মিষ্টি প্রেমের গল্প

তবুও তোমাকেই চাই (১ম খণ্ড) – আবেগের ভালোবাসার গল্প

তবুও তোমাকেই চাই (১ম খণ্ড) – আবেগের ভালোবাসার গল্প: হৃদি রেগে ফোনটা কেটে দিলো। নির্ণয় ও এখন মিথ্যে বলতে শিখে গেছে৷ যেই মেয়েকে এখনো অবধি ও টাচই করেনি সেই মেয়ের সম্বন্ধে এতগুলো কথা ও হৃদিকে অবলীলায় বলে দিলো যাতে হৃদি সত্যিটা মেনে দ্রুতই সরে যায় ওর কাছ থেকে।


সূচনা পর্ব

তোহার বিয়েটা নির্ণয়ের সাথে হয়েই গেলো। বাচ্চা একটা মেয়ে তোহা। সবেমাত্র এসএসসি এক্সাম দিলো।

হৃদির চোখের সামনে ওর ভালবাসার মানুষ নির্ণয় আজকে তোহার হয়ে গেলো! হৃদিসহ বাকি দশ বন্ধু এইটা মন থেকে না মানতে পারলেও নির্ণয়ের কথা ভেবে মেনে নিয়েছে।

পরিবারের বাইরে নির্ণয় এক পা ফেলবেনা সেইটা নির্ণয়ের বন্ধুরা খুব ভালো করেই জানে। হৃদিকে গোপনে ভালবেসে গেছে নির্ণয়। হৃদি পেরেছিলো নিজের মনের কথা নির্ণয়কে জানাতে কিন্তু বড্ড দেরি করে ফেলেছে ও।

বাসর ঘরে তোহা দুই হাত ঘোমটা টেনে বসে আছে। পুতুলের মত লাগছে মেয়েটাকে। এত বাচ্চা একটা মেয়ে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়া ছেলের বউ!

এইটা ভেবেই নির্ণয়ের কষ্ট হচ্ছে। এই বালিকা বধূ দিয়ে কিভাবে সংসার করবে ও? নির্ণয় ঘরে ঢুকতেই তোহা সালাম দিলো। সালামের জবাব নিয়ে নির্ণয় বলল,

~ মা বলেছে তোমায় এই টাকাটা দিয়ে দিতে। এখানে এক লাখ টাকা আছে, কাবিননামার টাকা।
~ ঠিক আছে দিন।

তোহা টাকাটা বালিশের নিচে রেখে দিলো। দুই লাখ টাকার মালিক এখন ও। পুরোটাই কাবিননামার টাকা। নির্ণয় আর কিছু না বলে দখিনের জানালা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস বইছে খুব জোরে। বাতাসের তোড়ে জানালা গুলো কাঁপছে।

নির্ণয়ের বুকের ভেতরটাও কেঁপে কেঁপে থেমে যাচ্ছে। এমন অসহ্য যন্ত্রণা এর আগে কখনো হয়নি ওর। তোহা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল

~ মন খারাপ আপনার? সুখি নন আপনি এই বিয়েতে?
~ হ্যা আমি সুখি, অনেক সুখি। মন কেন খারাপ হবে? আচ্ছা তোমার বয়স কত? (নির্ণয়)
~ ১৬ বছর।

~ আমার বয়স জানো? (নির্ণয়)
~ ২৫ বছর।
~ এই বুড়ো মানুষটাকে তুমি বিয়ে করতে রাজি কেন হলে? তোমার থেকে নয় বছরের বড় আমি!

~ তাতে কি হয়েছে? আমার বাবা আম্মুর থেকে পনেরো বছরের বড়। তাদের তো কোনো ভয় হয়নি এইটা নিয়ে।
~ রাত তো অনেক হলো। ঘুমাবেনা?
~ আপনি ঘুমাবেন না?
~ হ্যা ঘুমাবো।

~ আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি? (নির্ণয়ের পায়ের দিকে তাঁকিয়ে তোহা)
~ হ্যা কর।

~ আপনি কি পাজামা এইভাবেই পরেন? (বেশ মনোযোগ দিয়েই তোহা নির্ণয়ের পায়ের দিকে তাঁকিয়ে আছে)
~ কিভাবে?

~ এইযে গোড়ালি ভেদ করে পায়ের পাতায় বিছিয়ে গেছে আপনার পাজামা। তাই জিজ্ঞেস করলাম।
~ হ্যা এভাবেই পরি।

~ এই কাজ করবেন না। পায়জামাটা বটে পরবেন। আচ্ছা শুনুন, মা আপনার জন্য এক গ্লাস দুধ রেখে গেলেন। খেয়ে নিন।
~ দুধ খাইনা আমি।

~ এলার্জি? (তোহা)
~ বলা যায়। আমি চেঞ্জ করে আসছি। তুমিও চেঞ্জ করে শুয়ে পরো।
~ জ্বি আচ্ছা।

তোহা নাকের নোলক খুলছিলো। নির্ণয় তখন গেঞ্জি আর প্যান্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ভালভাবে হাত~ মুখ ধুয়ে নির্ণয় পনেরো মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে তোহা গয়নাগাটি সব খুলে ফেলেছে। চুল আঁচড়াচ্ছিলো তোহা।

নির্ণয় তোহার চুল দেখে বলে,
~ তোমার চুল তো তোমার থেকেও বড়। কাটো না চুল?
~ নাহ। লম্বা চুল আমার খুব পছন্দের। সামলাতে কষ্ট হয় তবুও ভাল লাগার বস্তু এইটা।
~ এই নাও টাওয়েল। যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো।

তোহাকে টাওয়েল হাতে ধরিয়ে দিয়ে নির্ণয় ফুলের বিছানায় শুয়ে পরে। হরেক রকমের ফুলের গন্ধ একসাথে মিশ্রিত হয়ে খুব বাজে গন্ধ ছড়াচ্ছে। এজন্য মাথা ব্যাথা করছে নির্ণয়ের। তবুও ও চেষ্টা করলো ঘুমিয়ে যাওয়ার।

কিন্তু বারবার হৃদির কান্নামাখা মুখটাই ভেসে আসছে। এ কেমন যন্ত্রণা? ভালো লাগছেনা কিছু নির্ণয়ের। এইদিকে বাচ্চা মেয়েটা শাড়ি কিভাবে পরতে হয় জানেনা তাই সে থ্রি পিস পরেই ওয়াশরুম থেকে বের হলো। ভয়, লজ্জা সবকিছু নিয়েই নির্ণয়ের সামনে দাঁড়ালো তোহা।
~ কিছু বলবে? (নির্ণয়)

~ হ্যা। আসলে আমি খাটের বামপাশ ছাড়া ঘুমাতে পারিনা। আপনি কি দয়া করে ওইপাশে যাবেন? (আমতা আমতা করে তোহা)
~ হুম।

নির্ণয় সরে গিয়ে ডানপাশে ঘুমালো। বামপাশের ফুলগুলো ঝেড়ে তোহা শুয়ে পরলো। শোয়ার সময় তোহার সব চুল উড়ে গিয়ে নির্ণয়ের বুকে আর মুখে পরলো। নির্ণয় চুলগুলো সরিয়ে ঘুরে শুয়ে রইলো।
~ একটা কথা বলব?

(তোহা)
~ বল। (অন্যপাশ থেকে নির্ণয়)
~ আমি নাক ফোঁড়াইনি আর হাতেও চুরি পরিনি। এইজন্য আপনি কি কিছু বলবেন? (তোহা)

~ কি বলব আমি? বিয়ের চিহ্ন হিসেবে যদি চুরি, নাকফুল পরতে চাও তো পরো না। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আর যদি ভাবো যে শুধু সুন্দরের জন্য পরবে তবে পরতে পারো। ইচ্ছা তোমার। (নির্ণয়)
~ এইটাই শুনতে চাইছিলাম। আমি পরবনা কখনো নাকফুল।
~ এজ ইউর উইশ।

তোহা বাচ্চামন নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেলো। কিন্তু নির্ণয়? ওর তো আসছেনা ঘুম। কতক্ষণ উঠে বসে থাকে নির্ণয় আবার পায়চারি করে। কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। ওইদিকে ভোরে হৃদি ফোন করে নির্ণয়কে। নির্ণয় ফোন রিসিভ করে বারান্দায় চলে যায়।

~ এত ভোরে ফোন দিয়েছিস যে! (নির্ণয়)
~ তুই কি ব্যস্ত? কেটে দিব? (কাঁদতে কাঁদতে হৃদি)
~ না ব্যস্ত না। কাঁদছিস কেনো তুই?

~ আমার ভালো লাগছে না রে নির্ণয়। তুই আজ থেকে অন্য কারো হয়ে গেলি। এইটা ভেবেই যে আমার কলিজা ফেঁটে যাচ্ছে। কিভাবে থাকলি তুই আজকে অচেনা, অজানা একটা মেয়ের সাথে।

(হাউমাউ করে কাঁদছে হৃদি)

নির্ণয় চুপ করে শুনছে। হৃদি তো চিৎকার করে কাঁদছে। কিন্তু নির্ণয়? ও তো ছেলে। ও যদি এইভাবে কাঁদে সেইটা মানাবেনা। নির্ণয় চোখের পানি মুছে কিছু বলতে যাবে তখন ফোনের ওপার থেকে হৃদি আবার বলে,

~ আজকে থেকে তোকে ভালবাসার সব অধিকার আমি হারিয়ে ফেললাম নির্ণয়। এত কষ্ট কেন হচ্ছে আমার বলতে পারবি? এক তরফা ভালবেসে গেছি বলে কষ্ট পাচ্ছি? এই নির্ণয় তুই কেন আমার হইলি না?

~ তুই এক তরফা ভালবাসিস নি হৃদি। আমিও যে আমার চকলেটিকে অনেক ভালবেসেছি। (মনে মনে নির্ণয়)
~ তোর বউকে আজকে তুই অনেক আদর করেছিস তাইনা? বউয়ের জায়গা ওকে দিয়ে দিয়েছিস তাইনা রে নির্ণয়? (হাউমাউ করে কাঁদছে হৃদি)

~ ও তো আমার বউ। বিয়ের পর থেকেই জায়গা নিয়ে বসে আছে। ৷ নতুন করে কি দেওয়ার আছে হৃদি? (চোখের পানি মুছে নির্ণয়)
~ আযান দিচ্ছে নির্ণয়। কত ভোরের আযান আমি আর তুই ফোনের ওপার থেকে শুনেছি।

কত ভাললাগা কাজ করেছে তখন। তবে আজ কেন এত বিষাদ লাগছে? কেন মনে হচ্ছে আমি আমার ভালবাসাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি? নির্ণয় রে আমি তো সইতে পারছিনা। তোকে অনেক দেখতে ইচ্ছে করছে। কি করব আমি বল তুই? আমার যে তোকেই চাই।

(আবারো হৃদি কাঁদছে)
নির্ণয় ও নিঃশব্দে কাঁদছে হৃদির পাগলামো শুনে৷ কি করবে এখন ও? ওকে তো এখন দুর্বল হলে চলবেনা। নির্ণয় হৃদিকে বলে,
~ যা হৃদি ঘুমা। ঘুম না আসলে একটা স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমা। এভাবে পাগলামো করিস না।

বাধ্য করিস না তোর বাসায় আমাকে যেতে। তুই না আমার বেস্ট ফ্রেন্ড? এত উইক হলে তোকে মানায়? প্লিজ একটু শান্ত হ তুই। তুই এভাবে কন্টিনিউয়াসলি পাগলামি করলে আমি কিন্তু চলে আসব।

সেইটা কি ভাল হবে তুই বল? প্লিজ হৃদি তুই ফোন রেখে একটু ঘুমা। একটার বেশি পিল খাইস না তুই। আমি রাখছি।
ফোন কেটে দিয়ে নির্ণয় বারান্দায় বসে পরে।

এইভাবে সবকিছু কেনো এলোমেলো হয়ে গেলো? আমার চারটা বছরের সুপ্ত ভালবাসা এভাবে মিথ্যে হয়ে গেলো? অনেক আজগুবি ভাবনা ভাবছে নির্ণয়। ওইদিকে তোহা ভোরে ঘুম থেকে উঠে যায় নামাজ পড়বে বলে। নির্ণয়কে পাশে না দেখে তোহা খুঁজতে খুঁজতে বারান্দায় এসে দেখে নির্ণয় বসে আছে আর কাঁদছে। তোহা তখন আর নির্ণয়কে কিছুই বলেনি।

একা একা নামাজ সেড়ে বিছানা গুছিয়ে ফেলে ও। সাতটার সময় মেহের মানে নির্ণয়ের ছোট বোন আসে তোহাকে ডাকতে। তোহা দরজা খুলে দেয় আর নির্ণয় তখন ওয়াশরুমে যায় মুখ ধুতে।

~ ভাবি উঠেছো তুমি? মা তোমায় ডাকছিলো।
~ চলো।

ঘোমটা দিয়ে মেহেরের সাথেই বেরিয়ে যায় তোহা। রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ায় ও। হাতের মেহেদি তখনো তোহার হাতে জ্বলজ্বল করছে। কি সুন্দর রঙ হয়েছে ফর্সা হাত দুটোয়!

~ এ বাসায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো তোহা? (তোহার শ্বাশুড়ি)
~ না মা। আপনি কি নাস্তা বানাচ্ছেন? আমি সাহায্য করব? যদিও আমি কিছুই পারিনা রান্না বান্নার। আপনি শিখালে শিখে যাব খুব শীঘ্রই।
~ হাহাহা। না বোকা মেয়ে। আজকে তোমায় কিছুই করতে হবেনা। তুমি এখন ঘরে গিয়ে বসো। আমি মেহেরকে দিয়ে তোমার নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।

আর কিছু না বলে তোহা ঘরে চলে এলো। নির্ণয় চেয়ারের উপর বসেছিলো আর কি বই যেন উলটাচ্ছিলো। দরজা চাপিয়ে দিয়ে তোহা বলে,
~ আপনি এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না তাইনা?

~ রাজি না থাকলে বিয়ে কিভাবে করে? (নির্ণয়)
~ সে তো আমি জানিনা। কাল রাতেও আপনি আমার সাথে কথা বললেন না আবার আজও বারান্দায় বসে বসে কাঁদছিলেন। কোনো ছেলে নিজের বাসরে কাঁদে?
(তোহা)
~ আচ্ছা তুমি তো জাস্ট আমার বউ। আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে জানার তো কেউ না।

তবে এসব প্রশ্ন করে কেন আমায় তাঁতিয়ে দিচ্ছো? আমার মা আমাকে আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করেনা তবে তুমি কে যে এভাবে বলছো? (নির্ণয় খানিকটা উঁচু স্বরেই কথাগুলো বলল)
~ আপনার মা আর আমি কি এক হলাম? (তোহা)
~ হ্যা এক না তোমরা। তাই বলছি এসব প্রশ্ন আমায় করনা। যাও এখান থেকে৷

তোহা আর কিছু না বলেই সেখান থেকে সরে এসে খাটে বসলো। তোহার ছোট মাথায় তখনো এই চিন্তা আসেনি যে নির্ণয় কাউকে ভালবাসতে পারে। কারণ প্রেম ভালবাসার জ্ঞান তোহার নেই। কিছুক্ষণ পর মেহের খাবার দিয়ে গেলো তোহাকে। নির্ণয় ডায়নিং এ বসে খেয়ে গেলো কিন্তু তোহা ঘরে বসেই খেলো।

সকাল নয়টার দিকে নির্ণয় হৃদিকে ফোন করলো। হৃদির ফোন আউট অফ রিচ। নির্ণয়ের ভয় যদি হৃদি ঝোঁকের বশে কিছু করে ফেলে? হৃদির আম্মুকে ফোন করলো নির্ণয়।

উনি জানালেন হৃদি ঘুমাচ্ছে। তখনো নির্ণয় স্বস্তি পেলো না কারণ কয়টা স্লিপিং পিল খেয়েছে হৃদি সেইটা ও জানেনা। এক প্রকার চিন্তায় চিন্তায় নির্ণয় বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ করলো। হৃদি আসেনি বৌভাতে। বাকি বন্ধুরা অবশ্য এসেছে। কিন্তু তোহা কারো সাথেই দেখা করেনি। সন্ধ্যে বেলায় তোহার বাবা এসে মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে নিয়ে যায়।

তোহার বাড়ি কুমিল্লাতে। তোহা লক্ষ্য করলো নির্ণয় গাড়িতে সারাক্ষণ কাউকে ফোনে ট্রাই করে যাচ্ছে কিন্তু পাচ্ছেনা। তোহা আর কিছু জিজ্ঞেসই করলো না কারণ সকালের ব্যবহার ও ভুলেনি। সাড়ে নয়টার দিকে কুমিল্লায় নিজের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালো তোহা।

মা সাদরে মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে ঘরে তুললেন। এখানে তোহার কোনো আত্মীয় স্বজন নেই তাই কেউই আসেনি বিয়েতে। আত্মীয়রা সবাই USA তে সেটেলড। নির্ণয় ঘরে ঢুকে শুধু এক গ্লাস পানি খেলো আর ব্লেজার খুলে তোহার রুমে পায়চারি করছে।

ভারী ল্যাহেঙ্গা সামলাতে না পেরে তোহা খাটের কোণায় বারি খেয়ে ফ্লোরে পরে যায়। এর জন্য অবশ্য নির্ণয় ও দায়ী কারণ ও~ ই অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলো। নির্ণয় তোহাকে উঠিয়ে সরি বলল।

তোহার হাত ছিলে গেছে। সেইদিকে নির্ণয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সারাক্ষণ ফোনে ট্রাই করছে কাউকে। শেষে তোহা নিজেই একটা মলম লাগিয়ে জামাকাপড় পালটে ফেলল। নির্ণয় শার্ট, প্যান্ট পরেই বসে আছে।
~ চেঞ্জ করবেন না? (তোহা)
~ পরে।
~ কিছু খাবেন?
~ না।

~ আচ্ছা। এইযে টি শার্ট আর ট্রাউজার রেখে গেলাম। চেঞ্জ করে নিয়েন। আমি আম্মুর কাছে আছি। কিছু প্রয়োজন হলে আমায় ডাকবেন।
~ হুম।

রাত একটা পর্যন্ত তোহা ওর মায়ের সাথে গল্প করে। কিন্তু একটাবার নির্ণয় ওকে ডাকেনা। শেষে তোহার মা তোহাকে বললেন,
~ জামাইকে একা রেখে মায়ের সাথে গল্প করছিস তুই? কয়টা বাজে দেখেছিস? যা ঘরে যা। জামাই তো কিছুই খেলো না। কত সাধলাম!
~ আমিও সেধে এসেছি কয়েকবার। খাবেনা বলল। আচ্ছা আম্মু আমি যাই।
~ যা।

ঘরে এসে তোহা দেখে নির্ণয় ঘুমাচ্ছে চেঞ্জ না করেই। হাতের তালুতে ফোন বাজছে। ফোন সাইলেন্ট করা। খানিকটা কাছে গিয়ে তোহা দেখে Incoming call from HRIDI লিখা। তখনো তোহা কিছুই ভাবেনি। ফোন রিসিভ করবে কি করবেনা এইটা ভেবেই দ্বিধাদ্বন্দে কাটায় কিছুক্ষণ তোহা।

কিন্তু এইদিকে ফোন এসেই যাচ্ছে। এক প্রকার বাধ্য হয়েই তোহা ফোন রিসিভ করলো। হ্যালো বলার সাথে সাথেই হৃদি চেঁচিয়ে বলল,
~ নির্ণয়ের ফোন ধরার সাহস হয় কি করে তোমার?

~ সরি। আসলে উনি ঘুমাচ্ছেন আর আপনিও বারবার ফোন দিচ্ছিলেন তাই আর কি ধরলাম।

~ তুমি জানো ওর ফোন কেউ ধরার সাহস পায়না? ইভেন আমিও না।
~ সরি আপু। আমি রাখছি। ওনাকে বলে দিব যে আপনি ফোন দিয়েছিলেন।

নির্ণয়, হৃদি সবার ব্যবহার অনেক অদ্ভুত লাগলো তোহার কাছে। তবুও তোহা কিছুই মনে করলো না। নির্ণয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পরলো ও। নির্ণয়ের শার্টের বোতাম খুলে দিয়ে ও নির্ণয়কে দেখছে। ঘামে ভিজে গেছেন উনি। স্বামীর ভালবাসা যে কি সেইটাই তোহা জানেনা। তাই ও স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মানেটাও বুঝেনা।

ওর কাছে স্বামী স্ত্রী একটা সম্পর্কের নামমাত্র। যেই সম্পর্কে দুইজনকে এক ঘরে থাকতে হয়। এর বেশিকিছু তোহা জানেই না। কারণ ছোট থেকেও ও একা একা বড় হয়েছে। কোনো বন্ধুবান্ধব ও নেই ওর।


পর্ব ০২

বৌভাতের রাত তোহা জামাইয়ের ঘুমন্ত মুখ দেখেই কাটিয়ে দিলো। নির্ণয় সারাদিন স্ট্রেস নিয়ে তার উপর হৃদির চিন্তায় ক্লান্ত হয়ে গেছে তাই এভাবে অঘোরে ঘুমুচ্ছে। তোহা বেচারি এইসব ভাবতেই পারেনা যে তার জামাই গোপনে অন্য কোনো মেয়েকে ভালবাসে!
সকাল ছয়টায়,

নির্ণয় ঘুম থেকে উঠে দেখে তোহা কুরআন শরীফ পড়ছে। পরে নির্ণয় ফোন হাতে নিয়ে দেখে হৃদি অনেকবার ফোন করেছিলো আর একটা কল রিসিভ ও হয়েছে। পরে নির্ণয় আর কলব্যাক করলো না। যেহেতু ফোন দিয়েছে সেহেতু বেঁচে আছে এই ভেবেই নির্ণয় আর কলব্যাক করেনি। এখন যত দ্রুত সম্ভব হৃদিকে ভুলে যাওয়াই ভালো। নির্ণয়কে ঘুম থেকে জাগতে দেখে তোহা কুরআন শরীফ বন্ধ করে নির্ণয়কে জিজ্ঞেস করে,

~ উঠেছেন আপনি? চা বা কফি কিছু খাবেন? কাল থেকে তো একদম খালি পেটে আছেন। সেই সকালে দুইটা রুটি খেয়েছিলেন। কিছু দিব আমি এখন? (তোহা)

~ নাহ। গোসল করব আমি। একটা টাওয়েল দিবা? আর আমার জামাকাপড় বের করে দাও।
~ আপনি বাথরুমে যান। আমি দিচ্ছি।

নির্ণয় বাথরুমে গেলো। তোহা কুরআন শরীফ পড়া বন্ধ করে নির্ণয়কে টাওয়েল আর জামাকাপড় দিয়ে আসলো। এরপর এসে কুরআন শরীফ পড়া শেষ করে নির্ণয়ের জন্য কফি বানাতে গেলো। তোহার মা মেয়ের জামাইয়ের জন্য স্পেশাল নাস্তা বানাচ্ছে। তোহা হেসে হেসে আম্মুকে বলে,

~ আম্মু কফিতে চিনি কতটুকু দিব দেখো না?
~ তুই যা। আমি করে দিচ্ছি।

~ না। একা হাতে তোমায় সব করা লাগবেনা। তুমি আমায় বলো আমি বানাচ্ছি।

~ নির্ণয় চিনি কেমন খায় এইটাই তো জানিনা আমি। দেড় চামচ চিনি দাও। এরপর যদি লাগে তাহলে চিনির কিউব নিয়ে যেয়ো। ওই কৌটায় আছে দেখো।

~ আচ্ছা মা। আমি এইটা ওনাকে দিয়ে এসে তোমায় হেল্প করছি।
~ না। ছেলেটার সাথে একটু গল্প কর যাও। আসতে হবেনা তোমায় রান্নাঘরে। নতুন বউ এখন তুমি।

~ আচ্ছা মা শোনো। (আমতা আমতা করে তোহার আম্মু)
~ হ্যা আম্মু বলো।

~ না মানে নির্ণয় কি তোমায় ছুঁয়েছে?(মাথা নিচু করে তোহার মা)
~ না আম্মু। উনি আমায় ছুঁবে কেন? (কফিতে চিনি মেশাতে মেশাতে তোহা)

~ এই বোকা মেয়ে কি বলছো তুমি? কেন ছুঁবে না? তুমি ছুঁতে দাওনি?
~ কি বলছো তুমি মা? আমি কেন ওনাকে ছুঁতে দিব? উনি তো আমার স্বামী। তুমিই না বলো।

~ যাও এখন নির্ণয়কে কফি দিয়ে আমার কাছে এসো। বলছি আমি তোমায় সব।
~ আচ্ছা।

তোহার মা পরে গেলো বিপাকে। এইরকম একটা কিছুই উনি আশা করছিলেন মেয়ের থেকে। ওনার মেয়ে যে এইসব কিছুই বুঝেনা, কিছুই জানেনা। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক আসলে কি এইটাই তো তোহা জানেনা!

এখন মেয়েকে কিভাবে বুঝাবেন উনি? বেশ চিন্তায় পরে গেলো তোহার মা। এই বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয়ত ঠিক হয়নি। কিন্তু ওনারা তো চেয়েছিলেন শরীয়ত অনুযায়ী মেয়ের বিয়ে দিবেন। তা~ ই দিয়েছেন। এতে আফসোস থাকার কথা না।

এখন মেয়েকে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক বোঝানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তোহার মায়ের কাছে। নির্ণয় মাথা মুচছিলো তখন তোহা এসে নির্ণয়কে কফি দিলো আর একটা বাটিতে করে চিনির কিউব দিয়ে গেলো দুইটা।
~ এইযে আপনার কফি। খেয়ে নিন। একটু পর ব্রেকফাস্ট করবেন৷
~ হুম।
~ জামাকাপড় দিন আমি শুকাতে দিচ্ছি।
~ না আমি পারব।

~ আচ্ছা তাহলে। আর কিছু লাগলে আমাকে ডাকবেন।
~ হুম।

তোহা আবার রান্নাঘরে এসে মায়ের সাথে আড্ডা দেয়। এক সময় মা তোহাকে বলে,

~ জানো মা নির্ণয় আর তোমার সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিৎ?
~ কেমন আম্মু? (উৎসুক হয়ে তোহা)

~ বন্ধুর মতো হওয়া উচিৎ। তুমি না বলো আমি তোমার একমাত্র বন্ধু। তেমনি নির্ণয়কে তোমার বন্ধু বানানো উচিৎ যাকে তুমি সব শেয়ার করতে পারবা। সুখে, দুঃখে একে অপরের পাশে থাকতে পারবা।
~ যেমনটা তুমি আর আব্বু থাকো?

~ হ্যা৷ বাকিটা তুমি আস্তে আস্তে জেনে যাবা, শিখে যাবা। জামাই তোমায় শিখিয়ে দিবে। শুধু জামাইকে কষ্ট দিওনা। বউদের কাজ কি জানো?
~ কি?

~ স্বামীর সেবা করা। ঘর সংসারের দায়িত্ব পালন করা। এখন তুমি বলতে পারো যদি তা~ ই হয় তাহলে আমি এত টাকা খরচ করে কেন পড়াশোনা করেছি?

~ হ্যা সেইটাই। যদি আমি বাইরে গিয়ে কাজই না করতে পারি তবে কেনো এত টাকা খরচ করে পড়ছি?

(পালটা প্রশ্ন তোহার)
~ কেনো পারবানা? অবশ্যই পারবা। সেইটা পর্দা সহিত।
~ এইটা আমি জানি মা। তুমি আমায় শিখিয়েছো। (তোহা)
~ হ্যা। এখন শুনো আমি যা বলি। আচ্ছা তুমি কি কখনো একসাথে হাঁটতে আর দৌড়াতে পারবা?

হয়ত এর মাঝামাঝিটা তুমি করতে পারবা, দ্রুত হাঁটতে পারবা কিন্তু এতে কষ্ট তোমারই হবে। একটা সাধারণ জীবনযাপন থেকে বেরিয়ে তুমি যদি অসাধারণ ভাবে জীবন যাপন করতে চাও এতে কষ্ট তোমার হবে।

তেমনি ঘর সংসার সামলে তুমি যদি বাইরে কাজ কর তবে তুমি নিজেই অতিষ্ট হয়ে যাবা। যেমন তোমার মেজো খালামনি আমেরিকা গিয়ে সারাক্ষণ অফিসে পরে থাকে। লাখ লাখ টাকা ইনকাম তার। কিন্তু তার ছেলে অলিন কি করছে?

সিগারেট, মদ, মেয়েদের সাথে অবলীলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার সংসারে তার স্বামী থাকেনা কারণ সংসারটা আর সংসার নেই, টাকার খোটা হয়ে গেছে। তোমার আন্টি টাকা ইনকাম করে তোমার আংকেলকে কথা শুনায় যে সে মাসে দেড় লাখ টাকা আয় করে তাই বাসায় সময় দিতে পারেনা। আজকে তোমার আংকেল দ্বিতীয় বিয়ে করতে আগ্রহী।

তবে বলো চাকরি করে লাভটা কি হলো যেখানে মূল ভীতটাই আজ নড়বড়ে? অথচ তোমার আংকেলের কিন্তু সামর্থ্য আছে তার পরিবার চালানোর। মেয়েরা এখন বাইরে পরিচিতি গড়তে গিয়ে নিজেদের স্বস্তা বানিয়ে ফেলে। আর এক্সকিউজ দেয় একজনের আয়ে সংসার চলেনা।

~ বুঝেছি আমি মা। তবে আমার পড়াশোনা না করলেই তো হয়। (মাথা নিচু করে তোহা)

~ কেনো হয়? তুমি যদি শিক্ষিত হও তোমার ছেলেমেয়েকে শিক্ষার জন্য বাইরে দৌড়াতে হবেনা। ছেলে মেয়েকে সঠিকভাবে মানুষ করার গুরু দায়িত্ব কিন্তু থাকে মায়ের উপর জানো সেইটা? আজকে আমিও তো আমেরিকা সেটেলড থাকতাম। তবে কেনো তোমায় নিয়ে বাংলাদেশে চলে এলাম আমরা?

যাতে তুমি অলিনের মতো শিক্ষা না পাও, সংস্কৃতির দোহাই না দাও। মা নিজের ঈমান ঠিক থাকলে চারপাশ এমনিতেই মধুর লাগে আর যদি ঈমান নড়বড়ে থাকে তবে মধুর বাটিতেও উচ্ছের রস খুঁজে পাই আমরা। তুমি তোমার ছেলে মেয়েকে শিখাবা তোমার শিক্ষা।

~ আমার চাকরি বাকরি করার ইচ্ছে নেই আম্মু। লাখ লাখ টাকারো লোভ নেই। শুধু ইচ্ছা শান্তিতে থাকার। ভালো হয়েছে আমি আমেরিকান কালচারে বড় হইনি। আমাকে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য রোজ হাশরে আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তোমাদের গুণগান গাইবো মা। আর দশটা বাচ্চার মতো আমি না।

আমার শান্তি এই কালো বোরকা আর হিজাবেই। বাইরের কর্পোরেটের রঙিন দুনিয়া আমি কখনো দেখতেও চাইনা। (আম্মুকে জড়িয়ে ধরে তোহা)
~ পাগলি মেয়ে। ঘরে যাও। দেখো নির্ণয় কি করে। (হেসে তোহার আম্মু)
~ আচ্ছা।
তোহা ঘরে গিয়ে দেখে নির্ণয় কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে। ওড়নাটা ঠিকঠাক পরে তোহা নির্ণয়ের সামনে গেলো।
~ কিছু বলবে? (নির্ণয়)
~ না। খাবেন না আপনি?
~ হ্যা আসছি।

তোহা এসে ডায়নিং এ খাবার বাড়ছিলো। কিছুক্ষণ পর তোহার বাবা নির্ণয়কে নিয়ে খেতে বসলো। নির্ণয় অনার্স শেষ করে কি করবে না করবে সেই বিষয়েই কথা হচ্ছিলো। নির্ণয় বলল,
~ আমার ইচ্ছে আছে বিদেশ যাওয়ার। বাকিটা জানিনা।
~ বিদেশ কেনো? দেশে সমস্যা কি?

(তোহার আব্বু)
~ এই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভাল লাগেনা আমার। ইগোতে লাগে এখানে জব এপ্লাই করতে গেলে।
~ বিজনেস করবা। আমি আছি তো নাকি?

~ ফাইনালটা দেই আগে। এরপর ভেবে দেখব কি করা যায়! আব্বুর মতামতের ও একটা ব্যাপার আছে।
~ ওইটাই। খাওয়া শুরু কর।

খাওয়া দাওয়া শেষে নির্ণয় একটু বাইরে গেলো হাঁটতে। তোহা থালাবাসন গুলো ধুয়ে নিজে খেয়ে নিলো। তোহার একটা ফোন আছে। টেইনে উঠার পর বাবা গিফট করেছে। কিন্তু ফোনটা ছুঁয়েও দেখেনি তোহা। কি করবে ও ফোন দিয়ে?

কে আছে ওর কথা বলার জন্য? এখন মনে হয় ফোনটা কাজে লাগবে। এইজন্য তোহা আলমারি থেকে ফোনটা বের করে চার্জ করলো। এরপর মায়ের একটা সিম লাগিয়ে ফোন ওপেন করলো।
দুইদিন নির্ণয় একদম চুপচাপ শ্বশুর বাড়ি থাকলো।

এর মাঝে তোহাকে ও স্পর্শ ও করেনি। তোহার বেশ বিরক্তি লাগে ওর সাথে কেউ কথা না বললে কারণ ও কথা বলতে ভালবাসে। দুইদিন পর তোহা শ্বশুর বাড়ি চলে এলো আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে। আম্মুকে ছাড়া মেয়েটা কিভাবে থাকবে?

তোহার মা বারবার নির্ণয়কে বলে দিয়েছে তোহাকে দেখে রাখতে আর ওকে কষ্ট না দিতে। নির্ণয় কথা দিয়ে চলে আসে যে ও তোহার খেয়াল রাখবে। ভাবিকে পেয়ে মেহেরের যেন আনন্দের বাঁধ ভেঙে গেছে। বাসায় এখন আর কোনো গেস্ট নেই।

এজন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তোহা। বিয়ের চারদিন পার হয়ে যাওয়ার পরেও যখন নির্ণয় ওর সাথে কথা বলেনা তখন তোহা ধরে নেয় উনি বোধহয় এমন। আমার আব্বু আম্মু তো কত কথা বলে কিন্তু উনি কেন আমার সাথে বলেন না?

সেইদিন রাতে,
নির্ণয় ঘুমাতে যাওয়ার আগে তোহাকে বলে,
~ তোহা তোমায় কিছু বলার আছে আমার।
~ জ্বি বলুন৷

~ আমাকে কিছুদিন সময় দাও। আমি এখনি তোমায় স্ত্রীর অধিকার দিতে পারছিনা। তুমি হয়ত অন্যকিছু মিন করতে পারো বাট আই এম নট রেডি। তুমি ভীষণই বাচ্চা একটা মেয়ে। আমার মনে হয় তুমিও প্রস্তুত নও এই মুহুর্তে। (হাত মোঁচড়াতে মোঁচড়াতে নির্ণয়)
~ স্ত্রীর অধিকার? সেইটা কি? আর কিসের জন্য আপনি রেডি না? (অবাক হয়ে তোহা)

তোহার কথা শুনে নির্ণয় একটু হাসলো। নির্ণয়ের হাসি দেখে তোহা বলল,
~ কি মিষ্টি করে হাসেন আপনি! সারাক্ষণ চুপচাপ থাকেন কি করে? মুখ প্যারালাইজড লাগেনা? (তোহা)
~ হাহাহাহা।

এইবার নির্ণয় উচ্চস্বরেই হাসলো। নির্ণয় বলল,
~ মুখ আবার প্যারালাইজড হয় কেম্নে?

~ চুপচাপ থাকলেই হয়। আচ্ছা আপনি বললেন না তো স্ত্রীর অধিকার কি জিনিস?

~ বুঝতে চাও? (ভুরু উঁচু করে নির্ণয়)
~ হ্যা।

~ বয়স হয়নি। বয়স হলেই বুঝবা। ঘুমাবানা এখন?
~ মেহের বলল ওর মাথায় তেল দিয়ে দিতে। দিয়ে আসি।
~ আচ্ছা যাও।

তোহা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে তোহার কথা ভেবে নির্ণয় একা একাই হাসে। মেয়েটাকে যত বেশি বাচ্চা মনে করেছিলো ও তার থেকেও বেশি বাচ্চা। তবে এইটুকু বুঝেছে নির্ণয় যে এই যুগের আল্ট্রামডার্ণ মেয়েদের মতো তোহা নয়।

একদমই আলাদা ও। এখনকার মেয়েরা তো সিক্সে উঠেই বাচ্চা কাচ্চার স্বপ্ন দেখে কিন্তু তোহা জানেই না স্বামী কি! নির্ণয়ের জন্য ভালই হয়েছে। ও নিজেকে রেডি করতে পারবে সব কিছুর জন্য।
পাঁচদিন পর,

সকাল নয়টায় নির্ণয় রেডি হচ্ছিলো ভার্সিটিতে যাবে বলে। তোহা মেহেরের সাথে গল্প করছিলো। নির্ণয় তোহাকে ডাকে ঘরে আসার জন্য।
~ হ্যা বলেন।
~ আমার এখানকার বইগুলো কোথায়?
~ শেলফে রেখে দিয়েছি। লাগবে?
~ হ্যা।
~ কোনটা?
~ চারটাই লাগবে।

~ আচ্ছা এনে দিচ্ছি।
তোহা শেলফ থেকে বইগুলো এনে নির্ণয়কে দিলো। নির্ণয় সুন্দর করে প্যান্ট শার্ট পরে বের হওয়ার জন্য ঘুরলো তখনি তোহা বলল,
~ দাঁড়ান এক মিনিট।
~ কি?

তোহা নির্ণয়ের সামনে বসে নির্ণয়ের জিন্সটা বটে দিলো।
~ শু পরেই তো যাবেন। বটে পরলে সমস্যা কোথায়? ভাঁজ খুইলেন না। (তোহা)
~ আচ্ছা।
নির্ণয় ও জুতা পরে বেরিয়ে যায়। তোহা ফি~ আমানিল্লাহ বলে বিদায় জানায় নির্ণয়কে।

ভার্সিটিতে গিয়ে নির্ণয় শকড! এগারোজন বন্ধু সবাই পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ফরচুনেটলি সেখানে হৃদিও আছে। নির্ণয়কে আসতে দেখে হৃদি দাঁড়িয়ে যায়। অঙ্কুর বলে,
~ নতুন জামাই আসছে। এতদিন পর মনে পরলো আমাদের কথা!
~ ঠিক তা না। তোহা~ ই আমাকে আসতে দিচ্ছিলো না। (হৃদিকে শুনিয়ে মিথ্যে বলল নির্ণয়)

~ বাব্বাহ! এখনি তোর বউ তোকে এত ভালবাসে নির্ণয়? (রাজ)
~ হুম৷ তোরা এখানে কেন? ক্লাসে যাবি না? (নির্ণয়)
~ হ্যা যাব।
~ তো চল।

~ আচ্ছা চল।
সবাই গেলেও হৃদি গেলো না। হৃদি পুকুরপাড়েই দাঁড়িয়ে রইলো। আজকে হৃদির ঠোঁটে চকলেট কালারের লিপস্টিকটা নেই। কেমন যেন দেখাচ্ছে ওকে।

সব খেয়াল করার পরেও নির্ণয় কিছুই বলল না। খানিকবাদে হৃদি ক্লাসে ঢুকে তামান্নার সাথে বসে। জেনারেলি ও নির্ণয়ের সাথে বসতেই অভ্যস্ত তবে আজ ওর সাথে আর বসতে ইচ্ছে করছেনা। নির্ণয় ও এইটাই ভাবলো যে হয়ত হৃদি বাস্তবতা মেনে ওকে ভুলার চেষ্টা করছে।

কিন্তু আদৌ কি তাই? ক্লাস শেষ করে নির্ণয় বিকেলে বাসায় চলে আসে। এর মাঝে একবারো ও হৃদির সাথে কথা বলেনি। বাসায় এসে দেখে তোহা হাত পুড়িয়ে বসে আছে। মেহের, আম্মু, আব্বু সবাই তোহাকে ঘিরে বসে আছে। আর তোহার হাতে মলম লাগানো।

~ কিভাবে পুড়লো হাত? (নির্ণয়)
~ গরম পানি পরে গেছে হাতে। কত না করলাম রান্নাঘরে যেয়ো না তুমি তবুও গেলো।

আর এই আকাম করলো। (মেহের)
~ অনেকখানি পুড়ে গেছে তো। ডাক্তার দেখিয়েছো? (নির্ণয়)
~ হ্যা দেখিয়েছি। তোহা তুমি ঘুমাও এখন। হাতটা বালিশের উপর রেখে ঘুমাও। যন্ত্রণা করলে নির্ণয়কে বলো। নির্ণয় দেখিস ওকে। (তোহার শ্বশুর)
~ আচ্ছা আব্বু।

ঘর থেকে সবাই বের হওয়ার পর নির্ণয় ধুমসে বকে তোহাকে।
~ এই তোমাকে কে বলছে রান্নাঘরে যেতে? নিজেই তো চলতে পারো না আবার রান্না ঘরে কি? আরেকদিন শুনলে পা প্যারালাইজড করে দিব একদম।

~ আপনি আমায় এভাবে বকছেন কেনো? আমি ইচ্ছে করে করেছি নাকি? (তোহা কেঁদে দেয়)
~ আচ্ছা সরি। কেঁদো না। কি আজব মেয়ে তুমি। রান্নাঘরে যেয়ো না তুমি আর। তোমার আম্মু আমায় বলেছে তুমি রাঁধতে পারো না তবে কেন গেলে রাঁধতে? (নির্ণয়)

~ আম্মু এইটাও বলেছে সংসারে কিছু না কিছু করা লাগে।
~ হইছে চুপ। যে স্বামী বুঝেনা সে সংসার বুঝে। কি আজব! (নির্ণয়)


পর্ব ০৩

তোহা নির্ণয়ের বকুনি খেয়ে পোড়া হাত নিয়ে বসে আছে। পাকা বুড়ির মতো তোহা নির্ণয়কে বলল,
~ ক্যান আই আস্ক ইউ আ কুয়েশ্চন?
~ হ্যা বলো।
~ স্বামী মানে কি?

~ হাজব্যান্ড। (দাঁত কটমট করে নির্ণয়)
~ কি করে হাজব্যান্ড দিয়ে? একসাথে থাকা খাওয়া, সুখ, দুঃখ ভাগ করে নেওয়া এইসবই তো?

~ হ্যা এইসবই। (মুচকি হেসে নির্ণয়)
~ আপনি তাহলে আমার হাজব্যান্ড তাইনা?
~ হ্যা।

~ কি বলে ডাকব আপনাকে? হাজব্যান্ড? (তোহা)
~ নির্ণয় বলে ডাকলেও সমস্যা নাই।
~ এ মা ছি ছি! আপনি আমার কত বড়! নাম ধরে কিভাবে ডাকব?
~ তাহলে আর কি! ডেকো যা মন চায়!

~ জানেন আমার না বড়দের দেখলে ভাইয়া ডাকতে অনেক ইচ্ছা করে। কখনো কাউকে ভাইয়া বলে ডাকিনি তো! (হাতে ফুঁ দিতে দিতে তোহা)

~ আসতাগফিরুল্লাহ! তুমি কি আমাকে ভাইয়া ডাকার জন্য অনুমতি চাচ্ছো? (চোখ মুখ কাঁচুমাচু করে নির্ণয়)
~ হ্যা যদি আপনি অনুমতি দেন তো।

(মাথা নিচু করে তোহা)
~ এইটাও শুনার বাকি ছিল! আচ্ছা ডেকো তুমি ভাইয়া।
তোহার সাথে কথা বলেই নির্ণয় ওয়াশরুমে চলে যায় গোসল করতে। আর তোহা মেহেরের ঘরে গিয়ে অযূ করে এসে এশারের নামাজ পড়তে দাঁড়ায়। তোহা সবসময় মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে থাকে। এইটা নির্ণয়ের কাছে খুবই ইউনিক লাগে।

ওর কোনো মেয়ে বন্ধু আজ পর্যন্ত ওড়না নিয়েই ভার্সিটিতে আসেনি আর ঘোমটা তো দূর! নির্ণয় গোসল সেড়ে এসে দেখে তোহা নামাজ পড়ছে তাই ও সাইডে দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ। তোহা সালাম ফিরানোর পর ওই জায়গা ক্রস করে তোহাকে বলে,
~ হাতের জ্বালা কমেছে?

~ না। আছে। কমে যাবে মনে হয়। (তোহা)
~ সাবধানে নামাজ পইড়ো। হাতে যেন ঘষা না লাগে।
~ আপনি নামাজ পড়বেন না?
~ নাহ। আমি নামাজ পড়িনা।

~ কেনো? (অবাক হয়ে তোহা)
~ মনে চাইলে জুম্মা পরি নাইলে নাই। তবে ঈদের নামাজ শিউর পড়া হয়। (বই নিয়ে বসে নির্ণয়)

~ ওহ ভালো তো। তবে এই রুটিন মনে হয়না খুব বেশিদিন থাকবে বলে! (তোহা)
~ কেনো? (ভুরু কুঁচকে নির্ণয়)
~ জানিনা। পড়ুন আপনি ভাইয়া।

তোহার মুখে ভাইয়া শুনে নির্ণয় জোরে জোরে হাসতে শুরু করে। তোহা এই হাসির অর্থ না বুঝেই আবার নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো। এর মাঝে হৃদি অনেকবার কল করেছে নির্ণয়কে কিন্তু নির্ণয় ফোন রিসিভ না করে সাইলেন্ট করে দিয়েছে।

পড়াতেও মনোযোগ দিতে পারছেনা নির্ণয়। সামনেই অনার্স ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম। এখন পড়াশোনা করতে না পারলে থার্ড ক্লাস মার্কা রেজাল্ট আসবে যা ফেইলের সমান। কত শত টেনশন নির্ণয়ের! ও একমাত্র ফিজিক্সেই কাঁচা আর বেছে বেছে পেয়েছেও ওই ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট।

কিভাবে কিভাবে যেন ভর্তি পরীক্ষায় ফিজিক্সে টপ করে ফেলেছিলো নির্ণয় যার ফল আজকের এই চিন্তা। রাত দশটায় তোহা শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে ডিনার সার্ভ করছিলো। শ্বাশুড়ি মা তোহাকে বললেন,
~ নির্ণয় কই? ডাকো ওকে।

~ আচ্ছা মা, ডাকছি।
মেহের টেবিলে বসেছিলো তখন। তোহা ডায়নিং এ থেকেই নির্ণয়কে ডাকছে,
~ ভাইয়া খেতে আসুন। (তোহা)

~ ও মা গো! এই ভাবী তোমার ভাইয়া কে? (মেহের)
নির্ণয়ের মা চোখ বড় বড় করে তাঁকিয়ে আছে তোহার দিকে। তোহা থতমত খেয়ে বলে,
~ মা আমি কি কোনো ভুল করেছি? এভাবে তাঁকিয়ে আছেন কেনো?
~ কাকে ভাইয়া ডাকলা তুমি?

~ আপনি যাকে ডাকতে বললেন তাকে।
~ পাগলি মেয়ে ও না তোমার হাজব্যান্ড হয়? হাজব্যান্ডকে কেউ ভাইয়া ডাকে? (নির্ণয়ের আম্মু)
~ উনিই তো বললেন ডাকতে।

~ না। আর কখনো যাতে না শুনি। তুমি করে বলবা নির্ণয়কে আর “শুনছো” বলে ডাকবা ঠিক আছে? (নির্ণয়ের আম্মু)
~ জ্বি মা।

~ ডাকো তো এখন।
আম্মুর কথা শুনে মেহের হাসছে।

তোহা বুঝতেছেনা শুনছো বলে ডাকলে কি হবে? ভাবতে ভাবতেই নির্ণয় আর ওর আব্বু খেতে চলে আসে। আব্বু নির্ণয়ের পিঠে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করে,

~ ভার্সিটিতে গেলা যে কেউ কি লেকফুল করেনাই?
~ ফ্রেন্ডরা তো একটু আধটু করবেই। (মাথা নিচু করে নির্ণয়)
~ কিন্তু তাদের কথা কানেই তুলবানা। মনে যেন থাকে।
~ আচ্ছা আব্বু। আমার কিছু টাকা লাগবে।

~ যত লাগবে তোমার মায়ের থেকে নিয়ে যেয়ো। আর শুনো নির্ণয় আগামীকাল তো ভার্সিটিতে যাবানা তাইনা? তোহাকে নিয়ে বাইরে থেকে একটু হেঁটে এসো। রেহেনা ছেলেকে কিছু টাকা বেশি দিয়ে দিও। (নির্ণয়ের বাবা)
~ আচ্ছা।

তোহা সবাইকে খাবার বেড়ে না দিলেও সাইডে দাঁড়িয়ে ছিল। পানি এগিয়ে দিচ্ছিলো সে। মেহেরের সাথে এর মধ্যেই তার ভাব জমে গেছে। মেহেরের ইচ্ছে ভাবী আর সে দুজন একই কলেজে ভর্তি হবে। কিন্তু ইচ্ছেটা এখনো কাউকে প্রকাশ করেনি সে।

খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই উঠে যায় আর মা সব কিছু গুছিয়ে রাখে। তোহা তখন শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলো। শ্বাশুড়ি মা তোহাকে বারবার বলছে নির্ণয়কে ভাইয়া না ডাকতে। মেহের ভেবেছে ভাবীকে বোঝানো উচিৎ আসলে ভাইয়ার সাথে ওর সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিৎ!

সেইদিন রাতে নির্ণয় টেবিলে বসে পড়াশোনা করছিলো আর তোহা শুয়ে ছিল। হাতের যন্ত্রণায় বেচারি ঠিক করে শুতেও পারছেনা। এইদিকে হৃদিটাও বারবার নির্ণয়কে কল করেই যাচ্ছে।

যখন নির্ণয় ফোন তুলছিলোই না তখন হৃদি নির্ণয়কে একটা মেসেজ করে। মেসেজটা ছিল “তুই কি ফোন রিসিভ করবি নাকি আমি নিজের হাত কাটবো?” এই মেসেজটা দেখেই নির্ণয় ভেবে পায়না কি করবে! পাঁচ মিনিট পর হৃদি আবারো ফোন দিলো। এক প্রকার বাধ্য হয়েই নির্ণয় ফোন রিসিভ করলো।

~ এতক্ষণ ফোন রিসিভ করছিলি না কেনো? (রেগে গিয়ে হৃদি)
~ সেইটা কি তুই বুঝিস না? একটা সদ্য বিবাহিত ছেলে এত রাতে বউ রেখে অন্য কোনো মেয়ের ফোন কিভাবে রিসিভ করে? সেন্স নেই তোর? (নির্ণয়)

~ ও তার মানে তুই ওই মেয়েটার রুপেই পাগল হয়ে গিয়েছিস? কিরে নির্ণয় এত সহজে তুই ওই বাচ্চা মেয়েটাকে নিজের বউ বলে মেনে নিলি? আবার এখন আমাকে এই কথা বলছিস? (অবাক হয়ে হৃদি)
~ এছাড়া তো বলার কিছু নাই।

তোহা জেগে আছে। আমি রাখছি। (মিথ্যে বলল নির্ণয় যাতে হৃদির সাথে ওর আর কথা বাড়ানো না লাগে)
~ তুই অনেক পালটে গেছিস নির্ণয়। আচ্ছা তোহা জেগে কি করছে এত রাতে? (হৃদি)
~ এসব কি তোকে বলা উচিৎ? (হেসে নির্ণয়)
~ হ্যা উচিৎ।

~ ও শুয়ে আছে আমার হাতের উপরে। এর বেশি কিছু বলব? শুনবি? (নির্ণয়)
~ ফোন রাখি।

হৃদি রেগে ফোনটা কেটে দিলো। নির্ণয় ও এখন মিথ্যে বলতে শিখে গেছে৷ যেই মেয়েকে এখনো অবধি ও টাচই করেনি সেই মেয়ের সম্বন্ধে এতগুলো কথা ও হৃদিকে অবলীলায় বলে দিলো যাতে হৃদি সত্যিটা মেনে দ্রুতই সরে যায় ওর কাছ থেকে। কিন্তু সত্যিই কি তাই সম্ভব?

রাতে নির্ণয় টেবিলের উপরেই ঘুমিয়ে যায় আর তোহা খাটে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে তোহা দেখে নির্ণয় টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। তোহা নির্ণয়কে ডেকে বিছানায় শুতে বলে। এরপর ও নামাজ পড়ে, কুরআন পড়ে আবার শুতে যায়। এক মুহুর্তের জন্য তোহা নিজের ওড়না গা থেকে সরায়নি। এমনকি ঘুমাতে গেলেও নির্ণয়ের জন্য তোহা ওড়না নিয়েই ঘুমিয়েছে।

ভারী অদ্ভুত এই সংসার। কেউ নয় এ পাকা আবার কেউ নব্বইতেও কাঁচা। এসএসসি দিলেও তোহা মেয়েটা একদমই ম্যাচিউরড না। চাইল্ডিশ একটা স্বভাব ওর মঝে আছেই। ফের খাটে ঘুমাতে এসে তোহা একটু আমতা আমতা করে। এরপরও ও ঘুমালো। এক ঘুমে সকাল সাতটা বাজিয়ে ফেলল মেয়ে৷ তোহা ঘুম থেকে উঠে দেখে নির্ণয় ঘুমাচ্ছে।

খাট থেকে নামতে গিয়ে ওড়নার সাথে পা পেঁচিয়ে তোহা নির্ণয়ের উপর পরলো। নির্ণয় ও লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে যায়। উঠে দেখে তোহা ভীষণ ব্যাথা পেলো হাতে। পুরো শরীরের ভর গিয়ে পরলো তোহার হাতে। হাতের চামড়াটা ছরে গেছে। নির্ণয় চোখমুখে পানি দিয়ে তোহার হাতে মলম লাগাতে লাগাতে বলল,
~ কি কর? দেখে চলতে পারোনা?

পরে যাও কিভাবে?
~ এইটা কি হলো? (মাথা নিচু করে তোহা)
~ কোনটা? (তোহার দিকে তাঁকিয়ে নির্ণয়)
~ আপনার উপর পরে যাওয়ার পর আমার কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো। কি ছিল এইটা? (তোহা)
~ মানে?

~ মানে জানিনা তো। কিন্তু খুব ভালো লাগছিলো। এই অনুভূতির নাম কি? (তোহা)
~ পাগল হতে এই প্রথম তোমাকে দেখলাম। যাও কোথায় যাচ্ছিলে। (নির্ণয়)
~ হুম।

তোহা নির্ণয়ের সামনে থেকে চলে গিয়ে ভাবতে লাগলো কি হলো এইটা? এই ফিলিংস তো কখনো হয়নি। নাম কি এই ফিলিংস এর?
এক মাস পর,

তোহা আর নির্ণয় আগের মতোই আছে। তোহার আর মেহেরের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে বিশদিন আগে। তোহা গোল্ডেন পেয়েছে আর মেহের এ গ্রেড। দুজনেই সাইন্সের।

তোহার রেজাল্ট শুনে তোহার শ্বশুর সেইদিন বাড়ির সবাই এবং সব আত্মীয় স্বজনদের মিষ্টি খাইয়েছিলো। নির্ণয় তো অভিভূত। তোহা এত ট্যালেন্টেড ও আগে জানতোই না। তাই নির্ণয় ঠিক করে ওকে একটা ভালো কলেজে পড়াবে। মেহের ও ভীষণ খুশি নিজের রেজাল্ট নিয়ে কারণ ও পড়াশোনার একদমই করেনি।

নির্ণয় বউ আর বোনকে একটা ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলো। দুজন একসাথে যাবে আসবে কোনো সমস্যা হবেনা। আর কলেজে ছেলে মেয়ে আলাদা শিফট বলেই তোহা ভর্তি হতে রাজি হয়েছে। তোহার রেজাল্ট জানার পর হৃদি নির্ণয়কে বলেছিলো,
~ আরেহ বাহ তোর বউ তো শুধু সুন্দরি না রে! ট্যালেন্টেড ও বটে। কলেজে ভর্তি করাচ্ছিস। সামলে রাখিস বউকে।

~ জাস্ট শাট আপ হৃদি। আমার পার্সোনাল লাইফে নাক গলানোর তুই কে? তুই তোহাকে নিয়ে কোনো কথা না বললে আমি খুশি হব। আর বেহায়ার মত কেন বারবার আমার সাথে কথা বতে আসিস? লজ্জা করেনা তোর?

সেইদিনের পর থেকে হৃদি নির্ণয়কে আর ফোন করেনি। নির্ণয় ও হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। নির্ণয় চেষ্টা করছে তোহার প্রতি দুর্বল হওয়ার, তোহাকে নিয়ে সুখি হওয়ার।

কিন্তু কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে ও বারবার। রাতে যখন তোহা ঘুমায় তখন ওকে দেখতে চাঁদের মতো সুন্দর দেখায়, ইচ্ছে করে কপালে একটা চুমু দিয়ে দিতে কিন্তু নির্ণয় দেয়না কারণ কোথায় যেন সে একটা বাঁধা পায়। হয়ত তোহা এখনো ছোট বলে!

নির্ণয়ের আর মাত্র পনেরোদিন পরেই ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল। পড়াশোনা নিয়ে খুব প্রেসারে আছে নির্ণয়।

এইদিকে তোহার কলেজে যাওয়ার প্রথমদিন নির্ণয় সাথে যেতে পারলো না কারণ ওর সেইদিন ভার্সিটিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ছিল। নির্ণয়ের বাবা~ ই দুই মেয়েকে নিয়ে সেইদিন কলেজে যান।

কলেজটা তারও খুব পছন্দ হয়। প্রথমদিন ক্লাস করে দুজনেই খুব মজা পায়। রাস্তা দিয়ে আসার সময় তোহার আপাদমস্তক কালো বোরকা আর হিজাবে ঢাকা থাকে আর মেহের সাদা কামিজ, ক্রস বেল্ট আর সালোয়ার পরেই চলে।

তোহা ভেবেছে মেহেরকে একদিন বুঝাবে সব। নিশ্চই মেহের সবটা বুঝবে কারণ ও ভালো মেয়ে। কলেজ থেকে এসে তোহা আম্মুকে ফোন করে জানালো সবটা। তোহার আম্মুও ভীষণ খুশি হয়। ঠিক সেইদিনই সন্ধ্যাবেলা দারুণ একটা সংবাদ আসে নির্ণয়ের কাছে।

নির্ণয়ের বিশ্বাস হয়নি। দুইদিন আগে ও একটা কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ পদে একটা সিভি জমা করেছিলো অনলাইনে তাও সেইটা শখের বশে। চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। দুইদিন পর নোটিশ আসে নির্ণয় চাকরিটা পেয়ে গেছে, ছয় ঘণ্টা ডিউটি। সেইদিন বাড়ির সবাই খুব খুশি হয়। নির্ণয়ের বাবা বলেই ফেলে,

~ দেখেছিস যোগ্য পাত্রী বিয়ে করেছিস বলে আজ তোর এত উন্নতি। এইজন্যই বলতাম বিয়ে কর, ভাগ্য খুলে যাবে। মিললো তো আমার কথা? সবাইকে ট্রিট দিচ্ছিস কবে?
~ ফাইনাল এক্সামের পর। (হেসে নির্ণয়)
~ অপেক্ষায় রইলাম।

তোহা আসার পর নির্ণয় বেশ ভালভাবেই কথা বলতে পারে আব্বুর সাথে। আগে যেমন যমের মতো বাবাকে ভয় পেতো এখন আর তেমন পায়না। আসলেই তোহা আসার পর অনেক কিছু বদলে গেছে। মাঝে মাঝে তোহার বাচ্চামো দেখে নির্ণয় হাসতে হাসতে কুটোকুটি খায়। একটা বাচ্চামোর উদাহরণ দেওয়া যাক~

বিয়ের পর তোহার যখন প্রথম রজঃচক্র শুরু হয় তখন তোহা ভয় পেয়ে যায় কারণ কাকে বলবে এখন ও? কে ওকে দরকারি জিনিসপত্র গুলো এনে দিবে? আগে তো আম্মু এনে দিত। এখন ও কাকে বলবে? সেইদিন সকালে নির্ণয় তোহার মুখ দেখে বুঝে যায় কিছু একটা হয়েছে। নির্ণয় তোহাকে ভালভাবেই জিজ্ঞেস করে,
~ তোমার কি কিছু হয়েছে?

~ না। আপনাকে বলা যাবেনা। আপনার ফোনটা দিবেন? আমি একটু আম্মুকে ফোন করব। (এই কথা বলেই মেয়ে কেঁদে দেয়)
~ আরে বোকা কাঁদছো কেনো? এই নাও ফোন। সিরিয়াস কিছু হয়েছে তোহা?

কথার উত্তর না দিয়ে তোহা বারান্দায় গিয়ে ওর আম্মুকে সব বলে। তোহার আম্মু বলে নির্ণয়কে সব বলতে। কিন্তু তোহা লজ্জায় নির্ণয়কে বলবেনা। আড়াল থেকে নির্ণয় তোহার কান্নার আওয়াজ আর কথা দুইটাই শুনছিলো।

তোহার কথা শুনে নির্ণয় হেসে দেয় এইবার। তোহার ফোনে কথা বলা শেষ হলে নির্ণয় জিজ্ঞেস করে,
~ তুমি অসুস্থ না? এইটা আমায় বলতে অসুবিধা কোথায়? তুমিই না বলো আমি তোমার একমাত্র বন্ধু যার সাথে তুমি অনেক কথা বলো। এইটা বললেই পারতে।

~ না পারতাম না। (তোহা আবারো কাঁদছে)
~ কেঁদো না। আমি মেহেরকে এই ঘরে পাঠাচ্ছি। ওর সাথে কথা বলো। যা যা লাগবে ওর কাছ থেকে চাও। আর তোমার কি কি লাগবে সেইটা লিখে দাও আমি দোকানে গিয়ে নিয়ে আসছি। আপাতত মেহেরের থেকে হেল্প নাও।
~ আচ্ছা।

লজ্জায় তোহার মাথা ছিঁড়ে যাবে মনে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তোহার মিস্টার শুনছো জানলোই। ও হ্যা তোহা নির্ণয়কে মিস্টার শুনছো বলেই ডাকে। নির্ণয় মেহেরের ঘরে গিয়ে বলে তোহার কাছে একবার যেতে। এরপর ও মেহেরের ঘরে এসেই বসে থাকে।

সেইদিন তোহার মুখটা কোনোভাবেই ভুলার মতো না। এত ভয় পেয়েছিলো ও। নির্ণয় এক সপ্তাহ পর কোম্পানিতে জয়েন করে আর পরের সপ্তাহ থেকে এক্সাম ও দেয়। যেদিন এক্সাম থাকে সেইদিন অনেক রাত পর্যন্ত নির্ণয়কে অফিসে থাকতে হয়।

তোহা সেইদিন একা ঘুমাতে পারেনা, ভয় পায়। রাত আড়াইটা/তিনটায় নির্ণয় বাড়ি ফেরে ততক্ষণ পর্যন্ত তোহা জেগে থাকে। একদিন রাত তিনটায় বাড়ি ফেরে নির্ণয়। তোহা সেইদিন সারাঘর আলো করে বই নিয়ে বসেছিলো। নির্ণয়ের কড়া হুকুম ইন্টারেও গোল্ডেন পেতেই হবে।

তাই এত পড়াশুনা। নির্ণয়কে খুব ক্লান্ত লাগছিলো সেইদিন। জেনারেলি নির্ণয়কে এতটা ক্লান্ত কখনো দেখেনা তোহা। তোহা বলে,
~ আপনি বসুন আমি লেবুর পানি নিয়ে আসছি।

সেইদিন প্রথম তোহার হাত ধরে তোহাকে যেতে না দিয়ে নিজের কাছে এনে তোহাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলো নির্ণয়। তোহা শুধু কাঁপছে। মুখ দিয়ে তোহার কোনো কথা বের হচ্ছেনা৷ তারপরও তোহা কাঁপা গলায় নির্ণয়কে প্রশ্ন করে,
~ কি হয়েছে আপনার? কাঁদছেন কেনো এইভাবে?
~ নির্ণয় চুপ

~ বলেন না কি হয়েছে আপনার? এই নিন পানি খান।
~ নির্ণয় চুপ।
তোহা নির্ণয়ের কান্না দেখে ভয়ে নিজেও কেঁদে দেয়। এরপর আবার বলে,
~ বলেন না কেনো আপনার কি হয়েছে?

~ সবটাই বলব। এই মেন্টাল প্রেসার আমি জাস্ট আর নিতে পারছিনা। (নির্ণয়)
~ কি হয়েছে আপনার? কিসের প্রেসার?

~ হৃদি আজকে ভার্সিটিতে এক্সাম শেষে আমায় ডিরেক্ট বলে “আমি যদি দুইদিনের মধ্যে ওকে বিয়ে না করি তো ও সুইসাইড করবে সাথে সুইসাইড নোটে আমার নাম লিখে যাবে। আবার এইটাও বলেছে ও আমার বাবা মায়ের কাছে এসে বলবে আমি ওকে লুকিয়ে বিয়ে করেছি”। এখন আমি কি করব তোহা? (নির্ণয়)
~ কে এই হৃদি?


পর্ব ০৪

নির্ণয়ের মুখ থেকে সব কথা শুনে তোহা প্রশ্ন করলো,
~ কে এই হৃদি?

~ তোমাকে বলা হয়নি। হৃদি আমার ব্যাচমেট। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলতে পারো। ও আমাকে ভালবাসে সেইটা আমায় বিয়ের দুইদিন আগে বলেছে।

আমিও ওকে ভালবাসতাম কিন্তু কখনো বলিনি। অবশ্য ভালবাসা কি তুমি তো সেইটাই বুঝবেনা। (নির্ণয়)
~ হৃদি আপু আপনাকে পছন্দ করতো আবার আপনার বিয়ে হয়ে গেছে জেনেও আপনাকে বিয়ে করতে চায়? (তোহা)
~ হ্যা চায়।

~ আপনি কিছু বললেন না?
~ আমি কি বলব? আমার জন্য তো কোনো অপশন ও রাখেনি। তোহা ট্রাস্ট মি আমি হৃদিকে ভুলে যাওয়ার পুরা চেষ্টা করছি। আজকের পর থেকে তো আমি ওর চেহারাও দেখতে চাইনা। ও এতটা কুৎসিত মনের মানুষ আমি বুঝতে পারিনাই।

~ ড্রেস পাল্টাবেন না? যান হাত মুখ ধুয়ে আসুন। কালকে বাবা মায়ের সাথে সরাসরি আলোচনা করুন এইটা নিয়ে।

নির্ণয় তোহাকে ছেড়ে উঠে যায়। তোহা নিজের হাত স্পর্শ করে আছে কারণ নির্ণয়ের ছোঁয়া ওর কাছে মারাত্মক লেগেছিলো। নির্ণয় ছুঁয়ে দেওয়ার পরেই তোহা পাগল হয়ে গিয়েছিলো।

একটা ছেলে যদি একটা মেয়েকে ছুঁয়ে দেয় তবে কি এমনই লাগে? গোসল করে এসে নির্ণয় খাটে বসে পরে। তোহা ওর জন্য খাবার বেড়ে নিয়ে আসে। নির্ণয় খাবেনা বলে জানিয়ে দেয়।

তখন তোহা নিজেই ভাত মেখে নির্ণয়কে খাইয়ে দিতে শুরু করে। নির্ণয় ও তখন বাধ্য হয়েই খেয়ে নেয়। তোহা নির্ণয়কে খাওয়াতে খাওয়াতে বলল,
~ একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
~ হ্যা বলো।

~ আপনি আমায় কেন জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন? একটা ছেলে কি কখনো একটা মেয়েকে এইভাবে জড়িয়ে ধরে? (তোহার চোখে বিষ্ময়)
~ আমরা একটা ছেলে আর একটা মেয়ের মতো নই তোহা।

তাই তো তোমায় জড়িয়ে ধরতে পেরেছি। আমরা স্বামী স্ত্রী। একদিন তোমায় বুঝাবোনে সব যেদিন আমার প্রয়োজন হবে। ভাল লাগছেনা আজকে।
~ একটা কথা বলব?
~ কি?

~ আজকে আমার সাথে তাহাজ্জুদ পড়বেন? মন দিয়ে নামাজ পড়েই দেখুন না সব চিন্তা মাথা থেকে বের হয়ে যাবে।
~ ভালো লাগছেনা যে বললাম! (পানি খেতে খেতে নির্ণয়)
~ ভালো লাগবে। আসুন আপনি।

তোহার কথায় নির্ণয় অযু করতে যায়। রাত তখন চারটার বেশি। খানিকবাদে ফজরের আযান পড়ে যাবে। তাই চার রাকা’ত তাহাজ্জুদ পড়লো ওরা দুজন।

নামাজ শেষে নির্ণয় টুপি খুলতে যাবে তখনি তোহা আবার বলল,
~ ফজরটাও পড়ে নিন। আসুন। ওয়াক্ত হয়ে গেছে।
~ আচ্ছা।

এরপর দুজন মিলে ফজরের নামাজ পড়ে নির্ণয় ঘুমাতে যায়। তোহা বসে বসে কুরআন শরীফ পড়ে। আধা ঘণ্টা পর সে ও ঘুমাতে যায়। নির্ণয় মাথায় হাত দিয়ে কি যেন চিন্তা করছিলো।

~ এখনো ঘুমান নি? (খাটে শুয়ে তোহা)
~ আসছেনা ঘুম।
~ আমি কি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিব? (খানিকটা ইতস্তত করে তোহা)

~ দাও।
এরপর তোহা নির্ণয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর নির্ণয় ও বউয়ের নরম হাতের ছোঁয়া অনুভব করছিলো। এক পর্যায়ে নির্ণয় তোহার দিকে ঘুরে তোহাকে আলিঙ্গন করে ফেলে।

তোহা অস্বস্তিতে পরে যায়। তবুও কিছু বলেনা কারণ মা বলেছে স্বামীর সুখ দুঃখে পাশে থাকতে। এখন নির্ণয়কে সরে যেতে বললে নির্ণয় আরো কষ্ট পেতে পারে। তাই তোহা আর কিছুই বলেনি নির্ণয়কে। কিছুক্ষণ পর নির্ণয় ঘুমিয়ে যায়। নির্ণয়ের হাতটা তোহা নিজের উপর থেকে সরায়। কমপক্ষে দেড় গিবা দূরত্বে দুজন শুয়ে আছে।

সকালে নির্ণয় ঘুম থেকে দেরি করে উঠে কারণ আজ শুক্রবার। না আছে ভার্সিটি আর না আছে অফিস। তাই বেশ আরাম করেই ঘুমাচ্ছিলো ও। হঠাৎ হৃদির ফোনের ভাইব্রেশনে নির্ণয় উঠে যায়।

ফোন রিসিভ না করেই ও ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। তোহা, মেহের, বাবা মা সবাই ড্রইংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সবার ব্রেকফাস্ট করা শেষ। নির্ণয় ও মন খারাপ করে সোফায় গিয়ে বসে মেহেরের পাশে। মেহের জিজ্ঞেস করে,
~ কিরে ভাইয়া? মুড অফ?

~ আব্বু~ আম্মু তোমাদের সাথে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
~ কি? আগে খেয়ে নে। বেলা তো অনেক হলো। (আম্মু)
~ না আম্মু। আগে বলাটা জরুরি। প্লিজ শুনো।
~ আচ্ছা বল।

(নির্ণয়ের বাবা)
~ আমি আমার ক্লাসমেট হৃদি নামে কাউকে গোপনে ভালবাসতাম। কখনো বলা হয়নি। হৃদিও আমায় ভালবাসে। কিন্তু ও আমার বিয়ের দুইদিন আগে আমায় বলেছে তাই আমার আর কিছু করার ছিলনা তোমাদের মুখে চেয়ে। কিন্তু আমি বলিনি যে আমি ওকে ভালবাসি। বিয়ের পর আমি ওর সাথে সম্পুর্ন যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছি।

ও আমায় সারাক্ষণ ফোন করতো, আমি রিসিভ করতাম না। মাঝে মাঝে অপমান করতাম। কিন্তু গতকাল এক্সাম শেষে ও আমায় বলেছে আমি যদি ওকে বিয়ে না করি ও সুইসাইড করবে আর নোটে লিখে যাবে আমি ওকে ঠকিয়েছি বলেই ও সুইসাইড করেছে। ও আমায় দুইদিন সময় দিয়েছে। আমি এখন কি করব আব্বু? (মাথা নিচু করে নির্ণয়)

নির্ণয়ের কথা শুনে বাবা মা দুজনেই দাঁড়িয়ে যায়। নির্ণয়ের বাবার মাথা চট করেই গরম হয়ে যায়। উনি বলে,

~ ওর মতো মেয়ে দ্বারা এগুলাই সম্ভব। কোন ফেমিলির মেয়ে দেখতে হবেনা? স্বয়ং সাব্বিরের মেয়ে। বাপ যেমন মেয়েও তো তেমন রে! মেহের তুই তোর ঘরে যা তো। তোর ভাইয়ার সাথে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে। তোহাকে নিয়ে যা। (নির্ণয়ের বাবা)
~ আচ্ছা আব্বু। ভাবি এসো।

(মেহের)
মেহের আর তোহা ড্রইংরুম

~ তোকে এত তারাতারি বিয়ে কেন দিলাম জানিস? কারণ তোর মা আর আমি জানতাম তুই ওই হৃদিকে ভালবাসিস। ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাতে না যায় তাই তোকে জোর করে বিয়ে করানো। এখন বুঝেছিস যার ফেমিলি খারাপ সে ও খারাপ হয়।

খুব অল্প ছেলেমেয়েই রিকোভার করে আসে। ছোট থেকে ওর বাবাকে চিনি। ফেমিলি থেকে কি শিক্ষা পাবেনা? যতই ভদ্র, সভ্য, মেধাবী ছাত্রীই হোক না কেনো প্রাইমারি শিক্ষাটাই ওর ভুল। এক্ষুনি আমি সাব্বিরের বাসায় যাব। গিয়ে জিজ্ঞেস করব ওর মেয়ে এইরকম কেন করছে। রেহানা রেডি হও।
নির্ণয় আর কিছু বলল না।

মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসে রইলো। নির্ণয়ের বাবা প্রচন্ড ক্ষেপে গেছে। কি হবে ওখানে কে জানে! এক ঘণ্টার মধ্যে নির্ণয়ের বাবা মা হৃদির বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। নির্ণয়কে তোহা খেতে দেয়। কিন্তু নির্ণয় খাচ্ছে না।
~ খান না কেনো আপনি?
~ ভাল লাগছেনা। রেখে দাও। খাবনা।

এরপর নির্ণয় ডায়নিং থেকে উঠে ঘরে চলে যায়। মেহের তোহাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে,
~ ভাবী ভাইয়া কি খায় নাই?
~ না।

~ আমার ভাইয়াকে এমন আমি কখনো দেখিনাই। যেই ভাইয়া আমার সাথে ঝগড়া না করে দিন শুরু করতে পারেনা আমার সেই ভাইয়া বিয়ে হওয়ার পর সম্পুর্ণ চেইঞ্জ হয়ে গেছে! কারণটা আজ বুঝেছি আমি। ভাইয়া এতদিন ডিপ্রেশনে ছিল কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। তুমিও তো আমায় বললানা ভাবী।

~ আমিও জানতাম না মেহের। কালকেই জেনেছি। উনি আমাকেও কিছু বলেনাই। (তোহা)

~ তুমি জিজ্ঞেস করবানা ভাইয়ার মুড অফ থাকে কেন?
~ আমি মানুষের মন বুঝিনা মেহের। এইজন্য জিজ্ঞেস করতে পারিনাই। (তোহা)

~ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড ভাবী একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করব?
~ হ্যা কর।

~ ভাইয়ার সাথে কি তোমার স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হয়নাই?
~ এই সম্পর্কে বিশেষ কিছু আছে নাকি মেহের? যেদিন বিয়ে করেছি সেইদিন থেকেই তো আমরা স্বামী স্ত্রী। নতুন করে কি সম্পর্ক হওয়ার ছিল? (অবাক হয়ে তোহা)

~ তুমি জানো না ভাবী? (চক্ষু শীতল করে মেহের)
~ কি জানব?

~ বিয়ের পর ভাইয়া কখনই তোমার কাছে আসেনাই?
~ উনি একটা ছেলে আর আমি মেয়ে। উনি কেনো আমার কাছে আসবে?

~ ভাবী ভাইয়া তোমার বর হয়, বর। দুনিয়ার আর কোনো ছেলে তোমার কাছে আসতে পারবেনা। এই কাছে আসার অধিকার শুধু ভাইয়ার। আমি অনেক আগেই বুঝেছি তুমি স্বামী স্ত্রীর মানে বুঝো না।

শুনো ভাবী স্বামী স্ত্রী মানেই নতুন একটা জীবনের শুরু। একটা ছেলে আর একটা মেয়ের কত স্বপ্ন থাকে জানো এই বিয়েকে কেন্দ্র করে? তার বর তাকে ভালবাসবে, আদর করবে, ঘুরতে নিয়ে যাবে। কত ফ্যান্টাসি থাকে এই বিয়েকে ঘিরে।

আর এসব তুমি কিছুই বুঝো না ভাবি? বাসর রাত থেকেই একে অপরের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় সব নিয়ে। এই যুগের মেয়ে হয়ে তুমি জানোই না স্বামী মানে কি! অবশ্য জানবা কিভাবে সঙ্গ পাওনি তো। কিন্তু ভাবী তুমি তো অনেক হাদিস কুরআন পড়

হাদিসে কি লিখা নেই নবিজি আর বিবি আয়েশার কথা? ওনারা একপাত্রে খেতেন, নবিজি কত রোমান্টিক ছিলেন স্ত্রীদের প্রতি, এসব কি তুমি পড়নাই?

আমি যখন ফেসবুক স্ক্রল করি তখন এসব দেখে খুবই আনন্দিত হই যে নবিজি স্ত্রীদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতেন। আচ্ছা ভাবী তুমি কি কখনো তোমার ছেলে কাজিনদের সাথে একসাথে ঘুমানোর অনুমতি পাবে?
~ কখনই না।

~ কিন্তু ভাইয়াকে তুমি চিনো না অথচ তার সাথে তুমি একঘরে থাকতে পারছো। কোন শক্তির বলে? সেই শক্তিটাই বিয়ে। ভাবী প্লিজ তুমি এসব বুঝো। আর কিভাবে বুঝাবো তোমায় বলো? যত তাড়াতাড়ি তুমি বুঝবে তত তাড়াতাড়িই তোমার জন্য ভালো। এখন থেকে ভাইয়ার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা কর। ভাইয়াকে সময় দাও। আচ্ছা ভাবী আমরা সন্তান হলে বলিনা ভালবাসার ফসল? বলি কি না?
~ হ্যা আম্মু বলতো আমায়।

~ সেই ভালবাসাটাই জাগাও ভাইয়ার মনে। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলতে পারছিনা। ভাইয়া তোমায় কিছুই বলেনা?
~ নাহ৷

~ আচ্ছা তুমি গিয়ে দেখো ভাইয়া কি করে। ভাইয়ার কাছে যাও।
তোহা মেহেরের ঘর থেকে কি যেন ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে চলে আসে। নির্ণয় খাটে শুয়ে ছিলো। সিলিং এর দিকে তাঁকিয়ে কি যেন ভাবছিলো। তোহা এসে নির্ণয়কে বলল,
~ আপনার মোবাইলটা দিন তো। আম্মুকে ফোন করব।
~ এইযে নাও।

তোহা বারান্দায় গিয়ে ওর আম্মুকে ফোন করে মেহেরের বলা কথাগুলো বলল। তোহার মা শুনে বলল,
~ ঠিকই বলেছে মেহের। তুই নির্ণয়ের স্ত্রী হয়ে উঠ মা। নয়ত তোকে যে আজীবন পস্তাতে হবে। তুই কি চাস তোর গাফিলতির জন্য নির্ণয় তোকে ছেড়ে দিক?
~ না আম্মু।

~ তাহলে ভেবে দেখিস এসব মা। মা হয়ে একটা কথা তোকে আমি বলি। খারাপ ভাবিস না৷ তোকে বুঝানোর জন্যই বলছি। আজকে তুই নিজেই নির্ণয়ের বুকের উপর ঘুমাবি। আর দশটা ছেলের সাথে ওর তুলনা করবিনা।

আর দশটা ছেলে তোর সাথে যা না পারবে নির্ণয় সেইটা পারবে। স্বামী স্ত্রী শুধু একটা সম্পর্কের নাম না। বন্ধুত্ত্ব, সম্মান, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস সব কিছু মিলেই স্বামী স্ত্রী হয় মা।
~ হ্যা মা আমি বুঝেছি। রাখি এখন। উনি খায়নাই কিছু এখনো। খাবার দিব ওনাকে।
~ যা।

ফোন রেখে তোহা নির্ণয়কে খাবার প্লেট এনে দিয়ে বলল,
~ উঠুন।

~ খাবনা আমি তোহা।
~ খেয়ে গোসল করে মসজিদে যান। জুম্মার নামাজ আজকে।
~ হ্যা যাব কিন্তু খাবনা।

~ কে না কে হৃদি তার জন্য আপনি না খেয়ে থাকবেন? উঠেন আমি খাইয়ে দিচ্ছি।

~ তোহা জোর করনা।
~ তো কি হৃদি আপু এসে জোর করবে? (ভুরু কুঁচকে তোহা)
~ কিহ?

~ হিহ। উঠেন এখন। ফালতু চিন্তা করছেন কেন? হৃদি সুইসাইড করে যদি নিজের জাহান্নামের টিকেট নিজেই কাটে তাতে আপনার কি? আর রইলো সুইসাইড নোট ওইটা পুলিশ বুঝবে।

উঠেন এখন। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড না খেয়ে থাকবে আর আমি দেখব সেইটা? উঠতে বলছিনা? (চোখ রাঙিয়ে তোহা)
~ তুমি এত ভয়ঙ্কর হইলা কিভাবে? এভাবে তাঁকানো শিখলা কার কাছ থেকে?

~ শিখছি বই পড়ে। উঠেন না প্লিজ।
~ আচ্ছা উঠছি।
নির্ণয় উঠার পর তোহা নির্ণয়কে খাইয়ে দেয়। খাওয়া শেষে নির্ণয় গোসল করতে যায়। ঘরে এসে ও হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবি বের করে পরবে বলে।

নির্ণয় পাঞ্জাবিটা পরার আগেই তোহা বলে,
~ পরবেন না এইটা। ছেলেদের হলুদ আর লাল রঙের কাপড় পড়া সম্পুর্ণ হারাম। এই রঙ কাফেরদের পরিচয় বহন করে। (রেফারেন্সঃ মুসলিম ২০৭৭)
~ কি বলছো? হলুদ আমার প্রিয় রঙ! (নির্ণয়)
~ বাদ দিয়ে দিন এইটা। কালো বা সাদা পাঞ্জাবি থাকলে পরেন।
~ আছে।

~ তাহলে রেখে দিন এইটা। জিন্স ভাঁজ করে ভালভাবে পরবেন কিন্তু।
~ আচ্ছা। (হেসে নির্ণয়)
নির্ণয় সাদা রঙের একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে মসজিদে চলে যায়। যাওয়ার আগে নির্ণয়ের হাতে জায়নামাজ ধরিয়ে দেয় তোহা। নির্ণয় ওইটা হাতে নিয়েই মসজিদের দিকে হাঁটা ধরে।

মা বাসায় নেই৷ আজকে রান্না তো ওকেই করা লাগবে। কিন্তু কি রান্না করবে আর কিভাবেই বা করবে? না জানি ওই বাসায় কি হচ্ছে! কত শত ভাবনা তোহার মনে উঁকি দিচ্ছে কিন্তু তোহা পরে আছে সেই স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের ভাবনায়।


পর্ব ৫

নির্ণয় কষ্ট পাচ্ছে নিজের মনে মনে। নির্ণয়ের কষ্ট সবাই বুঝতেছে কিন্তু কিছু করার নাই। কুমিল্লা আসার পর নির্ণয় গাড়ি থেকে নামে।
~ আমি ভেতরে না যাই? এখানে ওয়েট করি? (নির্ণয়)
~ মাইর খাবি। আয়।

আব্বু নির্ণয়কে ধরে ভেতরে নিয়ে গেলো। মেয়ের বাবা গেইটে দাঁড়ানো আর সাথে ঘটক অর্থাৎ যিনি এই সম্বন্ধটা ঠিক করেছেন। নির্ণয় আর বাকি সবাই তাদের সালাম দিলো। লোকটাকে বড্ড চেনা চেনা লাগছে নির্ণয়ের! কোথায় যেন দেখেছে। ধুম করেই মেয়ের বাবা বলে ফেললেন,

~ তুমি নির্ণয় না? আমার মেয়ে আর আমাদের বান্দরবানে বাঁচিয়েছিলে? (অবাক হয়ে মেয়ের বাবা)
~ ও হ্যা। এইজন্যই আপনাকে আমার চেনা চেনা লাগছিলো। (নির্ণয়)
~ তুমিই তাহলে পাত্র? (হেসে মেয়ের বাবা)

নির্ণয় আর কথা না বলে চুপ করে রইলো। নির্ণয় ওর বাবা মাকে পুরো ঘটনা বলল। শুনে তারা হাসছে কিন্তু নির্ণয়ের মুখে হাসি নেই। শেষ পর্যন্ত এসএসসি পাস করা পিচ্চি!

বাড়িতে গিয়ে নির্ণয় বসে। বেশ পরিপাটি করে গোছানো বাড়িটা। ড্রইংরুমের দেয়ালে আলপনাও আঁকা রয়েছে। হ্যান্ড মেড শো পিসের অভাব নেই। নির্ণয় মাথা নিচু করে বসে আছে। তোহার মা নির্ণয়ের সাথে খোশ গল্প সেড়ে ফেলে। সবাইকে লাঞ্চ করিয়ে আড্ডা দিতে বসে দুই পক্ষ।

নির্ণয় সেইভাবেই মাথা নিচু করে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর তোহাকে সবার সামনে নিয়ে এলো ওর মা। তোহা সবাইকে সালাম দিয়ে সোফার উপর বসে। মেহের তোহার দিকে তাঁকিয়ে হা করে আছে। নির্ণয়ের আম্মু হেসে দেয় মেয়েকে দেখে।

~ মেয়ে তো মাশাআল্লাহ! পড়াশোনা কতদূর? (নয়ন)
~ সবেমাত্র এসএসসি দিলাম। (তোহা)
~ তার মানে আমার বয়সী ভাবি। (মেহের)
~ চুপ কর মেহের।

তোমার নাম কি? (তোহাকে প্রশ্ন করলো নয়ন)
~ তোহা। পুরো নাম জাইকা জামান তোহা।
~ নামটাও সুন্দর। নির্ণয় তুমি দেখো। (নয়ন)
~ তোমার পছন্দ হলেই হবে।

(নির্ণয়)
তোহা নির্ণয়ের পায়ের দিকে তাঁকায় বারবার। কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকে যায় তোহা। প্রশ্ন উত্তর আর দেখাশোনার পালা শেষ করে তোহাকে ঘরে রেখে আসে ওর আম্মু। নির্ণয়ের ব্যাপারে মোটামুটি জানে তোহার বাবা মা।

কিন্তু মেয়ের জামাই হিসেবে যতটুকু জানার দরকার ততটুকু জানেন না তারা। তাই নির্ণয়কে বারবার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। দশ মিনিট নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নির্ণয়ের ফেমিলি। পরে নির্ণয়ের আব্বু তোহার আব্বুকে জানায়,
~ মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। এগোতে চাই আমরা যদি আপনারা মত দেন তো।

~ আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের মতে তো কিছুই হবেনা। আমার মেয়ের সাথে কথা বলা লাগবে। (তোহার আব্বু)
~ সে তো অবশ্যই। দূরের রাস্তা বোঝেন ই তো। বারবার আসা যাওয়াতে কষ্ট তো হবেই। (নির্ণয়ের আব্বু)
~ আপনারা বসুন। আমরা আসতেছি।

নির্ণয়ের আম্মু আর মেহের তোহাকে নিয়ে আলোচনা করছে আর ওইদিকে তোহা জানায় সে এই বিয়েতে রাজি। তখন তোহার আম্মু তোহাকে বলে,

~ তুই যেই যেই গুণ চাইতি একটা ছেলের মধ্যে তার একটা গুণ ও তো নির্ণয়ের মাঝে নেই। তুই রাজি হচ্ছিস যে?
~ জানো আম্মু রেডিমেড কোনো জিনিসে সুখ নেই।

~ কি পাকা পাকা কথা বলে! আমি তাহলে ওদের হ্যা বলে দিচ্ছি কিন্তু। বেশি বাছাবাছি করলে পরে কপালে কিছুই থাকবেনা। (তোহার আম্মু)
~ হ্যা অবশ্যই।

দুই ফেমিলি পুরোপুরি সম্মতি প্রদান করে এই বিয়েতে। নির্ণয়ের আব্বু বলে,

~ ছেলে মেয়েরা যদি দুইজন আলাদা করে একটু কথা বলে নিতো? না বলছিলাম যেহেতু সবকিছু ফাইনাল হয়েই গেছে সেহেতু কথা বলা যেতেই পারে।
~ তা তো অবশ্যই। তোহার মা নির্ণয়কে নিয়ে তোহার ঘরে যাও। (তোহার আব্বু)

তোহার আম্মু নির্ণয়কে নিয়ে তোহার ঘরে গেলো। তোহা ঘোমটা দিয়ে বসেছিলো। কিন্তু সিল্কি ওড়নাটা সিল্কি চুলের উপর বসতে চাইছিলো না বলে বোধহয় ঘাড়ে ওড়নাটা চলে এসেছে। আম্মুর ডাকে তোহা ঘুরে তাঁকালো আর নির্ণয়কে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো। তোহার আম্মু চলে গেলো।

~ আসসালামু আলাইকুম। (তোহা)
~ ওয়ালাইকুম সালাম। (নির্ণয় এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে)
~ আপনার জিন্স পায়ের পাতার নিচে কেনো? জিন্সটা ভাঁজ করে টাখনুর উপরে রাখুন।

তোহার এমন কথায় নির্ণয় থতমত খেয়ে যায়। আজীবন তো এভাবেই জিন্স পরে এসেছে ও। কেউ তো কিছু বলেনি তবে এই মেয়েটা এইসব বলার কে? নির্ণয় রেগে যায় কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করে বলে,
~ এসব আমার অভ্যাস। তাছাড়া এত তাড়াতাড়ি যে তোমায় বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে তুমি কিছু বলছো না কেনো?

~ তারাতারি কোথায়? ঠিক সময়েই তো বিয়ে দিচ্ছে। আর আটকাবোই বা কেনো? (তোহা মুখে আঙুল রেখে হাসছে)
~ আর ইউ ওকে? তোমার বয়স কত?
~ সতেরো। কেনো?

~ সতেরো বছর বয়সে বিয়ে করাটা দেরি? তাড়াতাড়ি না? (অবাক হয়ে নির্ণয়)
~ অফকোর্স দেরি। তাছাড়া বিয়ের বয়স হলেই তো বিয়ে করতে হবে তাইনা? (তোহা)

~ মেয়েদের বিয়ের বয়স আঠারো। আর তোমার সতেরো। এখনো তো তোমার বিয়ের বয়স হয়নি।
নির্ণয়ের কথা শুনে তোহা খিলখিলিয়ে হাসছে। তোহার হাসি দেখে নির্ণয় বোকা বনে গেলো। নির্ণয় মনে মনে ভাবছে হয়ত যে এই মেয়ে এভাবে হাসে কেন? সংবিধানে কি আছে জানেনা নাকি? তোহা হাসি থামিয়ে বলে,

~ সংবিধান তো এই আঠারো বানায় আর এই ষোলো বানায়। সংবিধান চেঞ্জেবল বাট ইসলাম চেঞ্জেবল না। আচ্ছা বাদ দিন বয়স নিয়ে ঝামেলা আছে নাকি আপনার?

~ না নাই। কিভাবে বোঝাই তুমি আস্ত একটা ঝামেলা আমার জীবনে। (মনে মনে নির্ণয়) আচ্ছা আর কিছু বলবে তুমি? আমি বের হই?
~ জিন্সটা ভাঁজ করুন আগে। এরপর যান।
~ পারবনা। আজব!

নির্ণয় পর্দাগুলো সরিয়ে বেরিয়ে যায়। তোহা মাথা থেকে ওড়না ফেলে হাসছে। রাতের বেলা ডিনারের আগেই নির্ণয়ের ফেমিলি ওই বাসা থেকে বেরিয়ে আসে বিয়ের সব কথা ফাইনাল করে। এখন শুধু বিয়ের ডেট ফালানো বাকি। নির্ণয়ের আম্মু আসার আগে তোহাকে পনেরোশো টাকা দিয়ে আসে জোর করেই। বাসায় আসতে আসতে মেহের বলে,

~ ভাবিকে দেখতে কত সুন্দর তাইনা আম্মু? আমার কিন্তু অনেক ভাল লেগেছে ভাবিকে।

~ হ্যা আর অনেক ভদ্র সভ্য। মনে হচ্ছে তোর ভাইয়াকে টাইট দিতে পারবে যা আমরা পারিনি। (নির্ণয়কে শুনিয়ে ওর আম্মু)
~ শোনো মা ওই মেয়ে আগাগোড়া পুরা পাগল। আমাকে বলে আমি জিন্স কেন পায়ের নিচে পরি? আজব! এইগুলা কিন্তু ঠু মাচ আম্মু। এত ভদ্র সভ্য মেয়ের দরকার নেই আমার।

(নির্ণয় বিরক্ত হয়ে)
~ তুই একদম চুপ থাকবি। ও ভুল টা কি বলেছে? সময় থাকতে শুধরে যা। ওই মেয়েই হবে আমার ছেলের বউ।
~ শেষে বউ কিনা ছোট বোনের সমান। (মনে মনে রাগে ফাটতে ফাটতে নির্ণয়)

রাত সাড়ে এগারোটায় বাসায় এসে নির্ণয় ফোন চালু করে। বিরক্তিকর লাগছে সবকিছু। ফোন চালু করতেই সবার এত এত ফোনের নোটিফিকেশন এলো। এর মধ্যে হৃদির ফোন নাম্বারই বেশি সংখ্যক বার। নির্ণয় আর কল ব্যাক করলো না।

পাঞ্জাবি খুলে হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পরলো। তোহার প্রতিও একটা বিরক্তি কাজ করছে নির্ণয়ের। ওতটুকু মেয়ে এইভাবে ওর ভুল ধরে কিভাবে? যদি বিয়ে হয় তাহলে বাকি জীবন কি করবে উপরওয়ালাই জানে।

পরেরদিন ভার্সিটি বন্ধ। নির্ণয় বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলো সকালবেলা। ফোনের আওয়াজে ঘুম উবে গেলো। স্ক্রিনে আবারো হৃদির নাম ভেসে উঠলো। নির্ণয় ফোন ধরেই হৃদির কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। নির্ণয়ের ঘুমের ঘোর কেটে যায়।
~ কাঁদছিস কেনো তুই? (নির্ণয়)

~ একদম চুপ। লাস্ট একষট্টি ঘণ্টা কোথায় ছিলি তুই? কতগুলো কল দিয়েছি তোকে? হিসাব আছে কোনো? (কাঁদতে কাঁদতে হৃদি)
~ কথা তো সেইটা নয়। তুই এতগুলো কল কেনোই বা দিবি?
~ কেনো দিব মানে? তুই বুঝিস না? জানিস না কিছু ইডিয়েট? আমি তোকে ভালবাসি নির্ণয়, আই লাভ ইউ সো মাচ।

নির্ণয় চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিছুক্ষণ নির্ণয় ও চুপ করে থাকে। ওইদিকে হৃদি তখনো কাঁদছে।

~ ফালতু কথা বলিস না হৃদি। ভালবাসিস মানে কি? তোর কোনো আইডিয়া আছে তুই কি বললি? (উলটা ভাব নিয়ে নির্ণয়)
~ আমি যা বলেছি ঠিক বলেছি। তুই ভালবাসিস না আমাকে?
~ না। (নির্ণয়ের বুকটা চিঁড়ে যাচ্ছিলো এই কথা বলতে)

~ ও! ওয়ান সাইড লাভগুলো খুব পেইনফুল নির্ণয়। নিজেকে আজ অনেক বেশি হাল্কা লাগছে তোকে সত্যিটা বলতে পেরে। এতে তুই চাইলে বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারিস আবার রাখতেও পারিস।

~ ফোন রাখ আর কান্না থামা নিজের। এই ফ্যাচফ্যাচানি কান্না একদম পছন্দ না আমার (চোখের পানি মুছে নির্ণয়)
~ আচ্ছা। রাখছি।

হৃদি ফোন কেটে দেওয়ার পর নির্ণয় অনেকক্ষণ কান্না করলো। দুপুর বারোটা বেজে গেছে কিন্তু নির্ণয় উঠছে না ঘুম থেকে। পরে নির্ণয়ের আম্মু নির্ণয়ের ঘরের দরজায় নক করে। এরপর নির্ণয় বেরিয়ে আসে স্বাভাবিক ভাবেই।

~ ঘুম ভাঙেনাই? ব্রেকফাস্ট করবিনা? (আম্মু)
~ হ্যা আম্মু আসছি।

নির্ণয় ড্রইংরুমে গিয়ে দেখে মেহের টিভি দেখছে। নির্ণয় মেহেরের পাশে গিয়ে বসে রুটি আর ভাজি খাচ্ছে। নির্ণয়ের এই আচরণে মেহের অবাক হয়ে যায়।
~ কিরে ভাইয়া রিমোট চাইলিনা? (মেহের)
~ না, তুই দেখ।
~ এত ভালো হয়ে গেলি?
~ হুম।

খাওয়া শেষ করে নির্ণয় ছাদে যায়। কড়া রোদে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে নির্ণয়। একটু পর রাকিন আসে ছাদে। রাকিন নির্ণয়দের পাশের ফ্ল্যাটের ছেলে যাকে নির্ণয় দেখতে পারেনা।
~ নির্ণয় কি অবস্থা? (নির্ণয়ের সামনে গিয়ে রাকিন)
~ এইত। তোমার?

~ গার্লফ্রেন্ড এর প্যারায় আর ভাল লাগছেনা। জিন্দেগীটা তামা তামা বানায় দিছে আমার। (রাকিন)
~ ও।
~ মন খারাপ নাকি তোমার ব্রো?
~ নাহ।

~ আজকে মা বলল তুমি নাকি বিয়ে করছো? কবে? (রাকিন)
~ আচ্ছা ভাই তোর সমস্যা টা কি? আমায় একটু শান্তিতে দাঁড়াতে দে না! নয়ত তুই থাক, আমি চলে যাই। ডিজগাস্টিং!

নির্ণয় রাকিনের উপর বিরক্ত হয়ে চলে গেলো। রাকিন অবশ্য জানে যে নির্ণয় ওরে দেখতে পারেনা। তাই আর নির্ণয়কে আটকালো না রাকিন।

কয়েকদিন পর নির্ণয় আর তোহার বিয়ের ডেট ফাইনাল করা হলো। এই মাসেরই পরের শুক্রবার ওদের বিয়ে। বিয়ের কথা কাউকে জানায়নি নির্ণয়। বিয়ের কার্ড ছাপানোর পর এগারোটা কার্ড নিয়ে একদিন ভার্সিটিতে যায় নির্ণয়।

ক্লাস শেষ করে পুকুরপাড়ে সবাই আড্ডা দিচ্ছিলো আর হৃদি বই পড়ছিলো। নির্ণয় তখন কাঁপা কাঁপা হাতে কার্ড এগারোটা বের করলো। সবার হাতে কার্ড দিয়ে বলল,
~ শুক্রবার আমার বিয়ে। এইটা তারই কার্ড। (পুকুরের দিকে তাঁকিয়ে নির্ণয়)

সবাই তো দাঁড়িয়ে গেলোই আর হৃদি হাত থেকে বই ফেলে দিলো। সবাই অবাক হয়ে নির্ণয়ের দিকে তাঁকিয়ে আছে। হৃদির মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছেনা। আজকে ওর চকলেট কালার লিপস্টিকে যেন চকলেটি ভাবটা নেই।

আপন তারাতারি কার্ড খুলে দেখে এইটা কোনো মজা নয়, সত্যি সত্যিই নির্ণয়ের বিয়ে!

~ কই নির্ণয় আমরা তো কিছু জানলাম না। এত বড় ঘটনা বিয়ের চারদিন আগে জানাচ্ছিস? ধন্য তুই নির্ণয়! (অঙ্কুর)
~ ভাই সিরিয়াসলি? তোর বিয়ে? আজকে জানালি আমাদের? (শাফায়াত)

~ জানানোর মতো কিছুইনা এইটা তাই আগে থেকে জানাই নি। তোরা থাক গেলাম আমি।

নির্ণয় চলে যেতে নেয় তখন হৃদি নির্ণয়ের হাত ধরে।
~ জানানোর মতো কিছু না হলে কার্ড দিলি কেন? না জানিয়েই করতি বিয়েটা! দরকার ছিল না তো ইনভাইটেশনের! (হৃদির চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে)
~ হৃদি হাতটা ছাড়। (নির্ণয়)

~ এই নির্ণয় তুই এতটা বেইমান আর স্বার্থপর সেইটা তো আমার জানা ছিল না রে! কেন করলি তুই এমন? আমি তো তোকে ভালবেসেছিলাম নিজের চেয়েও বেশি।

(নির্ণয়ের হাত ধরে হৃদি)
~ ভুল করেছিলি। (পুকুরের দিকে তাঁকিয়ে নির্ণয়)
~ আমার চোখের দিকে তাঁকিয়ে কথা বল নির্ণয়। তুই সত্যিই অন্য কাউকে বিয়ে করছিস?

~ হুম। যাই আমি। শপিং করতে যেতে হবে।

নির্ণয় আর এক সেকেন্ড সেখানে না দাঁড়িয়ে চলে আসে। নির্ণয় আশেপাশে তাঁকিয়ে নিজের কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে। হৃদি সিঁড়িতে বসে কান্না করছে। বাকিরা তখনো স্তব্ধ!

~ কি হয়ে গেলো এইটা আপন? হৃদি নির্ণয়কে ভালবাসে এইটা নির্ণয় জেনেও কিভাবে অন্য কোথাও বিয়ে করে? (প্রলয়)
~ কিচ্ছু ঢুকছেনা মাথায়। তোরা কি এখানে বসবি? আমি যাই। ভাল লাগছেনা কিছু। (আপন)
~ চল আমরাও যাব। (

মেঘ)
~ হৃদি উঠ। বাসায় যাবি। (আপন)
~ তোরা যা। আসছি আমি। (কান্না মুছে হৃদি)
~ মুবিনা নিয়ে আয় ওরে। (রাজ)
~ আসছি। (মুবিনা)

নির্ণয় মিথ্যে বলে বাসায় চলে আসে। আজকে বিয়ের মার্কেট করতে যাওয়ার কথা ঠিকই কিন্তু নির্ণয় যাবেনা। মেহের, আম্মু আর ফুফাতো বোনেরা যাবে। খালি বাড়িতে নির্ণয় একা। নির্ণয় নিজের ভালবাসার কথা হৃদিকে বলতে চায়নি কারণ হৃদিকে নতুন করে কষ্ট দিতে চায়নি ও। হৃদি যদি জানতো যে নির্ণয় ও ওকে ভালবাসে তাহলে হয়ত আরো বেশি কষ্ট পেতো।


পর্ব ০৬

শুকনো ডালের ভূতের ভয় উপেক্ষা করে তোহা একটু শান্ত হয়। নির্ণয় ওকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক করে। আসলে রাস্তার পাশে তাল আর সুপারি গাছের জন্যই হয়ত ও এতটা ভয় পেয়েছে। নিকাব খুলে ঢকঢক করে তোহা পানি গিলে। নির্ণয় বলে,
~ ভূতের ভয় শেষ? এখন একটু বাইরের দিকে তাঁকিয়ে প্রকৃতি দেখো।
~ হুম।

তোহা বাইরে তাঁকিয়ে আছে। তোহার পিঠে হাত রেখে নির্ণয় ও বাইরে তাঁকিয়ে আছে। নির্ণয় মনে মনে বলছে,
~ এই মেয়েটাকে আমি কষ্ট দিতে চাইনা। এই মেয়েটার সাথে আমার বন্ধন যেন ভেঙে না যায় কখনো। হৃদিও যেন নিজের ভুল বুঝতে পারে।

ভোরের আলো ফুঁটে সকাল হয়ে গেছে। সকাল দশটায় ওরা রাঙামাটি বাসস্ট্যান্ডে নামে। নির্ণয় এক হাতে ট্রলিব্যাগ টানছে আরেকহাতে তোহার হাত ধরে রেখেছে। এখন এইখান থেকে সিএনজি বা জিপ গাড়ি ছাড়া পাহাড়ের রিসোর্টে যাওয়া অসম্ভব।

নির্ণয় একটা সিএনজি নিলো। প্রথমে সাজেক যাওয়ার প্ল্যান থাকলেও পরে সেইটা পালটে ফেলে নির্ণয়। সামনেই পাহাড় ঘেষে একটা দোতলা রিসোর্ট আছে। সেই রিসোর্টেই ঘর নেওয়ার প্ল্যান আছে নির্ণয়ের। দেড় ঘণ্টা পর তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। নির্ণয় সিএনজি ভাড়া মিটিয়ে আইডি প্রুফ দেখিয়ে সেখানে রিসোর্ট ভাড়া নেয়।

কিন্তু সমস্যা হলো ওদের দুইটা ঘর একসাথে ভাড়া নিতে হবে। সিঙ্গেল রুম পাওয়া যাবেনা। শেষে পাঁচশ টাকা বেশি দিয়ে নির্ণয় দোতালার দুইটা ঘরই নিলো। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে তোহা ঠকঠক করে উঠছে আর নির্ণয় বলছে,
~ আওয়াজ করনা তো।

~ আমি কি করব আওয়াজ হলে? (তোহা)
~ জুতা খুলে আসো।
~ এখন জুতা খুলতে গেলে পরে যাব।
~ আচ্ছা আসো আস্তে আস্তে।
ঘরে ঢুকে তোহার ঘরটা পছন্দ হয়ে যায়। ড্রেসিংটেবিল, সুন্দর একটা খাট, আলমারি, বসার জন্য সোফা সবই আছে।
~ ঘরটা কি সুন্দর!

~ হ্যা। বোরকা খুলো। যাও গোসল করে আসো।
~ যাচ্ছি।
ট্রলি থেকে জামাকাপড় বের করে তোহা ওয়াশরুমে চলে যায়। বোরকাটাও ধুয়ে দেয় সে।

সারারাতের জার্নি! না জানি কত বালু খেয়েছে বোরকাটা। আধা ঘণ্টা পর তোহা গোসল সেড়ে এসে দেখে নির্ণয় বসে বসে ফোন ঘাটছে।
~ যান এখন আপনি গোসল করে আসুন।
~ যাচ্ছি।

বারান্দায় গিয়ে তোহা জামাকাপড় শুকাতে দিচ্ছে। এই প্রকৃতি ও আগেও দেখেছে। এখানেই তো নির্ণয়ের সাথে ওর প্রথম দেখা হয়েছিলো।
“ফ্ল্যাশব্যাক”
তোহা, তোহার বাবা~ মা সেইদিন রাত দশটার দিকে কুমিল্লা থেকে রাঙামাটি এসে নামে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এখানে একটা জবরদাস্ত ছুটি কাটানো। কিন্তু ওত রাতে পাহাড়ি এলাকা সেইফ নয়। আশেপাশে কোনো পুলিশও ছিল না। তোহাকে ডাকাতদল এটাক করে আর তোহার বাবা মায়ের কাছ থেকে সব নিয়ে নেয়। তখনি নির্ণয় ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো।

নির্ণয় ওর ফ্রেন্ডদের সাথে এখানে বেড়াতে এসেছিলো। তোহাকে চিৎকার করতে শুনে নির্ণয় আর ওর দুইটা ফ্রেন্ড ওদের কাছে যেতেই ডাকাতদল সব রেখে ভয়ে পালিয়ে যায়। ডাকাতদল ভেবেছিলো ওরা পুলিশ হবে হয়ত। পরে তোহা নিজের বোরকা ঠিক করে ভয়ে দাঁড়াতেও পারছিলো না।

তোহার বাবা পরে তোহাকে কোলে নিয়ে হোটেলে যায়। ভাগ্যবশত নির্ণয়রাও সেই হোটেলেই ছিল। সেইদিন নির্ণয়ের জন্যই তোহার কোনো কলঙ্ক লাগেনি। কিন্তু তোহা কখনো ভাবেনি এই ছেলেটার সাথেই ওর বিয়ে হবে!

চুল থেকে টাওয়েল খুলে তোহা চুল ঝাড়ছিলো তখনি নির্ণয় গোসল করে শার্ট প্যান্ট মেলতে আসে। তোহাও ঠিক তখনি পেছনে ঘুরতে যায় আর তোহার লম্বা ভেজা চুলের বারি নির্ণয়ের খালি বুকে উপর পরে।

~ সরি! ব্যাথা পান নি তো। (তোহা)
~ না না। এই নাও এই দুইটা মেলে দাও।
~ হুম দিন।
নির্ণয় তখন ঘরে চলে আসে। তোহা জামাকাপড় মেলে দিয়ে ঘরে এসে বসে।

~ রেডি হও। খেতে যাব৷ ক্ষুধা লাগছে ভীষণ। (নির্ণয়)
~ দাঁড়ান একটু।

তোহা আরেকটা বোরকা বের করে পরা শুরু করলো। নির্ণয় বলল,
~ বোরকার কি দরকার? নিচেই তো যাব।
~ নিচে কি মানুষ নেই নাকি তাদের চোখ নেই? (তোহা)
~ আচ্ছা পরো।

নির্ণয় একটা টি শার্ট আর জিন্স পরে তোহাকে নিয়ে নিচে নামলো। এখন তো লাঞ্চ টাইম তাই ওয়েট ফুড ই খেতে হবে। তোহা ভাত ছাড়া কিছু খাবেনা। নির্ণয় ওদের দুজনের জন্যই বাসমতি চালের ভাত আর তিন রকমের তরকারি অর্ডার করলো। এখন এখানে তোহা নিকাব খুলে খেতে পারবেনা তাই নির্ণয় তোহাকে নিয়ে এক কোণায় বসে আর তোহাকে আড়াল করে রাখে।

~ এখন নিকাব খুলো আর খাও।
~ আপনি সোজা হয়ে বসে থাকুন হ্যা?

~ আরে বাবা আচ্ছা। (হেসে নির্ণয়)
তোহা একটু একটু করে ভাত মেখে খাচ্ছে আর নির্ণয় এখনো শুরুই করেনি কারণ বউকে ঢেকে রাখতে হচ্ছে ওকে। হাতের আংটিগুলোর জন্য তোহার পিচ্চি হাতটা আরো সুন্দর লাগছে এখন। দশ মিনিট পর তোহার খাওয়া হয়ে গেলে তোহা বসে থাকে নির্ণয়ের খাওয়ার জন্য। তোহাকে হাত ধুইয়ে দিয়ে নির্ণয় বলে,
~ এখন তুমি দেখো, আমি খাই।

নির্ণয় ও খাওয়া শেষ করে ফেলে। বিল হচ্ছে ৩২০ টাকা। নির্ণয় টাকা টা দিয়ে আবারো উপরে চলে আসে।

এখন এইখানে কাপল প্যাকেজ চলছে তাই খাবারের দাম ও ঘরের দাম অনেকটাই কম। এই জায়গাটায় কম করে হলেও ১৫ টা রিসোর্ট আছে আর সবগুলো একজনেরই৷ তাই কোনো না কোনো প্যাকেজ এখানে লেগেই থাকে।
উপরে এসে নির্ণয় সোজা বিছানায় ধুম করে শুয়ে পরে।

এখন না ঘুমালে কিছুতেই হবেনা। এর আগে বাবা~ মা কে জানাতে হবে যে ওরা খেয়েছে। নির্ণয় আম্মুকে ফোন করে জানায় যে ওরা সেইফলি পৌঁছেছে আর যেন কোনো চিন্তা তারা না করে। ফোন রেখে নির্ণয় বালিশ নিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তোহা বোরকা খুলে ভেজা চুলগুলো শুকাচ্ছে।

~ ওই তুমি ঘুমাবানা? টায়ার্ড লাগছেনা? (নির্ণয়)
~ চুলগুলো শুকাক এরপর ঘুমাবো।
~ এইদিকে আসো আমি শুকানোর বন্দবস্ত করে দেই।
~ কিহ! (হেসে তোহা)
~ এসোই না।

তোহা খাটের উপর গিয়ে বসে। নির্ণয় বলে,
~ শোও।

~ না আমি ঘুমাবোনা এখন।
~ তো কি করবা?
~ আপনাকে দেখব।
~ হাহাহাহা। আমায় দেখা লাগবেনা।

নির্ণয় তোহার হাত টান দিয়ে তোহাকে শুইয়ে দেয়। পা দুটো উপরে তুলে তোহা ঠিক করে শোয়৷ নির্ণয় তোহার চুলগুলো মাথার উপর সুন্দর করে ছড়িয়ে দেয় আর বলে,
~ নিশ্চিন্তে ঘুমাও। তোমার চুলগুলো শুকিয়ে যাবে।

~ এইভাবে চুল শুকাবেন আপনি! হাহাহা।
~ আমি মেহেরকে দেখেছি ও এইভাবে চুল মেলে ঘুমায়। তাই তোমারটাও মেলে দিলাম। (নির্ণয়)

নির্ণয় আর তোহার মাঝখানে একটা কোলবালিশ। নির্ণয় তোহার সাথে কথা বলছে আর তোহা ছোট ছোট রিপ্লাই দিচ্ছে। শেষে কথা বলতে বলতে তোহাই আগে ঘুমিয়ে যায়। পরে নির্ণয় ঘুমায়। ঘুমানোর আগে নির্ণয় ভাবে,

~ তোহার কাছে যাওয়াটা বড্ড প্রয়োজন। ও এখন কলেজে পড়ে। ভাল মন্দ এতদিন না বুঝলেও এখন বুঝবে। কতজনের সাথে না চাইতেও মিশবে। আর কলেজের সবাই~ ই জানে তোহা মেরিড। তখন যদি ওরা এসব নিয়ে বাজে মন্তব্য করে তবে তোহার মন পালটে যেতে পারে।
বিকেলে তোহা আগে ঘুম থেকে উঠে যায়। মসজিদ থেকে এখানে আযান শোনা যায়না।

তাই ঘড়ি দেখে দেখে নামাজ পড়তে হয়। ফজর আর যোহর কাযা নামাজ পড়লো তোহা আর আসর পরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। নির্ণয় তখন আড়মোড়া ভাঙছে। বেডরুম থেকে বারান্দায় তাঁকিয়ে দেখে নীল রঙের থ্রি পিস পরে তোহা ওইখানে দাঁড়িয়ে আছে। নীল রঙ যে আবার নির্ণয়ের বড্ড পছন্দ তাই ওই রঙটাই আগে চোখে ধরে যায়।

নির্ণয় উঠে মুখ ধুয়ে তোহাকে আস্তে করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ৪২০ ভোল্টের শকের মতো তোহা লাফিয়ে উঠলো। আচমকা ধরাতে ভয় পেয়েছে আবার শিহরিত ও হয়েছে ও। নির্ণয় তোহার চুল ঠিক করে দিতে দিতে বলে,
~ এত ভয় পাও কেন তুমি?

~ আপনি আমায় এভাবে ধরে আছেন কেনো? (ধরা গলায় তোহা)
~ কেউ কি কখনো এভাবে ধরেছে তোমায়?
~ না।

~ তাইতো আমি ধরেছি আর শুধু আমিই ধরব।
নির্ণয়ের বুকের সমান তোহা। কোথায় যেন বলে “খাটো মেয়েরা রোমান্সের জন্য পার্ফেক্ট। এরা বুকের কম্পন শুনতে পায় কিন্তু লম্বা মেয়েরা তা পারেনা।

খাটো মেয়েদের বুকে মিশিয়ে নেওয়া যায় কিন্তু লম্বা মেয়েরা ধরার আগেই মাথায় বারি খায়”। তোহা যে কাঁপছে এইটা নির্ণয় বুঝতে পারছে। তোহাকে আরেকটু কাঁপানোর জন্য নির্ণয় তোহার চুল সরিয়ে ঘাড়ে হাত রাখে।

তোহা ঝটকা দিয়ে সেখান থেকে সরে এসে ঘরে বসে। তোহার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। নির্ণয় বারান্দায় দাঁড়িয়েই তোহাকে দেখছে। কিছুক্ষণ পর নির্ণয় ও ঘরে আসে। তোহাকে বলে,
~ হাঁটতে যাবা?
~ না।

~ চলো সামনে থেকে একটু হেঁটে আসি।
~ আমি যাবনা। ভালো লাগছেনা আমার। (তোহা)
~ আচ্ছা। চা বা কফি কিছু খাবে?
~ না।

~ তাহলে এখানেই বসে থাকো আর কি করার।

নির্ণয় টি টেবিলের উপর পা রেখে সোফার উপর বসে ফোন চালাচ্ছে। তোহা আঁড়চোখে নির্ণয়কে দেখছে। এই ছেলে কি কারেন্ট? ছুঁয়ে দিলে এত শক লাগে কেনো? নির্ণয়ের দিকে তাঁকিয়ে এসবই ভাবছে তোহা। একটু পর তোহা নির্ণয়কে বলে,
~ আমি যাব বাইরে।

~ হঠাৎ ডিসিশন চেইঞ্জ?
~ হ্যা যাব। নিয়ে চলুন।
~ রেডি হও।

তোহা এইবার নীল রঙের একটা বোরকা পরলো। চারটা বোরকা ও সাথে করে এনেছে আরেকটা পরে এসেছে। বিয়ের পর শ্বাশুড়ি মা তোহাকে এতগুলো বোরকা একসাথে কিনে দিয়েছে। রেডি হতে হতে তোহা নির্ণয়কে বলে,
~ ফোন টিপা রাখবেন নাকি যাবেন না?
~ আমি তো রেডিই।

~ টি শার্ট পরে যাবেন?
~ হ্যা।
~ না। শার্ট পরুন। শার্টে আপনাকে আরো সুন্দর লাগে।
~ বের করে দাও।

পরে তোহা রেডি হয়ে নির্ণয়কে শার্ট দিলো। নির্ণয় চেইঞ্জ করে এসে চুল আঁচড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। তোহা সবসময় প্লেইন হিলেই অভ্যস্ত। সব সময় তিন ইঞ্চি উঁচু প্লেইন হিলই পরে। কিভাবে পরে আল্লাহ জানে! রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে নির্ণয় পকেটে হাত দিয়ে হাঁটছে। তোহার হাতে নির্ণয়ের ফোন আর সাইডে পার্টস। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর যাওয়ার পর নির্ণয় তোহাকে বলে,
~ হাত ধর আমার।

~ মানুষ কি বলবে? (তোহা)
~ এখানে কোন মানুষটা হাত ধরা ছাড়া হাঁটছে দেখাও আমায়।
~ কেউ না।

~ এখন তুমি ধর।
তোহাও নির্ণয়ের বা হাত জড়িয়ে ধরলো। নির্ণয় বলল,
~ শক খেয়ো না আবার।

নির্ণয়ের কথা শুনে তোহা হেসে দেয়। একটা টিলার উপর গিয়ে দুজন বসে। সূর্য এখনো তার হালকা আভা ছড়াচ্ছে। কি ভেবে যেন নির্ণয় তোহার কোলের উপর শুয়ে আকাশের দিকে তাঁকিয়ে রইলো। তোহা ব্যাগটা সাইডে রেখে নির্ণয়কে বলছে,
~ শুয়ে পরলেন যে!

~ ভাবছি আসলে!
~ কি ভাবছেন?
~ তোমাকে আমি কি করে বোঝাবো।

~ কি বোঝানোর আছে আমাকে?
~ অনেক কিছুই এখনো বোঝানো বাকি। প্রেম মানে বুঝো তোহা?
~ না। কি সেইটা?

~ তুমি যে আমার হাত ধরে এই পর্যন্ত আসলে সেইটা প্রেম আর ভালবাসা কি সেইটা বুঝো?
~ না।

~ আমি না খেলে যে তোমার কষ্ট হয় সেইটাই ভালবাসা। আচ্ছা আমি যে এখন তোমার পায়ের উপর শুয়ে আছি। তোমার কেমন লাগছে?
~ ভীষণই ভালো লাগছে।

~ একটু আগে আমি তোমায় জড়িয়ে ধরার পর ওইভাবে সরে কেনো গেলে? আমাকে কি তোমার পছন্দ না?
~ না আসলে আমি….! (মাথা নিচু করে তোহা)
~ আচ্ছা বাদ দাও। বাদাম খাবে?
~ হুম।

নির্ণয় বিশ টাকার বাদাম কিনলো পাশের টিলায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার থেকে৷ নির্ণয় শুয়ে শুয়েই বাদামের খোসা ছাড়াচ্ছে আর তোহার হাতে ছোলা বাদামগুলো দিচ্ছে। তোহাও বাদামের খোসা ছাড়ানোর পর আলগা ছোলাটা ফু দিয়ে উড়িয়ে নির্ণয়ের মুখে ফেলে হেসে মজা নিচ্ছে। তোহা নির্ণয়কে খাওয়াচ্ছে আর নির্ণয় তোহাকে৷

এইটাকেই বোধহয় বৈধ প্রেম বলে! সারাক্ষণ নির্ণয় তোহার কোলে শুয়ে ছিল। এক সময় তোহা বলে,
~ সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। রিসোর্টে ফিরবেন না?
~ হ্যা চলো।
~ একটা কথা বলব?

~ হ্যা বলো।
~ নামাজ পড়বেন আমার সাথে রিসোর্টে ফিরে। ঠিক আছে?
~ দেখা যাক।
~ পরতেই হবে।
~ আচ্ছা পরব।

নির্ণয় উঠে দাঁড়িয়ে হাত ধরে তোহাকে উঠায়। তোহার হাতে পায়ে মোজা ছিল। হাতমোজা খুলে এতক্ষণ বাদামের খোসা ছাড়াচ্ছিলো। তোহা সেগুলো পরে আবার হাঁটা ধরলো। সূর্য তখন ডুববে ডুববে অবস্থায়। সূর্যের লাল আভা পুরোটাই তোহার উপর পরছে। নির্ণয় তোহার মুখের দিকে তাঁকিয়ে ছিলো আর তোহা নির্ণয়ের হাত জড়িয়ে ধরে হাঁটছে।

রিসোর্টে ফিরেই তোহা বোরকা খুলে অযু করে নামাজের জন্য দাঁড়ায় আর নির্ণয় শার্টটা পালটে টি শার্ট পরে অযু করে আসে। নির্ণয়ের খানিকটা পেছনে তোহা নামাজ পড়তে দাঁড়ায়। দুজন একসাথে নামাজ শেষ করে সোফার উপর বসে৷ তোহা নির্ণয়কে বলছে,

~ চা হলে ভালো হতো।
~ দাঁড়াও আমি বলে দেই চা দিতে।

নির্ণয় রিসিপশনে ফোন দিয়ে বলে শাপলা রিসোর্টের দুই তলায় দুইকাপ চা দিতে যেতে। এখানে ঘন ঘন লোড শেডিং হয়। কিন্তু নির্ণয়রা আসার পর এখনো হয়নি। কিছুক্ষণ পর সার্ভিসের লোকেরা চা দিয়ে গেলো আর বিল নিয়ে গেলো। নির্ণয় একটা চেয়ার নিয়ে তখন বারান্দায় গেলো। নির্ণয় চেয়ারে বসে তোহাকে ওর কোলে বসালো। তোহা নির্ণয়ের কোলে বসে চা খাচ্ছিলো।

তোহা কোলে বসতে চায়নি কিন্তু নির্ণয়ই জোর করে বসিয়েছে। চা খেতে খেতে দুজন অনেক গল্প করলো। এখানে সাধারণত রাত নয়টার পর কেউ বের হতে দেয়না। রাত নয়টার পর টুরিস্টদের বের হওয়া একদম নিষেধ। চারপাশে যখন একটা একটা বাতি নিভছে অর্থাৎ মানুষ ঘুমিয়ে পরতে শুরু করেছে তখন তোহা বলে,

~ ডিনারটা ভালো ছিল। ফ্রি ডিনার হিসেবে ভালই।
~ হ্যা। বাট সব চার্জ এর সাথে কেটে রাখবে। নামেই শুধু ফ্রি। এশার নামাজ তো পড়েই ফেলছো। ঘুমাবানা?
~ দুপুরে ঘুমাইলাম না? এখন কি ঘুম আসবে?
~ তাহলে চলো দুজন মিলে মুভি দেখি। স্মার্ট টিভি আর ওয়াইফাই সবই তো আছে।

~ না ওসব দেখিনা আমি। আমি একটু হাত মুখ ধুয়ে আসি।
যেই না তোহা বাথরুমে ঢুকেছে হাতমুখ ধুবে বলে ওমনি কারেন্ট চলে গেলো। তোহা এক চিৎকার দিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। নির্ণয় সামনে যেতেই তোহা নির্ণয়কে জড়িয়ে ধরে।

~ রিলাক্স। কারেন্টই গেছে শুধু। ফ্ল্যাশ অন করে দিলাম। তাঁকাও এখন।
~ জানেন আমি কতটা ভয় পেয়ে গেছি!

~ হ্যা সেইটা কালই বুঝেছি তুমি কতটা ভীতু। চলো আমার সাথে। আমি লাইট ধরি আর তুমি হাতমুখ ধোও।
~ দাঁড়ান।

নির্ণয় লাইট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আর তোহা হাতমুখ ধুয়ে আসে। এরপর দুজন আবার বারান্দায় চলে যায়। কারেন্ট আসলেই ঘুমাতে যাবে। সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে খোলা বারান্দায় ঝিঁঝিঁ পোকার সবুজ বাতি জ্বলজ্বল করছে। তোহা সেগুলো ধরছে আর হাসছে। নির্ণয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছে। আধা ঘণ্টা পর কারেন্ট এলে দুজনেই বারান্দার দরজা লাগিয়ে ঘুমাতে যায়। তখন বাজে রাত এগারোটা।

~ বাতি বন্ধ করে ঘুমাবেন? (তোহা)
~ তো কি অন করে ঘুমাবো? (ভুরু কুঁচকে নির্ণয়)
~ হ্যা।

~ কেন?
~ আমার ভয় লাগে।

~ আমি আছি তো। লাইট অন থাকলে ঘুম আসবেনা।
~ আচ্ছা অফ করে দেন তাহলে।
তোহা শরীরের উপর পাতলা চাদর নিয়ে শুয়ে পরলো কারণ এখানে ভালই শীতশীত লাগছে। নির্ণয় তোহার পাশে গিয়ে শুয়ে পরলো। তোহা অন্যদিকে ফিরে শুয়েছিলো। নির্ণয় তখন তোহাকে নিজের দিকে ঘুরালো।

~ কি হলো? (তোহা)
~ আমার দিকে ফিরে ঘুমাও।
~ কেন? আপনি তো সাহসী, ভয় তো পান না। তাহলে আমায় ঘুরতে বলছেন কেন?

~ এইটা যদি তুমি বুঝতা তবে তো খুবই ভালো হইতো। আচ্ছা তোমায় একটা জিনিস দেখাই?
~ দেখান।

নির্ণয় ওর ফোন হাতে নিয়ে নেটে সার্চ করে একটা রোমান্টিক মুভি বের করে। সেই মুভির কিছু অংশ নির্ণয় তোহাকে দেখায়। তোহা এসব দেখে চোখ বন্ধ করে বলে,
~ ছিহ কিসব ফালতু জিনিস। এইভাবে কেউ কাউকে কিস করে? ছিহ! (তোহা)
~ এখন তো আমি তোমায় কিস করব আর ঠিক এইভাবেই।


পর্ব ০৭

নির্ণয়ের কথা শুনে তোহা চোখ বড় বড় করে নির্ণয়ের দিকে তাঁকালো। ঘর অন্ধকার তাই এখন তোহা চাইলেও দৌড়ে সরে যেতে পারবেনা। নির্ণয় তোহার হাতের উপর নিজের হাত রাখে। মাঝখানের কোলবালিশ সরিয়ে ফেলে নির্ণয়।

~ দেখেন এইটা ঠিক না! আপনি আমার কাছে আসছেন কেনো?
~ দূরে তো আর সরবনা।

~ না সরুন৷ একটা মেয়ের সাথে এইভাবে টিজ করা মানে অসভ্যতামি, নোংরামি।

~ ছিহ। তুমি কি যেকেউ লাগো নাকি? বউ লাগো আমার। মানুষ বিয়ে কেন করে?
~ জানিনা আমি কেন করে। আপনি সরেন এখন। (তোহা হাইপার হয়ে যাচ্ছে)
~ হাইপার কেন হচ্ছো? আচ্ছা আমি আসলাম না তোমার কাছে। হ্যাভ আ নাইস ড্রিম। গুড নাইট। (নির্ণয়)

মন খারাপ করে নির্ণয় আরেকপাশে শুয়ে পরে। তোহা এখনো ভয় পেয়ে আছে। ওর কাছে ছেলে মেয়ের কাছে আসাটা কি না কি যেন! নির্ণয় ঘুমিয়ে যায় আর তোহা জেগেই আছে। এই বিষয়টাই কেন যেন ও মানতে পারেনা।

পরদিন সকালে,
নির্ণয়ের মা ফোন করে জানায় হৃদি আগে থেকে ভালো আছে। জ্ঞান ফেরার পরই হৃদি নির্ণয় নির্ণয় শুরু করেছে। এইটা শোনার পর এক প্রকার রেগেই যায় নির্ণয়।

~ এইটা কি ধরনের কথা? ওকে আমি ডিচ করেছি নাকি হ্যা? ও কি আমার মাথা খারাপ করে দিবে মা? না আমি ওকে বলেছি ভালবাসি, না বলেছি বিয়ে করব আর না কিছু করেছি? ও ভালবাসে বলে আমাকেও এইটা মেনে নিতে হবে? আমি মেরিড ও কি সেইটা বুঝেনা? উফফ! (নির্ণয়)

~ তুই কেন রেগে যাচ্ছিস? তোহা কি করে? ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করছিস না তো?

~ না মা। ওর সাথে কেন খারাপ ব্যবহার করব আমি?
~ দেখেশুনে রাখিস ওকে। রাখছি ফোন।

নির্ণয়ের মা ফোন কেটে দিলো। প্রায় পনেরো বিশ দিনের মতো ওদের এখানে থাকতে হবে। এখানে একা একা এতগুলা দিন কাটানো একেবারেই অসম্ভব তার উপর বউটাও রোমান্টিক না। একটু জড়িয়ে ধরলে বলে “ধরবেন না”, খাইয়ে দিতে গেলে বলে ” আমার হাত আছে”। কি একটা অবস্থা! নির্ণয় আসলেই মহা বিপাকে আছে।
আটদিন পর,

সেইদিন সারাদিন বৃষ্টি। তোহা সারাক্ষণ বারান্দায় বসে বসে বৃষ্টি দেখেছে। এই আটদিনে নির্ণয় এক ওয়াক্ত নামাজও মিস করেনি তোহার প্যারায়। নির্ণয় কফি এনে তোহার হাতে দিলো আর নিজে একটা চেয়ার টেনে বসলো।
~ আজকের দিনটা কত সুন্দর তাইনা? (নির্ণয়)
~ আসলেই। থ্যাংক ইউ কফির জন্য। ভাবছি কফি খাওয়া শেষ করে একটু সাজব।

সেই বিয়ের দিন একটু সেজেছিলাম। মা নীল রঙের একটা কাতান শাড়ি দিয়েছে। ভাবছি সেইটাও পরব। (তোহা)
~ তুমি শাড়ি পরতে জানো?
~ হ্যা। শাড়ি সামলাতে পারিনা কিন্তু পরতে পারি।
~ কিভাবে শিখলা?

~ আগে শাড়ি পরে খেলতাম। খেলতে খেলতে শিখে গেছি। ওত সুন্দর না পারলেও পারি কোনোরকম।
~ আমার সামনে সেজো তো তুমি আজকে।
~ আচ্ছা।
কফি খাওয়া শেষে তোহা উঠে ঘরে চলে আসে। তোহার পিছু পিছু নির্ণয় ও আসে। আলমারি থেকে তোহা শাড়ি, ব্লাউজ সব বের করলো আর বিয়ের মেকাপ কিট গুলোও বের করলো।

ড্রেসিং টেবিলের উপর সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলো সে। পাশের খালি ঘরটায় গিয়ে তোহা শাড়ি পরে আসে আর নির্ণয়ের সামনে বসে বসে সাজছে। তোহা যখন চোখে কাজল লাগাচ্ছিলো তখন নির্ণয় কাজলের স্টিকটা ধরে তোহার কাজলের লাইন সোজা করে দিলো।

লিপস্টিক লাগাতে গিয়ে তোহা লিপস্টিকের ঘ্রাণেই আধপাগল হয়ে গেলো। একটা টিপ নাকফুল পরলো তোহা। এছাড়া গায়ে একটা গহনাও নাই। কথায় আছে “গহনা ছাড়া সাজলে নাকি মেয়েদের পুতুল লাগে আর গহনাসহ সাজলে বাড়ির বউ”।

তোহাকে এখন পুতুলই লাগছে।
~ বাহ বেশ লাগছে তো। চুলগুলো মাঝে সিঁথি করে ছেড়ে দাও। শাড়ির আচলটা এমনভাবে রাখো যেন অর্ধেকটাই মেঝেতে পরে থাকে। (নির্ণয়)

~ আপনি এতকিছু জানেন কিভাবে? এর আগে কাকে সাজিয়েছিলেন?
~ কাউকেই না। ইমাজিন করলাম যে কীভাবে ভাল লাগবে।
~ হাহাহা।

নির্ণয়ের কথামতো তোহা চুল মাঝে সিঁথি করলো, শাড়ির আচল মেঝেতে ছেড়ে দিলো। এরপর তোহা নির্ণয়ের দিকে তাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

~ কেমন লাগছে?
~ সুপারভ। অনেক মিষ্টি দেখাচ্ছে। ছবি তুলি?
~ আচ্ছা।

নির্ণয় প্রথমবার বউয়ের সাথে ছবি তুললো। বউয়ের কতগুলো আলাদা ছবিও তুললো সে। ছবি তুলা শেষে তোহা বারান্দায় যায়। বারান্দা থেকে নির্ণয় তোহাকে ঘরে নিয়ে আসে। আলমারির সাথে তোহাকে দাঁড় করায় নির্ণয়।
~ তোহা?

~ আমাকে এভাবে আটকে দাঁড়ালেন কেনো? (তোহা)
~ চুপ একদম। অনেক কষ্ট দিছো। আর কত? আজকে আমি তোমায় হাজব্যান্ড ওয়াইফের রিলেশন বুঝিয়েই ছাড়ব। একটা কথা বলবেনা তুমি আর একদম চেঁচাবেনা। যদি আমি রেগে যাই তাহলে থাপ্পর মারব ধরে।

নির্ণয়ের কথা শুনে তোহা কান্নাভরে চোখে নির্ণয়ের দিকে তাঁকায়। নির্ণয় তোহার কপালে চুমু দেয়। তোহা সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
~ কাঁদবানা। কাঁদার মতো কিছুই হয়নি।

~ আমাকে বকলেন কেনো? (তোহা কেঁদেই দেয়)
~ আচ্ছা সরি। আর বকবনা। (তোহাকে জড়িয়ে ধরে নির্ণয়)
~ বকে এখন আদর করছেন?(নির্ণয়ের গেঞ্জিতে নাক মুছে তোহা)
~ ছিহ। আমার টি শার্ট কি নাক মোছার জন্য? কান্না থামাও। আর বকবনা ভাই।
~ আচ্ছা।

তোহা আচ্ছা বলার পর নির্ণয় তোহাকে কোলে নেয়। তোহার কান্না তখনই থেমে যায়। তোহা নির্ণয়ের কোলে উঠে হেসে দেয়।
~ এইভাবে আদর করলে এখন থেকে প্রতিদিনই বকবেন আমায়।
~ হাহা। প্রতিদিন কোলে নিব?
~ হুম।
~ ভাল্লাগে কোলে উঠতে?
~ হ্যা ভীষণ৷

~ তাহলে নিবনে প্রতিদিন কোলে। চোখের পানি শেষ? (নির্ণয়)
~ হ্যা আপাতত শেষ। (নির্ণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে তোহা)
~ বাহ। কোলে নিছি বলে এত খুশি যে গলাও জড়িয়ে রেখেছো।
তোহা আর কিছু বলল না। নির্ণয় তোহাকে অনেকক্ষণ কোলে বসিয়ে রাখে। ডিনার ঘরে এসে দিয়ে যায় একটা ছেলে।

নির্ণয় তোহাকে নিজের কোলে বসিয়েই খাইয়ে দেয় আর বলে,
~ আমি আমার মেয়েকে কোলে বসিয়ে খাওয়াবো নাকি বউকে খাওয়াবো, কিছুটা কনফিউজড আমি।

~ কে বলছে আমাকে কোলে বসিয়ে খাওয়াতে আর মেয়ে এলো কোথা থেকে? (খেতে খেতে তোহা)
~ আসেনি। আসবে তো।

~ মেয়ে আসে কেম্নে আবার? হাসপাতাল থেকে চুরি করে আনতে হয়। মা তো এখনো আমায় বলে আমাকে হাসপাতাল থেকে চুরি করে এনেছে।

এই কথা শোনার জন্য নির্ণয় প্রস্তুত ছিলনা। বউয়ের মুখে এই ধরনের কথা শুনার পর নির্ণয় বউকে খাওয়াতে ভুলে গেছে।

নির্ণয় বলে,
~ হ্যা আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করে হাসপাতালের ওয়ার্ডে ফেলে দিছে আর ওখান থেকেই যে যা পারে চুরি করে নিয়ে আসে। আমিও তো চুরি করা মাল। (মুখ কাঁচুমাচু করে নির্ণয়)
~ খারাপ কথা বলেন কেনো আপনি? মাল কি?
~ প্রোডাক্ট।
~ খান এখন।

নির্ণয় খাচ্ছে আর ভাবছে
~ সত্যিই কি আমার বাচ্চা বউ জানেনা মেয়ে কিভাবে আসে? আল্লাহ গো!


পর্ব ০৮

তোহার বাচ্চামোর যন্ত্রনায় নির্ণয় অস্থির। তোহা রাতের খাবার নির্ণয়ের হাতে খেয়ে আবার ড্রেসিংটেবিল এর সামনে বসলো মেকাপ ঠিক করবে বলে। নির্ণয়ের ততক্ষণে খাওয়া শেষ। খাওয়া শেষ করে নির্ণয় বলে,
~ আর মেকাপ করতে হবেনা। চলো রিসোর্টের বাগানটাতে যাই।
~ বোরকা পরা লাগবে।

~ আচ্ছা তাহলে যেতে হবেনা। এখন আমি যা যা বলি মন দিয়ে শোনো।
~ আমি জানি আপনি কি বলবেন। মেহের আমাকে আগেই বলেছিলো এসব।

~ কি বলব? (ভুরু কুঁচকে নির্ণয়)
~ বলেছে তুমি সাজার পর ভাইয়া তোমার কাছে গেলে আটকিয়ো না।
~ হায় আল্লাহ! আমার বোন বুঝে আর তুমি বউ হয়ে বুঝো না?
~ বুঝি না~ ই তো৷ বাচ্চা না আমি?

~ ছোটাচ্ছি বাচ্চামো।
তোহা নির্ণয়কে দুই ঘর দৌড় করায়। আচল হাতে তুলে কি দৌড়ানি তোহার! নির্ণয় পরে তোহার চুল টেনে ধরে। তোহা চুলে হাত দিয়ে থেমে যায়।

~ ধরে ফেলেছি। এবার ছুটো। (নির্ণয়)
আচমকাই নির্ণয়কে অবাক করে দিয়ে তোহা নির্ণয়কে জড়িয়ে ধরে। শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলে,
~ আর দৌড়াবো না। হাঁপিয়ে গেছি।
~ আচ্ছা আর দৌড়াতে হবেও না।

নির্ণয় তোহাকে কোলে নিয়ে সোফার উপর বসায়। বিয়ের পর ওই প্রথমবার নির্ণয় তোহাকে গালে চুমু দেয়। তোহা নির্ণয়ের হাত ধরে রাখে। তোহার চোখমুখ, নাক লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। নির্ণয়ের দিকে তাঁকাতে পারছেনা ও। তোহার লজ্জা পাওয়া দেখে নির্ণয় হাসছে। সেই প্রথমবার নির্ণয় তোহাকে বুঝাতে সক্ষম হলো স্বামী স্ত্রী সম্পর্কটা আসলে কেমন।

পরদিন সকালে,
ঘুম থেকে উঠে তোহা নির্ণয়ের সামনে আসেনা লজ্জায়। নির্ণয় জেনারেলি দেরিতেই ঘুম থেকে উঠে। ওইদিন ফজরের নামাজটাও কেউ পড়েনি। সকাল আটটায় তোহা ঘুম থেকে উঠে শাড়ির আচল ধরে পাশের ঘরে চলে যায়। রাতের কথা মনে করেই তোহা লজ্জায় মরে যাচ্ছে। ওর চোখ, নাক, মুখ এখনো লাল হয়ে আছে।

তোহা নিজে নিজেই হাসছে কি যে করছে ওর নিজেরই খেয়াল নাই। নয়টার সময় নির্ণয় ঘুম থেকে উঠে পাশে তোহাকে না পেয়ে বাথরুমে গিয়ে দেখলো৷ সেখানেও তোহা নেই। নির্ণয় খালিঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো তোহা জানালার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে হাসছে আর ফর্সা নাক মরিচের মতো লাল হয়ে আছে।

~ পাগলের মতো একা একা হাসছো কেনো? কিছু কি হয়েছে? (টুল টেনে তোহার পাশে বসলো নির্ণয়)
ও মা! তোহা নির্ণয়ের দিকেও তাঁকায় না! এত লজ্জা কোথায় পেলো ও?

~ ময়নাপাখি তুমি তো লজ্জায় মিঠাই কালার হয়ে যাচ্ছো। এত লজ্জা পাচ্ছো কেন? আমিই তো। (তোহার পায়ের উপর দু হাত রেখে নির্ণয় তোহার দিকে তাঁকিয়ে)
~ সরেন তো। আপনি আমার সামনেই আসবেন না। আমি দেখতে চাইনা আপনাকে।

তোহা উঠে চলে যাবে তখন নির্ণয় তোহার আচল টেনে ধরে তোহার সামনে গিয়ে তোহাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,
~ তাহলে কাকে দেখতে চাও তুমি? (তোহার ঘাড়ে কিস করে নির্ণয়)
~ ছিহ আবার শুরু করছে! (হেসে দেয় তোহা)
~ যা একবার শুরু হয়েছে তা কি শেষ হবে ময়নাপাখি?

~ আমি তোহা। কোনো ময়নাপাখি না। ছিহ কি বাজে নাম!
~ তুমি ময়নাপাখি আর আমি শালিক পাখি আর আমাদের বাচ্চা কাচ্চারা হবে টেপা আর টেপি। সুন্দর নাম না? ছেলে হলে টেপা রাখব নাম আর মেয়ে হলে টেপি। হাউ সুইট!

নির্ণয়ের কথা শুনে তোহা খালি বোতল দিয়ে নির্ণয়কে পেটাতে শুরু করে। নির্ণয় ভুলে তোহার শাড়ির আচলে পা ফেলে দেয় আর তোহা পরে যায় মাটিতে।
~ ওহ শিট! ব্যাথা পাইছো? (নির্ণয়)
~ না।

~ তোমায় আর একা একা উঠতে হবেনা। আমিই কোলে নিয়ে উঠাচ্ছি আর চলো আজকে আমি তোমায় গোসল করিয়ে দিব।
এই কথা শুনে তোহা তো শেষ! নির্ণয় ওরে গোসল করিয়ে দিলে ও লজ্জায় ট্রেনের নিচে মাথা দিয়ে দিবে! কিন্তু নির্ণয়ের কথার আপত্তিও জোরালোভাবে করলো না তোহা। শেষে নির্ণয় নিজেই তোহাকে গোসল করিয়ে দিলো।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে রেডি হয়ে দুজন খেতে গেলো। নির্ণয় আগে তোহাকে সবার থেকে আড়াল করে খাওয়ালো এরপর নিজে খেলো। খাওয়া দাওয়া করে ওরা আর ঘরে না ফিরে হাঁটতে বের হলো। তোহা তো নির্ণয়ের সাথে কথাই বলছেনা। নির্ণয়ই তোহার হাত ধরলো। তোহার হাত ধরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর তোহা নির্ণয়ের হাত নিজের নখ দিয়ে খামচাচ্ছে।
~ কি হলো? ব্যাথা পাই তো।

~ না পান না। আপনি এত্ত খারাপ! (তোহা)
~ খারাপির কিচ্ছু দেখোনাই তুমি। এখন থেকে দেখবা। তোমায় নিয়ে বছরে দুই তিনবার ট্যুরে আসব আর প্রতি বছর আমাদের একটা করে বাচ্চা হবে। পরে বড় টেপি, ছোট টেপি সব হবে। টেপা হলেও আপত্তি নাই। (নির্ণয়)

নির্ণয়ের কথা শুনে তোহা খিলখিল করে হেসে দেয়। নির্ণয় ও তোহার বাহু জড়িয়ে ধরে। সামনে যেতে যেতে নির্ণয় তোহাকে বলে,
~ তুমি মেডিক্যালে পড়বা?

~ আপনি আমার এম্বিশন জানেন কিভাবে?(তোহা অবাক হয়ে)
~ সব জানি। নরমালি ট্যালেন্টেড মেয়েরা মেডিক্যালেই পড়ে।
~ আমি ট্যালেন্টেড না কিন্তু মেডিক্যালে ট্রাই করতে চাই।
~ আই উইশ তুমি একজন ভালো গাইনোকোলজিস্ট হও। (হেসে নির্ণয়)
~ গাইনোকোলজিস্ট এর কাজ কি?

~ কয়দিন পরেই বুঝবা। (কোনোমতে হাসি থামিয়ে নির্ণয়)
~ আপনি আবার আমার সাথে শয়তানি করছেন?
~ কই না তো। আমি একটা ভদ্র ছেলে। শয়তানি করিনা।
~ চলো মার্কেটে গিয়ে কিছু কিনে নিয়ে আসি। কবে চলে যাই তার নাই ঠিক। (নির্ণয়)
~ টাকা বেশি হয়ে গেছে?

~ হ অনেক বেশি। চলো এখন।
মার্কেটে গিয়ে নির্ণয় তোহার হাত ধরে রাখে আর সর্বোচ্চ প্রটেকশন দিয়ে রাখে যাতে তোহার সাথে কেউ ধাক্কা না খায়।

তোহা মেহেরের জন্য একটা লোকশিল্পের ড্রেস নিলো আর মায়ের জন্য হাতের চুরি। নিজের জন্য একটা ভারী পুঁথির তসবিহ কিনলো শুধু। তোহা রাস্তায় কিছু খেতে চায়না কারণ মুখ খোলা লাগে তাই নির্ণয় ঝালমুড়িসহ সেখানকার কিছু লোকাল খাবার প্যাকেট করে রিসোর্টে নিয়ে এলো।

তোহা বোরকা খুলতে খুলতে নির্ণয়কে বলছে,
~ মা, বাবা, মেহের ওদের খুব মিস করছি। অনেকদিন তো হলো এসেছি। এবার চলে যাই চলুন। হৃদি আপুও তো এখন সুস্থ।
~ তোমার কি মনে হয় আমি আদৌ হৃদির ভয়ে এখানে এতদিন পড়ে আছি? (শার্ট খুলতে খুলতে নির্ণয়)
~ তাহলে?

~ এইটা আমার হানিমুন টাইম। আই ওয়ান্ট টু এঞ্জয় ইট নাইসলি। তাই এখানে আমি পড়ে আছি বুঝছো? তোমার কলেজ ভালমতো শুরু হয়ে গেলে আর আসার সময় পাবনা।
~ আবার আপনি মাস্টার্সে ভর্তি হবেন। অনেক প্যারা তাইনা? (তোহা)
~ এইত বুঝছো।

নির্ণয় টি শার্ট পরতে যাবে তখন তোহা নির্ণয়কে বলে,
~ একটা কথা বলি?

~ বলো।
~ দাঁড়ান টি শার্টটা পরবেন না।
~ কেনো?
~ আমিই তো।

আমার সামনে খালি গায়ে থাকতে কি সমস্যা? (কথা ঘুরালো তোহা)
~ উহু তুমি অন্য কিছু বলতে। কি বলতে চাইলা বলো। (টি শার্ট রেখে নির্ণয়)
~ এইটাই বলতে চাইছি আর কি।

(জিহ্বা কামড় দিয়ে তোহা এক চোখ বন্ধ করে ফেলে)
~ হেই এইটা কি ছিল? আবার কর তো। (এক লাফে নির্ণয় তোহার সামনে চলে এলো)
~ কোনটা?

~ জিহ্বায় কামড় দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলাটা জাস্ট ক্রাশ। আবার করনা?

~ না এসব বারবার হয়না। কি কি খাবার না আনলেন, খান না কেন? ঠান্ডা হয়ে যাবে তো। (তোহা)
~ দাঁড়াও হাতমুখ ধুয়ে আসি।
নির্ণয় যাওয়ার পর তোহা বলছে,
~ ইশ! আমিও এমন নির্লজ্জ হলাম কিভাবে?

ওনাকে কিভাবে বলতাম যে ওনাকে খালি গায়ে আমি একবার জড়িয়ে ধরতে চাই! ইশ!
নির্ণয় হাতমুখ ধুয়ে এসে তোহাকে বলে,
~ এখনো খাবারগুলো প্লেটে ঢালো নাই তুমি? কবে বড় হবা তোহা? আচ্ছা তুমি বসো। আমি ঢেলে দিচ্ছি।
~ না। আপনি বসেন।

আড়াই বছর পর,
এই আড়াই বছরে ছোট্ট তোহা অনেক বড় হয়ে গেছে। ইন্টারে গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে ও শুধু তাই নয় ঢাকার র‍্যাংকিং এ থাকা থার্ড মেডিক্যাল কলেজ সলিমুল্লাহ মেডিক্যালে ও চান্স পেয়েছে।

স্বপ্ন এখন ওর আকাশছোঁয়া। নির্ণয় তোহার এডমিশনের রেজাল্টের দিন এপার্টমেন্টের সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছে। নির্ণয় ও নিজ যোগ্যতায় মাস্টার্স শেষ করার পরপরই ভালো একটা সরকারি চাকরি পেয়ে যায়।

এখন নির্ণয়কে বাবার টাকায় বউয়ের শখ পূরণ করতে হয়না। আর রইলো পরে হৃদি? মাস্টার্স শেষ করার পর হৃদির বাবা মা হৃদিকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়। এর মাঝে হৃদির স্বামী নির্ণয়কে ফোন করে কথা বলেছিলো। এখনো হৃদি নির্ণয় নির্ণয় করেই নিজের সংসারে আগুন লাগানোর পরিকল্পনা করছে।

বউ, বাবা,মা, বোন এদের নিয়েই নির্ণয় এখন ভীষণ খুশি। প্রতিদিন অফিস ছুটি হলে বউ আর বোনের আবদারের খাবার নিয়ে নির্ণয়কে বাসায় ঢুকতে হয়। এখন তোহা খুব ভালভাবেই বুঝে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক। মেহের জাহাঙ্গীর নগরে চান্স পেয়েছে।

নির্ণয় কিছুতেই বোনকে একা সাভার পাঠাবেনা তাই ইডেনেই বোনকে ভর্তি করিয়ে দেয়। নির্ণয় আর তোহার ছোট্ট একটা সংসারে সুখের সীমা ছিল না আর থাকবেই বা না কেনো? নিজ হাতে নির্ণয় তোহাকে প্রেম শিখিয়েছে, ভালবাসা শিখিয়েছে। তোহাকে তো ওর হতেই হতো।

একদিন সন্ধ্যায়,
~ কই আপনি? (নির্ণয়কে ফোন করে তোহা)
~ অফিস থেকে বের হলাম। কি আনবো বলো?
~ ফুচকা। মেহের ফুচকা খেতে চেয়েছে আজকে।
~ আর তুমি?

~ আমিও ফুচকা~ ই। (হেসে তোহা)
~ মোটেও না। ফুচকা তুমি খাওনা। বলো কি আনবো তোমার জন্য?
~ যা বলব তা আনতে পারবেন?

~ কেনো পারবনা? বলেই দেখো। (হেসে নির্ণয়)
~ আমার জন্য কিছু ভালবাসা নিয়া আইসেন তাহলেই হবে।
~ কিহ?

ভালবাসা কিনতে পাওয়া যায় নাকি ময়নাপাখি?
~ হ্যা যায়। খুঁজেন, খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আর তাড়াতাড়ি চলে আসেন। পরে এশারের জামায়াত মিস করবেন।
~ আসছি।

~ রাখছি আমি। আর শুনেন
~ বলো
~ আগামীকাল আমার মেডিক্যালে ফার্স্ট ক্লাস। আপনি আমার সাথে যাবেন না?

~ জানি আমি, সকাল দশটায় এইটাও জানি আর আমি বেঁচে থাকলে যে মাস্ট বি যাবো এইটা তুমি খুব ভালো করেই জানো।
~ থ্যাংক ইউ। রাখছি এখন। আল্লাহ হাফেজ।
তোহাকে আর মেহেরকে নির্ণয় খুব ভালো দুইটা ফোন কিনে দিয়েছে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে।

কিন্তু তোহার অভ্যাস হয়ে গেছে নির্ণয়ের ফোন দিয়ে বাবা মায়ের সাথে কথা বলা। এখনো তোহা তা~ ই করে। তোহার ফোনে নির্ণয়ের নাম্বার ছাড়া আর কারো নাম্বারই নেই। এইদিকে মেহেরের একটা বয়ফ্রেন্ড জুটেছে এইটা তোহা জানলেও নির্ণয় জানেনা।

মেহের বারবার তোহাকে বলেছে যাতে নির্ণয়কে না জানায়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নির্ণয় বাসায় ঢুকলো। মায়ের জন্য ওষুধ আর মেহেরের জন্য ফুচকা ঠিকই এনেছে কিন্তু তোহার জন্য তো ভালবাসা আনেনি। এইজন্য তোহার মন খারাপ হয়ে যায়। নির্ণয় ঘরে গিয়ে তোহাকে বলে,

~ আই এম সরি। আমি ভালবাসা কিনে আনতে পারিনি। ভালবাসা কিনার মতো ওত টাকা আমার ছিল না। (তোহার দিকে তাঁকিয়ে নির্ণয়)
~ একটা জিনিসই তো চেয়েছিলাম তাও বলেন টাকা নাই? (মন খারাপ করে ফেলল তোহা)
~ বলছি কারণ ভালবাসা টাকা দিয়ে কিনা যায়না। ভালবাসা অর্জন করতে হয়।

(তোহাকে নিজের কাছে টেনে কপালে চুমু দিয়ে নির্ণয়)
~ আপনি কতদিন পর আমায় অফিস থেকে এসে কিস করলেন বলেন তো? এখন কি আপনার অফিসের সুন্দরী কলিগ গুলোই সব? ওদের সাথে থাকতে থাকতে বাসায় ফিরে আমায় আদর দিতে ভুলে যান তাইনা?

(অভিমান করে তোহা)
~ এইজন্যই তুমি বলেছো যাতে আমি ভালবাসা কিনে নিয়ে আসি তাইনা? অনেক চালাক হয়ে গেছো তুমি বুঝছো?
~ আপনি চালাক, অসভ্য লোক। লাগবেনা আপনার আমাকে আদর করা। ছাড়েন আপনি।

তোহা কথা বলতে বলতে শ্বাশুড়ি মায়ের ডাক পরলো। তোহা শ্বাশুড়ির ঘরে চলে গেলো নির্ণয়ের কাছ থেকে সরে গিয়ে।
~ নির্ণয়কে শরবত করে দিছো? (নির্ণয়ের আম্মু)
~ হ্যা মা। গোসল করে উনি মসজিদে যাবেন। ডাকব ওনাকে?
~ হ্যা। বলো যে আমি ডাকি।

~ আচ্ছা মা।

নির্ণয় গোসল করতে ঢুকবে তখনি তোহা নির্ণয়কে আটকিয়ে বলে,
~ মা ডাকছে। দেখা করে আসেন আগে।
~ গোসল করে যাই?

~ না এখনি। গায়ে টাওয়েল দিয়ে যান। একশদিন বলছি মা বোনদের সামনে বাসায় খালি গায়ে ঘুরবেন না। কথাই শুনেনা আমার। অবশ্য আমি কে?

~ সুন্দরী কলিগরাই সব। এইটাই তো বলবে? (নির্ণয় টাওয়েল ঘাড়ে ফেলে)
~ হ্যা সত্যি যে তাই।

নির্ণয় মায়ের সাথে কথা বলে এসে গোসল করে কিছু খায় এরপর নামাজ পড়তে যায়। এইটা ওর ডেইলি রুটিন। বাবা নিজের ব্যবসা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত। রাত ছাড়া পরিবারকে সময় দিতে পারেনা। রাতে ডিনারের আগে সবাই মিলে ড্রইংরুমে জম্পেশ একটা আড্ডা হয় প্রতিদিনই। তোহা নতুন রান্না শিখেছে তাই এইটা ওইটা প্রায় প্রতিদিনই বানায় ও। রান্না করতে নাকি ওর ভালোলাগে।

রাতে ঘুমানোর আগে,
নির্ণয় ফোন ইউজ করছে আর তোহা ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। ঘর ঝাড়ু দেওয়া হয়ে গেলে হাতমুখ ধুয়ে এসে শুয়ে পরে নির্ণয়ের পাশে। নির্ণয় তখন ফোন রেখে দেয়। তোহাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
~ কালকে থেকে তুমি মেডিক্যালে যাচ্ছো।

সেখানে শুধু মেয়ে নেই, ছেলেও আছে। একসাথে ক্লাস করতে হয়, বন্ধুত্ত্ব হয় আরো কতকিছু। তুমি প্লিজ ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ত্ব করনা।

যতখুশি মেয়ে ফ্রেন্ড বানাও কিন্তু ছেলেদের সাথে কথাও বলো না। নিজের পড়াশোনা আর সংসার দুটোই ভালভাবে সামলাতে পারো তুমি আমি জানি। কিন্তু এতদিন তো মেহের তোমায় হেল্প করেছে। মেহেরকেও তো বিয়ে দিতে হবে তখন সব একাহাতে তোমায় করা লাগবে।

এতকিছুর মাঝেও তোমার পড়াশোনার স্পিরিট যাতে নষ্ট না হয়। দুইটাকে সমান প্রায়োরিটি দিও। চার বছর পর যেন ভালো রেজাল্ট নিয়ে মেডিক্যাল থেকে বের হতে পারো সেই চেষ্টাই কর। কালকের কথাগুলো আজ বলে দিলাম। কাল বলার সময় হবে নাকি জানিনা।
~ আপনি আমার সাথে থাকবেন তো?

~ কলিগদের সাথে না থাকি? (নির্ণয়)
~ ধ্যাৎ। (নির্ণয়কে জড়িয়ে ধরে তোহা)
সকালে সবার দোয়া নিয়ে বোরকার উপর সাদা এপ্রোণ গায়ে জড়িয়ে আর কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে তোহা বেরিয়ে যায়।

মেডিক্যাল থেকে পয়তাল্লিশ মিনিট দূরত্বে নির্ণয়ের বাসা। তোহাকে মেডিক্যালে নামিয়ে দিয়ে একটা সাইড হাগ করে আর অল দা বেস্ট জানিয়ে নির্ণয় চলে আসে কারণ ভেতরে গার্ডিয়ানরা নট এলাউড। নির্ণয়ের বাবা এসে তোহাকে বাসায় নিয়ে যাবে। নির্ণয় অফিসে এসেছে ঠিকই কিন্তু মন তোহার কাছেই পরে আছে। তোহার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস খুব ভালভাবেই শেষ হয়।

ক্লাস শেষ করে তোহা সবার আগে নির্ণয়কে ফোন করে সব জানায় এরপর শ্বশুরের সাথে বাড়ি ফিরে যায়। সেইদিনই নির্ণয় আর তোহার আলাদা হওয়ার বন্দোবস্ত করে দিলো নির্ণয়ের অফিসের বস। উনি নির্ণয়কে ট্রান্সফার করে রাজশাহী পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছেন। নির্ণয়ের মন পুরা খারাপ। তোহাকে ছেড়ে আর পরিবার ছেড়ে ওকে যেতে হবে।

লেখনী ~ নীলিমা জাবিন তানমনা

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “তবুও তোমাকেই চাই (১ম খণ্ড) – আবেগের ভালোবাসার গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – তবুও তোমাকেই চাই (শেষ খণ্ড) – ভালোবাসার আবেগের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!