলু হয়ে আছে। শর্মিলা আন্টি ও তার বোন তারাও অনেক রেগে আছেন।

আবির আংকেলের মুখে চিন্তার ছাপ।

আয়ান ভাইয়ার বন্ধুরা তার দিকে রেগে তাকিয়ে আছে।

কি হচ্ছে এখানে আমি বুঝতে পারছিনা সাথে আয়ান ভাইয়াও কিছু বুঝতে পারছেনা।

আয়ানঃ কি হচ্ছে এখানে! এভাবে সবাই দড়জার পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছো কেন!

বিনা টাকায় কি কোনো সার্কাস দেখাচ্ছে(রেগে)

মিরা এসে আয়ানকে জড়িয়ে ধরলো সবার সামনে।

কি বেহায়া মেয়েরে বাবা! এভাবে কারো সামনে কেউ জরিয়ে ধরে? তাও মা-বাবা সামনে আছে!

যেমন আয়ান ভাইয়া তেমন তার গফ। দুটোই বেহায়া।


পার্টঃ ০৪

মিরা এসে আয়ানকে জড়িয়ে ধরলো সবার সামনে। কি বেহায়া মেয়ে।

আয়ান! তিনিও বা কম কিসে। দুটোই বদের হাড্ডি।

মিরাঃ তুমি কিছু ওরে কিছু করোনি তো বেবী। (ন্যাকা কান্না করে)

আয়ানঃ নাহ। মাথা খারাপ নাকি! (মিরাকে সরিয়ে)

সবাই একসাথে পাগল হইছো?(চেঁচিয়ে) এখানে এত হট্টগোল কিসের শুনি?(রেগে)

আয়ানের চেঁচানো দেখে সবাই চুপচাপ চলে গেলো।

সবাই জানে আয়ান রেগে গেলে কি করতে পারে।

মিরা! সবাই গেলেও মিরা যে চলে যাবার মেয়ে নয়। এটা আয়ান ভালোভাবেই জানে।

তাই মিরাকে ঠিক রাখতে।

চলো মিরা বেবী, ছাঁদ থেকে ঘুরে আসি। এখানে ভালোলাগছে না।

মিরার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে!

আয়ানের এমন আচরনে মিরা ১৪০ ভোল্টের শকড খেল। আয়ান এত ভালোভাবে কথা বলছে মিরার সাথে!

মিরাতো খুশিতে নাচানাচি শুরু করে দিছে।

আয়ানের মনের মধ্যে কি চলছে তা শুধুমাত্র শাহিন(আয়ানের বেষ্ট ফ্রেন্ড ) ছাড়া কেউ জানেনা।

মিরার সাথে এমন ভালোভাবে আচরণ করতে দেখে শাহিন হাসলো একটু। কিন্তু পরক্ষণেই জান্নাতর দিকে তাকানোর পরে শাহিনের হাসি মুখে মেঘ জমে গেলো।
বনু! (আমাকে উদ্দেশ্য করে)

আয়ান ভাইয়ার এরকম পরিবর্তন দেখে খুব কষ্ট লাগছে।

আচ্ছা! ছোট সময়ের কথা কি তার মনে নেই!

একটু আগে কি শুধুমাত্র দয়া দেখিয়েছে! নাকি অন্যকিছু!

দয়া দেখানো ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই মনে হচ্ছনা।

তাহলে মিস. হাফ প্যান্টের সাথে ঢেইঢেই করে নাচতে নাচতে যেতনা।

কিন্তু একটা কথা ভেবে ভালোই লাগছে। সবার সাথে সাথে আমার চোখও স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। এখন আগের মতো আর চোখের পানি ঝরাতেই চাইছেনা।

এসব ভাবছি তাই শাহিন ভাইয়ার কথা ভালোভাবে খেয়াল করিনি।

শাহিনঃ হ্যালো! এত কি ভাবছো? (তুড়ি দিয়ে)

আমিঃ কককই কিছুনা ভাইয়া।

শাহিনঃ বুঝাই যাচ্ছে।

ভাইয়ার কাছে কিছু লুকানো যায়না। ভাইয়ারা এমনিতেই বুঝে নেয় তার বোন ভালো আছে কিনা।

কখনো কষ্ট পেলে নিজের মধ্যে রাখতে নেই। তাহলে কষ্ট দ্বিগুণ বেড়ে যায়৷ তারথেকে কারো কাছে শেয়ার করবা। দেখবা তোমার কষ্ট অনেকটা কমে গেছে।

বলেই শাহিন ভাইয়া চলে গেলো।

আমার কষ্ট শেয়ার করার মতো কাউকে দেখছিনা। শুধু শুধু কষ্ট শেয়ার করার মত মানুষ খুঁজে আরও কষ্ট বাড়াতে চাইনা।

তার থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে যেতেই হবে।

এই নরকের মধ্যে আর থাকতে ইচ্ছা করছেনা।

ভাবতে ভাবতে স্টোর রুমের দিকেই আসলাম। এটাই তো একমাত্র আমার থাকার জায়গা। কিন্তু কিছুক্ষন আগের কথা মনে পড়তেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।

আয়ান ভাইয়া না থাকলে এতক্ষনে হয়তো প্রতিটি খবরের চ্যানেলে হেড-লাইনে আমার কথাটাই থাকতো।

বড়বড় খবরের কাগজেও আমার নামটাই বড় অক্ষরে ছাপানো হতো।

রুমে যাওয়ার পড়ে আবারো শকড আমি।

আয়ান ভাইয়া!

সে তো মিরার সাথে ছিলো, আমার রুমে কি করছে!

আমি দড়জা পর্যন্ত এসেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

আমার ঘোর কাটছেনা, ভাইয়াকে সব জায়গায় কারনে-অকারনে দেখি। কখনো স্বপ্ন, কখনো কল্পনা।

ইদানীং বুঝতে পারছি আমার একটা অসুখ হইছে। যার নাম আয়ান অসুখ।

যে কল্পনাতেও আসছে, আর বাস্তবেও আসছে।

কখনো ভালবাসে, আবার কখনো অবহেলা করে যায়।

আমার সমস্ত ঘোর কাটিয়ে আয়ান ভাইয়া আমাকে হেচঁকা টান দিয়ে রুমের ভিতরে নিয়ে দড়জা লাগিয়ে দিল।

এভাবে টান দেয়ার কারনে আমি এসে আয়ান ভাইয়ার বুকে ঝেঁকে পড়লাম।

আয়ান ভাইয়া! সে আমাকে আলতো ভাবে জড়িয়ে ধরলো। এই বুঝি পালিয়ে যাবো এই বাহুডোর থেকে।

হঠাৎ মনে হলো, আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমার কপাল বেয়ে পড়ছে।

আমিও সেই ভালোবাসাময় পানি অনুসরণ করতে লাগলাম।

একি! আয়ান ভাইয়া কান্না করছে!

ছেলেরাও বুঝি কান্না করতে পারে! একদম মেয়ে-মেয়ে লাগে।

কিন্তু আয়ান ভাইয়া কান্না করাতে ভাইয়াকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। পুরাই বাচ্চাদের মতো।

কিন্তু কষ্ট ছাড়া ছেলেরা কান্না করতে পারেনা। আয়ান ভাইয়ার এত কষ্ট কিসের?

ওই মিস. হাফ প্যান্ট মিরার সাথে ঝগড়া হয়নিতো! একটু আগে ভাইয়াতো ভালোই ছিল। তাহলে হঠাৎ এত কষ্ট কীসের?

শাহিন ভাইয়া তো বললো, কষ্ট সবার সাথে শেয়ার করতে হয়, তাহলে নাকি কষ্ট কমে যায়।

আয়ান ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলে কি বলবে আমায়? নাকি ধমক দিবে।

ধমক দিলে দিবে আমার কি! আজকে একদিনই হয়তো অবহেলা পাবো। তারপর তো চলেই যাবো। তার থেকে আয়ান ভাইয়ার কষ্টের কারনটা জেনে যাওয়াই ভালো।
তাই আমিও অন্যকিছু না ভেবে ভাইয়ার চোখের পানি মোছার জন্য পা উঁচু করে দাড়ালাম।

আয়ান ভাইয়া এতটা লম্বা! যার জন্য পা উঁচু করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।

চোখের পানি মুছে দেয়ার সাথে সাথেই। আমার সমস্ত চিন্তাভাবনার বিসর্জন দিয়ে ভাইয়া আমার দুইগালে হাত রেখে মুখটা উঁচু করে ধরলো।

আমায় ছেড়ে পালানোর বুদ্ধি চলছে? (মুখ গোমড়া করে)

আমি বরাবরের মতোই শকড। আয়ান ভাইয়ার মাথা ঠিক আছে তো!

আমি চলে গেলে তার কিছু হবে কেন! সবার ভালো হবার কথা।

সত্যিই কি আমি তাকে ছেড়ে পালিয়ে থাকতে পারবো!

স্মৃতি তো তাড়া করবেই। শুধু মানুষটিকে সামনে দেখবোনা।

এটা তো নিজে নিজে ভাবছিলাম, কারো সাথে শেয়ার তো করিনি।

আয়ান ভাইয়া কিভাবে জানতে পারলো!

কথা বলছিস না কেন! খুব বড় হয়ে গেছো তাইনা!

এক পা বাহিরে দিয়ে দেখ না পা ভেঙে ঘরে রেখে দিব।

কথাগুলো বলে আমাকে কোনো পরোয়া না করেই হনহন করে চলে গেলো।

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কি হচ্ছে আমার সাথে, আমি কি সারাদিনই দিবাস্বপ্ন দেখে কাটিয়ে দিচ্ছি সময়টা!

ফ্লাশব্যাক…..

মিরার সাথে আয়ানের তেমন কোনো ভালো সম্পর্ক নেই বললেই চলে।

এয়ারপোর্ট থেকেই সবাইকে দেখানোর জন্য আয়ান মিরার এতটা কাছে ঘেষে থাকছে।

আয়ান কেনই বা এমনটা করবে! সবাইকে দেখিয়ে মিরার কাছে থাকা কি আয়ানের জন্য খুবই জরুরী!

মিরার তো কোনো কথাই নাই। আয়ানকে পেলেই হইছে, তাতে আয়ান যত বকাঝকা করুক না কেন! তবুও আয়ান এর কাছাকাছি ঘেঁষে থাকবেই।
কিছুক্ষন আগে যখন ছাদে নিয়ে গেলো সবার সামনে থেকে।

আয়ানঃ তোরে কয়বার বলছি, এভাবে আমাকে যখন তখন জড়িয়ে ধরবিনা। কথা কি কানে যায় না? (রেগে)

সারাক্ষন এত বেবি বেবি করছিস কেন!

আমাকে দেখে কি ছোট একটা বাচ্চা মনে হয় তোর! (রেগে)

শোন, একটা কথা তোকে হাজার বার বলতে হবে কেন! আমি তোর ভাই হই। খালাতো ভাই। তাই নিজের ভাইয়ের চোখেই দেখিস আমায়।

আর শোন। তোর সাথে এভাবে কথা বলছি আমি। যদি তুই আর আমি ছাড়া বাইরের কেউ জানতে পারে, তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবেনা।
আয়ানের কথাগুলো শুনে মিরা রেগেমেগে চলে গেলো।

কিছুক্ষন পরে শাহিন ছাদে এসে বললো। ।

আয়ান!

হুম।

ভাই যা করছিস ভালোভাবে ভেবে করিস, আর তাড়াতাড়ি।

এমন কিছু করতে যাস না, যার জন্য কারো কোনো ক্ষতি হোক অথবা কেউ কষ্ট পায় এমনকিছু।

আয়ানঃ কি বুঝাতে চাচ্ছিস!

ভালোভাবে বল।

শাহিনঃ কিছুনা।

আমি কিছু বললে হয়তো খারাপ লাগবে। তুই বুদ্ধিমান, নিজে খুজে নিস।

তখনই আয়ানের একটা ভয় হলো। যার জন্য স্টোর রুমে গেলো।

বর্তমান….

আয়ান ড্রয়িংরুমে গেলো, সেখানে সবাই বসে আছে।

আবির সাহেব টিভি দেখছেন।

শর্মিলা, তার বোন বসে আছেন।

রাফাত তখনই বাড়ি থেকে চলে যায়। মিরা মুখ গোমড়া করে ওর মায়ের কাঁধে মাথা দিয়ে আছে।

আয়ানের ফুফু রান্না করছেন। কতমানুষের রান্না একা সামলাচ্ছেন। এখান থেকে ভালো খাবার নিতে পারবে ছেলেটার জন্য তাই।

আয়ান যেয়ে চুপচাপ সোফায় বসলো।

আয়ানের বন্ধুরা শাহিন, নিবিড়, মিন্নি ওরাও আছে।

হঠাৎই আবির সাহেবের হাত থেকে টিভির রিমোট পড়ে গেলো।

রিমোট পড়ার শব্দে সবার মনযোগ আবির সাহেবের দিকে গেল। অতঃপর টিভির দিকে চোখ দিতেই মুহুর্তের মধ্যেই নিরবতার ছায়া নেমে আসছে।


পার্টঃ ০৫

হঠাৎই আবির সাহেবের হাত থেকে টিভির রিমোট পড়ে গেলো।

রিমোট পড়ার শব্দে সবার মনযোগ আবির সাহেবের দিকে গেল। অতঃপর টিভির দিকে চোখ দিতেই মুহুর্তের মধ্যেই নিরবতার ছায়া নেমে আসছে।

আট বছর আগের কাহিনি আবার শুরু হইছে!

( জান্নাতর মা-বাবা) ইয়াসিন সাহেব ও তার সহধর্মিণীর খুনের তদন্ত শুরু হচ্ছে নতুনভাবে। ঠিক আট বছর পরে।

কিন্তু ইয়াসিন সাহেবের এমন ভয় পাওয়ার কি আছে!

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো সবাই তারদিকে।

ইয়াসিন সাহেব সবাইকে ঠিক রাখার জন্য মুখে হাসির রেখা টেনে বললেন।

অবশেষে খুনের রহস্য উদ্ধার হবে। কিন্তু আট বছর পরেই বা আবার নতুন করে তদন্ত শুরু হলো কেন! কারাই বা করলো।

আয়ানঃ পাপ বাপকেও ছাড়েনা।

তাই হয়তো।

আয়ানের কথা শুনে ওর বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কথাটা আয়ান কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেনিতো!

তিনি সাথে সাথে আয়ানের দিকে তাকালো, দেখলেন আয়ান মিটমিট করে হাসছে।

আবির সাহেব বুঝতে পারলেন কিছুটা। তার ছেলের হাত কিছুটা হলেও আছে এই তদন্তের মধ্যে। তাই তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
শর্মিলা আন্টি আবির সাহেবের দিকে তাকালেন একবার। তার মুখটাও চিন্তায় শুকিয়ে গেছে হয়তো।

শাহিন আয়ানের দিকে তাকালো। দেখছে আয়ানের মুখে এখনো হাসির রেখে ফুটে আছে।

শর্মিলার বোন শর্মিলার দিকে তাকিয়ে আবার মেয়ের(মিরার) মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

আয়ানের ফুফু চা নিয়ে আসলো। সবাইকে চুপচাপ দেখে তিনি রান্নাঘরের দিকে পা দিলেন, তখনি।

আয়ানঃ ফুফু!

আয়ানের ডাকে পিছনে ফিরলেন।

ফুফুঃ হুম।

আয়ানঃ রসিবকে দেখছিনা যে। আমি আসছি সকালে কিন্তু ও এয়ারপোর্টেও গেলোনা। বাড়িতেও আসলোনা একবারের জন্যও।

আমি আসছি দেশে। রসিব কি জানেনা? (মন খারাপ করে)

ফুফুঃ আয়ানের কথা শুনে মন খারাপ হহে গেলো।

আসলে রসিব বাড়িতে আছে। কোথাও বের হয়না বাসা থেকে। আমার অনেক রান্না পড়ে আছে। আমি যাচ্ছি( কথা এড়িয়ে চলে যেতে চাইলেন)।

আয়ানঃ এড়িয়ে যাচ্ছো আমায়?

কি হয়েছে বলো! আমি আসছি জেনেও রসিব বাড়িতে থাকবে এমন কোনো কথা নাই।

সত্যি বলবা নাকি, আমি কিছু করবো। (রেগে)

ফুফুঃ একটু ভয় পেলো। সবাই জানেন আয়ানের রাগ হলে কি করতে পারে। এতদিনের সাধনা নিমিষেই শেষ করতে পারেননা।

যাদের সন্দেহ করছেন, কিন্তু টাকা ও ক্ষমতার জন্য তিনি কিছুই করতে পারেননি।

এখন আয়ান আসছে, তাহলে হাত ছাড়া কিভাবে করা যায়। এসব ভেবেই তিনি আয়ানকে সত্য কথা বলে দিলেন।

আসলে রসিবের পা নেই। (মাথা নিচু করে, আমতা আমতা করে বললেন)

আয়ানঃ এ কথাটা হয়তো শুনতে চাইছিলোনা।

মানেএ! কিভাবে কি হইছে!

ওর পা নেই। (আফসোস নিয়ে)

ফুফুঃ চোখের পানি চলে আসলো। কিন্তু ভয়ে কিছু বললোন। তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে ছুটে গেলেন।

আয়ানের বিষ্ময় কাটছেনা এখনও। এটা কি শুনলো! রসিবের পা নেই!

মানুষ এতটা খারাপ কিভাবে হতে পারে! রসিবকেও শেষ পর্যন্ত ছাড়লোনা!

আয়ান রাগে ঘৃনায় তাকালো, কারো দিকে। কিন্তু কিছু বললোনা।

শুধু আফসোস জানালো ইশারায়।

অতঃপর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে উঠে গেল। রসিবকে দেখার উদ্দেশ্য। সাথে ওর দুইটা বন্ধু গেল শাহিন, নিবিড়।

আবির সাহেব কিছু একটা ভেবে আয়ানের জন্মদিনের আয়োজন নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। যা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। পরে হয়তো অনেক সময় চলে যাবে কাজের কিছুই হবেনা।

রুমে বসে বসে আয়ান ভাইয়ার কথাগুলো ভাবছি। হঠাৎ হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে। ঠিক গিরগিটির মতো।

আমার ভাবনায় আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে -পুড়িয়ে ছাই করে দিলো মিস. হাফ প্যান্ট মিরা।

দেখলেই গা জ্বালা করে। ইচ্ছা করে ঘোড়ার লেজের মতো চুলগুলোকে কেটে দিতে পারি। তাহলে আর আমার আয়ান ভাইয়ার কাছে ঘেষে থাকবেনা।

আমার আয়ান ভাইয়া! কথাটা মনে পড়তেই নিজে নিজেই লজ্জা পেলাম। সে আমার কিভাবে হয়। সে তো এই মিস. ঘোড়ার লেজেরই।

ঘোড়ার লেজ! নামটা বড়ই অদ্ভুত। মানুষের নাম এটা হয়!

ভেবেই নিজে নিজে হেসে দিলাম।

মিরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর রাগে কটমট করছে। মনে হচ্ছে গিলে ফেলবে আমায়।

গিলে ফেলতেও পারে। আস্ত একটা রাক্ষসী। আয়ান ভাইয়াকেই নিয়ে গেল। হুহ।

তাতে আমার কি!

আয়ান যে এমন একটা কান্ড করতে পারে। তা বুঝতেই পারছিল আবির সাহেব।

আয়ানের ফুফু ভয়ে ঢোক গিললেন। কোনো বিপদ আসবেনা তো আবার!

আয়ান ও ওর বন্ধুরা রসিবের বিছানার পাশে বসে আছে। রসিবের মাথার কাছে আয়ান।

রসিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

রসিব ঘুম থেকে জেগে উঠে আয়ানকে দেখে খুশিতে দিশেহারা হয়ে পড়লো।

আয়ানের সাথে ওর ফিরে যাওয়া অনেক কথা বললো। আয়ান বিদেশে যাবার পর থেকে রসিব আয়ানকে কতোটা মিস করছে সেই কথাগুলো।

কথার শেষে আয়ান রসিবকে প্রশ্ন করলো। ওর পা ভেঙে গেলো কিভাবে।

আয়ানের এমন প্রশ্নের জন্য রসিব তৈরি ছিলনা। কিন্তু আয়ানের রাগ ও জেদের কাছে হার মেনে রসিবকে সত্যি কথাটাই বলতে হলো।

রসিবের বলা কথাগুলো শুনে আয়ানের ঘোর কাটছেনা। হাত-পা কাঁপা শুরু করলো।


পার্টঃ ০৬

রসিবের বলা কথাগুলো শুনে আয়ানের ঘোর কাটছেনা। হাত-পা কাঁপা শুরু করলো।

শেষ পর্যন্ত ওর বাবা এতটা নিচে নেমে গেলো! কিভাবে পারলো এটা করতে! তাছাড়া রসিবতো তার একটামাত্রই ভাগ্নে। রসিবহীন ফুফুর রক্ত চলাচলই বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তাহলে জেনেশুনে বাবা কিভাবে এটা করতে পারলো!

তাছাড়াও বাবা কিভাবে পারলো আমাদের সবাইকে ঠকাতে! কিভাবে পারলো আম্মুকে ঠকাতে!

ভেবেই আয়ানের রাগে-কষ্টে চোখ দিয়ে নোনা জল বের হবার অবস্থা।

তবুও নিজেকে সামলে রসিবকে কোলে নিয়ে ওর গন্তব্যে বের হলো।

আয়ানের বন্ধুরা ভুত দেখার মতো আছে। ভয়ে কিছু বলছেনা। কি হতে পারে সামনে ভেবেই সবার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে।

মিরাঃ খুব খুশি লাগছে তাইনা! (রেগে)

আমিঃ কিছুই বুঝতে পারলাম না। খুশি লাগবে কেন হঠাৎ!

এই ডাইনির মনে হয় নিশ্চয় মাথা খারাপ হইছে।

মিরাঃ কি কথা বলছিস না কেন! (রেগে)

শোন! আশ্রিতা আছো আশ্রিতার মতো থাকিস। একদম বাড়ির মালিকের দিকে চোখ দিবিনা।

তাছাড়াও এভাবে অন্যের বাড়িতে পরে থাকার কোনো মানেই হয়না।

কত টাকা লাগবে তোর! আমি দিচ্ছি, কিন্তু দয়া করে এ বাড়ি থেকে চলে যা।

আর আমার আয়ানের পিছুপিছু ঘুরবিনা।

যদি আমার কথা না শুনছো, তাহলে আমার থেকে খারাপও কেউ হবেনা। (রেগে)

ডাইনিটা কথাগুলো বলেই চলে গেলো।

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। টাকার জন্য আমি এ বাড়িতে পরে আছি!

সত্যিই তো আয়ান ভাইয়ার জন্যই তো ছিলাম।

কিন্তু আয়ান ভাইয়াকে ছেড়ে আমি চলে যাবো!

আমার তো অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু ভাইয়ার! তার তো মিরাই আছে। (ভাবনার মাঝে আবারও ডাইনির আগমন)

মিরাঃ একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।

আমি তোকে এতক্ষন যে কথাগুলো বললাম। কেউ যদি একটুও জানতে পারছে তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবেনা বলে দিলাম।

তোর রুমে যে আমি আসছি, তাও জেনো কেউ বুঝতে বা জানতে না পারে।

আগে না হয় কোনো একটা কারনের জন্য এত অবহেলা পেয়েও ছিলাম। কিন্তু এখন আর এ বাড়িতে থাকার ইচ্ছা বা আশারা কোনোটিই নাই।

আবির সাহেব একরকম দৌড়ে দৌড়ে রসিবদের বাড়িতে গেলেন। কিন্তু তিনি যে ভয়টা পেয়েছিলেন ঠিক সেটাই হলো। আয়ান সবকিছু জেনে গেছে! রসিবকেই বা কোথায় নিয়ে যাবে!

ভয়ে আবির সাহেবের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

রসিবয়ের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস নিলো আয়ান। এখন বাকি কাজ গুলো ঠিকঠাক সমাধান করতে পারলেই শান্তি।

বাড়িতে আসার পরে আবির সাহেবেকে না দেখে আয়ানের মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। রাগে কটমট করতে করতে ফুফুর উদ্দেশ্য গেল।

আয়ানের ফুফু চিন্তিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। চোখেমুখে ভয় বিস্ময় নিয়ে আছেন। কিন্তু আয়ানের কথায় তিনিও স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। তার রসিব ঠিক আছে! ভেবেই আয়ানকে জরিয়ে কান্না শুরু করলো।

আয়ান কোনোরকম শান্ত করে চলে আসলো।

আয়ানঃ আম্মু ( শর্মিলা কে উদ্দেশ্য করে) তোমার সাথে খুব জরুরি কথা আছে।

শর্মিলাঃ এখন কোনো কথা শুনতে পারবোনা। অনেক কাজ পরে আছে তোর জন্মদিনের জন্য।

আয়ানঃ আম্মু কথাটা শুনো আগে। কাজ পরেও করা যাবে, কিন্তু কথাটি না শুনলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

শর্মিলাঃ বললামতো কোনো কথাই শুনছিনা।

এরই মধ্যে আবির সাহেব চলে আসলেন।

আবির সাহেবঃ এখন কোনো কথা হবেনা। কি বলো শর্মিলা?

শর্মিলাঃ হুম। ( মুখে হাসি লেগেই আছে)

আয়ান বিস্মিত হয়ে আছে। এত আয়োজন কিসের! জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্য মানুষ এতটা ব্যস্ত থাকে!

পরমুহূর্তেই আয়ানের ভয় লাগলো। ও যা ভাবছে তাইই করছেনা তো!

যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাকেও।

রুমে এসে আয়ান পায়চারি করছে। কিভাবে কি করা যায়। আয়ানের বন্ধুরা দুগালে হাত দিয়ে আয়ানকে দেখছে।

অনেক্ষন ভাবনার পরে আয়ান ও ওর বন্ধুরা পরিকল্পনা করে।

শর্মিলা আন্টি অনেক্ষন আগে খাবার দিয়ে গেছেন।

এক কর্নারে রেখে বসে বসে ভাবছি কি করা যায়। কিভাবে যাওয়া যায় এই নরক থেকে।

শর্মিলা আন্টি কি বলে গেলেন! আয়ান ভাইয়ার বিয়ে দিচ্ছে!

তার বিয়ে হবে, আর আমি দেখবো! তার থেকে আগেই চলে যাবো এ বাড়ি থেকে।

হাটুঁতে মাথা গুজে কান্না করছি। আয়ান ভাইয়ার বিয়ে দেখার আগে চলে যাওয়াই ভালো। অজানা গন্তব্যে অথবা বাবা-মায়ের কাছে।

রাত ২টা প্রায়…

বাড়ির সবাই প্রায় ঘুমিয়ে গেছে।

আমার ঘুম আসছেনা আসবেই বা কিভাবে ঘুমাইনি। অনেক চেষ্টা করছি এই বাড়ি থেকে পালাবার। কিন্তু সফল হচ্ছিনা।

এখন! বাড়ির মেইন দড়জায়ই তালা লাগানো।

তাই আফসোস ও কষ্ট নিয়ে আবার স্টোর রুমে আসছি। এখন পর্যন্ত কিছু খাইনি।

কোনো শক্তি পাচ্ছিনা, শরীর দুর্বল লাগছে। তাই বিছানায় এলিয়ে দেয়া মাত্রই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলাম।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকানোর পরে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গেলাম।

আমি কি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছি! নাকি রুপকথার রাজ্যে আসছি।


পার্টঃ ০৭

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকানোর পরে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গেলাম।

আমি কি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছি! নাকি সত্যিই অন্য কোনো রুপকথার রাজ্যে চলে আসছি।

আয়ান ভাইয়া! আমার পাশে বসে দুগালে হাত দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর ঠোটে সেই দুষ্ট হাসিটা রয়ে গেছে। যা যে কাউকে মুহুর্তের মধ্যেই ঘায়েল করে দিতে পারে।

আমি ভূত দেখার মতো তাকিয়ে রইলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করবো! নাকি সামনের এই মানুষটিকে!

তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখি রুমটাও অপরিচিত লাগছে।

এবার সত্যি সত্যিই বলতে পারি আমি কোনো রুপকথার রাজ্যে আছি।

আমিতো ছিলাম স্টোর রুমে। আর এখন একটা রাজকক্ষে। তাও রাজপুত্র কাছে বসে আছে।

এটা কল্পনা বা স্বপ্ন ছাড়া কিছুই হবেনা।

তবুও নিজেকে নিজে শান্তনা দেয়ার জন্য রাজপুত্রকে একটু ছুতে ইচ্ছা হলো। সত্যি নাকি মিথ্যা দেখার জন্য।

আমার ভাবনায় আগুন ধরিয়ে ছাই করে দিল আয়ান ভাইয়া।

আয়ানঃ সারাক্ষন জেগে জেগে স্বপ্ন না দেখে কাজের কাজ কর।

আয়ান ভাইয়ার হঠাৎভাবে এমন ধমকানো কথায় আমি লাফিয়ে উঠি।

আয়ান ভাইয়া খিলখিল করে হেসে দেয়।

আমি ভয় পাইছি কিন্তু সে মজা নিচ্ছে। মেজাজই গেল খারাপ হয়ে। রাগ দেখিয়ে উঠতে যাবো। কিন্তু তা আর হলো না। কপাল আমার সাথে না। কারন আমি যখনই রাগ দেখিয়ে উঠতে যাবো তখনই আয়ান ভাইয়া হেঁচকা টান দিয়ে আমাকে তার সাথে মিশিয়ে নিল।

তার এমন আচরনে আমি বাস্তবে নেই নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু আয়ান ভাইয়ার হার্টবিট তো অনুভব করতে পারছি। তাহলে এটা স্বপ্ন কিভাবে হয়।

আয়ান ভাইয়া এবার আমার ভাবনায় পানি ঢেলে দিল।

সারাক্ষন এভাবে যদি স্বপ্ন দেখতে থাকো, তাহলে সামনে মানুষটিও ভয় পায়। কই আমি কি তোমার মত লাফ দিয়েছি! (বলেই মুখটা বাচ্চাদের মত করে রাখলো)
তার এমন কান্ড দেখে আমার খুব হাসি পায়, কিন্তু অবাক না হয়ে পারছিনা।

তুমি! সে আমাকে তুমি বললো!

আয়ানঃ সারাক্ষন এত কি ভাবো! এত ভাবাভাবির দরকার নাই। সময় আরও পরে আছে। তার জন্যও একটূ ভাবনা রেখো। ভাবনার আম্মু(বলেই চোখ টিপ মারলো)
এই ভাবনা টা কে! আমিই বা আম্মু হবো কেন! (অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি)

তিনি কিছু না বলে আমাকে তৈরি হতে বললো। আমি তৈরি হয়ে কি করবো! না কোনো বিয়ে খেতে যাচ্ছে, না নিজে বিয়ে করছি। এত রাতে কেউ তৈরিই বা হবে কেন!
কিন্তু আয়ান ভাইয়া এবার আমার মাথায়ই পানি ঢেলে দেয়।

এতরাতে পানি দিলে কেমন অনুভূতি, যার উপরে পড়ে সে বুঝে।

আমি করুনভাবে তাকিয়ে আছি তার দিকে।

আয়ানঃ পানি দেয়ার জন্য সরি ভাবনার আম্মু। সারাক্ষণ এত ভাবতে হবেনা। কিছুদিন পরে ভাবনাই সামনে চলে আসবে তখন ভেবো।

হাতে বেশি সময় নেই তারাতারি তৈরি হয়ে নাও।

এই ভাবনা টা কে! আর আমিই ভাবনার আম্মু কেন হব! আমার মেয়ের নাম হবে আদিবা মাহমুদ মিশমি(কথার তালে তালে বলেই ফেললাম)। কিন্তু পরক্ষণেই মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরলাম।

আয়ান ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।

কিন্তু আমার কান্ড দেখে হোহো করে হেসে দিল। আর বললো,

তো এতদুর চলছে(বলেই চোখটিপ দিল)

তার কথায় আমি কিছুটা লজ্জা পেলাম। যা ছিল মনে ছিল এমন পাজি ছেলের সামনে বলা উচিত হয়নি। কেন যে বললাম। কিন্তু না বলেই বা উপায় কি! আমার তো কোনো দোষ নাই। তার নামের কারনেই তো আমি বলতে বাধ্য হইছি।

ভাবনার আম্মু! নামটা খারাপ না, কিন্তু আমিই আম্মু হতে যাবো কেন!

আরও অনেককিছুই হবে, শুধু সময় লাগবে। ভাবনার আম্মু হবে, আদিবার আম্মু হবে, আদিলের আম্মু হবে। আরও কতো কি! শুধু সময় লাগবে ভাবনার আম্মু। সারাক্ষণ এত ভাবতে হবেনা। তারাতারি তৈরি হয়ে নাও। মিটমিট করে হেসে তিনি চলে গেলেন।

সাথে সাথে মিন্নি আপু আসলো।

তিনি আমাকে কোনোভাবে তৈরি করে নিচে নিয়ে গেলেন। কি হচ্ছে আগামাথা কিছুই বুঝছিনা।

শুধু যে যেভাবে চালাচ্ছে আমিও চলছি। কিছু বললেই তো রাগ দেখাবে। এই আয়ান মিন্নিকন্ডার ভয়ংকর রাগ তো দেখছি। তাই আমি কিছু বলিনি। ভাবছি যা বলবে তাই করবো।
কিন্তু একি! কি হচ্ছে এখানে! খুশি হব! নাকি জমানো অভিমান গুলো চোখের পানি দিয়ে মুছে ফেলবো বুঝতে পারছিনা।

একটা মধ্যবয়সী লোক পাঞ্জাবি পড়া, মাথায় টুপি, চুলগুলো হালকা মেহেন্দী দিয়ে কালার করা। সামনে কাগজপত্র।

কি হচ্ছে এখানে!

তার মধ্যে আয়ান ভাইয়া একটা পাঞ্জাবি পড়া আছে। অ্যাশ কালারের। একবার তাকালে আর চোখ ফেরাতে ইচ্ছা করেনা। কিন্তু আমি তাকানো মাত্রই আয়ান ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপ দিলো।

আজকে নির্ঘাত তার চোখের সমস্যা হইছে। কথায় কথায় চোখ টিপ দিচ্ছে।

কিন্তু এখানে কি হচ্ছে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে নেই। তারপরে তার ট্রিটমেন্ট করা যাবে।

আমাকে আয়ান ভাইয়ার পাশে বসানো হল। আমি বসা মাত্রই ওই লোকটা কি পড়ানো শুরু করলো।

বিয়ে! হ্যা ঠিক ভাবছি। আমি আয়ান ভাইয়ার দিকে তাকালাম। সে একটা মায়াবী হাসি উপহার দিল। আর ইশারায় বুঝালো। ওই লোকটার কথায় যেন সম্মতি দেই। আমিও মাথা নাড়িয়ে হ্যা সূচক জবাব দিলাম।

আবারো ছেলে-মেয়েদের নামের মতো অবস্থা হল। সবকিছু বলার পরে মনে পড়ছে আমি কি করছি!

বিয়ে সম্পন্ন হলো। তখন বুঝতে পারছি আয়ান ভাইয়া কি বলছিল তখন। বিয়েতে সম্মতি দিতে! আর আমিও তার মায়াবী হাসির প্রেমে পরে হ্যা বলে দিলাম।

কিন্তু এতরাতে কাজী আনলো কিভাবে! নিশ্চয় গুন্ডাদের মত ভয় দেখিয়ে আনছে।

আমি প্রশ্নটি যখন ছুড়ে দিব তখন মিন্নি আপু বলে উঠলো।

মিন্নিঃ ভাবী! (বলেই হেসে দিল)

আমি তার দিকে তাকিয়ে লজ্জামাখা হাসি দিলাম। ভাবী! বিয়ে হইছে আমার!

মিন্নিঃ উফফ তুমি সারাক্ষণকি ভাবনার জগতে থাকো! এত কি ভাবছো সারাক্ষণ!

আমি তোমার বরের গুডফ্রেন্ড। আমাকে বলতেই পারো।

আসলে ওই কাকাক। (কথার মাঝেই)

আয়ানঃ এত কাকা করতে হবেনা। ময়নাপাখি (বলেই খিলখিল করে হেসে দিল। সাথে তার বন্ধুরাও হেসে দিল)

আজকে নিশ্চিত এই মানুষটার মাথায় কোনো গন্ডগোল হইছে। শুধু আবোলতাবোল বলেই যাচ্ছে। তাদের হাসাহাসি দেখে আমি মুখ গোমড়া করে আছি। বদমাশ ছেলে, শুধু পাগলদের মতো ব্যবহার করে। হুহ।

আয়ানঃ আচ্ছা এত অভিমান করতে হবেনা সরি।

ওই বুড়ো আংকেলকে বাসা থেকে নিয়ে আসছি।

রসিবের বন্ধুর বাবা হয়। রসিবকে অনেক ভালো জানে। তাই রসিব সবকিছু খুলে বলা মাত্রই চলে আসছে।

এখন আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইনা। বাড়িতে যেতে হবে। বিপদ হতে বেশি সময় লাগেনা। তাই আগে থেকেই সাবধান হওয়া ভালো।

কিন্তু আমিতো ঘুমিয়েছিলাম। তাহলে এখানে আসছি কিভাবে?

আয়ানঃ তা জানার জন্য সময় আছে। এখন আপাতত ভাবতে থাকো। তোমার ভাবনাকে নিয়ে।

আমিঃ হুহ।

দাড়োয়ান কাকা! সে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য!

এতক্ষনে বুঝলাম। দাড়োয়ান কাকার সাহায্য নিয়ে সদর দড়জা দিয়ে বের হইছে। শুধু শুধু হিরোগিরি করার মানে হয়না। এভাবে সাহায্য পেলে আমিও বের হতে পারতাম।

আয়ানঃ অনেক চেষ্টা করছো পারলেনা তো। (মুখ গোমড়া করে)

আমায় ছেড়ে পালানোর বুদ্ধি ঘুরে সবসময় মাথায় তাইনা! (একটু রাগ ও অভিমান মিশ্রিত)

আমি জবাবে কিছুই বললাম না। সত্যিই তো তাকে ছেড়ে পালানোর বুদ্ধিই তো।

বাড়িতে পা রাখার সাথে সাথে লাইট জ্বলে উঠলো।


পার্টঃ০৮

বাড়িতে পা রাখার সাথে সাথে লাইট জ্বলে উঠলো।

ফুফু! সে এখনও বসে আছে! এতরাত হইছে এখনও ঘুমায়নি!

আমি অনুশোচনায় ভুগছি, সবাইকে না জানিয়ে এভাবে বিয়ে করা কি ঠিক হলো আয়ান ভাইয়ার! তারমধ্যে ফুফু এখনও জেগে আছে। হঠাৎ এভাবে লাইট জ্বলে উঠলে যে কেউ ভয় পাবে। আর আমরা যে কাজ করে আসছি। তাতে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক।

এখন ফুফুর মনে অনেক প্রশ্ন জাগতেই পারে, এত রাতে আমায় বা আমাদের নিয়ে কোথায় গেছিল। তাও আবার আমি শাড়ি পড়া আয়ান ভাইয়া পাঞ্জাবি পড়া। বউ ও কনে সাজে আছি।

বাহ! কি সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে!

মধ্যরাতে লুকিয়ে বিয়ে করে আবার বাসায়ও ফিরে আসছি!

তারজন্য যে কেউই কথা শুনাতে পারে। কিন্তু আয়ান ভাইয়া হঠাৎ এমন করবে কেন! তারজন্য তো মিরা আছে। কি হচ্ছে কিছুই বুঝিনা আমি। সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এবারও আমার ভাবনায় পানি ঢেলে ফুফু বরনডালা নিয়ে সামনে এগোলো।

নতুন বিবাহিত দম্পতিকে বরন করে ঘরে উঠালো। ফুফুকে সালাম করলাম, ঠিক যেমন নতুন বউ করে। আমিও তো নতুন বউ আজকে বিয়ে হইছে। কিন্তু সবাই মেনে নিবে তো আমাদের!

ফুফুঃ সারাজীবন দুজন-দুজনের পাশে থাকবি। কোনো বাঁধা যেন দুজনকে আলাদা করতে না পারে।

আর শোন! এখন যে যার রুমে যা তারাতারি। একটু পরেই আযান দিবে।

তাই কেউ যেন কিছুনা বুঝতে পারে। তাহলে অনেক সমস্যা হতে পারে। তোরা তো কেউ অবুঝ না। কি যে যাচ্ছে এই পরিবারের উপর দিয়ে, কিছুই বুঝতে পারিনা।

আয়ানঃ হুম।

আমি কিছু বললাম না। ফুফুর কথামতো স্টোর রুমে আসছি।

আমিতো পালাতে চেয়েছিলাম কিন্তু হঠাৎ এমনকিছু হবে ভাবতেই কেমন একটা অনুভুতি লাগে।

আশ্রিতা থেকে শশুড় বাড়ি! হুহ!

একটু পরর আযান দিল। নামাজ আদায় করেই শুইলাম। কিন্তু ঘুম আসবে তো!

কোনো ঘুমের চিহ্নমাত্র নাই। শুধু আজকের দিনে ফেলে আসা সময়গুলো ভাবছি।

আয়ান ভাইয়ার পাগলামোগুলো।

কখন ঘুমিয়ে গেলাম নিজেই জানিনা। হঠাৎ কারো ডাকে ঘুম ভাঙলো। শর্মিলা আন্টি! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ১০ টা বাজে। এত বেলা পর্যন্ত আমি ঘুমাইছি! নিশ্চয় শর্মিলা আন্টি এখন বকাঝকা করবে। আমি তার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ঢোক গিললাম। এমনভাবে তাকিয়ে আছে, মনে হয় আমাদের বিয়ের কথাটা জানতে পেরেছে।
কিন্তু শর্মিলা আন্টি আমাকে ভুল প্রমান করলেন। তিনি এসে আমার কপালে হাত দিয়ে দেখলেন। জ্বর আছে কিনা। তারপর মাথাটা বুকে নিয়ে বললেন।

শর্মিলা আন্টিঃ শরীর খারাপ লাগছে!

তুই তো এত বেলা পর্যন্ত ঘুমাস না।

আমিঃ (তার এত ভালো ব্যবহার দেখে আমি শকড। সত্যি দেখছি! নাকি ঘুমের মধ্যে দেখছি। তিনি আবারও বললেন)

শর্মিলা আন্টিঃ কিরে কি ভাবছিস!

দেখ মা! আমি তোর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করি। পারলে ক্ষমা করে দিস আমায়। হয়তো আমার পাপের শাস্তি আমি পেয়েছি(কথাটা বলা মাত্রি আন্টির চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো)

আন্টি কান্না করছে! কিসের শাস্তি পাইছে! কি কষ্ট তার!

আমি আন্টির বুক থেকে মাথাটা তুলে তার দিকে তাকালাম ভালোভাবে।

একি‌! আন্টি তো সত্যি সত্যিই কান্না করছে।

আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আন্টি আমার কথার কোনো সারাশব্দ দিলনা। আপনমনে কান্না করে যাচ্ছে।

আন্টির কষ্ট! আন্টিকে তো কখনোই কান্না করতে দেখিনি। তাহলে এখন কি হইছে এমন।

পরক্ষনেই আন্টি হাসলো। আশ্চর্য! আন্টিকেও নিশ্চয় তার ছেলের মতো কোনো জিনে ধরছে। তার ছেলে তো কেমন বজ্জাতের মত কান্ড করছে।

আর আন্টি হঠাৎ কান্না করছে, আবার হাসছে।

কি হচ্ছে! কিছুই বুঝিনা।

এবার আন্টির কথাশুনে আমারই কান্না পাচ্ছে। আমি শকড। ভয়ে ঢোক গিলছি বারবার। এখন নিশ্চয় আমাকে অনেক বকবেন আন্টি।

কিন্তু তিনি আমাকে আবারও ভুল প্রমাণিত করলেন।

তিনি একটা বক্স বের করে আমার সামনে ধরলেন।

আমি প্রশ্নসূচক ভাবে তার দিকে তাকালাম। তিনি আমাকে কোনো পড়োয়া না করে, বক্সটি খুললেন।

আমার একটা মাত্র ছেলের বউ। ভালোভাবে তো বরন করতে পারলাম না। আপাতত এটুকু দিয়ে চালিয়ে দেই। রাগ করিস না মা।

আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। আন্টি কিভাবে জানলো! তাছাড়া বিন্দুমাত্র রাগ নেই তার মধ্যে। না আছে কোনো অহংকার।

তিনি আবারও আমাকে কিছু না বলতে দিয়ে। আমার গলায় একটা স্বর্নের লকেট পড়িয়ে দিলেন, নাকে নাকফুল।

আমি হতভম্ব হয়ে আছি। আন্টি এসব কি করছে!

শর্মিলা আন্টিঃ বিয়ে হলে মেয়েদের একটু-আধটু স্বর্ন ব্যবহার করতে হয়।

কিন্তু আমাদের কি ভাগ্য(বলেই মন খারাপ করলেন। চোখে পানি টলমল করছে)

আমার একমাত্র ছেলের বউ তুই। আমারতো কোনো মেয়ে নেই। আমার ছেলের বউই আমার মেয়ে হয়ে থাকবে।

কিন্তু আমার কি কপাল। (মন খারাপ করে)

ভালোভাবে কিছুই করতে পারলাম না। এমনকি কখনো তোর জন্য কিছু করতে পারি কিনা জানিনা।

আর আমি যে এগুলো পড়িয়ে দিলাম, খুলে রাখিস। কেউ যেন দেখতে না পায়৷ তাহলে অনেক জবাবদিহি দিতে হবে।

আন্টির কথাই তো শেষ কথা হতো বাড়িতে৷ তাহলে আন্টি এতটা নরম হয়ে গেছেন। এখন কার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে কিন্তু আন্টিকে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো উত্তর দেয় না।

আন্টি আবারও আমাকে জরিয়ে ধরলেন। আর বললেন।

কখনো যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমার ছেলেটাকে দেখে রাখিস।

তার কথাটা শুনে আমার কলিজায় মোচড় দিল। আন্টির কিছু হবে! কি হবে!

আমি আন্টির বুকে মাথা দিয়ে আছি।

মায়ের আদর! কতোবছর আগে পাইছি। কিন্তু আজকে আবারও মায়ের আদর পাচ্ছি। সময়টা এখানেই থেমে থাকতে পারতো।

কিন্তু সময় তো থেমে থাকার নয়। স্রোতের মতোই গতিশীল।

হঠাৎ মনে হলো আরও দুইটা জোড়ালো হাত আমাকে জরিয়ে আছে।

মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি, ঠিকই ভাবছি।

আয়ান ভাইয়া! আমায় ও আন্টিকে জরিয়ে ধরে আছেন।

আমি তারাতারি নিজেকে ছাড়ালাম।

আন্টি মুচকি হেসে চলে গেলেন।

আমার অনেক রাগ হলো, এই বজ্জাতটি না আসলে হয়তো আন্টি এখন যেত না। ভালোই তো ছিলাম তার কাছে, মায়ের আদর পাচ্ছিলাম। কিন্তু সব গোলমেলে করে দিলো।
আন্টি যাওয়া মাত্রই আয়ান ভাইয়া দড়জা লাগিয়ে দিল।

আমি ভয়ে ঢোক গিললাম। এমনিতেই রাগ উঠছিল এখন ভয়। পুরাই বেহাল অবস্থা আমার।

করুন চোখে তাকিয়ে বললাম।

আয়ান ভাইয়া! দড়জা বন্ধ করলেন কেন!

একি! আমি কি এমন কথা বলছি! যার জন্য আয়ান ভাইয়া। আমার থেকেও করুন অবস্থায় তাকিয়ে আছে।

তার এমন বোকাবোকা চাহনি দেখে আমার বেশ ভালোই লাগছে। পুরা হাবাগোবার মতো। ভাজা মাছও উল্টিয়ে খেতে জানেনা এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন।


পার্টঃ ০৯

এমন বোকাবোকা চাহনি দেখলে যে কেউ হেসে দিবে। আমি কোনোভাবে নিজেকে ঠিক রাখছি, কিন্তু তাও বেশিক্ষনের জন্য নয়। অবশেষে হেসেই দিলাম। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এবার রেগেই গেলেন। আমি কি করছি এমন! একবার হাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে তো আরেকবার রেগে মিন্নিকন্ডার মতো হবে।

আয়ানঃ এই মেয়ে! আমাকে দেখে কি জোকার মনে হয় তোমার?

আমিঃ একদমই না। পুরা বিড়ালের বাচ্চা। (দাঁতে দাঁত চেপে)

আয়ানঃ (চোখ বড়বড় করে) কিইইইইইইইইই

আমিঃ পরক্ষনেই মনে পরলো আমি কি বলছি। তারাতারি মুখে হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করলাম। যেন অন্যকোনো কথা না বের হয়।

আল্লাহ আমি এমন কেন! যা মনে আসে তাই বলে দেই। (ন্যাকা কান্না)

আবারও ভাবতে ভাবতে কখন মুখ থেকে হাত সরিয়েছি বুঝতেই পারিনি। তাই যা মনে মনে বলছি ওই বজ্জাতটা শুনতে পেল।

আয়ানঃ একদম চুপ (দাঁতে দাঁত চেপে) এমনিতেই সকাল সকাল মন মেজাজ দুটোই খারাপ করে দিলা। এখন আবার এভাবে পাগলের মতো বাজে বকছো?

আমিঃ অবুঝ বাচ্চার মতো তাকিয়ে আছি। কিছুই বুঝছিনা।

আমি আবার কখন মেজাজ খারাপ করছি।

এক মিনিট, এক মিনিট। পাগল কে! এই বেটা আমারে পাগল বলছে! (মনে মনে রেগে)

আয়ানঃ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।

এই! এসব কি ভাষা ব্যবহার করছো!

বেটা কি?

আমিঃ পাগল কি?

আয়ানঃ এমনিতেই ভাইয়া ডেকে আমার মুডের ১২টা বাজাইছো।

এখন আবার মুখে মুখে তর্ক করছো? (রেগে)

আমিঃ ভাইয়া বলছি তো কি এমন দোষ করছি!

আপনিতো ভাইয়াই। হুহ!

আয়ানঃ কি বললে?(দাঁতে দাঁত চেপে)

আমিঃ কানে কম শুনেন নাকি!

আপনিও তো আমার মুডের ১৩টা বাজাইছেন। কত ভালোভাবে আন্টির আদর খাচ্ছিলাম। দিলেন তো ১৩টা বাঁজিয়ে।

আয়ানঃ কিইইইই। (চোখ বড়বড় করে)

আমারে কি তোমার চোখে পরেনা! (দাঁতে দাঁত চেপে)

আমিঃ আপনারে কেন চোখে পরবেনা। পুরাই জিরাফের মতো। লম্বাচওড়া। যে কারোই চোখে পরবে(ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে)

আয়ানঃ এইইই মেয়ে একটু কম কথা বলে থাকতে পারোনা। সারাক্ষন পাগলের মতো আবোলতাবোল বলেই যাচ্ছো।

আমায় জিরাফ বললে! (রেগে) এখন দেখবা এই জিরাফ কি কি করতে পারে(দাঁতে দাঁত চেপে)। সামনের দিকে যেতে যেতে কথাগুলো বললো আয়ান।

আমিঃ (ভয় পেয়ে ঢোক গিললাম) আয়ান ভাইয়া! আর এমন হবেনা, এই যে মুখ বন্ধ করছি(মুখে হাত দিয়ে)। আর আবোলতাবোল কথা বলবোনা, প্রমিজ।

আয়ানঃ কি বললে! (রেগে)

ভাইয়া! আমি তোমার ভাইয়া হই?

আমিঃ হুহ। আয়ান ভাইয়া। (ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে)

আয়ানঃ আজকে কত কষ্ট করে বিয়া করলাম। ভাইয়া ডাক শোনার জন্য(দাঁতে দাঁত চেপে)!

আমিঃ ও মনে ছিলনা (ইনোসেন্ট)। কিন্তু বিয়ে করছি তাতে কি হইছে। আয়ান ভাইয়াই তো আপনি। অন্যকিছু তো মনে আসছে আপাতত।

আয়ানঃ নিজের মাথায় হাত দিয়ে। আল্লাহ কি এমন দোষ করছি। যার জন্য একটা বোকা বউ দিলা। (করুন ভাবে)

আমিঃ বউ! এতক্ষনে সত্যি সত্যিই মনে পরলো। ইনি আমার জামাই।

তার সাথে তর্কাতর্কি করতে করতে ভুলেই গেছিলাম আমাদের যে বিয়া হইছে।

কিন্তু যা হইছে হইছে। তার জন্য যে আগের মতো ডাকতে পারবোনা। এমন তো কোনো কথা নাই। হুহ!

আয়ানঃ খুব শখ তাইনা! ভাইয়া ডাকার(দাঁতে দাঁত চেপে)

দেখাচ্ছি বিয়ের পরে ভাইয়া ডাকার কোনো কথা আছে কিনা। বলেই…

এরপর থেকে কখনো ভাইয়া ডাকতে আসলে সবকিছু মনে পরে যাবে তোতাপাখি। (লুচুমার্কা হাসি দিয়ে)

আমিঃ লাল ইদুর, কালা ইদুর, টিকটিকি, কুমির, সাপ, মিন্নিকন্ডা। জীবনে বউয়ের মুখ দেখতে পারবিনা। কারন তোর বিয়াই হবেনা। (ন্যাকা কান্না করে)

আয়ানঃ হোহো করে হেসে দিলো।

আমার তো আর বিয়ার দরকার নাই ভাবনার আম্মু।

এত তারাতারি ভুলে গেলে আমি তোমার স্বামী (চোখ টিপ দিয়ে)। আজকে মধ্যরাতেই তো আমরা বিয়ে করলাম।

তাইলে বউয়ের মুখ দেখতে পারবোনা কেন!

আমিতো বউয়ের মুখ দেখছি, তারপরে।

আমিঃ( বজ্জাতটার ঠোঁটে হাত দিয়ে কথাগুলো বলতে দিলাম না)

চুপ কর শালা। (রেগে)

আয়ানঃ চোখ বড়বড় করে।

কিইই শালা কি!

আমিঃ তারাতারি হাত সরিয়ে ভয়ে ঢোক গিললাম।

আবার কি বলতে কি বলে ফেলি ঠিক নাই। তারপরে যদি আবার।

তারথেকে পালানোই ভালো।

উফফ! এই বেটা বজ্জাতের প্রেমেই আমি কেন পড়লাম! তাহলে হয়তো তার কথায় বিয়েতে রাজি হইতাম না।

আল্লাহ দড়ি ফালাও, এই বজ্জাতরে উঠিয়ে দেই।

আয়ানঃ কিইইইইই বললে!

আমিঃ …….

কিছু না। (করুনভাবে তাকিয়ে)

ফ্লাশব্যাক…..

গতকালকে রসিবের কাছে যখন আয়ান জানতে চায়। মাঝরাস্তায় ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলো কে! ও কাউকে দেখছে বা সন্দেহ করে নাকি!
তখন রসিব প্রথমে না বলতে চাইলেও আয়ানের কারনে বলতে বাধ্য হইছে।

ওই ব্যাক্তিকে রসিব না দেখলেও, আয়ানকে যা বললো মুহুর্তের মধ্যেই আয়ান কেঁপে উঠলো। ভয়ের জন্য না। মায়ের মুখের হাসিটা হয়তো দেখতে পারবেনা আর।
আবির সাহেব! ও আয়ানের খালা রাহিমা (মিরার মা) তাদেরকে একসাথে দেখছেন! ।

শর্মিলা বেগমের প্রেশার খানিকটা বেড়ে গেছিল। আবির সাহেবকে কয়েকবার বলছে হাসপাতালে তার সাথে যেতে কিন্তু আবির সাহেবের নাকি কোন কাজ আছে তাই তিনি যেতে পারবেননা।

যখন শর্মিলা বেগম তার বোন রাহিমাকে বললো তিনিও বললেন, তার নাকি ভীষণ মাথা ব্যাথা করে তাই তিনিও যেতে পারবেননা।

শর্মিলা বেগম তাই তার ননদ (রসিবের মা) তাকে নিয়ে গেলেন।

কলেজ থেকে ফিরে রসিব যখন বাসায় ওর মাকে দেখতে পেলোনা তখন ভাবছিল আয়ানদের বাসায় আসছে।

তাই রসিবও আয়ানদের বাসায় আসলো। দড়জায় কয়েকবার ঠোকা দেয়ার পরে বাসায় কাজের লোক দড়জা খুলে দিলো।

রসিব ওর মাকে খুজছে, কিন্তু নিচের রুমে কাউকে না দেখে সিড়ির দিকে পা ফেললো।

উপরে যাওয়ার পরেই ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা।

আবির সাহেব! তিনি শর্মিলা মামির বোনকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে যেয়ে পিছন থেকে গলায় কিছু পরিয়ে দিচ্ছেন!

রসিব নিজেকে সামলে তারাতারি চলে আসবে, কিন্তু তখনই ওর হাতে লেগে ফুলদানিটা পড়ে যায়।

আবির সাহেব খানিকটা ভয় পেয়ে ছিটকে উঠে। এতদিনের সম্পর্ক কেউ জানতে পারেনি। কিন্ত্য এই রসিবের জন্য সবাই জেনে যাবে!

তখন রাগ ভয় দুটোই কাজ করছিলো তার মনের মধ্যে।

যেমন ভাবা ঠিক তেমনই কাজ করলেন তিনি, ভাড়া করা মানুষ দিয়ে রসিবকে গাড়ির নিচে ফালাইলেন।

অন্যকিছু করলে হয়তো পুলিশের দৌড়ানি খেতে হবে। যতই টাকা দিয়ে সামলানো যাক। তবুও তিনি কোনো রকম রিস্ক নিতে চাননি।

কিন্তু এই রসিবের কি ভাগ্য বেঁচে আছে! কিন্তু রসিব সম্পুর্ন কোমায় ছিলো। তাই আবির সাহেব বোনের কান্না দেখে রসিব নিয়ে কিছু ভাবলেন না পরবর্তীতে।
আয়ান গতকালকে ওভাবে ছুটে যাওয়ায় আবির সাহেব পুনরায় ভয় পেলেন।

তিনি এতটা ভাবেননি যে আয়ান রসিবকে লুকিয়ে ফেলবে। তাহলে এতটা কাঁচা কাজ করার মানুষও তিনি নন।

আয়ানের মনে রসিবকে ছাড়াও ওন্যকিছু হারানোর ভয় জাগলো। জান্নাত! নিশ্চয় কিছু করতে পারে আমার পিশাচ বাবা। তাই আয়ানও কোনো রিস্ক না নিয়ে আগেই বিয়ে করে ফেললো।

আয়ানের মনে ভয় ছিলো। রাহিমা আন্টির সাথে যেহেতু বাবার এতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাহলে রাহিমা আন্টির মেয়ের সুখের জন্য আর আমাকে পিছু ফেরানোর জন্য নিশ্চয় দ্বিতীয়গুটি চালবেন আবির সাহেব। কিন্তু তার আগেই আয়ান গুটি সাজিয়ে ফেললো।

বাকি রইলেন শর্মিলা। তাকে অনেকবার আয়ান সত্যিটা বুঝাতে চাইছেন। ছেলে হয়ে যা কোনোভাবেই সম্ভব না। তবুও আয়ান চাইছিলোনা কোনো মুখুশ পরা মানুষের জন্য শর্মিলা মমিরা হয়ে উঠুক।

আবির সাহেবকে শর্মিলা বেগম অনেক বিশ্বাস করেন তার বিশ্বাসের উপহার হয়তো বিশ্বাস ঘাতকতা।

রাহিমা! তার জন্য তো শর্মিলা বেগম নিজের কলিজাটাও দিতে পারেন। কিন্তু তার এই বোনই তো কাল হয়ে দাড়ালো। পাঁতে খেয়ে বুকে ঠোকর।

আয়ান যখন রাতে জান্নাতকে নিয়ে বাসার বাইরে গেল। তখন শর্মিলা বেগম বারান্দায় ছিলেন। ঘুম আসছিলো না। আবির সাহেবও বাসায় নেই কোন কাজ আছে নাকি তাই গেছে।
হঠাৎ গেটের সামনে কারো কথোপকথন শুনে তিনি তাকিয়ে দেখলেন কয়েকটি ছেলেমেয়ে দাড়োয়ানের সাথে কথা বলছে।

শর্মিলা বেগম স্টোর রুমের দিকে এগোলেন। যা ভাবছেন তাই রুম শুন্য। জান্নাত নেই রুমে!

একে একে তিনি আয়ানের সব বন্ধুদের রুমে গেলেন কাউকে দেখলোনা।

অতঃপর আয়ানের রুমে গেলেন। কিন্তু তার রাগ, অভিমান সব নাড়া দিচ্ছে। তার ছেলে শেষ পর্যন্ত কিনা তার কথার বিরুদ্ধে গেলো। কত চেষ্টা করছে জান্নাতর থেকে আলাদা করার। এমনকি যখন বিদেশে থেকে জান্নাতর সাথে কথা বলতে চাইতো তখন তিনি আয়ানকে অনেকভাবে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করছেন। অবশেষে সফল। দীর্ঘদিন ধরে আয়ান জান্নাতর সাথে ফোনে কথা বলতে চাইতোনা। এমনকি দেশে ফেরার পরেও এড়িয়ে চলছিলো প্রথম দিন।

কিন্তু সেই ছেলে আজকে আমার কথার অবাধ্য হইছে! ভেবেই শর্মিলা আন্টির মেজাজ ৩৬০°।

কিন্তু আয়ানের ল্যাপটপ + ড্রয়ার হাতিয়ে কিছু কাগজ-পত্র চোখে পরে।

আয়ান! ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠা আয়ানের ছবি শর্মিলা বেগমের চোখে পড়ে।

কলম মুখে নিয়ে কিছু একটা ভাবছে আয়ান, তখনই কেউ আয়ানকে ক্যামেরা বন্দি করে। কিন্তু জায়াগাটা কোর্টের মতো লাগছে। আয়ান প্রশাসনের কেউ! শর্মিলা আন্টি ঠিকই ভাবছেন। আয়ানের কাগজগুলো ভালোভাবে দেখলেন। ল্যাপটপে পাসওয়ার্ড চাইছে তাই তিনি ল্যাপটপ ঘাটতে পারেননি।

কিন্তু একটা জায়গায় তার চোখ আটকে গেল, হাত-পা কাঁপছে। শেষে কিনা আবির সাহেব এতবড় বিশ্বাস ঘাতকতা করতে পারলেন!

আয়ান সবকিছু নোট করে রাখছিলো আবির সাহেব কি কি করে যাচ্ছেন বা করছেন।

এমনকি ইয়াসিন সাহেব ও তার সহধর্মিণীর মৃত্যুর কিছুকিছু লেখা আছে স্পষ্টভাবে।

শর্মিলা বেগম কাগজগুলো ভালোভাবে দেখলেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেননা। এই লোকটার পিছনে এত বড় একটা পশু লুকিয়ে আছে!

তিনি তড়িঘড়ি করে নিচের রুমের দিকে গেলেন। কিন্তু আয়ানের ফুফু তাকে দেখে খানিকটা চমকে গেলেন। অতঃপর শর্মিলা বেগমের জোরাজোরির কারনে আয়ানের ফুফু সবকিছু বলতে বাধ্য হইছেন যা যা জানেন তিনি।

কিন্তু শর্মিলা বেগমের সব না পাওয়ার মধ্যে একটাই পাওয়া হলো, আয়ান বিয়ে করছে!

যে অন্যাগুলো আগে তিনি করে গেছেন, সেইগুলো সব মনে জেগে উঠছে তাই তিনি কোনোরকমের বরনডালা সাজিয়ে উপরে চলে গেলেন তার রুমে।

যখন আয়ান ও জান্নাতকে বরন করলেন আয়ানের ফুফু। তখন শর্মিলা বেগম উপর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। তার বোন রাহিমা যেন কিছু না জানতে পারে তাই তিনি আয়ানের ফুফুকে সবকিছু সামলে নিতে বলছেন।

তবুও নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না তিনি। আয়ানের কাছে সবপ্রশ্নের উত্তরের জন্য ছুটে গেলেন। এমনকি আয়ান কিছু লুকিয়ে রাখলোনা। বলতে কষ্ট হইছে আয়ানের কিন্তু সত্যিটা তো জানাতেই হবে।

আবির সাহেব অনেক খুজলেন কিন্তু রসিবের কোনো চিহ্নমাত্র পাননি। তাই একঝাঁক বিরক্তি নিয়ে বাসায় ফিরে আসলেন।

শর্মিলা বেগম কিছু বুজতে না দিয়ে আবির সাহেবের সাথে আগের মতোই ভালো ব্যবহার করছেন।


পার্ট ১০

আবির সাহেব অনেক খুজলেন কিন্তু রসিবের কোনো চিহ্নমাত্র পাননি। তাই একঝাঁক বিরক্তি নিয়ে বাসায় ফিরে আসলেন।

শর্মিলা বেগম কিছু বুজতে না দিয়ে আবির সাহেবের সাথে আগের মতোই ভালো ব্যবহার করছেন। যা করতে হবে ভেবেচিন্তে। নয়তো এই মানুষটি আবার কোনো না কোনো ক্ষতি করে দিবে।

মিরা ঘুম থেকে উঠে আয়ানের রুমে গেল, কিন্তু কোথাও আয়ানকে দেখলো না। বারান্দায় যেয়েও দেখেনা। ভাবছিলো ছাদে যেতে পারে, তাই মিরা ছাদের উদ্দেশ্যে গেল।

বাহ! আয়ান মাহমুদকে ফাঁকি দিয়ে চলে আসছি। এখন আমার টিকিটিও খুঁজে পাবেনা।

এই ভরদুপুরে কেউ ছাদে আসতে পারে, আয়ান মাহমুদ তো জানবেই না। তাই আমাকে খুঁজতেই আসবেনা।

বজ্জাত ছেলে আমার মতো একটা নিরীহ মেয়েকে কি না। (নিজের মুখ নিজেই ঢেকে ফেললো লজ্জায়)

আমি দোষ করছি! শুধু তো ভাইয়াই ডাকছি, আগেও তো ডাকতাম তখন তো কিছু বলতো না। এখন সব দোষ নন্দ ঘোষ।

জীবনের বউয়ের মুখ তো দেখলি। কিন্তু আজকে আর দেখা লাগবেনা। যদি শায়েস্তা না করছি আমিও মিসেস. আয়ান মাহমুদ না।

  • আমি সাহায্য করতে পারি তোমায়।
  • আচ্ছা। ধন্যবাদ। (অন্যদিকে তাকিয়ে)
  • তা কি সাহায্য লাগবে বলো। আমি সবরকম সাহায্য করতে প্রস্তুত।
  • আমি যে ছাদে আছি আপনি ছাড়া যেন কেউ না জানে।

বিশেষ করে, ওই লাল টিকটিকি যেন না জানে।

  • লাল টিকটিকি(অবাক হয়ে)। টিকটিকি আবার লাল হয়!

—- আরে লাল টিকটিকি হচ্ছে গিরগিটি।

আপনি জানেননা! গিরগিটি দেখতে খানিকটা টিকটিকির মতোই লাগে(এখনও অন্য দিকে তাকিয়ে)। আর সেই গিরগিটি হচ্ছে লুচু আয়ান। তাহলে লাল টিকটিকি কে হবে বলুন তো। (কথাগুলো বলেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকালাম। কিন্তু সামনের মানুষটি তো রাগে পুরাই মিন্নিকন্ডার রূপ ধারণ করছে। ভয়ে ছাদ থেকে চলে আসতে যাবো তখনই আয়ান টান দিয়ে তারসাথে মিশিয়ে নিলো)

—-কি যেন বলছিলে! তোতাপাখি। আমি লাল টিকটিকি? গিরগিটি? বজ্জাত? আমায় শায়েস্তা করবে!

আর কি যেন বলছিলে। ও হ্যা মনে পড়ছে। আমি লুচু! (রেগে)

এবার দেখবা এই লুচু কি করতে পারে। (ডেভিলমার্কা হাসি দিয়ে)

  • আমতা আমতা করে। আমি আআসলে(তার থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছোটাছুটি করছি কিন্তু তার শক্তির কাছে কিছুই পারছিনা। সে আমায় আরও শক্ত করে তার সাথে মিশিয়ে নিলো। যখন বেশি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছুটাছুটি করলাম তখন নিজের আয়ত্তে নিয়ে গেল)

আয়ানের কাছ থেকে অনেক কষ্টে ছুটে পালালাম।

একবার ছাদের দড়জা পর্যন্ত এসে আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখি মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে।

হুহ! তাতে আমার কি! বেটা বজ্জাত সময় পেলেই লুচুগিরি শুরু করে দেয়।

সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে মিরাকে দেখলাম ছাদের দিকে আসছে। কিন্তু আমার কি! আয়ান তো এখন আমার নিজেরই। তা এত মাথা ঘামালাম না।

একটু উন্নতির পর্যায়ে গেলাম। স্টোর রুমে থেকে আয়ানের পাশের রুমে আমার জন্য থাকার ব্যবস্থা করছে। যদিও আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা আমাদের কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে।

মিরা ও ওর মায়ের ইচ্ছামত হলো না বিষয়টি।

কিন্তু ওদের মুখের অবস্থা দেখে আমার বেশ হাসি পাচ্ছে।

গোসল করে ভেজা চুলগুলো ছেড়ে দিলাম। আমি আপন মনে চুলের মুছি। হঠাৎ মনে হলো ঘাড়ে কারো গরম নিশ্বাস পড়ছে। এই নিশ্বাস আমার খুবই পরিচিত। আমি তবুও ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি।

আয়ান! হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। নিশ্চয় এখন আবার ১২টা বাজাবে।

আয়ানঃ তোমার ১২টা কিভাবে বাজাবো! তুমি কি কথা বলার ঘড়ি? (পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে)

আমিঃ কথা বলার ঘড়ি আছে?

আয়ানঃ হ্যা আছে তো। আমার সামনেই তো কথা বলার ঘড়ি।

আমিঃ আমায় দেখে কি ঘড়ি মনে হয়! (রেগে)

আয়ানঃ আরে আরেহ রেগে যাচ্ছো কেন! তুমিই তো একটু আগে বললে। তোমার ১২টা বাজাবো।

ঘড়ি ছাড়া ১২টা কিভাবে বাজায়!

তাই তোমার কথা অনুযায়ী আমার মনে হইছে তূমিই ঘড়ি। (হেসে)

আমিঃ চুপ কর শালা। (রেগে)

আয়ানঃ কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে।

কককিই বলোও অঅঅঅ।

আমিঃ কানে কম শুনো! আজকেই সবাইকে বলবো। এই এক-কানীরে ভালো ডাক্তার দেখাতে।

আয়ানঃ এএক-কানীইই। কি?(কথাশুনে তুতলে গেল)

আমিঃ ওরেহ বাটপার! ভাবলাম এক-কানী। এখন আবার তোতলাওও!

আরেহ মিয়া! এক-কানী হইলো। কথা শুনেও না শোনার ভান করে যে।

এটা ভীষণ খারাপ রোগ। মানুষ বিরক্ত করার মহৌষধ।

আয়ানঃ (কথাশুনে পুরাই ভ্যাবাচ্যাকা খেল বেচারা)

আয়ানের অবস্থা দেখে খুব হাসি পাচ্ছে। কথা দিয়ে তো জিততে পারলাম। এখন খুব শান্তি লাগছে।

দেখলাম আয়ান মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া মায়া মুখ। স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে আছে। আমি থুতনি ধরে এদিক-ওদিক নাড়ালাম। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছেনা। সেই আগের মতোই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই দিন-দুপুরে কত কাজ পরে আছে। যদিও তেমন কাজ নেই। শর্মিলা আন্টি তো পইপই করে বলে গেছে। তার এই বুড়ো ছেলেকে সামলাতে হবে।
এর থেকে কাজ করাই ভালো। এই বুড়ো ভাম কেউ সামলাতে পারে।

আমিতো ভাবছি আয়ান স্ট্যাচু হয়েই আছে আমার কথা শুনবেনা তাই জোরে জোরেই বলে ফেললাম।

কিন্তু কপাল খারাপ আমার, সামনে তাকিয়ে দেখি চোখদুটো বড়বড় করে তাকিয়ে আছে।

ভয়ে ঢোক গিললাম। রুম থেকে পালিয়ে আসতে যাবো, তখনই হাত টান দিয়ে আমায় কাছে নিলো।

এই কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা! যেকোনো সময়ে সুযোগ পেলেই টানাটানি শুরু করে দেয়। হাত-পা যেন কখন ছিড়ে যায় কে জানে।

আআআমি কককিছু দেখিনি। চোখে হাত দিয়ে কথাগুলো বললো মিন্নি।

আর দিনে-দুপুরে এভাবে রোমাঞ্চ করলে দড়জা লাগিয়ে রাখতে হয় জানোনা।

আয়ানঃ ওই দড়জা নক করে আসতে পারোনা। শয়তানের নানি।

মিন্নিঃ কে জানবে যে তোরা এখন এভাবে। আচ্ছা বাদ দে। আমি শয়তানের নানি হলে তুই শয়তান। আর আমি তোর নানি।

মিন্নি আপুর কথাশুনে মাটি দুইভাগ করে তার মধ্যে যেতে ইচ্ছে করছে। বজ্জাতটি দড়জা তো লাগিয়ে লুচুগিরি করতে পারতো।

বিকেলে ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে। আমি উপরে আসতে চাইছি কিন্তু শর্মিলা আন্টি জোর করে তার পাশে বসাইছে।

মিরা ও রাহিমা আন্টি মুখ গোমড়া করে আছে এখনও। হয়তো আমার প্রতি এত কেয়ার তাদের পছন্দ না।

আবির আংকেল চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছেন। এবং বারবার সামনের সবার দিকে তাকাচ্ছেন। বিশেষ করে আয়ানের দিকে কিছুক্ষন পরপরই।

হঠাৎই আয়ানের কথায় সবাই চমকে উঠলো।

আয়ান যে এমনকিছু বলতে পারে তা হয়তো কেউই ভাবেনি। কিন্তু সম্মুখে প্রকাশ না করতে পারলেও আবির সাহেব বেশ খুশি হলেন।


পার্টঃ ১১

হঠাৎই আয়ানের কথায় সবাই চমকে উঠলো।

আয়ান যে এমনকিছু বলতে পারে তা হয়তো কেউই ভাবেনি। কিন্তু সম্মুখে প্রকাশ না করতে পারলেও আবির সাহেব বেশ খুশি হলেন।

আয়ানঃ আচ্ছা রাহিমা আন্টি, আপনি স্বামী-সংসার ছেড়ে আমাদের বাড়িতে পড়ে আছেন কেন!

অন্যের সংসারের দিকে খেয়াল না দিয়ে নিজের সংসারেও তো মনযোগ দিতে পারেন। তাছাড়া ছেলে-মেয়ে বড় হইছে। একটা ব্যাপার আছে না!

আবির সাহেব আয়ানের কথাটা ভালোভাবেই হজম করলেন। মনে হচ্ছে আয়ান যেন তার মনের মধ্যে জমানো কথাটাই বলে দিছে। তিনি বেশ আগ্রহ-সম্পন্ন দৃষ্টিতে আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান যেন আজকেই তাদেরকে বের করে দিবে। এমন আগ্রহে।

আয়ান রাহিমা বেগমকে কথাগুলো বলেই আবির সাহেবের দিকে আড়চোখে তাকালো। কিন্তু আয়ান তাকানো মাত্রই ও নিজেই চমকে গেল। আবির সাহেবের চোখগুলো বলে দিচ্ছে আয়ানের কথার সাথে তিনি সম্মতি প্রকাশ করছেন।

আয়ান বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে আবারও রাহিমা বেগমকে কথা শুনালেন।

রাহিমা বেগমঃ দেখ দেখ শর্মিলা তোর ছেলে কিসব বলছে? (ন্যাকা কান্না করে)

যে ছেলেকে কিনা আমি কোলেপিঠে মানুষ করছি, এই তার প্রতিদান দিচ্ছে!

শর্মিলা বেগমঃ ও ভুল কিছু বলেনিতো। যা বলছে ঠিকই বলছে।

এতদিনতো আমার সংসারে ছিলি। এখন নিজেরটা সামলে নে।

তাছাড়া ছেলে-মেয়ে বড় হইছে ওদের বিয়ে-শাদিও তো দিতে হবে। বোনের শশুড় বাড়িতে থেকে যদি ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়। তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম দেখায়না!

আয়ানঃ আমার যতটুকু মনে পড়ে আমি ছোট থেকেই আপনার কাছে কম যাওয়া-আসা করতাম। ছোট আম্মুর কাছেই আমি বড় হইছি(জান্নাতর আম্মু)। তাই শুধু শুধু নিজেকে মহান সাজানোর কোনো দরকার নাই।

রাহিমাঃ শর্মিলা তুই এখনও কিছু বলবিনা তোর ছেলেকে‌!

শর্মিলাঃ আগেও বলছি এখনও বলছি। ও কিছু ভুল বলেনি। আয়ানকে লালন-পালন তো সাহিদা ই করেছে। যখনই জানতে পারলো আমার ভিতরে আরও একটি অস্তিত্ব আছে।

তখন থেকেই সাহিদার (জান্নাতর আম্মু) এক কথা ছিলো, আমার ছেলে/মেয়ে কে ও বড় করবে। এবং ওর ছেলে/মেয়ে কে আমি বড় করবো।

নিজেদের মনের মত করে নিজেরাই গড়ে তুলবো। তারপর অনেক ধুমধামে বিয়ে দিবো।

কিন্তু তা আর হলো কই (দীর্ঘশ্বাস ফেলে)।

কারো কুনজরে সব-স্বপ্নই নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।

আমি চাইলে ওর স্বপ্নগুলোকে পূরণ করতে পারতাম, কিন্তু তোর আশকারায় আমি সবকিছু ভুলে গেছি।

সৎ কখনো আপন হয়না। তা কোনো না কোনোদিন ঠিকই ধরা পরে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। তার জন্য যতই নিজের কলিজাটা ছিড়ে দিক না কেন! (রসিবের কথাগুলো মনে পড়লো। সাথে আবির সাহেব ও রাহিমার প্রতি ঘৃনা দ্বিগুন বেড়ে গেল)।

তারজন্য আমি আমার রক্তের বোন না থাকা স্বত্তেও সেই বোনের ইচ্ছা পুরন করিনি। যে নিজের কথা না ভেবে আমার জন্য প্রানও দিয়ে দিতে পারতো। সেই স্কুল/কলেজের কাটানো স্মৃতিগুলো আজকে শর্মিলা বেগমের কড়া নাড়ছে।

আফসানা (জান্নাতর মা) ও শর্মিলা স্কুল থেকেই দুইজন ভালো বান্ধবী ছিলেন।

ইয়াসিন সাহেবের সাথে আফসানার বিয়ের সূত্রতা নিয়েই আবির সাহেবের সাথে শর্মিলার বিয়ে হয়।

আফসানার ইচ্ছা ছিলো তারা দুই বান্ধবী একসাথে থাকবে। একঘরে না যেতে পারলেও আফসানার বরের বন্ধুর (আবির সাহেবের) জন্যই শর্মিলা কে আনলো।

কতসুন্দর মুহুর্ত ছিলো তাদের, কত স্মৃতি, মান-অভিমান সবকিছুই আজকে শর্মিলাকে কড়া নাড়ছে।

পুরোনো স্মৃতিগুলো বড্ড মনে পড়ছে আজকে।

কিন্তু তিনি আফসানার জন্য কিছুই করতে পারলো না। এমনকি তার মেয়েকেও দিনের পর দিন অবহেলা করে গেছে।

সবকিছুর কারন যে একজন, তা শর্মিলা বেগম ভালোই বুঝতে পারছেন। এমনকি রসিবের কথাগুলো মনে পড়াতে। তিনি আরও রেগে আছেন।

তার বোন রাহিমাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। মিরা যদিও বারবার বাহানা খুঁজছে, রাহিমা বেগম তো রাগে ফুঁসছেন।

শর্মিলা বেগম যখন রাহিমাকে কড়াভাবে কথাগুলো শুনাচ্ছিলো তখন আবির সাহেবের দিকেও বারবার আড়চোখে রাকিয়েছেন। কিন্তু তার কোনো পরিবর্তন নেই, তার চোখ-মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে আবির সাহেবও অনেক খুশি।

কিন্তু আয়ান ও শর্মিলা বেগম একটু চিন্তিত হলেন। যেখানে আবির সাহেবের খুশি হওয়ার কোনো কথা নেই, সেখানে তিনিই হাসি-মুখ নিয়ে বসে আছেন! রাহিমা বেগমের যাওয়াতে।

শর্মিলা বেগম বেশি মাথা ঘামালেন না। আজকে আয়ানের জন্মদিন। তিনি আফসানার ইচ্ছাটা একটু হলেও পূরণ করতে চাইছেন সাথে আয়ানের জন্মদিনের অনুষ্ঠানও ধুমধাম করে করতে চাইছেন।

আয়ানের জন্মদিনে তিনি আয়ান ও জান্নাতর বিয়ের জন্য আলাদা কিছু করার প্লানিং করছেন।

তিনি কথাগুলো ভেবে মুচকি হেসে জান্নাতর পাশে বসলেন এবং ওর মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে চুল বিলি কাটছেন।

আয়ান মুগ্ধনয়নে দেখছে এই ভালোবাসা।

আবির সাহেব শর্মিলা বেগমের পরিবর্তন দেখে খানিকটা চমকে গেলেন। কিন্তু প্রকাশ করলেন না। এজান্নাততেই আজকে সকাল থেকে বাড়িতে আসছে পরে তার লেডি কিলারের বেশ পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন। যার মধ্যে অন্যতম হলো তাকে এড়িয়ে চলা।

ঝামেলায় ঝামেলায় বাড়িতে আজকে এতবড় অনুষ্ঠান হবে অথচ শর্মিলা বেগম কিছু করেননি!

তিনি তড়িঘড়ি করে উঠলেন তখনই আবির সাহেব বললেন,

আবির সাহেবঃ এত তারাহুরো করতে হবেনা। সবকিছু আমি গুছিয়ে রাখছি।

শর্মিলা বেগম প্রতিউত্তরে কিছু বললেন না।

আমিঃ আজকে তার জন্মদিন! এতদিনের দূরত্বে আমি সবকিছু ভুলে গেছি। মন খারাপ করে বেডের একপাশে বসে আছি। তাকে বার্থডে-উইশ করতে পারলাম না।

আয়ান হুট করে এসে আমার কোলে মাথা দিলো।

আয়ানঃ আমার মহারানীর মন খারাপ! এভাবে গোমড়ামুখ করে বসে আছে যে।

আমিঃ উহু

আয়ানঃ কি! চাঁদমুখে মেঘের ছায়া একদম ভালোলাগেনা।

ভয় থাকে কখন বৃষ্টি ঝরে যায়।

আচ্ছা মন খারাপের কারনটা কি আমি! তাহলে বলে দিও আমি বিরক্ত করবোনা।

মুখ গোমড়া করে তিনি চলে যাচ্ছিলেন। আমি হাতটা ধরলাম। তার জন্য আমক বিরক্তি হই!

তার হাতটা শক্ত করে ধরলাম, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছেনা।

তিনি আবারও আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এবং আমার হাতের আঙুলের ভাঁজে তার হাত রেখে খেলা করছেন।

আবারও মিন্নি আপু আসলো।

মিন্নিঃ এই এই(চোখে হাত দিয়ে) দড়জা লাগিয়ে রাখতে পারিস তো।

আমি তারাতারি তাকে সরিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তিনি করুন চোখে একবার আমার দিকে একবার মিন্নি আপুর দিকে তাকাচ্ছেন।

এই মিন্নি আপুও না! শুধু কথায় কথায় লজ্জা দেন।

আয়ান ভুরু কুঁচকে মিন্নির দিকে তাকালো।

ওই তুই আসার আর সময় পাওনা!

মিন্নিঃ আমি কিভাবে জানবো! সারাক্ষন তোরা।

আচ্ছা যাই হোক। আন্টি তৈরি করতে বলছে জান্নাতকে। তাই আমি আসছি। এখন তুই যেতে পারো।

আয়ানঃ মামা বাড়ির আবদার! আমার বউ আমি থাকবো, তুই যা।

মিন্নিঃ আন্টিকে ডাকবো!

আয়ানঃ আরেহ না না আমিতো মজা করছি।

তিনি মুখ গোমড়া করে চলে গেলেন।

মিন্নি আপু তার দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসছেন। যেন আজকে অনেক বড় যুদ্ধ জয় করছেন।

বাড়িতে লোক সমাগম শুরু হয়ে গেছে। মিন্নি আপু আমকে তৈরি করে আমাকে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে গেলেন।

আয়ানের সাথে আমাকেও কালার ম্যাচিং করে শাড়ি পড়ানো হয়েছে। তার দিকে চোখ যাওয়া মাত্রই থমকে গেলাম। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে, আমি তার দিকে তাকানো মাত্রই তিনি চোখ মারলেন। হুহহ! এই বজ্জাত এখানেও আমায় লজ্জায় ফালাতে চায়!

আমি তারাতারি অন্যদিকে তাকালাম, নয়তো এই বজ্জাত আবারও কোনো কান্ড ঘটাবে।

আয়ান বন্ধু/বান্ধবীদের জোরাজোরিতে গান গাইতে বাধ্য হলেন।

আমি মুগ্ধভাবে শুনছি। তার চাওয়া -পাওয়া, ভালোবাসা, মান-অভিমান মিশ্রিত গান।

তোর কাছে যেতে চায় হৃদয় মানেনা বারন, বৃষ্টির শহরে মেঘলা আমার এই মন।

তোর কাছে যেতে চায় হৃদয় মানেনা বার বৃষ্টির শহরে মেঘলা আমার এই মন।

তুই কি আমার মত ভাবিস আমায়। ভালোবাসা খুঁজে নিস জলের ছোয়ায়।

তোকে ছাড়া হয়নাতো কোনো উৎসব!

তুইই ই ই ই ইইইইইইইই ই। তুই তো আমার সব।

তুইই ই ই ইইইইইই ই তুই তো আমার সব।

তুই তো আমার সব।

অভিমানী ভুলগুলো যেন ফুল হয়, একা একা কাটেনা যে বিরহী সময়।

অভিমানী ভুলগুলো যেন ফুল হয়, একাএকা কাটেনা যে বিরহী সময়।

তুই কি আমার মতো স্বপ্ন দেখিস, চোখের আকাশ জুড়ে আমায় আঁকিস।

তোকে ছাড়া হয়নাতো কোনো উৎসব। তুই ই ই ইইইইইইই তুই তো আমার সব।

তুই ই ই ইইইইই তুই তো আমার সব, তুই তো আমার সব।

ভেঁজা চোখে ঝরে পড়ে শিশিরের সুর, তোর কথা মনে পরে রাত্রি-দুপুর।

ভেঁজা চোখে ঝরে পড়ে শিশিরের সুর, তোর কথা মনে পরে রাত্রি-দুপুর।

তুই কি আমার মতো উদাস কবি! লিখে যাস হৃদয়ে কাব্য ছবি।

তোকে ছাড়া হয়নাতো কোনো উৎসব।

তুই ই ই ইইইই তুই তো আমার সব,

তুই ই ই ইইইই তুই তো আমার সব, তুই তো আমার সব।


পার্টঃ ১২

এতক্ষন চোখ বন্ধ করে ছিলেন। গান শেষে চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দেয়।

এজান্নাততেই বারবার তার প্রেমে পড়ি। এখন গান শোনার পড়ে তো সেকেন্ডে সেকেন্ডে পড়তে ইচ্ছা করবে। গানের প্রতিটি কথায়, প্রতিটি সুরে তিনি আমায় কল্পনা করছেন।

আমি মুগ্ধনয়নে দেখছিলাম তাকে। হটাৎ আয়ান এসে ফিসফিসিয়ে বলছে,

এভাবে তাকিয়ে থাকতে নেই তোতাপাখি নজর লেগে যাবে তো(বলেই চোখ টিপ দিলো)

আমার ইচ্ছা করছে মাটি দুইভাগ করে মাটির নিচে ঢুকে যাই৷ হুহ! আমি তাকালে তার নজর লেগে যাবে!

কই এত মেয়েরা যে তাকাচ্ছে বারবার তখন তো কিছু বলছেনা। তখনতো ভালোই লাগছে তার।

সবকিছু আমার বেলায়ই, তাকাবোনা আমি।

অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেললাম, এই লুচু বজ্জাতকে না দেখলে আমার কিছু হবেনা। তাকে দেখার অনেকে আছে।

আয়ানঃ আরে আরেহ তোতাপাখি রাগ করছো কেন! আমিতো মজা করছি।

আমিঃ হুহ

আয়ানঃ তাকাবেনা আমার দিকে!

আমিঃ নাহ।

আয়ানঃ সত্যি তো?

আমিঃ হ্যা। একশো পার্সেন্ট সত্যি।

আয়ানঃ দেখো ওই মেয়েটা কি সুন্দর, একদম হুরপরীর মতো লাগছে।

আমিঃ (চোখ বড়বড় করে তাকালাম তারদিকে) কোন মেয়েটা তাকাচ্ছে?

আয়ানঃ এই যে অ্যাশ কালারের শাড়ি পড়া মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়েছিলো(আমাকে উদ্দেশ্য করে)।

আমিঃ শয়তান পোলা(রেগে) তাকাবোইনা। বলেই আয়ানের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাইলাম। তখনই আয়ান আমাকে হেঁচকা টান দিয়ে তার কাছে নেয়।

(এর লজ্জা-শরম কিছু নাই। কিন্তু আমারতো আছে। এই পাব্লিক প্লেসেও এভাবে করা লাগে)

কিছু বলতে যাবো তখনই একহাত দিয়ে আলতোভাবে আমার কোমড় ধরে, অন্যহাত দিয়ে আমার ঠোঁটে স্লাইড করছে।

হঠাৎ লাইট অফ হয়ে যায়। হালকা রঙিন মৃদু আলোয় তাকে দেখছি, অপলকভাবে তাকিয়ে আছে আমারদিকে।

আমিও দেখছি একটা মায়াবী মুখ। ছেলেরা এত মায়াবী হয় আগে জানতাম না।

আবারও তিনি বলে উঠলেন।

আমার কথা শুনে তো রেগে গেলে, আমি মিথ্যা বলিনা, এখন দেখছোতো! এই অ্যাশ কালারের শাড়ি পড়া মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

তো! অন্যকারো তাকানো আশা করেছিলেন নাকি!

হ্যা (বলেই জিহবায় কামড় দিলো)

কি (ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে)

আরে আমি বলছিতো অন্যকারো তাকানো আশা করিনি।

সেটা ভালোই শুনছি।

রাগ দেখিয়ে চলে আসতে যাবো তখনই লাইট জ্বলে উঠে। সাথে চারিদিক থেকে ফুলের ছড়াছড়ি পড়ছে আমাদের উপরে।

আমি আয়ানের দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে আবারও মুচকি হাসলেন।

তারমানে এতক্ষন এই প্লানিং চলছিলো!

আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবতী, কারন এমন একজনকে আমার জীবনে পেয়েছি।

কংগ্রাচুলেশনস মি. &মিসেস আয়ান মাহমুদ।

সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে বলছে।

আমিতো এর আগে কখনো দেখিনি, হয়তো তার ফ্রেন্ড হবে। জিন্স – টপস পড়া, চুলগুলো এলোমেলো সিল্কি চুল কোমড় অবধি ছুঁয়ে গেছে, উচ্চতা ৫’৩” এর মতো।

আমার মনে হয় কোনো নায়িকাদের সৌন্দর্যের সাথে যদি তাকে তুলনা করা হয়। তাহলে তিনিও হার মানবেনা।

মেয়েটাকে দেখেই আয়ান হেসে চলে গেল, সাথে সাথে মেয়েটি তাকে জরিয়ে ধরলো, তিনি কিছু বললেন না।

কি চমৎকার দৃশ্য! বউ দাঁড়িয়ে আছে অথচ সে অন্যএকজনের সাথে জরা জরি করছে। বন্ধু হতেই পারে, তাই বলে এভাবে!

শর্মিলা আন্টি তার আত্নীয়দের সাথে আমায় পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এদিকে আমার কোনো খেয়ালই নাই, আমার সমস্ত মনযোগ আয়ানের কাছে।

কি কথা বলছে এত! বিশ মিনিট যাবৎ তারা কথা বলছে, এখন মাঝে মাঝে হাসছে। আর আমার দিকে তাকাচ্ছে।

আমি কোনো পড়োয়া না করে অন্যদিকে তাকালাম। এতক্ষনে আমার কথা মনে পড়লো! তাও ওই মেয়েটার সাথেই আছে, আমার কাছে তো আসলো না।

এই মানুষটিকে সত্যিই আমি বুঝতে পারিনা, পুরাই গিরগিটির মতো। ক্ষনে ক্ষনে রূপ পরিবর্তন করে।

আমিও তার বউ। আমিও কম যাই কিসে। আমিও নিজেকে পরিবর্তন করতে পারি।

এতদিন মিরা ছিলো এক আপদ বিদায় করতে, আরেক আপদের আমদানি।

পুরো অনুষ্ঠানে তিনি দুইবার আমার কাছে আসছিলো। একবার কেক কাটার সময়। অন্যএকবার কাপল ছবি তোলার সময়ে।

বাহ! কি সুন্দর দৃশ্য, মুহুর্তের মধ্যেই আমায় ভুলে গেছে।

শর্মিলা বেগম বেশ চিন্তিত হয়ে আছেন। সাথে আয়ানের ফুফুও।

আবির সাহেব অনুষ্ঠান ছেড়ে ছুটতে ছুটতে কই যেন চলে গেছেন। শর্মিলা বেগম ও আয়ানের ফুফু এতবার জানতে চাইলো কিন্তু আবির সাহেব কিছু বললেন না।
কোনো একটা বিষয় নিয়ে তিনি ভয় পেয়ে আছেন।

তিনি বাসা থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষন পরেই আয়ান তাকে ফলো করতে বের হয়। যদিও এর আগে থেকেই আয়ান লোক ঠিক করে রেখেছে ওর বাবাকে ফলো করার জন্য। তাই অনুষ্ঠান শেষেই আয়ান গেল।

আয়ান এতক্ষন যে মেয়েটির সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলো, সেই মেয়েটি হলো আয়ানের ফ্রেন্ড। মেয়েটির নাম মোহনা।

কিন্তু মেয়েটিকে শাহিনের কলিগও বলা যায়।

ডিটেক্টিভ অফিসার! শাহিন ও মোহনা দুজনেই।

শর্মিলা বেগম আয়ানের ঘরে যাকিছু দেখছিলো সবকিছুই শাহিনের। আয়ান জানে, যদি ওর বাবা আবির সাহেব জানতে পারেন শাহিন একজন ডিটেকটিভ অফিসার।
তাহলে নিশ্চয়ই তিনি কোনো গন্ডগোল লাগাবেন। তাই আয়ান শাহিনের সনদ-পত্র ওর কাছে রেখে দেয়।

শর্মিলা বেগম সেইগুলোই দেখে বুঝেন আয়ান একজন গোয়েন্দা অফিসার।

শাহিন বাংলাদেশেরই ছেলে। কিন্তু যখন ইয়াসিন সাহেব ও আফসানা বেগমের খুনের তদন্তের পুনরায় জেগে উঠলো তখনই শাহিন সবকিছু মাথা পেতে নেয়। নতুন চাকরিতে জয়েন্ট করেই তদন্ত শুরু! আয়ানও না করেনি। ও জানে শাহিন যে কাজটা করে তা সম্পুর্ন দায়িত্ব সহকারেই।

আয়ানের সাথে আসার পরে এখনও নিজ বাড়িতে পা রাখেনি শাহিন।

রাত ১২ টা বেজে ১ মিনিট তখন থেকে বউ সেজে অপেক্ষা করছি আমার বরের জন্য।

কি ভাড়ি লেহেঙ্গা, খুব অসহ্য লাগছে কিন্তু যার জন্য এখনও অপেক্ষা করছি তার কোনো চিহ্নমাত্র নেই।

এখন ১টা বেজে ১৬ মিনিট এতক্ষন তার জন্য অপেক্ষা করছি।

সে তো বলেই যেতে পারতো আমি আসতে পারবোনা, শুধু শুধু আমাকে কষ্ট দেয়ার মানে আছে কোনো!

এত অপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব না, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

শর্মিলা বেগম চিন্তিত হয়ে বসে আছেন, আয়ান সেই কখন গেছে এখনও কোনো নামমাত্র নাই।

মেয়েটিকে শুধু শুধু বসিয়ে রাখছি। তিনি কথাগুলো ভাবছেন আর বারবার দড়জার দিকে তাকাচ্ছেন।

তার পাশেই বসে আছেন অন্যান্যরা। শুধু নেই শাহিন, মোহনা, আয়ান।

রাত ১ টা বেজে ২৫ মিনিট

একটা ভাঙা ২ তলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান, মোহনা, শাহিন।

যদিও মোহনাকে আসতে বলেনি, এত রাতে একটা মেয়ে বাইরে থাকবে সেটা কারোই ভালো লাগবেনা।

কিন্তু মোহনার এককথা দায়িত্বে যখন পড়ছে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকবে।

এত রাতে এই বাড়িতেই বা আবির সাহেবের কি কাজ থাকতে পারে! তাকে অনুসরণ করতে করতে ওরাও আসছে।

এখন ধৈর্যের সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে, কতক্ষন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এভাবে! সাথে মশা তো আছেই, বিনা টিকিটেই মহাকাশ ভ্রমন করাতে পারবে।

আয়ান বিরক্ত হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য পা বাড়ালো। শাহিন ও মোহনা বারন করছে তবুও আয়ান ওদের কথা শুনলো না।

তাই বাধ্য হয়ে শাহিন ও মোহনাও আয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো।

ভাঙা জানালা দিয়ে ভিতরে কি হচ্ছে দেখার জন্য আয়ান সামনে এগোলো।

সাথে সাথে ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম।

আবির সাহেবের মত আরও একজন সামনে দাঁড়িয়ে আছেন!

আমি তো কখনো জানতাম না যে আমার কাকা আছে। তাও আব্বুর জমজ ভাই! আয়ানের ঘোর কাটছেনা।

যা দেখছে তা সত্যি! নাকি আড়ালে যা আছে তা সত্যি।

এর সমস্ত উত্তর ওর বাবা আবির সাহেবই দিতে পারবেন।

শাহিন ও মোহনা বিষ্ময়কর হয়ে তাকিয়ে আছে ঘটনা বুঝার জন্য।

এরমধ্যে অট্টহাসিতে হেসে উঠলো আবির সাহেব রূপি আরেকজন।

আবির সাহেব আকুতি -বিনতি করছে কিন্তু সামনের মানুষটি তার কথার পড়োয়া না করে অট্টহাসিতে হেসে উঠলো।

ঘটনার আকস্মিকতায় এবার আয়ানও চমকে গেল।

বেশ কিছুক্ষন পরে আবির সাহেব বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। কিন্তু ওই লোকটি এখনও হেসেই যাচ্ছে।

এবার শাহিন ও মোহনার কথায় আয়ানকেও বাড়ির পথ ধরতে হয়।

সবকিছু গোলমেলে হয়ে গেছে, ভাবছিলো এক কিন্তু এখন অন্যকিছু হতে যাচ্ছে।

শর্টকাট রাস্তা ধরে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো ওরা। আবির সাহেবের আগে পৌঁছাতে হবে, নয়তো সবকিছু শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে।

আয়ান রুমে যেয়ে দেখে জান্নাত ঘুমিয়ে আছে।

আজকে বাসর রাত! এভাবে তাড়াহুড়ো করে ছুটতে ছুটতে কিছুই মনে ছিলোনা আয়ানের।

নিশ্চয়ই কপালে দুর্ভোগ আছে।

কিন্তু পরক্ষণেই বললো জান্নাতর দিকে তাকিয়ে।

যা কিছু করছি সবই তো তোর জন্য।

এখন একটু কষ্ট কর, পরে সবকিছু পুষিয়ে দিবো কথাগুলো বলে আয়ানের ঘুমন্ত মায়াপরীর কপালে আলতোভাবে চুমু খেল।

তারপর জরিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো আয়ান।

সকালে ঘুমঘুম চোখে উঠতে যাবো কিন্তু মনে হলো কারো বুকে খুব যত্ন-সহকারে আছি।

তাই চোখ বন্ধ করেই অনুভব করছি, তার হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু ঘুমন্ত অবস্থায় এত হার্টবিট চলে! নিশ্চয়ই কোনো গন্ডগোল আছে, চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি বজ্জাতের বুকে আছি।

আমায় কষ্ট দিয়ে এখন খুব শান্তিতে ঘুম হচ্ছে! রেগেমেগে উঠতে যাবো, তখনই ছেলেদের মায়াবীমুখ চোখে পড়লো।

ছেলেরাও মায়াবী হয়! আমার সামনে যিনি আছেন তাকে দেখলে বুঝতে পারি এখন, ছেলেরাও মায়াবী হতে পারে।

কিছুক্ষন তাকিয়ে তার নাকের সাথে নাক ঘেঁষে উঠতে যাবো তখনই তিনি আরও শক্তভাবে আমাকে তার সাথে মিশিয়ে নিলো।

কি মহা ঝামেলায় পড়লাম! এত বেলা হইছে এখনতো ঘুম থেকে উঠা উচিৎ। কিন্তু এই বজ্জাতের জন্য কিছুই পারছিনা।

জেগে থাকলেও টানাটানি শুরু করে আবার এখন ঘুমন্ত অবস্থায়ও শুরু করছে।

কিন্তু আমি তাকে পড়োয়া না করে উঠতে যাবো ঠিক তখন আবারও আমাকে আগের থেকেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।

আয়ানঃ এত তাড়াহুড়ো কিসের শুনি! একটু ঘুমোতে দাও।

আমিঃ তো ঘুমাবেন। আমাকে তো উঠতে দিবেন।

আয়ানঃ তুমি থাকবেনা আর আমি ঘুমাবো?

দেখতে পারছোনা কত শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলাম। দিলে তো ঘুম ভাঙিয়ে। এখন শাস্তি তো পেতেই হবে(বলেই দুষ্ট হাসি দিলো)

আমি তার কথার ধরন বুঝতে পারছি। কিন্তু গতকালের ঘটে যাওয়া সবকিছু মনে পড়লো।

ওই মেয়েটির সাথে জরাজরি করছে, তারপর আমায় বসিয়ে রাখছে তার কোনো হদিস ছিলোনা।

এখন আমি কেন তার কথায় পাত্তা দিতে যাবো!

আমি উঠতে যাবো তখনই।

আয়ানঃ গতকালকের জন্য রেগে আছো?

আসলে একটা কাজ ছিলো, তাই বুঝতে পারিনি।

আমিঃ আমার বেলায়ই তো সব কাজ। আমি তাকালে সমস্যা হয়, অন্যকেউ জরাজরি করলেয কিছু হয়না। (অভিমান করে)

আয়ান আবারও আমার মাথাটা তার বুকের সাথে শক্ত করে ধরলো।

আয়ানঃ আমার বউ অভিমানও করতে পারে! আগে জানতাম না তো।

আমিঃ হুহ

আয়ানঃ আসল কথা হলো।

আমার সাথে অন্য কাউকে দেখলে হিংসে হয়! আমার মতো হতে চাও! (বলেই হেসে দিলো)

এজান্নাততেই মেজাজ খারাপ, এখন আবার এমন কথা বলছে।

ওই বজ্জাত ছাড়বি তুই! আমি উঠবো এখন।

আয়ানঃ (ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে)

স্বামীকে তুই করে বলতে নেই পাপ হয়।

আমিঃ তোর পাপের পিন্ডি চটকাই। (রেগে)

আয়ানঃ বউ আমার সাংঘাতিক রেগে আছে মনে হয়।

রাগ ভাঙাতে পারি! যদি সম্মতি দিন মহারানী।

আমিঃ রাগের গুষ্টি কিলাই। (রেগে)

আমার রাগ কারো ভাঙাতে হবেনা।

আপনার তো অনেকে আছে। তাদের কাছেই যেতে পারেন। আমি তো কেউ না। (অভিমান করে)


পার্টঃ ১৩

আয়ানঃ একটা সুযোগ কি পাওয়া যায়না?

আমিঃ হ্যা সুযোগ আছে। ওইদিন রাফাত ভাইয়া স্টোর রুমে গেছে, কিন্তু আপনি কিভাবে জানলেন? এটা বলতে হবে।

আয়ানঃ…..

একটা গল্প বলছি।

অনেকদিন আগের কথা, একছিলো এক পেত্নী আরেক ছিলো ভদ্র ছেলে সেই পেত্নীটা শুধু জালাতন করতো ভদ্র ছেলেটিকে। কারনে-অকারনে রেগে থাকতো আর সেই ভালো ছেলেটির বিভিন্ন উপায়ে রাগ ভাঙাতে হতো।

মাঝে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। সেই ছেলেটির সাথে ওই পেত্নীর সবরকমের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় যে কোনো কারনে।

কিন্তু ছেলেটি সবসময়ই চোখে চোখে রাখতো। অথচ পেত্নীটি বুঝতেই পারতোনা, কারন অন্য মানুষের সাহায্য নিতো যার জন্য মেয়েটি বুঝতে পারেনি।

মেয়েটির মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখে ছেলেটি নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনা। কিন্তু কিছু করার থাকেনা, নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

ছেলেটির সাথে মেয়েটির দেখা হয়। মেয়েটিকে দেখার সাথে সাথেই ছেলেটি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আগের চঞ্চলতা খুঁজে পায়না। যে মেয়ে সবসময় দুষ্টুমিতে মগ্ন থাকতো কিন্তু তার এতটা পরিবর্তন দেখে ছেলেটি নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি।

ছেলেটি পাগলের মত হয়ে যায় সত্যিটা জানার জন্য।

কারন, বাসা থেকে বের হলে মেয়েটি যা যা করে সবকিছু ছেলেটি জানতে পারে, বাসার ভিতরের কিছুই জানেনা।

তাই ছেলেটি বাড়ির ভিতরে গোপন ক্যামেরা রাখে। বিশেষ করে একটা রুমের সামনে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখে, যেখানে ওই মেয়েটি থাকতো।

কিন্তু বিকেলের দিকে মেয়েটি ব্যাগ নিয়ে নিজের রুম থেকে বের হলো। তখন ছেলেটি পিছু নিয়ে দেখে মেয়েটি স্টোর রুমে গেছে।

হঠাৎ ছেলেটির মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি আসলো, তাই স্টোর রুমের ডুপ্লিকেট চাবি নিলো।

কিন্তু স্টোর রুমের কাছে এসে শুনতে পেলো ভিতর থেকে দড়জা আটকানো, আর মেয়েটি চেঁচামেচি করছে।

তাই ছেলেটি বাধ্য হয়ে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দড়জা খুললো।

কিন্তু ভিতরে যেয়ে ছেলেটির মাথায় রক্ত উঠে গেল।

তাই মারামারি করে পেত্নীটিকে নিজের কাছে নিয়ে গেলো।

কিন্তু সেই পেত্নী তো পেত্নীই, ছেলেটি কত ভালোবেসে তাকে নিজের কাছে নিলো। কিন্তু সে কিনা স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু তার এমন বোকাবোকা কথা শুনে ছেলেটি বেশ মজা নিলো।

মেয়েটিকে রাগানোর জন্য ছেলেটি অন্যএকজনকে নিজেদের মধ্যে আনলো। মেয়েটি দেখে তো যেমন রাগে ফুঁসছে তেমনই মন খারাপ।

ছেলেটি কখনোই চায়নি মেয়েটি মন খারাপ করুক, কারন নিজের থেকেও ভালোবাসে তাকে।

কিন্তু হঠাৎ ছেলেটির মধ্যে একটা অস্থিরতা ভাব দেখা গেল। তার মনে হয়েছিলো মেয়েটি তাকে ছেড়ে চলে যাবে।

তাই আগে থেকেই মেয়েটির অজান্তে স্টোর রুমে একটা ক্যামেরা লাগালো। আর নিজে বসে অপেক্ষা করছিলো।

মেয়েটি রুমে ঢোকা মাত্রই ছেলেটি জরিয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেয়।

কিন্তু সেই বোকা মেয়েটি তখনও কিছু বুঝতে পারলোনা। সেই ছেলেটির যে তাকে ভালোবাসে।

এমনকি সেই মেয়েটি, ছেলেটিকে ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছিলো। তাই ছেলেটি বাড়ি থেকে যাওয়ার জন্য সবকিছু বন্ধ করে দেয়।

সবার অজান্তে মেয়েটিকে বিয়ে করে ওইদিন রাতেই।

কত কষ্ট করছে সেই ভদ্র ছেলেটি কিন্তু মেয়েটি বুঝলোই না। শুধু শুধু রাগ করে, এমনকি কাছে যেতে চাইলেও মেয়েটি বাঁধা দেয়। শুধুমাত্র জোর করে কয়বার কিসি দিছিলো, তাতেই মেয়েটির নাকি সবকিছু শেষ।

ছেলেটির আশা আর পূর্ণ হলোনা। তার ভাবনাকে দেখা হবেনা।

আমিঃ এতক্ষন কথাগুলো আবেগের সাথে শুনছিলাম৷ সত্যিই তো আমি কখনোই বুঝিনি তাকে।

পেত্নী বলাতেও রাগ হলোনা।

কিন্তু ভদ্র ছেলে! সে ভদ্র কিভাবে হয়। আর শেষের কথাগুলো শুনে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করছে।

সবকিছুর মধ্যে তার এইসব আনতেই হবে।

আয়ানঃ আমায় কেউ ভালোবাসেনা। সবাই অবহেলা করে। (কান্নার ভান ধরে)

আমিঃ ওইইই মিয়া। মেয়েদের মতো কি শুরু করছেন! হুম্মম?

সবাই অবহেলা করে মানে! আর কার কার কাছে ভালোবাসার জন্য গেছিলেন। শুনি?

আয়ানঃ থতমত খেয়ে।

ক ক কই কারো কাছে যাইনিতো। ভাবনার আম্মুর কাছেই গেছি, কিছু ভাবনার আম্মু পাত্তাই দিচ্ছেনা।

আমায় ভালোবাসেনা ঠিক আছে, কিন্তু ভাবনার কথা তো ভাবতেই পারে। মেয়েটা কোথায় আছে, কিভাবে আছে কে জানে।

মেয়েটিকে আমাদের কাছে আনার চেষ্টা তো করতেই পারি।

আমিঃ কিইইইইইই (চোখ বড়বড় করে)

আয়ানঃ দেখো আমি কিন্তু আমার মেয়েকে খুব ভালোবাসি।

তুমি আমার মেয়েকে কষ্ট দিতে দিতে পারোনা।

আমিঃ আপনার মেয়েকে আপনি নিয়ে আসবেন আমায় বলছেন কেন!

আয়ানঃ আমি একাএকা!

আমিঃ তার কথার ধরন বুঝে তারাতারি কেটে পড়লাম। নয়তো কিনা কি বলে ফেলে কে জানে।

শর্মিলা আন্টির সাথে ব্রেকফাস্ট গুছিয়ে আয়ানকে ডাকতে আসছি। রুমে এসেই দেখি গতকালের মেয়েটি।

এখনো যায়নি!

তারা হাসাহাসি করছে, কিন্তু আমি যাওয়া মাত্রই চুপ হয়ে গেলো।

মোহনাঃ হাই! আমি মোহনা। আয়ানের গুড ফ্রেন্ড।

আমিঃ ওয়ালাইকুম সালাম, আমি মিসেস আয়ান মাহমুদ ( সালাম দিতে হয় তাও জানেনা। হাই, হ্যালো পাইছে আর কিছু লাগেনা তাদের যত্তসব)

আমার কথা শুনে মেয়েটি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। মুখে অবস্থা দেখে খুব হাসি পাচ্ছে। কিন্তু নিজের হাসিকে খুন করতে হলো।

আমার জামাইর পিছনে ঘুরঘুর করা! দেখাচ্ছি কত ধানে কত চাল।

আয়ান আমার কথা শুনে মিটমিট করে হাসছে। কিন্তু আমার মত নিজেকে সামলে নিলো।

আয়ানঃ কিছু বলবা? (আমাকে উদ্দেশ্য করে)

আমিঃ হ্যা। ব্রেকফাস্টের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।

আয়ানঃ আচ্ছা। চল মোহনা।

মোহনাঃ হুম

আয়ানের পাশের চেয়ারে তারাতারি যেয়েই আমি বসে পরলাম। মোহনা আপুকে এবারও বিশেষ ধরনের চমক দিলাম।

শখ কত! আমার জামাইর পাশে বসার।

এতদিন যত নষ্টামি করুক আয়ান। এখন আর কোনো সুযোগ দিচ্ছিনা।

গতকাল অবধি ভালো ছিলাম বাড়িত অতিথি ছিলো বলে।

আয়ান তাকিয়ে বললো,

এখনও ভাবনার জগতে যেতে হবে! আগে খেয়ে নাও তারপর যতখুশি ভাবতে থাকো।

আমিঃ হুহ

খাবারের একপর্যায়ে আয়ানের কথায় বিষম খেল আবির সাহেব।


পার্টঃ ১৪

আয়ানঃ আচ্ছা আব্বু, আমার দাদু বাড়িতে আমরা থাকিনা কেন!

আমার যতটুকু মনে পড়ে, দাদা বাড়ির সীমানায়ও পা রাখিনি কখনো।

আবির সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু না বলে মনমরা হয়ে উঠে গেলেন।

আয়ানঃ ভয় পাচ্ছো! যতবারই তোমার কাছে জানতে চেয়েছি ততবারই এড়িয়ে যাচ্ছো।

কি লুকাচ্ছো?

এমনকি আমার দাদা বাড়িতে কে কে আছে, সেটা পর্যন্ত জানিনা।

আবির সাহেবঃ দাদা নেই তোমার।

আয়ানঃ কাকা তো আছে।

আবির সাহেব আয়ানের কথা শুনে থমকে গেলেন। ছেলের মুখে নিজের নরপশু ভাইয়ের কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।

আয়ানঃ আব্বু! আগে যা কিছু হইছে তুমি শেয়ার করোনি কারো সাথে। কিন্তু এখন তোমার ছেলে বড় হইছে। তুমি চাইলে সবকিছুই বলতে পারো।

ছেলে বড় হলে বাবার শক্তি অনেকটা বেড়ে যায়, নিশ্চয় এ কথাটি তোমার অজানা নয়।

আবির সাহেব কিছু না বলে চলে গেলেন।

সবাই চুপচাপ হয়ে গেল।

কাকার কথা বলাতে এমন করছেন কেন! আবির সাহেব।

শাহিন আয়ানের কাঁধে হাত রাখলো, আয়ান কিছু না বলে হাত ধুয়ে উঠে গেলো।

সবাই যার যার মতো চলে গেল, কারো মুখে কোনো কথা নাই।

রুমে যেয়ে দেখি আয়ান গুটিশুটি দিয়ে বসে আছে। যতই হোক আমার একটামাত্র বজ্জাত স্বামী। এভাবে চুপচাপ থাকলে ভালো লাগেনা, তাছাড়া তার মনও ভালো নেই।

আমি পাশে যেয়ে বসা মাত্রই আমার কাঁধে মাথা রাখলো। কিন্তু তাকে এভাবে চুপচাপ থাকলে ভালো লাগেনা।

মুখ গোমড়া করে আছে পেঁচার মতো। “যাইহোক এভাবে একদম ভালো লাগছেনা। একটু রাগানো যাক।

আয়ান ভাইয়ায়ায়া!

তিনি মাথা তুলে ভুরু কুঁচকে তাকালো, কাটা জায়গায় লবন দেয়া যাকে বলে।

আমিঃ মন খারাপ করে আছেন কেন! একদম পেঁচার মতো লাগে।

আয়ানঃ কি বললে তুমি? তার আগে।

আমিঃ (মুখে হাত দিয়ে)। কই কিছু বলিনি।

ওরে বাপরে বাপ। গোমড়ামুখো থেকে ভালো করতে চাইছি। কিন্তু তার জন্য রাগাতে গেলাম কেন কত বুদ্ধিমতী মেয়ে আমি। নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল দিতে পারি।

কিন্তু আয়ান কিছু না বলে চলে গেল। বেশিই করে ফেলি আমি।

কতক্ষন হলো এখনো আয়ান বাসায় আসেনি। চিন্তিত হয়ে বসে আছেন আবির সাহেব। শর্মিলা বেগম আবির সাহেবের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। তিনি কখনোই আবির সাহেবের কাছে জানতে চায়নি। তিনি পরিবার থেকে আলাদা আছে কেন!

আবির সাহেবও কখনো বলেনি। কিন্তু আজকে তার সমস্ত চিন্তাভাবনায় কড়া নাড়ছে আয়ানের কথায়।

আবির সাহেব বলে দিলেই পারতেন। ছেলের চিন্তা করে আবির সাহেবের দিকে রাগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন শর্মিলা বেগম।

এমনকি আয়ানের মোবাইল বন্ধ। গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলো শাহিন ও নিবিড়।

কিন্তু যখন শুনতে পেল আয়ান সেই সকাল থেকে বাসায় নেই এখন প্রায় সন্ধ্যা। চিন্তিত হয়ে শাহিন ও নিবিড় আয়ানকে খোঁজার উদ্দেশ্যে দড়জা অবধি গেল।

তখনই দেখতে পেল আয়ান বাসায় আসছে। সাদা শার্ট রক্তে ভেঁজা। সবার সামনে আশা মাত্রই শর্মিলা বেগমের আগেই মোহনা দৌড়ে জরিয়ে ধরে হাউমাউ কাঁদা শুরু করলো।
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তব্ধ হয়ে আছেন।

আমি শর্মিলা আন্টির পাশে ছিলাম, যা ঘটলো সবকিছু চোখের সামনেই।

হাত-পা বরফের মতো হয়ে গেল। শুধু আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছি।

তার সাদা শার্ট যে রক্তে মাখা তার জন্য! নাকি শুধুই মোহনা আপুর জন্য।

ভালো বন্ধু হতে পারে তাই বলে এভাবে!

আয়ান মোহনাকে সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে আমার মনের মধ্যে কি চলছে।

কিছুক্ষনের জন্য নীরবতা পালন করছে সবাই। কিন্তু পরক্ষণেই শর্মিলা আন্টি আয়ানের কাছে যেয়ে কান্না শুরু করে দিলো।

আয়ানঃ আম্মু! এভাবে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই।

সরি তোমাদের এভাবে কষ্ট দেয়ার জন্য। আসলে আমার একটা বন্ধু মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করছে ওরে নিয়ে ব্যাস্ত ছিলাম। অন্যকোনো দিকে খেয়াল ছিলোনা। আর মোবাইলটাও কোথায় যেন পরে যায়।

শর্মিলা বেগম ঃ বোকা বানাচ্ছিস আমাদেরকে! (কান্না করে) এই যে রক্তমাখা শার্ট পরে আছো। (এখনো কান্না করে যাচ্ছেন)

আয়ানঃ পুরোনো ফ্রেন্ডরা আড্ডা দিচ্ছিলাম তখনই প্রলয় বাইক নিয়ে আসে। কিন্তু আমাদের কাছাকাছি আসা মাত্রই একটা অটোর সাথে ধাক্কা খায়।

মুহুর্তের মধ্যে কিভাবে কি হয়ে যায় বুঝতে পারিনা।

(বলেই আয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো)

আয়ান রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো। শর্মিলা আন্টি আমাকে তার সাথে আসতে বললেন, আমিও বাধ্য মেয়ের মত আয়ানের পিছন পিছন রুমে আসছি।

এখন আর কোনো ঝামেলা করতে চাইনা, এজান্নাততেই বন্ধুর জন্য কষ্ট পাচ্ছেন। আর আমি ওভাবে দুষ্টুমি না করলে হয়তো এভাবে রাগ করে যেতোনা।

রুমে আসা মাত্রই আয়ান দড়জা লাগিয়ে দিলো। এখন আর ভয় লাগছে না, তার মোহনা আছেই তো। তার যখন কাউকে জরিয়ে ধরতে ইচ্ছে করবে মোহনা তো আছেই।

আয়ানঃ সরি (মাথা নিচু করে)। এভাবে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।

আসলে মোবাইল কোথায় যে হারিয়ে যায় বুঝতে পারিনি।

(আমি ভাবছি মোহনার কথা বলবে, এখন দেখছি অন্য কথা। তার মনে হয় ভালোই লাগছিলো)

আমিঃ আচ্ছা ঠিক আছে। যা হবার হইছে, এখন ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিন। তার জন্য শার্ট বের করলাম। একবারের জন্যও তার দিকে তাকাইনি।

মেজাজই খারাপ হয়ে গেছিলো, বউ থাকা স্বত্তেও অন্য মেয়েরা এভাবে জরাজরি করবে আর তিনি হাসিমুখে চলে আসবেন।

থাকুক তিনি তার মতো, আমিও আমার মত থাকতে পারবো।

তিনি রক্তমাখা শার্ট পরা অবস্থায়ই আমার কাছে আসলেন।

আয়ানঃ রেগে আছো। (মাথা নিচু করে)

আমিঃ আমি রাগ করিনা। আর আপনি আমার সাথে এমন ব্যবহার করেননি যার জন্য রেগে থাকবো।

আয়ানঃ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আসলে তোমায় একবার ভাইয়া বলতে নিষেধ করছি, কিন্তু আবারও বলছো তাই রেগে চলে গেছিলাম। আমার রাগ উঠলে মাথা ঠিক থাকেনা, তাই আগে থেকেই সরে গেছি। নয়তো অজান্তে যদি কষ্ট দিয়ে ফেলতাম(মাথা নিচু করে)

আমিঃ বুঝতে পারছি। তার জন্যই হয়তো মোহনা আপু জরিয়ে ধরছে?

কারন, আমিতো কখনো এমন কিছু করিনি। (চোখে পানি টলমল করছে)

আয়ানঃ আ আ আসলে মোহনা এমনকিছু করবে ভাবতে পারিনি। তাছাড়া ও যে পরিবেশে বড় হইছে তার মধ্যে এটা কিছুই না।
তাই মন খারাপের কিছু নাই।

(আমার কাছে এসে কথা গুলো বললেন)

আমিঃ একদম কাছে আসবেন না।

আর এই রক্তমাখা শার্ট সরিয়ে ফেলুন ভয় লাগে।

বলেই বারান্দায় আসছি।

একটু পরেই তার ডাক পরলো। সবকিছু তো গুছিয়েই দিয়ে আসছি। তাহলে এখন আবার কি দরকার।

কিন্তু রুমে এসে দেখি বজ্জাত জামাই শুধু তাওয়ালে পরে চুল ঠিক করছে। লজ্জা বলতে কিছুই নেই তার বেশ বুঝতে পারছি।

এভাবে কেউ থাকে! তাও আমার মত একটা নিষ্পাপ মেয়ের সামনে।

আয়ানঃ মনে মনে ভেবেও কোনো কাজ নেই। সবকিছু বুঝতে পারি, কিছুদিন ছিলাম তো ভাবনার আম্মুর সাথে তাই তার মনের কথা পড়তে পারি।

আমি চোখ বড়বড় করে তাকালাম। তিনি হেসে বললেন।

এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি এজান্নাততেই সুন্দর, বলা তো যায়না কখন নজর লেগে যায়।

(তার মতিগতি বুঝা মুশকিল। এই অবস্থায়ও এভাবে কথা বলে যাচ্ছেন)

আমিঃ আপনার দিকে ওই ঘষেটি দের মতো তাকিয়ে থাকার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।

আমি তাকালে নজর লাগে আর তারা জরিয়ে ধরলে ভালো লাগে! তাইনা!

আয়ান আমার কাছে এগোতে এগোতে বলছেন।

কেন! তোমার হিংসে লাগে? নাকি কষ্ট লাগে? (হেসে)

আমিঃ হিংসে কষ্ট কিছুই লাগেনা। আর আমার কিছু দরকার নাই, হুহ!

আয়ানঃ আমার তো কষ্ট লাগে, বউ আমায় একটুও ভালোবাসেনা। অন্য মেয়েদেরকেও ভালোবাসতে দিচ্ছেনা।

আমিঃ কই আমি নিষেধ করছি নাকি? (রেগে)

যান না (অন্য মেয়েদের কথা বলছেন তিনি! তার মানে অন্য কেউ যা করুক তার ভালোই লাগে)

আয়ান আমার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন।

আচ্ছা! বউ সম্মতি দিছে যখন তাহলে তো কোনো বাঁধা নেই।

কথাটি শোনামাত্রই গলাটা চিপে ধরলাম। সাহস কত, আমিতো আবেগে বলছি কথাগুলো কিন্তু তিনি সত্যি ভাবলেন!

কিন্তু পরক্ষণেই ছেড়ে দিলাম।

আয়ানঃ ওরে গুন্ডি বউ আমার এভাবে কেউ স্বামীকে অত্যাচার করে! একটু হলেই তো উপরে পাঠিয়ে দিতে।

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

আয়ানঃ আচ্ছা সরি।

আমিঃ হুহ

আয়ানঃ সরি তো। এভাবে মন খারাপ করলে আমার ভালো লাগেনা।

তিনি আমার চুলগুলো কানে গুজে দিলেন। এবং কপালে ভালবাসার পরশ একেঁ দিলেন।

আবির সাহেব আয়ান মুখোমুখি বসে আছে।

আজকে ছেলের কাছে কিছুই গোপন রাখবেন না তিনি। শর্মিলা বেগমও পাশে আছেন।

আবির সাহেব কথাগুলো বলছেন আর চোখ দিয়ে নোনাজল পরছে।


পার্টঃ ১৫

আবির সাহেবঃ মা-বাবা, মামুন আর আমি এই চারজনকে নিয়ে খুব ভালোই দিনগুলো যাচ্ছিলো।

মামুন আমার যমজ বড় ভাই, তেমনই আমার খেলার সঙ্গীও। দুই ভাইয়ে ভাইয়ে খুব মিলেমিশে থাকতাম।

কিন্তু সব ভালো বেশি দিন থাকেনা ফাটল ধরবেই সেই সম্পর্কের মধ্যে।

আমাদেরও সেই একই অবস্থা হলো।

প্রাইমারী স্কুলে একই ক্লাসে ছিলাম আমরা। আমি লেখাপড়া নিয়ে ব্যাস্ত থাকতাম আর মামুন খেলাধুলা নিয়ে। পরিক্ষার রেজাল্টে আমি ফার্স্ট ছিলাম সবসময়। মামুন পাশ অবধি করতো না, কারন ও কখনো বইয়ের ধারে-কাছেই যেতোনা।

মা-বাবা রেজাল্টের জন্য আমায় ভালোবাসতেন কিন্তু মামুনকে যে ভালোবাসতো না এমনটিও নয়। শুধু রাগ দেখাতো, ধমকাতো যাতে ও একটু লেখাপড়ায় মন দেয়।

এভাবে প্রাইমারির, সময়টা কেটে যায় যখন নাইনে পড়ি তখন মামুন ওর বন্ধুদের সাথে মিশে অধিক বেমানান হয়।

ক্লাস নাইনে থেকেই সিগারেটের মধ্যে ডুবে থাকতো। এমনকি সারাক্ষন টাকার জন্যও মায়ের সাথে ঝগড়া করতো।

এসএসসি পরিক্ষার পরে মামুনের আরও পরিবর্তন ঘটে।

সারাক্ষন শুধু টাকা আর টাকা, বাবা সাধারণ একটা প্রাইমারির শিক্ষক ছিলেন। যা বেতন পেতেন তা দিয়ে লেখাপড়ার খরচ, বাবার ওষুধ এইসবেই অনেকটা টাকা খরচ হতো। কিন্তু মামুনকে যা পারতো বেশিই দিতো।

কিন্তু তাতেও যদি মামুন ভালো থাকতো তাহলে আমাদের কোনো কষ্টই লাগতো না।

ওর বন্ধুদের সাথে নোংরা কাজে লিপ্ত হইছে পর্যন্ত। নেশা করা, টাকার বিনিময়ে অন্যের সাথে মারামারির কাজে লিপ্ত হওয়া ওর পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি ভাইকে কয়েকবার নিষেধ করছি উল্টো আমায় মারছে, আর মা-বাবার কাছে আমার নামে বিচার দিতো। কিন্তু মা-বাবা ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করতো না। তারা জানেন আমি কিরকম ছিলাম।

তাই মামুন সবসময় আমাকে সবার সামনে খারাপ করে তুলে ধরার চেষ্টা করতো।

একদিন বাবার কাছে বিচার আসে মামুনের নামে। বাবা অনেক অপমানিত হন।

সেদিন বাড়িতে ফেরার পরে মামুনকে মারধর করেন বাবা। এক পর্যায়ে মামুন বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।

তিনি নিজেও একজন অসুস্থ বয়স্ক মানুষ ছিলেন তাই সহ্য করতে পারেননি চলে যান সবাইকে ছেড়ে।

মামুনের বয়স কম ছিলো কিন্তু ওর অত্যাচারের জন্য গ্রামের সবাই অশান্তিতে ছিলো। তাই বাধ্য হয়ে আর খুন করার জন্য মামুনকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।

বাবার মৃত্যুর ৩ দিন যেতে না যেতেই গ্রামের সবাই আমাদের বাড়িঘর ছেড়ে আসতে বলে। আমরা থাকলে নাকি মামুন আবার সেখানে যাবে। আর অকারণেই ঝামেলা বাঁধাবে।

আমরা যদি না থাকি তাহলে গ্রামবাসীরা নাকি মামুনকে গ্রামে উঠতে দিবেনা। যদি আমরা থাকি তাহলে মামুন ঝামেলা বেঁধে উঠবে।

তাই এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবার শেষ স্মৃতি থেকে চলে আসতে হয় গ্রাম ছেড়ে।

মা ও সঞ্চয়ের জমানো কিছুটা টাকা সাথে। ঢাকার শহর অচেনা রাস্তা কিছুই চিনিনা।

বাস টার্মিনালে বসে আছি মাকে সাথে নিয়ে। আমি না খেয়ে থাকতে পারবো কিন্তু মাকে তো খাবার দিতে হবে।

আমার লেখাপড়া না হয় শেষ হয়ে গেল এখন তো রোজগারের জন্য পা বাড়াতে হবে নয়তো খাবো কি! আর মাকেই বা উপোস রাখবো কিভাবে!

কোনোরকম একটা ভাড়া বস্তিতে উঠলাম কিন্তু মাস শেষে তো ভাড়া দিতে হবে। খাবার জোগাড় করতে হবে, তাই আমি কাজ খুঁজতে নামলাম।

মা অনেকবার নিষেধ করছিলো আমি শুনিনি।

আমার মা কম যায়না। মা হন তিনি সবার বড় জান্নাত। আমার সুখের কথা ভেবে তিনিও কাজ খুঁজে দিতে বললেন। যাদের সাথে কয়েকদিনেই পরিচয় হইছে তাদেরকে।

আমি সন্ধ্যায় হতাশ হয়ে ঘরে ফিরলাম কোথাও কোনো কাজ নাই। কাজ তো এতোটা সহজ কথা না। যে মুখ থেকে বললেই কাজ সামনে চলে আসবে।

ঘরের আসার পরে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মা হাসিখুশি আছে। আমি ঘরে আসামাত্রই আমাকে জরিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললেন।

আমাকে আর কাজ খুঁজতে হবেনা, তিনি কাজ পেয়েছেন।

এখন নাকি আমায় লেখাপড়ায় মনযোগী হতে হবে। তারপর অনেক বড় হবো।

মায়ের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাই। তিনি মুচকি হাসি দিয়ে বললেন আমার ছেলে বাংলাদেশের একজন সম্মানিত মানুষ হবে। তারপর আবার আমাকে জরিয়ে ধরলেন।

কিন্তু তার সেই হাসির আড়ালে যে কান্না লুকিয়ে ছিলো আমার চোখ এড়োয়নি।

তবুও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলাম না কারন মায়ের আদর পাচ্ছি তো। যেখানে কোনো অবহেলা নেই।

কিন্তু মা কি কাজ করবেন! এই শহরে কিছুই ভেবে পাচ্ছিনা।

সকালে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি আমি মায়ের কোলেই ঘুমিয়েছিলাম। মায়ের দিকে তাকানো মাত্রই মায়ের মুখে এক চিলতে হাসি দেয়। আমি মুগ্ধ নয়নে মায়ের পবিত্র ভালোবাসার হাসি দেখছি।

মা বলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই তোকে আবার কলেজে ভর্তি করবো।

তিনি একটা ছোট হাসি উপহার দিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে গেলেন। আমি স্তব্ধ হয়ে তখনও বসে রইলাম। দুই-তিন দিন পরে আমাকে একটা কলেজে ভর্তি করলেন।
অসময়ে! এখনো কলেজের ভর্তি চলছে তাই হয়তো সুযোগ পেয়েছিলাম আবার লেখাপড়ার।

আমাদের পাশের বাসায় এক আন্টি ছিলো (রসিবের নানি) সেই মুলত মাকে কাজ খুঁজে দিছিলো। ভালো সম্পর্ক ছিলো তার সাথেও। বলতে গেলে মা আর আন্টি(রসিবের নানি) বোনের মতো ছিলেন।

একদিন কলেজ থেকে ফিরে আসার পরে প্রায় দুই ঘন্টার মত অপেক্ষা করি কিন্তু মায়ের কোনো খোঁজ নেই। যেখানে মাকে প্রতিদিন আমি আসা মাত্রই দেখতে পেতাম।
ছুটে যাই আন্টির কাছে কিন্তু তিনি বলেন মা নাকি এখনো আসেনি।

তিনি আমাকে মা যেখানে কাজ করতেন সে বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু আফসোস মা নাকি অনেক আগেই বেরিয়ে গেছিলেন।

এত বড় শহর কোথায় খুঁজবো মাকে। ফুটপাতের রাস্তা ধরে হাঁটছি আমি আর আন্টি। আন্টির নাকি পানির তেষ্টা লাগছে তাই একটা চায়ের দোকানে যাই।

কত ভাগ্যবান ছেলে আমি, আমার মায়ের ছবি তুলে টিভিতে দেখাচ্ছে। মা রাস্তার পাশ ধরে আসার সময়ে নাকি গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়।

স্তব্ধ হয়ে রইলাম, আমার মাথার উপরে শেষ ছায়াও চলে গেল, আমার জান্নাত চলে গেল।

যে হাসপাতালে আছে সেখানে চলে গেলাম, যেয়ে দেখি আমার মা সাদা কাপড় জরিয়ে শুয়ে আছে।

বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হলো কিন্তু দাফনের পরেই আমাকে বাড়ি ছাড়তে হলো। নয়তো মামুন ঝামেলা করতে পারে, সন্দেহের বসে আমায় গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করলো সবাই।
চলে আসছি আবারো সেই বস্তিতে, যেখানে মায়ের শেষ স্মৃতি জরিয়ে আছে।

আন্টির ছেলে নেই নিজের ছেলের মতো আমার দায়িত্ব নিলেন। যদিও তার অহরহ ছিলোনা, আপুর(রসিবের মা) তার অবদানে কোনোরকমে ইন্টার শেষ করছি। যদিও তিনি লেখাপড়া করেননি কিন্তু একজন সত্যিকারের বোনের দায়িত্ব পালন করছে।

টিউশনি করি, ইন্টারের রেজাল্টও ভালো হয়। একটা পাব্লিক ভার্সিটিতে চান্স হয় নিজের টিউশনির টাকা দিয়েই চলতে পারতাম। সাথে আন্টিকেও সাহায্য করতাম।

ভার্সিটিতে নতুন পরিবেশ কিভাবে কি থাকবো বুঝতে পারিনা সারাক্ষন মনে হয় এখানেও হয়তো মামুনের মত কেউ থাকবে।

কিন্তু না ভালো খারাপ মিলিয়েই আমাদের সমাজ গঠিত। প্রথম দিনেই একজন বন্ধু পাই ইয়াসিন যে প্রতিটি পদক্ষেপে আমার সাথে ছিলো।

দিনগুলো যাচ্ছিলো ভালোই। ইয়াসিনের বিয়ে ঠিক হয় কিন্তু পরে জানতে পারি আমার বিয়েও ঠিক করছে ও। ওর বউয়ের বান্ধবী দুইজন একঘরে না থাকতে পারলেও দুই বন্ধু দুই বান্ধবীকে বিয়ে করি।

দিনগুলো সুখের যাচ্ছিলো, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি কিন্তু যারা অবদানে ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ আর বেঁচে ছিলোনা।

সুখের দিন আমার কপালে বেশি থাকেনা। আবারও প্রমান পেয়েছি তার।

তুই(আয়ান), জান্নাত আমাদের সাথে মেলায় ছিলি। এতবার ইয়াসিন আর আফসানাকে আসতে বলছিলাম ওরা আসলো না। আফসানার মাথা ব্যাথা ছিল তাই ইয়াসিনও আসেনি।
জান্নাত কান্না করছিলো তাই ওর জন্য আমরা আসতে বাধ্য হইছি।

মেলা থেকে যখন বাসায় যাই তখন দেখতে পাই দুইটা নিথর দেহ পরে আছে। ছুটে যাই কলিজার বন্ধুর কাছে।

তারমধ্যেই পুলিশ আসে আমার সামনে থেকে আমার কলিজার বন্ধুকে নিয়ে যায়। শত বাঁধা দিয়েও রাখতে পারিনি।

কিন্তু পুলিশ নাকি কোনো প্রমান পায়না। কে খুন করছে, কেন করছে তারা কিছু করেনা।

খুন হবে কিন্তু বিচার হয়না, আল্লাহর কাছে বিচার দেই। তিনিই একমাত্র ভরসা ছিলেন।

তোর(আয়ান) উপরে যাতে এসবের প্রভাব না পরে তাই বিদেশে পাঠিয়ে দেই। জান্নাতকে আমাদের কাছে রেখে দেই। আমি অফিসে কাজ করতাম তাই বাসার খোঁজ খবর তো আমার জানার কথা না। একদিন বাসায় ফিরে দেখি ছোট্ট মেয়েটি(জান্নাত) মন খারাপ করে বসে আছি। আমি শতবার জানতে চাইলেও কিছু বলেনা।

আমি আর জানার চেষ্টা করিনি, আমি ভাবি হয়তো মা-বাবার কথা মনে পড়েছে তাই মন খারাপ।

কিন্তু তা না। রাহিমা আসার পরেই খেয়াল করলাম ওর উপরে মানুষিক অত্যাচার বেড়েই যাচ্ছে। শর্মিলাকে যতবার বুঝিয়েছি ও বুঝার মতো অবস্থায় ছিলনা। (কথাটি শুনে শর্মিলা বেগমের মুখটি অন্ধকার হয়ে গেল)

অনেকবার রাহিমার হাসবেন্ডের কথা জিজ্ঞেস করছি ও বলছে হাসবেন্ড বিদেশে থাকে।

শর্মিলা জিজ্ঞেস করলে ও কিছু বলতে পারেনা কারন রাহিমা নিজে বিয়ে করছে।

একদিন অফিস থেকে একটা ডিল করার জন্য রেস্টুরেন্টে যাই। সেখানে যাওয়া মাত্রই চোখ আটকে যায় পাশে টেবিলে।

রাহিমা! আর পাশে আমারই নিজের ভাই মামুন। ওরা দেখার আগেই আমি অন্যদিকে সরে যাই।

অনেক খোঁজাখুঁজির পরে জানতে পারি রাহিমার হাসবেন্ডের নাম মামুন। তার মানে আমার ধারনাই ঠিক ছিলো।

বাসায় ফিরে যখন জান্নাত মায়ের মুখ দেখলাম আবারও মন খারাপ। আস্তে আস্তে মেয়েটি বড় হইছে এখন আমি কোথায় বা রাখবো ওকে। শহর ভালোনা, তাছাড়াও খুনের সাথে যে মামুন জরিত ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার। ওর কাছে এই বাচ্চা মেয়েটির ক্ষতি করা কোনো ব্যাপার না।

তাই অনেক বাঁধার সম্মুখীন হলেও জান্নাত মাকে আমার চোখে চোখে রাখি। আমার একমাত্র কলিজার বন্ধু ইয়াসিনের কলিজার টুকরো।

রসিবের সাথে কি ঘটছে তাও জানতে পারি, মামুন আর রাহিমাকেই দেখেছিল রসিব। কিন্তু আমি মামুনের ভয়ে কাউকে ওর কথা প্রকাশ করতে পারছিলাম না। তাহলে নাকি জান্নাতর ক্ষতি করবে। ও মুখে যা বলে তাই করে। তাই আমিও নিজেকে শক্ত রাখছি।

তুই যেদিন রসিবকে খোঁজার উদ্দেশ্যে গেলি আমিও গেছিলাম কিন্তু তুই তার আগেই ওকে সরিয়ে দিছো।

কিছু ঘটতে পারে মামুনের জন্য, তাই তোর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে জান্নাতর সাথেই বিয়ের তোর বিয়ের কথা সবাইকে জানিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি তোদের বিয়ে হয়ে গেছে।

যখন কথাটি শুনি আমার থেকে কেউ মনে হয়না যে বেশি খুশি ছিলো। ধুমধামে অনুষ্ঠান করি, কিন্তু হঠাৎই মামুনের কল আসে ছুটে যাই সেখানে।

ওর মেয়ে মিরা পাগলের মত হয়ে গেছিলো তোর বিয়ের কথা শুনে।

কিন্তু এখন ওর হাতে মরলেও আমার আফসোস থাকবেনা কারন আমার বন্ধু ইয়াসিনের শেষ ইচ্ছা আমি পূরণ করতে পারছি।

কথাগুলো বলে আবির সাহেব দীর্ঘশ্বাস নিলেন। কোনো কথা আর আজকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখেননি।

শর্মিলা বেগমের মনে তার ই করা অত্যাচার গুলো জেগে উঠলো। যা ভেবে ভেবে তিনি আফসোসে ভুগছেন।

আয়ান আবির সাহেবের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে ছিলো। যে বাবা কিনা আমার বা আমাদের ভালোর জন্য কতোকিছু করছেন।

নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা কত কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন তাকে আমরা ভুল বুঝছি।

এক পর্যায়ে আয়ান আবির সাহেবকে জরিয়ে ধরলো।

বাবা-ছেলের ভালোবাসা দেখে শর্মিলা বেগমের ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।

রাত ১২ টা….

আয়ান রুমে যেয়ে দেখে জান্নাত ঘুমিয়ে গেছে। আজকে আর জান্নাতকে রাগাতে ভালো লাগছেনা আয়ানের তাই নিজেও শুয়ে পরলো। আবির সাহেবের বলা কথাগুলো মনে পরছে আয়ানের।

আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম, ঘুম আসছেনা।

কিন্তু আয়ান আজকে আর কিছু বলছেনা।

তাই অপেক্ষায় রইলাম কখন বজ্জাত ঘুমিয়ে যাবে।

কিছুক্ষন পরে বুঝতে পারলাম সে ঘুমের রাজ্যে পারি দিছে তাই আমিও আমার স্থানে পারি জমালাম( আয়ানের বুকে)।

একদিনেই অভ্যাস হয়ে যায়! আসলে আমরা অভ্যাসের দাসত্ব করি। যা মন চায় তাই করি।

কিন্তু হঠাৎ মনে হলো দুটো হাত আমায় জরিয়ে আছে। পরক্ষণেই কানে ফিসফিস করে বললো।

বউ আমায় ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মুখ তুলে তাকিয়ে থতমত খেলাম।

এই বজ্জাত বেটা এখনও জেগে আছে!


পার্টঃ ১৬

আয়ানঃ ভাগ্যিস ঘুমাইনি। নয়তো এত সুন্দর মুহুর্ত দেখতে পারতাম না।

আমি তার কথা শুনে মাথাটা সরিয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু তা স্বপ্নই থেকে গেল।

আয়ানঃ কি! এখানে ভালোলাগছে না?

আমিঃ উহু

আয়ানঃ তো কোথায় যাচ্ছো! চুপচাপ শুয়ে থাকো।

একটু নড়াচড়া করলে কিন্তু ভাবনাকে আনবো। (হেসে)

এখন তোমার ইচ্ছা তুমি কি করবে।

আমিঃ এই কোন বজ্জাতের পাল্লায় পরলাম।

চুপচাপ তার কথামত শুয়ে রইলাম। নয়তো কি না কি করে বসে এর ঠিক নাই।

সকালে আবির সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে মনযোগ দিলেন।

আবির সাহেবের পাশেই অন্যরা বসে আড্ডা দিচ্ছিলো।

হঠাৎ আবির সাহেবের চোখ কপালে উঠার উপক্রম।

রাফাত! খবরের কাগজে বড় করে রাফাতের মুখটা দেখা যাচ্ছে। আর ছবির নিচেই লেখা ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করছে।

আবির সাহেবের বেহাল অবস্থা দেখে শর্মিলা বেগম তারাতারি কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলেন। কিন্তু তার অবস্থাও আবির সাহেবের মত, যতই হোক ছোট থেকে ছেলেটিকে দেখছে।
এভাবে জঘন্য কাজে যে লিপ্ত হবে এটা ভাবেনি।

আমিও পাশে ছিলাম। রাফাত ভাইয়ার কথাটি শুনে খারাপ লাগলেও সেদিনের কথা মনে পরলো।

আয়ান যদি না থাকতো তাহলে হয়তো আমারও আজকের মেয়েটির মত অবস্থা হত।

কিন্তু তার পাপের শাস্তি যেন তিনি পায়।

আয়ান, শাহিন ভাইয়া সকাল থেকে কই যেন গেছে আর মোহনা আপুকেও দেখছিনা। মনে হয় তাদের সাথেই আছে।

কিন্তু আয়ান! মোহনার সাথে থাকলে তো নির্ঘাত ওই মেয়ে কিছু করবে। কেমন ভাবে আয়ানের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

মনে চায় চোখ দুটো উঠিয়ে ফেলি। আর আমার বজ্জাত জামাই আছে তার তো ভালো লাগে।

কিন্তু আমাই তাকালেই তার উপর যত নজর পরে।

তাকাবোনা আমি। হুহ।

  • কার দিকে তাকাবেনা?

এতক্ষন রুমে পায়চারি করছিলাম আর কথাগুলো বলছিলাম। কিন্তু কারো কথা শুনে দড়জার দিকে তাকিয়ে দেখি আয়ান আসছে।

আপনি!

আয়ানঃ তো! অন্য কাউকে আশা করছিলে নাকি?

আমিঃ আপনার মত আমি না। হুহ…..!

সারাক্ষন অন্য মেয়ের সাথে ঢলাঢলি করবেন আর বউ তাকালেই আপনার উপর নজর পরবে।

আয়ানঃ কোন মেয়ে! (অবাক হয়ে)

আমিঃ এখন সাধু সাজলে কিছুই হবেনা। সকালে একবারের জন্যও বকে যাননি। আবার ওই মোহনা সারাক্ষন পিছুপিছু ঘুরবে। তার সাথে কিসের এত কথা?

আমি থাকলেই যে সব কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়!

আয়ানঃ কেন! হিংসে হয়? (হেসে)

আমিঃ সারাক্ষন ফাজলামি ভালো লাগেনা।

এরপরে যদি আর একবারো দেখি, তাহলে আপনার একদিন কি ওই মোহনার একদিন।

আয়ানঃ কেন কেন! মোহনার সাথে কথা বলবো না কেন! একশো বার বলবো। (হেসে)

আমিঃ কিইইইই(রেগে)। থাক তোর মোহনা নিয়ে, আমি থাকবোনা।

আয়ানঃ মোহনা আমার ভালো বন্ধু হয়। ওর সাথে কথা বলবোনা বলো?

তাছাড়া আমাদের বাসার গেস্ট।

আচ্ছা ঠিক আছে। এভাবে কান্না করোনা প্লিজ (হাত আয়ানের হাতের মুঠোয় নিয়ে)

মোহনা একটা কাজের জন্য আসছে তোমাকে সাহায্য করার জন্য। তারপরেই চলে যাবে।

তাছাড়াও ও আমাদের বাড়ির গেস্ট, আর গেস্টদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হয়।

আমিঃ গেস্টদের সাথে জরাজরি করে মানুষ?

এবার থেকে যে ছেলে আসবে আমিও জরাজরি করে গেস্টদের সাথে ভালো ব্যবহার করবো। (মুখ ভেঙিয়ে)

আয়ান মুখ হা করে তাকিয়ে আছে জান্নাতর বোকাবোকা কথা শুনে। ও হাসবে নাকি কান্না করবে কনফিউজড।

অতঃপর বলেই ফেললো,

অন্য কোনো ছেলের নাম মুখে আনলেও মেরে ফেলবো(দাঁতে দাঁত চেপে)

আমিঃ নিজে মেয়েদের নাম তো দুরের কথা বউয়ের সামনে চুমু খেতে পারেন, জরাজরি করতে পারেন। তাতে কোনো দোষ হয়না! (চোখ রাঙিয়ে)

আয়ানঃ (ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পরার অবস্থা। এসব আবার কখন করলো কিন্তু পরক্ষণেই মনে পরলো মিরা চুমু খেয়েছিলো আর মোহনা জরিয়ে ধরছে) তাই জান্নাতকে ক্ষেপানোর জন্য আয়ান বললো।

হ্যা। বউ (আর কিছু বলতে দিলোনা তার আগেই জান্নাত মুখে হাত দিয়ে বন্ধ করে দিলো)

আয়ানঃ উম্মম

আমি হাত সরিয়ে অন্যদিকে ফিরে বসে রইলাম। বজ্জাত জামাই বউ রেখে অন্য মেয়েদের কথা বলছে!

থাকুক সে তার মতো।

আয়ান জান্নাতর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো। তারপর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

অন্য মেয়েদের পাশে দেখলে রাগ করে! অথচ নিজেও কাছে নেয়না।

তাই আয়ান অন্য কিছু ভেবে হাসি দিলো।

আয়ান আমার সামনে আসেনি একবারের জন্যও। বুঝে গেছি, আমায় আর দরকার নেই তার।

রাতে আয়ান রুমে এসে একপাশ হয়ে শুয়ে রইলো। একবারের জন্য আমার দিকে তাকালোও না। আজকে আর গতকালকে মত ভুল করবোনা। হুহ!

তার মোহনা আছে, আমায় তো আর লাগেনা।

আমি এপাশ-ওপাশ ফিরছি কিন্তু তিনি একবারের জন্যও আমার দিকে তাকালেন না।

আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু উঠবো যে তেমন কোনো শক্তি নেই। কারন দুইটা হাত আমায় জরিয়ে আছে।

মিন্নিকন্ডা, ইদুর, টিকটিকি, কুমির রাতে আমার দিকে একবারের জন্যও তাকালো না। কিন্তু এখন দিব্যি আমায় জরিয়ে ঘুমানো হচ্ছে!

আমি উঠবো তখনই তার মায়াবী মুখের দিকে চোখ পরলো। আবারও ক্রাশ খেলাম কিন্তু কিছু করার নাই আমি তো রাগ করছি তার সাথে।

তাই নিজেকে সামলে তার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ একেঁ দিলাম।

উঠুন, নামাজের সময় হইছে।

আয়ানঃ উম্মম। ঘুমাতে দাও

আমিঃ এখন নামাজের সময় হইছে, নামাজ আদায় করে যত ইচ্ছা ঘুমান।

উঠুন।

আয়ানঃ ( চোখ মেলে) উঠবো। কিন্তু শর্ত আছে। তাহলে ভদ্র ছেলের মত মসজিদে যাবো।

আমিঃ ঠিক আছে আমি রাজি। তবুও নামাজে যাবেন।

আয়ানঃ এই যে একটু আগে লুকিয়ে লুকিয়ে কি যেন দিছিলে। আবার দাও(মুচকি হেসে)

আমিঃ কিইইইই(চোখ বড়বড় করে)। আপনি সজাগ ছিলেন?

আয়ানঃ ছিলাম তো। সজাগ না থাকলে এত সুন্দর মুহূর্ত মিস করতাম।

আমিঃ নামাজে যাবেন। তারজন্য উঠতে বলেছি সেখানেও লুচুগিরি শুরু করছেন?

তাছাড়া আপনি আমায় জরিয়ে ঘুমিয়েছিলেন কেন শুনি?

রাতে তো বেশ একাএকা ছিলেন(মন খারাপ করে)

আয়ানঃ ওরে বউ আমার অভিমান করছে(হেসে)।

কে বলছে আমি একাএকা ছিলাম! হুম্মম্ম?

আমিতো আমার বউয়ের সাথেই ছিলাম। কিন্তু বউ ঘুমে বিভোর ছিলো তাই বুঝতে পারেনি।

আমিঃ এখন বানিয়ে বানিয়ে কোনো কথা বললেও বিশ্বাস করছিনা। ইগ্নোর করছেন আমায়।

কালকে আপনি আমার সামনেও আসেননি।

আয়ানঃ ভাবনার আম্মু! (করুন ভাবে তাকিয়ে)

একটা কাজে ব্যাস্ত ছিলাম তাই আসতে পারিনি।

আর রাতে যখন বাসায় আসছি তখম দেখি তুমি শুয়ে আছো তাই আর ডিস্টার্ব করিনি।

আমিঃ কাজ তো সবসময় থাকে মোহনার সাথে।

আমি তো কেউ না তাই আমাকে বলারও প্রয়োজন মনে করেননি।

বলেই উঠে পরলাম।

আয়ানঃ আরে আরেহ কই যাচ্ছো!

কথা ছিলো কি?

আমিঃ মোহনা আছে তো তার কাছে যাবেন।

আয়ানঃ এসবের জন্য!

আমিঃ যাবেন কিনা মসজিদে! (চোখ রাঙিয়ে)

আয়ানঃ হ্যা যাবোতো।

মসজিদ থেকে এসে তিনি আবার শুয়ে পরলেন।

আমি পাশে বসে ম্যাগাজিন পড়ছি।

হঠাৎই তিনি আমার হাত থেকে ম্যাগাজিন কেড়ে নিলেন।

আশ্চর্য! আমি যা করি তাতেই তার অশান্তি।

যত্তসব তেলাপোকা।

আয়ানঃ (কথা শুনে হা করে তাকিয়ে আছে)

আমিঃ এভাবে হা করে থাকলে সত্যি সত্যিই তেলাপোকা যাবে মুখে।


পার্টঃ ১৭

আয়ানঃ তুমি তো মিসেস. তেলাপোকা হয়ে যাবে।

আমিঃ ওরেহ বাটপার। একদম আমাকে জরাবেন না।

আপনার অন্য যারা যারা আছে তাদেরকে মিসেস. তেলাপোকা, টিকটিকি, গিরগিটি, কুমির, এলিয়েন। আর আর (মুখে এক আঙুল দিয়ে ভাবছি)

আয়ানঃ আরও বাকি আছে? (অবাক হয়ে)

আমিঃ হ্যা অনেক নাম আছে। কিন্তু এখন মনে পড়ছে না। যখন পড়বে তখন বলে দিবো।

আয়ান কথা শুনে ঘরবাড়ি ছেড়ে হিমালয়ে যেয়ে সন্ন্যাসী হবার অবস্থায়।

আমিঃ এভাবে সন্ন্যাসগিরি দেখালে কিছু হবেনা। আমি সত্যি কথাই বলছি মি. লাল ইদুর।

আয়ানঃ লাল ইদুঁর! (অবাক হয়ে)

আমিঃ হ্যা! লাল ইদুঁর। ওই যে ছোট ছোট ইদুঁরের বাচ্চা।

একদম না জানার ভান ধরবেননা জিরাফ কোথাকার।

আয়ানঃ সব চিড়িয়াখানার আত্নীয়-স্বজন কি আমাদের বাসায়! (আমতাআমতা করর বললো। কারন, এখন যদি অন্য কিছু বলে তাহলে নেহাত আরো আজগুবি নাম শোনা লাগবে)

আমিঃ আপনিই তো আস্ত চিড়িয়াখানা।

আয়ানঃ কিইইইইইই। (চোখ বড়বড় করে)

আমিঃ কেন! কানে কম শুনেন নাকি! আপনাকেই বলছি। এভাবে চিল্লানোর কিছু নাই।

আয়ানঃ এই তোমার ম্যাগাজিন। কান ধরলাম আর কখনোই এভাবে কেড়ে নিবোনা।

আমিঃ বাহ! বুদ্ধি আছে তাহলে!

আয়ানঃ আমার মাথায় কি বুদ্ধি ছিলোনা!

আমিঃ যখন আমার থেকে ম্যাগাজিন কেড়ে নিছেন তখন তো ভাবছি পুরাই হানির মত।

কিন্তু এখন আমার ম্যাগাজিন আমায় দিছেন তাই ভাবছি একটু হলেও বুদ্ধি আছে।

আয়ানঃ এই হানি টা কে আবার! (আমতাআমতা করে)

আমিঃ এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনার মত আমার এত বাবুসোনা নাই।

এটা কার্টুনের হানির কথা বলছি।

আয়ানঃ আমার আবার কখন বাবুসোনা ছিলো। (অবাক হয়ে)

আমিঃ আবারও সন্ন্যাসগিরি শুরু করছেন!

আয়ান বেবী আয়ান বেবী যখন ডাকতো তখন তো বেশ মজা নিতেন। এখন ভুলে গেলে হয়! ভাবনার আব্বু।

( কথাটি বলেই জিহবায় কামড় দিলাম) কথার শেষে মনে পড়ছে আমি কি বলছি।

আয়ানঃ (হোহো করে হেসে দিলো)

অবশেষে বউ ভাবনার আব্বু ভাবলো আমায় (চোখ টিপ দিয়ে)।

আমিঃ কেন! অন্য কেউ ভাববে?(নিজের পায়ে যখন নিজেই কুড়োল মারলাম। তাই এড়িয়ে তো আর যাওয়া যায়না)

আয়ানঃ (থতমত খেয়ে) অন্য কেউ কেন ভাববে বউ।

আমিঃ বউ ডাকবেন না একদম আমায়।

আয়ানঃ আচ্ছা ভাবনার আম্মু।

আমিঃ ওই মিয়া আমি কিছু হইনা আপনার(রেগে)।

অন্য অনেকে আছে তাদের সবরকম আত্নীয়-স্বজন বানিয়ে গেষ্ট সেবা করুন।

আয়ানঃ …

তুমিই তো ভাবনার আম্মু। আমি যখন একবার ঠিক করছি তো তুমিই ভাবনার আম্মু হবে।

অন্য কেউ না বউউউউউউউউউউ।

আমিঃ কান আমার ঝালাপালা হয়ে গেল এই বজ্জাতের জ্বালায়।

এত জোরে চিল্লান কেন!

আয়ানঃ তো কি করবো বউ।

তুমি তো শুনছোইনা আমার কথা।

আমিঃ মাফ চাই ক্ষেমা দেন।

আমি ভাবনার আম্মু তবুও এত জোরে চিল্লাচিল্লি করবেন না। সবাই বাসায় আছে এজান্নাততেই। (করুন ভাবে)

আয়ানঃ ভাবনার আম্মু!

কি আনন্দ লাগছে শেষমেশ ভাবনার আব্বু তো হতে পারলাম।

দড়জা ঠোকার শব্দ পেয়ে।

আমিঃ ভাবনার আত্নীয়-স্বজন আসছে মনে হয়। শুধু শুধু আমার কান ঝালাপালা করবেন না এখন।

বলেই আমি দড়জা খুলতে গেলাম।

আয়ানঃ আচ্ছা ভাবনার আম্মু।

দুজনে দুজনার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। শর্মিলা আন্টি এই বজ্জাতের কথা শুনতে পেল। আল্লাহ জানে এখন কোন অবস্থায় পরতে হয় আমার।

এমন একটা বজ্জাত কেন আমার কপালে পরলো।

আয়ান মিটমিট করে হাসছে।

শর্মিলা আন্টি রুমে ঢুকে আমাদের দুজনের দিকেই তাকাচ্ছে।

কিছুক্ষন পর্যবেক্ষণ করে আন্টি বললেন।

ব্রেকফাস্ট এর সময় হইছে।

আমিঃ জ্বী আন্টি আসছি। (আমতাআমতা করে বললাম)

আজকে আন্টি যদি কিছু শুনে ফেলেন তো আমি শেষ।

রক্ষা করো, রক্ষা করো। (মনে মনে)

আন্টি দড়জার কাছে যেয়ে আবার আমার দিকে একবার তাকালেন। আর মুচকি হাসি দিলেন।

তার হাসির আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না।

আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখি সেও মিটমিট করে হাসছে।

আজকে মনে হয় আমি শেষ।

এবার মনে হয় সত্যি সত্যিই এক গ্লাস পানিতে ডুব দিয়ে তিন ঘন্টা জ্ঞান হারাতে হবে।

ও বউউউউউউ

আমিঃ আবারো চিল্লানো শুরু করছেন(চোখ রাঙিয়ে)। আজকে যদি উল্টাপাল্টা কিছু হইছেনা বাসায়! তাহলে আপনার একদিন কি আমার দশদিন।

কথাগুলো বলেই আমি নিচে আসলাম।

আর বজ্জাত জামাইকেও আসতে বললাম।

নিচে আসা মাত্রই সবাই আমার দিকে অন্যরকম ভাবে তাকাচ্ছে।

শর্মিলা আন্টিঃ আরে মা! তুই নিচে আসলি কেন!

আমি ভুলে গেছিলাম যে তোকে নিচে আসতে বারন করবো।

সবকিছু গুছিয়ে রাখছি উপরেই খাবার দিয়ে আসতাম এখন।

আমিঃ কেন আন্টি! আমার হাত-পা সবকিছুই তো ঠিক আছে।

নিচে আসতে পারবোনা কেন! (অবাক হয়ে)

শর্মিলা আন্টিঃ এত কিছু ভাবতে হবেনা। বড়দের কথা শুনতে হবে এখন থেকে।

শর্মিলা আন্টি আমার কপালে চুমু খেয়ে, আয়ানকে ধমক দিলেন।

অসুস্থ মেয়েটাকে একাএকা নিচে আসতে দিলি (রেগে) এতদিন সব বাদরামো সহ্য করছি। এখন থেকে কোনো কথা শুনছিনা।

আয়ানঃ আমি কি করলাম! আর কে অসুস্থ! কখন অসুস্থ হলো। (অবাক হয়ে তাকিয়ে)

শর্মিলা আন্টিঃ চুপ কর। (ধমক দিয়ে)

এই অসুস্থ মেয়েটি একা নিচে আসছে। যদি পরে যেত! তাহলে তো সবকিছু শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে যেত।

আয়ানঃ আরে আরেহ! এ অসুস্থ কখন হলো। একটু আগেই তো ভালো ছিলো।

আর পরে যাবে কেন!

সিঁড়ি ভয় পায় একে। তাই পরে যাবার আগেই সিঁড়ি ভয়ে ধরে ফেলবে। পরে যাবার কোনো প্রশ্নই উঠেনা।

শর্মিলা আন্টিঃ আবার ফাজলামো শুরু করছো (রেগে)।

আয়ানঃ …

আমি এতক্ষন তাদের কথাগুলো শুনছিলাম। আমিতো একদম ঠিক আছি। অসুস্থ কিভাবে হলাম।

যাইহোক, শর্মিলা আন্টির ধমক খেয়ে আয়ানের মুখটা দেখার মত ছিলো। কিন্তু নিজের হাসিকে মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে চুপচাপ শান্ত হয়ে রইলাম।

এই সিমিরাস মুহুর্তে হাসলে শর্মিলা আন্টি বেশ ক্ষেপে যাবেন।

শর্মিলা আন্টিঃ এত কি ভাবছিস।

আমি খাইয়ে দিচ্ছি!

আমি অবাক হয়ে আছি। আমি তো পুরাই ঠিক আছি৷ সিঁড়ি থেকে নামতে পারবোনা। আবার খাইয়েও দিচ্ছে।

কি হচ্ছে ব্যাপারটা!

চারপাশে তাকিয়ে দেখি সবাই মিটমিট করে হাসছে। শুধু মোহনা আপু বাদে।

আমিও আর কিছু না ভেবে আন্টির হাতেই যত্নসহকারে খেতে নিলাম। কিন্তু এত খাবার কে খাবে! আমি তো পারবোনা।

অনেক ভয়ে ভয়ে আন্টিকে বললাম। কিন্তু খাবারের সাথে ধমকও খেলাম।

আন্টি এখন খেতে পারবোনা। তাহলেই বমি দিয়ে দিবো।

শর্মিলা আন্টিঃ এসময়ে বমি হবেই খেয়ে নে।

আমিঃ পরিমানের থেকে বেশি খেলে তো বমি হবেই। তাই তো আমি খেতে চাচ্ছিনা।

শর্মিলাঃ আবার পাকনামো! (চোখ রাঙিয়ে)

আমি করুনভাবে তাকালাম।

শর্মিলা আন্টিঃ আচ্ছা ঠিক আছে। একটু পরে খেয়ে নিবি আবার।

এখন শান্তি খাওয়া থেকে তো বাচলাম।

কিন্তু এ কি হচ্ছে আজকে! আবির আংকেল মিষ্টির বন্যা বসিয়ে দিচ্ছেন।

আজকে কি কোনো অনুষ্ঠান! কিছু তো শুনলাম না।

শর্মিলা আন্টি মিষ্টির প্যাকেট থেকে মিষ্টি এনেই আমার মুখের সামনে ধরলেন।

আমি কিছু বলার আগেই শর্মিলা আন্টি আমার মুখে পুরা একটা মিষ্টি দিয়ে দিলেন।

আয়ানের অবস্থাও আমার মতোই হলো, কিন্তু শর্মিলা আন্টির ধমকের কারনে তিনি মিষ্টি খেতে বাধ্য হলেন।

কি হচ্ছে আজকে! সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।

শাহিন ও নিবিড় ভাইয়া আয়ানের কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে কি যেন বললেন।

পরক্ষণেই আয়ান আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হেসে একটা চোখ টিপ দিলেন।

শর্মিলা আন্টি ও মিন্নি আপু আমাকে রুমে দিয়ে গেলেন। সাথে মোহনা আপুওছিলো। আমি নাকি একা আসতে পারবোনা। মোহনা আপু মুখ গোমড়া করে আছেন।

শর্মিলা আন্টি চলে যাবার পরে মিন্নি আপু যা বললেন। তার কথা শুনে আমার মঙ্গল গ্রহে যেয়ে একাএকা থাকতে ইচ্ছা করছে।

এই বজ্জাতটির জন্য আজকে আমার এই বেহাল অবস্থা।


পার্টঃ ১৮/ শেষ পর্ব

মিন্নি আপুর কথা শুনে আমার মঙ্গল গ্রহে যেয়ে একা একা থাকতে ইচ্ছা করছে। এই বজ্জাতের জন্য আমার আজকে এত বেহাল অবস্থায় পরতে হইছে।

এখন আমার কি হবে!

মিন্নি আপুঃ কি আর হবে! যা হবার হয়ে গেছে(হেসে হেসে)

মোহনা আপু চিন্তাভরা মুখমণ্ডল নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

কিন্তু এখন নিজের চিন্তাতেই বিভোর আমি তাই তার কথা না হয় পরেই ভাবা যাবে।

মিন্নিঃ আবার ভাবনার জগতে ডুব দিলে! ভাবনার আম্মু। (হেসে হেসে)

তার কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরার অবস্থা। এসব মিন্নি আপু কিভাবে জানলো! ভাবনার আম্মু তো শুধু আয়ানই ডাকে।

মনে হয় মি. তেলাপোকা সবকিছু বলে দিছে।

বজ্জাত বজ্জাতই থাকে কখনো ভালো হয়না।

মিন্নিঃ আয়ান শুধু শুধু ভাবনার আম্মু রাখেনি। সারাক্ষন ভাবনার জগতে মগ্ন থাকো।

এই মোহনা! তুইও আবার ভাবনার জগতে পারি জমালি!

মোহনাঃ উহুহুম্মম্ম

আসলে ভাবনার খালাজান্নাত হবো তো তাই ভাবনার জগতে পারি জমালাম একটু।

মিন্নিঃ তুইও শুরু করছিস আবার(চোখ রাঙিয়ে)

মোহনা ঃ তো কি করবো এখন!

আমি জানি তোমাদের মধ্যে এমন কিছুই হয়নি এখনো(আমাকে উদ্দেশ্য করে)।

দুই-তিন দিন থেকে তুমি একঘেয়ে হয়ে থাকতে। আর গতকালকে রাতে যখন বাসায় ফিরলাম আন্টি বললেন ঘরে নাকি নতুন কোনো অতিথি আসতে পারে। প্রথমে বুঝিনি, তারপরে আন্টির ভাবসাব দেখে কিছুটা হলেও বুঝতে পারলাম। ডিটেকটিভ অফিসার তো এজান্নাত এজান্নাত হইনি।

আমি মোহনা আপুর কথা শুনে হা করে তাকিয়ে রইলাম। ডিটেকটিভ অফিসার!

মোহনা আপু আমার অবাক হওয়া দেখে হেসে আমার নাক টেনে হেসে দিলেন।

মোহনাঃ জ্বি ভাবনার আম্মু।

একটা কাজের জন্য আসছি কাজ টা শেষ এখন চলে যাবো।

প্রথম থেকেই আয়ানের সাথে এভাবে চলাফেরা করছি সবকিছুই আয়ানের কথায়।

ও দেখতে চাইছিলো অন্য মেয়েদের সাথে যদি তুমি দেখো তাহলে কেমন আচরন করবে।

তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওর কথা শুনতে হইছে আমার ছোট্ট বোনকে কষ্ট দিয়ে।

এখন আয়ানকে শাস্তি দেয়ার ব্যাপার তোমার আমি তো সত্যিটা বলেই দিলাম।

কিন্তু শর্মিলা আন্টির কথাও ভেবো। অনেক আশা নিয়ে আছেন তিনি।

গতকালকে যে কাজের জন্য এসেছি সবকিছু গুছিয়ে যখন রাতে বাসায় ফিরলাম তখন আয়ান, আমি, শাহিন সবাই একটু ক্লান্ত ছিলাম।

কিন্তু শর্মিলা আন্টি কিছু না ভেবেই বলা শুরু করছে।

আয়ান যেন এখন তোমায় জ্বালাতন না করে।

ঘরে নাকি নতুন অতিথি আসছে। তাই তোমার দিকে খেয়াল রাখতে বলছে।

দুই-তিন যাবৎ নাকি তিনি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন।

মাথা ব্যাথা, কিছু খেলেই নাকি বমি দাও, তারপরে শরীর দুর্বল থাকে। নিজেকে ঘরেই বন্দী করে রাখো, লজ্জায় নাকি কারো সামনে যাওনা এইসব (হেসে হেসে কথাগুলো বললেন মোহনা আপু সাথে মিন্নি আপু হাসছেন)

তাদের কথা শুনে আমি এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে পরিভ্রমণ করছি।

আমিতো ওই তেলাপোকার জন্য মেজাজ খারাপ করে কারো সামনে যেতাম না। কি না কি বলে দেই নিজেরই হুশ থাকবেনা। তাই একঘেয়ে হয়ে থেকেছি।

মাথা ব্যাথা তো যে কারোই থাকতে পারে, আর আমার এজান্নাততেই একটা খারাপ অভ্যাস আছে কোনোকিছু ইচ্ছার বিরুদ্ধে খেলেই বমি দেই।

তাহলে শরীর তো দুর্বল থাকবেই।

মোহনাঃ এগুলো তো তুমি জানো আর আমরা জানি।

শর্মিলা আন্টি বুঝবে বলো!

সে তো সকাল থেকেই নতুন অতিথির জন্য বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছে।

এখন সে যদি জানতে পারে তার সবকিছুই মিথ্যা তাহলে তার মনের অবস্থাটা কি হতে পারে একবার ভাবছো?

আর আবির আংকেল!

তার সম্পর্কে কিছু জানো!

সে এমন একজন মানুষ যে সবকিছু হারিয়েও সবার সাথে হাসিমুখে থাকে।

সে এমন একজন মানুষ দিনভর চেষ্টা করে গেছেন তোমার বাবা আর আবির আংকেলের কলিজার বন্ধুর খুনির বিচারের জন্য।

হোক না তার ভাই, তবুও একবারের জন্য পিছুপা হননি যখন তার ভাই তার হাত-পা ধরে ক্ষমা চেয়েছিলো। নিজ হাতে নিজের ভাইকে পুলিশের কাছে তুলে দেন তিনি।

এখন সবকিছু হারিয়ে যখন নতুনভাবে কোনো আশার আলো দেখতে পেল তখন তাকে আর কে পায়! সকাল থেকেই শর্মিলা আন্টির মতোই পাগলামো করে যাচ্ছেন। নতুন অতিথি আসবে তিনি খেলা করবেন।

এখন যদি কোনোভাবে জানতে পারে সবকিছুই মিথ্যা শুনছে তখন মনের অবস্থা কি হবে!

আর তুমি আমায় খারাপও ভাবতে পারো। বিশ্বাস করো আমি সেরকম মেয়ে নই।

অনেককিছু বলে ফেললাম বোন। ভুল হলে মাফ করে দিও। আমি শুধু সত্যিটিই তুলে ধরছি। যা এখনো সংশোধন করা যাবে। সবকিছুই তোমার হাতে। আয়ান এমন ছেলে না, যে তোমাকে কোনো ব্যাপারে জোর করবে।

আমরা ওর ভালো বন্ধু, আর এই কথাটি নিশ্চয়ই জানা আছে বন্ধুদের থেকে বন্ধুর কথা কেউ বেশি জানেনা।

আমি একটু পরেই চলে যাবো মা অসুস্থ হয়ে পরছে তার জন্য।

তাই সবকিছু আজকেই বলে দিলাম। নয়তো সামনে ভুল কিছু হতে পারে।

নিজের খেয়াল রাখতে বলছিনা। শুধু আয়ানের ভাবনার ও ভাবনার আম্মুর খেয়াল রেখো।

এতক্ষন মোহনা আপুর কথাগুলো শুনছিলাম। সত্যিই তো সবকিছু অনেক গভীরে চলে যেতে পারে একটা ভুল বোঝার জন্য।

কিন্তু বাবার খুনি! এটা কে হতে পারে।

আবির আংকেলের ভাই আছে! কই কখনো তো শুনিনি।

আর তিনি কেনই বা খুন করবে সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে।

মোহনা আপু ও মিন্নি আপু চলে গেলেন।

একটু পরেই আয়ান রুমে আসলো। তিনি রুমে এসে চোরের মত তাকালেন আমার দিকে। আমার অবস্থা বুঝতে পারছেন হয়তো।

সবকিছু এই বজ্জাতের জন্য হইছে এখন।

কি দরকার ছিলো মোহনা আপুর সাথে বুদ্ধি পাকানোর! তাহলে আমি ভুল বুঝতাম না আর মন খারাপও থাকতোনা। তাহলে তো দিব্যি ভালোই থাকতাম। তাহলে তো আন্টি ভাবতো আমি ভালো আছি।

আর এই মি. তেলাপোকা কি করলো! সবকিছু বেহেশতে দিলো আমার।

এমনকি যেটুকু বাকি ছিলো সকালে ষোলো কলা পূর্ণ করছে।

জোরে জোরে বলার কি এমন দরকার ছিলো! ভাবনার আম্মু তারপরে নিজে ভাবনার আব্বু হচ্ছে।

আন্টি তো সবকিছুই শুনছে তাই তিনি সত্যিই ভাবছেন কেউ আসছে।

কেউ কিভাবে আসবে! ধুর ভাল্লাগেনা কিছু।

এখন ইচ্ছা করছে এর মাথাটা খেয়ে ফেলতে পারি তাহলে যদি একটু শান্তি পাই।

আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখি সে করুনভাবে তাকিয়ে আছেন।

এটা সত্যি সত্যিই একটা আস্ত তেলাপোকা। শুধু শুধু মানুষ হয়রানি করাবে।

তার জন্য আজকে আমার এই বেহাল অবস্থা। এখন কি করবো!

আয়ানঃ আয়ান কনফিউজড হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছেনা।

নতুন অতিথি আসবে! এসব ভেবেই হাসি পাচ্ছে ওর। যেখানে কোনো সম্পর্কই গড়ে উঠেনি তেমনভাবে।

কিন্তু যদি সত্যি কথাটা ওর মা জানতে পারে তখন!

কথাটা ভেবেই আয়ানের ভিতরটা অস্থিরতায় ভরে উঠছে।

আয়ান চুপচাপ যেয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লো। এখন দুষ্টুমি করলে যে ওর ঘরবাড়ি ছেড়ে হিমালয়ে যেতে হবে তা বেশ বুঝতে পারছে।

তার এমন শান্তভাবে থাকা আমার মোটেই ভালোলাগছে না। এজান্নাততেই চিন্তায় মরে যাওয়ার অবস্থা এখন যদি তাকে এভাবে ভদ্র ভাবে দেখি তাহলে ভয় কাজ করে।
ভূতে ধরলো কিনা।

কারন, যে মানুষটি সারাক্ষন লেগে থাকবে সে এখন এত চুপচাপ এটা মানা যায়না।

আমি যেয়েই ল্যাপটপ টা রেখে দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে তাকালেন।

আমি কিছু না বলে দড়জার উদ্দেশ্যে গেলাম কারন, এখন নিচে যেয়ে টিভি দেখবো।

তখনই আয়ান আমার হাত ধরে টান দিলো আমি সাথে সাথে বলে উঠলাম।

আমি অসুস্থ এভাবে কেউ কারো হাত ধরে! যদি কিছু হয়ে যেত!

আমার কথা শুনে আয়ান হোহো করে হেসে দিলো।

বুঝলাম না এখানে হাসির কি আছে। আমি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। তিনি এখনো হেসে যাচ্ছে।

পরক্ষণেই তার হাসির কারন বুঝতে পারলাম। হায় আল্লাহ! আমি শর্মিলা আন্টির কথা ভাবতে ভাবতে সেগুলোকেই ঠিক মনে রাখলাম!

আয়ানঃ সরি সরি ভুলে গেছিলাম যে আমার বউ অসুস্থ। (হেসে)

ও বউ!

ভাবনা কবে আসছে! (চোখ টিপ দিয়ে)

আমি চোখ বড়বড় করে তাকালাম এই বজ্জাতটি কি বলছে এসব।

আয়ানঃ বউউউউউ!

কিছু বলছোনা কেন! বলো না ভাবনা কবে আসছে!

আমিঃ আপনার মাথা গেছে!

ভাবনা কই থেকে আসবে!

সবার সাথে আপনিও পাগল হইছেন তাইতো!

আয়ানঃ একটু পাগল হলে প্রব্লেম কি!

আমিঃ কেন হবেন!

আয়ানঃ হবো।

তোকে ভালোবাসার কারনে না হয় একটু পাগলামোই করবো।

তোর ভালোবাসার চাদরে না হয় নিজেকে একটু জরাবো।

তোর হাসি-কান্নার কারন হবো।

তোর ভালোবাসার কাঙাল হতে চাই।

তোর ভালোবাসায় মাতাল হতে চাই।

সবকিছু শুধু ই।

দিবিতো একটু ভালোবাসা!

আমিঃ উহু

তিনি আমার কপালের সাথে তার কপাল মিশিয়ে লাগালেন।

তাকে বাঁধা দেয়ার শক্তি হয়তো নেই আমার।

আবির আংকেলের ভাইয়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করছিলাম কেন আমাকে এতিম বানালো!

কি দোষ করছিলো আমার মা-বাবা!

তিনি নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন হয়তো আমার প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিলোনা।

মানুষ ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয় হয়তো সেও হইছে এখন। এখন নিজের করা পাপের শাস্তি নিজেই পাচ্ছে।

নিজের ভুলগুলো কড়া নাড়ছে।

এমন পাপ কাজ করার সময় মানুষের হিতাহিত বোধ থাকেনা। তখন তারা একটা নেশায় আসক্ত হয় যা মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনায় থাকে।

আবির আংকেলের থেকে তার সব প্রিয়কিছু কেড়ে নেয়াটাই তার ভাই মামুন আংকেলের কাজ ছিলো। তাই সবকিছু আস্তে আস্তে কেড়ে নেয়ার পরে আমার মা-বাবাকে নিয়ে গেলো।

কারন, আবির আংকেলের সবথেকে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো মা-বাবার সাথে।

কিন্তু এই প্রতিশোধের নেশায় আমার বাল্যকালও কেড়ে নিলো।

রাহিমা আন্টি মিরাকে নিয়ে মুম্বাইয়ে চলে গেছেন।

শুধু যাবার আগে আমার কাছে এসে ক্ষমা চাইছেন।

ক্ষমা করা মহৎগুন। তাই আমিও ক্ষমা করে দিলাম।

৫ বছর পরে……

মিশমিঃ মাম্মাম মাম্মাম। তোমাল ছব গলম কাপল দাও আমি থান্দা কলে দিচ্চি।

আমি রুম গুছাচ্ছিলাম তখনই আমার ও আয়ানের একমাত্র ভালোবাসার প্রতীক আমাদের সবার কলিজার টুকরো আসলো।

একমাত্র কলিজার টুকরোর নাম আদিবা মাহমুদ মিশমি।

একবারে ওর বাবার কপি মানে দুষ্টের শিরোমণি। যেমন বাপ তেজান্নাত তার মেয়ে। দুটোর কারনে মাথাটা সারাক্ষন ভনভন করে মাছির মত।

আমার ভাবনা আমার সামনে আছে। তাই ভাবনার জগতে এখন আর বেশি যাইনা। তার সাথে কথা বলেই সময় কাটাতে হয়। নয়তো সারা বাড়িতে আমার বিচার নিয়ে ঘুরবে।

একবার একঘেয়ে হয়ে যে ভুল করছি এখন আর করতে চাইছিনা।

মিশমিঃ মাম্মাম্মম্মম্মম্মম

(আমার শাড়ির আঁচল ধরে টান দেয়ায় হুশ ফিরলো)

আমিঃ হ্যাঁ মাম্মাম বলো।

মিশমিঃ তুমি বলতোনা গলম নাগে। আল গলম কাপলে পললে তী বেথি গলম নাগে।

তাই কাপল দাও আমি থান্দা কলে দিবো।

আমিঃ বাকি গুলো কোথায়! এই মাত্র তো নিলে।

তোমার বাবাইয়ের শার্ট ঠান্ডা করো তার ভয়ংকর গরম দেখা যায়।

মিশমিঃ কলছি তো বাবাইয়েলতা।

আমিঃ কিভাবে!

তখনই আয়ান রুমে এসে মুখটা গম্ভীর করে বললো।

আমার শার্ট সুইসাইড করছে। তুমি দায়ী তার জন্য।

তখনই মিশমি বলে উঠলো,

উফফ বাবাই তুমি আবালো ভুল গেথো।

আমিতো ফ্লিজে লাখতি থান্দা কলতে।

মেয়ের কথা শুনে আমি আয়ানের দিকে তাকালাম, সে করুন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

দুই বাবা-মেয়ের কথা শুনে হাসবো নাকি কান্না করবো বুঝতে পারছিনা।

একটা তেলাপোকা অন্য একটা ছাড়পোকা। দুটোই সমানে জ্বালাচ্ছে।

কিন্তু মেয়ের কথাগুলো শুনে আর না হেসে পারলাম না। শার্ট ফ্রিজে রেখে আসছে ঠান্ডা করার জন্য।

আমার হাসি দেখে আয়ান করুনভাবে তাকালো আর বললো।

এখন অফিসে যাবো কিভাবে!

আমিঃ কেন! আপনার না অনেক গরম লাগছে। গরমে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন যার জন্য আমাদের কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন না।

তাই তো আমাদের ভাবনা সবকিছু ঠিক করে দিলো। (হেসে)

আয়ানঃ খুব হাসি পাচ্ছে তাইনা!

আজকে তো আর অফিসে যাচ্ছিনা বউ।

আমাদের ভাবনাটা সত্যিই খুব ভালো।

তোমার কাছে আসার সুযোগ করে দেয় আমাকে। (চোখ টিপ দিয়ে)

আমি তার কথা শুনে চোখ বড়বড় করে তাকালাম। তিনি হেসে যাচ্ছেন।

আমার অনেক কাজ পরে আছে। তাই দূরে থাকবেন।

আয়ান পিছন থেকে জরিয়ে ধরলো আমায়।

তারপর বললেন।

আজকে আর কোনো কাজ হচ্ছেনা।

চলোনা কোনো অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যাই। যেখানে তুমি আমি আর ভাবনা ছাড়া অন্য কেউ থাকবেনা।

যেখানে স্মৃতি হয়ে শুধু আমাদের ভালোবাসার মুহুর্ত গুলো থাকবে।

পড়ন্ত বিকেলে তার হাতে হাত রেখে হাঁটছি। আমি এক হাত ও মিশমি এক হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছি নদীর পাশ ধরে।

নদীর শীতল ঠান্ডা মাতাল হওয়া বাতাসে ভালোবাসার নতুন নতুন রূপের সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি গান ধরলেন, আমি বরাবরের মতো মুগ্ধভাবে শুনছি।

বলবো তোকে আজ, বলবো কিছু কথা।

চলবো অচেনা পথ, ভেঙে সব নীরবতা।

এই মনের যত আশা, পেলে তোর ভালোবাসা।

মন ছুঁয়ে যায় শুন্যতায়।

ওওও বলবো তোকে আজ।

বলবো কিছু কথা।

চলবো অচেনা পথ, ভেঙে সব নীরবতা।

সমাপ্ত

তোর জন্য
সুমাইয়া আক্তার মনি

আরো পড়ুন – ভালোবাসার কথা

পাঠক আপনাদের জন্যই আমরা প্রতিনিয়ত লিখে থাকি। আপনাদের আনন্দ দেয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ। তাই এই পর্বের “মিষ্টি প্রেমের কাহিনী গল্প” টি আপনাদের কেমন লাগলো পড়া শেষে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

Related posts

সিনিয়র প্রেম – ডাক্তার মাইয়া যখন বউ – পর্ব ৪ | Senior Bou

valobasargolpo

মিষ্টি প্রেমের গল্প – পর্ব ৯ | স্যারের সাথে প্রেম | Love Story Bangla

valobasargolpo

Leave a Comment

error: Content is protected !!