স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প

গল্প হলেও পারতো – ভালোবাসার কথা গল্প

গল্প হলেও পারতো – ভালোবাসার কথা গল্প: ক্লাস সিক্স এর ছোট বোনটাকে কোনো ছেলের সাথে গোপনে কথা বলতে দেখে, মেনে নিতে পারলো না রিমা। সে চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুললো।


পর্ব ১

এই লকডাউনে দিনের বেশিরভাগ সময়ই ফেইসবুকে কাটছে। সময় কাটানোর একটা ভালো মাধ্যম বলা যেতে পারে এটাকে। মাঝেমধ্যে ভাবি, জাকারবার্গ যদি ফেইসবুক আবিষ্কার না করতো তবে আমাদের কি অবস্থা হত!

প্রতিদিনের মতো আজও যোহরের নামায পড়ে বিছানায় শরীর টা এলিয়ে দিলাম। ফোন হাতে নিয়ে ফেইসবুকে প্রবেশ করলাম। মেসেজ রিকোয়েস্ট চেক করতে গিয়ে একটা মেসেজে চোখ গিয়ে আটকায়-

আমাকে চিনেছ আপু? রিশা আমি।

রিশা আলমের আইডি চেক করতে থাকলাম। যদিও এখন বেশ বড়সড় লাগছে তবুও ছবি দেখে মেয়েটিকে চিনতে ভুল করলাম না। একই স্কুলে পড়তাম আমরা। আমার তিন বছরের ছোট সে। ভারী মিষ্টি দেখতে মেয়েটি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতেই তার জন্য ছেলেরা লাইন লাগিয়ে রাখত। অবশ্য সে এত লম্বা যে, কেউ দেখলে বুঝতেই পারতো না বয়স কম তার। ভালো নাচতেও জানতো সে। নাচের প্রতিযোগিতায় আমার সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলেছে তার।

আমি যখন কলেজে উঠি, সে তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। হঠাৎ একদিন শুনলাম সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। সেই থেকে তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আমার ৷ আজ এত বছর পর তার খবর পেলাম!

দেরী না করে তাকে রিপ্লাই দিলাম। চ্যাট হতে থাকলো তার সাথে। আমি বই বের করেছি শুনে অনেক খুশি হলো সে। এই কথায় সেই কথায় জানতে পারলাম তার লাইফের অনেক কিছুই। তার উপরে কি কি বয়ে গিয়েছে শুনে হতাশ হলাম। এতটুকু একটা মেয়ে, কত কিছুই না সহ্য করলো! সে বলতে বলতে বলল, আমি তার জীবন কাহিনী লিখতে পারতাম কিন্তু এত বাজে ঘটনা লিখলে আমার লেখা আর কেউ পড়বে না!
তার মেসেজ দেখে মুচকি হেসে রিপ্লাই দিলাম-

আমি তোমাকে নিয়ে লিখতে চাই।

রিশার কাছে তিনদিন সময় নিয়ে শুরু থেকে সবটা আবার শুনলাম। ঠিক করলাম তাকে নিয়েই পরের গল্পটা লিখব। ভেবেচিন্তে একটা নামও ঠিক করলাম।

বিছানায় বসে পেছনে বালিশ চাপা দিয়ে লিখতে লাগলাম সত্য ঘটনা অবলম্বনে আমার নতুন গল্প
”গল্প হলেও পারতো”

সময়টা ছিল ২০১১। মাত্র পিএসসি পরীক্ষা শেষ করে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে সময় কাটাচ্ছে রিশা৷ এমন দিনগুলোর কোনো এক সন্ধ্যায়, এলাকার ফার্মেসীতে এল সে। মেডিসিনের নাম লেখা তালিকাটা ধরিয়ে দিলো সেখানে থাকা ছেলেটির হাতে।

তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে রোহান। রিশাকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য যেন তার দুনিয়াটা থমকে গেল। ফ্রক পরা পুতুলের মতো একটা মেয়ে তার সামনে রয়েছে। প্রথম দেখাতেই এত বেশি ভালো লাগছে কেন তাকে!
মেয়েটিকে সামনে থেকে দেখার লোভ সামলাতে পারলো না রোহান। ফার্মেসীতে বসা ছেলেটি তার পরিচিত ছিল। তাই সে ভেতরে এসে মেডিসিন নিতে হেল্প করলো ছেলেটিতে। কিন্তু চঞ্চল রিশা রোহানের কার্যকলাপ খেয়াল করলো না। মেডিসিনগুলো নিয়ে টাকাটা দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে দৌড় দিলো।

রোহান তার পিছু নিতে চাইলেও পারলো না। ছুটন্ত রিশার পেছনে কিভাবে ছুটবে সে! আশেপাশের লোকজন দেখলেই বা কি মনে করবে?

ছেলেটির কাছে জানতে চায়লে রিশার বাড়ির ঠিকানা সে দিতে পারলো না। কারণ ছেলেটি এই এলাকায় নতুন এসেছে। ফার্মেসীতেও বসছে বেশিদিন হয়নি।

হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসলো সে। এভাবে কয়েকদিন কেটে যেতেই রিশাকে সে ভুলে যায়। হয়তোবা এটা কিছু সময়ের ভালো লাগা ছিল!
কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ঠিক দুইমাস পরে।

রোহানের স্কুলের মাঠেই রিশাকে আবার দেখতে পেল সে। রোহান চট্রগ্রাম কুলগাঁও সিটি কর্পোরেশন স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। একটু খোঁজ নিতেই সে জানতে পারলো, রিশাও এই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। পুরনো ভালোলাগা টা জেগে উঠলো আবার৷ অবশ্য ভালোলাগার মতোই রিশা।
চঞ্চল, হাসিখুশি একটা মেয়ে সে। হাসিটা তার মুখে সবসময় লেগে থাকে।

ইদানীং রোহানের কিছুতে মন বসেনা। রিশাকে দেখলেই তার অন্যরকম লাগে। মনেহয় রিশাকে তার চোখের সামনে বসিয়ে রেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে৷ তবে কি সে প্রেমে পড়ে গেল!
নিজেকে আর সামলাতে পারলো না রোহান। সারাক্ষণ রিশার আশেপাশে থাকা শুরু করলো। স্কুল ছুটির পরেও সে পিছু নিতো রিশার। কিন্তু সাহসের অভাবে কিছু বলতে পারলো না।

দেখতে দেখতে স্কুলের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চলে আসলো৷ রিশা যেমন পড়াশোনায় ভালো ছিল ঠিক তেমনি খেলাধুলায়ও। দৌড়, দড়ি লাফসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে সে। ছয়টির বেশি না দেয়ার নিয়ম থাকলে হয়ত বা সবগুলোতেই অংশ নিত।

আউটডোর খেলা শেষ হলে ইনডোর শুরু হয়। নাচের প্রতিযোগিতায় রিশা অংশগ্রহন করলো। নীল রঙের একটা শাড়ি পরে এল সে। লম্বা চুল গুলো খুলে দিলো। খুব বেশি সাজেনি রিশা৷ কিন্তু রোহানের কাছে মনেহচ্ছে, স্বর্গের পরী সে।

যতক্ষণ না নাচ শেষ হলো, রোহান হাততালি দিয়েই যাচ্ছিল। দ্বিতীয় স্থান লাভ করলো রিশা। প্রথম হয়েছে সাজি আফরোজ। রোহানের কাছে মনে হলো, সাজির চেয়েও রিশার নাচটায় ভালো ছিল। যদিও রিশা এটা নিয়ে মন খারাপ করেনি।

বিজয়ী ঘোষণা দেয়ার পরেই রিশার চারপাশে মেয়েরা ভিড় জমালো অভিনন্দন জানাতে। রোহানেরও ইচ্ছে করছে, নীল শাড়ি পরিহিতা রিশাকে অভিনন্দন জানিয়ে আসতে। তীব্র ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখতে পারলো না সে৷ রিশার পাশে এসে বলল-

দারুণ নাচো তুমি। আমি যদি বিচারক হতাম, তোমাকেই প্রথম ঘোষণা করতাম।

মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে সেখান থেকে চলে গেল রিশা।

রিশার কণ্ঠস্বর শুনে রোহানের মনটা আরো অশান্ত হয়ে উঠল। এই কণ্ঠটা যদি সে আজীবন শুনতে পারতো!
সেই থেকে একটা সেকেন্ডও রিশাকে না ভেবে রোহানের দিন কাটে না। স্বপ্নেও রিশাকেও দেখতে পায় সে। একসময় রোহান ঠিক করলো, রিশাকে সে বোঝাতে চেষ্টা করবে তার ভালোবাসা। এভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।

সেই থেকে রিশার সাথে কথা বলতে শুরু করে সে নানা বাহানায়। তার কার্যকলাপে বোঝাতে চেষ্টা করে, সে ভালোবাসে তাকে। কিন্তু পিচ্চি মেয়েটার কি এসব এত সহজে বোঝার ক্ষমতা আছে!
একদিন রোহানের বন্ধু ইমরান তাকে বলল-

এভাবে হবেনা দোস্ত৷ সরাসরি বলতে হবে। নাহলে দেখবি অন্য কেউ পটিয়ে ফেলবে। দেখিস তো মেয়েটির পেছনে কত ছেলে ঘুরে।

ইমরানের কথাটি মাথায় নিলো রোহান। সে সিদ্ধান্ত নিলো মনের কথা জানিয়ে দিবে তাকে। কিন্তু নানা বিপত্তি ও ভয়ের কারণে জানাতে পারলো না সে।

ঠিক এক মাস পর স্কুলের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আজ। স্কুলের মাঠে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সবার মনোযোগ অনুষ্ঠানে থাকলেও রোহানের রয়েছে রিশার মাঝে। রিশা কতবার চোখের পলক ফেলছে, এটাও হিসাব করে যাচ্ছে সে। একসময় রিশা উঠে হাঁটতে শুরু করলে রোহান তার পিছু নিলো। স্কুলে প্রবেশ করে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে। রোহান তার জন্য সিঁড়িতে অপেক্ষা করতে লাগলো। রিশা সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় রোহান তার পথ আটকালো। তার এরূপ কাণ্ডে ঘাবড়ে গেল রিশা। রোহান তাকে অভয় দিয়ে বলল-

দেখো রিশা তুমি বিষয়টা কিভাবে নিবে জানিনা কিন্তু আমি আর নিজেকে আঁটকে রাখতে পারছি না। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তাই তো তোমার পেছনে কতদিন যাবত ঘুরঘুর করছি। কিন্তু তুমি খেয়ালই করছ না। অথবা করেও আমাকে বুঝতে দিচ্ছ না। একটু বুঝো প্লিজ, এই রোহান ছেলেটা তোমাকে না পেলে দম আঁটকেই মারা যাবে।

এক নাগাড়ে রোহানের কথাগুলো শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেল রিশা।
রোহান বলল-
কিছু তো বলো?

আচমকা রিশা শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো।
রোহান ভয় পেয়ে গেল। প্রপোজ পেয়ে কেউ এভাবে ভ্যা ভ্যা শব্দে কাঁদে, তার জানা ছিল না।
সে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল-
কি হয়েছে? আমি কি কষ্ট দিয়েছি তোমাকে?

রিশার কোনো উত্তর না পেয়ে সে তার পকেট থেকে পাঁচটি চকোলেট বের করলো।
রিশার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
দেখো তোমার জন্য আমি চকোলেটও এনেছি।

রোহানের হাতে চকোলেট দেখে ফিক করে ফেসে ফেললো রিশা। স্বস্থির একটা নিশ্বাস ফেলে রিশার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে রোহান বলল-
এখানে আমার ফোন নাম্বার আছে। ইচ্ছে হলে ফোন দিও।

চিরকুট টা নিজের কাছে রেখে দিলেও রোহানের জন্য তার মনে ভালোবাসা জন্ম নিলো না। সে পাত্তা দিলো না রোহানের এসব কথা। এড়িয়ে চলতে শুরু করলো তাকে। কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে বেহায়া করে তুলতে বাধ্য। রোহানের অবস্থাও হয় এমন। রিশার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠল সে। নানাভাবে রিশাকে রাজি করানোর চেষ্টা করতে থাকলো, সম্পর্কে জড়ানোর জন্য। এভাবে প্রায় আরো দেড় মাস কেটে যায়। হাল ছাড়েনি রোহান। এই দেড় মাসে রিশার মনের কোণে তার জন্য ভালোলাগা সৃষ্টি হয়।

রোহান দেখতে হ্যান্ডসাম। বেশ লম্বাচওড়া। রিশাকে দেখতে যেমন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মনেহয় না, রোহানকে দেখলেও মনেহয় কোনো ভার্সিটির ছাত্র। রিশার মেয়ে বান্ধবীরাই রোহানের উপরে ফিদা। অনেকেই মজার ছলে বলে, সে রাজি না হলে তাদের জন্য রোহান কে রাজি করাতে।

এভাবে দিন যেতে থাকে। রিশার অন্যান্য বান্ধবীরা প্রেম করে। সে ভাবলো, সেও একটা প্রেম করতে পারে৷ তার পেছনে অনেক ছেলেই ঘুরে।

কিন্তু কার সাথে প্রেম করবে সে? ভাবতে ভাবতে রোহানের কথা মনে পড়ে তার। রোহানের মতো এতমাস ধরে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করেনি কেউ। তার মানে রোহানই তাকে বেশি ভালোবাসে। রিশার বাচ্চামনে হুট করে প্রেম জেগে উঠে। চিরকুট টা খুঁজে বের করে সে। মায়ের ফোনটা নিয়ে ডায়েল করে রোহানের নাম্বারে।
রিশার ফোন পেয়ে বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে যায় রোহান। এভাবে অনাঙ্ক্ষিতভাবে তার ফোন পাবে ভাবেনি সে। এতদিন যে নাম্বার টা রেখে দিবে এটাও যে তার ভাবনার বাহিরে ছিল।

রিশার সাথে প্রায় ঘণ্টা খানেক কথা বলল রোহান। সেই থেকে শুরু হয় তাদের ফোনালাপ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা ফোনে কথা বলতো। এভাবে এক মাস কেটে যায়। এই এক মাসে তারা কেবল ফোনেই কথা বলেছে।
হঠাৎ এক সকালে সবাইকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে, মায়ের ফোন নিজের রুমে নিয়ে আসে রিশা। রোহান কে কল করে কথা বলতে থাকে। একটু পরেই মেজ বোনের হাতে ধরা পড়ে সে।

রিশারা তিনবোন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। মেজ বোন রিমার বিয়ের কথা চলছে। সবার ছোট রিশা৷ তাদের বাবা দেশের বাইরে থাকে। তাই বাবার সাথে তেমন সখ্যতা গড়ে উঠেনি রিশার। একমাত্র মেজ বোনকেই সে ভয় পায়।

ক্লাস সিক্স এর ছোট বোনটাকে কোনো ছেলের সাথে গোপনে কথা বলতে দেখে, মেনে নিতে পারলো না রিমা। সে চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুললো। তার চেঁচামেচির শব্দ শুনে উপস্থিত হলেন তাদের মা হালিমা বেগম। সবটা শুনে তিনিও ভীষণ কষ্ট পেলেন। রোহান কে ডাকলেন তিনি। এর আগে রিশাকে অনেক ভয় দেখালেন তারা। বললেন, আজই ছেলেটার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করতে হবে। একটা সম্পর্কই থাকতে পারবে। সেটা হলো ভাই বোনের।

একটু পরে রোহান এই বাড়িতে এল। তার সাথে তারা কোনো বাজে ব্যবহার করলো না। শুধুমাত্র রিশা এসে বলল-
এতদিন যা হয়েছে তার জন্য আমি দুঃখিত ভাইয়া।

ভাইয়া!
ভাইয়া ডাক শুনে রোহানের এতটাও কষ্ট হলো না, যতটা না রিশাকে দেখে হচ্ছে। রিশাকে কি মেরেছে তারা? এভাবে কাঁদতে কাঁদতে চোখ কেনো ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটি!

জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলেও করলো না রোহান৷ চুপচাপ বেরিয়ে গেল সেই বাড়ি ছেড়ে। বাসায় এসে কোনোকিছুতেই মন বসাতে পারছে না সে। একটা চিন্তায় তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ থেকে কি রিশা তার সাথে আর কথায় বলবে না? এমন টা হলে রোহান বাঁচবে কিভাবে! রিশাকে ছাড়া একটা দিন কল্পনা করাও যে অসহ্যকর


পর্ব ২

সাতদিন হয়ে গেল!
এই সাতদিনে রিশাকে স্কুলে যেতে দেয়নি রিমা। আজ হালিমা বেগমের কথায় তাকে স্কুলে যেতে দিতে রাজি হয় সে। তবে কড়াভাবে রিশাকে বোঝানো হয়, রোহানের সাথে যেন ভুলেও কথা না বলে। রিশা সম্মতি জানালে তাকে স্কুলে যেতে বলে রিমা।
এদিকে সাতদিন রিশার কোনো খবর না পেয়ে পাগলপ্রায় রোহান। রিশার কি অবস্থা এখন ভাবতে ভাবতেই সারাটা দিন কেটে যায় তার। প্রতিদিন সে স্কুলে এসেছে, রিশার বাড়ির আশেপাশেও ঘুরঘুর করেছে। যদি একটাবার দেখা যায় মেয়েটাকে এই আশায়!
আজও রোহান স্কুলে এসেছে৷ স্কুল গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। এই সাতদিনেও এমন করেছে। যাতে রিশা আসলেই সে দেখতে পায়।
আজ রোহানের আশা পূরণ হলো। রিশাকে দেখতে পেল সে। কিন্তু রোহান কে দেখে রিশা মাথা নিচু করে দ্রুতবেগে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল।
এতদিন পর দেখা হয়েও রিশা একটাবার রোহানের হালচাল জিজ্ঞাসা করলো না! তার যে কষ্ট হচ্ছে মেয়েটা কি বুঝছে না?
রিশার পিছু নিলো রোহান। সে বলল, এখুনি স্কুলের পেছন দিকটায় আসতে। জরুরি কথা আছে।

কেন যেন রোহানের কথাটা শুনলো রিশা। ক্লাসে না গিয়ে সে স্কুলের পেছন দিকে আসলো। ফোনে কথা বলার পর এই প্রথম তারা সামনাসামনি হয়েছে।

রোহানের দিকে ভালোভাবে তাকাতেই চমকে উঠল সে৷ এই সাত দিনে এই কি হাল হয়েছে ছেলেটার! মনেহচ্ছে ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করছেনা সে। চুল গুলোও অগোছালো। এর আগে এভাবে আসতে তাকে দেখেনি রিশা।
আচমকা রোহান কাঁদতে শুরু করলো। কেঁদে কেঁদে বোঝাতে লাগলো, রিশাকে ছাড়া সে ভালো নেই।

রিশা ঠিক করেছিল সে রোহানের সাথে আর কথায় বলবে না। নাহলে তার স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে যাবে৷ কিন্তু রোহানের অশ্রুসিক্ত দুচোখ দেখে তার মনে মায়ার সৃষ্টি হলো। তার জন্য একটা ছেলে এভাবে কাঁদছে! নিশ্চয় ছেলেটি তাকে অনেক বেশিই ভালোবাসে। নাহলে এটা সম্ভব না। রোহানকে সে ভরসা দিয়ে ক্লাসে ফিরে গেল।
বাসায় এসে কিছুতে মন বসাতে পারছে না রিশা। সারাক্ষণ চোখের সামনে রোহানের মুখটা ভেসে উঠছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটো ফুলিয়ে ফেলেছিল ছেলেটি।

এতদিন রিশার মনে রোহানের জন্য শুধু ভালোলাগাই কাজ করতো। কিন্তু আজ মনেহচ্ছে সে রোহানের জন্য পরিবারের সাথেও লড়াই করতে পারবে। সেও ভালোবাসে রোহান কে। এটি ভেবে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল রিশার মুখে। সে সুযোগ খুঁজতে লাগলো ফোন কাছে পাওয়ার।

সুযোগ পেতেই রোহানের সাথে কথা বলা শুরু করলো সে। রোহানকে জানালো, সেও রোহানকে তার মতোই ভালোবাসে।

এভাবে কয়েকদিন যেতেই আবার মেজ বোনের হাতে ধরা পড়লো রিশা। এবার আর কথার মাধ্যমে বোঝানো হলো না তাকে। মারধর করা হলো।
মার খেয়ে ঘরের কোণায় বসে মুখ লুকিয়ে কেঁদে চলেছে রিশা। তার খালাতো ভাই আসলাম বেড়াতে এসেছে এখানে৷ সে এসব দেখে রিশার পাশে বসে বলল-
এমন করতে থাকলে তোমার স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিবে তোমার বাসায়। একটা ছেলের জন্য স্কুল বন্ধ করবা? তোমার মাকে এখন বলতে শুনলাম, আর স্কুলে যেতে দিবে না তোমায়।

কথাটি শুনে ঘাবড়ে গেল রিশা। সে ভাবলো, স্কুলে না গেলে রোহানের সাথে দেখা করবে কিভাবে!
সে সাহায্য চায়লো আসলামের কাছে। আসলাম তাকে বলল-
তুমি যদি কোরআন ধরে বলো আর বফ এর সাথে কথা বলবে না তাহলেই তারা বিশ্বাস করবে।

রিশা ভাবলো, স্কুলে গেলে অন্তত রোহান কে তো দেখতে পারবে! কথা নাহয় নাই বললো সে। আসলামের কথা মেনে কোরআন ধরে শপথ করলো সে, বফ এর সাথে কথা বলবে না।
আসলাম এটি সবাইকে জানালো। হালিমা বেগম স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বললেন-
আমার মেয়ে কোরআন ধরে যখন এটা বলেছে তখন সে এসব থেকে সরে আসবে। এটা আমার বিশ্বাস।

কিন্তু রোহানের সাথে কথা বলতে না পেরে রিশার বুকের মাঝে ঝড় বইতে থাকলো। সে নিজেকে রোহানের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারছে না। হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি আসে৷ পরের দিন সে চুরি করে মায়ের একটি স্বর্ণের আন্টি স্কুলে নিয়ে গেল। এক বান্ধবীর মাধ্যমে রোহান কে ডাকা পাঠায়। স্কুলের পেছন দিকটায় এসে রোহান কে সালাম করে তার আঙুলে আন্টি টা পরিয়ে দিলো সে। তারপর কবুল বলে বলল-
আজ থেকে তুমি আমার বফ নও, হাসবেন্ড।

-এসবের মানে কি রিশা?
-এটা না করলে আমি যে তোমার সাথে কথা বলতে পারব না। এখন থেকে বফ না আমি আমার হাসবেন্ড এর সাথেই কথা বলব।

রোহান কে সব খুলে বললো রিশা। সবটা শুনে রোহান অনেক খুশি হলো। রিশা তার ভালোবাসার মর্যাদা এভাবে দিবে জানা ছিল না তার।

সেই থেকে রোহানের সাথে সতর্কতার সাথে যোগাযোগ শুরু করলো রিশা। রিশার দিকে কোনো ছেলে তাকাতেও পারে না। কোনো ছেলে বন্ধুও নেই তার। সবটা জুড়ে রয়েছে রোহান। তার সব কথা মেনে চলে সে। নিজের স্বামী হিসেবেই মেনে নিয়েছে সে রোহান কে। এভাবে তার ফাইনাল এক্সাম ঘনিয়ে আসলো।
পরীক্ষা দেয়ার পর একেবারেই ঘরবন্দী হয়ে গেল রিশা। মা ও বোনের জন্য না পারতো ফোনে কথা বলতে, না পারতো ঘরের বাইরে যেতে।

এভাবে কি থাকা যায়! রোহান কে দেখার জন্য, তার সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করতে থাকলো সে।
একদিন বিকেলে ছাদে আসলো রিশা। একটু দূরে চোখ যেতেই রোহানকে দেখতে পেল সে। তাকে দেখে বিশ্বজয়ের হাসি মুখে ফুটলো তার। দুজনে ইশারায় অনেক কথা বলল। প্রিয় মানুষটার সাথে এভাবেও কথা বলতে পারাটাও যেন শান্তি!
হালিমা বেগম ও রিমা ভাবলো, এবার হয়তো বা রিশার মাথা থেকে ছেলেটির ভুত নেমেছে।
কারণ আগের মতো রিশা বাইরে যেতে চায়না, ফোন নিয়েও লুকিয়ে পড়ে না।
দেখতে দেখতে সপ্তম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়।

এখন রিশার উপরে কারো সন্দেহ নেই বললেই চলে।
কয়েকদিন ক্লাস করার পর ইশারায় বাদ দিয়ে সরাসরি কথা বলতে শুরু করলো রিশা ও রোহান। স্কুলের কোনো ক্লাস রুম বা সিঁড়ি নেই যে, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলেনি। কিছুদিন যেতেই রোহান তাকে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। রিশাও রাজি হয়ে যায় সহজেই। ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে রিশার বাচ্চা মনে আনন্দের দোলা দেয়।
এভাবে তারা রিকশায় চেপে শহরের নানা জায়গায় ঘুরতে থাকে।

একদিন স্কুল থেকে বাসায় এসেই বোনের হাতে মার খেলো রিশা। কেউ একজন তার বাসায় জানিয়েছে, রিশাকে তারা কোনো ছেলের সাথে রিকশায় দেখেছে।

রিমা অনেক রাগ করলো। বলল, তার স্কুলেই যেতে হবে না এখন থেকে। কোরআন ছুঁয়েও এই মেয়ে মিথ্যে কথা বলেছে সবাই কে, আর বিশ্বাস করা যাবেনা তাকে।
কিন্তু পরেরদিনে হালিমা বেগমের জন্য স্কুলে যেতে পারলো রিশা। হালিমা বেগম রিশাকে অনেক বুঝিয়েছেন এসব বাদ দিতে।
সে স্কুলে যাওয়াই মায়ের সাথে রাগারাগি করলো রিমা। হালিমা বেগম বললেন-
স্কুল বন্ধ করাটায় কোনো সমাধান নই। তাকে আমি শেষবারের মতো বুঝিয়েছি দেখি কি হয়।

এই শেষবার আর শেষ হলোনা! বারবার একই ভুল করতে লাগলো রিশা।
সামনেই রিমার বিয়ে। তাই সে বাড়ির বাইরে যায় না খুব একটা। আর হালিমা বেগমের প্রায় শরীর খারাপ থাকে। তাই রিশাকে পাহারা দেয়ার জন্য কেউই তার সাথে যেতে পারে না স্কুলে। কিন্তু এসব একসময় হাতের নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকলো। রিশা অনেক বেশি উশৃঙ্খল হয়ে উঠেছে।

একসময় রিমা এলাকার বড় ভাই রুস্তমের সাহায্য চায়। তিনি এই এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাঝে একজন। তাকে শিখিয়ে দেয় রিশাকে ভয় লাগানোর জন্য।

তিনি রিশাকে ডেকে পাঠান। তাকে জানায়, এভাবে চলতে থাকলে তাকে সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে।
বাচ্চা মেয়েটা ভয় পেয়ে যায়। রোহানের সাথে দুরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মনকে বুঝাতে পারলো না সে। আবারো সে এসবে জড়িয়ে পড়ে।
এবার রিমা মাকে বলল, রিশার স্কুল একেবারেই বন্ধ করা হোক।
হালিমা বেগম পান চিবুতে চিবুতে বললেন-
একটা বাইরের ছেলের জন্য আমার মেয়ের পড়াশোনা কেন বন্ধ করব! ভেবেছিলাম মেয়ে আমার বুঝবে, সরে আসবে এসব থেকে। নাহ, সে ঠিক হলো না। ছেলেটার বাসার খোঁজ নেওয়া হোক। যেটা এতদিন করিনি সেটাই করতে হবে।

রোহানের খবর নিয়ে জানলো, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে সে। পাশের এলাকায় ভাড়া থাকে সপরিবারে।
যেটা জেনে বেশি অবাক হয়েছেন তা হলো, রোহানের বাবা দুটো বিয়ে করেছেন। এবং দুই বউ একসাথে থাকেন। রোহানের বাবার সম্পর্কে আরো নানা তথ্য পান তারা। যেসব মোটেও ভালো নয়।

এমন একটা ফ্যামিলির ছেলের সাথে তাদের মেয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে এটা মানতে পারলেন না হালিমা বেগম। তিনি রোহানের পরিবারের কাছে নালিশ পাঠান৷ রোহানের বড় ভাই এসবের জন্য তাকে প্রচুর মারলেন।
আর এদিকে রিশা কে নানাভাবে চাপ দিতে থাকে এসব থেকে বেরিয়ে আসতে। তাকে ঘর বন্দী করা হয় অবশেষে।
কিছুছিন পর রিমার আকদ হলেও অনুষ্ঠান করে তুলে নেওয়া হয়নি তাকে। অসুস্থ শরীর নিয়েই রিশাকে স্কুলে নিয়ে যেতে থাকে হালিমা বেগম।

রোহানের সাথে তার সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

অষ্টম শ্রেণিতে উঠার পর হঠাৎ রিশার শরীর খারাপ হয়ে যায়। সারাক্ষণ সে রোহান রোহান করতে থাকে।
ডাক্তার বাধ্য হয়ে জানালেন, যে ছেলেটির নাম রিশার মুখে লেগে আছে তার সাথে সময় কাটাতে দেওয়া হোক তাকে। মানসিক সমস্যায় ভুগছে রিশা৷ এই সময় রোহান কে তার পাশে প্রয়োজন।

বাধ্য হয়ে রোহানকে বাসায় আসতে দেন হালিমা বেগম ও রিমা। রিশাকে ঘুমের মেডিসিন দেয়ার মাধ্যমে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয় বেশিরভাগ সময়। নাহলে সে পাগলামি করে বাড়ি মাথায় তুলে রাখে। এখন রোহান প্রায় রিশাকে সময় দেয়। অনেকসময় রিশা ঘুমিয়ে থাকে, রোহান তার পাশে বসে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। রিশার কাছে ফোনও থাকে এখন। যখন খুশি সে রোহানের সাথে ফোনে কথা বলে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখন, যখন সে সুস্থ হয়ে উঠল। রিশাকে সুস্থ করতেই রোহানকে ব্যবহার করে তার পরিবার। রিশা সুস্থ হয়ে উঠলেই তার ফোন নিয়ে ফেলা হয়। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। রিমা তার জন্য পাত্র ঠিক করে। তারা ঠিক করলো, এভাবে আর নই। ওই ছেলেকে তারা কিছুতেই মেনে নিবেন না। রিশার বিয়ে দিয়ে দিবেন যত দ্রুত সম্ভব।

এক বিকেলে রিশা ঘর থেকে পালিয়ে গেল। বাইরের দোকান থেকে রোহান কে ফোন করে দেখা করতে বলল। রোহান আসলে সে জানালো, সে রোহানের সাথে থাকতে চায়। রোহান এতে রাজি হলো না। তাকে বুঝিয়ে বাসায় নিয়ে আসলো।
হালিমা বেগমের হাতে রিশাকে তুলে দিয়ে

বলল-
আমরা এমন কিছু করতে চাইনা যাতে আপনাদের সম্মানহানি হয়। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। এখন পড়াশোনা করি দুজনে। মাঝেমধ্যে নাহয় দুটো কথা বলব! আমার পড়াশোনা শেষ হলে বিয়েটা দিবেন। এভাবে আমাদের এখন আলাদা করে কষ্ট দিবেন না প্লিজ।

হালিমা বেগম বললেন-
সম্ভব নয়। মরে গেলেও মেয়েকে তোমার সাথে দিব না। যত দ্রুর পারি ওর বিয়ে দিব অন্য কারো সাথে।
-আমি কোন দিকে খারাপ?

-তুমি খারাপ নও। কিন্তু তোমার পরিবার আমার পছন্দ না। রিশাকে ভুলে যাও।

মায়ের কাছে এসে কান্নাকাটি করে বলতে থাকে রিশা-
আমরা এখন কিছু করব না৷ কিন্তু আমার বিয়ে অন্য কোথাও দিও না। রোহানের সাথেই দিও।

হালিমা বেগমের মন গললো না। তিনি রোহান কে চলে যেতে বললেন।
আজও রিশাকে মার খেতে হলো বোনের হাতে এই অপরাধে। বাড়ি ছেড়ে বের হবার জন্য হালিমা বেগমও প্রচুর মারলেন তাকে।

এতে করে বোন ও মায়ের প্রতি আরো ঘৃণা তার মনে জন্ম নিলো।
রোজার মাস চলে আসলো। রিশা কোনো কেনাকাটা করলো না রাগ করে। এখন রোহান বাড়ির আশেপাশেও আসতে পারেনা। কেউ যদি তাকে দেখে রিশাকে মারে, এই ভয়ে!
ঈদের দিন রিশাকে বাড়ির বাইরে যেতে দেওয়া হলো না। রিশা কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে ফোন খুঁজতে লাগলো। অবশেষে বোনের ফোনটা পেয়ে গেল সে। বোনের ফোন থেকে রোহান কে কল করে জানালো, বাড়ির সামনের রাস্তাটায় আসতে দ্রুত।

রিশাও বাড়ি ছেড়ে বের হতে থাকল। তাকে আটকালো রিমা। সে বাড়ির বাইরে গেলে খুব খারাপ হবে বলল। রিশা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলে হালিমা বেগম ভয় পেয়ে যান। তার শরীর খারাপ হবে বলে রিমা কে আটকান তিনি। রিশা খুশিমনে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। কিন্তু আসলো না রোহান। প্রায় ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করার পর বাসায় ফিরে আসলো সে। হালিমা বেগম তাকে জানায়, এলাকার ছেলেদের দিয়ে রোহানকে মারা হয়েছে। তাই সে এসে পৌঁছতে পারেনি।
একথা শুনে রিশা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

হালিমা বেগম তার পাশে এসে বললেন-
এখন থেকে এটাই চলবে। তুই ভুল করবি আর শাস্তি পাবে রোহান। ওর পরিবারের ক্ষমতা নেই আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলার। উল্টো নিজের পরিবার থেকেও অপমানিত হবে রোহান। এখন তুই বুঝ, তুই কি করবি।

রিশা ঘাবড়ে যায়। তার মাথায় এখন একটা বিষয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে। আর সেটা হলো, রোহান কষ্ট পাচ্ছে। বাইরের ছেলেদের কাছে মারও খাচ্ছে!

চোখ জোড়া মুছে মায়ের পায়ের কাছে বসে রিশা বলল-
তুমি প্লিজ রোহান কে কষ্ট দিও না। আমি আর এমন করব না।

হালিমা বেগম বুঝতে পারলেন, এটাতেই কাবু করা গিয়েছে তার মেয়েকে।
তিনি রিশাকে ভরসা দিলেন, তার কথা রাখলে তিনি এমন কিছুই করবেন না। এবং বললেন তাদের পছন্দের ছেলেটির সাথে বিয়েতে রাজি হতে। ছেলেটি ভালো রাখবে তাকে। রিশা রাজি হলো মায়ের কথায়। তিনি খুশি হয়ে মিষ্টি আনার ব্যবস্থা করলেন।
সাথে সাথেই ছেলের বাসায় ফোন করলেন। তারা জানালেন, ছেলের বড় ভাই বিদেশ থেকে না আসা অবধি কোনো আয়োজন তারা করতে পারবে না।
হালিমা বেগমের তাড়া কিসের জানাতে পারলেন না তিনি।
সেই থেকে রিশা তাদের কথামতো চলতে শুরু করে। সামনে জেএসসি পরীক্ষা বলে ক্লাসও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না। তবে তার মায়ের সাথে স্কুলে যায় সে।
বান্ধবীদের মাধ্যমে রোহানকে তার কাছে আসতে নিষেধ করে।
এভাবে কি চলা যায়? ভালোবাসার মানুষটার সাথে একটা দিন কথা না বলাও যে কষ্টকর! রোহান পারলো না নিজেকে সামলাতে। রিশার বান্ধবীর মাধ্যমে তাকে স্কুলের পেছনে আসতে জানিয়ে দেয়। রিশার মাও স্কুলে উপস্থিত আছে। তবুও মাকে ফাঁকি দিয়ে সে পেছনদিকে আসলো।
রিশা আসলে তার এরূপ ব্যবহারের কারণ কি সে জানতে চায়। তাকে সবটা খুলে বলল রিশা। সব শুনে রোহান বলল-
আমরা কি চেয়েছি? একটু কথা বলতে, শান্তিতে দিন পার করতে দুজনে। কিন্তু তোমার মা বোন আমাকে মেনে নিবেনা কখনো জানিয়ে দিয়েছেন। তোমাকে নানাভাবে প্রেসার দিচ্ছে তারা আমার কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য। ভয় লাগালেন আমাকে মারবে বলে! এখন আবার তোমার বিয়েও দিতে চায় তারা!

আমি শত মার খেয়েও তোমার সাথে এক মিনিট কথা বলতে রাজি। তুমি প্লিজ এভাবে দূরে থেকো না আমার থেকে। বিয়ে টা করিও না তুমি। আমাকে ছাড়া ভালো থাকবে বলো তুমি?

রিশা কেঁদে ফেললে তাকে শান্তনা দিলো রোহান। রিশা জানালো সেও ভালো নেই কিন্তু কিইবা করার আছে?
রোহান বলল-
অবশ্যই করার আছে। আমরা পালিয়ে যাই। ওরা আমাদের বুঝেনি আমরা কেন বুঝব! সেদিন তোমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছি কিন্তু আজ বলছি, চলো আমরা দূরে কোথাও চলে যাই।

রিশাকে নিশ্চুপ দেখে রোহান বলল-
কিছু তো বলো!

চোখের পানি মুছতে মুছতে রিশা বলল-
আমিও আর পারছি না এভাবে দূরে থাকতে তোমার কাছ থেকে। ঠিকই বলেছ, ওরা আমাদের বুঝেনা। আমি যেতে চাই তোমার সাথে। নাহলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে হবে আমার। চলো পালিয়ে যাই

পর্ব ৩

পালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও হুট করে পালালো না তারা৷ কারণ রোহান বা রিশার হাতে পর্যাপ্ত টাকা পয়সা নেই। আর এভাবে কোথায় বা যাবে তারা!

রোহান তাকে বলল, কিছুদিন অপেক্ষা করা হোক। টাকার ব্যবস্থা করা হোক, তারপর যাওয়া যাবে।
রিশা বলল, সে টাকা দিতে না পারলেও অন্যান্য জিনিস দিতে পারবে। যেমন:কাথা,কম্বল,প্লেট,গ্লাস,চামচ ইত্যাদি।
রিশার কথা শুনে রোহান হেসে বলল-
এসবও একটা খরচ! তুমি আসলেই পারবে দিতে?

-হ্যাঁ। প্রতিদিন কাউকে দুপুরের টাইমে বাড়ির পেছনে পাঠিও। আমি তাকে দিয়ে দিব। তুমি জমিয়ে রেখ।

রিশার কথায় অমত পোষণ করলো না রোহান। এই ছাড়া আর উপায় নেই।
রোহান আরো বলল-
এখন থেকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। কেউই যেন না বুঝে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে।
রোহান কে ভরসা দিয়ে বিদায় জানিয়ে রিশা চলে গেল।

এভাবে বেশ কিছুদিন ধরে নিজের ঘর থেকে জিনিসপত্র চুরি করে ছাদে লুকিয়ে রাখছে রিশা। রোহান নিজে এসেই সুযোগ বুঝে নিয়ে যায় এসব। রিশা নিজের ব্যবহারের জিনিসই দিচ্ছে বলে তার পরিবারের কেউ টের পায়নি এসব।
প্রায় বেশকিছুদিন যাওয়ার পর স্কুলের পেছন দিকে এসে রোহানের সাথে দেখা করলো রিশা।
রোহান হতাশ হয়ে জানালো, সে বেশি টাকা জোগাড় করতে পারেনি। নিজের কম্পিউটার বিক্রি করে কিছু টাকা পেয়েছে। নিজের কানে থাকা স্বর্ণের দুলগুলো খুলে রোহানের হাতে দিলো রিশা। এগুলো বিক্রি করে টাকা নিতে বলল।

উপায় ছিল না বলে এটাও করতে রাজি হলো রোহান।
ঠিক করলো পরেরদিনই তারা পালাবে। রিশার সামনে জেএসসি পরীক্ষা আর রোহান দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। এই সময়ে পড়ালেখার খেয়ালই নেই তাদের মাথায়। দুজন দুজনকে হারানোর ভয়ে ব্যকুল হয়ে আছে। বেঁচে থাকলে পড়াশোনা আবার হবে এই ভেবে দুজনে পাড়ি দিলো নারায়নগঞ্জের উদ্দেশ্যে। রোহান আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। তার বন্ধুর মামাতো ভাই এর বাসায় যাচ্ছে তারা।

সারাপথে রিশা কেঁদেছে। প্রিয়জনদের ছেড়ে এভাবে যেতে তার ভালো লাগছে না। কিন্তু রোহানও তার প্রিয়জন! এটা তারা বুঝলো না। নারায়ণগঞ্জ এ বন্ধুর কাজিনের বাসায় এসে আত্নগোপন করে রিশা ও রোহান। রিশার বাড়ির কি অবস্থা সে জানে না। তবে এখানে এসে রোহান রিশার বাড়িতে ফোন করে জানালো, তারা পালিয়েছে এবং ভালোই আছে। খুঁজে লাভ নেই। তারা খুব দ্রুত বিয়ে করতে চলেছে।

এতটুকুই বলে ফোন বন্ধ রাখে রোহান। তিনদিনের মাঝে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। কাজি অফিসে গিয়ে বন্ধুর কাজিন ও তার বউকে সাক্ষী করে বিয়েটা সম্পন্ন করা হয়। এরপর তাদের মাধ্যমেই একটা বাসা ভাড়া নেয়। একরুমের ছোটখাটো একটা বাসা নেয় তারা। রিশার প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে তাই তেমন কিছু কিনতে হয়নি তাদের।

নিজের বাড়িঘর, পরিবার ছেড়ে এই ছোট্ট রুমটিতে থাকতে হচ্ছে রিশার। তবুও সে রোহানের উপরে রাগ করলো না। রোহান পাশে আছে বলেই রিশা অনেক সুখে আছে।
কিন্তু বিপত্তি ঘটলো কিছুদিন পরে, যখন রিশার বাসায় ফোন করে রোহান জানতে পারলো তারা তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অনেকটা হতাশ হয়ে পড়ে রোহান। তার উপর

তাদের টাকা শেষ হয়ে আসলো। অপরিচিত একটা শহরে মাত্র ১৭-১৮হাজার টাকা নিয়ে এসেছিল তারা। আর কতদিন বা চলবে এই টাকা নিয়ে! রোহান কাজের সন্ধানে ঘুরতে থাকে। মাস শেষ হয়ে আসলেও কোনো কাজ জোগাড় করতে পারলো না রোহান।

তখন রিশা বাধ্য হয়ে তাকে জানায়, সে গার্মেন্টসে কাজ করতে চায়। ক্লাস ৭ পাশ নিয়ে অন্য কোনো কাজ সে পাবে না।
রোহান এতে রাজি না হলে জোরাজোরি করতে থাকলো রিশা৷ তখন রোহান জানায়, তবে সেও করবে৷
ফেইক সার্টিফিকেট বানিয়ে দুজনে স্যুর টু স্যুর পোশাক কারখানায় আসলো।

অনেক মানু্ষের ভিড় এখানে। তা দেখে ঘাবড়ে যায় রিশা। রোহান তাকে অভয় দিলো। কিন্তু তাদের কারসাজি ধরা পড়া গেল। রিশা লম্বা হলেও যে ছোট এটা তাদের বুঝতে বাকি রইলো না। রিশা ও রোহান কে চলে যেতে বললেন তারা৷ রিশা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এই কাজটা তার প্রয়োজন তা বোঝানোর চেষ্টা করে। রিশার পরিচয় জানতে চায় তারা। ভাগ্যক্রমে ওখানের তিনজনই চট্রগ্রামের। এবং রিশার এলাকারই একজন আছে। রিশাকে কাজ দিতে রাজি হয় তারা। কিন্তু রোহান কোনো কাজ পেল না। এখানে ছেলেদের জন্য কাজ নেই আপাতত।

রিশা কাজ পেল কাটিং সেকশন এ হেল্পার হিসেবে। অন্য কোনো বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা ছিল না। এতেই খুশি সে। রোহানকে নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরে এল। কিন্তু পরেরদিন থেকে শুরু হলো তার অভিশপ্ত দিনগুলো।
সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে ঘরের কাজ সামলানো। ৭টায় কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া। সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা অবধি দাঁড়িয়ে কাজ করা। এভাবে দাঁড়িয়ে কাজ করতে করতে পায়ের পাতায় দাগ পড়ে গিয়েছে ছোট মেয়েটির।
রাত ১০টায় বাড়ি ফিরে গোসল সেরে, রান্না করে রোহান কে সময় দিয়ে ঘুমোয় সে। ঘুমোতে ঘুমোতে রাত ২-৩টা বেজে যায়। সেই আবার সকাল ৬টায় উঠতে হয়!

মায়ের কাছে থাকা আদরের মেয়েটি এসব করতে করতে চেহারাটাও খারাপ করে ফেললো। রোহান প্রায় তার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে। ভালো থাকার জন্যই তো এসেছিল তারা। আদৌ কি ভালো আছে! রিশার মতে সে ভালো আছে। এতকিছুর পরেও দিনশেষে রোহানের মুখটা দেখলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায় তার।
একদিন রিশা কারখানার গল্প করতে থাকলো রোহানের কাছে।

একপর্যায়ে জানতে পারলো, সে বোরকা খুলে কাজ করে।
রোহান বলল-
বোরকা কেন খুলতে হয়?
-ওখান থেকে শার্ট দিয়েছে। ওটা পরেই কাজ করতে হয়। ভেতরে জামা পরেছি, বোরকার উপরে শার্ট পরলে গরমে বেঁচে থাকব আমি?
-ওড়না নাওনি?
-হিজাব করা ছিল।
-তাই বলে ওড়না নিবে না! বুক দেখিয়ে হাঁটবে?

রোহানের কথাটি পছন্দ হলো না রিশার। এই বিষয়ে কথা কাটাকাটি হতে থাকলো দুজনের। একসময় রোহান তার গালে কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। এমন কাণ্ডে হতভম্ব হয়ে গেল রিশা। এই প্রথম রোহান তার গায়ে হাত তুলেছে! কোনো কথা না বলে সে শুয়ে পড়লো। বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদতে লাগলো নীরবে। রোহানের খারাপ লাগা শুরু করলো মনে। ছোট্ট মেয়েটি এত কিছু বুঝে নাকি!

যেদিন ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছে সেদিন দেখেছে, তার দিকে ওখানের ছেলেরা কেমন লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তাই তো রোহান এসব বলেছে, তার ভালোর জন্যই। রিশার রাগ ভাঙালো রোহান। তাকে বোঝালো, তার জন্য চিন্তা হয় রোহানের। রিশা বলল, নিজের জামার উপরে এখন থেকে রোহানের ফুল হাতের গেঞ্জি পরে থাকবে। এর উপরে শার্ট পরবে যত গরমই থাকুক না কেন। আর সে মোটেও সাজগোছ করে বের হবে না। এসব শুনে খুশিতে রিশাকে বুকে জড়িয়ে নিলো রোহান। শুধু মুখে নয়, কাজেও এসব করে দেখালো রিশা। রোহানের বাধ্য বউ হয়েই চলে সে।

এভাবে দিন কাটতে থাকে তাদের৷ ইদানীং প্রায় শরীর খারাপ থাকে রিশার। এমন এক দিনে জ্ঞান হারালো সে কারখানায়। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করে কারখানার ডাক্তার রুমে। ছুটি নিয়ে বাসায় চলে আসে সে। কিন্তু পরের দিন আবার পর পর দুবার সে জ্ঞান হারায়।

রিশার অবস্থা দেখে বসের মায়া হয়। অনেকদিনের জন্য তাকে ছুটি দেওয়া হয়। বাড়িতে রেস্ট নিয়েও যখন রিশা ঠিক হচ্ছেনা, রোহান তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসলো। আর এখানেই জানতে পারলো, রিশা মা হতে চলেছে। রিশার জন্য রোহানকে পাওয়ার পর এটিই হলো খুশির সংবাদ। সে অনেকবেশিই খুশি। রোহান আর তার অংশ এই পৃথিবীতে আসতে চলেছে! এর চেয়ে বেশি খুশির খবর আর কিইবা হতে পারে?

তবে রোহান খুশি নয়। হয়তো ভয়, হয়তো বাচ্চাটি সে চাচ্ছেনা, হয়তো বা রিশার বয়স নিয়ে ভাবছে।
কিন্তু রিশা ঠিক করলো, বাচ্চাটিকে দুনিয়ার আলো সে দেখাবে। রিশার খুশি দেখে রোহানও আর না করলো না। তারা সুখে দিন পার করতে লাগলো৷ এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হবেনা জানা ছিল না রিশার। দুপুরে শরীর খারাপ বলে রিশা শুয়ে আছে। একটু আগেই ওয়াশরুম ভর্তি বমি করে এসেছে সে। রোহান তাকে বারবার বলছে, গোসল টা সেরে আসতে। শরীর খারাপের জন্য রিশা উঠতে পারছে না। রোহান এটা বুঝলো না। সে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে বলল-

সময় মতো কিছু করো না তাই তো অসুখ হয় তোমার। এখুনি গোসল করে আসো। ভালো লাগবে।

এরপরেও রিশা না উঠলে ক্ষেপে যায় রোহান। আচমকা শোয়া থেকে রিশাকে তুলে মারতে থাকলো সে। রোহান এই সামান্য বিষয়ে তার গায়ে হাত তুললো! এটা মানতে পারলো না রিশা। কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারালো সে। জ্ঞান ফিরে দেখলো, তার পাশেই বসে রোহান সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে ব্যস্ত। সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য হয়না রিশার৷ দৌঁড়ে সে ওয়াশরুমে এসে বমি করে ফেলে।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রুমের দিকে গেল না রিশা। রান্নাঘরেই পা টেনে বসে থাকলো অভিমানে৷ আজ নিজের মাকে ভীষণ মনে পড়ছে তার। অসুস্থ শরীরে তার মা কখনো তার গায়ে হাত তুলেনি।
কিছুক্ষণ পর এসে রোহান ক্ষমা চায়৷ রিশার রাগ ভাঙিয়ে রুমে নিয়ে আসে তাকে৷ রিশা ভাবলো, মানুষের মাথা অনেকসময় খারাপ হয়ে যেতেই পারে৷ রোহান আর এমন করবে না। কিন্তু রিশার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। ছোট ছোট বিষয়েও রোহান রিশার গায়ে হাত তুলতে থাকে, তার সামনে বসেই সিগারেট খেতে থাকে। এমন কি বন্ধুর কাজিন ও তার বউ এর সামনেও রিশাকে মারতে দ্বিধাবোধ করেনি সে।

দেখতে দেখতে ছুটি শেষ হয়ে যায় রিশার। কিছুদিন কাজের পর রিশার ইচ্ছে হলো রোহানের সাথে ঘুরতে যাবে সে। ইচ্ছের কথা রোহান কে জানালে সেও রাজি হয়। তারা ঠিক করলো একসাথে রাতের খাবার খাবে বাইরে কোথাও। তাই রিশা ২ঘন্টা আগে কারখানা থেকে বের হবার জন্য বসের কাছে ছুটি চায়। বস ছুটি দিলো না। তবে জানায়, সে যদি দুই ঘন্টার কাজ আগে সেরে ফেলতে পারে তবে আগেই বের হতে পারবে।

রিশা রাজি হয় এতে। অনেক কষ্টে কাজ শেষ করে বাসায় আসে সে। রোহান তাকে দশ মিনিট অপেক্ষা করতে বলে বেরিয়ে পড়ে৷ সে বাসায় ফিরলো অনেক রাতে। রিশার রাগ হলো অনেক। কার জন্য আজ এত কষ্ট করে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলো সে! এই প্রথম রিশা রাগ দেখালো। চেঁচামেচি শুরু করলো সে। এটাও রোহান সহ্য করতে পারলো না। আবারো গায়ে হাত তুললো তার। আর এবার অনেক বেশিই মারধর করলো রিশাকে। এমনকি লাথি মারতেও ছাড়লো না।
এসবের পরেও যখন রিশাকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নেয় রোহান, সে সব ভুলে যায়। ভালোবাসায় এতটায় ডুবে যায় চৌদ্দ বছরের মেয়েটা, মার-লাথি খেয়েও রোহানের সাথে থেকে যায় সে!

একদিন কারখানায় কাজে ভুল হওয়াতে রিশাকে তার বস জারজ সন্তান বলে গালি দেয়। রিশা কান্না আঁটকাতে না পেরে সবার সামনেই কেঁদে ফেলে। তার মা বাবা হজ্জ করেছে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাঝে একজন তার বাবা। এই কথাটি সহ্য হলোনা তার৷ বস রিশাকে ভালোই বাসতেন। মাথা খারাপ থাকাতে এটা বলে ফেলেছেন। তিনি অনুতপ্ত হয়ে রিশাকে ছুটি দিয়ে দিলেন। রিশা বাসায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়লো। ভীষণ জ্বর তার শরীরে। জ্বরের কারণে কয়েকদিন যাওয়াই হলো না কাজে৷

রোহান তার অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নিলো চট্রগ্রাম ফিরে আসবে। কিন্তু রিশা ভয়ে রাজি হলো না।
চট্রগ্রাম থেকে আসার পরে একবারের জন্যও মায়ের সাথে কথা বলেনি রিশা। মাঝেমধ্যে রোহান কথা বলেছে। হালিমা বেগম যতবার কথা হয়েছে, ততবারই বলেছেন ফিরে আসতে। তারা মেনে নিবেন তাদের। কিন্তু রিশা যায়নি।
রিশার শরীর খারাপ দেখে ভয় পেয়ে যায় রোহান। ফোন করলো হালিমা বেগম কে। রিশার সাথে কথা বলতে দিলো তাকে। দুইমাস পর মা মেয়ে কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে৷ তিনি রিশাকে অভয় দিলেন। বললেন, ফিরে যেতে। মায়ের কথায় গলে যায় রিশা। রাজি হয়ে যায় সে। চট্রগ্রাম ফেরার বন্দবস্তও করা হয়। কিন্তু একটা ভয় তার মনে থেকেই গেল। তার মা সত্যিই কি মেনে নিবেন তাদের? নাকি শুরু হবে নতুন ঝামেলা

পর্ব ৪

অবশেষে চট্রগ্রাম আসলো রোহান ও রিশা। রোহান নিজের বাসায় নিয়ে আসলো রিশাকে। এরপর একাই রিশার বাসায় আসলো তার মা বাবার সাথে দেখা করতে৷ হালিমা বেগম নিজের হাতে হরেকরকমের রান্না করেছেন রিশার জন্য। রোহানের পাশে রিশাকে না দেখে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন। এরমাঝে রিমারও বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে যায়। আর তাই তাদের বাবা বিদেশ থেকে এসেছিলেন। ছোট মেয়েকেও নানা জায়গায় খুঁজেছেন এতদিন। আজ অধির আগ্রহে মেয়েকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। রোহানকে একা দেখে পুরুষ হয়েও তিনি কেঁদে ফেললেন। রোহান তাকে শান্তনা দিয়ে বলল, রিশা ঠিক আছে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন, মামলা তুলে নেওয়া হবে। রিশাকে যেন নিয়ে আসে। এরপর হালিমা বেগম সব খাবার প্যাকিং করে রোহানের হাতে দেয়। বললেন, রিশাকে এসব খাওয়াতে। আর তাড়াতাড়ি যেন তাকে নিয়ে আসে।

রিশার জন্য তার পরিবারের এত ভালোবাসা দেখে রোহান খুশি হয়। দেরী করলো না সে এই বাড়িতে তাকে নিয়ে আসতে। হালিমা বেগম ও রিশার বাবা রোমান আলম কোনো কটুকথা শোনালেন না মেয়েকে। রিশাকে পেয়ে তারা এতটাই খুশি হলেন যে, রোহানকেও এখানে থেকে যেতে বললেন। রোহানের বাসায় তাদের মেনে নেয়নি। যেহেতু রোহান এখনো রোজগার করেনা। তাই এই বয়সে বিয়ে করাটা মানতে পারেন নি তারা। বাধ্য হয়ে রোহানকে ঘরজামাই হিসেবে থাকতে হয় এখানে।

রোহানকে নিজের রুমে নিয়ে আসলো রিশা। তাকে জড়িয়ে ধরে বলল-
দেখেছ আমার আম্মু আব্বু কত ভালো? সবটা মেনে নিয়েছে।

রিশার কপালে চুমু খেয়ে রোহান বলল-
আগে আসলে এতদিন এত কষ্ট করতে হত না তোমায়।
-যা হবার হয়েছে। এখন ওসব বাদ দাও।
-হু।
-বাসায় গিয়ে তোমার আমার জিনিসপত্র নিয়ে এসো।

রিশার কথামতো জিনিসপত্র আনতে সে গেল কিন্তু নিজের কাপড় ছাড়া কিছুই আনতে পারলো না। এটার কারণ কি জানতে চায়লে রোহান বলল-
ফকিরের মতো আচরণ করছ কেন?

রোহানের কথা শুনে অবাক হলো রিশা। সে রেগে বলল-
আমার আব্বু আমার জন্য বিদেশ থেকে কম্বল, চাদর এনেছিল। আমার বোন আমার জন্য অনেক শখ করে নকশি কাঁথা টা করেছিল। আমার মায়ের নিজের হাতে কেনা প্লেট,চামচ ইত্যাদি ওসব। আমার জিনিস আমি চেয়ে ফকিরনী হয়ে গেলাম!

দরজা বন্ধ করে দুজনে কথা কাটাকাটি করতে থাকলো। একপর্যায়ে রিশার গালে থাপ্পড় বসিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল রোহান।

রিশা মুখে হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো। দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো সে। রোহানের এই রূপ সম্পর্কে তার বাসায় জানতে দেওয়া যাবে না।

একটু পরে তার রুমে এসে হালিমা বেগম জানালেন, সামনে তার জেএসসি পরীক্ষা। সে যেন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়।

রিশা অবাক হলো। কারণ সে টেস্ট পরীক্ষা দেয়নি। হালিমা বেগম বললেন, তিনি সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন শিক্ষকদের সাথে কথা বলে। তার মন বলেছে তার মেয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে।
কিন্তু এতদিন পড়াশোনা করেনি বলে পরীক্ষা দিতে রাজি হলোনা রিশা। হালিমা বেগম বললেন-
ফেল করলে করবি! তবুও পরীক্ষা দিবি। আজ থেকেই পড়াশোনা শুরু কর।

মায়ের কথায় রিশা পড়াশোনায় মন দিলো। তার পরীক্ষা শুরু হয়। তারা এখানে থাকলেও রোহানের পরিবারের সাথে মাঝেমধ্যে কথা হয় তার।
রিশা প্রায়ই নিজের জিনিসগুলোর কথা রোহানকে বলে। কারণ ওসব তার প্রিয়। রোহান তাকে জানালো, এসব খুঁজে আর লাভ নেই। ব্যবহার করছে তার পরিবার।

হতাশ হয়ে রিশা এই বিষয়ে আর কথা তুলেনা। রোহান তো তার পাশে আছে, জিনিস নাহয় যাক।

পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে রেজাল্ট এর দিনও চলে যায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, রিশা ৪৫৬ পেয়েছে। রিশার খুশির সীমা নেই। কিন্তু তার খুশিতে খুশি হতে পারলো না রোহান। কারণ তার ছোট বোন পিএসসি তে কোনোমতে পাশ করেছে। রিশা এটা নিয়ে রোহানকে মন খারাপ করতে নিষেধ করলে রোহান উল্টো ক্ষেপে যায়। সে রিশার সাথে বাজে ব্যবহার করে। এবার রিশারও খারাপ লাগে। সে চেঁচামেচি করে শুরু থেকে রোহান তার সাথে কি কি অন্যায় করেছে সব বলতে থাকলো। একসময় রিশা বলেই ফেলল-
আমার পেটে তোর বাচ্চাও আছে। তাও তুই আমাকে ভালোবাসিস না। না বাসলে বাচ্চা দিলি কেনো পেটে? কেনো করলি বিয়ে?

হালিমা বেগম রুমের পাশে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলেন। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। তিনি ভেবেছিলেন তার মেয়েটা সুখে আছে। আর এখন কিনা এসব শুনছেন!
আর বাচ্চা? চৌদ্দ বছরের মেয়ে রিশা। যে কিনা নিজেই বাচ্চা, তার পেটে বাচ্চা আছে! এটা মানা যায় না।

হালিমা বেগমের শরীর কাঁপতে থাকে। প্রেসার লো হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ছোটখাটো একটা ঝড় বয়ে যায় রিশার পরিবারের উপরে।

রিশার পরিবার ও রোহান বোঝানোর চেষ্টা করে রিশাকে, এবরশন করানোর জন্য। রিশা ভয় পেয়ে যায়৷ সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা এখন। কারো হাতে কিছু খেতেও পারেনা। তার পেটে বাচ্চা এসেছে তিনমাস শেষ হতে চললো। মায়ের জোরাজোরিতে সে ডাক্তারের কাছে এল। ডাক্তার বললেন, এবরশন এর সুযোগ নেই এখন। তবে রিশা বেশ দূর্বল। তার ওজন ৩৫এর নিচে। রিশার এখন অনেক বেশিই যত্ন করতে হবে সবার।
কথাটি মাথায় নিলেন হালিমা বেগম ও রোহান।

অতিরিক্ত মেডিসিন দেওয়া হলো রিশাকে। কারণ তার শরীর বাচ্চা বহন করার অবস্থায় নেই। এদিকে এবরশন করাটাও ঝুঁকি।

রোহান ও হালিমা বেগম রিশার যত্ন নিতে শুরু করলেন।
রিশাকে সারাক্ষণ কিভাবে খুশি রাখা যায় এটাই চেষ্টা করেন তারা। রিশাকে গোসলটাও একা করতে দেয়না। বেশি মেডিসিন নেওয়ার ফলে রিশার পায়ে জ্বালাপোড়া করে। রোহান কাপড় ভিজিয়ে তার পা মুছে দেয় দিনে বেশকয়েকবার।

সারাক্ষণ রিশার চারপাশে নানাধরনের খাবার থাকে। আর সবচেয়ে বেশি যেটা খায় সে, তা হলো আচার। আচার খাওয়ার সময় রোহানও এসে যোগ দেয়। রিশা বলে-
তুমি আমার আচারে ভাগ বসাচ্ছ কেনো?
-বারেহ! তুমি মা হলে আমিও বাবা হব! আমারো খাওয়া উচিত।

সবমিলিয়ে রিশা অনেক ভালো আছে। কেউ দেখলেই হা করে তাকিয়ে থাকে, এত যত্ন কেউ পায়!
রিশার প্রেগন্যান্সির যখন সাত মাস তখন রোহান উপলব্ধি করলো, তার কিছু করা উচিত। কিন্তু এই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভালো কোনো চাকরি সে পাবেনা। তাই হালিমা বেগম ব্যবসার জন্য তাকে চল্লিশ হাজার টাকা দেন। ওই টাকা দিয়ে সে ডিমের ব্যবসা শুরু করে।

ব্যবসার কাজে প্রায় বাইরে থাকতে হয় রোহানকে। একদিন রিশা খেয়াল করলো তার ফোনে দুটো সিম৷ এবং সে রবি চার্কেল ব্যবহার করে। গোপনে এসব করার কারণ কি সে রোহানকেই জিজ্ঞাসা করে। রোহান চায়লেই ভালোভাবে উত্তর টা দিতে পারতো। কিন্তু সে বলল-

দশটা সিম ইউজ করব, তোর কি?

তার উত্তর শুনে রিশা চেঁচিয়ে বলল-
অবশ্যই আমার কিছু। তুই পারবি না এসব করতে।

রিশার এই কথা শুনে রোহান তাকে জোরে আঘাত করে ধাক্কা মারলো। ধাক্কা সামলাতে না পেরে রিশা মেঝেতে পড়ে যায়৷ ধাক্কাটি এতটায় জোরালো ছিল যে, রিশার বাচ্চাটি তার পেট থেকে বুকের হাড্ডিতে এসে লেগে যায়।
জ্ঞান হারিয়ে রিশা পড়ে থাকা স্বত্তেও রোহান তার পাশে এল না। হালিমা বেগম রোহানের গালে কষে থাপ্পড় মেরে তার পরিবার কে নিয়ে আসতে বললেন।

পাশেই এসব বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ মহিলা আছে, তাকে ডাকা পাঠালেন। তিনি এসে রিশার বুকের হাড্ডি টেনে বাচ্চাটি বের করলেন। এর ব্যাথায় জ্ঞান ফিরলো রিশার। ডাক্তারের কাছেও আনা হলো তাকে। সে সুস্থ আছে বললে তাকে নিয়ে বাসায় ফিরে হালিমা বেগম। বাসায় এসে রোহানের দুই মাকে দেখতে পান। তারা রিশার খবর না নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দেন। বলতে থাকেন, আরেকটু হলেই হালিমা বেগম মেরে ফেলতেন রোহান কে।
এসব দেখে রিশা রেগে যায়। হালিমা বেগম রিশাকে আগেই বলেছেন, কেন সে রোহানের গায়ে হাত তুলেছেন।
রিশা রোহানকে বলল, তার দুই মাকে সাথে নিয়ে এই বাড়ি থেকে চলে যেতে। সেও যেন আর কখনো না আসে।
রোহান নিজের ব্যাগ গুছিয়ে মায়েদের সাথে বেরিয়ে পড়ে।

তবে বেশিক্ষণ রিশাকে ছাড়া দূরে থাকতে পারলো না। মামাতো ভাইকে নিয়ে এবাড়িতে এসে রিশার মায়ের কাছে ক্ষমা চায়লো। রিশার কাছেও ক্ষমা চায়। এই ঘটনার জন্য রোহান অনেক লজ্জিত। মাথা তুলেও রিশার সাথে কথা বলতে পারছে না সে। রিশার খারাপ লাগা কাজ করে। সে রোহানের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নেয়।
দুই পরিবারের মাঝেও সব ঠিক হয়ে যায়।

কিছুদিন পর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর মাধ্যমে জানা যায়, রিশার মেয়ে হবে৷ এটা শুনে রোহানের আসল মা খুশি হতে পারলেন না।
রিশারা তিনবোন। তার মা ও বাবার রক্তের গ্রুপ একই থাকার কারণে প্রথম বাচ্চা যেটি হয়েছে, পরবর্তী বাচ্চা গুলোও তাই হয়েছে।

কিন্তু রোহানের মা ভাবলেন, হালিমা বেগমের মন্দ ভাগ্য। তাই এমনটা হয়েছে। তিনি চান না রিশারও এমন হোক। তাই তিনি রিশাকে নিয়ে নানারকম জায়গায় যেতে থাকলেন। যাতে তার ভাগ্য তার মায়ের মতো মন্দ না হয়।
রিশার প্রেগন্যান্সির যখন নয়মাস তার শরীরে প্রচন্ড জ্বর আসে। ডাক্তারের কাছে নেওয়া হলে তিনি জানান, এতটুকু মেয়ে সামনের যন্ত্রণা সহ্য করতে কষ্ট হবে। তার শরীরটাও বেশ দূর্বল। রক্তেরও ঘাটতি আছে। ২৪ঘন্টার মাঝে জ্বর না কমলে তার সিজার করাতে হবে। এতে বেশ ঝুঁকি হবে। আল্লাহ এর রহমতে জ্বর কমে যায়। বাসায় আনা হয় রিশাকে। রক্ত বাড়ার জন্য মেডিসিন দেওয়া হয়।

রোহান আগের থেকেও রিশার এখন বেশি খেয়াল রাখে। সারারাত জেগে পাহারা দেয় সে রিশাকে। রোহানের এরূপ আচরণ দেখে রিশা নতুনভাবে ওর প্রেমে পড়লো। এই সময়ে মেয়েরা তো এটাই চায়! তার হাসবেন্ড তাকে ভালোবাসা দিক আরো বেশি, খেয়াল রাখুক আরো বেশি। রোহানও কোনো কিছুর কমতি রাখেনি।
ব্যবসায় লোকসান হয় রোহানের৷ হাতে কোনো টাকা নেই। এবার আর তাকে হালিমা বেগম সাহায্য করলেন না। রোহানের মা তাকে গার্মেন্টস এ চাকরি জোগাড় করে দেয়। রিশা আপত্তি জানায়৷ কারণ সে জানে এই চাকরিতে অনেক কষ্ট। কিন্তু হালিমা বেগম তাকে বুঝালেন, একটু কষ্ট না করলে রিশার কষ্ট টা সে বুঝবে না।

দেখতে দেখতে ডেলিভারির তারিখ ঘনিয়ে আসলেও রিশার পেইন উঠল না। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালো, বাচ্চার অবস্থা ভীষণ খারাপ৷ এখুনি অপারেশন করাতে হবে। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়।
অপারেশন থিয়েটারে ডুকানোর আগে হালিমা বেগম পাঁচ কালেমা পড়ে রিশার মাথায় ফু দিয়ে দিলেন। তার বাবাও দেশে নেই এখন। রিশার দু’চোখ খুঁজে চলেছে রোহান কে। যদিও রোহান ফোনেই একটু আগে বলে দিয়েছে, সে কাজে আঁটকে আছে আসতে পারবে না। কিন্তু মন তো মানেনা!

এই সময় রোহান কে যে তার পাশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করিয়েই রিশার শরীরে ইনজেকশন পুষ করা হয়।
টিভিতে সবসময় দেখতো, বাচ্চা জন্ম দেয়ার সময় মেয়েরা অনেক কষ্ট পায়। মাথাটা এদিক ওদিক করে নাড়তে থাকে।

এসব দেখে রিশা বলতো-
কষ্ট হচ্ছে ভালো কথা। মাথা নেড়ে চেড়ে এত ড্রামা করার কি আছে!

কিন্তু আজ রিশা বুঝতে পারছে এসব আসলেই কোনো অভিনয় নয়। বাস্তবে আরো বেশি কষ্ট পায়। আজ কাটা মুরগির মতো নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে করছে তার। মনেহচ্ছে কেউ জবাই করে দিয়েছে তাকে। কিন্তু শরীর অবশের কারণে নড়তে পারছেনা। তাই কেবল মাথাটায় ঝাকাতে পারছে সে।
রিশার অবস্থার অবনতি দেখে তাকে একেবারেই সেন্সলেস করা হয়।

এদিকে ডাক্তার হালিমা বেগমকে জানিয়ে দিয়েছেন, অবস্থা বেগতিক দেখলে তারা কেবল রিশাকেই বাঁচাতে চেষ্টা করবে। হালিমা বেগম করিডোরে পায়চারি করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সামনে কি হতে চলেছে এই ভাবনায় অস্থির হয়ে আছে তার মনটা

পর্ব ৫

হালিমা বেগমের কাঁধে হাত রাখলো রোহান। তিনি রোহানকে দেখে ভরসা পেলেন। রিশাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে শুনে নিজের উপর রাগ হতে থাকলো তার৷ আরেকটু আগে আসলেই সে রিশার দেখা পেত! মেয়েটা মনে কতটা কষ্ট পেল

বাচ্চার কান্নার আওয়াজ রিশার কানে বাজতে লাগলো। কিন্তু সে সাড়া দিতে পারছে না। কেবল কান্নাই শুনে যাচ্ছে।
জ্ঞান ফিরছেনা বলে ডাক্তার ব্যস্ত হয়ে পড়লো। অনেকক্ষণ পরেই জ্ঞান ফিরলো রিশার। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগলো। নার্সকে ইশারায় ডেকে বাচ্চার কথা জানতে চায়লে সে বলল-
তোমার খুব সুন্দর একটা পরী হয়েছে। এবং সে সুস্থ আছে।

কথাটি শুনে রিশার যন্ত্রনা যেন কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে। পাশের দোলনায় বাচ্চাটি রাখা আছে। দূর থেকেই লম্বা, ফর্সা পা দেখে রিশা মুচকি হেসে বলল-
ও আমার মতোই লম্বা হবে!

এভাবে রিশা পনেরো বছর বয়সে মা হয়ে যায়!
বাচ্চাটির নাম রাখা হলো মিষ্টি। দেখতে ঠিক রোহানের মতোই হয়েছে! প্রথমবার মিষ্টিকে কোলে নিয়ে রোহান কেঁদেই ফেললো!
মিষ্টি আসাতে রোহান ও রিশার সম্পর্ক মধুর হয়।
রিশার বোনেরাও রোহানকে মেনে নিয়েছে।

রোহান চাকরি থেকে এসে রিশা ও মিষ্টিকে সময় দেয়। ভালোই যাচ্ছিল দিনটা।

প্রায় মাসখানেক পর রোহানের শার্ট ধুতে গিয়ে পকেটে সিগারেট পায় রিশা। ইদানীং রিশার মাথা কারণে অকারণেই খারাপ থাকে। বেশি মেডিসিন খাওয়ার ফল হয়তো এটি। এই বিষয়ে রোহান ও তার মাঝে ঝগড়া হয়। কয়েকদিন না যেতেই রোহান রিশাকে জানায়, সে আর চাকরি করতে পারবে না। এতে কষ্ট অনেক। ব্যবসা করতে চায়। কিন্তু হালিমা বেগম টাকা দিতে রাজি হলেন না। তবে তিনি রোহানকে রবি কোম্পানিতে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। এতেও রোহানের পরিবার খুশি হলেন না। কিছুদিন আগেও যে রোহান গার্মেন্টস এ চাকরি করতো এটা তারা ভুলে গেলেন! কিন্তু রোহান এই চাকরি টা করতে লাগলো।

দশম শ্রেণিতে ভর্তি হলো রিশা। মিষ্টিকে রোহান অনেক ভালোবাসে। সেও বাবা বলতেই পাগল। কিন্তু বেশকিছু ধরে মিষ্টিকে সময় দিতে পারছে না সে।

আর রিশার সাথেও ছোটছোট বিষয়েও ঝগড়া হয়। আর এখন ঝগড়া মানেই মার খেতে হবে! রিশারও দোষ কম আছে তা নয়। ছোট ছোট বিষয় যেগুলো কথা বলে সমাধান করা যাবে, সেগুলোতেও সে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। রোহান একটা কথা শোনালে সে দশটা শুনিয়ে দেয়। এভাবে ছোট ঝগড়া বড়তে পরিণত হয় ও রোহান তার গায়ে হাতও তুলে।

একদিন হালিমা বেগম ঝগড়াঝাটির শব্দ শুনে তাদের রুমে আসলেন। তিনি দেখলেন, রিশার ঠোঁট থেকে রক্ত বের হচ্ছে। এতটায় তাকে মেরেছে রোহান!

এটা নিয়ে তিনি রোহানকে কথা শোনালে সে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে।
একটু পর রিশাই তাকে ফোন করে বাসায় আসতে বলল।
রোহান বলল আসবে সে, তবে ওই বাড়ি ছেড়ে রিশাকেও বের হতে হবে। তার মাকেই রোহান এসবের জন্য দায়ী করে।

সামনে রিশার এসএসসি বলে সে রাজি হলো না। রোহান বলল, আশেপাশেই ভাড়া নিবে। শেষমেশ রোহানের কথামতো বাসা ভাড়া নেওয়া হয়। এখন তাদের দিন ভালোই কাটছে মিষ্টিকে নিয়ে। এসএসসি পরীক্ষা চলে আসে। যদিও ভালো প্রস্তুতি ছিল না, আল্লাহ এর উপর ভরসা রেখে রিশা পরীক্ষা দিতে যায়।
এদিকে রিশার শশুরবাড়ির লোকরা তাদের পাশেই বাড়ি ভাড়া নিলো।

তাদের সাথেও আগের চেয়ে সম্পর্ক টা ভালো যাচ্ছে। তবে রোহান না থাকলে রিশা মায়ের কাছেই থাকে। তাকে কোনো রান্না করতে হয়না। রোহান অফিস থেকে আসার সময় হলে সে চলে আসে।
রিশার এসএসসি পরীক্ষা চলে আসে। অঙ্ক ছাড়া আর কোনো বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি তার। পরীক্ষা শুরু তার ২ফেব্রুয়ারী তে। রোহানের জন্মদিনও ২ফেব্রুয়ারী তে।

তার জন্য পড়ে পড়ে রিশা কেক বানালো। মিষ্টিকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এল। কিন্তু এখানে রিশার দেবর ছাড়া কেউ নেই। দেবর, মিষ্টি, রোহান ও সে মিলে কেকটা কাটলো রাত বারোটায়। সারপ্রাইজ পেয়ে খুশি হলো রোহান। ২তারিখ সন্ধ্যায় অফিস থেকে রোহানদের কক্সবাজার ট্যুরে নেওয়া হবে। সকালে অফিসের কিছু কাজও আছে। তাই রিশার সাথে পরীক্ষার হলে যেতে পারছেনা সে। এদিকে পরীক্ষার সেন্টারও বেশ দূরেই। রিশা বান্ধবীর সাথে যাবে জানায়। তবে রোহান বলল, সে পরীক্ষা শেষে নিয়ে আসবে তাকে। কথামতো পরীক্ষা শেষে রোহানের জন্য সে অপেক্ষা করতে লাগলো। হঠাৎ মনেহলো সে পিরিয়ড হয়েছে। ওয়াশরুমে এসে দেখলো তার ধারণা ঠিক।

ক্লাসমেটের বাবার কাছ থেকে রোহান কে ফোন করেও সে পেল না। পরে সে তাদের সাথেই গাড়িতে উঠে বসলো। প্রায় দশ মিনিট পরে রোহান ফোন দিয়ে জানালো, স্কুল গেইটের সামনে রিশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে। সে রিশার কোনো কথায় শুনলো না।

গাড়ি থেকে নেমে একটা রিকশা নিয়ে স্কুলটির সামনে ফিরে এল রিশা।

এদিকে পিরিয়ড হওয়াতে চিন্তা হচ্ছে তার। পেছনে কিছু লাগছে কিনা বুঝতেও পারছেনা৷ কান্না চলে আসলো রিশার। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
রোহান আসলে রিশা হেসে বলল-
আজকে আমি হারিয়ে গেলে কি হত?

যদিও রিশার রাগ আছে, আজ রোহানের জন্মদিন বলে ঝামেলা করলো না সে।
বাসায় এসে মায়ের কাছ থেকে মিষ্টিকে ও দুপুরের খাবার নিয়ে আসলো রিশা। রোহান চায়লে পারতো এই কাজটি করতে। কিন্তু সে নিজের ব্যাগ রিশা ঠিকঠাক মতো গুছিয়েছে কিনা তা দেখে যাচ্ছে।

ঠিকমতো পেটের ব্যথায় বসতেও পারছে না রিশা। অনেকক্ষণ রিকশায় বসে থাকার কারণে ব্যাথাটা আরো বেড়ে গিয়েছে। মিষ্টিও ভাত না খেয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দিয়েছে। রোহানের উপরে রাগ হচ্ছে রিশার। সে মিষ্টিকে সাথে না নিয়ে আসতে চেয়েছিল, রোহান বের হবে বলে আনতে হলো। সে কি পারতো না নিজেই খাইয়ে দিতে মিষ্টিকে!
রিশার পিরিয়ড চলছে। কোনোকিছুর দরকার হবে কিনা তাও জানতে চায়লো না সে। সবমিলিয়ে রিশার রাগ হচ্ছে। রোহান তা বুঝতে পারলো না। পিকনিকে গিয়ে কি কি করবে এসব বলতে লাগলো রোহান।

মিষ্টি মুখে ভাত নিচ্ছে না। এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে। রিশা ধমক দিয়ে তাড়াতাড়ি খেতে বলল। তা শুনে তাকে ধমকে রোহান বলল-
আমার মেয়েকে ধমকালি কেনো তুই?

রিশা এবার কেঁদেই ফেলল। সে বলল-
আমার ব্যথা সহ্য হচ্ছে না আর।

তার কান্না দেখে মিষ্টিও শব্দ করে কেঁদে ফেলল। রোহান মিষ্টির ঘাড় ধরে ধাক্কা দিয়ে বলল-
তাড়াতাড়ি পেটের মধ্যে ঢুকা সব।

মিষ্টি মেঝেতে পড়ে গেল। মুখটা তরকারির বাটির মধ্যে ঢুকে গেল। কপালের দিকে কেটেও যায় তার। রক্ত বের হতে থাকে কাটা অংশ থেকে। তা দেখে চিৎকার করে কেঁদে ফেললো রিশা। এমনটা হবে জানলে মুখ থেকে কোনো শব্দই সে বের করতো না।

তার কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেল। রোহানকে কেউ কিছু বলেনি। সে ব্যাগ নিয়ে নিজের মতো বেরিয়ে পড়লো।

রিশার মনেহলো, অনেক হয়েছে! এই রোহানের সাথে আর না। সে তার কাপড়চোপড় নিয়ে মায়ের কাছে চলে আসে। রোহান ফিরে এসে রিশাকে ডাকলে সে আসেনা৷ তাই সে মিষ্টিকে নিয়ে যায়। মিষ্টির জন্য রিশাও ফিরে আসতে বাধ্য হয়। কিন্তু এসব বিষয়ে ঝগড়া হয় তাদের৷ রিশার গায়ে আবারো হাত তুলে রোহান। সে মিষ্টিকে রেখেই মায়ের কাছে ফিরে আসলো।

তিনদিনের মাথায় জানলো, মিষ্টি অনেক কান্না করছে। মিষ্টি তার মা, বাবা ও হালিমা বেগম কে ছাড়া কারো সাথেই মিশেনা। রোহান তার মায়ের বাসায় মিষ্টিকে রেখে অফিসে যায়।

কোচিং থেকে ফিরছে রিশা। খবরটি শুনে দৌড়ে শশুরবাড়ি এল। তাকে দেখে ছুটে এল মিষ্টি। কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় তার শাশুড়ি রান্নাঘর থেকে তাকে মারার জন্য তেড়ে এলেন। অথচ একজন শাশুড়ির সে সময় উচিত ছিল তার ছেলের বউ কে বোঝানো, শান্তনা ও ভরসা দেওয়া।

রিশা তা দেখে অবাক হয়ে পেছনে সরে আসে। রোহানের ছোট বোন এসে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে ফেলে। বুকের উপর থেকে ওড়না নিয়ে মাটিতে ছুড়ে মারে।

তার দেবর এসে মিষ্টিকে নিয়ে টানাটানি শুরু করে। রিশা ও মিষ্টি দুজনেই কাঁদতে থাকে। একপর্যায়ে রিশা মেঝেতে শুয়ে পড়ে। তবুও মিষ্টিকে টেনেই যাচ্ছে তার দেবর। কিন্তু মিষ্টি কিছুতেই ছাড়তে চায়ছে না তার মাকে।
রিশার সাথে তার কয়েকজন বান্ধবী ছিল। তার চিৎকার শুনে ভেতরে এল তারা। তারাও চেঁচামেচি করে ছাড়িয়ে নিলো রিশাকে। মিষ্টিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো রিশা। রাস্তায় ওড়না ছাড়াই রিশা হাঁটতে থাকে। মিষ্টি কান্না করে করে বলছে-
আমার মাম্মার ওড়না দাও।

বাসার উঠোনের রশিতে ওড়না আছে, রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। রিশা ওড়না নিয়ে গায়ে প্যাচিয়ে মিষ্টিকে দেখালে সে কান্না থামালো। এতটুকু মেয়েটা কি বুঝেছে রিশা জানেনা। কিন্তু মায়ের প্রতি এই ভালোবাসা দেখে রিশা বুঝলো, এই বাচ্চা জন্ম দিয়ে ভুল করেনি সে।

বাসার এসে রোহান কে ফোনে সবটা জানায়। রোহান তাকে শান্তনা না দিয়ে বাজে ভাষায় গালিগালাজ করে। রিশা ফোন কেটে দেয়। পরের দিন হিসাববিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে যায় সে, মিষ্টি ও তার মাকে বোনের বাসায় রেখে। আসার সময় রোহানকে রাস্তায় দেখলো সে। তার সাথে আরো ৭-৮জন বন্ধু বান্ধব আছে। তারা রোহানকে বুঝাতে থাকে। কিন্তু সে বুঝেনা। সে রিশার উদ্দেশ্যে যা তা বলতে থাকলো। রিশাও রোহানকে অনেক কিছু শুনিয়ে দিলো। তারপর বলল-

তোমার ভাই বোন আমার সাথে কি না করেছে! ওড়নাও নিয়ে ফেলেছে আমার। আর তুমি এসব বলছ?

সাথে সাথেই রোহান সবার সামনে রিশার গালে চড় মেরে, তার বুকের উপর থেকে ওড়না টা টান দিলো। পিন দিয়ে আটকানোর কারণে টান লেগে রিশার জামাটাও ছিড়ে যায়।
সবার সামনে নিজের স্বামী বুকের ওড়না টেনে এভাবে অপমান করবে ভাবনায়ও ছিল না রিশার। অপমানবোধ করে সে চলে যায়। এটা নিয়ে এলাকায় সালিশ বসানো হয়। মুরুব্বী ও গণ্যমান্যরা বললেন, সংসার করতে ইচ্ছে না করলে করবে না রিশা। কিন্তু মিষ্টি বাবার কাছেই থাকবে।

এই হলো বাংলাদেশের সমাজ!

পরে রিশার বেহাল অবস্থা দেখে কেউ একজন বলল, এখন পরীক্ষা চলছে৷ এখন অন্তত মিষ্টি মায়ের কাছেই থাক। পরীক্ষার পর তাদের বনিবনা না হলে এই বিষয় নিয়ে আবারো সবাই বসবেন।
তারা রাজিও হয়। এভাবে রিশার এসএসসি শেষ হয়ে যায়। বোনের বাসায় থেকে রোহানকে ডিভোর্স দেয়ার সব ব্যবস্থা করে রিশা। কিন্তু একা থাকতে থাকতে রোহান নিজের ভুল বুঝতে পারলো। সে ফিরে এসে ক্ষমা চায়। ভালোবাসার মানুষের সাথে কি রাগ করে থাকা যায়? তাছাড়া রোহান তার স্বামী, মিষ্টির বাবা। তাই সে আবারো ফিরে যায়।

ওই বাসাতে অনেক খারাপ স্মৃতি আছে বলে রোহান বাসা বদলায়। একই এলাকাতেই আরেকটা বাসা নেয়।
রিশা রোহানের পরিবারের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। রোহান কাজে সফলতা পায়। রিশাও কলেজে ভর্তি হয়। সবমিলিয়ে এখন তারা ভালোই আছে।
এবারের ঈদ টা রিশার জীবনের সেরা ঈদ। নিজের হাতে সারারাত ধরে হরেকরকমের রান্না সে করেছে। রোহানও তাকে সাহায্য করেছে। মেয়ে ও রোহানের সাথে ভালো একটা দিন পার করলো সে। অনেক ভালো দিন কাটছে তাদের এখন।

ঈদের পর কলেজে যাওয়া শুরু করলো রিশা। বোরকা ও হিজাবে গেলেও তার দিকে ছেলেদের দৃষ্টি থাকে। চারদিক থেকে প্রেমের প্রস্তাব পেতে থাকে সে। রিশা সবাইকে জানিয়ে দেয়, তার বাচ্চাও আছে! এটা বলতে তার কোনো লজ্জা লাগেনা।

রোহানের বেতন বাড়ানো হয়। তার দিনকাল ভালোই কাটছে। রবি অফিসে চাকরি করে বলে বেশ কয়েকটা ফোন আছে তার।

একরাতে রোহান ও মিষ্টি ঘুমিয়ে পড়লেও রিশার ঘুম আসছেনা। এটা ওটা করতে করতে রোহানের ছোট্ট বাটন সিস্টেমের ফোনটি হাতে নিলো সে। মোবাইল চালু করে মেসেজ অপশনে যায় সে। মামা নামের একটি নাম্বার সেভ করা আছে। ওখানের মেসেজ গুলো এমন যে-
তুমি ফোন কেন ধরছ না?

আমার চিন্তা হচ্ছে। ফোন ধরো প্লিজ।

এই টাইপের আরো কিছু। বেশি মেসেজ না থাকলেও রিশার সন্দেহ হয়। মামাকে কেউ এই রকমের মেসেজ কেনো দিবে! সে নাম্বারটি লিখে রাখলো। পরেরদিন ওই নাম্বারে কল করে দেখলো, একটি মেয়ে রিসিভ করেছে। রিশা মেয়েটির সাথে দেখা করতে চায়। মেয়েটিও রাজি হয়। কিন্তু যে জায়গায় মেয়েটি আসার কথা ছিল, সেখানে গিয়েও মেয়েটিকে পায়না সে। রিশা রেগে রোহানকে সব জানায়৷ রোহান বলল সে এসব ব্যাপারে কিছুই জানেনা। রাগে রিশা তার নিজের ফোন ছুড়ে মারে।

কলেজে উঠার পর নিজের জমানো টাকায় রিশা ফোন নেয়। তার সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। শুধু কল করা, রিসিভ করা ও ইউটিউব এ বাংলা নাটক দেখায় জানতো। রোহান কিছুই স্বীকার করলো না। সন্ধ্যায় মেয়েটির সাথে ফোনে কথা বলে রিশা।

মেয়েটি তাকে জানায়, রোহান বলেছে সে স্টুডেন্ট। পাশাপাশি টিউশনি করায়। এবং বিবাহিতা এটাও বলেনি। তারা চ্যাট করতো তবে এখনো প্রেম হয়নি।
এসব রোহানকে জানালে সে স্বীকার করে। কিন্তু সে বলল, এসব করেছে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। কারণ ওই মেয়েটি তার এক বন্ধুকে ঠকিয়েছিল।

রিশা বিশ্বাস করলো এসব। মেয়েটি রিশার সাথে আবার দেখা করতে চায়লে সে গেল। মেয়েটির ব্যবহার অনেক ভালো। রিশাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে নিলো। রিশাকে দেখে মেয়েটি অবাক হয়। বারবার একটা কথায় বলতে থাকলো-
এত সুন্দরী একটা বউ রেখে রোহান এসব কিভাবে করতে পারলো!

রিশা জানতে চায়লো, মেয়েটি আসলেই কাউকে ঠকিয়েছে কিনা। সে না বললে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসে রিশা।
রোহান সব শুনে বলল, মেয়েটি মিথ্যে বলছে। রোহান শুধু বন্ধুর কথায় প্রতিশোধ নিতে এসব করেছে।
রোহানের কথায় বিশ্বাস করলো রিশা। হয়তোবা এটাই সত্যি! নাহলে বউ বাচ্চা রেখে কেনোই বা রোহান এসব করবে!
আবারো সব ঠিক হয়ে গেল।

রিশা নিয়মিত ক্লাস করে এখন। ক্লাসমেট দের ফেইসবুক ব্যবহার করতে দেখে। রোহানকে এটা সম্পর্ক জিজ্ঞাসা করলে সে জানালো, এসব সে ব্যবহার করেনা এবং রিশাও যেন না করে।
কিন্তু কিছুদিন পর দেখলো রোহানের ফোনে ফেইসবুক আইডি লগইন করা। রিশা জিজ্ঞাসা করলে সে বলে, এটা তার আগের আইডি। হ্যাক হয়েছে তাই পড়ে আছে। বেচারি রিশা কিছু না বুঝে তার বান্ধবীর কাছে জানতে চায়। বান্ধবী হেসে বলল-

তোর জামাই এর আইডি হ্যাকার ফেরত দিলো পড়ে থাকার জন্য?

বান্ধবী তাকে ফেইসবুক সম্পর্কে ধারণা দিলো। সবটা শুনে রিশা বুঝলো, রোহান তার হাতের বাইরে চলে গিয়েছে।
রিশা পাগলের মতো আচরণ শুরু করে। সে রোহানকে হারাতে চায়না। এমনকি সে রোহানকে নিজের করে রাখতে তাবিজও করে।
এতসব কিছুতেও কাজ হলোনা। রোহান রিশার এক বান্ধবীকেও ফেইসবুকে মেসেজ দিয়ে পটানোর চেষ্টা করে। সব প্রমাণ পেয়ে রিশা হতাশ হয়ে পড়ে।

তার বান্ধবীরা বুদ্ধি দিলো, সেও যেন প্রেম করে অন্য কারো সাথে। এতে রোহানের শিক্ষা হবে। রিশা রাজি হয়ে যায়। তার বান্ধবীর এক ভাই এর নাম্বার তাকে দেওয়া হয়। রিশা ফোনালাপ শুরু করে তার সাথে। সে বিবাহিতা এটাও গোপন করে। সে ঠিক করলো, ছেলেটিকে সবটা জানিয়ে সাহায্য চায়বে তার কাছে। সবটা শুনলে হয়তো সাহায্য না করে থাকবে না। দুই তিন কথা বলার পরেই ছেলেটি দেখা করতে চায় তার সাথে। রিশা রাজি হয়ে যায়। কারণ সে ফোনে বেশি কথা বলতে পারেনা। এবং ফোনে সবটা বোঝানো সম্ভবও নয়। তাই সে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যায় ছেলেটির সাথে।

পর্ব ৬

যে মেয়েটির মাধ্যমে ছেলেটির সাথে রিশার পরিচয় হয়, সেই মেয়েটি তার স্কুলের বান্ধবী ছিল। এখন একই কলেজে না পড়লেও ফোনে কথা হয় প্রায়ই। রিশা সেই মেয়েটিকে নিয়ে এল রেস্টুরেন্টে।
ছেলেটিকে দেখে রিশার রোহানের চেয়েও ভালো মনে হলো না। তার টাকা-পয়সা আছে প্রচুর কিন্তু রোহানের চেয়েও সুন্দর না। তাই সে বেশিক্ষণ না বসে চলে আসে। সেখান থেকেই কলেজে আসে সে।
কলেজে রিশার বেস্ট ফ্রেন্ড হলো পিয়াসা। দুটো ছেলে ফ্রেন্ডের সাথেও পিয়াসা ও রিশার ভালো ভাব আছে। যাদের নাম আদ্রিক ও শাফি।

পিয়াসা ও রিশা যখন তাদের কাছে যায় তারা মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। কি হয়েছে জানতে চায়লে শাফি বলল-
তোকে আমরা ভালো মনে করেছিলাম রিশা। বাট তুই বিবাহিতা হয়েও ছেলেদের সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা করিস! এইমাত্র একজন কল করে জানালো আমাদের।

কথাটি শুনে রিশা চোখের পানি লুকিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে আসে। রিশা তার ও রোহানের ব্যাপারে তাদের কিছু বলেনি। এসব মেয়ে ঘটিত বিষয় গুলো নিজের পরিবারেও বলেনি। কারণ রোহান তার নিজের পছন্দের!
তবে পিয়াসা সব জানতো। সে তাদের সবটা খুলে বলল-
রিশার এক স্কুল ফ্রেন্ড আছেনা টিনা? সে রিশাকে বুদ্ধি দিয়েছে এসব। ওই ভাইয়া টার সাথে দেখা করে, তাকে রোহান ভাইয়া সম্পর্কে সব জানানোর জন্য। তারপর তারা প্রেমের অভিনয় করে যেন রোহান ভাইয়া কে জেলাস করে। কিন্তু ভাইয়া টাকে তার পছন্দ হয়নি।

-অভিনয়ই তো করবে! তাতে পছন্দ অপছন্দের কি আছে?
-সে চেয়েছে রোহান ভাইয়ার চেয়েও বেশি হ্যান্ডসাম কাউকে। যাতে এটা দেখে রোহান ভাইয়া বুঝতে পারে, রিশা চায়লেই যেকোনো ছেলের সাথে প্রেম করতে পারে।

সবটা শুনে আদ্রিক ব্যথিত কণ্ঠে বলল-
রিশা আমাদের ফ্রেন্ড ভাবতো! বাট তার হাসবেন্ড কে নিয়ে কখনোই কিছু শেয়ার করেনি। এত দুঃখে আছে মেয়েটা!

শাফি ও আদ্রিক এসে ক্ষমা চায় রিশার কাছে।
ক্লাস শুরু হয়ে যাচ্ছে। শাফি তাদের আসতে বলে নিজে এগিয়ে গেল।
রিশা উঠল না। চুপচাপ বসে রইল। তার পাশে বসে আদ্রিক বলল-
তুই আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতে পারিস নি। নাহলে নিজের হাসবেন্ড কে নিয়ে লুকোতি না।
-আমি চাইনি তোরা ওকে খারাপ ভাবিস।

আদ্রিক চুপ করে রইল। কিছু বললো না। সে কখনোই রিশা আর রোহানের ব্যাপারে কিছুই বলেনা।

রিশা নিশ্চুপ থাকলে আদ্রিক দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে বলল-
আমি কি রোহানের চেয়ে হ্যান্ডসাম না?
-কেন বলছিস এটা?
-আমাকেই বলতি! আমি তোর বফ সেজে সাহায্য করতাম।

এটি বলে উচ্চশব্দে হেসে উঠল আদ্রিক। রিশাও হেসে ফেলল৷ আদ্রিক শান্ত গলায় বলল-
তুই ভুল পথে পা বাড়িয়েছিলি। এটা কোনো সমাধান নয় রিশা। আমাদের সমাজে মেয়েদের একটুখানি দোষও সবার চোখে পড়ে।

রিশা মাথা নিচু করে রইল। আদ্রিক বলল-
ক্লাসে চল।

ছেলেটির সাথে রিশা যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। কিন্তু ছেলেটা রিশাকে পাগলের মতো খুঁজতে থাকে। টিনাকেও নানাভাবে বিরক্ত করতে থাকে। একপর্যায়ে ছেলেটি খুঁজে বের করলো রিশাকে। বিবাহিত জেনে রোহানকে সবটা বলে দিলো। রোহান এটা নিয়ে ঝামেলা করে রিশার সাথে। শুধু তাই নয়, তার বন্ধুদেরও জানিয়ে দিলো সব। তারা রিশাকে খারাপ ভাবে।

রিশা এমনটা কেনো করেছে সে রোহানকে জানালো। এবং বলল, তার কল লিস্ট চেক করার জন্য। দুই-তিন দিনে বিশ মিনিটও সে কথা বলেনি ছেলেটির সাথে। তাছাড়া একটা মেসেজও নেই। যেহেতু রোহান রবি কোম্পানিতে কাজ করে, এসব বের করতে কষ্ট হলো না তার। পরে বুঝলো, তার ভুলের জন্যই রিশা এমন করেছে। ভুল তো তারই। তাকে শিক্ষা দিতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছিল মেয়েটা। রোহান তার বন্ধুদের কাছে ব্যাপার টা খুলে বলল। পরে এসে রিশার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় সে। রিশাও চায়। রোহান জানায়, সে ভুল পথ থেকে ফিরে আসবে আর রিশাও যেন ভুল পথে পা না বাড়ায়। এভাবেই সব ঠিক হয়ে গেল।

সময়টা ২০১৮ সাল। তখন রিশার বয়স ১৮ আর রোহানের বয়স ২৫। এদিকে রবি কোম্পানিতে রোহানের চাকুরির বয়স ২বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনো সে কাউকে বলেনি সে বিবাহিত। এটা জানার পর রিশা আপত্তি জানালে রোহান বললো, তার এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। তার সিনিয়ররাও অবিবাহিত। সেখানে সে বিবাহিত এটা জানালে নাকি খারাপ দেখায়।
কিন্তু রিশা এটা মানতে পারলো না। কেননা তার পুরো কলেজ জানতো তার সবকিছু। এটা নিয়ে মাঝে মাঝেই তাদের মধ্যে অশান্তির সৃষ্টি হত।

দেখতে দেখতে শবেবরাত চলে এল। রান্না করে, নামায পড়ে রিশা বিছানায় শরীর টা এলিয়ে দিলো। রোহান বাড়ির বাইরেই আছে। হয়তোবা মসজিদে।

হঠাৎ রিশার চোখ গিয়ে আটকালো রোহানের অফিস ব্যাগের দিকে। সে এখন প্রায়ই রোহানের জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি করে। সবটা ভালো চললেও সন্দেহ তো রয়েই গেল!

এমন সুযোগ সহজে পাওয়া যায় না। তাই হাত ছাড়া করা ঠিক হবে না। ক্লান্ত শরীর নিয়েও রিশা উঠে পড়ল। অফিস ব্যাগ খুলে অফিস থেকে দেওয়া ট্যাব টা পেল সে। এখানে অফিসের সব কাজ করে সে।
রিশা ডাটা অন করে দেখলো, এখানেই তার আগের আইডি লগইন করা আছে। অথচ সে বলেছে, তারা কেউই ফেইসবুক ব্যবহার করবে না।

ফেইসবুক নিয়ে এখন ভালোই ধারণ আছে রিশার। মেসেঞ্জার নেই। ব্যাগেই সে এমবি কার্ড পেল। তা দিয়ে সে মেসেঞ্জার ইনস্টল করলো।
শুরুতেই একটা আইডি আছে-

তাদের কয়েকটা মেসেজ দেখেই রিশা বুঝলো, রোহান আর রিশার নেই।

শুধু তানিশার মেসেজ দেখেই রিশা এতটায় হতাশ হয়ে পড়লো যে, অন্যকারো মেসেজ দেখার শক্তি নেই তার।
এই মেয়েটির সাথে কেবল প্রেম হয়নি রোহানের। দেখা করা, ১৮+চ্যাট করা, এমন কি রুমে ডেটও হয়েছে! তাদের ১৮+ চ্যাট দেখতে দেখতে রিশা হয়রান হয়ে যায়।
রিশা প্রমাণ রাখার চেষ্টা করতে থাকলো। কিন্তু কিভাবে স্ক্রিনশট নেওয়া হয় সে জানেনা। চোখে ঝাপসা দেখছে সে। মাথায় কিছু কাজ করছেনা।

সে রেগেমেগে রোহানকে ফোন করে বাসায় আসতে বলল।
রোহান ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মোবাইল থেকেই লগআউট অল করে দেয়।
রিশা আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ল এটা দেখে। মনে হচ্ছে তার শ্বাস আঁটকে যাচ্ছে।

রোহান আসলে রিশা পাগলের মতো আচরণ করতে থাকলো। রোহান কোরআন ধরে বলল, সে কিছুই জানেনা এই ব্যাপারে। এই আইডি টা নাকি হ্যাক হয়েছে। সে লগ ইন করে এসব দেখেছে,
কিন্তু এসব সে করেনি। রিশাকে শান্ত করার চেষ্টা করলো সে। কোরআন ধরে বলাতে রিশা শান্ত হলেও মাথা থেকে বিষয়টি ফেললো না রিশা। ঠিক করলো এর শেষ সে দেখেই ছাড়বে।
মেসেজ গুলো পড়ে মোটামুটি মেয়েটা সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনে যায় রিশা। এবং তার আইডিতেও ছিল অনেক কিছু। সে কোন কলেজে পড়ে, কোন জায়গায় থাকে, এসব
রিশা ফ্রেন্ড দের সহায়তায় চেষ্টা করতে লাগলো মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু মেয়েটির আইডিতে মেসেজ দিয়ে কোনো রিপ্লাই তারা পেল না। রিশা আরো পাগল হয়ে উঠে। তার সাথে কথা না বললে যেন শান্ত হবে না সে। মেয়েটির কলেজেও যায় বেশ কয়েকবার। কিন্তু খুঁজে পায়না।

রিশার প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু সে এসব থেকে দূরে থাকতে পারেনা। তানিশা সরকারী মহিলা কলেজের ছাত্রী। এবং সে রিশার মতোই প্রথম বর্ষের ছাত্রী। রিশা সেই কলেজের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। কেউ যদি মেয়েটিকে চিনে! অবশেষে রিশার বান্ধবীর মাধ্যমে দুটো মেয়েকে সে পায়, যারা তানিশা কে চিনে। রিশা অনুরোধ করলো তাদের, যেন এই ব্যাপারে তারা রিশাকে সাহায্য করে। তারা তানিশাকে কখন পাওয়া যাবে তা জানায়।
রিশার যেদিন পরীক্ষা নেই সেদিন তানিশার আছে। এই সুযোগে মহিলা কলেজে যায় রিশা। যেহেতু সে মেয়েটির ছবি দেখেছে, তাই তাকে চিনতে অসুবিধা হবে না তার। রিশা তার জন্য কলেজ গেইটে অপেক্ষা করতে থাকলো।
টানা চারঘন্টা অপেক্ষা করার পর সে মেয়েটিকে পেল।
মেয়েটিকে রিশা ভয় দেখিয়ে বলল, তার কাছে সব প্রমাণ আছে৷ রোহানের সাথে এমন কেন করেছে তা জানাতে। সে কি জানতো না রোহান বিবাহিত!

তানিশার কথা শুনে বোঝা গেল, তাকে আগেই সতর্ক করেছে রোহান৷ তাই সে এসব গোপন করতে চায়ছে। কিন্তু রিশাও ছাড়ার পাত্রী নয়। সে নানারকম প্রশ্ন করতে করতে অবশেষে তানিশার মুখ থেকে সত্যটা স্বীকার করালো৷ শুধু রুম ডেটের কথা অস্বীকার করলো। তবে মেসেজ গুলোতে উল্লেখ ছিল এই বিষয়ে।
রিশা তাদের দুজনকে একসাথে করবে ঠিক করলো। একটা রেস্টুরেন্টে তানিশাকে নিয়ে বসলো সে। রোহান আসলো। সে কারো পাশেই বসলো না। তার মানে সে রিশা ও মেয়েটিকে সমান করলো। রোহান অন্যপাশে এসে বসলে রিশার মাথা আরো বিগড়ে যায়।

তানিশা দেখতে মোটেও সুন্দরী নয়। রিশার ধারেকাছেও তার তুলনা দেওয়া যায়না। তাকে ফেলে সে এই মেয়েটির সাথে এসব করেছে মানতে পারছে না রিশা। রিশা দুজনকেই কথা শোনাতে থাকে।
তানিশা রোহানের ব্যাপারে সবটা জানে। তারা একে অপরকে ভালোবাসে না। শুধুমাত্র একে অপরের সাথে সময় কাটিয়ে মজা নেয়। যাকে বলে অবৈধ সম্পর্ক।
এই ঘটনার পর রিশা দূর্বল হয়ে পড়ে। রোহানের প্রতি ভালোবাসা কাজ করেনা আগের মতো। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারো সে ক্ষমা করে দেয় রোহান কে। ডিভোর্স দিতে চাইলেও দিতে পারলো না সে। তাই এবার সে রোহানকে দিয়ে আইনিভাবে আপোষনামা করালো, এটাই তার শেষ সুযোগ হিসেবে।
রোহান তাকে স্পর্শ করলেই রিশার শরীরে জ্বালাপোড়া করে উঠে। চোখে ভেসে উঠে রোহান ও তানিশার ১৮+চ্যাটের দৃশ্য। এতসব কিছুর পরেও সে সংসার করে চলেছে রোহানের সাথে। রোহান নিজেকে শুধরে নিবে এটাই তার কাম্য।

কিন্তু সে শত চেষ্টা করেও নিজেকে রোহানের সাথে স্বাভাবিক করতে পারছে না। ফেইসবুক ব্যবহার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটাতে শুরু করলো। কলেজে সময় দেওয়াও শুরু করলো।
নিজেকে রোহানের ভালোবাসা আর ভয়ের কারণে এতদিন যেভাবে বন্ধি করে রেখেছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে লাগলো।
রোহান এখন রিশাকে সময় না দিলেও রিশা কষ্ট পায়না। কেননা, এর আগে এতদিন সে কাজের বাহানা দিয়ে আরেকটা সম্পর্কে ছিল। এখন আর এরচেয়ে বেশি খারাপ কি হবে ভেবে রিশা আর আফসোস করেনা!

তার মেয়েটা না থাকলে হয়তো অনেক আগেই ডিভোর্স টা হয়ে যেত। আস্তেধীরে যখন রিশা নিজেকে একটু স্বাভাবিক করতে পারলো, তখনি আরেকটি ঝড়ের কবলে পড়ল। অফিস থেকে ফেরার পথে রোহানের ব্যাগটা সিএনজি তে ভুলে রেখে আসে সে। যেখানে ছিল প্রায় আশি হাজার টাকা। সবটায় অফিসের। এটা নিয়ে থানা পুলিশ করতে আরো দশ হাজারের মতো খরচ হয়। কিন্তু যেখানে টাকা হারায়নি খুঁজে পাবেও বা কিভাবে!

পর্ব ৭

কিছুদিন পরেই রিশাকে না জানিয়ে রোহান হারিয়ে যায় কোথাও। রোহান জুয়া খেলে অফিসের দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা, ব্যাংক থেকে লোনের পঞ্চাশ হাজার টাকা, সমিতির টাকা, বাড়ি ভাড়া কিছু না মিটিয়ে উধাও হয়ে যায়। তখনি রিশা বুঝে, সিএনজি তে টাকা হারায়নি। এসব ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিল সে।
রোহান পালাতো না। সবটা সামলে নিতো। কিন্তু সে কিছু খারাপ ছেলের সাথে মিশে ডাকাতি করতে যায়। সেখানে একজন ছেলে ধরা পড়ে গিয়ে রোহানের নাম বলে দেয়। আর ওই লোকটি ছিল রবি কোম্পানির একজন বড় বাইয়ার।

মামলা করা হয় রোহানের নামে। অফিস থেকে লোকজন এসে অপমান করে রিশাকে।
ব্যাংক এর, সমিতির টাকা এবং ঘরভাড়ার টাকা সব এসে পড়ে হালিমা বেগমের ঘাড়ে। এই ঘটনার পর রোহানের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ল রিশা। রোহান কি করছে, কোথায় আছে, কি খাচ্ছে এসব নিয়ে অস্থির হয়ে থাকে সে। নিজের ব্যাংকে বিশ হাজার টাকা আছে৷ সেসব সে রোহানের কাছে পাঠিয়ে দেয়।

প্রায় একমাস পর রোহানের সাথে দেখা করতে আসে রিশা, সে যেখানে লুকিয়ে আছে। ঠিক করলো এখানে কিছুদিন থাকবে। দুইদিনের মাথায় দেখলো, রোহান ড্রাগস এর ব্যবসা শুরু করেছে। এসবের জন্য তাদের মাঝে ঝগড়া শুরু হয়। রোহান তাকে বোঝায়, এভাবে চলা যায় না। টাকা শোধ করতে পারলে তাকে আর লুকিয়ে থাকতে হবে না।
কিছুমাস যাওয়ার পর তাকে রিশা জানায়, এসব সে মেনে নিতে পারবে না৷ এসব ছাড়তে হবে৷ রোহান রাজি হয়। ওই এলাকা ছেড়ে রোহানকে অন্য এলাকায় বাসা নিয়ে দেয়। তারপর পাশের একটা গার্মেন্টস এ চাকরি নেয় সে।
রোহানের কষ্ট দেখে রিশার খারাপ লাগলেও খুশি হয়, ভুল শোধরাতে পরিশ্রম তো করছে সে!

২০১৯সাল চলে আসে। রোহানের জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য তার বাসায় আসলো রিশা। এসে দেখে আবারো ড্রাগস! রিশা চেঁচামেচি শুরু করলে তার গায়ে হাত তুলে রোহান। রিশা চলে আসে সেখান থেকে। যোগাযোগ কমিয়ে দেয় রোহানের সাথে।

দেখতে দেখতে রিশারও জন্মদিন চলে আসে। ভালোবাসা মানুষকে বেহায়া করে তুলে, রিশার অবস্থা হয়েছে এমন। এতকিছুর পরেও সে রোহানের কাছে আসলো নিজের জন্মদিনটা তার সাথে কাটাতে। কিন্তু এসে দেখলো, রোহান গার্মেন্টস এর একটি মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে। এটা নিয়ে ঝগড়া করে বাসায় ফিরে আসলো।
রিশার পৃথিবী টা অন্ধকার মনেহচ্ছে। কার জন্য কি করেছে সে!

সেই ছোট্ট থেকে রোহানকে মনেপ্রাণে ভালোবেসেছে সে। তার জন্য নিজের বাড়ি ছেড়েছে, গার্মেন্টস এ কাজ করেছে, শত ভুল করেও তাকে ক্ষমা করেছে, শত মার খেয়েও তাকে আপন করে নিয়েছে। কেন করলো এসব! ভালোবাসার জন্যই তো? তবে কেনো রোহান তাকে ভালোবাসতে পারেনা! সব তো ভালোই চলছিল৷ ওসব ড্রাগস, প্রেমের কি প্রয়োজন! এসব জেনে রিশার যেখানে উচিত রোহানকে ঘৃণা করা সেখানে সে রোহানের জন্য আরো পাগল হয়ে উঠে। কেনো রোহান তার কাছ থেকে এভাবে দূরে সরে যাচ্ছে সে মানতে পারছে না। সব চেষ্টায় তো সে করে দেখেছে। আর কি করলে রোহান ঠিক হতে পারে এই চিন্তায় তার ঘুম হয় না।
এরপর যতবারই রিশা এসেছে রোহানের কাছে, ততবারই মার খেয়েছে। একপর্যায়ে রোহান জানায়, সে আর এই সংসার করতে পারবে না। আরেকটি বিয়ে করবে।

রিশার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল! রিশার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করে আরেকটি বিয়ে করতে চাচ্ছে রোহান!
কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরে এল সে। ৩৮টা ঘুমের মেডিসিন খেয়ে ফেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করলো রিশা। এবার হয়তো রোহান শান্ত হবে। বুঝতে পারবে নিজের ভুল! আর বুঝবে একমাত্র রিশাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো।

রিশার হার্ট ব্লক হয়ে যায়। ডাক্তার জানায়, নাও বাঁচতে পারে। কিন্তু হালিমা বেগমের দোয়ায় ও আল্লাহ এর রহমতে দুইদিন পরে জ্ঞান ফিরলো তার।

সুস্থ হয়ে রিশা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, সে ডিভোর্স দিবে রোহানকে। কিন্তু মিষ্টির বিষয়টা ভাবায় তাকে। তাদের জন্য মিষ্টির কোনো ক্ষতি হবে নাতো‌! এত কম বয়সে তাদের আলাদা হওয়াটা মিষ্টির উপরে প্রভাব ফেলবে কি!
এই সময় তার পাশে এসে দাঁড়ালো আদ্রিক। রিশার মুখে কিভাবে একটু হলেও হাসি ফুটানো যায়, এটার চেষ্টা করে সে। আর মিষ্টি! আদ্রিক কেই নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড বানিয়ে নেয়।
নিজের একাকীত্ব কমানোর জন্য আদ্রিকের সাথে মিশতে শুরু করলো রিশা।

আদ্রিক ছেলেটায় এমন, না মিশে থাকায় যায়না। কলেজের অনেক মেয়েই তার জন্য পাগল৷ শ্যামবর্ণ গায়ের রং, মুখে চাপ দাঁড়ি, উচ্চতায় ৫ফুট ১০ইঞ্চি আদ্রিককে দেখে যেকোনো মেয়েই প্রেমে পড়তে বাধ্য। কিন্তু আদ্রিক পছন্দ করে রিশাকে। সেই কলেজের প্রথম দিন থেকে। সে জানতো না রিশা বিবাহিতা। তাই রিশার সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টায় থাকে। ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব থাকেনা সহজে। প্রেমে পরিণত হয় এই বন্ধুত্ব। তার ক্ষেত্রেও নাহয় এমনি হবে। কিন্তু রিশা বিবাহিতা জেনে বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে গেল আদ্রিক। মেয়েটি বিবাহিতা হতে পারে এটি তার ধারণারও বাইরে ছিল। সেই থেকে নিজের চাওয়াটা মনেই পুষে রাখে। তবে ভালোবাসা কমলো না।

যেদিন থেকে জানলো রোহান তাকে কষ্ট দেয়, আদ্রিক তার খবরাখবর নিতে থাকে। ভালো বন্ধু হয় তার। কিন্তু কখনোই নিজের চাওয়াটাই পূরণ করতে চায়নি। কারণ সে জানে, রিশা মনেপ্রাণে ভালোবাসে রোহানকে। তাই সে চেয়েছে তাদের মাঝে সব ঠিক হয়ে যাক। কিন্তু রিশা ঘুমের মেডিসিন খাওয়ার পর মৃত্যুপথে চলে যায় প্রায়। রোহানের প্রতি ঘৃণা জন্মায় তার মনে। সে চায়না রোহানের মতো ছেলের সাথে বাকিটা জীবন রিশা থাকুক। এতে কষ্ট ছাড়া কিছুই পাবে না সে। তাই রিশার ছায়া হয়ে থাকতে চায় আদ্রিক। এভাবে আদ্রিকের সাথে রিশার সখ্যতা গড়ে উঠে। আর এক পর্যায়ে রোহান থেকে সরে এসে তার কাছে থাকার প্রস্তাব দেয় আদ্রিক। সে বাসায়ও তাদের কথা জানাতে রাজি।

রিশা বুঝতে পারলো, আদ্রিক ছেলেটা অনেক বেশিই ভালো। নাহলে সবটা জেনে তার পাশে এভাবে এসে দাঁড়াতো না। রিশা অমত পোষণ করলে সে জানায়, কলেজের প্রথমদিন থেকেই তাকে পছন্দ করে আদ্রিক। এটা কোনো মায়া নয়, ভালোবাসাই।

রোহানের কাছ থেকে সরে আসতে চায় রিশা। তার জন্য দরকার এমন কাউকে যে তাকে রোহানকে ভুলে থাকার জন্য সাহায্য করবে।
আদ্রিককে রিশা জানালো, তার জন্য সব সহজ হবেনা। রোহান কে সে ভালোবাসে। তাই তাকে ভুলে যাওয়া হয়তো সহজ নয়।
আদ্রিক জানায়, এবার নিজের ভালো থাকাটা ভাবতে রিশাকে। আর মিষ্টি বা কি দোষ করেছে! এমন বাবা থাকার চেয়ে আলাদা হওয়াই ভালো।

হালিমা বেগমসহ আপনজনেরা রিশাকে বোঝাতে শুরু করলো, রোহানকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য।
সেই থেকে রোহানকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে রিশা। রিশার বাবাও দেশে ফিরলেন।
এক দুপুরে রিশা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জ্বর এসেছে শরীরে। হঠাৎ তাকে ঘুম থেকে তুলে রোহান থাপ্পড় মেরে জিজ্ঞাসা করে, ফোন কেনো রিসিভ করছে না।
আজ আর রিশার কিছুই বলতে হয়নি। তার বাবাই রোহানকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেন। যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফিরে যেতে বলেন।

রিশার বাবা, রোহানকে খুব ভালোবাসতেন। এই ঘরে কোনো ছেলে ছিল না বলে রোহান বেশ আদর-যত্ন পেত। কিন্তু সে এসবের কদর করতে জানেনি।

এরপরেই আদ্রিকের সাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হয় রিশা। শুধুমাত্র রোহানকে ভুলে থাকার জন্য। তবে রোহানের মতো লুকিয়ে নয়। সবাইকে জানিয়েই সে সম্পর্কে পা বাড়ায়। এবং সে চেয়েছে রোহান এসব জেনে জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যাক।

আদ্রিক রিশাকে মন থেকেই ভালোবাসে। সে তার ভালোবাসা দিয়ে সব কষ্ট ভুলিয়ে দিতে চায়। কিন্তু রিশা সবসময় রোহানের খবর নিতে থাকে। স্বাভাবিক হতে পারছেনা সে আদ্রিকের সাথে। রোহান আবারো সম্পর্কে জড়ালে রিশা পাগলপ্রায় হয়ে যায়। কেনো তা সে নিজেও জানেনা! সে কি চায় এটাও সে জানেনা! সবমিলিয়ে তার বাঁচার ইচ্ছেটায় মরে যায়। এই পৃথিবীটায় ত্যাগ করার ইচ্ছে জাগে মনে। এবার রিশা আবারো ঘুমের মেডিসিন খায়। চট্রগ্রাম মেডিক্যাল থেকে রিশার নামে মামলা করা হয়। আরেকবার যদি সে সুইসাইড করার চেষ্টা করে, তবে তাকে থানায় নেওয়া হবে।

আদ্রিক ছুটে আসলো রিশাকে দেখার জন্য। আসলো রোহানও। আদ্রিককে দেখে রোহানের রাগ হতে থাকলো। কারণ সে জানে রিশা এই ছেলেটির সাথে প্রেম করে। রোহান তাকে মারতে শুরু করে। মেডিক্যাল এ মানুষ জড়ো হয়ে যায়। হালিমা বেগম শান্ত করলেন রোহানকে।

জ্ঞান ফিরে এসব শুনে রিশা ক্ষেপে যায়। এদিকে সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে আর রোহান কিনা মারামারি করছে!
এবার েবঁচে ফেরার পর সবার ভালোবাসা দেখে রিশা ঠিক করলো, সে ভালো থাকবে এখন থেকে। যা করবে নিজের জন্যই করবে। অন্যের জন্য ভাবনা অনেক হয়েছে! তার মাথায় আর কোনো চিন্তা নেই। এখন একটায় চিন্তা, কিভাবে সে ভালো থাকবে বাকিটা জীবন। রোহানের সাথে থাকলে এটা সম্ভব নয়। কারণ এত কিছু করার পরেও যে শুধরায়নি আর শুধরাবে বলেও মনে হয়না তার। আর ভাবতে চায় না সে রোহানকে নিয়ে। রোহান যা খুশি করুক, যেখানে খুশি যাক, যার সাথে ইচ্ছে তার সাথেই থাকুক তার কিছুতে যায় আসেনা।

নিজের মনকে শক্ত করে নেয় রিশা। ডিভোর্স দিয়ে দেয় রোহানকে। বিয়ের কাবিননামা দশলাখ টাকা। রিশা একটা টাকাও নিলোনা রোহানের কাছ থেকে। শুধু মিষ্টিকে রাখলো নিজের কাছে।

ডিভোর্স এর পর রোহান নানাভাবে চেষ্টা করতে লাগলো রিশার সাথে যোগাযোগ করতে। রিশাও কথা না বলে থাকতে পারে না। রোহান ফোন দিলে রিসিভ করে। আদ্রিক সবটা জানে। রিশা যে এত তাড়াতাড়ি সবটা গুছিয়ে নিতে পারবে না সে জানে৷ তাছাড়া রিশা বলেছে, তার সময় লাগবে স্বাভাবিক হতে।

সবটা জেনে যদি আদ্রিক রাজি হয় তবে তার আপত্তি নেই। আদ্রিক ধীরেধীরে রিশার মনে জায়গা নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে তার ভালোবাসা দিয়ে৷ আদ্রিক হয়ে উঠে রিশার বেস্ট ফ্রেন্ড। রিশা সক্ষম হয় রোহান কে ছাড়া ভালো থাকতে। এখন রোহানেরও কিছু করার নেই৷ সবই তো শেষ! মাঝেমধ্যে এসে মেয়েকে দেখে যায়। কখনো রিশার দেখা পায় কখনো বা পায়না।

এতসব কিছুর পরেও মিষ্টির গায়ে কোনো আঁচ লাগতে দেননি হালিমা বেগম। নানুমার চোখের মনি মিষ্টি!
এদিকে আদ্রিক তার পরিবারের কাছে রিশার কথা জানায়। আদ্রিকের মা প্রথমে মিষ্টির জন্য আপত্তি জানালেও পরে সবটা মেনে নেন। আদ্রিকের ভাই মানুষ হিসেবে ভীষণ ভালো।

তিনি নিজে দাঁড়িয়ে তাদের বিয়ে দিবেন বললেন। কিন্তু আদ্রিক তাদের ঘরের ছোট ছেলে। তাই তারা চান, আদ্রিক পড়াশোনা টা শেষ করে যেন নিজের পায়ে দাঁড়ায়।
তাদের কথার মান রাখলেন হালিমা বেগম। তিনি নিজেও চান চা অনিশ্চিত কোনো সম্পর্কে আর তার মেয়ে জড়াক। এদিকে রিশারও সময় প্রয়োজন। সেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে তাকে কোনো কিছু নিয়ে কষ্ট পেতে না হয়। তাই সে আদ্রিকের কাছে সময় চেয়ে নিল ছয়-সাত বছরের মতো!
এবার আর ভুল সে করবে না। নিজেকে গুছিয়ে নিবে সে পুরোপুরি ভাবে।

সব মিলিয়ে এখন ভালোই আছে তারা। কিন্তু ভালো নেই রোহান। নিজের পরিবারের সাথেও সম্পর্ক নেই তার।
তাকে দেখলে কেউ বলবে না, এই রোহান একজন সুদর্শন পুরুষ ছিল!

ড্রাগস নেওয়া, নেশা করা, মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়ানো এসবই তার কাজ।

আর রিশা চট্রগ্রাম মহসীন কলেছের ছাত্রী। আদ্রিকের সাথে সেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
রিশা যখন সব পিছুটান ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তখনি তাকে আবার বিরক্ত করতে শুরু করলো রোহান। আদ্রিক কে বেশ কয়েকবার মারতেও চায় সে। চেষ্টা করে রিশার জীবন থেকে আদ্রিক কে সরানোর। কিন্তু আদ্রিক সবটা জেনেই রিশার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এত সহজেই কি সে ছেড়ে যাবে রিশাকে!

রিশার পেছনে পাগলের মতো ঘুরছে রোহান এখনো, কিন্তু রিশা আর ফিরবে না। কখনো ফিরে যাবে না সে রোহানের কাছে।

রিশার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলো না সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। নানা জনে নানা কথা বলে কষ্ট দিতে চায় তাকে। কিন্তু সে কষ্ট পায় না। কেনোই বা পাবে! যখন সে কষ্ট পেত তখন এই সমাজ কোথায় ছিল! কোথায় ছিল তাদের এসব বাণী? এখন যখন সে সরে এসেছে তখন তাকে শুনতে হয় তার ধৈর্য্য নেই।

হ্যাঁ সেও ভুল করেছে। পালিয়েছে বাড়ি ছেড়ে। ভালোবাসার মানুষটার জন্যই তো করেছে এসব। কিন্তু সে কি করলো? আর কতই বা ধৈর্য্য ধারণ করবে সে! একটা মানুষ আর কত ধৈর্য্যশীল হতে পারে রিশার জানা নেই। জানতেও চায়না। শুধু জানে সে এখন ভালো আছে।

আর এভাবেই ভালো থাকতে চায়। কিন্তু মাঝেমাঝে আদ্রিকের জন্য চিন্তা হয় তার৷ অন্যের বউ এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে বলে আদ্রিক কে কথা শোনায় অনেকে। তখন ভেঙে পড়ে রিশা। তার জন্য আদ্রিক কে কথা শুনতে হয় এটা মানতে পারে না সে। কিন্তু তখন আদ্রিক তাকে ভরসা দিয়ে বলে, এটা তার জীবন। তার সিদ্ধান্ত। সত্যিটা কি তারা জানে। অন্যরা না জানলেও চলবে।

আদ্রিকের সঙ্গ রিশার পৃথিবী টা আলোকিত করে দেয়। ভবিষ্যতে কি হবে সে জানেনা। কিন্তু এখন সে ভালো আছে, অনেক বেশিই ভালো আছে!

লেখা – তাজ তানিশা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “গল্প হলেও পারতো – ভালোবাসার কথা গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – নোনাজলের শহর (১ম খণ্ড) – ভালোবাসার কষ্টের কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!