স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প

প্রিয় তুমি – ভালোবাসার কথা | Love Story Bangla

ভালোবাসার কথা

প্রিয় তুমি – ভালোবাসার কথা: ভালোবাসা বড়ই বিচিত্র। কখনো রাগ, কখনো এক বুক ভালোবাসায় ডুবে থাকা আবার কখনো কথা না বলে অভিমান করে থাকা। চলুন এরকম একটি গল্প পড়ি।

পর্ব- ১

তোমাকে বিয়ে করেছি বলে ভেবো না তুমি বউয়ের অধিকার পাবে আমার থেকে। এ বিয়েতে আমার কোনো মত ছিলো না শুধুমাত্র মা-বাবার কথা রাখতে বিয়ে করেছি। না হলে তোমার মতো একটা মেয়ে এই আলিফ আহমেদের পাশে দাড়ানোর যোগ্যতা রাখে না।
সো বি কেয়ারফুল অধিকার দেখাতে আসবে না কখনো।

বাসর রাতে স্বামীর থেকে এরকম কথা শুনে ইপ্তি খানিকটা অবাক হলেও নিজেকে সামলে নিলো। কারন ওর ধারনা ছিলো এমনটাই হতে পারে। কিন্তু যোগ্যতা এই কথাটা খুব গায়ে লাগলো ওর। হতে পারে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে কিন্তু রুপে গুনে কোনে দিক থেকে তো কমতি নেই। আচ্ছা শুধু কি টাকা পয়সা দিয়ে যোগ্যতা যাচাই করা হয়? ইপ্তি ঘোমটার আড়াল থেকে আড় চোখে আলিফের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো,

  • নাহ ভেঙে পড়লে চলবে না, নিজেকে শক্ত রাখতে হবে। আজ অন্তত কিছু বলবো না। আমাকে যোগ্যতা নিয়ে কথা শুনানো তাইনা! কি ভাবে কি নিজেকে হিরো! হুহ। অবশ্য হিরোর থেকে কম কিছু নয় দেখতে তো মাশআল্লাহ!

ইপ্তি বেড থেকে নেমে কোনো কথা না বলে লাগেজ থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে চলে গেলো।

আলিফ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো ইপ্তিকে এতোটা শান্ত দেখে। ও ভেবেছিলো হয়তো কোনো রিয়েক্ট করবে।

  • কি হলো এটা! মেয়েটি কি কিছুই শোনে নি! কিন্তু আমি তো জোরেই বলছি। আমি এতো কিছু বললাম অথচ একটা শব্দও বের করলো না মুখ থেকে। বাই দা ওয়ে, মেয়েটি বোবা নয় তো? ধুর যা খুশি হোক তাতে আমার কি। বরং ভালোই হলো আমাকে আর কিছু বলতে হলো না।

ইপ্তি শাড়ি চেঞ্জ করে কালো রঙের একটা ড্রেস পড়ে নিলো। রাতে শাড়ি পড়ে ঘুমাতে অসুবিধা হবে তাই।

আলিফ বেডে শুয়ে ফোনে কিছু একটা করছে দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সেদিকে না তাকিয়ে বললো,

  • তোমাকে আমি যা যা বলেছি এসব মা-বাবা যেনো না জানতে পারে। যদি জানে তাহলে…..
  • তাহলে খুব খারাপ হবে তাইতো?

ইপ্তির মুখে কথা শুনে আলিফ অবাক হয়ে তাকালো। কিন্তু সে অবাক চাহনি প্রিয়ন্তি দেখলো না। ও আলিফের থেকে উল্টো দিকে ঘুরে গায়ে ওড়নাটা ভালো করে পেঁচিয়ে নিলো।

আলিফ স্বাভাবিক হয়ে বললো,

  • যাক কথা বলতে পারো তাহলে আমি তো ভেবেছিলাম….যাই হোক ঘরের কথা যেনো বাইরে না যায়।

ইপ্তি মুখ বাকিয়ে মনে মনে বললো,

  • এই ছেলে আমার সামনে যতোই হিরোগিরি দেখাক না কেনো নিজের বাবা-মায়ের কাছে একদম জিরো, এটা বেশ বুঝতে পারছি আমি।

ইপ্তি বেডের অন্য পাশে গিয়ে বেডে বসতে নিলে আলিফ, ফোনের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • আমি কারো সাথে বেড শেয়ার করে শুতে পারিনা। তুমি সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ো। তুমি নিজেকে আমার বউ ভাবতে পারো বাট আমি তা মানি না।

ইপ্তির এবার রাগ উঠে গেলো ভেবেছিলো আজ অন্তত কিছু বলবে না কিন্তু এখন দেখছে কথা না বললে আলিফ আরো সুযোগ পেয়ে যাবে।

  • এই যে মিস্টার, আমি কি আপনাকে বাধ্য করেছি বিয়ে করতে? করলেন কেনো বিয়ে? আমার এতো ইচ্ছে ছিলো না এমন বড় বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করতে। এরা তো শুধু অহংকার করতে জানে মন বলতে কিছুই নেই। আপনি যেমন আপনার বাবা-মায়ের কথা রাখতে বিয়ে করেছেন আমিও তেমন আমার মামার কথা রাখতে বিয়েতে রাজি হয়েছি।

ভেবেছিলাম আজ কোনো কথা বলবো না কিন্তু আপনি আমাকে বাধ্য করলেন বলতে। আর শুনুন আমি এই বেডেই ঘুমাবো আপনার প্রবলেম হলে আপনি সোফায় যান। গুড নাইট।

আলিফ তো আশ্চর্য হয়ে গেছে। এই মেয়ে এতো কথা বলতে পারে ওর ধারনাই ছিলো না। ধারনা থাকবেই বা কি করে প্রথমে তো টু শব্দ ও করেনি।

ইপ্তি অন্যদিকে ঘুরে শুয়ে আছে। আলিফ একবার তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বেড থেকে নেমে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। রাগে গজ গজ করতে করতে বললো,

  • মেয়েটিকে যতোটা সহজ সরল ভেবেছিলাম ততোটাও নয়। কিভাবে কথা শুনিয়ে দিলো আমাকে এমনকি আমার বেডটাও দখল করে নিলো। ইচ্ছে তো করছে এই মেয়েকে এ রুম থেকেই বের করে দেই। মা-বাবা কি দেখেছে এই মেয়ের মাঝে আল্লাহ জানে। ওকে তো আমি দূর করবোই আমার লাইফ থেকে। এমন নিচু ঘরের একটা মেয়ে আমার বউ হয়ে থাকতে পারে না।

ইপ্তি ঘুরে দেখলো আলিফ সোফায় শুয়ে আছে। ইপ্তির চোখ থেকে পানি পড়তে লাগলো, শব্দহীন কাঁদছে। মনে মনে বলতে লাগলো,

  • মা-বাবা তোমরা তো ওপর থেকে সব দেখছো। জানো আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তোমরা চলে যাবার পর মামা অতি আদরের সাথে আমাকে বড় করেছে। কিন্তু মামি আমাকে সহ্য করতে পারতো না মামার অবর্তমানে আমাকে কথা শোনাতো। মামা বুঝতে পারতো আমার কষ্টটা। আমার একটু সুখের জন্য মামা আমাকে আলিফের সাথে বিয়ে দিলো। কিন্তু আমার ভাগ্যটা যে খারাপ আলিফ আমাকে নিজের ইচ্ছে বিরুদ্ধে বিয়ে করেছে। মা বাবা তোমরা বলোনা আমি কি করবো এখন? আমি কি পারবো আলিফকে মানিয়ে নিতে?

ইপ্তির যখন ৫ বছর বয়স তখন ওর বাবা-মা রোড এক্সিডেন্ট এ মারা য়ায়। তারপর থেকেই ইপ্তি ওর মামা বাড়িতে থাকতো। ইপ্তির মামা ওকে অনেক ভালোবাসতো কিন্তু ওর মামি ওকে দেখতে পারতো না খোটা দিয়ে কথা বলতো। ইপ্তি ভেঙে পড়েনি নিজেকে গড়ে তুলতে হলে এমন হাজারো কথা শুনতে হয় এটা ভেবেই কখনো মামির সাথে খারাপ ব্যাবহার করে নি।

ইপ্তি অনার্স ২য় বর্ষে পড়ে ওর এতোদূর আসার পেছনে একমাত্র অবদার ওর মামার।

ইপ্তির গায়ের রং উজ্জল শ্যাম বর্ণের। চুল গুলো কোকড়ানো হলেও কোমড় ছাড়িয়ে যায়। ইপ্তির মুখের গড়নটা খুবই মায়াবী। আর সেই মায়াতেই আটকে গিয়েছে আলিফের বাবা-মা।

ইপ্তির মামা আলিফের বাবার অফিসে চাকরি করে। ইপ্তি প্রায় যেতো মামার অফিসে। অর্ক আহমেদ (আলিফের বাবা) ইপ্তিকে দেখে পছন্দ করে ওর ব্যবহার চলাফেলা সবকিছু দেখে মুগ্ধ হয় সে। আলিফের বাবা আলিফের মাকেও ইপ্তির ব্যাপারে বলে। আনিলা আহমেদ(আলিফের মা) সেও ইপ্তিকে দেখে তারও ভালো লেগে যায়।

আলিফের বাবা-মা ইপ্তিকে ছেলের বউ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইপ্তির মামাকে প্রস্তাব জানালে সে অমত করেনি ইপ্তির ভালোর কথা ভেবে রাজি হয়ে য়ায়।

আলিফ মাস্টার্সে পড়ছে, দেখতে স্মার্ট ফরসা গায়ের রং। আলিফ নিজের মন মতো চলতেই পছন্দ করে। বন্ধুদের সাথে বেশির ভাগ সময় সে বাইরে কাটায় এতে ওর ওপর খারাপ প্রভাব পড়বে। তাই ওর বাবা-মা ভাবে ওকে বিয়ে করালে হয়তো নিজেকে পাল্টাতে পারবে। আলিফ এখনি বিয়ে করতে চায়নি ওর বাবা-মায়ের কথায় বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছে। বিয়ের আগে ইপ্তিকে দেখেওনি।

ইপ্তি ও এ বিয়ে করতে চায়নি। ও জানে বড়লোকের ছেলেরা অহংকারী হয় তারা সব সময় নিজের ইগোকে প্রাধান্য দেয়। ইপ্তি মানা করে দিয়েছিলো এ বিয়ে ও করবে না শুধুমাত্র মাত্র মামার মান রাখতে রাজি হতে হয়েছে। কারন ওর মামা আলিফের বাবা-মাকে কথা দিয়েছিলো। ইপ্তিকে ছোট থেকে ওর মামা অনেক ভালোবেসে বড় করেছে তাই মামাকে সে কষ্ট দিতে চায়না।

আলিফকে বিয়ে করতে রাজি হয়। অবশেষে পারিবারিক ভাবে ওদের বিয়েটা হয় আত্নীয় স্বজন রাও জানে না। আলিফের পড়াশুনা শেষ হলে জানাবে সবাইকে।

খুব সকালে ইপ্তির ঘুম ভেঙে যায়। ইপ্তি উঠে ফ্রেস হয়ে শাড়ি পড়ে নিলো, সে এবাড়ির বউ বিয়ের পর দিনে জামা পড়াটা মটেও ভালো দেখায় না। ইপ্তি নামাজ আদায় করে ঘড়িতে টাইম দেখলো ০৫:৫৫ বাজে। ইপ্তির রোজকার অভ্যাস ভোরে উঠে নামাজ পড়ে কোরআন তেলাওয়াত করা। কিন্তু এ রুমে আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও কোরআন দেখতে পাচ্ছে না। তাই ভাবলো শাশুড়ির থেকে জেনে নেবে কোরআন কোথায় রাখা আছে।

আলিফ সোফায় জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে আছে, ইপ্তি বেড থেকে চাদরটা এনে আলিফের গায়ে মেলে দিলো। ইপ্তি আলিফের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলতে লাগলো

  • ছেলেরা ঘুমালে এতো সুন্দর দেখায় জানা ছিলো না। কি সুন্দর লাগছে উনাকে। আমাদের বিয়েটা যেভাবেই হোক হয়েছে। এই মানুষটা আমার স্বামী কিন্তু উনি তো আমাকে বউ বলে মানতে নারাজ। উনি কি কখনোই মেনে নেবে না আমাকে? মানুষের জীবন সত্যি অদ্ভুত অনেক বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়। আমাকে শক্ত হতে হবে আলিফের সামনে দুর্বল হওয়া যাবে না। আলিফকে বুঝিয়ে দিতে হবে যোগ্যতা শুধুৃমাত্র সমানে সমানে হয়না। মানুষের সঠিক ব্যবহারই হলো আসল যোগ্যতা।

ইপ্তি কিচেনে এসে নিজে হাতে ব্রেকফাস্ট তৈরি করে সব টেবিলে নিয়ে রাখলো। বাড়ির কাজের মেয়ে ওকে মানা করেছিলো কিন্তু ও শোনে নি শিউলিকে(কাজের মেয়ে) সাথে থেকে সাহায্য করতে বলে নিজেই করেছে।

আলিফের মা নিচে এসে দেখলো ইপ্তি ডাইনিং এ সব এনে রাখছে। উনি এগিয়ে গিয়ে বললো,

  • ইপ্তি তুমি এতো সকালে উঠেছো কেনো? আর এসব তুমি করছো কেনো?
  • আসলে আন্টি আমার সকালে উঠার অভ্যাস। তাছাড়া আমার এসব করতে প্রবলেম হচ্ছে না। শিউলি আমাকে মানা করেছিলো আমি নিজে থেকেই করেছি।
  • হুম বুঝলাম তুমি আমাকে আন্টি কেনো ডাকছো মা বলে ডাকবে কেমন।
  • আচ্ছা। তাহলে আপনি আমাকে তুমি নয় তুই করে বলবেন।
  • ঠিক আছে বলবো তুই করে। তাহলে যে তোকেও এই মাকে আপন ভেবে তুমি বলতে হবে।

ইপ্তির চোখ ছলছল করে উঠলো, শাশুড়ি যে ওকে একদিনে এতো আপন করে নেবে ভাবে নি।

  • একিরে তোর চোখে পানি কেনো!
  • কই নাতো। চোখের পানি মুছে বললো।

আলিফের মা ইপ্তির গালে হাত রেখে বলল্‌,

  • বুঝতে পেরেছি আমি। শোন আজ থেকে আমি তোর মা কখনো শাশুড়ি ভাববি না। নিজের মা ভেবে সবকিছু শেয়ার করবি আমার সাথে। তুই সত্যি খুব লক্ষি মেয়ে আমার মেয়ে হয়ে থাকবি তুই।
    ব্রেকফাস্ট টেবিলে আলিফ পরোটা খেতে খেতে বললো,
  • মা আজকের ব্রেকফাস্ট কে বানিয়েছে? স্বাদটা অন্যরকম।
  • কেনো ভালো হয়নি?
  • ভালো হয়েছে বলেই জিজ্ঞাসা করলাম।

আলিফের মা হেসে বললো,

  • ইপ্তি করেছে।

আলিফ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • ইপ্তি কে?

আলিফের মা বাবা বোন সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

আলিফের বোন কুসুম বললো,

  • সেকি ভাইয়া তুই নিজের বউয়ের নামটা জানিস না এখনো!

পর্ব- ২

আলিফ ওর মায়ের রুমে মাথা নিচু করে বসে আছে। আলিফের মা ওর পাশে এসে বললো,

  • আলিফ আমি আর তোর বাবা তোর ভালোর কথা ভেবে ইপ্তিকে তোর সাথে বিয়ে দিয়েছি। আমি বুঝতে পারছি তুই ওকে মেনে নিতে পারিস নি। ইপ্তি খুবই ভালো মেয়ে ওকে তুই মেনে নে।

আলিফ নিচের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছে ওই মেয়ের তো আজ খবর আছে, আমি মানা করার পরেও মাকে বলে দিয়েছে আমি ওকে মেনে নেইনি!

  • কি হলো বিড়বিড় করে কি বলছিস তুই?
  • নাহ মা কিছুনা। মা ওই মেয়েটা তোমাকে বলেছে আমি ওকে মেনে নেই নি তাইনা?
  • ওই মেয়েটা কি কথা হুম? ওকে ইপ্তি বলবি। আর শোন ইপ্তি আমাকে কিছু বলেনি। তুই খাবার টেবিলে ওর নাম শুনে চিনতে পারলি না তখনি আমি যা বুঝার বুঝে নিয়েছি। দেখ আলিফ মেয়েটা আমাদের মতো এতো বড় ঘরের মেয়ে না হলেও ওর মধ্যে আমাদের সাথে মিশে থাকার প্রতিভা আছে। আমি গত ২ সপ্তাহ ধরে ওকে ফলো করে তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোর কি মনে হয় তোর বাবা আর আমি তোর খারাপ চাইবো?
  • মা এসব কি বলছো তোমরা আমার খারাপ কেনো চাইবে। মা তোমাদের কথা রাখতে আমি বিয়ে করেছি। ভেবেছিলাম পড়াশুনা শেষ করে তারপর বিয়ে করবো কিন্তু তোমরা সেই সুযোগ টাও দিলে না। চিনি না জানিনা এমন একটা মেয়েকে আমার লাইফে জুরে দিলে।
  • এখন চিনবি ওকে প্রবলেম কোথায়? তোর পড়াশুনায় তুই চালিয়ে যা। আলিফ আবারো বলছি ইপ্তির মতো লক্ষী মেয়ে খুবই কম দেখা যায়। ওর আচরন চলাফেরা সব দিক থেকেই পারফেক্ট। আর চেহারা তো মাশআল্লাহ, অনেক মায়া ওর চোখে মুখে।

আলিফ মনে মনে বিরক্ত হচ্ছে ইপ্তিকে নিয়ে কথা শুনতে। মাকে মানা করতেও পারছে না। তাই ওর মাকে বললো,

  • মা তোমাদের কথায় আমি বিয়ে করেছি, ঠিকআছে মেনেও নিবো ওই মেয়েকে। এবার খুশি তো?

আলিফের মা হেসে বললো,

  • হুম খুব খুশি। তুই শুধু একবার ইপ্তিকে মেনে নে দেখবি পরে তুই নিজেই ওকে ছাড়তে চাইবি না চোখে হারাবি ওকে।

আলিফ উঠে দাড়িয়ে বললো,

  • মা আমাকে একটু বের হতে হবে আসছি এখন।

আলিফ মায়ের রুম থেকে বেড়িয়ে রাগে হাত মুঠোবন্দী করে বলতে লাগলো,

  • মাকে তো থামানোর জন্য বললাম মেনে নেবো ওই মেয়েকে। কিন্তু নাহ ওকে আমি মানবো না। ওই মেয়েটি দেখছি মাকে নিজের বসে নিয়ে নিয়েছে। শুধু মা নয় বাবাও তার ভক্ত হয়ে গিয়েছে। এসব ছোট ঘরের মেয়েদেরকে ভালো করে চেনা আছে আমার ধনী পরিবার পেয়েছে তাই বাবা-মাকে কৌশলে নিজের দলে টেনে নিয়েছে। ওই মেয়েকে কি বলবো আমার বাবা-মা সুযোগ দিয়েছে বলেই তো সে সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে।

ইপ্তি ব্যালকনিতে দাড়িয়ে আছে। উদাসীন হয়ে ভাবছে কি হয়ে গেলো ওর জীবনে। বিয়ে শশুরবাড়ি বর সবকিছু নিয়ে মেয়েদের একটা সপ্ন থাকে হয়তো ইপ্তির ও এমন সপ্ন ছিলো। সব ঠিক থাকলেও যে তার বরটা ঠিক নেই ওকে তো সে বউ বলেই মানবে না বলেছে। ইপ্তি বুঝে উঠতে পারছে ওর কি করা উচিত। ও কি আলিফের অবহেলা সয়ে এই বাড়িতে থাকবে নাকি চলে যাবে। কিন্তু এ বাড়ি ছেড়ে আর কোথায় যাবে ইপ্তি মামার কাছে ফিরে গেলে যে সে কষ্ট পাবে আর মামির কটু কথা শুনতে হবে।

ইপ্তি অনেক ভেবে মনে মনে বললো,

  • ছোট বেলায় বাবা মাকে হারিয়েছি এখানে এসে আমি নতুন বাবা মা পেয়েছি আমি পারবো না এদেরকে ছেড়ে যেতে। বরের ভালোবাসা না হয় নাই পেলাম বাবা মায়ের ভালোবাসা তো পাবো এতেই আমি খুশি।

ইপ্তির ভাবনার মাঝে কুসুমর ডাক শুনতে পেলো

  • ভাবি কোথায় তুমি?

ইপ্তি ব্যালকনি থেকে রুমে এসে মৃদু হেসে বললো

  • আপু এইতো আমি ব্যালকনিতে ছিলাম।
  • ভাবি আমাকে আপু ডাকছো কেনো আমার নাম কুসুম, নাম বলেই ডাকবে। তুমি আমার বড় ভাইয়ের বউ সম্পর্কে আমি তোমার ছোট ননদ হই।
  • আপু তুমি আমার সম্পর্কে ছোট হলেও বয়সে তো বড় আমি তোমাকে আপু বলেই ডাকবো।
  • আচ্ছা ঠিকআছে ডেকো তবে শোনো আমাকে ননদ বলে দূরে সরিয়ে রেখো না বোনের মতো মিশবে আমার সাথে।
  • আচ্ছা আপু।

কুসুম ইপ্তির গালে হাত রেখে মুচকি হেসে বললো,

  • আমার সুইট ভাবি। আমি ঠিক এমনই একটা ভাবি চেয়েছিলাম আর পেয়েও গেছি। আ’ম সো হ্যাপি।

ইপ্তি হাসলো কিছু বললো না শুধু মনে মনে অবাক হচ্ছে,
আলিফের বাবা মা ওর বোনের ব্যবহারে। মাত্র একদিকে এতোটা আপন করে নিয়েছে ইপ্তিকে।

  • ওহ ভাবি যেটা বলতে এসেছিলাম, মা তোমাকে ডাকছে মায়ের রুমে যেতে বলেছে।
  • হুম যাচ্ছি। আপু একটা কথা বলবো?
  • হ্যা বলোনা কি কথা?
  • বলছি তোমার ভাইয়া কি বাড়িতে আছে? ব্রেকফাস্ট এর পর আর দেখিনি তো তাই আর কি।

কুসুম কিছুক্ষণ ইপ্তির দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

  • ভাইয়া তো সকালেই বেড়িয়ে গেছে। তোমাকে কিছু বলে যায়নি তাইনা?
  • না মানে! আপু বাদ দাও চলো মায়ের রুমে যাই।
  • ভাবি তুমি না বললেও আমি বুঝতে পারছি। ভাইয়া তোমার নামটাও জানতো না এতেই তো সবটা পরিষ্কার যে ভাইয়া তোমাকে মেনে নিতে পারে নি। তবে তুমি টেনশন করো না ভাইয়া তোমাকে মেনে নেবে আর তোমার প্রেমেও পড়বে খুব তাড়াতাড়ি।

ইপ্তি চোখ বড় বড় করে তাকালো, আফিয়ে হেসে উঠে বললো

  • ওভাবে কি দেখছো! আমি যা বলেছি না এটাই হবে মিলিয়ে নিয়ো। চলো এখন।

রাত ১১টা বেজে গিয়েছে আলিফ এখনো বাড়ি ফেরেনি। ইপ্তি ড্রয়িংরুমে বসে আছে আলিফের অপেক্ষায়। আলিফের মা ও বসে ছিলো ইপ্তি জোর করে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে। এদিকে ওর ক্ষিদেও পেয়েছে আলিফের সাথে খাবে বলে সবার সাথে খায়নি। ইপ্তি যদিও জানে ও না খেয়ে থাকলেও আলিফ ওকে খেতে বলবে না বা জানতেও চাইবে না খেয়েছে কিনা।

কলিংবেল বেজে উঠতে ইপ্তি শাড়ির আচঁলটা মাথায় তুলে দরজা খুলে দিলো। বাইরের আলো ইপ্তির মুখে না পড়লেও ঘরের লাইটের আলো আলিফের মুখে পড়েছে। আলিফের ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে ইপ্তি। আলিফ বিরক্ত নিয়ে বললো,

  • দরজা আটকে দাড়িয়ে না থেকে সরো এখান থেকে।

ইপ্তি সরে আসলো সেখান থেকে। আলিফ ভেতরে ঢুকে সোজা উপরে চলে গেলো। ইপ্তি দরজা আটকে ডাইনিং এর খাবার রেডি করে উপরে এলো।

আলিফ ফ্রেস হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতে ইপ্তি সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে বললো,

  • খাবার রেডি করে এসেছি নিচে চলুন।
  • আমি খেয়ে এসেছি ফ্রেন্ডের বাসা থেকে, খাবো না এখন।

ইপ্তি আর কথা বড়ালো না নিচে এসে খাবারগুলো ফ্রিজে রেখে দিলো। ইপ্তিও আর কিছু খেলো না শুধু এক গ্লাস পানি খেয়ে রুমে চলে এলো।

আলিফ বেডের ঠিক মাঝখানে শুয়ে আছে ফোনের দিকে তাকিয়ে। ইপ্তি ঠিক বুঝতে পারছে ও যেনো বেডে শুতে না পারে এইজন্যই মাঝখানে গিয়ে শুয়ে আছে।

  • আমি যেমনি হই না কেনো এই আলিফের সামনে নরম হওয়া যাবে না।

ইপ্তি বেডের পাশে দাড়িয়ে বললো,

  • পুরো বেড জুড়ে শুয়েছেন কেনো? একপাশে যান আমি ঘুমাবো এখন।

আলিফের কানে যেনো কোনো কথাই যায় নি ও ফোনের দিকেই তাকিয়ে আছে।

  • কি হলো আপনি শুনতে পাননি? আমি ঘুমাবো তো।

আলিফ ফোনের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • রুম আমার বেড আমার এমনকি এ রুমে যা আছে সবই আমার। সো জোরটা আমার বেশি, এতো কথা না বলে যাও গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ো।
  • ও আচ্ছা রুম আপনার বেড আপনার এ রুমের সব আপনার তাহলে আপনি স্বীকার করলেন আমিও আপনার মানে আপনার বউ।
    আলিফ রেগে উঠে বসলো ইপ্তি পাশ ফিরে দাড়ালো মনে মনে ভাবছে,
  • সাহস দেখিয়ে তো বলে ফেললাম না জানি এই জিরোটা কি করবে এখন!
  • হাউ ডেয়ার ইউ! কি বলছো এসব? তোমাকে আমি বউ বলে স্বীকার করেছি কখন?
  • এক্ষুনি তো বললেন এই রুমে যা যা আছে সব আপনার। তাহলে আমিও তো এখন আপনার রুমে আছি আমিও আপনার। সিম্পল।
    আলিফ রাগি চোখে তাকালো ইপ্তির দিকে। ইপ্তি সাথে সাথে অন্যদিকে ঘুরে বললো,
  • আপনি যদি আমাকে শুতে না দেন তাহলে আমি এখনি মাকে গিয়ে বলে দিবো আপনি আমাকে বেডে জায়গা দিচ্ছেন না।
  • তোমার সাহস তো কম নয় আমাকে ভয় দেখাচ্ছো মায়ের কথা বলে!
  • ওমা! আপনাকে আমি ভয় দেখাবো কেনো আপনি কি ছোট বাচ্চা, যে মায়ের কথা বললাম আর ভয় পেয়ে গেলেন।

আলিফ হাতের মুঠো শক্ত করে দাতে দাত চেপে মনে মনে বললো,

  • মাত্র দুদিন ধরে এসেই এতো সাহস বেড়ে গিয়েছে এই মেয়ের। অধিকার দেখাতে মানা করেছি সেটা তো মানছেই না উল্টো আমার মা বাবা বোনকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে। আবার এখন আমার রুমটাও দখল করতে চাইছে।

ইপ্তি আলিফের দিকে তাকিয়ে দেখলো আলিফ নিচের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। ইপ্তি মুচকি হেসে গিয়ে বেডের একপাশে চাঁদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো।

আলিফ পাশে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললো,

  • তোমাকে না বলেছি সোফায় গিয়ে শুতে। এখানে কেনো শুয়েছো? ওঠো বলছি।

ইপ্তি চাঁদরটা মুড়ি দেওয়া অবস্থায় বললো,

  • উঠবো না। বেডে অনেক জায়গা আছে শুয়ে পড়ুন। না হলে সোফায় যান।
  • কি মেয়েরে বাবা! ঠিকআছে এটাও মেনে নিলাম তবে খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে এবাড়ি থেকে বের করবো।

খুব ভোরে মধুর কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনে আলিফের ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ ডলতে ডলতে চোখ মেলে তাকালো। কিছুটা বিরক্ত লাগলেও এতো সুন্দর কোরআন পাঠ শুনে খুব ভালো লাগছে ওর। সোয়া থেকে উঠতে নিলে দেখলো কালকের মতো আজও চাঁদর গায়ের ওপর।

আলিফ সামনে তাকিয়ে দেখলো ইপ্তি মাথায় ওড়না পেচিয়ে জায়নামাজে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছে।

আলিফ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ৫:৫২ বাজে। এতো ভোরে কি করে ওর ঘুম ভাঙলো এটা ভেবেই অবাক হচ্ছে!

ইপ্তি পড়া শেষ করে কোরআন শরীফ ঠিক জায়গায় রেখে জায়নামাজ গুছিয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো আলিফ নিচের দিকে তাকিয়ে সোফায় বসে আছে।

  • কি ব্যাপার আপনার এতো সকালে ঘুম ভেঙে গেলো যে? বুঝেছি আমার কোরআন পড়ার শব্দে আপনার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। আচ্ছা ঠিকআছে আমি পাশের রুমে গিয়ে পড়বো কাল থেকে।

ইপ্তি কথাটি বলে অন্যদিকে ঘুরে ওড়না খুলতে লাগলে। আলিফ উঠে দাড়িয়ে টি শার্ট ঠিক করতে করতে বললো,

  • না অন্য রুমে যেতে হবে না এ রুমেই পড়বে।

ইপ্তি ঘুরে আলিফের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • আপনার প্রবলেম হবে নাতো?
  • নাহ প্রবলেম কিসের কোরআন পড়া বা শোনা তো খারাপ কিছু নয়।
  • তাহলে তো নামাজ পড়াটাও খারাপ কিছু নয় বরং আপনার জন্য ভালো। আপনি এখন থেকে নামাজ পড়বেন কেমন?
  • এই মেয়ে তোমাকে আমার ভালো নিয়ে ভাবতে হবে না আমি নিজের ভালোটা বুঝে নেবো ওকে।
  • ঠিকআছে ভাবলাম না হুহ।

ইপ্তি ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে চুল ছেড়ে দিলো। ওর ঘন কালো কোকড়ানো চুলগুলো কোমড় ছাড়িয়ে পড়লো। ইপ্তি চুল আচড়ে চুল কাধের একপাশে এনে কিছু একটা খুজতে লাগলো।

ড্রেসিংটেবিলের ওপর আলিফের ফোন রাখা ছিলো আলিফ ওটা নিয়ে মাথা তুলে কয়েকসেকেন্ড অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বললো,

  • তুমিই ইপ্তি!

পর্ব- ৩

ইপ্তি হা করে আলিফের দিকে তাকিয়ে আছে। আলিফ আবারো বললো,

  • কি হলো বলো, তুমিই ইপ্তি?
  • হ্যা আমি ইপ্তি। কিন্তু হঠাৎ এভাবে নাম জিজ্ঞাসা করছেন কেনো?

আলিফ কোনো কথা না বলে হা করে তাকিয়েই রইলো ইপ্তির দিকে। ওর এভাবে তাকানোতে ইপ্তি অস্বস্তি বোধ করছিলো। হঠাৎ আলিফের এভাবে তাকিয়ে থাকা নাম জানতে চাওয়া অদ্ভুত লাগছে ইপ্তির কাছে।

ইপ্তি আলিফের সামনে হাত নাড়িয়ে বললো,

  • এই যে জিরো সাহেব কোথায় হারিয়ে গেলেন আপনি?

আলিফ কিছুটা চমকে উঠে বললো,

  • জিরো! আমাকে জিরো কেনো বলছো তুমি?
  • ঘরের মধ্যে আমার সামনে হিরোগিরি দেখান আর বাবা মায়ের সামনে জিরো আপনি। তাই আমি আপনার এই নাম দিয়েছি।
  • খবরদার আমাকে তুমি জিরো বলবে না। আচ্ছা একটা কথা বলোতো আমি কি তোমাকেই বিয়ে করেছি?

ইপ্তি অবাক হয়ে বললো,

  • বিয়ের ২ দিন পর আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন আপনি আমাকে বিয়ে করেছেন কিনা! কথাটা কেমন হাস্যেকর হয়ে গেলো না?

আলিফ আর কিছু বললো না মাথার চুলগুলো একহাতে টানতে টানতে ব্যালকনিতে চলে গেলো।

ইপ্তি আলিফের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

  • কিছুই তো বুঝলাম না কি হইলো এইটা!

আলিফ ব্যালকনিতে দাড়িয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,

  • এই মেয়েটার সঙ্গে দুদিন একরুমে থেকেও ওর চেহারাটা আমি দেখিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে আয়নায় ওর মুখটা দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না! এটাই সেই মায়াপরী যাকে আমি এতো খুজেছি অথচ পাইনি। হ্যা সেদিন তো ক্যাফেতে পাশের মেয়েটি ওকে ইপ্তি নামেই ডেকেছিলো। আজ সেই মায়াপরীটা আমার বউ হয়ে আমার এতো কাছে আছে! ও মাই গড! আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না! আমি আরো দুদিন আগে ওর মুখটা কেনো দেখলাম না? কেনো ওর নামটা শুনেও আমি সেই মায়াপরীর কথা ভাবলাম না? যদিও নামটা শুনে চমকেছিলাম কিন্তু একই নামে তো অনেক মেয়ে আছে এটা ভেবেই ভুল করেছি। এখন কি করবো আমি?

আলিফ চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলো কয়েকমাস আগের কথা……

আলিফ বন্ধুদের সাথে একটা ক্যাফে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ক্যাফেটা খুবই সুন্দর আর জায়গাটাও খোলামেলা। ক্যাফের চারিপাশটা ছিলো শুধু সবুজের সমারহ। শো শো করে বাতাস বইছে যা এখানে থাকা সকলের শরীর মনকে ফ্রেশ করে দিচ্ছে। এককথায় অসাধারণ একটি জায়গা।

হঠাৎ মেয়েদের হাসির শব্দ পেয়ে আলিফ পাশের টেবিলে তাকালো। ওই টেবিলে ৩ জন মেয়ে বসে আছে ২ জন মেয়ের মুখ দেখতে পেলেও ওই ২ জনের আড়ালে থাকা মেয়েটির মুখটা আলিফ দেখতে পায় নি। হাসির শব্দটা যেনো আলিফের কানে এখনো বাজছে কিন্তু এই ৩ টি মেয়ের মধ্যে কে এতো সুন্দর করে হাসলো আলিফ সেটাই ভাবছে।

আলিফের বন্ধু ঈশান আলিফকে বললো,

  • কিরে ওই দিকে তাকিয়ে আছিস কেনো? ওই মেয়েদের মধ্যে কাউকে ভালো লেগেছে নাকি?
  • আরে নাহ কি বলছিস আমি তো অন্য কিছু দেখছিলাম।
    আলিফ কফি খাচ্ছে আর আড় চোখে পাশের টেবিলের দিকে তাকাচ্ছে। ওর খুব মন চাইছে জানতে এতো সুন্দর করে কে হাসছিলো। আলিফ ওইদিকেই তাকিয়ে আছে তখন ২ জন মেয়ের মধ্য একজন উঠে কোথায় যেনো গেলো। মেয়েটা সরে যাওয়ার পর সেই আড়ালে থাকা মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখতে পেলো আলিফ।

আলিফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, মেয়েটির ঠোঁটে লেগে আছে মুচকি হাসি সামনে থাকা কোকড়ানো চুলগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। কিছু চুল চোখে মুখে পড়তে হাত দিয়ে কানের পেছনে গুজে হাত নাড়িয়ে সামনের মেয়েটির সাথে কথা বলছে। চোখে কাজল নেই অথচ ঘন পাঁপড়ি গুলো দেখে মনে হচ্ছে কাজল টেনে দেওয়া চোখে।

আলিফ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে।

মেয়েটির চোখের মায়ায় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।
হঠাৎ মেয়েটি উঠে দাড়াতেই আলিফ নড়েচড়ে উঠল তবে দৃষ্টি সরালো না। পাশে থাকা মেয়েটি বললো,

  • ইপ্তি এ জায়গাটা খুব সুন্দর মাঝে মাঝে আসতে হবে।
    তখন আলিফের দেখা মেয়েটি হাসি মুখে কিছু একটা বললো যা আলিফ শুনতে পেলো না।

আলিফের বন্ধুরা ওকে ডাকছে সেদিকে ওর কোনো খেয়াল নেই ও সেই মেয়েটিকে দেখতে ব্যস্ত, তার মুচকি হাসি চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিকে তাকানো আলিফকে মুগ্ধ করে তুলেছে।

মেয়েগুলো বেড়িয়ে যেতে নিলে আলিফ উঠে দাড়িয়ে বললো,

  • তোরা থাক আমার একটু কাজ আছে আমি আসছি এখন। কাল দেখা হবে।

আলিফ কথাটা বলে তাড়াহুড়ো করে ক্যাফের দরজার সামনে আসতেই ঈশান জোরে বলে উঠলো,

  • আরে আলিফ তোর ফোন আর বাইকের চাবিটা তো নিয়ে যা।
    আলিফ ফিরে এসে ফোন আর চাবি হাতে নিয়ে যেতে নিলে পিয়াস(আলিফের বন্ধু) বললো,
  • কি এমন কাজ তোর এতো তাড়াহুড়ো করছিস কেনো?
  • পরে বলবো এখন সময় নেই।

আলিফ ক্যাফে থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে এলো কিন্তু চারিদিকে তাকিয়ে সেই মেয়েটিকে আর দেখতে পেলো না। হতাস হয়ে জোরে শ্বাস নিয়ে বলতে লাগলো,

  • কোথায় গেলো মেয়েটা? ধেত তখনি কেনো বের হলাম না আমি। কোথায় খুজবো এই মায়াপরীটাকে? হ্যা মেয়েটি সত্যি একটা মায়াপরী পাগল করা তার হাসি মুগ্ধ করেছে আমাকে। কাজল বিহীন চোখ জোড়া যেনো তার চোখের মায়ায় ফেলে দিয়েছে। ঘন কালো কোকড়ানো চুলগুলো মেয়েটির সৌন্দর্যকে যেনো আরো শতগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু আমি যে হারিয়ে ফেললাম সেই মায়াপরীকে, তার দেখা কি পাবো আমি কখনো?

আচ্ছা পাশের মেয়েটি কি নামে ডাকলো ওকে? ধেত মনে পড়ছে না, যাই হোক সে আমার কাছে শুধুই মায়াপরী।

তারপর থেকে আলিফ প্রায়ই সেই ক্যাফেতে যেতো কিন্তু কখনো তার মায়াপরীকে আর দেখেনি। এমনকি রাস্তায় ও কখনো তাকে চোখে পড়েনি। আলিফ আশা ছেড়ে দিয়েছিলো যে সে তার মায়াপরীকে হয়তো কখনো খুজেই পাবে না। সে হয়তো সপ্নের মতো এসে তাকে মুগ্ধ করে হারিয়ে গিয়েছে।

আলিফের দেখা সেই মায়াপরীটা আর কেউ নয় সে ইপ্তি।

অর্ক আহমেদ সোফায় বসে নিউজপেপার পড়ছে। তার রোজকার অভ্যাস সকালে নিউজপেপার পড়া। ইপ্তি চা এনে অর্ক আহমেদকে বললো,

  • বাবা আপনার চা।

অর্ক আহমেদ পেপারটা রেখে হাসি মুখে চা নিয়ে বললো,

  • বউমা তোমার কোনো প্রবলেম হচ্ছে নাতো এবাড়িতে?
    প্রবলেম আর কি সবই ঠিক আছে, প্রবলেম তো একটাই আপনার ছেলে।

ইপ্তি মনে মনে কথাটা বলে মৃদু হেসে বললো,

  • না বাবা আমার কোনো প্রবলেম হচ্ছে না।

অর্ক আহমেদ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললো,

  • আমি জানি বউমা তোমার কোনো প্রবলেম হবে না। তোমার মামার সঙ্গে কথা বলেছিলে?
  • কাল রাতে বলেছিলাম।

কুসুম ইপ্তির পাশে এসে দাড়িয়ে বললো,

  • কি কথা হচ্ছে শশুর বউমার মাঝে আমি কি জানতে পারি?
  • আপু আমার কোনো প্রবলেম হচ্ছে নাকি বাবা সেটাই জিজ্ঞাসা করছিলো।
  • ওও আচ্ছা! বাবা আমি আর মা থাকতে ভাবির কোনো প্রবলেম হবে ভেবেছো। ভাবি যদি ভাইয়ার সঙ্গে একা থাকতো তাহলে না হয় প্রবলেমের কথা ভাবা যেতো।
  • মানে আলিফ কি বউমাকে কিছু বলেছে?

কুসুম কিছু বলতে নিলে ইপ্তি ওর হাত ধরে থামিয়ে বললো

  • না বাবা তেমন কিছু নয় আপু তো এমনি বলেছে।
  • ওহ আচ্ছা বউমা শোনো তুমি আগামিকাল থেকে আবারো ভার্সিটি যাবে পড়াশুনাটা চালিয়ে যাও।

ইপ্তি খুশি হয়ে বললো,

  • আচ্ছা বাবা যাবো।
  • বাবা ভাবির ভার্সিটি তো আমাদের বাসা থেকে দূরে হয়ে যায়। তুমি বরং ভাবিকে ওখান থেকে ট্রান্সফার করে আমার ভার্সিটিতে এডমিশন করিয়ে দাও তাহলে ভাবির ও সুবিধা হবে আর আমারো একজন সঙ্গী হবে।
  • হুম তুই তো ভুল কিছু বলিস নি। বউমা আলিফ কোথায়?
  • উনি হয়তো রুমে আছে।
  • কুসুম যা তো আলিফকে ডেকে আন। আলিফকেই বলি বউমাকে ওখান থেকে ট্রান্সফার করিয়ে এখানে এডমিশন করিয়ে দিতে।
  • না না বাবা তার কোনো প্রয়োজন নেই মাত্র তো ৪৫ মিনিট সময় লাগবে যেতে আমি ওখানেই যেতে পারবো। ট্রান্সফার করানোর দরকার নেই।
  • ওখানে যেতে ৪৫ মিনিট আর কুসুমর ভার্সিটি আমাদের বাসা থেকে ১০ মিনিট লাগে মাত্র। কুসুম যেমন আমার মেয়ে তুমিও আমার মেয়ে দুজনকে আমি সমান চোখে দেখি। তাছাড়া তুমি রোজ একা এতো দূরে যাবে ব্যাপারটা ভালো দেখায় না। কুসুম তুই যা আলিফকে ডেকে আন।

কুসুম ইপ্তির কানের কাছে মুখ এনে বললো,

  • ভাইয়াও কিন্তু আমার ভার্সিটিতেই মাস্টার্সে পড়ছে। তুমি ভর্তি হলে ভালোই হবে।

কুসুম কথাটি বলে চলে গেলো ইপ্তি মনে মনে ভাবছে,

  • আপু তাহলে ইচ্ছে করেই বাবাকে এখানে এডমিশন করিয়ে দিতে বলেছে। যে ছেলে ঘরেই আমাকে বউ বলে মানে না সে কি আর বাইরে মানবে! হয়তো তখন সবার সামনে বলবে আমাকে সে চেনেই না।

কুসুম রুমে ঢুকে বললো,

  • ভাইয়া বাবা তোকে ডাকছে এখনি নিচে আয়।
    আলিফ বেডে অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। কুসুমর কথা হয়তো ওর কানে যায় নি। কুসুম চলে যেতে নিয়ে আবার ঘুরে এসে আলিফের সামনে দাড়িয়ে বললো,
  • ভাইয়া আমি যে কিছু বলেছি শুনেছিস তুই?

আলিফ কিছুটা কেপে উঠে বললো,

  • তোর কথা পরে শুনবো আগে আমার কথা শোন, তোকে কয়েকমাস আগে একটি…..
  • ভাইয়া তোর কথা আমি পরে শুনবো। বাবা তোকে নিচে যেতে বলছে।
  • কেনো?
  • নিজে গিয়েই শুনে নে না।

কুসুম চলে যেতে নিলে আলিফ বলে উঠলো,

  • বোন আমার কথাটা একটু শুনে যা।
  • ঠিকআছে বল একটুই বলবি কিন্তু।
  • হুম একটুই বলছি। তোকে একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম না যার নাম দিয়েছিলাম মায়াপরী ওকে আমি পেয়ে গিয়েছি।

কুসুম কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,

  • ভাইয়া তোর এখন বউ আছে আর তুই সেই অচেনা অজানা মায়াপরীকে নিয়ে পড়ে আছিস। এমনিতে তো ভাবিকে মেনে নিসনি এখন তোর মুখে অন্য মেয়ের কথা শুনলে ভাবি কতোটা কষ্ট পাবে ভেবে দেখেছিস?

ভাবির মতো এমন একটা বউ পেয়েছিস এটা তো তোর ভাগ্য।

  • কুসুম আমার পুরো কথাটা তো শোন আগে, আমি যার কথা বলছি সেই…
  • শুনবো না তোর কথা গেলাম আমি।

কুসুম চলে গেলো আলিফ কপালে হাত রেখে বললো,

  • ধেত এই মেয়েটাও না আমার পুরো কথা না শুনে উল্টো আমাকে কথা শুনিয়ে চলে গেলো।

আলিফের বাবা মা দুজনে বসে কথা বলছে আলিফ এসে বললো,

  • বাবা তুমি আমাকে ডাকছিলে?
  • হ্যা, তোর কি আজ এবং আগামি দুদিনে কোনো কাজ আছে? অবশ্য তোর বিশেষ কোনো কাজ নেই জানি যদিও থাকে তা ক্যান্সেল করবি।

আলিফের মা বললো,

  • তোমার ছেলের আর কি কাজ থাকবে ওর প্রধান কাজ তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া।

আলিফ কিছু বলতে নিলে ওর বাবা বলে উঠলো,

  • হুম বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা কমা আলিফ। শুনলাম কালও অনেক রাতে বাড়িতে ফিরেছিস ভদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরা বেশি রাত করে বাড়িতে ফেরে না এটা নিশ্চই তোর অজানা নয়।

যাই হোক আসল কথায় আসি, আমি ভাবছি বউমা পড়াশুনাটা চালিয়ে যাক। কিন্তু এখান থেকে ওর যাতায়াতে সমস্যা হবে। ওকে তোদের ভার্সিটিতে এডমিশন করাতে চাইছি। এখান থেকে কাছেই আর কুসুমর সাথে বউমা যাওয়া আসা করতে পারবে। আমি চাইছি বউমাকে ওর ভার্সিটি থেকে ট্রান্সফার করে এখানে এডমিশন করানোর সব কিছু তুই করবি। পারবি তো?

আলিফের চোখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কিছু না ভেবেই বলে দিলো,

  • হ্যা বাবা আমি পারবো।

আলিফের মা হা করে তাকালো ছেলের দিকে উনি হয়তো ভাবে নি আলিফ বিনাবাক্যে হ্যা বলে দেবে।

ইপ্তি পেছনেই দাড়িয়ে ছিলো। আলিফের এভাবে রাজি হওয়াতে অবাক হলো ইপ্তি। ও ভেবেছিলো আলিফ হয়তো বলবে আমি পারবো না ওই মেয়েটার জন্য কিছু করতে। ইপ্তি পরক্ষণেই আবার মনে মনে বললো,

  • ধেত এতো অবাক হওয়ার কি আছে। এই আলিফ আহমেদ যে তার বাবা-মায়ের সামনে জিরো এটা ভুলে যাচ্ছি কেনো!

পর্ব-৪

ইপ্তি রেডি হয়ে বসে আছে অথচ আলিফের কোনো খবর নেই। ইপ্তি কুসুমর রুমে গেলো আলিফকে ফোন দিতে বলার জন্য

  • আপু আসবো?

কুসুম হিজাব বাধতে বাধতে বললো,

  • ভাবি তুমি এসো এসো আমার রুমে আসতে অনুমতি লাগে নাকি। তোমার যখন ইচ্ছে হবে চলে আসবে।
  • আচ্ছা আপু আসবো। আপু তুমি কোথাও যাচ্ছো?
  • হ্যা ভার্সিটিতে যাবো ইমপর্টেন্ট ক্লাস আছে। ভাবি তোমাকে তো ড্রেস পড়ে খুব সুন্দর লাগছে আর হিজাবে তো মাশআল্লাহ আরো বেশি সুন্দর দেখতে লাগছে তোমাকে। কোথাও যাবে নাকি?
  • বাবা বললো না তোমার ভাইয়াকে আমার ভার্সিটি থেকে ট্রান্সফার করিয়ে এখানে এডমিশন করাতে। তাই তোমার ভাইয়া রুমে এসে বললো রেডি হতে ভার্সিটিতে যেতে হবে আজই নাকি ট্রান্সফার করানোর ব্যবস্থা করবে।
  • বাবা ভাইয়াকে দায়িত্ব দিলো আর সে রাজি হয়ে গেলো তাও আবার তোমার ব্যাপারে। এতেই বোঝা যাচ্ছে আমার ভাইয়া একটু হলেও তোমার প্রতি দুর্বল হয়েছে। আর হবে নাই বা কেনো আমার এত্তো সুইট ভাবিকে দেখে হয়তো আমার ভাইয়া সত্যি প্রেমে পড়েছে।
  • আপু তুমি বাড়িয়ে বলছো আমি মটেও এতো সুইট নই। তোমার ভাইয়া আমার প্রেমে পড়বে ইম্পসিবল! আর দুর্বল হওয়া তো দূরের কথা সে তো আমার দিকে ভালো করে তাকায় না। তোমার ভাইয়া যা করছে বাবা মার মন রাখার জন্য করছে।

কুসুম ইপ্তির গালে হাত দিয়ে বললো,

  • আমি জানি ভাবি তোমার খারাপ লাগে। জানো তো ধৈর্যের ফল মিঠা হয়, ধৈর্য রাখো দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাইয়া আসলে একটা মৌহে আটকে আছে সেটা কেটে গেলে ভাইয়া তোমাকে বউয়ের মর্যাদা দেবে এটা আমার বিশ্বাস।
  • কিসের মৌহ আপু?
  • আরে না তেমন কিছু নয়। ভাবি এখন আমাকে বের হতে হবে তোমরাও আর দেরি করো না বেরিয়ে পড়ো।
  • আপু তোমার ভাইয়া কোথায় সেটাই তো জানি না তুমি একটু ফোন দিয়ে দেখো না। আমি তোমাকে ফোন দিতে বলার জন্যই এসেছিলাম।
  • তোমার কাছে ভাইয়ার নাম্বার নেই?
  • আসলে আপু আমার ফোনটা আমি মামিকে দিয়ে এসেছি, আমার কাছে ফোন নেই।

কুসুম হেসে আলিফের নাম্বারে ডায়েল করে বললো,

  • ভাবি তুমি সত্যি অনেক ভালো। নাউ কথা বলো।
  • না না তুমি জিজ্ঞেস করো উনি কোথায় আছে।
  • আমি কেনো তুমি কথা বলো রিসিভ করেছে।

ইপ্তি কানের কাছে ফোন নিতেই ওপাশ থেকে বলে উঠলো,

  • হ্যা বোন বল?
  • আমি ইপ্তি। আপনি কোথায়? আমি তো তখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি।

আলিফ একটু চুপ থেকে বললো,

  • নিচে এসে দাড়াও আসছি আমি।
  • আচ্ছা।

ইপ্তি কুসুমর ফোন দিলে কুসুম বাই বলে বেরিয়ে গেলো। ইপ্তি রুমে গিয়ে ব্যাগ নিয়ে আলিফের মাকে বলে গেটের সামনে এসে দাড়ালো।

২/৩ মিনিটের মধ্যে আলিফ বাইক নিয়ে ইপ্তির সামনে এসে দাড়িয়ে কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেলো।

একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইপ্তির দিকে।

ইপ্তি পার্পেল কালারের ড্রেস আর মাথায় ব্লু হিজাব পড়েছে। সাজ বলতে ঠোঁটে পিংক কালারের লিপস্টিক হালকা করে নেওয়া। তাতেই যেনো অপ্সরীর মতো লাগছিলো ইপ্তিকে।

আলিফ ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ইপ্তি বিরক্তি নিয়ে মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বললো,

  • এই লোকটার প্রবলেম কি? এভাবে কেনো তাকিয়ে আছে? উনার আচরন ও আজ সকাল থেকে কেমন যেনো লাগছে কি হয়েছে কে জানে।

গাড়ির শব্দ শুনে আলিফের হুস এলো। ইপ্তি তখনো মাথা নিচু করে আছে। আলিফ নরম স্বরে বললো,

  • কি হলো দাড়িয়ে আছো কেনো ওঠো বাইকে।
  • আপনিই তো কিছু না বলে হা করে তাকিয়ে আছেন, দাড়িয়ে থাকবো না তো কি করবো।
  • হা করি নি মুখটা বন্ধই ছিলো আমার। এখন ওঠো।
  • আমি কখনো বাইকে উঠি নি উঠলে যদি পড়ে যাই!

আলিফ হেসে বললো,

  • ধরে বসলে পড়বে না। দেরি করো না উঠে পড়ো।

ইপ্তি বাইকে উঠে আলিফের থেকে দূরত্ব রেখেই বসলো।

  • এভাবে বসলে তো পড়ে যাবে আমাকে ধরে বসো।
  • আপনি রাগ করবেন নাতো?

আলিফের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। ইপ্তি যে আলিফের বলা কথা গুলো মাথায় রেখে এ কথা বলেছে সেটা বেশ বুঝতে পারছে। আলিফ হালকা হেসে বললো,

  • না রাগ করবো না। বাবা আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছে সেটা তো ঠিকঠাক করতে হবে। তুমি ভালো ভাবে বসে আমার কাধে হাত রাখো।
  • ওও আমি তাহলে ঠিকি ধরেছিলাম মিস্টার জিরো সাহেব নিজের বাবার কথা রাখতে এসব করছে। হুহ।

ইপ্তি আলিফের কাধে হাত রেখে শক্ত করে ধরে বসে আছে বাইকে। আলিফ বাইক আস্তে চালালেও ইপ্তি একটু পর পর আলিফের কাধ খামচে ধরছে। আলিফ একটা অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করছে। আলিফ আগে কখনো নিজের মা আর বোন ছাড়া কোনো মেয়ের এতো কাছে যায়নি। বাইকে ও এপর্যন্ত কোনো মেয়েকে তোলো নি এমনকি নিজের বোনকেও না। কুসুম বাইকে উঠতে চাইলে বলতো এ বাইকে আগে আমার বউ উঠবে তারপর তুই। কথাগুলো ভেবেই আলিফ নিশব্দে হাসছে। যদিও আলিফ এখনো ইপ্তিকে বউ বলে স্বীকার করেনি কিন্তু তার মায়াপরী যে তার বাইকে উঠেছে এটাই বা কম কিসে।

ইপ্তি যতোটা পারছে আলিফের থেকে দূরে সরতে চাইছে।
তারপরেও একটু পর পর আলিফের পিঠের সাথে ওর শরীর ছুয়ে যাচ্ছে। না চাইতেও নিজের হাত দ্বারা আলিফের কাধ খামচে ধরছে। ইপ্তি ভেবেছিলো আলিফ হয়তো রেগে যাবে কিন্তু না আলিফ চুপচাপ বাইক চালাচ্ছে। ইপ্তির মনে বাইকে উঠার আগে যে ভয়টা ছিলো এখন আর তেমন ভয় লাগছে না। বরং আলিফের এতো কাছে থেকে নিজেকে সেভ মনে হচ্ছে।

কেমন যেনো একটা ভালোলাগা অনুভব করছে আলিফের প্রতি যার একটুও গত দুইদিনে অনুভব করে নি ইপ্তি।

ইপ্তির সাথে থেকে আলিফ ওর ট্রান্সফার করার সব ব্যবস্থা করে ওকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো।

রাত ৯:৩৩ মিনিট আলিফ তখন বাড়ি ফিরেছে। আলিফের মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলের দিকে।

  • মা আমার দিকে এমন অবাক চোখে তাকিয়ে আছো কেনো?
  • অবাক হবো না, তুই আজ এতো তাড়াতাড়ি বাড়িতে এসেছিস! যে ছেলে রাত সাড়ে দশটার আগে বাড়িতে আসতো না সে আজ ১০ টার আগে এসেছে ভাবা যায়!
  • মা তোমার প্রবলেম কি বলোতো? দেরি করে ফিরলেও কথা শোনাও আবার আজ তাড়াতাড়ি ফিরেছি তাও এসব বলছো। ঠিকআছে আমি কাল থেকে আবারো দেরি করে ফিরবো।
  • না বাবা আমি আর কিছু বলবো না তুই আজকের মতো রোজই তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসবি কেমন।

আলিফ আর কিছু বললো না উপরে যেতে নিলে কুসুম এসে সামনে দাড়ালো। আলিফ কপাল কুঁচকে বললো,

  • কি হলো সামনে দাড়ালি কেনো, মায়ের মতো তুইও কি তাড়াতাড়ি ফেরা নিয়ে কথা শোনাবি?
  • মা তো তাড়াতাড়ি ফেরার কারনটা জানে না আমি জানি তাই এ বিষয়ে কিছু বলবো না। এখন বল তোর হাতে এই প্যাকেট টা কিসের কি আছে এতে?

আলিফ ভ্রু কুঁচকে বললো,

  • এই প্যাকেটটা কিসের তোর না জানলেও চলবে। কি কারন জানিস সেটা বল?
  • কারন আর কি আমার একমাত্র ভাইয়ার একমাত্র বউ মানে আমার সুইট ভাবি তার জন্য তুই তাড়াতাড়ি ফিরেছিস। ঠিক বলেছি না?
    আলিফ কুসুমর মাথায় চাটি মেরে বললো,
  • তুইও যেমন তোর ভাবনা গুলোও তেমন। তবে তোর এই ভাবনাটা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

আলিফ উপরে উঠে গেলো কুসুম ওর মায়ের কাছে গিয়ে গলা জড়িয়ে বললো,

  • মা বুঝলে কিছু?
  • হুম কিছুটা বুঝেছি। আমরা ইপ্তিকে বউ করে এনে ভুল করি নি।

ইপ্তি ব্যালকনিতে দাড়িয়ে ছিলো রুমে কারো আসার শব্দ পেয়ে রুমে এসে দেখলো আলিফ এসেছে। ইপ্তি এগিয়ে এসে কিছু বলবে তার আগেই আলিফ বললো,

  • প্লিজ তুমি অন্তত জানতে চেয়ো না এতো তাড়াতাড়ি কেনো ফিরলাম। নাউ এটা তোমার জন্য এনেছি।

আলিফ ইপ্তির দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিলো ইপ্তি ওটার দিকে তাকিয়ে বললো,

  • কি আছে এতে?
  • নিজেই খুলে দেখো।

ইপ্তি প্যাকেটটা নিয়ে কয়েকসেকেন্ড ওটার দিকে চেয়ে থেকে খুললো ভেতরে থাকা বক্সটা দেখে ইপ্তি বড় বড় চোখ করে বললো,

  • এ তো মোবাইল ফোন! কার এটা?
  • বললাম তো তোমার জন্য এনেছি। তারমানে তোমার এটা।
    ইপ্তির চোখ জোড়া আগের চেয়ে আরো বড় হয়ে গেলো। একবার বক্সটার দিকে তাকাচ্ছে আবার আলিফের দিকে।

আলিফ মুচকি হেসে বললো,

  • চোখ দুটো তো বেড়িয়ে আসবে এভাবে দেখার কি আছে।
  • না মানে আপনি আমাকে হঠাৎ ফোন এনে দিলেন কেনো? এটা আপনিই রাখুন আমার লাগবে না।
  • চুপ বেশি কথা বলো কেনো। তোমার ফোন নেই তাই নিয়ে এলাম। সব সময় মায়ের ফোন বা কুসুমর ফোন নিতে তোমার হয়তো ভালো লাগবে না। তাছাড়া তুমি ভার্সিটিতে যাবে আসবে কখন কি হয় বলা যায় না ফোন থাকলে অনেক সুবিধা হবে। এখন থেকে এটাই ব্যবহার করবে ফোনে আমি সিম সেটিং করে দিয়েছি। বাবা মা কুসুম আর আমার নাম্বার ও সেভ করে দিয়েছি। তুমি তোমার ফ্যামিলিতে যারা আছে তাদের নাম্বার সেভ করে নিও। আর একটা কথা বাইরের কাউকে নাম্বার দেবে না ক্লোজ ফ্রেন্ড ছাড়া।

আলিফ ওর কথা শেষ করে ওয়াশরুমে চলে গেলো। এদিকে ইপ্তি যেনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সবটা সপ্নের মতো লাগছে। আলিফের বিহেব টা ওর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। বিয়ের রাতে ইপ্তি যে আলিফকে দেখেছিলো তার সাথে এই আলিফের কোনো মিল খুজে পাচ্ছে না ইপ্তি।

ইপ্তি নিজে নিজে বলতে লাগলো,

  • যে ছেলে আমার যোগ্যতা নিয়ে কথা বলেছে। আমাকে কখনো মানবে না বলেছে। সে এতো ভালো ব্যবহার কি করে করছে আমার সাথে? আমি তো তাকে ফোনের কথাও বলিনি তাহলে হঠাৎ নিউ ফোন এনে দিলো কেনো? আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না। আসবেই বা কি করে বিয়ের প্রথম দুদিন আমার ছায়াও দেখতে পারতো না আর আজ সকাল থেকেই তার উল্টোটা হচ্ছে। আল্লাহ জানে কি চলছে এই আলিফের মাথায়!

রাতে ডিনার করে এসে আলিফ বেডে বসে ল্যাপটপে কিছু করছে।

ইপ্তি চুপচাপ গিয়ে সোফায় বসে পড়লো আলিফ আড় চোখে ইপ্তির দিকে তাকিয়ে বললো,

  • ফোনটা যেভাবে দিয়েছি ওভাবেই রেখে দিয়েছো বক্সটা খুলে তো দেখতে পারতে। নাকি আমার দেওয়া কিছু নেবে না তুমি?

ইপ্তি আলিফের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • কেনো নিবো না অবশ্যই নিবো। এখন তো কোনো দরকার নেই তাই বের করিনি। আর শুনুন আপনি দিয়েছেন এতে আমার কোনো প্রবলেম নেই। আপনি আমাকে বউ বলে না মানলেও আমি আপনাকে আমার বর বলে মানি। আর আমি শুনেছি বর কিছু দিলে তা ফিরিয়ে দিতে নেই।

আলিফ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না এই মেয়েটাকে যে সে মনের অজান্তে অনেক আঘাত দিয়ে ফেলেছে। আলিফের এখন নিজের প্রতি নিজেরই রাগ হচ্ছে। আলিফ ভাবছে কেনো সে নিজের আভিজাত্যের অহংকার করে তার মায়াপরীকে লোভী বলে ভাবলো। সে যে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হয়েও আলিফের পাশে দাড়ানোর যোগ্যতা রাখে।

আলিফ বেডে শুয়ে আছে দেখে ইপ্তি কিছু বললো না। বেড থেকে বালিশ নিয়ে সোফায় কাছে যেতেই আলিফ বলে উঠলো,

  • তুমি বেডেই শুতে পারো আমার কোনো প্রবলেম হবে না।
  • আমি এখানেই ঠিক আছি এমনিতে আপনাকে দুদিন কষ্ট করে সোফায় শুতে হয়েছে। আপনি বেডেই ঘুমান আমি সোফায় ঘুমাবো।
    আলিফ কিছু বললো না শুধু তাকিয়ে থাকলো তার মায়াপরীর দিকে।

পর্ব-৫

ইপ্তি আজ ভার্সিটিতে যাবে ২ দিন আগে আলিফ ওকে ভর্তি করে দিয়েছে। ইপ্তি ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাড়িয়ে হিজাব বাধছিলো তখন আলিফ রুমে এলো।

ইপ্তির মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে মনে মনে বললো,

  • উফ এই মেয়েটা তো দেখছি আমার মাথাটা খারাপ করে দেবে। এতো সুন্দর লাগে কেনো ওকে? সিম্পল ভাবে থাকে তারপরে ও মনে হয় সব সময় নিজেকে গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখে। এমন একটা মেয়েকে আমি দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিলাম! নাহ আমি আর ধনী গরীব বলে কাউকে আলাদা করে দেখবো না, এখন থেকে সবাই আমার চোখে সমান।

আমি আমার মায়াপরীকে অনেক ছোট করেছি ওর যোগ্যতার কথা বলে সত্যি আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।

  • এইযে জিরো সাহেব কোথায় হারালেন আপনি? এতো বার ডাকছি কিছুই শুনছেন না?

আলিফ চমকে উঠে বললো,

  • কিছু বলছো?
  • জ্বি বলছি। কি ভাবছিলেন হুম কতোবার ডাকলাম। আমি তো ভেবেছি আপনি হয়তো অন্য কোনো জগৎ এ হারিয়ে গিয়েছেন।
  • হ্যা হারিয়েছিলাম তো আমার মায়াপরীর জগৎ এ।
  • কিহ! এই মায়াপরীটা আবার কে?
  • সময় হলেই জানতে পারবে। তুমি রেডি তো? কুসুম হয়তো নিচে অপেক্ষা করছে।
  • হ্যা আমি রেডি চলুন।

ইপ্তি আগে বেরিয়ে যেতে নিলে আলিফ নরম স্বরে পেছন থেকে ডাকলো,

  • ইপ্তি?

ইপ্তি চমকে উঠলো এই প্রথম আলিফের মুখে নিজের নাম শুনে। ইপ্তি আলিফের দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। আলিফ মৃদু হেসে বললো,

  • আমার একটা আবদার ছিলো, রাখবে?
  • কি আবদার বলুন?
  • তোমার হিজাবটা খুলে চুলগুলো ছেড়ে দাও। ঠিক আগে যেমন চুল ছেড়ে থাকতে।
  • আগে চুল ছেড়ে থাকতাম আপনি কি করে জানলেন?
  • আমি তো এমনি বলেছি হয়তো বা থাকতে তাই বললাম। প্লিজ আজকের মতো চুল ছেড়ে দাও কাল থেকে রেগুলার হিজাব পড়বে।
    ইপ্তি কথা বাড়ালো না ওর খুব ইচ্ছে করছে আলিফের আবদারটা রাখতে। শুধু তো চুল গুলোই ছেড়ে দিতে বলেছে এটা তো কঠিন কিছু নয়। ইপ্তি বিয়ের আগে মাঝে মাঝে হিজাব পড়তো শখ করে। বিয়ের পরে নতুন মানুষ নতুন জায়গা এখানে তো নিজের মতো চলা যাবে না। তাছাড়া কুসুম এ বাড়ির মেয়ে হয়ে হিজাব ছাড়া বের হয়না। ইপ্তি বাড়ির বউ হয়ে হিজাব ছাড়া বের হবে এটা ভালো দেখায় না। তাই ইপ্তি হিজাব পড়েতে শুরু করেছে।

ইপ্তি হিজাব খুলে বাধা চুল গুলো ছেড়ে দিতেই তার অবাধ্য চুলগুলো পিঠে কোমড়ে ছড়িয়ে পড়লো। আলিফ মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছে সেই চুলের দিকে।

ইপ্তি আলিফের সামনে আসতেই আলিফ মুচকি হেসে বললো,

  • চুল ছেড়ে দিয়ে অনেক সুন্দর লাগছে তোমাকে।

ইপ্তি একটু লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বললো,

  • কেনো হিজাব পড়ে কি খারাপ দেখায় আমাকে?
  • উহু একটুও খারাপ দেখায় না। হিজার পড়া অবস্থায় তোমাকে পবিত্র লাগে দেখতে। তুমি কাল থেকে আবারো হিজাব পরেই বের হবে।

আলিফ ইপ্তি কুসুম একসাথেই ভার্সিটি যাচ্ছে। কুসুম না থাকলে আলিফ ইপ্তিকে নিয়ে বাইকেই যেতো। তিনজন তো যাওয়া যাবে না তাই নিজেদের গাড়িতেই যাচ্ছে। আলিফ ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। ইপ্তি আর কুসুম পেছনে, কুসুম ও আজ হিজাব খুলে চুল ছেড়ে দিয়েছে। কুসুমকেও খুব সুন্দর লাগছে চুল ছেড়ে। ওর চুলগুলো একদম সিল্কি তবে বেশি বড় নয়।

আলিফ একটু পর পর ঘার ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে তার মায়াপরীকে দেখছে। বাতাসে ইপ্তির চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সামনের কাটা চুলগুলো চোখে মুখে আচড়ে পড়ছে। ইপ্তি বিরক্তির সাথে চোখ মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে নিচ্ছে।

আলিফের খুব হাসি পাচ্ছিলো ইপ্তির বিরক্তিমাখা মুখটা দেখে। ওর খুব ইচ্ছে করছিলো নিজের হাতে তার মায়াপরীর এলোমেলো অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে গুজে দিতে।

ভার্সিটির সামনে নেমে কুসুম ইপ্তি আর আলিফ ভেতরে ঢুকলো। একটু সামনে এগোতেই ঈশান দৌড়ে এসে ওদের সামনে দাড়ালো। আলিফ হেসে বললো,

  • কিরে এভাবে দৌড়ো এলি কেনো?
  • আমার তো উড়ে আসতে মন চাইছিলো। তোদের দেখে ডিপার্টমেন্টের ২ তলা থেকে দৌড়ে এলাম।

ঈশান আড় চোখে কুসুমর দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বলে হাপাচ্ছে। আলিফ বললো,

  • আমাদের কি আগে কখনো দেখিসনি যে ২ তলা থেকে তোর উড়ে আসতে মন চাইলো?
  • দেখেছি রে দোস্ত তবে এমন রুপে আগে কখনো দেখি নি। আমার যে হার্টবিট সেকেন্ডে সেকেন্ডে কেঁপে উঠছে।

আলিফ ঈশানের কথা বুঝতে না পেরে বললো,

  • তোর মাথা হয়তো ঠিক নেই কি বলছিস এসব! তোর মুখে তো আগে এ ধরনের কথা শুনিনি কখনো।

কুসুম ঈশানের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বললো,

  • ভাইয়া তুই তোর মাথা খারাপ বন্ধুকে সামলা আমরা গেলাম।
    ঈশান কুসুমর দিকে তাকিয়ে বললো,
  • আমার মাথা ঠিক আছে হৃদয়টা ঠিক নেই, বুঝেছো। এ হৃদয়টা কোনো এক রমনীকে দেখে থমকে গেছে।

ইপ্তি কিছুই বলছে না নিরব দর্শক হয়ে ওদেরকে দেখছে।

ঈশানের চোখ ইপ্তির দিকে পড়তে কুসুমকে বললো,

  • এটা কি তোমার নিউ ফ্রেন্ড?
  • হুম, কেনো ভালো লেগেছে, প্রোপোজ করবেন?

আলিফ ইপ্তি দুজনেই কুসুমর দিকে তাকালো। ঈশান মুচকি হেসে বললো,

  • আমার ভালো লাগাটা অন্য কেউ, অনেক আগে থেকেই তাকে ভালোলাগে, মেবি ভালোও বাসি তাকে। আর আজ তো তাকে দেখে আরো ভালোলেগে গেছে। সো আমি ডানে বামে না তাকিয়ে সামনের দিকেই শুধু তাকাতে চাই।

আলিফ একটু হলেও ভেবে নিয়েছিলো ঈশান হয়তো ইপ্তিকে দেখে এসব বলছে কিন্তু এখন ঈশানের কথা শুনে আলিফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললো,

  • ঈশান তোর পাগলামো গুলো পরে দেখবো এখন থাম। কুসুম তুই তোর ক্লাসে চলে যা আমি ইপ্তিকে ওর ডিপার্টমেন্ট দেখিয়ে দিবো।

ইপ্তি কুসুমর হাত ধরে বললো,

  • না আপুও যাবে আমার সঙ্গে।

আলিফ বুঝতে পারছে ইপ্তির কিছুটা নার্ভাস লাগছে। নতুন ভার্সিটি নতুন পরিবেশ একটু তো নার্ভাস লাগবেই। আলিফ ইপ্তিকে বললো,

  • ইপ্তি, কুসুম তো ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে ওই সামনের বিল্ডিংটার ২ তলায় ওর ক্লাস হয়। আর তোমার ডিপার্টমেন্টটা আরো ভেতরে ওর ওদিকে যেতে হবেনা। আমি তোমাকে দেখিয়ে দিবো।

আলিফ ইপ্তিকে নিয়ে একাউন্টিং ডিপার্টমেন্টের সামনে এলো সাথে ঈশান ও এসেছে। আলিফ বললো,

  • ৩ তলায় একাউন্টিং ডিপার্টমেন্ট যেতে পারবে তো নাকি দিয়ে আসতে হবে?
  • আমি বাচ্চা নাকি যে হাত ধরে ক্লাসে দিয়ে আসবেন, আমি একাই যেতে পারবো।
  • হুমম। আচ্ছা শোনো আমি ক্যাম্পাসেই আছি ক্লাস শেষ হলে ফোন দেবে আমাকে। আর শোনো একদম নার্ভাস হবে না কেমন।
    ইপ্তি মুচকি হেসে বললো,
  • আমাকে নিয়ে এতো ভাবতে হবে না, আসছি।

ইপ্তি চলে যেতেই ঈশান সন্দেহের দৃষ্টিতে বললো,

  • কাহিনি কিরে কে এই মেয়েটি?
  • আমিও তো সেটাই জানতে চাই তোর কাহিনি কি কাকে দেখে তোর হার্টবিট সেকেন্ডে সেকেন্ডে কাঁপছিলো?
  • আলিফ আমার কথা ছাড় আগে বল মেয়েটি কে, তুই এতো কেয়ার করছিলি কেনো ওকে?

আমি তো ভেবেছিলাম কুসুমর বান্ধবী হয়তো পরে তো দেখলাম মেয়েটি ওকে আপু বললো। বলনা কে ও?

  • বলবো? শুনে কোনো রকম রিয়েক্ট করবি নাতো?
  • আরে বল তো আগে।
  • ওর নাম ইপ্তি, ও সেই অচেনা মায়াপরী। ওই যে ক্যাফেতে যে মেয়েকে দেখে আমি তার চোখের মায়ায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। এটাই আমার সেই মায়াপরী।
  • ওওও এই তাহলে তোর সেই মায়াপরী! তোর চয়েজ আছে বলতে হবে। যাক ভালো হয়েছে এতো খুজে অবশেষে ওকে পেয়েছিস তুই। বাট এটা তো খারাপ কিছু নয় তুই রিয়েক্ট করার কথা কেনো বললি?
  • এর পরের কথাটা শুনলে চমকাবি তুই। যাই হোক কোনো রিয়েক্ট করিস না প্লিজ। আসলে তোদের কাউকে বলা হয়নি আমি গত সপ্তাহে বিয়ে করেছি আর এই মায়াপরীটাই আমার বউ।

ঈশান চোখ বড় বড় করে আলিফের দিকে তাকিয়ে আছে আলিফ বললো,

  • এ নিয়ে কথা বাড়াস না দোস্ত সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে। আমি তোকে সবটা বলছি।

আলিফ ঈশানকে সবটা খুলে বললো। ঈশান সব শুনে বললো,

  • বুঝলাম, কিন্তু আলিফ তুই ইপ্তিকে এতোটা ছোট করে না দেখলেও পারতি। মেয়েটির মধ্যে একটা ইনোসেন্ট ভাব আছে তা ওর কথা শুনেই বোঝা যায়। তাছাড়া তুই বললি ওর মা বাবা ও ছোট থাকতেই মারা গিয়েছে তারপর থেকেই মামার কাছে বড় হয়েছে। মা বাবা ছাড়া একটা মেয়ে হয়ে এতো বড় হয়েছে কতোটা কষ্ট করতে হয়েছে ভাবতে পারছিস। আর তুই ওকে ওর যোগ্যতা নিয়ে কথা বলেছিস। কাজটা না করলেও পারতি।
  • আই নো ঈশান, আমার ভুল হয়েছে আমি তো ওর সম্পর্কে কিছু না যেনে ওসব বলেছি। আমি আমার ভুলটা সুধরে নিতে চাই আমি ইপ্তির কাছে ক্ষমা চাইবো।

ইপ্তির ক্লাসে এসে নিঝুম নামের একটি মেয়ের সাথে পরিচিত হয়েছে। পাশাপাশি বসেছিলো দুজন ক্লাসে। নিঝুম খুব মিশুকে টাইপের মেয়ে মাত্র দুইঘন্টায় ইপ্তির সাথে মিশে গিয়েছে।

ইপ্তির ও মেয়েটিকে খারাপ বলে মনে হলো না। ওরা ক্লাস শেষ করে একসাথেই কথা বলতে বলতে নিচে এলো। নিচে এসে দেখলো কুসুম ওদের দিকেই আসছে। কুসুম ইপ্তির সামনে এসে বললো,

  • ভাবি প্রথম দিন ক্লাস করতে কেমন লাগলো?
  • ভালো লেগেছে আপু তবে প্রথম দিন তো একটু বোরিং লাগছিলো।
    নিঝুম কুসুমর দিকে তাকিয়ে বললো,
  • কুসুম আপু ইপ্তিকে তুমি ভাবি বলছো কেনো?
  • আমার ভাইয়ার বউ তাই ভাবি বলেছি।
  • ওমা! আলিফ ভাইয়া বিয়ে করেছে! কই ভাইয়া তো কিছুই বললো না।
  • বিয়ের ব্যাপারটা কাউকে জানানো হয়নি। আচ্ছা নিঝুম আগে বলো আমার ভাবিকে কেমন লেগেছে হুম?
  • খুব ভালো লেগেছে আপু।

ইপ্তি কুসুমকে বললো,

  • আপু তোমরা দুজন দুজনকে চেনো?
  • হ্যা, সকালে ক্যাম্পাসে আসার পর যে ছেলেটি আমাদের সামনে এসে পাগলামো করলো। উনার নাম ঈশান, ভাইয়ার ফ্রেন্ড উনি। আর নিঝুম ঈশান ভাইয়ার বোন।

নিঝুম কুসুমর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,

  • কুসুম আপু ভাইয়া কি পাগলামো করেছে?
  • বাসায় গিয়ে তোমার ভাইয়ার থেকেই শুনে নিও।

ইপ্তির ফোন বেজে উঠলে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখলো আলিফ কল দিয়েছে। ইপ্তি রিসিভ করলো,

  • হ্যালো..
  • ক্লাস শেষ হয়নি এখনো?
  • হয়েছে একটু আগেই।
  • ওহ, আচ্ছা শোনো আমি ক্যাম্পাস থেকে বেড়িয়ে এসেছি তুমি কুসুমর সঙ্গে বাড়িতে চলে যেও। কুসুমকে আমি বলে দিয়েছি।
  • হুমম আপু আমার পাশেই আছে।

ইপ্তি ফোন কাটতেই কুসুম বললো,

  • কি ভাবি আমার কথাগুলো একটু হলেও মিলে যাচ্ছে তো? দেখেছো ভাইয়া কতো কেয়ার করে তোমার।

ইপ্তি কিছু বললো না নিঝুম হেসে বললো,

  • ভালোবাসা থাকলে কেয়ারটা আসবেই। আচ্ছা আপু তুমি তো আমাদের এক ইয়ার উপরে বয়সেও বড় তাহলে ইপ্তিকে ভাবি ডাকছো কেনো?
  • তাতে কি আমার বড় ভাইয়ের বউকে নাম ধরে ডাকালে কেমন দেখায় না। আর এমন একটা মেয়েকে ভাবি ডাকতেই ভালো লাগে।
  • হুমম আমার হবু ভাবিটাও কিন্তু অনেক কিউট আর আজ তাকে অন্য লুকে আরো বেশি কিউট লাগছে। হয়তো তাকে দেখেই আমার ভাইয়া আজ পাগলামো করেছে।
  • নিঝুম তোমার হবু ভাবি মানে! ঈশান ভাইয়া কাউকে ভালোবাসে?
  • আমি যতোটা জানি ভাইয়া তাকে অনেক অনেক অনেক পছন্দ করতো হয়তো ভালোবেসেও ফেলেছে।

পর্ব-৬

আলিফ আজো তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরেছে। আজ এনিয়ে আলিফের মা কিছুই বলেনি গত এক সপ্তাহে আলিফ রাত ৯:৩০ এর আগেই বাড়িতে ফিরেছে। ছেলের এমন পরিবর্তন দেখে আনিলা আহমেদ মনে মনে খুব খুশি হয়েছেন।

ইপ্তি বাড়িতে এতোদিন শাড়ি পড়েছে, শাড়ি পড়ে চলতে অসুবিধা হয় তাই আলিফের মা ওকে ড্রেস পড়তে বলেছে। ইপ্তি খুবই নরমাল ভাবে থাকতে পছন্দ করে তাই সেলোয়ার কামিজ চুড়িদার এসব পড়তেই কমফোর্টেবল ফিল করে।

ইপ্তি আজ নীল রঙের সেলোয়ার কামিজ পড়েছে। রুমের লাইট অফ করে জানালার ধারে দাড়িয়ে দূর আলিফের দিয়ে তাকিয়ে আছে ইপ্তি। আলিফের মা বোনের সাথে সারাদিন থেকে ভালো সময় কাটলেও এই রাতটা যেনো কাটতে চায় না। আলিফের বলা প্রথম কথাগুলো মনে পড়লে ওর বুকে তিরের মতো আঘাত করে। কিন্তু ইপ্তি আলিফকে এখনো বুঝতে পারছে না আলিফ ঠিক কি চাইছে।

রুমে লাইটের আলো না থাকলেও বাইরের আবছা আলোতে ইপ্তির মুখটা খুব মায়াবী লাগছে। ওর পড়নে থাকা নীল ড্রেসটা যেনো ওকে এই অন্ধকারে সৌন্দর্যটা অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আলিফ রুমে ঢুকে অন্ধকার দেখে ইপ্তিকে ডাকলো। কোনো সাড়া না পেয়ে আলিফ আর একটু সামনে এগিয়ে আবছা আলোতে দেখতে পেলো ইপ্তি জানালার ধারে দাড়িয়ে আছে। আলিফ কোনো কথা না বলে ইপ্তির পেছনে গিয়ে দাড়ালো। তারপর নরম স্বরে ইপ্তির নাম ধরে ডাকলো কিন্তু তাতেও ওর কোনো সাড়া পেলো না ইপ্তি সেই একই ভাবে সামনে দৃষ্টি রেখে দাড়িয়ে আছে।
আলিফ ইপ্তির কাধে হাত দিতে গিয়েও নামিয়ে নিলো। একটুপর আবারো আস্তে আস্তে হাত উঠিয়ে আলতো করে ইপ্তির কাধে হাত রেখে বললো,

  • ইপ্তি কি হয়েছে? কিছু বলছো না কেনো?

ইপ্তি কেঁপে উঠলো আলিফের হাতের ছোয়ার, আলিফ দ্রুত হাত সরিয়ে বললো,

  • সরি আসলে আমি ডাকছিলাম তুমি সাড়া দিচ্ছিলে না তাই তোমার কাধে…
  • ইট, স ওকে। আমি কিছু মনে করিনি। আপনি কখন এসেছেন?
    ইপ্তির গলাটা কাঁপছিলো কথা বলার সময়। ও এখনো আলিফের থেকে উল্টো দিকে ঘুরে দাড়িয়ে আছে। আলিফ ইপ্তির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলো। ইপ্তির সামনে গিয়ে বললো
  • ইপ্তি মাথা তোলো তাকাও আমার দিকে।
  • কি হলো তাকাও বলছি।

ইপ্তি আলিফের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো, আলিফ আচমকা ইপ্তির গালে নিজের হাত রেখে বললো

  • কি হয়েছে তোমার চোখে পানি কেনো?

ইপ্তি কিছু বলবে কি ও তো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আলিফের দিকে। আলিফ ওর গালে এভাবে হাত রেখেছে সেটা হয়তো মানতেই পারছে না।
আলিফ রেগে বললো,

  • কি হলো আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি শোনো নি তুমি? কি হয়েছে কাদছো কেনো?

ইপ্তি খানিকটা কেপে উঠে অভিমানি কন্ঠে বললো,

  • কিছু হয়নি। আর আমার চোখের পানিও কাউকে দেখতে হবে না।

ইপ্তি সোফায় গিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো। আলিফ ও আর কিছু বললো না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়াশরুমে চলে গেলো।

ইপ্তি রাতে খাবে না বলেছে তাই আলিফ ওর মাকে বলেছে খাবার রুমে পাঠিয়ে দিতে। আলিফ ইপ্তিকে অনেকবার বলেও খাওয়াতে পারেনি। আলিফ ও না খেয়ে রেখে দিলো। ইপ্তি সোফায় শুয়েছে আলিফ বেডে শুতে বলেছে ইপ্তি সেটাও শোনে নি এমনকি আলিফের সাথে কোনো কথাও বলছে না। আলিফ আর কিছু না বলে রেগে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

রোজকার মতো আজ সকালেও ইপ্তির কোরআন পড়ার শব্দ শুনে আলিফের ঘুম ভেঙে গেলো। এটা যেনো ওর অভ্যেসে পরিনত হয়েছে, রোজ সকালে ইপ্তির কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শোনা।

সবাই মিলে একসাথে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। আলিফের বাবা ইপ্তিকে বললো,

  • বউমা এক সপ্তাহের বেশি হলো তুমি এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছো। তোমার মামা কাল অফিসে বলছিলো তোমাকে আর আলিফকে ওই বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আসতে। আজ তো তোমার ভার্সিটি অফ যাও ঘুরে এসো।

ইপ্তি মাথা নিচু করে রইলো কিছুই বললো না। কি বা বলবে আলিফ হয়তো যেতে চাইবে না ওর সাথে। একা যাওয়াটা তো ভালো দেখায় না। আর যদি একা যায় তাহলে মামি কথা শোনাবে।

আলিফের মা ইপ্তির দিকে তাকিয়ে বললো,

  • ইপ্তি কিছু বলছিস না কেনো? মন খারাপ তোর আলিফ কিছু বলেছে?

আলিফ এতক্ষণ চুপ করে খাচ্ছিলো ওর মায়ের কথা শুনে ইপ্তির দিকে তাকালো।

  • না মা উনি কিছু বলেনি। আসলে আমি যেতে চাইছি না ও বাড়িতে, একা গেলে মামি আমাকে কথা শোনাকে সাথে মামাকেও। আমি চাইনা মামা আমার জন্য আর ছোট হোক।
  • তুই কেনো একথা বলছিস আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু তুই একা কেনো যাবি আলিফ ও যাবে তোর সঙ্গে। কিরে আলিফ ইপ্তিকে নিয়ে ওর মামা বাড়িতে যেতে কোনো প্রবলেম আছে তোর?

আলিফ মৃদু হেসে বললো,

  • নাহ আমার কোনো প্রবলেম নেই। আমি তো ফ্রী আছি আজ।

ইপ্তি আশ্চর্য হয়ে তাকালো আলিফের দিকে। আলিফ ওর সঙ্গে যেতে রাজি হবে এটা কল্পনাও করেনি। আলিফ বলে উঠলো,

  • আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? নাকি আমাকে তোমার সঙ্গে তোমার মামা বাড়িতে নিতে চাইছো না?
  • আলিফ কি বলছিস তুই ইপ্তি তোকে নিতে চাইবে না কেনো?
  • মা আমি এমনি এমনি বলছি না দেখো ইপ্তি কিভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

ইপ্তি আর আলিফ একটু আগেই মামা বাড়িতে এসেছে। ইপ্তির মামা তো খুব খুশি হয়েছেন ওদেরকে দেখে। ইপ্তির মামিও হাসিমুখে কথা বলছে কিন্তু ইপ্তি ঠিকি বুঝতে পারছে আলিফকে দেখেই সে কিছু বলছে না তবে মনে মনে ঠিকি রাগে ফুসছে।

দুপুরের খাবার খেয়ে আলিফ ইপ্তির রুমে গিয়ে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর দরজা ঠেলে কেউ রুমে ঢুকার শব্দ পেয়ে আলিফ সেদিকে তাকালো।

পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে আলিফের সামনে এসে কোমড়ে হাত রেখে চোখ দুটো ছোট ছোট করে বললো,

  • তুমি আমার আপুনিকে কেনো নিয়ে গিয়েছো?

আলিফ উঠে মেয়েটির সামনে হাটু গেড়ে বসে মেয়েটির গালে একহাত রেখে আদুরে গলায় বললো,

  • তোমার নাম কি? আর কে তোমার আপুনি?

মেয়েটি আলিফের হাত গাল থেকে সরিয়ে বললো,

  • আমার মুখে হাত দিবে না, তুমি আপুনিকে নিয়ে গিয়েছো। তুমি খুব পচা লোক। আপুনি আমাকে রোজ চকলেট এনে দিতো কত্তো আদর করতো এখন আমাকে কেউ চকলেট দেয় না আদর ও করে না।

রাইনামনি এখানে, সে কি আমার ওপর অভিমান করেছে? আমি তো তার জন্য অনেকগুলো চকলেট এনেছি আর ভাবছি এত্তো গুলা আদর দিবো তাকে।

দরজায় দাড়িয়ে ইপ্তি হাসি মুখে কথাগুলো বলে এগিয়ে এলো। মেয়েটির মুখে হাসি ফুটে উঠলো ইপ্তির সামনে গিয়ে ইশারায় বললো নিচু হতে। ইপ্তি নিচু হতেই মেয়েটি ওর গলা জড়িয়ে দুইগালে চুমু দিয়ে বললো,

  • আপুনি আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি। তুমি কেনো চলে গিয়েছিলে? তোমাকে এই পচা লোকটা নিয়ে গিয়েছিলো, তাইনা?
  • আমি জানি তো আমার বোনটা আমাকে অনেক মিস করেছে তাই তো দেখা করতে চলে এসেছি। আর উনাকে পচা লোক বলছো কেনো উনি খুব ভালো। উনি তোমার ভাইয়া হন। ভাইয়াকে সালাম দিয়েছো?
  • না দেইনি, রিয়ান ভাইয়া বলেছে উনি নাকি তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলো তাই আমি রাগ করেছি এই ভাইয়াটার ওপরে।
  • ওও তাই, কিন্তু আমি তো চলে এসেছে। তোমাকে না বলেছি সবাইকে সালাম দিতে হয় যাও ভাইয়াকে সালাম দাও।
    রাইনা আলিফের দিকে ঘুরে বললো,
  • আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।

আলিফ ওদের কথা শুনে বুঝতে পারছে এটা ইপ্তির বোন হয়। ইপ্তি যে ওকে খুব ভালোবাসে তা ওদের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে। আলিফ মুচকি হেসে বললো,

  • ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি এখন বুঝতে পারছি তুমি কেনো রেগে আছো আমার ওপর। এটাই তোমার আপুনি তাইতো। কিন্তু তোমার আপুনি তো চলে এসেছে এখনো রেগে আছো আমার ওপরে?
  • না আমি আর রেগে নেই আপুনি তো বললো তুমি খুব ভালো, জানোতো আপুনি বলেছে যারা ভালো তাদের ওপর রাগ করতে নেই।
  • ওও আচ্ছা তাই! তোমার নামটা কি বললে নাতো?
  • আমার নাম রাইনা।

আলিফ রাইনাকে তুলে বেডে বসিয়ে বললো,

  • আমার ছোট্ট শালিকা তো অনেক কিউট। নামটাও খুব সুন্দর। চকলেট পছন্দ করো খুব?
  • হুমম খুবববব।
  • আচ্ছা এখন থেকে তোমার আপুনি নয় আমি তোমাকে চকলেট এনে দিবো কেমন।

ইপ্তি অনেকগুলো চকলেট এনে রাইনাকে দিয়ে বললো,

  • আমার বোন আমি কেনো চকলেট দিবো না। আপনাকে তো কেউ দিতে বলেনি।
  • আমার শালিকা আমি দিবো, কারো কথা শুনে দিতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।
  • আমাকে বউ বলে মানেন আপনি যে ওকে শালিকা বলছেন?

ইপ্তি নিরব দৃষ্টিতে আলিফের দিকে তাকিয়ে আছে, আলিফ কি বলবে বুঝতে পারছে না। ইপ্তিও আলিফকে আর কিছু বললো না। আলিফের উত্তরের অপেক্ষা না করে ইপ্তি রাইনার দিকে তাকিয়ে বললো,

  • রাইনা, রিয়ান কোথায় ও বাড়িতে নেই?
  • আছে তো ভাইয়া গেম খেলছে। জানো আপুনি তুমি চলে যাওয়ার পরে ভাইয়া আমাকে আর গেম খেলতে দেয় না।
  • আচ্ছা আমি ওকে বকে দিবো চলো আমরা কার্টুন দেখবো এখন।

ইপ্তি রাইনাকে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। আলিফ ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

  • আমার মায়াপরীটার অনেক অভিমান হয়েছে। আর দেরি করা যাবে না ওর মনের সব সংসয় দূর করে অভিমান ভাঙাতেই হবে।

আলিফ ইপ্তি আজ মামা বাড়িতেই থাকবে। যদিও আলিফ বলেছিলো আজই চলে যাবে কিন্তু মামা বারবার থেকে যেতে বলেছে তাই থাকতে হচ্ছে। তাছাড়া ইপ্তি এ বাড়িতে এসে মামাতো ভাই রিয়ান আর বোন রাইনাকে পেয়ে যেনো প্রান ফিরে পেয়েছে। মন খুলে হাসছে ইপ্তি যে হাসির একটু ঝিলিক আলিফের মনকে আরো দমিয়ে দিচ্ছে। আলিফের মন যে এই হাসিতেই বাধা পড়ে গেছে। তাই আলিফ চাইছে না ইপ্তির এমন মনকাড়া হাসিটা কেড়ে নিতে।

রাইনা আলিফের সাথে একদম মিশে গিয়েছে আলিফ ও হাসি দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছে রাইনার সাথে।

ইপ্তি আলিফকে আগে এভাবে হাসতে দেখেনি ওকে এভাবে হাসতে দেখে মনে মনে বলতে লাগলো,

  • উনি হাসতেও পরে! কই এ কদিনে তো এভাবে কখনো হাসতে দেখিনি উনাকে। কতো সুন্দর উনার হাসি মন চাইছে এখনি বলি, আলিফ আপনি সব সময় এভাবে হাসবেন হাসলে আপনাকে দেখতে খুব ভালোলাগে। ধেত কি ভাবছি আমি, আমার তো উনার ওপর বিন্দু মাত্র অধিকার দেখানোর ক্ষমতা নেই উনি সে পথ তো নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারছি না উনি কেনো এতো কেয়ার করে আমার আর আজ নিজে থেকেই আমার সাথে আসতে রাজি হয়ে গেলো কেনো? হয়তো সবটাই তার বাবা মায়ের মন রাখারা জন্য করছেন।

রাত ১১ টার দিকে আলিফ রুমে এসে বেডে হেলান দিয়ে বসে উপরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। একটুপর ইপ্তি রুমে এলো আলিফের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • আপনার নিশ্চই এসি ছাড়া প্রবলেম হচ্ছে তাইনা? আবার এইরুমে ওয়াশরুম ও নেই প্রবলেম হওয়ারি কথা। আপনি মামার কথা রাখতে না থাকলেও পারতেন। আমিও তো ফিরে যেতে চেয়েছিলাম।
  • ইপ্তি তুমি কি জানো তুমি বড্ড বেশি কথা বলে ফেলছো? আমি কি একবারও বলেছি আমার এখানে কোনো কিছুতে প্রবলেম হচ্ছে?
  • বলতে হবে কেনো আমি তো বুঝতে পারি। এতো বড় ঘরের ছেলে এমন একটা বাড়িতে মানিয়ে নেওয়াটা খুবই কষ্টকর। যেমন দেখুন আমি এই পরিবেশে বড় হয়েছি তাই আমার আপনাদের বাড়িতে মানিয়ে নিতে প্রবলেম হচ্ছিলো এসির হাওয়াটাও আমার সহ্য হয় না। এই ফ্যানের বাতাসটাই ভালো লাগে আমার।

আলিফ আর কিছু বললো না শুধু তাকিয়ে রইলো। ইপ্তি বেড থেকে বালিশ নিতে গেলে আলিফ বললো,

  • বালিশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? রুমে তো সোফা নেই বেডেই শুয়ে পড়ো।
  • সোফা নেই তো কি হয়েছে মেঝে তো আছে মেঝেতেই শুয়ে পড়বো।
  • ইপ্তি কথা বাড়িয়ো না চুপচাপ বেডে শুয়ে পড়ো আমার কোনো প্রবলেম হবে না। আর যদি আমার কথা না শোনো আমি রুম থেকে বেড়িয়ে যাবো তখন তোমার মামিকে কি বলবে তুমি?
  • না না বের হতে হবে না আমি বেডেই শুয়ে পড়ছি।

আলিফ বাকা হেসে শুয়ে পড়লো। ইপ্তি মাঝে একটা কোলবালিশ রেখে মনে মনে আলিফকে বকতে বকতে বেডের এককোনায় শুয়ে পরলো।

  • এতো কর্ণারে শুয়েছো কেনো পড়ে যাবে তো।
  • পড়লে পড়বো তাতে আপনার কি আপনি ঘুমান।
  • আমার অনেক কিছু।

ইপ্তি ঘুরে তাকিয়ে বললো,

  • অনেক কিছু মানে?
  • কিছুনা, তুমি এদিকে চেপে শোও মাঝে তো বর্ডার দিয়েই দিয়েছো। আমি ওদিকে যাবো না ভয় নেই। আর শোনো মনে মনে না বকে জোরে বকবে এর পর থেকে আমি কিছু মনে করবো না।

ইপ্তি অবাক হয়ে ভাবছে, আমি মনে মনে উনাকে বকছি কি করে বুঝলো! জিরো সাহেবটা মন পড়তেও জানে নাকি?

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আলিফ বলে উঠলো,

  • ঘুমিয়ে পড়েছো?
  • না কেনো?
  • কিছু কথা বলার ছিলো।
  • হুম বলুন?
  • ইপ্তি আমাকে ক্ষমা করা যায়না? আমি জানি আমি ভুল করেছি তোমাকে ছোট করে আমার সেদিন তোমাকে ওসব বলা উচিত হয়নি। আমি তোমাকে বউ বলে মেনে নিয়েছি তুমি সব কথা ভুলে যাও প্লিজ।

ইপ্তির চোখে পানি জমে গিয়েছে আলিফ ওকে বউ বলে মেনে নিয়েছে শুনে বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। মনে মনে খুশি হলেও অভিমানে সেই খুশিটা চাপা পড়ে গেলো। নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,

  • মিস্টার আলিফ আহমেদ আপনি কেনো ক্ষমা চেয়ে নিজেকে ছোট করছেন আমার মতো একটা মেয়ের কাছে। আপনি হয়তো জানেন না চাইলেই সব কিছু ভুলে যাওয়া যায় না। আজ আমার জায়গায় যদি আপনি থাকতেন কি করতেন আপনি?
  • কি হলো চুপ করে আছেন কেনো, কি বলবেন খুজে পাচ্ছেন না? থাক আর কিছু বলতে হবে না ঘুমিয়ে পড়ুন।

পর্ব-৭

পরের দিন সকালেই আলিফ ইপ্তিকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। ইপ্তি সব সময় আলিফের থেকে দূরে দূরে থাকে প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও বলে না। ইপ্তি চায় আলিফের আসে পাশে থাকতে মন খুলে কথা বলতে কিন্তু পারে না কোথাও একটা বাধা পড়ে যায়।

ইপ্তি আর আলিফের মা ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছিলো এমন সময় আলিফ এলো বাড়িতে ওর সাথে অল্প বয়সী দুইটা ছেলে এসেছে। ছেলেদের একজনের হাতে বড় বক্স এর মতো কিছু একটা অন্যজনের হাতে একটা ব্যাগ। আলিফের মা উঠে দাড়িয়ে বললো,

  • আলিফ ওরা কারা আর হাতে এগুলো কি?
  • মা আমার রুমে একটু কাজ করাতে হবে তাই ওদের এনেছি। এই তোমরা এসো আমার সঙ্গে।

আলিফের মা ইপ্তিকে জিজ্ঞেস করলো,

  • ইপ্তি তোদের রুমের কিছু নষ্ট হয়েছে কি?
  • কই না তো সবই তো ঠিকআছে।
  • সব ঠিক থাকলে কি কাজ করাবে! ছেলেটার মাথায় কখন যে কি চাপে কে জানে। যা রুমে গিয়ে দেখ কি কাজ করাচ্ছে রুমে।
  • হুম মা যাচ্ছি।

ইপ্তি রুমে এসে অবাক হয়ে বললো,

  • এসব কি করাচ্ছেন! এসি থাকতে ফ্যান কেনো?
  • আজ থেকে এ রুমে এসি চলবে না ফ্যান চলবে।
  • কিন্তু কেনো?

আলিফ ইপ্তির পাশে এসে আস্তে করে বললো,

  • আমার বউয়ের নাকি এসির হাওয়া ভালোলাগে না তার ফ্যানের হাওয়াটাই পছন্দ। তাই তার জন্য সামান্য এই আয়োজন।

ইপ্তি আলিফের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বললো,

  • আপনার কি হয়েছে বলুন তো প্রথমে তো বউ বলে মেনেই নেননি আর এখন বউয়ের জন্য এতো দরদ আসছে কোথা থেকে?
  • এই কি করছো কি বাইরের লোকের সামনে আস্তে বলো। কি যেনো বললে দরদ কোথা থেকে আসে জানতে চাও?
  • হুমম বলুন?

আলিফ বুকের বা পাশে হাত রেখে ইপ্তির কানের কাছে মুখ এনে বললো,

  • এই যে এখান থেকে আসে দরদ, শুধু দরদ নয় ভালোবাসাটাও আছে এখানে। একটা সুযোগ দাও দেখবে তোমার কোনো অভিযোগ থাকবে না আমার ওপর। প্লিজ ইপ্তি আর অভিমান করে থেকো না, আমার ভুলটা সুধরে নিতে চাই সে সুযোগটা দাও আমাকে।

আলিফের প্রিতিটি নিশ্বাস পড়ছিলো ইপ্তি ঘারে মুখে ওর বলা কথাগুলো যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না ইপ্তি। কেবলই মনে হচ্ছে হয়তো সবটা সপ্ন। কিন্তু না এ তো সপ্ন নয় বাস্তব, আলিফ এখনো পাশেই দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার মায়াপরীর দিকে।

ইপ্তি সেখানে আর এক মুহুর্ত দাড়ালো না বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে।

ইপ্তি কুসুমর রুমে গিয়ে দরজা আটকে দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে রইলো। ওর চোখ থেকে অঝরে পানি পড়ছে। ও চায় না এ কান্না কাউকে দেখাতে, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটা নিজের কষ্টগুলো নিজের মধ্যে চাপা রাখতে রাখতে নিজেকে কঠিন বানিয়ে ফেলেছে। কষ্ট পেলে ও একাই পাবে কেনো শুধু শুধু অন্যেকে নিজের কষ্টের শামিল করবে। কুসুম ভার্সিটি গেছে তাই ইপ্তি ওর রুমেই এসেছে একা থেকে নিজেকে হালকা করতে।

ইপ্তি আজ নিজেই বুঝতে পারছে না এ কান্না সুখের নাকি দুঃখের। ওদের বিয়ে হয়েছে বেশ কিছুদিন হয়েছে ইপ্তির কাছে আলিফ ছিলো একদমই অচেনা। তবে এখন অনেকটাই চিনেছে আলিফকে। ইপ্তির মনেও আস্তে আস্তে ভালোলাগা সৃষ্টি হয়েছে আলিফের প্রতি। এমনকি ভালোবেসে ফেলেছে ও আলিফকে। হ্যা ইপ্তি আলিফকে ভালোবাসে। ইপ্তি যদিও জানে না এর পরিণতি কি হবে তারপরেও ভালোবেসেছে। ভালোবাসা তো দোষের কিছু নয়। মনের অজান্তেই ভালোবেসেছে সে আলিফকে।

আলিফ রোজ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে ইপ্তি উঠে আলিফের পাশে বসে একধ্যানে চেয়ে থাকে ওর মুখের দিকে কখনো কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ইপ্তি আলিফের কাছে গেলেই অদ্ভুত টান অনুভব করে কেমন যেনো মায়া কাজ করে মনে। হয়তো ওরা স্বামী স্ত্রী তাই সেই পবিত্র বন্ধনের মায়ায় পড়ে ইপ্তি ভালোবাসে আলিফকে।

ইপ্তি রোজ রাতে আলিফকে দেখে আর নিজে নিজে বিড়বিড় করে কথা বলে। তারপর যখন ঘুমাতে যায় তখন আলিফের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে “প্রিয় ভালোবাসি তোমাকে।”

আলিফ ইপ্তির বিয়ে হয়েছে ৫ মাস হলো এখনো ওদের সম্পর্ক সেই আগের মতোই আছে। তবে ইপ্তি বুঝে গেছে আলিফ তাকে ভালোবাসে এ কয়মাসে আলিফ তার প্রিতিটি ব্যবহারে তা বুঝিয়ে দিয়েছে। ইপ্তির মনে কি আছে এটা আলিফ এখনো বুঝতে পারেনি ইপ্তি তা বুঝতেও দেয় নি। নিজেকে সব সময় দূরে রাখার চেষ্টা করে আলিফের থেকে।

আলিফের মা বাবা কয়েকদিনের জন্য দেশের বাহিরে গিয়েছে। এদিকে কুসুম কিছুটা অসুস্থ তাই ইপ্তি ভার্সিটিতে যায় না কুসুমর পাশেই থাকে। দুপুরের দিকে কুসুম শুয়ে আছে আর ইপ্তি ওর পাশেই বসে আছে। কুসুম বলে উঠলো,

  • ভাবি তোমার আর ভাইয়ার সম্পর্কে কি কোনো পরিবর্তন আনা যায় না? এভাবে আর কতো দিন? ভাইয়া সত্যি তোমাকে খুব ভালোবাসে তুমি কি বুঝতে পারো না?
  • হুম আপু আমি বুঝতে পারি তোমার ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে, আমিও চাই সম্পর্কটা স্বাভাবিক করতে অন্য সব মেয়েদের মতো আমিও সংসার গুছিয়ে নিতে চাই। আপু তোমাকে তো সবকিছু বলেছি তোমার ভাইয়া বিয়ের প্রথম দুদিন কি কি বলেছে আমাকে। তারপর থেকে হঠাৎ উনি চেঞ্জ হয়ে গেলো আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলো। আমার মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানো, মনে হয় তোমার ভাইয়া আমাকে করুনা করছে আমি এতিম বলে।
  • ভাবি এসব কি বলছো, মানছি ভাইয়ার প্রথমে ভুল ছিলো কিন্তু ভাইয়া এখন সত্যি তোমাকে ভালোবাসে।
  • আমার ভয় হয় আপু যদি আবারো তোমার ভাইয়ার মনে হয় আমি তার অযোগ্য। তখন কি হবে? এখন যদিও বেঁচে আছি কিন্তু যদি এমন কিছু হয় তখন আমি মরেই যাবো।

কুসুম সোয়া থেকে উঠে ইপ্তির চোখের কোনের পানি মুছে দিয়ে মুচকি হেসে বললো,

  • ভয়কে জয় করতে শেখো। ভয় পেয়ে যদি নিজেকে পিছিয়ে রাখো তখন তো সব হারাবে। ভাইয়া তোমাকে ওসব বলে সত্যি ভুল করেছে আচ্ছা একটা কথা ভাবো ভুল তো মামুষেরই হয় তাইনা। সে ভুলটা ধরে বসে থাকলে তো নিজের ক্ষতি হবে কিছুর সমাধান হবে না।
    আর একটা কথা ভাইয়া তোমাকে ভুল করেও আর কখনো তার অযোগ্য বলবে না। তার কারন হলো তুমি তার প্রথম ভালোলাগা এবং ভালোবাসা। ভাইয়া যে তার মায়াপরীর মায়াতে বিয়ের আগে থেকেই বাধা পড়ে গেছে আর সে মায়াতেই আটকে থাকতে চায় সারাজীবন।
  • মায়াপরী! ওয়েট ওয়েট, আপু তুমি বলছো তোমার ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে। তাহলে এই মায়াপরীটা কে? এই মায়াপরী নামটা তোমার ভাইয়ার মুখে কয়েকবার শুনেছি। এটা কে আমি জানতে চাইলে বলতো সময় হলেই বুঝতে পারবে। আবার এটাও বলেছে যেদিন সব অভিমান ভুলে উনার বউ হয়ে পাশে দাড়াবো সেদিন এই মায়াপরীর ব্যাপারে সব বলবে।
  • ধেত আমি আরো ভাবলাম এই সিক্রেট কথাটা আমি তোমাকে বলবো কিন্তু তা আর হলো না। তুমি বরং ভাইয়ার থেকেই যেনে নিও। মায়াপরীটা কে তার উত্তর আমার থেকে ভাইয়া ভালো ভাবে দিতে পারবে।
  • আপু তুমিই বলোনা প্লিজ?
  • না গো ভাবি আমি এ বিষয়ে আর একটা কথাও বলবো না। আচ্ছা একটা কথা বলতে পারি তা হলো এই মায়াপরী কে সেটা জেনে তুমি খুশি হবে। আমি জানি তুমিও ভাইয়াকে ভালোবাসো তাই আর অভিমান নয় সব ভুলবুঝাবুঝি মিটিয়ে দুজন দুজনের পাশে থাকো।

ইপ্তি কুসুমর বলা কথাগুলো ভেবে মনে মনে বলতো লাগলো,

  • আপু তো সব ঠিক বলেছে, ভুল তো মানুষেরই হয় সে ভুল ধরে বসে থাকলে কোনো কিছুর সমাধান হবে না। আর এটাও তো সত্যি ভয় পেয়ে পিছিয়ে থাকলে সব হারাতে হয়। নাহ আমি এ পরিবারকে হারাতে চাইনা আলিফও হারাতে চাইনা সারাজীবনের জন্য পাশে চাই উনাকে আমি। আমি যে খুব ভালোবাসি আলিফকে।

কিন্তু একটা কনফিউশন তো থেকেই গেলো কে এই মায়াপরী তার কথা জেনে আমি কেনো খুশি হবো!

সন্ধার পর পরই আলিফ বাড়িতে ফিরেছে। ইপ্তি কুসুম একা আছে তাই তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। আলিফ কলিংবেল বাজিয়ে চলেছে কেউ দরজা খুলছে না। মুহুর্তের ওর চোখে মুখে আতংক ছড়িয়ে পড়লো। কুসুম তো অসুস্থ ছিলো আর ইপ্তি ওর পাশে একাই ছিলো বাড়িতে। ওদের কোনো প্রবলেম হয়নি তো? আলিফের গলা শুকিয়ে আসছে পকেট থেকে ফোন বের করে ইপ্তির নাম্বারে কল দিলো ওপাশ থেকে রিসিভ হলোনা। টেনশনে আলিফের হাত কাঁপছে, কুসুমর নাম্বারে কল দিতে গেলেই দরজা খুলে গেলো।
সামনে ইপ্তিকে দেখে আলিফ নিজেকে আর সামলাতে পারলো না একপা সামনে ফেলেই আচমকা জড়িয়ে ধরলো ইপ্তিকে।

ইপ্তির চোখ দুটো যেনো কোটর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। ফ্রিজড হয়ে একভাবে দাড়িয়ে আছে ওর সারা শরীরে শীতল হাওয়া বয়ে চলেছে। আলিফ এই নিয়ে দুবার ওর শরীরে হাত দিলো। সেবার তো শুধু গালে হাত রেখেছিলো আর আজ তো জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে।

আলিফ ইপ্তিকে জড়িয়ে ধরে শান্তি অনুভব করছে। ওর প্রাণপাখীকে মনের খাঁচায় ফিরে পেয়েছে। আলিফ ইপ্তিকে জড়িয়ে ধরেই বলতে লাগলো,

  • ইপ্তি কোথায় ছিলে তুমি দরজা খুলছিলে না কেনো? আমি কতোটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানো তুমি? ফোন দিয়েছি সেটাও ধরছিলে না। আমি সন্ধার পর এসেছি বলে তুমি দরজা খুলছিলে না তাইনা? ঠিকআছে আমি কাল থেকে যেখানেই থাকি না কেনো সন্ধার আগেই বাড়িতে চলে আসবো। আই প্রমিজ। কি হলো তুমি কিছু বলছো না কেনো?

ইপ্তির কোনো সাড়া না পেয়ে আলিফ ওকে ছেড়ে মুখের দিকে তাকালো। ইপ্তি সোজা হয়ে দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে আলিফের দিকে।

  • এভাবে কেনো তাকিয়ে আছো? জড়িয়ে ধরেছি বলে রাগ করেছো? দেখো রাগ করলেও কিছু করার নেই, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমরা একা ছিলে কোনো প্রবলেম হয়েছে কিনা। তাই তোমাকে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি কিন্ত সরি বলবো না নিজের বউকেই তো জড়িয়ে ধরেছি এতে দোষের কিছু নেই।

ইপ্তি আলিফের বলা কথাগুলো শুনে অবাক না হয়ে পারছে মা সামান্য দরজা খুলতে দেরি হয়েছে বলে এতো টেনশন! ইপ্তির হাসি পাচ্ছে। এই মুহুর্তে আলিফকে পাগল বলে মনে হচ্ছে ওর কাছে। আলিফ যে এমন বিহেব ও করতে পারে এটা ইপ্তির ধারনার বাইরে ছিলো।

ইপ্তি আলিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • অনেক গুলো প্রশ্ন তো করে ফেলেছেন। সব আমি গুলিয়ে ফেলেছি আপনি প্রশ্ন গুলো আবার রিপিট করুন আমি উত্তর দিচ্ছি।

আলিফ মাথা চুলকে বললো,

  • মজা নিচ্ছো তুমি?
  • আজব তো, মজা নিবো কেনো আপনার টেনশন দূর করতে হবে তো নাকি।
  • তুমি এখন আমার সামনে আছো আর কোনো টেনশন নেই। কুসুম কোথায়, ওর জ্বর কমেছে?
  • আপু রুমেই আছে, দুপুর থেকেই জ্বর নেই শরীরে। আপনি যান রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন।

আলিফ মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে নিয়ে থেমে গেলো। চোখ বড় বড় করে ঘুরে বললো,

  • ইপ্তি?

ইপ্তি দরজা লাগিয়ে আলিফের সামনে এসে বললো,

  • হুম বলুন।
  • তুমি সেই লাল শাড়িটা পড়েছো, সেজেছো! কই গত পাঁচ মাসে তো এভাবে সাজোনি কখনো! আবার আমার সাথে স্বাভাবিক ভাবেও কথা বললে, জড়িয়ে ধরলাম তাও কিছু বললে না?
  • হুহ ঢং, এতক্ষণ আমার সামনে থেকে এখন আমার সাজ শাড়ি পড়া উনার চোখে পড়লো। কথাটা মনে মনে বলে। আলিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
  • আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই সেজেছি। আর আপনার সাথে তো তেমন বেশি কথাও বলিনি আমি। আর রইলো জড়িয়ে ধরা ওটা তো আপনি টেনশনে ছিলেন তাই ধরেছেন।
  • বুঝলাম কিন্তু এই শাড়িটা, এটা পড়ার পেছনে তো একটা অপশন ছিলো। তাহলে কি ধরে নিবো তোমার অভিমান ভেঙেছে?

ইপ্তি মুচকি হেসে বললো,

  • সব কিছু তো বলে দিতে হয়না।

কথাটা বলে ইপ্তি চলে গেলো ওখান থেকে।

আলিফ একদিন ইপ্তিকে এই লাল শাড়িটা দিয়ে বলেছিলো। যেদিন তোমার মনে হবে আমাকে একটা সুযোগ দেওয়া দরকার, আমার বলা কথাগুলো ভুলতে পেরে আমাকে তুমি আপন করে নিতে পারবে সেদিন এই শাড়িটা পড়বে তুমি।

আলিফ ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,

  • ইয়েস, আমার মায়াপরীর মান ভেঙেছে। আজ আমি অনেক অনেক হ্যাপি।

পর্ব-৮ (শেষ পর্ব)

আলিফ রুমে এসে ইপ্তিকে পেলো না। ফ্রেশ হয়ে কুসুমর রুমে গিয়ে দেখলো ওখানেও নেই। কুসুম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আলিফ গিয়ে ওর কপালে হাত দিতেই চোখ মেলে তাকালো উঠে বসে মৃদু হেসে বললো,

  • ভাইয়া কখন এসেছিস?
  • কিছুক্ষণ হলো এসেছি। তোরা একা ছিলি বাড়িতে তাই চলে এলাম। তোর শরীরে তো জ্বর নেই। কেমন বোধ করছিস এখন?
  • আমি তো এখন ভালোই আছি কিন্তু তোর বউটাই তো আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না।
  • কেনো আমার বউটা কি করেছে?
  • কি করেনি সেটা বল, আমার জ্বর হওয়ার পর থেকে পাশেই তো থাকে সব সময় আর একটু পরপর বলে আপু শরীর ঠিক লাগছে তো এখন, খারাপ লাগলে আমাকে বলবে কিন্তু। কিছু খাবে বলো আমি এখনি করে আনছি। আমি খেতে না চাইলেও একটু পর পর এটা সেটা এনে খাওয়াচ্ছে। ভাইয়া আমার কি মনে হচ্ছে জানিস ভাবির এমন আদুরে অত্যাচার আমার এই জ্বর সহ্য করতে পারেনি। তাই খুব তাড়াতাড়ি পালিয়েছে।

আলিফ জোরে হেসে উঠে বললো,

  • দেখতে হবে না বউটা কার।
  • খুব তো বউ বউ করিস, পেরেছিস কি বউয়ের মান ভাঙাতে?
  • পেরেছি মানে আমি তো ভেবেছিলাম আরো বেশি খাটতে হবে বাট বউয়ের তো তার আগেই মান ভেঙেছে। আজ বাড়িতে আসার পর দারুন সারপ্রাইজ পেয়েছি আমি।

আলিফ সবটা বললো কুসুমকে। কুসুম অবাক ভঙ্গিতে বললো,

  • কি বলছিস ভাইয়া! তারমানে ভাবি আর অভিমান করে নেই তোর ওপর। আমি তো ভাবিও নি আমার কথাগুলো এতো তাড়াতাড়ি কাজে দেবে।
  • তোর কথা কাজে দেবে মানে?

কুসুম আলিফের কাছে সব বললো ইপ্তি আর ওর মাঝে কি কি কথা হয়েছে।

আলিফ সব শুনে কুসুমর গাল টেনে বললো,

  • আমার বোন তো দেখছি আমার থেকেও ওপরে। এই জন্যই তো তোকে এতো ভরসা করি আমি আর সব শেয়ার করি। লাভ ইউ বোনটি।
  • হয়েছে বোনকে আর পাম না দিয়ে যা নিজের বউকে পাম দে। আর শোন তোর মায়াপরীর স্টোরিটা বলে দিস ভাবি হয়তো মনে মনে মায়াপরীকে নিয়ে কনফিউশনে আছে।
  • হুম বলবো বলার সময় এসে গেছে। কিন্তু ইপ্তি কোথায় এখন?
  • ভাবি নিচে গিয়েছে ডিনার রেডি করতে। আমি যেতে চাইলাম। বললো চুপচাপ শুয়ে থাকতে। আর যদি ওর কথা না শুনি তাহলে নাকি মাকে ফোন করে বলে দেবে আমি অসুস্থ।
  • ভালোই বলেছে অসুস্থ শরীর নিয়ে উঠতে হবেনা। আচ্ছা তুই থাক আমি যাই দেখি আমার মায়াপরীটা কি করছে।
  • হ্যা যা বউ তো আজ থেকে আবার নতুন, তাইনা। তারপর আবার বাড়ি ফাকা সময়টা ভালোই কাটবে। তাইনা ভাইয়া?
  • ওই আমি তোর বড় ভাই হই ওকে, আর তুই আমাকে এসব বলছিস।
  • তুই আমার ভাইয়া+বন্ধু সো বলতেই পারি। আমাদের মতো ভাই বোনের সম্পর্ক খুবই কম হয় হু।
  • হুমম কথাটা ঠিক বলেছিস। আমার সেই ছোট্ট বোনটা আজ কতো বড় হয়ে গিয়েছে। এখন আমাকে আমার এই বোন+বন্ধুর জন্য কিছু করতে হবে। আর তা খুব তাড়াতাড়ি করবো আমার বোনের কোনো আশা অপূর্ণ রাখবো না। তুই যেনো হাসি খুশিতে থাকিস সেই ব্যবস্থাই করবো।

কুসুম মাথা নিচু করে হাসলো কিছু বললো না। আলিফ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বেড়িয়ে গেলো।

কুসুম ওয়াশরুম থেকে ফোনের রিংটনের শব্দ পেয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে ফোন রিসিভ করতে নিলে কেটে গেলো। আবারো বেজে উঠলে তখনি রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে বলে উঠলো,

  • কুসুম তুমি ঠিক আছো তো, জ্বর কমেছে?
  • হুম আমি ঠিক আছি আর হ্যা জ্বর ও কমেছে।
  • ফোন ধরছিলে না কেনো কোথায় ছিলে?
  • ওয়াশরুমে ছিলাম। আচ্ছা তুমি দুপুর থেকে কি করছিলে একবারো কল করলে না যে?
  • ভার্সিটিতে একটু বিজি ছিলাম। আর জানোই তো বিকেলে ফ্রেন্ডদের সঙ্গে একটু আধটু আড্ডা চলে। এখন বাসায় এসে ফ্রি হয়ে কল দিলাম।
  • হুম আচ্ছা শোনো না একটা গুড নিউজ আছে।
  • গুড নিউজ! বাবাহ এতো মিল আমাদের মাঝে! আমারো তো একটা গুড নিউজ দেওয়ার আছে তোমাকে।
  • কি গুড নিউজ বলো?
  • উহু আগে তুমি বলো, তারপর আমি বলবো।
  • ওকে, শোনো ভাবির অভিমান ভেঙেছে, আজ নাকি ভাইয়া ভাবিকে জড়িয়ে ধরেছিলো ভাবি কিছুই বলেনি। ভাইয়া তো খুব খুশি আজ।
  • কি বলো কিভাবে সম্ভব?
  • দেখা হলে বলবো ফোনে এতো কিছু বলা যায় নাকি।
  • আচ্ছা দেখা হলেই বলো। তো তোমার ভাইয়া ভাবির তো সব প্রায় ঠিক হতে চলেছে। আমাদের টা কবে ঠিক হবে কবে যে তোমাকে নিজের করে পাবো? অবশ্য তোমাকে নিজের করে পেতে খুব বেশি দেরি নেই।
  • খুব বেশি দেরি নেই এতোটা শিওর হচ্ছো কি করে?
  • আলিফ কিছু বলেনি তোমাকে, তোমার আমার রিলেশনের ব্যাপারে?
  • কই নাতো ভাইয়া তো কিছু জানেই না কি বলবে। ভাবি জানে কিন্তু ভাবি তো ভাইয়াকে কিছু বলেনি।
  • আলিফ সব জানে পিয়াস ওকে আজ বলে দিয়েছে সবটা। আমি তো ভেবেছিলাম আলিফ আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেবে না। বাট আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বললো।

ঈশান আমার ফ্রেন্ডদের মধ্যে আমার সব থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড তুই। আমি যতোটা জানি তোর আর তোর পরিবার সম্পর্কে আশা করি আমার বোনটা ভালো থাকবে। আর আলিফ এটাও বলেছে তোমার বাবা মা দেশে ফিরলেই আমাদের বিয়ের কথা বলবে।

  • ও মাই গড! ঈশান আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না ভাইয়া মেনে নিয়েছে! এই জন্যই কি ভাইয়া কিছুক্ষণ আগে বলে গেলো আমার কোনো আশাই অপূর্ণ রাখবে না। আমি যেনো হাসি খুশি থাকি সেই ব্যবস্থা করবে।

আলিফের বন্ধু ঈশান কুসুমকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করতো। কুসুমও মনে মনে পছন্দ করতো ঈশানকে। কুসুম যেদিন নিঝুমের থেকে শুনেছে ঈশান কাউকে ভালোবাসে তারপর থেকে কুসুম ঈশানকে এড়িয়ে চলতো দেখা হলেও কথা বলতো না। ঈশান একদিন ভার্সিটি থেকে কুসুমকে প্রোপজ করে। কুসুম কিছু না বলে চলে এসেছিলো। ঠিক তার দুদিন পরে নিঝুমের থেকে জানতে পারলো ঈশান অন্য কাউকে নয় কুসুমকেই পছন্দ করে আর ওকেই ভালোবাসে। ব্যাস তারপর থেকেই ঈশান আর কুসুম রিলেশনে বাধা পড়লো।

  • কার সঙ্গে কথা বলছো আপু নিশ্চই ঈশান ভাইয়া তাইতো?
    ইপ্তি খাবার হাতে নিয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে কথাটা বললো।

কুসুম তখনো ঈশানের সঙ্গে কথা বলছিলো ফোন কেটে দিয়ে বললো,

  • হুম। ভাবি ভাইয়া সব জেনে গিয়েছে ঈশান আর আমার ব্যাপারে। ভাইয়া নাকি মেনে নিয়েছে।
  • বাহ এ তো ভালো কথা। তোমার ভাইয়া মেনে নিয়েছে তাহলে তো বাবা মা ও মেনে নেবে। আপু তুমি বিয়ে করে চলে গেলে আমি কার সঙ্গে সময় কাটাবো?
  • আমি তো এখনি যাচ্ছি না গো ভাবি। আর আমি না থাকলেই বা কি ভাইয়া তো আছে সময় কাটানোর জন্য, তাইনা!
  • তোমার ভাইয়া দেবে আমাকে সময়! হুহ।
  • দেবে দেবে আজ যেমন দেরি করে দরজা খুলেছো বলে ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো। আর বলেছে কাল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে। কি জন্য তাড়াতাড়ি ফিরবে বলো তোমার সঙ্গে সময় কাটানোর জন্যই তো।
  • ওও জিরো সাহেব সব বলে দিয়েছে তোমাকে। কি লোক রে বাবা! থাক বাদ দাও তো, নাও খাবারটা খেয়ে নাও।
  • ওহো ভাবি সন্ধার একটু আগেই তো খেলাম আবারো?
  • হুমম আবারো, এখন কথা না বলে অল্প করে হলেও খেতে হবে। তোমার ভাইয়া বলে দিয়েছে না খেলে একটু পর এসে তোমাকে খুব করে বকে দেবে।

ইপ্তি জোর করে কুসুমকে খাইয়ে বেড়িয়ে যেতে নিলে কুসুম বলে উঠলো,

  • থ্যাংক ইউ সো মাচ ভাবি।
  • আপু হঠাৎ থ্যাংক ইউ কেনো?
  • ভাইয়ার ভালোবাসাকে বুঝতে পেরে আপন করে নিতে চেয়েছো নিজের জায়গাটা বুঝে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছো তাই। আচ্ছা শোনো ভাবি এখন যাও ভাইয়াকে সময় দাও। আমি এখন একদম সুস্থ আছি আমাকে নিয়ে আর চিন্তা করো না।

ইপ্তি কিছু বললো না একটু হেসে বেড়িয়ে গেলো।

ইপ্তি ব্যালকনিতে দাড়িয়ে আছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। আলিফ ওর পাশে দাড়িয়ে বললো,

  • আমার বউয়ের এই গুনটার কথা তো জানা ছিলো না! তুমি গান ও গাইতে পারো?
  • গুনগুন করলেই গান গাওয়া হয় নাকি। কি থেকে কি শুনেছেন।
  • আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম তুমি গান গাইছিলে। গানের কথাগুলো তো আমি শুনেছি। গানটা নিশ্চই আমাকে উদ্দেশ্য করে গাইছিলে তাইনা?
  • মটেও না আপনাকে উদ্দেশ্য করে কেনো গাইতে যাবো। এই মুহুর্তটা ভালো লাগছিলো তাই আর কি।
  • হুমমম ভালোলাগা মুহুর্তেই ভালোলাগার মানুষটিকে মনে পরে। তোমার ক্ষত্রেও কি সেটাই হয়েছে? আমার যতটা মনে হয় তোমার ভালোলাগার মানুষটি আর কেউ নয় আমি, কি ঠিক বলেছি তো?
    ইপ্তি মুচকি হেসে বললো,
  • জানি না।
  • ইসস এভাবে হেসো না গো, তোমার ওই পাগল করা হাসিতে অনেক আগেই মারা পড়েছি। আবারো কি মারতে চাও?
  • আমি আপনাকে কেনো মারতে চাইবো হুম?
  • ঠিক বলেছো মনের মানুষকে তো মারা যায় না, আমি তো তোমার মনের মানুষ।
  • এ কথা কখন বলেছি আপনাকে?
  • বলতে হবে কেনো আমি কি বুঝিনা, তাছাড়া তুমি তোমার গানের কথাতেই তো তা বলে দিলে। উমম কি গান যেনো গাইছিলে….হ্যা মনে পড়েছে তোমার গানের কথাগুলো ছিলো “প্রিয় তুমি ছাড়া আমার কেহো নাই, আমি শুধু তোমাকেই চাই।”
  • হয়েছে বাদ দিন, মায়াপরী কে সেটা বলুন, আজ বলতেই হবে।
  • মায়াপরী, তার কথা আর কি বলবো বলো, তার কথা বলে তো শেষ করা যাবে না। সে যে আমার মনের মায়াপরী ভালোবাসি তাকে আমি অনেক বেশি ভালোবাসি।

ইপ্তির চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো, বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। ইপ্তি মনে মনে বলতে লাগলো,

  • ওও তারমানে উনি সত্যি আমাকে করুনা করছে। বউ বলা আমার কাছে আসা আমার এতো কেয়ার করা সবটাই আমাকে অসহায় ভেবে করছে।
  • কি হলো কি ভাবছো?

ইপ্তি কেঁপে উঠলো আলিফের কথায়, হাসার চেষ্টা করে বললো,

  • কিছুনা আমার ঘুম পেয়েছে যাচ্ছি আমি।

ইপ্তি চলে যেতে নিলে আলিফ ইপ্তির হাত ধরে কাছে টেনে নিলো। ইপ্তি ছুটার জন্য ছটফট করছে কিন্তু আলিফ ছাড়ছে না।

আলিফ ওকে আরো কাছে টেনে নিয়ে কোমড় জড়িয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,

  • আমার সামান্য ভুলের কারনে আমি আমার মায়াপরীকে নিজের করে নিতে পারিনি। আমি যদি জানতাম আমার সেই মায়াপরীটাই আমার বউ হয়ে এসেছে তাহলে কখনোই আমি তাকে আঘাত দিয়ে কথা বলতাম না।

ইপ্তির আলিফের দিকে তাকিয়ে বললো,

  • আপনার মায়াপরী আপনার বউ মানে?
  • মানেটা হলো তুমিই আমার মায়াপরী বুঝেছো বউ?

ইপ্তি প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে আলিফের দিকে তাকিয়ে আছে। আলিফ মৃদু হেসে ইপ্তিকে সামনে দাড় করিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। ইপ্তি আলিফের এমন অবাধ্য ছোয়াতে কেঁপে উঠছে। আলিফ ওর কাধে থুতনি রেখে মায়াপরীর ব্যাপারে সব কিছু বললো।
ইপ্তি সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আলিফের মনে ও এতোটা জায়গা জুড়ে আছে সেটা হয়তো কখনোই ভাবেনি। ইপ্তি তো বিয়ের পর আলিফকে দেখেছে, ভালোবেসেছে। আর আলিফ বিয়ের আগে থেকেই অচেনা অজানা এক মায়াপরীকে নিজের মনের মাঝে ঠাই দিয়েছে এখনো আলিফ তার মায়াপরীকে ভালোবাসে। শুধু আলিফের একটু ভুলের কারনে ওদের সম্পর্ক আজ এখানে এসে পৌছেছে।

আলিফ ইপ্তির ঘাড়ে মুখ গুজে দিয়ে বললো,

  • আ’ম সো সরি মায়াপরী, আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। প্লিজজ আমাকে তুমি মাফ করে দাও।

ইপ্তি আলিফের দিকে ঘুরে চোখে চোখ রেখে বললো,

  • মাফ কেনো চাইছেন আপনি তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এটাই অনেক। আচ্ছা আমাকে আগে কেনো বলেন নি আপনি বিয়ের আগেও দেখেছেন আমাকে আবার একটা নামও দিয়েছেন?
  • আমি তো এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম তাই বলিনি।
    আলিফ ইপ্তি কপালে চুমু খেয়ে শাড়ির আচঁলটা মাথায় তুলে দিয়ে বললো,
  • আই লাভ ইউ মায়াপরী, আই লাভ ইউ সো মাচ।

ইপ্তি প্রতিউত্তরে কিছু বললো না মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরলো আলিফকে।

আলিফ নিজের বাহু দ্বারা ইপ্তিকে জড়িয়ে নিয়ে বললো,

  • আমি আমার উত্তরটা পেয়ে গিয়েছি বউ। আমি জানি তুমিও আমাকে ভালোবাসো।

বাইরের ঠান্ডা হাওয়া আলিফ ইপ্তিকে ছুয়ে যাচ্ছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে ওদের গায়ে। এই মুহুর্তে কতোই না সুখি লাগছে ওদের দুজনকে।

আলিফ ইপ্তিকে একহাতে বুকে জড়িয়ে অন্য হাতে ইপ্তির হাত ধরে তাকিয়ে আছে ওই দূর আলিফের বুকে রুপালী চাঁদটার দিকে।

  • এ বুকের ভেতর কান পেতে শোনো হৃদয় আমার ডাকছে তোমায় “এই চোখেতে চেয়ে দেখো না তুমি আছো মনিকোঠায়।” প্রিয় তুমি ছাড়া আমার কেহো নাই, আমি শুধু তোমাকেই চাই।

ইপ্তি অবাক হয়ে তাকালো আলিফের দিকে আলিফ হেসে বললো,

  • কি গানটা মিলেছে তো, তুমি এই গানটাই গাইছিলে তখন তাইনা?
  • হুম মিলেছে। থামলেন কেনো আপনার কন্ঠে তো শুনতে খুবই ভালো লাগছিলো গানটা।
  • এখন গান গাওয়ার সময় নাকি হুম, এটুকু তো তোমাকে চমকে দেওয়ার জন্য বলেছি। এখন আর কথা নয় রুমে যেতে হবে। আমার মায়াপরীকে আমি অনেক আপন করে নিতে চাই সে সুযোগটা কি পাবো?

ইপ্তির মুখে লজ্জার আভা ভেসে উঠেছে, মাথা নিচু করে রইলো। আলিফ হুট করেই ইপ্তিকে কোলে তুলে নিলো। ইপ্তি চোখ খিচে আলিফের টি শার্টের কলার খামচে ধরলো।

ভালোবাসার জোড় আসলেই অনেক বেশি রাগ অভিমানও হার মানতে বাধ্য এই ভালোবাসার কাছে। ইপ্তির মনে আলিফের জন্য, যে অভিমান জমা হয়েছিলো আজ তার বাধ ভেঙেছে। আলিফ তার মায়াপরীকে নিজের করে পেয়েছে। আর ইপ্তি পেয়েছে তার প্রিয় তুমিকে।

সমাপ্ত

প্রিয় তুমি
লেখিকাঃ মেঘা আফরোজ

আরো পড়ুন – ভালোবাসা হারানোর গল্প

পাঠক আপনাদের জন্যই আমরা প্রতিনিয়ত লিখে থাকি। আপনাদের আনন্দ দেয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ। তাই এই পর্বের “ভালোবাসার কথা” টি আপনাদের কেমন লাগলো পড়া শেষে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

Related posts

বউয়ের ভালোবাসা – স্বামীর বিয়ে – শেষ পর্ব | Bouer Valobasha

valobasargolpo

বউয়ের ভালোবাসা – স্বামীর বিয়ে – পর্ব ১ | Bouer Valobasha

valobasargolpo

Leave a Comment

error: Content is protected !!