স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প

তুমি আমার প্রোপারটি – আই লাভ ইউ জান (শেষ সিজন)

তুমি আমার প্রোপারটি – আই লাভ ইউ জান: তুমি একদম ছোট্ট শিশুর মত নিষ্পাপ রাহি। আর এই নিষ্পাপ মেয়েটিকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে নতুন করে বিয়ে করে আমার বাসায় নিয়ে যাব। আমার বউ করে। আর তোমার এই অগোছালো স্বামী তোমার কাছে গোছালো হয়ে ফিরবে আবার। প্রমিস কথাগুলো বলেই উনি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তখনই আমি ওনার হাতটি ধরে ফেললাম।


পর্ব ৩৫

রাই এবং ভাইয়ার সকল কথা শুনে বেশ কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইলাম আমি। সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে যার যার জায়গায়। কেউ কোনো কথা বলছে না। পুরো রুমজুড়ে এখন স্তব্ধতা বিরাজমান। আমি বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকার পর এবার মাথা তুলে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে উঠলাম,

~ তোমাদের কথা সব কিছু বুঝলাম ভাইয়া। বুঝলাম তোমরা এ কারণে আমাকে বিয়ে দিয়েছো। কিন্তু সেটার জন্য তো আমি কোন কিছুই বলিনি। আমি জানতে চাই তোমরা এই এতদিন আমার সাথে মিথ্যা অভিনয় করলে কেন? কেন সবাই মিলে বললে যে আমার এখনো বিয়ে হয়নি? রাজ বা রাই বলতে পৃথিবীতে কেউ নেই? সবই আমার মনের ভুল? তোমরা আমার সাথে কেনো এমন নাটক করলে ভাইয়া? তার উত্তর দাও আমায়!

আমার কথার উত্তরে ভাইয়া কিছু বলার আগেই আরিশা আমার পাশে এগিয়ে এসে আমার সামনে বসে বলতে লাগলো,

~ তোমার এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিচ্ছি রাহি। কেন তোমাকে এতটা কষ্ট সহ্য করতে হলো সবার থেকে, কেনই বা তোমার প্রিয় মানুষেরা তোমার সাথে নাটক করলো! আমি জানি এটা নিয়ে তুমি অনেক চিন্তিত! কিন্তু তুমি কি জানো তোমার সাথে এমন আচরনের কারনে তোমার চাইতেও বেশী কষ্ট পায় তারা! যারা তোমার সাথে এমন টা করেছে? বিশেষ করে আরিয়ান যে প্রতিটা মুহুর্তে তোমাকে এমন কষ্ট দিয়ে নিজে ধুঁকে ধুঁকে মরছে সেটা কি তুমি জানো? তা হয়তো জানো না। তাহলে শোনো কেন এমন করেছে তোমার সাথে সবাই। ” মনে আছে সেদিনের কথা? যেদিন তোমাকে আরিয়ান প্রপোজ করেছিল। যেদিন রাই এর সাথে তোমার ভাইয়ের বিয়ে ছিল। আর সেদিন তোমাকে বধু সাজে সাজিয়ে বাসর করার স্বপ্ন দেখেছিল আরিয়ান?

~ হুমম!

~ তোমার আচরণ ব্যবহারে আরিয়ান ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিল তুমি আরিয়ানের প্রতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছো। ওকে ভালবাসতে শুরু করেছো। তাই সেদিন ও তোমাকে স্ত্রী রূপে কাছে পাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছিল। তোমার মা কিন্তু তোমার উপর রাগ করে তোমাকে সেখানে থাকতে বলেননি। বরং সেখানে তোমাকে থাকতে বলেছিল এই ভেবে যেন তুমি সংসারী হয়ে ওঠো। যতই হোক মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে স্বামী’ই হয় তার সবচাইতে আপন। বাবার বাড়ির সবাই তখন পর হয়ে যায়। এটা তোমার মা তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিল। তাই বলে তোমার প্রতি তাদের ভালবাসা কিন্তু বিন্দু পরিমানও কমেনি। কিন্তু সেদিন তুমি ভুল বুঝে ছিলে। উল্টা বুঝেছিলে তুমি সব।

আরিয়ানের সাথে যখন উল্টোপাল্টা কথা নিয়ে রাগারাগি করছিলে। আরিয়ানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে তখন আরিয়ান তোমার ওপর রেগে যায়। এমনকি হাত তোলার জন্য হাত উঁচু করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিন্তু আরিয়ান তোমাকে মারেনি। বরং তুমি নিজেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাও। তোমার এই রোগটাই ছিলো তার কারণ। তুমি কি জানো তুমি জ্ঞান হারানোর পর আরিয়ান কেমন করেছিল? তোমার জন্য এক কথায় বলতে গেলে ও পাগল হয়ে গিয়েছিল। ও তখনই নিজেকে নিজে শেষ করে দিতে চেয়েছিলো। আরিয়ান ভেবেছিল তুমি হয়তো ওর কারনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছো এত কষ্ট পেয়েছো। নিজেকে নিজে শেষ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল সেদিন আরিয়ান।

কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি আর আম্মু সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। আর সেজন্যই আরিয়ানকে থামাতে পারি আমরা। তুমি জানো তোমার সাথে সবাই কেন এমন আচরণ করেছে? কেন সবাই তোমার থেকে নাটক করে দূরে সরে থেকেছে? সেদিন যখন তুমি জ্ঞান হারিয়ে পরে যাও! তখন তোমাকে নিয়ে আমরা সবাই মিলে আম্মুর হসপিটালে যাই। আরিয়ানকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করি। হসপিটালে দীর্ঘ ২ ঘন্টা আম্মু তোমাকে চেকআপের পরে আমাদের জানায় তুমি এক নতুন রোগে আক্রান্ত। আর সেই রোগের চিকিৎসা না করায় তোমার ওপর তার উল্টা প্রভাব পরছে। যেমন তুমি নিজের ফিলিংস গুলো বোঝাতে পারছো না। বরং উল্টা রিয়েক্ট করছো।
এতোটুকু একনাগাড়ে বলে থামল আরিশা। ওকে থামতে দেখে আমি প্রশ্ন করে উঠলাম,

~ কি সেই রোগ যার কারণে আমি এমন হয়েছিলাম?
আমার কথার উত্তরে আরিশা জিব্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল,

~ তোমার এই রোগটার নাম অ্যাসপারগার বা অ্যাসপারজার বলা চলে। তবে এই রোগটির নাম যে শুধু অ্যাসপারগার তা নয়। তোমার শরীরে যে রোগটা আছে সেটা ভীষণ অদ্ভুত একটি রোগ। তবে এটার সাথে অ্যাসপারগারের বেশ কিছুটা মিল রয়েছে বলেই এটাকে অ্যাসপারগার বলা হয়েছে। আম্মু তোমাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কেননা তোমার ব্যাপারে সব টা জানার পর আর তোমাকে চেকআপ করার পর অবাক করা বিষয় বেরিয়ে এসেছিল। আর সেটা হলো তুমি দিনে দিনে যত চুপচাপ থাকতে, যত কোনকিছুর প্রতিবাদ না করতে, ততো প্রতিবন্ধীর দিকে চলে যেতে। এমনকি একসময় হয়ত নিজে একটা প্রতিবন্ধী তে পরিণত হতে। কথায় কথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে। আর এভাবেই তোমার মৃত্যু ঘটতো।

তুমি জীবনেও নিজের ফিলিংস গুলো প্রকাশ করতে পারতে না।
অ্যাসপারগারের লক্ষণসমূহ বা অ্যাসপারজারের লক্ষণসমূহ বলতে এক প্রকার অটিজম বোঝায়। যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শৈশব এবং জীবনব্যাপী বিকাশ প্রক্রিয়ায় এক প্রকার ত্রুটি বা পার্থক্য ঘটে। যার ফলে ব্যক্তির সামাজিক আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। এই লক্ষণসমূহের ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি অলিখিত সামাজিক নিয়মাবলী বুঝতে পারেন না। এবং মুখের ভাব-ভঙ্গির মাধ্যমে এবং শরীরী ভাষায় বোঝানো নির্দেশ বুঝতে পারেন না। এরা সাধারণত প্রবল উদ্দীপকের অনুভূতি সহ্য করতে পারে না এবং প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। তোমার রোগ টা ও ঠিক এইরকমই। তবে তুমি আরেকটু গুরুতর হয়ে পড়েছিলে। যে কারণে দিন দিন তোমার মাঝে বেশি অবনতি লক্ষ করা যাচ্ছিল। তুমি দিনে দিনে হয়তো প্রতিবন্ধীত্বের রূপ নিতে বা পাগল হয়ে যেতে। নিজের ফিলিংস গুলো কখনো কারো সাথে শেয়ার করতে পারতে না। বা নিজের উপর হওয়া অন্যায় অপমানের কোন প্রতিবাদ করতে পারতে না। যেমনটা কখনো পারোনি তুমি।

তখন তোমাকে ঠিক করার জন্য একটাই উপায় ছিল, আর সেটা হলো তোমাকে এমন কোন শক দেওয়া যেটাতে পরে তুমি চিন্তা করতে বাধ্য হও। এবং অতিত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করো। নিজের ফিলিংস গুলো কে ধীরেধীরে প্রকাশ করতে সক্ষম হও। সকলের কাছে নিজের মনের চিন্তা ভাবনা গুলো প্রকাশ করতে পারো। আর সেসবের কারণে তুমি নিজেকে ধীরে ধীরে বুঝতে পারো। অন্যায়-অপরাধের প্রতিবাদ করে রুখে দাঁড়াতে পারো। এটার জন্যই সকলে তোমার সাথে অভিনয় করতে শুরু করে। কারণ তোমাকে শক দেওয়ার মতো তখন একটাই জিনিস ছিল সেটা হচ্ছে সকলের কাছ থেকে তোমার স্মৃতি মুছে ফেলার মত কথা বলতে শোনা। আর তোমার সাথে ঠিক সেটাই করা হয়েছে। সবাই অনেক কষ্ট করলেও তোমার থেকে দূরে সরে থেকেছে। এমন আচরণ করেছে যেনো তুমি সব ভুল বলছো তারাই সঠিক। আর তুমি যা বলছো সবই ভুল ও তোমার স্বপ্ন। বাস্তবে তার কোনো অসস্তি নেই। আর সবাই ঠিক সেটাই করলো, তোমার সাথে সবাই এমন আচারণ করতে শুরু করলো যেনো তুমি সব স্বপ্ন দেখেছো।

রাজ বা রাই এরা কেউ নেই পৃথিবীতে। সবই তোমার কল্পনা ছিল। এমনকি তুমি বিবাহিতও নয়। যখন সবাই তোমার সাথে এমন আচরন করতে শুরু করল তখন তুমি মনে মনে পণ করলে তুমি সত্যিটা খুঁজে বের করবে। তুমি নিজের মাঝে রাগ ও কৌতুহলের সৃষ্টি করলে। এবং সেই কৌতুহলের বশে নিজেকে ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে লাগলে। নিজের ফিলিংস গুলো প্রকাশ করতে লাগলে। আর এভাবেই এখন তুমি সুস্থ হয়ে গেছো রাহি। আর তোমাকে সুস্থ করে তোলার পিছনে সব চাইতে বেশি কষ্ট করেছে আরিয়ান। আমি নিজে চোখে দেখেছি তোমার প্রতি ওর পাগলের মতো ভালবাসাগুলো। তোমার সাথে অভিনয় করতে গিয়ে নিজেকে তিলে তিলে কষ্ট দেওয়াগুলো।

একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে থামল আরিশা। আমি ওর কথার উত্তরে কোন কিছু না বলে একদম চুপচাপ বসে রয়েছি। কারো মুখের দিকেও তাকাচ্ছি না। তবে বেশ ভালই বুঝতে পারছি সকলের চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেছে। শুধু আমি বাদে। আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরিশার চোখে চোখ রেখে বলে উঠলাম,

~ তাহলে রাজ যে আমার হাত কেটে নিজের নাম লিখে দিয়ে ছিলো। সেই হাত কাটার দাগ কোথায় গেল আরিশা? আর আজকে কেন আমার সাথে রাজ এতটা বাজে বিহেভ করল?
আমার কথার উত্তরে আরিশা মলিন হেসে আমার এক গালে নিজের হাত রেখে বলে উঠলো,

~ আরে পাগলি তুমি এখনো বুঝলে না তোমার হাতের দাগ কোথায় গেল? তুমি যেনো কোন কিছু ধরতে না পারো সেই কারণেই তোমার হাতের নাম লেখাটা মুছে দেওয়া হয়েছে। আর সেটা করেছে আমার আম্মু। খুব সূক্ষ্মভাবে ছোট্ট একটি প্লাস্টিক সার্জারি অপারেশন করে তোমার হাত থেকে সেই লেখাটা মুছে দেওয়া হয়েছে। আর আজকে আরিয়ান তোমার সাথে যেটা করেছে সেটা শুধুমাত্র তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য। যে তুমি এখনও আগের মতো নিজের প্রতি অন্যায় হওয়াতে চুপ থাকো নাকি প্রতিবাদ করতে পারো। আর দেখো তুমি আজকে ঠিক নিজের রাগ অভিমানগুলো আরিয়ানের ওপর প্রয়োগ করতে পেরেছো। তুমি পুরপুরি সুস্থ হয়ে গেছো রাহি। You are perfectly healthy now.

আরিশার কথা শুনে আমি কোন কিছু বললাম না। সকলের সামনে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা ভাইয়ার কাছে চলে গেলাম। তারপর ভাইয়ের হাত থেকে ওর ফোনটা ছো মেরে নিয়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম। সবাই এসে আমার দরজা ধাক্কাতে লাগলো। হয়তো সবাই ভয় পেয়েছে আমি আগের মতো আবার অসুস্থ হয়ে গেলাম কিনা? নিজের অনুভূতিগুলো হয়তো বোঝাতে পারছি না। তাই আমি সকলকে অভয় দিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠলাম,

~ আমার কিছু হয়নি আমি ঠিক আছি। আমাকে এখন কেউ বিরক্ত করো না প্লিজ। তোমরা যে যার কাজে চলে যাও।

কথাটি বলে ভাইয়ার ফোনটা নিয়ে সোজা আমার বিছানার উপর গিয়ে বসে পড়লাম। তারপর বালিশের পাশ থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিলাম। ভাইয়ার ফোন থেকে কল লিস্টে ঢুকে আরিয়ান এর নাম্বারটা নিজের ফোনে তুলে নিলাম। তারপরে কল দিলাম আরিয়ানের নাম্বারে। দুই তিনবার ফোন বাজতেই ওপাশ থেকে দ্রুত ফোন রিসিভ করলো আরিয়ান। তবে একদম চুপ করে রইলো সে। শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি। আমি মুচকি হেসে অভিমানি গলায় বলে উঠলাম,

~ হ্যালো মিষ্টার রাজ চৌধুরী, আমার সাথে কথা বলবেন না আপনি? বলি বৌ এর ওপর এত রাগ করলে চলে? যে বিয়ের পর থেকে একটানা বাবার বাড়িতে ফেলে রেখেছেন নিজের একমাত্র বউকে? নিজের কাছে বুঝি নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না আপনার? এই বুঝি বউ এর প্রতি আপনার ভালোবাসা? যে বিয়ে করে বউকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। এমন ভালোবাসা লাগবে না আমার বলে দিলাম। আগামি ১৫ মিনিটের মাঝে আপনাকে আমার সামনে চাই আমি। নয়তো আপনার সাথে কাট্টি। আর কখনো কোন কথা বলব না এই বলে দিলাম।
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে ফোনটা কেটে দিলাম আমি। তারপর কিছু একটা ভেবে আলমারির কাছে চলে গেলাম।


পর্ব ৩৬

গত ১০ মিনিট হলো আলমারি খুলে তার মাঝে সুন্দর একটি কাপড় পছন্দ করার জন্য খুঁজে চলেছি আমি। যেটা আজকে পরে আরিয়ানকে চমকে দেবো। যেন উনি আমার দিক থেকে চোখ সরাতে না পারেন। কিন্তু কোনভাবে একটাও জামা পছন্দ করতে পারছি না আমি। আলমারির মাঝের সব কাপড়চোপড় প্রায় নিচে ছুড়ে ফেলেছি রাগ করে। কেন পছন্দ হচ্ছেনা তাই। এভাবে করতে করতে হঠাৎ চোখ পরল একটি প্যাকেট এর দিকে। আর তার দিকে চোখ পড়তেই খুশিতে গদগদ হয়ে গেলাম আমি।

কেননা এই প্যাকেটটা সেটা যেটা আরিশার হাত দিয়ে আরিয়ান আমাকে কিনে দিয়েছিল নবীন বরণ উৎসব এর আগের দিন। প্যাকেটটা চোখে পড়তেই দ্রুত সেটা হাতে নিয়ে খাটের উপর চলে গেলাম আমি। তারপর প্যাকেটটা খুলতেই সেই নীল রঙের শাড়ি এবং জুয়েলারি গুলো বের হয়ে এলো। অসম্ভব খুশি লাগছে আমার এগুলো দেখে। কিন্তু এখন খুশি হয়ে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। তাড়াতাড়ি নিজেকে সাজাতে হবে আমায়।

তাই দ্রুত নিচে পড়ে থাকা এলোমেলো কাপড়-চোপড় গুলো তুলে আলমারিতে রেখে কোনমতে আলমারিটা লাগিয়ে রাখলাম। তারপর ওয়াশ রুমে চলে গেলাম শাড়ি এবং প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে। একটু পর ফ্রেস হয়ে শাড়িটা পড়ে আসলাম ওয়াশরুম থেকে। বাইরে আসতেই শুনতে পেলাম আরিয়ানের কন্ঠ। আরিয়ান উত্তেজিত হয়ে সকলের কাছে জানতে চাইছে আমি কোথায়? আমি ঠিক আছি কিনা? ওর কন্ঠ শুনতেই যেন বুকের মধ্যখানে অনেকটাই ধুকপুকানি বেড়ে গেল আমার। তাই দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে বেশ কয়েকবার টোকা দিয়ে বলে উঠলাম,

~ এই যে মিস্টার আরিয়ান চৌধুরি, আমার সাথে দেখা করতে হলে আপনাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। তাই উত্তেজিত না হয়ে চুপচাপ বসে থাকুন। আমি কিছুক্ষনের মাঝেই আসছি।
কথাটি বলেই মুচকি হেসে সেখান থেকে সরে আসলাম আমি। জানি এখন সকালের মাথার মধ্যে নানারকম প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমায় নিয়ে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারন আমি তো এখন তাদের সকলকে নতুন চমক দিতে চলেছি।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বসলাম আমি। তারপর নিজেকে সাজাতে লাগলাম সুন্দর এক নতুন সাজে। আরিয়ানের দেওয়া শাড়ির সাথের সকল জুয়েলারি গুলো একে একে পরে নিলাম, হাতে কপালে গলায় এবং কানে। তারপর ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক দিয়ে চোখে গাঢ় কাজল পরে নিলাম। চুলগুলো চিরুনি করে ঘারের পিঠে ছেড়ে দিলাম। এতটুকুই পার্ফেক্ট, এর চাইতে বেশি সাজগোছ পছন্দ নয় আমার।

তারপর নিজেকে ভালোভাবে একবার আয়নায় দেখে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে আসলাম, দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার জন্য। দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই যেন হার্টবিট দ্বিগুন বেড়ে গেল আমার। বুঝতে পারছি না এমন কেনো লাগছে আমার। অসম্ভব জোরে নিশ্বাস ফেলছি আমি। কেন জানিনা মন থেকে ভীষণ উত্তেজনা ফিল করছি। তবুও নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে বের হলাম। বাইরে বের হয়ে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলাম সোফায় বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে আরিয়ান। বাকি সবাইও আশেপাশেই আছে। শুধু আব্বু আর আম্মু নেই। আমাকে এমন সাজে দেখামাত্র আরিয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।

আর ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি ওর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। তারপর মনে মনে দুষ্টু হেসে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলাম ওর সামনে। তারপর আরিয়ানের ঠিক সামনের সোফাটায় পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়লাম আমি। ওর দিকে তাকিয়ে হাতের আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে ওকে বসতে বললাম। ও বেচারা এখনো আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আমার ইশারা পেয়ে চুপটি করে সোফায় বসে পড়ে একই ভাবে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি মুখ লুকিয়ে কিছুটা মুচকি হেসে নিয়ে আবার গম্ভীর মুখ করে বলে উঠলাম,

~ তো বলুন মিস্টার আরিয়ান চৌধুরী, আপনি যে আমাকে দেখতে এসেছেন আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়েছে?
আমার এমন কথা শুনে উপস্থিত সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সবাই বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। হয়তো সবাই মনে মনে ভাবছে আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু তারা তো আর জানেনা, আমার মাথায় এখন কি দুষ্টুমি প্ল্যানিং চলছে। সবাইকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমি এবার রাই এর দিকে তাকিয়ে বললাম,

~ এই যে মিস রাই চৌধুরী। আপনি তো মনে হয় আপনার ভাইয়ার সাথে মানে আরিয়ান চৌধুরীর সাথে এসেছেন তাই না? তাহলে আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আপনি গিয়ে উনার পাশে বোসুন। আর ভাইয়া তুমি এসে আমার পাশে বসো। তোমার বোনকে দেখতে এসেছে আর তুমি কিনা ওখানে ক্যাবলাকান্তর মতো হা করে দাঁড়িয়ে আছো? এটা কেমন কথা বলতো? এখানে এসে আমার পাশে বসো।

আমার কথার উত্তরে কেউ কিছু না বলে যা বললাম তাই করে বসল ওরা। রাই গিয়ে সোজা আরিয়ানের পাশে বসলো। আর ভাইয়া এসে আমার পাসে। সবাই যেন বোঝার চেষ্টা করছে আমি কি করতে চাইছি। তবে সবাই যে অনেক বেশি কনফিউজড এটা আমি খুব ভালভাবেই বুঝতে পারছি। হঠাৎ ভাইয়া আমায় কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই আমি ভাইয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম,
~ প্লিজ ভাইয়া এখন কোন কথা বলো না। আমাকে প্রশ্ন করতে দাও। আফটার অল আমাকেও তো জানতে হবে যার সাথে আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে সে কেমন মানুষ। তার সম্পর্কে তো বিশ্লেষণ না জেনে তাকে আমি বিয়ে করতে পারি না তাই না? তুমি মিস্টার আরিয়ান চৌধুরি আপনি কি করেন?

আমার কথার উত্তরে আরিয়ান কি বলবে বুঝতে পারছেনা। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি আবার গলা খাখারি দিয়ে বলে উঠলাম,
~ কি হলো আপনার কি কোন সমস্যা আছে? নাকি কথা বলতে পারেন না আপনি? আমি জিজ্ঞেস করছি আপনি কি করেন?
এবার আরিয়ান নড়েচড়ে বসে কেশে নিয়ে বলে উঠল,

~ আমি, আমি চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিক আরিয়ান চৌধুরি। এ ছাড়াও আমার দেশ বিদেশে বিজনেস আছে। আই এম এ বিজনেসম্যান।
~ ওহ গুড। তা আমাকে দেখে আপনার কেমন লাগলো? মানে পাত্রী দেখতে এসেছেন বলে কথা? আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়েছে?

আমার কথা শুনে এবার বেক্কলের মত তাকিয়ে রইল আরিয়ান আমার দিকে। আমি আবারো ওর সামনে হাতের আঙ্গুল দিয়ে চুটকি বাজিয়ে বলে উঠলাম,
~ কি হলো বলুন তো? আপনাকে একটা প্রশ্ন একবার করলে কি বুঝতে পারেন না নাকি? আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়েছে?
আরিয়ান দ্রুত বলে উঠলো,

~ হ্যা হ্যা পছন্দ হয়েছে। অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে তোমাকে আমার।
~ হুমম সেটা তো আগেই বুঝেছি। তো আপনি জানতে চাইবেন না, আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে কিনা?
আমার কথার উত্তরে আরিয়ান কিছু বলার আগেই ভাইয়া পাশ থেকে রাগী গলায় বলে উঠল,

~ কি হচ্ছে কি রাহি তখন থেকে? তুই কি পাগল হয়ে গিয়েছিস নাকি? কি বলছিস এসব আবোল-তাবোল?
ভাইয়ার কথার উত্তরে ওর দিকে তাকিয়ে কিছু বলব, তার আগেই আরিশা ভাইয়ার কাছে এগিয়ে এসে বলে উঠল,
~ ভাইয়া আপনি চুপ থাকুন। রাহি যা করছে তা ওকে করতে দিন।

আমি আরিশার দিকে তাকিয়ে উড়ন্ত কিস ছুড়ে দিয়ে বলে উঠলাম,
~ থ্যাঙ্ক ইউ সুইটহার্ট থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।

আমার এমন কান্ডে আরিশা সহ উপস্থিত সবাই বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আবারও আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
~ তা মিস্টার আরিয়ান আপনি হাতের কাজ কেমন জানেন? আই মিন রান্না-বান্না সব জানেন তো? আমি কিন্তু বিয়ের পর রান্না করে খাওয়াতে পারব না বরং আপনাকেই রান্না করে খাওয়াতে হবে আমায়।
আমার কথা শুনে ইয়া বড় বড় চোখ করে আরিয়ান তাকালো আমার দিকে। তারপর শুকনো ঢোক গিলে বলে উঠলো,

~ রাহি তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? তুমি এসব কি শুরু করেছো বলোতো?
ওনার কথায় পাত্তা না দিয়ে আমি আবারও বললাম,

~ দেখুন মিস্টার আরিয়ান আমি তেমন কিছুই শুরু করিনি। আসলে বিয়ের আগে ছেলেরা একরকম দেখায় আর বিয়ের পরে আরেকরকম, তাই বিয়ের আগে সবকিছু শিওর হয়ে নিতে চাইছি। আচ্ছা আপনি যদি কিছু না মনে করেন তাহলে আপনার সাথে আমি একটু আলাদা কথা বলতে চাই। সো আপনার কি সময় হবে?
আমার কথার উত্তরে এক লাফে উঠে দাঁড়ালো আরিয়ান। আর দ্রুত আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
~ অবশ্যই হবে, চলো যাই।

ওর এমন কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবাই বেক্কলের মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসতে শুরু করলো। আমার যে হাসি পাচ্ছে না তা কিন্তু নয়। কিন্তু যতটা সম্ভব নিজের হাসিটা কে লুকিয়ে যাচ্ছি আমি। আরিয়ানের এমন অদ্ভুত কান্ড সত্যিই অনেক হাস্যকর। সবার সামনে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমি আরিয়ানকে নিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম। তারপর ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে বিছানার উপর গিয়ে বসে ওনাকে ইশারা করে আমার পাশে বসতে বললাম। উনি এসে আমার পাসে চুপচাপ বসে পরলেন। আমি আবার ওনার সামনে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উনাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলাম। দেখে নিয়ে বললাম,

~ আচ্ছা আপনি কি চুল চিরুনি করেন না? মানে আপনি এত অগোছালো কেন? চুলগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। শরীরের জামা কাপড়ও কেমন অগোছালো লাগছে। বলি আপনি কি পাগল? এত বড়লোক একটা মানুষ কিন্তু আপনার এই অবস্থা কেন?

উনি আমার কথার উত্তরে আমার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ছোট করে বলে উঠলো,
~ তোমার জন্য!

ওনার এতোটুকু কথা’ই যেনো আমার বুকটাকে ক্ষতবিক্ষত করতে যথেষ্ট। আমি আর ওনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উনার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলাম না। মনে মনে যতই দুষ্টুমি প্ল্যান করি না কেন ওনার সামনে এসে সবকিছুই কেমন গুলিয়ে ফেলেছি আমি। তাই ওনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,

~ দেখুন আরিয়ান আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিয়েতে আমার মত ছিল না। কিন্তু এখন আমিও আপনাকে বিয়ে করতে চাই। তবে সেটা নতুন করে। আগের বিয়েটা আমি মানি না, আপনি যদি আমাকে স্ত্রীরূপে পেতে চান তাহলে আমাকে নতুন করে বিয়ে করতে হবে আপনাকে। আর এতদিন আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে আমার জন্য।
আমার কথার উত্তরে উনি কিছু না বলে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুতগতিতে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমায় আচমকাই জড়িয়ে ধরলেন।

উনার এমন আচরণে আমার কি করা উচিত আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। তাই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম আমার ঘারের কাছের শাড়ি অনেকটাই ভিজে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম উনি হয়তো আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন। আমি কি করবো বুঝতে পারছিনা তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু উনি যেন আমাকে ছাড়ার নাম’ই করছেন না। সেই কখন থেকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে কান্না করে চলেছেন। এদিকে আমার অবস্থা বেহাল হয়ে যাচ্ছে। কেননা উনি আমাকে এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে যে আমার মনে হচ্ছে আমার হাড়গোড় গুলো সব ভেঙে যাবে এখন। তাই আমি নিজের ডান হাতটা আলতো করে উনার পিঠে স্পর্শ করে বলে উঠলাম,

~ আই এম সরি আরিয়ান। আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে, আমি না জেনে আপনাকে বড্ড বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন।
আমার কথার উত্তরে উনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার দু গালে হাত রেখে কপালে আলতো করে একটি চুমু এঁকে দিয়ে বলে উঠলেন,

~ তুমি একদম ছোট্ট শিশুর মত নিষ্পাপ রাহি। আর এই নিষ্পাপ মেয়েটিকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি। তোমার কোনো ভুল হয়নি। তোমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো তোমার চাইতেও বেশি খারাপ আচরণ করতো আমার সাথে। তুমি সে তুলনায় কিছুই করোনি। আর আমি এতেই সার্থক যে তুমি স্বাভাবিক হয়ে গেছো। তোমার সব অসুখ সেরে গেছে। এটাই আমার কাছে যথেষ্ট। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে নতুন করে বিয়ে করে আমার বাসায় নিয়ে যাব। আমার বউ করে। আর তোমার এই অগোছালো স্বামী তোমার কাছে গোছালো হয়ে ফিরবে আবার। প্রমিস কথাগুলো বলেই উনি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তখনই আমি ওনার হাতটি ধরে ফেললাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করে জানতে চাইলেন, “কি হয়েছে”। আমি এবার অভিমানী ফেস করে বলে উঠলাম,

~ আমি যে আপনার জন্য এত সুন্দর করে সাজালাম! আপনারই দেওয়া শাড়ি পড়ে! আপনি তো কিছু বললেন না আমায় কেমন লাগছে?
আমার কথার উত্তরে উনি একবার আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভাল করে দেখে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
~ এখন কিছু বলবো না সময় হলে বলব! এখন বলতে গেলে সমস্যায় পড়ে যাব।

কথাটি বলেই মুচকি হেসে আমার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন উনি। আর আমি বিছানায় বসে লজ্জা মাখা মুখ করে হাসতে লাগলাম আনমনেই।


পর্ব ৩৭

১৫ দিন পর,
সারা বাড়ি ভর্তি মানুষ দিয়ে। সবাই হলুদের আয়োজন করতে আর বাড়ি সাজাতে ব্যস্ত। আজকে আমার সাথে রাজের গায়ে হলুদ। আর কালকে বিয়ে। বিয়ে টা বেশ জাঁকজমক ভাবেই প্ল্যান করেছে রাজ। এর আগে তো তেমন কিছুই হয়েছিল না বিয়েতে! তাই এবার সবকিছু খুবই ধুমধাম করে পালন হচ্ছে। তবে আমার মনটা খুব খারাপ। সেই কখন থেকে জানালার ধারে বসে বসে মন খারাপ করে আছি আমি। মন খারাপ হওয়ারও অবশ্য একটা কারন আছে। কালকে থেকে রাজের সাথে একটিবারও কথা হয়নি আমার।

কেন জানি না ও আমার ফোন তুলছে না। বিয়ের আগেই আমাকে পর করে দিচ্ছে না তো? গত 15 দিন তো প্রত্যেক ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে কথা বলতো আমার সাথে। আর কাল থেকে কি হয়েছে বুঝতে পারছি না। একটি বারের জন্যেও কি আমার কথা মনে পড়ছে না তার? ধুর বাবা কিচ্ছু ভালো লাগছেনা আমার। কখন থেকে মন খারাপ করে একা একা বসে থাকতে থাকতে বেশ বোর হয়ে যাচ্ছি আমি। হঠাৎ রাইয়ের ডাকে ধ্যান ভাঙল আমার। রাই আমার পাশে এগিয়ে এসে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,

~ কি হয়েছে আমার দুষ্টু ননদিনীটার? এভাবে মুখটা গোমরা করে বসে আছে কেন সে?

রাই এর কথা শুনে ওর দিকে গোমরা মুখ করে তাকালাম আমি। তারপর আবারো সামনের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলে উঠলাম,
~ কি করবো বলো না! তোমার ভাইয়াটা কে দেখেছ, কত স্বার্থপর হয়েছে সে। কালকে রাত থেকে একটি বারের জন্যও ফোন করল না আমাকে। এদিকে আমি তাকে ফোন করতে করতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। কেন যে নতুন করে আবার বিয়ে করতে বললাম আমাকে? এখন তো মনে হচ্ছে উনি আমাকে পর করে দিচ্ছেন। কিছু ভালো লাগছে না।
আমার কথায় হাসতে হাসতে আমার সামনে এসে বসে পরলো রাই। তারপর আমার থুতনিতে হাত রেখে বলল,

~ ওরে আমার দুষ্টু মিষ্টি ভাবি জান রে! তুমি তো দেখছি এখনই আমার ভাইয়াকে চোখে হারাচ্ছ? নতুন করে আবার বিয়ে হয়নি এখনই এতদূর? আরে একটু ওয়েট করো, আমার ভাইয়া যখনই এমন কিছু করে তখনই কোন না কোন চমক দিয়ে থাকে। হয়তো তোমার জন্যেও সে কোনো চমকের ব্যাবস্থা করছে। এখন কথা না বাড়িয়ে জলদি চলো তোমার গায়ে হলুদ হবে।
কথাগুলো বলেই আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল রাই। আমিও চুপচাপ বিরক্তিকর ভঙ্গিতে ওর সাথে যেতে লাগলাম। বাইরে এসে দাঁড়াতেই সবাই মিলে হাজির হলো আমাকে হলুদ লাগানোর জন্য। রাই আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে চলে গেল হলুদের বাটি আনতে। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
~ আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। আমি একটু পরেই ওকে নিয়ে আসছি। আসলে একটি জরুরি কাজ পরে গেছে।

কথাগুলো বলেই কারো উত্তরের আশা না করে আমার হাত ধরে নিয়ে বাসার মধ্যে চলে এল রাই। আমি ওর হাত ছাড়িয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
~ কি ব্যাপার রাই, হঠাৎ আমাকে ওখান থেকে এভাবে নিয়ে আসলে কেন? কি হয়েছে?

আমার কথার উত্তরে রাই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
~ একটু প্রয়োজন আছে তোমার সাথে।
কথাটি বলেই আমাকে আমার রুমের মাঝে নিয়ে এসে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
~ তুমি এখানে একটু অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুনি আসছি।

কথাটা বলেই আমাকে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল রাই। আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা ও কি করতে চাইছে। এমনিতেই সকাল থেকে আমার মন খারাপ। তারপর রাই এর এমন আচরণে আরো বেশি খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে মেজাজটা। কোন কিছুই ভালো লাগছে না। তাই বিছানা ছেড়ে উঠে আবারো জানালার পাশে চলে গেলাম আমি। রাগে যেন সারা শরীর জ্বলছে আমার রাজের ওপর। কেমন লোক উনি একটিবারও আমার কাছে ফোন করার প্রয়োজন মনে করলেন না? এই বুঝি তার ভালোবাসা?

হঠাৎ দরজা লাগানোর শব্দে ধ্যান ভাঙলো আমার। আমি জানালার দিক থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলাম রাজ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। সাদা রঙের পাঞ্জাবী পরা সাথে দুগাল ভর্তি হলুদ মাখানো। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে। আমি বেহায়ার মত তার দিকে এক নজরে হা করে তাকিয়ে রইলাম। চোখের পলক যেন তার দিক থেকে ফেরাতে পারছিনা। ইশশ আমার বরটা এত সুন্দর কেন? যে শুধু দেখতেই মন চায়। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি গুটি গুটি পায়ে আমার পাশে এগিয়ে এলেন। তারপর আমার সামনে চুটকি বাজিয়ে বললেন,
~ কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছ কেন জান?

ওনার এতোটুকু কথাতেই যেনো শিউরে উঠলাম আমি। এক রাশ লজ্জা এসে ভর করলো আমার ওপর। আমি ওনার দিক থেকে চোখ নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে লজ্জামাখা গলায় বললাম,
~ আ আপনি এখানে?

আমার কথার উত্তরে হালকা হাসলেন উনি। তারপর নিজের হাত দুটি পিছনে গুঁজে আমার মুখের সামনে নিজের মুখ টি নিয়ে এসে মিষ্টি হেসে বললেন,
~ আমার বউটাকে হলুদ মাখা তে এসেছি।

উনার কথায় চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকালাম আমি। সাথে সাথে উনি বুকের বা পাশে হাত দিয়ে বললেন,
~ ইশশ এভাবে তাকিও না জান, এইখানটায় তীরের মত আঘাত লাগে তোমার এই চাহনিতে।

উনার কথায় আবারও লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম আমি। উনি এবার আমার আরো একটু কাছে এগিয়ে এসে বললেন,
~ এভাবে লজ্জা মাখা মুখ নিয়ে আমার সামনে থেকোনা জান। নয় পাগল হয়ে যাবো, অথবা হার্ট এ্যাটাক করে ফেলব। এমনিতেই তোমায় হলুদ শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে হাফ হার্ট এটাক হয়ে গেছে আমার।

উনার কথায় আমি ওনার পাশ থেকে সরে এসে বিছানার উপর বসে অভিমানি গলায় বললাম,
~ ইশশ, হয়েছে আমার সাথে আর এত ভালবাসা দেখাতে হবেনা। কাল রাত থেকে যে একটিবারের জন্য আমাকে ফোন করে নি। আমার ফোন রিসিভ করেনি। সেটা কি ভুলে গেছে সে?
উনি আমার পাশে এসে বসে আমার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা নিজের দিকে তুলে নিজের কান ধরে বললো,

~ স্যরি জান আসলে তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। তাই ইচ্ছা করে ফোন ধরিনি। তবে জানো তোমার ফোন না ধরায় তোমার চাইতে হাজারগুণ বেশি কষ্ট হয়েছে আমার? তবে তোমাকে এই মুহুর্ত টুকু দেবো বলেই তো সেই কষ্টটা করেছি বলো? আমি এসেছি বলে কি তুমি খুশি হওনি?

ওনার কথায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রাগি গলায় বললাম আমি,
~ না হইনি। আপনি আমার ফোন ধরলেন না কেন আমি রাগ করেছি।

আমার কথায় উনি একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন,
~ আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসায় যখন তুমি খুশি হও নি। তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। থাকো তুমি।
কথাটি বলেই দরজার দিকে পা বাড়ালেন উনি। আমি দ্রুত গিয়ে ওনার হাত ধরে ফেলে নিচের দিকে মুখ করে নরম গলায় বললাম,
~ চলে যেতে বলেছি বলে চলে যাবেন? আমায় হলুদ মাখাবেন না?

আমার কথায় আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার মুখোমুখি মুখ এনে টেডি হেসে বলে উঠলেন উনি,
~ আমি জানতাম তুমি আমায় যেতে দেবে না। তাইতো চলে যাওয়ার নাটক করলাম জান।
~ ইশশ আপনি বড্ড পঁচা, খুব বাজে একটা লোক।
~ হুমম সে তুমি বলতেই পারো, তোমারই তো বর আমি।

উনার কথায় লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। উনি আবার টেডি হেসে আমার সামনে এগিয়ে এসে বললেন,
~ আমি বেশিক্ষণ এখানে দেরি করতে পারব না জান। এখনি হয়তো রাই এসে ডাক দেবে। তোমাকে হলুদ মাখিয়ে এখনই চলে যেতে হবে আমায়।
উনার কথায় অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম আমি ওনার দিকে। তারপর ছোট করে বলে উঠলাম,
~ এখনই চলে যাবেন?

আমার কথার উত্তরে উনি কোন কথা না বলে আমার পাশে এগিয়ে এলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে আমার গাল জড়িয়ে ধরে নিজের গাল আমার গালের সাথে ঘষে দিলেন। যার ফলে ওনার গালে লেগে থাকা হলুদ আমার দু গালে লেগে গেল। হলুদ মাখিয়ে দিয়ে আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড় করালেন উনি। তারপর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
~ আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখো জান। তোমাকে কতটা সুন্দর লাগছে এই হলুদ রাঙা বউ এর সাজে।

আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। সত্যিই হলুদ মেখে হলুদ শাড়ি পড়ে অনেক সুন্দর লাগছে আমায়। পাশাপাশি ওনাকে সাদা পাঞ্জাবিতে আমার পাশে দাঁড়ানো দেখে আরো বেশি লজ্জা পেয়ে যাচ্ছি আমি। ওনার সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিয়ে বিছানায় এসে বসে পড়লাম আমি। অসম্ভব লজ্জা লাগছে আমার। আমার পাশে এসে আমার সামনে বসে আমার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিয়ে বললেন উনি,

~ হয়েছে জান বাকি লজ্জাটুকু না হয় কালকে পেও? এখন আমি চলে যাবো অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফোনে কথা হবে, আল্লাহ হাফেজ।

কথাটি বলেই উনি দরজা খুলে বেরিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে আর আমার দিকে ফিরে তাকাননি উনি। হয়তো কষ্ট হবে তাই। উনি চলে যাওয়াতে মন খারাপ হলেও কিছুক্ষণ আগের মুহূর্ত গুলো মনে পড়তেই মনটা খুশিতে ভরে গেলো আমার। বার বার সেই মুহুর্তগুলো মনে করে গালে লেগে থাকা হলুদ স্পর্শ করতে লাগলাম আমি। আর হাড়িয়ে যেতে লাগলাম ভাললাগার এক সীমাহীন জগতে।
রাইয়ের ডাকে ধ্যান ভাঙলো আমার। রাই এসে আমার গালের সাথে লেগে থাকা হলুদে হাত দিয়ে বলে উঠলো,

~ আমার ভাবি টা দেখি লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। বলি তোমার গালে এই হলুদটা কে মাখালো গো? নিশ্চয়ই আমার ভাইয়া তাই না?
ওর কথায় লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম আমি। এবার ও একটু হেসে নিয়ে আমাকে লজ্জা দেওয়ার জন্য বলে উঠলো,
~ বাব বাহ এখনি এত লজ্জা? বলি কালকে বাসর ঘরে কি করবে ভাবি?

রাইয়ের এমন কথায় আমি বুঝতে পারলাম ও আমাকে এখন পঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তাই আমিও বুদ্ধি করে বলে উঠলাম,
~ কালকে ঠিক সে ভাবেই লজ্জা পাবো ভাবিজান, যে ভাবে আপনি আমার ভাইয়ের সাথে বাসর ঘরে লজ্জা পেয়েছিলেন।

আমার কথায় রাই বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকাল। তারপর দুজনেই একসাথে হেসে দিলাম। তারপর বেশ কিছুক্ষণ হাসাহাসি দুষ্টুমি করে রাই এর সাথে চলে গেলাম হলুদের স্টেজে। ওখানে যেতেই অনেকেই জিজ্ঞেস করল আমার গালে আগে থেকে হলুদ কি করে এলো তার কথা। রাই তাদের নানা রকম কথা দিয়ে বুঝিয়ে সব সামলে নিল। তারপর বেশ ভালোভাবে গায়ে হলুদ সম্পন্ন হলো আমার।


পর্ব ৩৮

সকাল ৯.১৫ মিনিট
হাতে মেহেদি পরে চুপ করে বসে আছি আমি। আর আমাকে ঘিরে ধরে বসে আছে আমার বান্ধবীরা, কাজিনরা আর রাই। সবাই অনেক হাসাহাসি আর দুষ্টুমি করছে আমার সাথে। আমিও ওদের সাথে কথা বলে বেশ মজা করছি। আর বাড়ি ভর্তি মানুষ জন আয়োজন করছে বিয়ের। আজকে আমার বিয়ে আমার রাজের সাথে। তাইতো এত ধুমধাম আর এত অনুষ্ঠান। আব্বু আম্মু আর ভাইয়া তো সেই তিনদিন আগে থেকে বিজি হয়ে আছে সব দিকে সামাল দিতে। সবাই মিলে কথা বলতে বলতে হঠাৎ রাই সামনে তাকিয়ে বলে উঠলো,

~ আরে আরিশা আপু, তুমি এসেছ? এত দেরী করলে কেন আসতে? আর কালকে হলুদের অনুষ্ঠানে এলেনা কেনো?

কথাটি বলে আরিশার কাছে এগিয়ে গেল রাই। তারপর আরিশার হাত ধরে নিয়ে এলো আমার পাশে। আরিশা আমার পাশে এসে বসে আমার গালে হাত দিয়ে বলল,
~ বাহ বেশ সুন্দর লাগছে তোমায় রাহি। দুঃখিত কালকে তোমার হলুদের অনুষ্ঠানে আসতে পারিনি। আর আজকে তোমার বিয়েতে ও থাকতে পারবো না।
ওর কথা শুনে আমি গোমড়া মুখ করে বলে উঠলাম,

~ এটা কেমন কথা বলছ আরিশা? তুমি আমার বিয়েতে থাকবেনা কেন? আর কালকে হলুদ এই বা কেন এলেনা তুমি?
আমার কথায় আরিশা জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলে উঠলো,

~ আসলে কালকে আম্মুর হসপিটালে একটু কাজ পরে গিয়েছিলো। তাই আম্মুর সাথে সেখানেই থাকতে হয়েছিল আমায়। তুমি তো জানোই আমি ডাক্তার হতে চাই। তাই অনেক চাওয়া সত্ত্বেও তোমার হলুদে থাকতে পারিনি কাল। আর আজকে আমাকে একটি জরুরী কাজে বিদেশ যেতে হবে। দুই এক মাসের মাঝে ফিরে আসবো। তাই তোমার বিয়েতেও থাকতে পারছিনা। প্লিজ তুমি রাগ করো না রাহি। তবে কথা দিচ্ছি খুব দ্রুতই তোমাদের জীবনে ফিরে আসব আমি। আর তখন তোমাদের সাথে অনেক মজা করবো কেমন।

আরিশা আমার কাছে নিজের ব্যস্ততা দেখালেও, আমি বেশ ভালো করেই জানি ও কেন আমার বিয়েতে থাকতে চাইছে না। আরিশা তো রাজকে সত্যিই মন থেকে ভালোবাসে। তাহলে ও কিভাবে মেনে নেবে নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্যের সাথে বিয়ে হতে দেখে? তাই হয়তো আমার বিয়েতে থাকতে চাইছে না ও। বাহানা দেখিয়ে চলে যেতে চাইছে। আমি চাইলেও ওকে আটকাতে পারবো না। কেননা আমিও তো নিজের রাজের ভালোবাসা কারো সাথে ভাগ করতে পারবো না। বা কাউকে দিতে পারবো না। এতটা দয়াবানও নই আমি। তাই ওকে আটকালাম না। বরং ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলাম,
~ ঠিক আছে তোমার যখন মন চায় তুমি ফিরে এসো আরিশা। আমরা অপেক্ষা করবো তোমার জন্য।

আমার কথার উত্তরে ও শুধু আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওর ব্যাগ থেকে একটি জুয়েলারি বক্স বের করল। তারপর সেটা আমার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,
~ তোমার বিয়েতে তো থাকতে পারবো না! কিন্তু তোমার বিয়ের গিফ্টা কিন্তু আনতে ভুল করিনি। এই নাও এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য উপহার। সবসময় এটা নিজের কাছে রেখ। মনে রাখবে এটা শুধু তোমার বান্ধবী নয় তোমার বড় বোনের দেওয়া একটি উপহার তোমার জন্য।

কথাগুলো বলেই জুয়েলারি বক্স টা খুলে একটি অনেক সুন্দর লকেট সহ চেইন বের করলো আরিশা। লকেটার সাথে একটি সুন্দর হিরা লাগানো। এটা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারছি আমি। আমার হাতে মেহেদি থাকায় আমি সেটা স্পর্শ করতে পারলাম না। তাই আরিশা নিজেই পরিয়ে দিল আমার গলায়। তারপর কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আর কোন কিছু না বলে অশ্রু ভেজা চোখ নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল আমার সামনে থেকে। আমি চাইলেও আর ওকে আটকাতে পারি না। কারন ও এখন কান্না করছে হয়তো নিজের মনের কষ্টগুলো চোখের জল দিয়ে মুছে ফেলতে। কিন্তু আমি যে নিরুপায়, চাইলেও ওর সেই অশ্রু মুছে দিতে পারবো না আমি। কারন ওর এই অশ্রু মুছে দিতে হলে আমার রাজকে ওকে দিতে হবে। সেটা কখনোই সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

লাল টকটকে বিয়ের বেনারসি শাড়ি আর একগাদা গয়না পড়ে বধু সেজে বসে আছি আমি। বরযাত্রীও অনেক আগেই চলে এসেছে। কিন্তু এখন অব্দি রাজের সাথে একটিবারও দেখা হয়নি আমার। মনটা বেশ আকুপাকু করছে ওকে এক নজর দেখার জন্য। বর সেজে কেমন লাগছে সেটা যেন চোখে হারাচ্ছি আমি। কিন্তু উপায় নেই, আমাকে ঘিরে ধরে বসে আছে অনেক আত্মীয়স্বজন বান্ধবী ও কাজিনরা। সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে তো আর আমি গিয়ে নিজের বরকে দেখতে পারিনা বেহায়ার মত! তাই বিরক্তি নিয়ে বসে আছি আমি। আমার মত হয়তো রাজের ও এখন একই অবস্থা। কিন্তু কি আর করার ওর ও তো এখন সম্ভব নয় আমাকে এভাবে দেখতে আসার। তাই চুপচাপ বসে থাকাই ভালো মনে হচ্ছে। হঠাৎ কানের কাছে কারো ফিসফিস কথা শুনে ধ্যান ভাঙলো আমার। সেদিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখি রাই আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে,

~ কি ব্যাপার ভাবিজান আপনার কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন বলে মন খারাপ? নাকি আমার ভাইয়াকে এখন পর্যন্ত বর সেজে দেখতে পারলেন না সেজন্য মন খারাপ? কোন টা বলুন তো আমায়?
ওর কথায় বেশ লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। মেয়েটা এত দুষ্টু হয়েছে না কি বলবো। ভাইয়ার সাথে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে যেন দুষ্টুমিটা হাজার গুণ বেড়ে গেছে ওর। সব সময় আমার পিছু লেগে থাকে কি করে আমায় লজ্জায় ফেলা যায় এটা ভেবে। কি ডেঞ্জারাস একটা ননদিনী পেয়েছি রে বাবা। তবে ওর এই দুষ্টুমিগুলো ভীষণ ভালো লাগে আমার। কারন আমিও তো আর কম দুষ্টুমি করি না ওর সাথে, ভাইয়াকে জড়িয়ে। কিন্তু এখন কি করব সেটা ভেবে না পেয়ে ওর দিকে গরম দৃষ্টিতে তাকালাম আমি। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও খলখলিয়ে হেসে দিলো। তারপরে আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,

~ ভাবিজান যদি তুমি চাও তাহলে কিন্তু আমি ভাইয়ার সাথে এই মুহূর্তে তোমার দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। কিন্তু তার বদলে আমি কি পাবো?
ওর কথা শুনে খুশি তে যেনো মনটা নেচে উঠল আমার। ইচ্ছা করছে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে গালে একটা কিস করতে। কিন্তু এতো মানুষের সামনে এখন এটা করা সম্ভব নয়। তাই নিজেকে সংযত রেখে বলে উঠলাম,
~ যা চাও তাই পাবে।

আমার কথায় পাজিটা আরো যেন হাসিতে ফেটে পড়তে লাগলো। ওকে এভাবে হাসতে দেখে আমার আশে পাশে বসে থাকা সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে। সবাইকে এভাবে তাকাবে দেখে হাসি থামিয়ে নিজেকে শান্ত করলো রাই। তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

~ আপনারা সবাই এখানে একটু বসুন আমি একটু ভাবিকে নিয়ে ঘুরে আসছি। আসলে একটা প্রয়োজন আছে ওর সাথে, প্লিজ কেউ কিছু মনে করবেন না।
কথাটি বলে কারো কোনো উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে আমাকে সাথে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে চলে আসলো রাই। তারপর আমাকে সকলের চোখের আড়াল দিয়ে লুকিয়ে নিয়ে ছাদের দিকে যেতে লাগলো। ওকে ছাদে যেতে দেখে আমি থেমে গিয়ে বললাম,

~ কি ব্যাপার রাই, এখন ছাদে যাচ্ছ কেন? তুমি না বললে রাজের সাথে দেখা করিয়ে দেবে?
রাই আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল,

~ আরে বাবা এখন কি আমাদের বাসার কোন রুম খালি আছে নাকি যে তোমাদের সেখানে দেখা করিয়ে দিব? এখন দেখা করতে হলে একমাত্র ছাদটাই খালি আছে। তাই সেখানেই চলো। তবে হ্যাঁ, জাস্ট পাঁচ মিনিট সময়। এর চাইতে বেশিক্ষণ কিন্তু আমি সকলকে সামলাতে পারবো না বলে দিলাম। আমি এখানে অপেক্ষা করছি তুমি জাস্ট যাবে আর আসবে।
রাই এর কথা শুনে আমি উপরে যেতে নিয়ে আবার থেমে গিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
~কিন্তু রাই তোমার ভাইয়া? ও কোথায়?

আমার কথার উত্তরে কপালে হাত দিয়ে বলল রাই,
~ আরে বাবা তুমি তাড়াতাড়ি যাও ভাইয়া অনেকক্ষণ হলো তোমার জন্য ছাদে অপেক্ষা করছে।

ওর কথা শুনে আমি এক প্রকার দৌড়ে ছাদে উঠতে লাগলাম। তখনই পিছন থেকে রাই এর ফোনটা বেজে উঠল। ওর ফোন বেজে উঠতেই আমি সামনে না এগিয়ে সেখানেই থেমে গেলাম। রাই ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে আমাকে ইশারা করে উপরে যেতে মানা করে দিল। ওর ইশারা পেয়ে আমি উপর দিকে না গিয়ে আবার ধীরে ধীরে নিচে নেমে ওর পাশে এসে দাঁড়ালাম। ও ফোনে কিছুক্ষন হু হা করে কথা বলে ফোনটা কেটে দিয়ে আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

~ সরি ভাবী অনেক দেরি করে ফেলেছি তোমাকে নিয়ে আসতে। আসলে ভাইয়া চলে গেছে। কাজী সাহেব নাকি বারবার তাড়া দিচ্ছিল বিয়ে পড়ানোর জন্য। তাই ভাইয়া আর অপেক্ষা করতে পারেনি। তবে তুমি চিন্তা করো না একেবারে শুভদৃষ্টি টা না হয় বাসর ঘরে করে নিও। এখন প্লিজ আর মন খারাপ না করে আমার সাথে চলো। ওদিকে তোমাকেও হয়তো বিয়ে পড়াতে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
ওর কথায় একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসিমুখে ওর সাথে আবারো সেই রুমে ফিরে এসে বসে পড়লাম আমি। তবে মন খারাপ হলো না আমার। কথায় আছে অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয়। আমিও না হয় অপেক্ষা’ই করলাম ওনাকে বর বেসে দেখার জন্য।

একটু পর কাজী সাহেব এসে বিয়ে পড়িয়ে চলে গেলেন। খুব ভালোভাবেই বিয়েটা সম্পন্ন হলো আমাদের। এত সময়ের মাঝে একটি বারের জন্য ও রাজের সাথে দেখা হলো না আমার। এমনকি বিয়ের শেষে দুজনকে একসাথে বসিয়ে ছবি তোলার কথা। কিন্তু জানিনা কার আইডিয়া মতে সেটাও ক্যানসেল করা হলো। সবাই বলে দিল আমাদের দেখা একদম বাসর ঘরেই হবে। তাই রাজকে নিয়ে এসে আমার পাশে বসানো হলো না। এই কারণে আমার বেশ মন খারাপ হলেও নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর সকলের থেকে বিদায় নিয়ে রাত দশটার দিকে রাজের সাথে গাড়িতে উঠে শ্বশুর-বাড়ির দিকে রওনা দিলাম আমরা। এতটুকু সময়ের মাঝে রাজের সাথে একটি কথাও হয়নি আমার। তবে রাজ আমার বাসার বাকি সকলের সাথেই কথা বলেছে আমার সামনেই। রাগে অভিমানে আমি ওর দিকে ফিরেও তাকাইনি একবার।

রাজের বাসার সামনে এসে গাড়ি থামলো। পুরো রাস্তা জুড়ে আমার সাথে একটি কথাও বলেননি রাজ। আমিও ওনার সাথে কথা না বলে গাড়ির একপাশে মুখ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। খুব অভিমান হয়েছিল আমার। উনি কেমন লোক একটা, সারাটা রাস্তা একটি কথাও বলল না আমার সাথে? বিয়ে করে নিয়ে এসে কি পর করে দিচ্ছে আমায়? এসব কথা ভাবছি আর প্রচুর কান্না পাচ্ছে আমার। বাবা-মাকে ছেড়ে আসতেও এতটা কষ্ট হয়নি। কিন্তু এখন ঊনার অবহেলা সহ্য করতে পারছিনা আমি। খুব কষ্ট হচ্ছে।

বারবার মনে হচ্ছে বিয়ে করে নিয়ে এসে উনি আমাকে পর করে দিচ্ছেন। বা আমার কোন ভুলের শাস্তি দিচ্ছেন উনি। আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখেই উনি গাড়ির দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে সোজা বাসায় ঢুকে গেল। ওনার এমন আচরণে ভীষন অবাক হলাম আমি। আমি গাড়ি থেকে না নেমে গাড়িতেই চুপ করে বসে রইলাম। এবার সত্যিই দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরার উপক্রম হল আমার। তখনই খেয়াল করলাম উনি আবারো বাসা থেকে বেরিয়ে আসছেন। তবে ওনার মুখে মুচকি হাঁসি। উনি এসেই গাড়ির দরজা খুলে আমাকে গাড়ি থেকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর কোলে করে নিয়ে বাসার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। আমি ওনার গলা জড়িয়ে ধরে অবাক চোখে ওনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আসলে কি করতে চাইছেন উনি? তবে উনি একটিবারের জন্যেও আমার মুখের দিকে তাকালেন না। ওবার দৃষ্টি সোজা বাসার দরজার দিকে।

আমাকে কোলে করে নিয়ে সোজা বাসার মধ্যে ঢুকে গেলেন উনি। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেলাম আমি। কেননা পুরো বাসাটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু টিপটিপ করে কয়েকটি মোমের আলো জ্বলছে। তাতে যা একটু অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব। আমি অবাক হয়ে উনাকে কিছু বলতে যাব, তার আগেই উনি আমায় থামিয়ে দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়েই বলে উঠলেন,
~ চুপ কোন কথা নয়!

উনার কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। কোন কথা বলছি না। উনি আমাকে কোলে করে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে উপর তলায় চলে গেলেন। তারপর উনার রুমের দরজার সামনে গিয়ে নামিয়ে দিলেন আমায়। আমাকে নামিয়ে দিয়ে উনি কোথায় যেন চলে গেলেন। পুরো বাসায় মোমবাতি জালানো বলে কোন কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তাই উনি হঠাৎ কোথায় চলে গেলেন আমি ওনাকে আর কোথাও দেখতে পেলাম না। এবার বেশ বিরক্ত লাগছে আমার। রাগও হচ্ছে প্রচুর। কেন জানিনা কিছু ভালো লাগছেনা।

এখন ইচ্ছে করছে বাসায় ফিরে যাই ওনার সাথে আর কথাই বলব না। কিন্তু কি আর করার বিয়ে যখন করেছি এখানে তো থাকতে হবে। তাই দরজা ঠেলে সোজা রুমের মধ্যে ঢুকে পড়লাম আমি। সাথে সাথে উপর থেকে হাজার গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে পড়ল আমার উপর। আর-রূম জুরে তাজা ফুলের সৌরভে সুরভিত হয়ে গেল আমার নাক। আমি অপলক দৃষ্টিতে চারিপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। পুরো রুমটা একদম তাজা ফুল দিয়ে সাজানো। অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে রুমটা। যেন কোন ফুলের বাগানের চাইতে কম নয়। যে ফুলের বাগানে পাতাবিহীন শুধু ফুলই ফুটে আছে। আমি অবাক দৃষ্টীতে রুমটা দেখতে দেখতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। পুরো মেঝেতেও যেন ফুল দিয়ে বিছানা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু ফুল আর ফুল সব জায়গায়। খুশিতে চোখে জল এসে গেল আমার। ইচ্ছে করছে পুরোটা রুমে পাগলের মত লাফালাফি করে ফুলগুলো দিয়ে খেলি আমি। ছোটবেলা থেকেই ফুল অনেক ভালবাসতাম আমি। এমন একটি ফুলে রাঙানো বাসর ঘরের কথা চিন্তাও করতে পারিনি আমি।

এতটা সুন্দর করেও কেউ বাসর ঘর সাজাতে পারে? আমি যখন এসব ভাবনায় ব্যস্ত, তখনই পিছনে কোন কিছুর শব্দ পেয়ে পিছন দিকে ঘুরে তাকালাম আমি। আর তাকাতেই দেখতে পেলাম হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ নিয়ে আমার পিছনে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজ। ওর দিকে তাকাতেই ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। কারন ওর চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার প্রতি ওর একটি নেশা কাজ করছে। ও নেশা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। রাজ একপা একপা করে আমার পাশে এসে দাড়ালো। ওকে কাছে আসতে দেখে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলাম আমি। ও আমার থুতনি ধরে আমার মুখটা ওর মুখোমুখি নিয়ে বলে উঠল,
~ এই মেয়ে, তুমি কি আমার’ই বউ? শুধু আমার?

উনার কথায় বেশ অবাক হলাম আমি। এটা আবার কেমন প্রশ্ন? বিয়ে করে নিয়ে এসে বলছে আমি ওনার বৌ কিনা? তাই কোমরে হাত দিয়ে বেশ রাগী লুকে উনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
~ তো আপনার কি মনে হয় আমি অন্য কারো বউ? ঠিক আছে তাহলে আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেন? আমি চলে যাচ্ছি আমার বরের কাছে!
আমাকে চলে যেতে দেখে উনি আমার হাত ধরে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

~ চলে যেতে দেবো বলে তো এখানে নিয়ে আসিনি তোমায় জান। তুমি গেলে যে আমার জান বেরিয়ে যাবে। আসলে কি বলতো সকাল থেকে তোমাকে বধু সাজে একটি বার দেখবো বলে পাগল হয়েছিলাম আমি। অনেক বার সুযোগ পেয়েও হারিয়েছি। তাইতো গাড়িতে ওঠার পর আর তোমার সাথে কথা বলিনি বা তোমার দিকে ফিরেও তাকাই নি। কারণ আমি চেয়েছিলাম সারা দিন যখন ধৈর্য ধরতে পেরেছি তাহলে তোমাকে না হয় একদম বাসর ঘরে এসেই মন ভরে দেখব। তাইতো এত আয়োজন।

উনার কথায় বেশ লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। লজ্জা পাওয়া ভঙ্গিতে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,

~ তাহলে আপনি পুরো বাসার লাইট অফ করে রেখেছেন কেন? আর এত মোমবাতি’ই বা জ্বালিয়েছেন কেন?
~ যে ঘরে এমন সুন্দর একটি চাঁদ আছে, যার রূপের আলোতে পুরো ঘর আলোকিত হয়। সেই ঘরে লাইট এর কি দরকার বল? আজ রাতে না হয় আমি এই চাঁদের আলোতেই কাটিয়ে দিব। লাইটের আলো নাই বা জ্বালালাম আজ।

কথাটি বলেই আরও গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরলেন উনি আমাকে। উনার কথায় এবার অনেকটা বেশি লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। তাই উনার দিকে ঘুরে উনার বুকে মুখ লুকালাম আমি। উনি আমাকে পরম ভালবাসায় বুকে জড়িয়ে নিলেন। সাথে উনার মুখে ফুটিয়ে তুললেন বিজয়ের হাসি। আজ যে পূর্ণতা পাবে আমাদের অপূর্ণ ভালবাসা। আর সম্পন্ন হবে আমাদের অসম্পূর্ণ ভালোবাসার গল্প। যে ভালোবাসায় থাকবে না আর কোনো বাধা-বিপত্তি। যে ভালোবাসা হবে সারাটি জীবনের বেঁচে থাকার দিক নিদর্শন। যতদিন বেঁচে থাকবো এই ভালবাসায় যেন সারা জীবন জড়িয়ে থাকতে পারি দুজন। সব পাঠকেরা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।


পর্ব ৩৯

সকালের মিষ্টি রোদ চোখে এসে লাগতেই ঘুম ভেঙে গেল আমার। ঢুলুঢুলু চোখে পাশে তাকিয়ে দেখি রাজ আমার পাশে নেই। হয়তো অনেক আগেই উঠে গেছে ও। সামনে থাকা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখি সকাল ৮.৩০ মিনিট বেজে গেছে। ইস নতুন বউ হয়ে এত বেলা পর্যন্ত ঘুম পাড়া একদম উচিত হয়নি আমার। তাই দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে পরে, কাপড়-চোপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলাম ওয়াশরুমে। যত দ্রুত সম্ভব ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে রান্নার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে আমায়, এটা ভেবে। কারন বাসায় আমি আর রাজ ছাড়া তো আর কেউ নেই। তাহলে রান্নাটা নিশ্চয়ই আমাকেই করতে হবে! আম্মুর কাছে অবশ্য টুকিটাকি বেশ ভালই রান্না শিখেছি আমি।

তাই কোন সমস্যা হবে না। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ফ্রেশ হয়ে একটি নীল রঙের শাড়ি পড়ে বের হয়ে এলাম আমি। বাইরে বের হয়ে আয়নার সামনে গিয়ে চুল মুছে চিরুনি করে নিলাম। তারপর আঁচলটা কোমরে গুঁজে প্রথমে বিছানাটা পরিস্কার করে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখলাম। পুরো রুমটা বেশ ভালো মতো গুছিয়ে পরিস্কার করে বাইরের দিকে পা বাড়ালাম রান্না করবো বলে। দরজার কাছে আসতেই বেখেয়ালে রাজের সাথে খুব জোরে ধাক্কা খেলাম আমি। ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যেতে নিলাম আর তখনি রাজ আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমাকে আটকে ফেলল। তারপর উত্তেজিত গলায় বললো,

~ এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছ হুমম? এখনি তো পরে গিয়ে কোমর ভাঙতে।

ওর কথায় আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওর কাছ থেকে একটু সরে এসে বললাম,
~ সরি রাজ প্রথম দিনেই এত দেরিতে ঘুম থেকে উঠলাম আমি। আসলে রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হয়েছে তো তাই সকালে ঘুম ভাঙেনি। আপনি একটু ওয়েট করুন আমি এখনই আপনার জন্য খাবার বানিয়ে দিচ্ছি।

কথাটি বলেই বাইরের দিকে আবারও পা বাড়ালাম আমি। তখনই উনি আমার হাত ধরে আটকে দিয়ে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর আমার চুলে মুখ গুঁজে জোরে একটি নিশ্বাস নিয়ে বলে উঠলেন,

~ আমি কি তোমাকে বলেছি আমার জন্য খাবার বানাতে? তোমাকে কিছুই করতে হবে না। বরং আজকে তোমায় একটা সারপ্রাইজ দিবো চলো আমার সাথে।
কথাটি বলেই আমাকে কোলে তুলে নিলেন উনি। উনার এমন আচরণে অবাক হয়ে গেলাম আমি। তবে মুখে কিছুই না বলে ওনার গলা জরিয়ে ধরে ওনার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম। আর মনে মনে বলতে লাগলাম,

~ ইশশ আমার বরটা এত কিউট কেন? দেখলেই মন চায় গাপুসগুপুস করে খেয়ে ফেলি। নয়তো সারাদিন শুধু তাকিয়েই থাকি। এতটা মিষ্টিও কি কারো বর হয়?
এসব কথা ভাবছি আর ওনার দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছি আমি। উনি সামনে একটু হেঁটে আবার থেমে গেলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে আমার নাকের সাথে নিজের নাকটা ঘষে নিয়ে বলে উঠলেন,

~ এভাবে তাকিও না জান, হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।

ওনার কথায় এবার বেশ লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। তাই দ্রুত উনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে ওনার বুকে নিজের মুখ লুকালাম। উনি আমাকে কোলে করে আরেকটু শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে সামনের দিকে হাটা দিলেন। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গেলেন। তারপর একটি চেয়ার টেনে আমাকে চেয়ারের ওপর বসিয়ে দিয়ে সামনে থাকা খাবারের ঢাকনাগুলো খুলে দিলেন উনি। গরুর মাংস, মুরগির রোষ্ট, ছোট মাছের চড়চড়ি, ডিম ভুনা, লাল শাক, সালাদ, আর ভাত রাখা আছে। সব খাবারগুলোর ঢাকনা খুলে দিয়ে উনি বললেন,
~ এই নিন মহারানী, যেটা খুশি খেতে পারেন!

আমি এতগুলো খাবার দেখে অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
~ এই এত খাবার কে খাবে? কি দরকার ছিল আপনার হোটেল থেকে এত খাবার কিনে আনার? আমি নিজেই বানিয়ে নিতাম।
আমার কথায় উনি আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিস ফিস করে বললেন,

~ তোমাকে কে বলেছে এগুলো হোটেলের খাবার? এগুলো আমি নিজে হাতে বানিয়েছি আমার মনের রানীর জন্যে।
ওনার কথা শুনে আমি বিস্ফোরিত চোখে তাকালাম উনার দিকে। তারপর উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলাম,
~ এসব কি বলছেন আপনি? এগুলো আপনি বানিয়েছেন মানে?

~ জি ম্যাম এই সবগুলো জিনিস আমি বানিয়েছি। শুধুমাত্র তোমার জন্য। তুমি আমাকে বলেছিলে না, যে আমি রান্না বান্না পারি কিনা? বিয়ের পর তোমাকে রান্না করে খাওয়াতে পারব কিনা? দেখো আমি কত কিছু শিখে ফেলেছি শুধু তোমার কথা রাখার জন্য। গত 15 দিনে আমি সব রকম রান্না শিখে নিয়েছি। তোমায় রান্না করে খাওয়াবো বলে।
ওনার কথা শুনে আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম উনার দিকে। এসব কি বলছেন উনি? আমি মজা করে কি একবার বলেছিলাম আর উনি সত্যি সত্যিই এত রান্না শিখে ফেললেন? এমন কি রান্না করেও ফেললেন আমার জন্যে? আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি এবার আমার মুখোমুখি মুখ নিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠল,

~ কি ব্যাপার জান তুমি কি আমার দিকে শুধু এভাবে তাকিয়েই থাকবে! নাকি এগুলো টেস্ট করে দেখে একটু প্রশংসাও করবে আমার রান্নার?

আমি ওনাকে কি বলব বুঝতে পারছি না। তবে সত্যিই আজকে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান স্ত্রী মনে হচ্ছে। যে কিনা এমন একজন স্বামী পেয়েছি। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে কোন কথা না বলে ডাইরেক্ট ওনাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরতে দেখে উনি পাথরের মূর্তির মত চুপ করে দাড়িয়ে রইলেন। এভাবে বেশ কিছুক্ষন কেটে যাওয়ার পর উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

~ আমার কিন্তু বড্ড খিদে লেগেছে রাহি। সেই ভোর ৫ টা থেকে রান্না করছি। খুধায় এখন পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। প্লিজ খাবারটা টেস্ট করে একটু বলো না কেমন হয়েছে? অনেক কষ্ট করে রান্না করেছি তোমার জন্য।

ওনার কথা শুনে ওনাকে ছেড়ে দিয়ে মুচকি হেসে বললাম,
~ আমি জানি আপনার রান্না অনেক মজা হয়েছে।

কথাটি বলেই আবারও চেয়ারে বসে প্লেটের মধ্যে সব খাবার একটু একটু করে নিয়ে খাওয়া শুরু করলাম আমি। প্রতিটি খাবার’ই অসাধারণ হয়েছে। সত্যিই ওনার হাতে জাদু আছে বলতে হয়। খাবার খেতে খেতে আমি খাবারের প্রশংসা করতেই ভুলে গেছি। এদিকে উনি যে আমার খাওয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে সেদিকে আমার খেয়ালই নেই।

খেতে খেতে হঠাৎ ওনার দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেলাম আমি। উনি হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। থেমে গিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে বলে উঠলাম,
~ সরি, আসলে খাবারটা এত টেষ্টি হয়েছে যে কি বলব। খাবার সময় সবকিছু ভুলে গেছি আমি। সত্যিই আপনার হাতের রান্না অসাধারণ, ঠিক আপনার নিজের মতই।
উনি আমার কথা শুনে কোনো উত্তর না দিয়ে একটানে আমাকে চেয়ার থেকে উঠিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে নিলেন। তারপর বলে উঠলেন,

~ তোমার খাওয়া শেষ তাই না? এবার আমাকে খাইয়ে দাও। অনেক কষ্ট করে রান্না করেছি। এখন আর নিজে হাতে খেতে পারবো না।
ওনার কথায় বেশ লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বললাম,
~ ঠিক আছে আমি খাইয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এভাবে কি করে খাওয়াবো?

কথাটি বলে ওনার কোল থেকে উঠতে নিলে উনি আরো শক্ত করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে বললেন,
~ এভাবেই খাওয়াতে হবে। কোন বাহানা চলবে না। নাও আমি হাঁ করছি জলদি খাইয়ে দাও।
কোন উপায় না দেখে আমি একটা প্লেটে খাবার নিতে নিলে উনি আবার ও আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
~ এই প্লেটে নয় তুমি যে প্লেটে খেয়েছ সেটাতে নাও।

~ কিন্তু ওটা তো আমার এঠো করা প্লেট?
~ তাতে কি ওটা কোন এঠো হয়নি। তুমি ওই প্লেটে নিয়েই আমাকে খাইয়ে দেবে বুঝলে। জানোনা এক প্লেটে খেলে ভালোবাসা বাড়ে? এখন দেরি করো না তো জলদি খাইয়ে দাও বড্ড খিদে লেগেছে আমার।

উনার কথায় আর কোন কিছু না বলে আমি আগের প্লেটটাতেই খাবার নিয়ে ওনাকে নিজ হাতে অনেক যত্নসহকারে খাইয়ে দিলাম। তারপর পানি দিয়ে ওনার মুখ ধুয়ে নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিলাম। তারপর উঠতে নিলেই উনি বলে উঠলেন,

~ উঠছো কেন? আমি কি তোমাকে উঠতে বলেছি? এখনো তো খাওয়া বাকি আছে আমার।
উনার কথায় উনার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললাম আমি,
~ আর কি খাওয়া বাকি আছে আপনার? আমি তো আপনাকে সবই খাওয়ালাম?

~ আরে খাবার পরে মিষ্টিমুখ করতে হয় জানো না তুমি? আমিতো এখনও মিষ্টিটাই খাইনি।
~ কিন্তু এখানে তো মিষ্টি কোনো কিছুই দেখছি না? আচ্ছা আপনি বসুন আমি ফ্রিজ থেকে মিষ্টি নিয়ে আসছি।
কথাটি বলে আবারও ওনার কোল থেকে উঠতে নিলে উনি আবারও আমাকে আটকে দিয়ে বললেন,
~ আমি ঐ মিষ্টির কথা বলিনি। আমি এই মিষ্টির (ঠোটে ইশারা করে) কথা বলেছি।

উনার কথায় বড্ড লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। বড় বড় চোখ করে ওনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
~ মাম মাম মানে?
~ মানে এটা ( কচু আর জানতে হবে না)

সকাল থেকেই রুমের মাঝে চুপ করে শুয়ে আছে রাই। কারো সাথে কোন কথা বলছে না। রাকিব বেশ কয়েকবার রুমে এসে ঘুরে গেছে। কিন্তু ও আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি রাই কে। হয়তো কালকে সারাদিনের ব্যস্ততার কারণে ক্লান্ত ও। তাই আর বেশি কিছু বলেনি ওকে। কিন্তু এবার অনেক বেলা হয়ে যাওয়ার পরেও রাই রুম থেকে বের হচ্ছে না চুপ করে বিছানার উপর শুয়ে আছে। তাই রাকিব রুমে এসে রাই এর পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

~ কি হয়েছে রাই? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? এভাবে শুয়ে আছো কেনো?
রাকিবের কথার উত্তরে কোন কিছু না বলে ওর দিকে ঘুরে রাকিবকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাই। রাকিব তখনই খেয়াল করে রাই এর দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ওকে কান্না করতে দেখে রাকিব বেশ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,

~ কি হয়েছে রাইশা? তুমি এভাবে কান্না করছো কেন? তোমাকে কেউ কিছু বলেছে? কি হয়েছে বল আমায়? সকাল থেকে এভাবে কেন শুয়ে আছ তুমি? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে বল আমায়? কি হয়েছে তোমার রাই?

রাকিব কে এমন উত্তেজিত হতে দেখে রাকিবের বুকে মুখ গুঁজে আস্তে করে বলে উঠল রাই,
~ আমি প্রেগন্যান্ট রাকিব। তুমি বাবা হতে চলেছো, আর আমি মা!

রাই এর কথাটা শুনতেই যেন থমকে যায় রাকিব। বেশ কিছুক্ষণ নীরব নিস্তব্ধতা ছেয়ে যায় পুরো রুমজুড়ে। রাকিবের কানে যেন কথাটি বারবার বাজতে থাকে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর রাকিব রাই এর মুখটা নিজের বুক থেকে তুলে উত্তেজিত হয়ে জোরে শব্দ করে বলে উঠে,

~ সত্যি বলছো তুমি রাইশা? সত্যি আমি বাবা হতে চলেছি আর তুমি মা? এতবড় একটা গুড নিউজ পাবো আমি সেটা ভাবতেও পারিনি।
রাকিবের কথা শুনে ওর বুকে লজ্জায় মুখ লুকায় রাই। পুরো বাসা জুরে সুরু হয়ে যায় আনন্দ আর খুশির উল্লাস। রাকিব রাহির কাছে ফোন করেও কথাটি জানিয়ে দেয়। সবার মাঝে এমন আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।


পর্ব ৪০

বাইরে আলো ফুরিয়ে হালকা অন্ধকার হয়ে এসেছে চারিদিকে। জানালার পর্দাগুলো বারবার দমকা বাতাসে উড়ে উড়ে আবার শান্ত হয়ে পরছে। সেই সাথে দমকা হাওয়া এসে আছড়ে পরছে আমার মুখে। সন্ধ্যা হয়ে এলো বুঝি। বেশ ভালো লাগছে এখনকার অনুভূতিটা। রাই আমার সামনে বসে সেই কখন থেকে আচার খেয়ে চলেছে। আমি চুপটি করে ওর সামনে বসে ওর আচার খাওয়া দেখছি আর ওর অনুভূতিটা উপভোগ করছি। মা হওয়ার অনুভূতিটা সত্যিই কত মিষ্টি হয় তাই না?

গত 10 দিন হলো এ বাসায় এসেছি আমি। এই 10 দিন হল বেশ ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছি রাইয়ের কাজগুলো। সব সময় পেটের খুব কেয়ার করে চলাফেরা করে ও। অনেক সময় দেখেছি একা একা বসে থাকলে পেটে হাত বুলাচ্ছে। একা একাই বিড়বিড় করে পেটের দিকে তাকিয়ে কিছু বলছে। আবার নিজে নিজেই হাসছে। ভীষণ ভালো লাগে আমার ওর এই অনুভূতি গুলো দেখে। এটাই বুঝি মা হওয়ার প্রথম অনুভূতি একটি মেয়ের জীবনে। আমি যখন রাই এর দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতে বাস্ত। তখনই ও আমাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল,

~ কি ব্যাপার ভাবি এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে কি দেখছো? এই নাও আচার খাও, আমি তো একা একাই খেয়ে চলেছি সেই তখন থেকে। তুমিও একটু খাও! ওর কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম আমি,

~ আমার খাওয়ার সময় হলে আমিও খাবো। এখন তুমি খাও ভাবিজান। আর তাছাড়া এখন তো তোমারই বেশি বেশি খেতে হবে বল! আমার ভাগ্নে টা যেন অনেক কিউট আর সুন্দর হয় ঠিক তোমার মত বুঝলে। বেশি বেশি খাবে আর নিজের যত্ন নিবে তাহলে তোমার বেবিটা অনেক কিউট আর গুলুমুলু হবে। আমি যেন ওকে গাল টিপে দিয়ে আদর করতে পারি।
আমার কথা শুনে রাই মুচকি হেসে বলল,

~ সেটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমি ভাগ্নে-ভাগ্নি মুখ দেখবো কবে হ্যাঁ? তুমিও তো এখন একটি ছেলে পুলে নিতে পারো নাকি? একসাথে দুজনের ছেলে মেয়ে হলে, একসাথে বড় হবে ওরা। একসাথে স্কুলে পড়তে যাবে। বড় হলে ওদের বিয়ে দিয়ে দিব। কী বলো? ননদ-ভাবী থেকে বিয়ান হয়ে যাব তখন ভালো হবে না?

রাই এর কথা শুনে চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম আমি। তবে ওর প্রশ্নের কোন উত্তর দিলাম না। তারপরে ওকে কিছু না বলেই আচমকা উঠে নিজের রুমের দিকে দৌড় লাগালাম। রাই আমার সিন দেখে বেকুবের মত আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। কি হলো কিছুই হয়তো বুঝতে পারেনি ও। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে যে একটা আইডিয়া চলছে সেটা তো আর ও জানে না। আমি সোজা নিজের রুমে এসে বিছানার ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে রাজের কাছে ফোন লাগালাম। দুবার রিং হতেই ফোন রিসিভ করলো ও,

~ হ্যালো জান তুমি আমায় ফোন করেছো? আমি তো ভাবতেই পারছি না!
ওনার কথা শুনে গম্ভীর গলায় বলে উঠলাম আমি,

~ ভাবতে যখন পারছেন না তাহলে আর ভাবতে হবে ও না। এখন বলুন আপনি বাসায় কখন আসবেন? আমি আপনার সাথে ও বাড়ি যাব।
উনি আমার কথা শুনে চমকে উঠে বলে উঠলেন,

~ সত্যি বলছো জান তুমি বাড়ি আসবে? কিন্তু হঠাৎ বাড়ি আসতে চাইছো যে কিছুকি হয়েছে?
উনার কথা শুনে এবার বেশ বিরক্তি নিয়ে কর্কশ গলায় বললাম আমি,

~ কেন বিয়ে করে কি বউকে শুধু শ্বশুর বাড়িতেই ফেলে রাখবেন? নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেই আপনার?

আমার এমন কথায় যে উনি বড়সড় একটা শখ খেয়েছেন এটা আর বলতে হবেনা। আমি বেশ ভালই বুঝতে পারছি। উনি অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
~ কি হয়েছে রাহি তোমার? তুমি হঠাৎ এভাবে কথা বলছ কেন? তুমি জোর করে ও বাসায় থাকতে চেয়েছ বলেই তো তোমাকে আমি ওখানে থাকতে দিয়েছি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এভাবে আসতে চাইলে তাই জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। কিন্তু তুমি তার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ এমন করে কথা বলছ কেন?

উনার কথার উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলাম আমি,

~ সেটা আপনাকে বলতে হবে না। আপনি জলদি করে আসুন আর আমাকে ও বাসায় নিয়ে চলুন। আমি আর এখানে থাকতে চাই না। বুঝলেন?

কথাটা বলেই চট করে ফোনটা কেটে দিলাম আমি। জানি এখন উনার অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গেছে। হঠাৎ করে আমি কেনো এমন করলাম তা নিয়ে হয়তো অনেক চিন্তায় পরে গেছেন উনি। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। কারন ওনাকে তো এবার আমি আবার মজা দেখাবো। বসে বসে কথাগুলো ভেবেই আলমারির কাছে চলে গেলাম আমি। তারপর লাগেজটা বের করে তার মাঝে জামা কাপড় গুলো সব গুছিয়ে তুলতে লাগলাম। একটু পরেই রাজ আসলে বাসায় চলে যাব বলে। তখনই রুমের মাঝে এসে প্রবেশ করল রাই। আর এসে আমাকে কাপড়-চোপড় গোছাতে দেখে অবাক হয়ে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল,

~ কি হয়েছে ভাবি তুমি হঠাৎ এভাবে কাপড় গুছাচ্ছ কেনো? কোথায় যাচ্ছো তুমি?
ওর কথার উত্তরে আমি ওর দিকে না তাকিয়েই বলে উঠলাম,
~ শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি। বাবার বাড়িতে আর কত দিনই বা থাকবো।

~ মানে? এসব কি বলছ তুমি ভাবি? হঠাৎ কি হল তোমার, তুমি এভাবে কেন চলে যেতে চাইছ বলতো? আমার কথায় কি রাগ করেছো তুমি? কি হয়েছে তোমার প্লিজ বলো আমায়।
আমি শান্ত হয়ে রাইকে আমার পাশে বসিয়ে নিয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম,

~ ও বাড়ি যাচ্ছি তোমার ভাইয়াকে শাস্তি দিব বলে। তোমার আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে। অথচ তুমি মা হতে চলেছো, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি কেন মা হলাম না? আমার পেটে কেন তোমার মত বেবি এলো না? এজন্য তোমার ভাইয়াকে শাস্তি দিতে যাচ্ছি বুঝলে? এখন আর কাউকে কিছু বল না। আমাকে চুপ করে চলে যেতে দাও পরে তোমাকে সব বলবো আমি, আমার কিউটি ননদিনী টা।
আমার কথা শুনে বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকাল রাই। তারপর বিস্ফোরিত কন্ঠে বলে উঠল,

~ ভাবি তোমার মাথা কি ঠিক আছে? আই মিন তুমি কি সুস্থ আছো নাকি পাগল হয়ে গেছো বলতো? আমার কিন্তু সত্যিই এবার সন্দেহ হচ্ছে?
ওর কথা শুনে আমি ভাবলেশহীন ভাবে কাপড়-চোপড় গোছাতে গোছাতে বলে উঠলাম,

~ সে তোমার যেটা খুশি সেটা ভাবতে পারো রাই। এখন আমাকে ডিস্টার্ব না করে বরং কাজে একটু হেল্প করো। অনেক কাপড় চোপড় গোছাতে হবে।
রাই আমার কথা শুনে আমার পাশে এসে আমার হাত ধরে বলল,

~ আজকে না গেলে হয়না ভাবি? তুমি গেলে অনেক মিস করবো তোমায়। গত দশদিন হল একসাথে খুব ভালো সময় কেটেছে তোমার সাথে। তুমি ছাড়া ভীষণ একা একা ফিল করবো এখানে।
~ তাহলে নিজের রুমে যাও আর নিজের কাপড়চোপড় গুলো গুছিয়ে রেডী হয়ে থাকো। আমার সাথে করে তোমায় নিয়ে যাব আমি।
আমার কথা শুনে আমার পাশে থেকে এক পা পিছিয়ে গিয়ে রাই আবারও বিস্ফোরিত কন্ঠে বলে উঠল,

~ কিন্তু আমি কেন ও বাড়িতে যাবো এখন? এটা আমার শশুর বাড়ি। আর এখন তো এটাই আমার আসল ঠিকানা তাইনা ভাবি?
ওর কথা শুনে আমি ওর দিকে এক নজর তাঁকিয়ে মুচকি হেসে দিয়ে আবারও কাপড়-চোপড় গোছাতে মনোযোগ দিয়ে বলে উঠলাম,
~ তাহলে একবার ভাবো, আমি যে গত 10 দিন ধরে পড়ে আছি এ বাসায়, এটাও তো আমার বাড়ি নয় তাই না? এখন আমি কেন তাহলে এখানে বেশি দিন থাকবো? নিজের বাড়ি ফেলে রেখে?


পর্ব ৪১

কাপড় চোপড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে গাল ফুলিয়ে চুপ করে সোফার উপর বসে আছি আমি। আমাকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাকি সবাই। আব্বু আম্মু ভীষণ রেগে আছে আমার উপর। আমার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রাজ। সে কি করবে হয়তো ভেবে পাচ্ছেনা এখন। ভাইয়াও পাশে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আর রাই বেচারি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সকলের দিকে লক্ষ্য রাখছে। পুরো রুম জুড়ে ছড়িয়ে আছে নিরব নিস্তব্ধতা। কারো মুখে কোন কথা নেই।

সবাই যে আমার উপর বেশ রেগে আছে এটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি আমি। তার কারণটাও একমাত্র আমি’ই। কারণ রাত প্রায় 10 টার উপরে বাজতে চললো কিন্তু আমি এখনই এ বাসা ছেড়ে ওই বাসায় যাব বলে উঠে পড়ে লেগেছি। যদিও এই সময় কেউ আমাদের যেতে দিতে চাইছে না। তবে কে শোনে কার কথা, আমি যখন জেদ ধরছি তখন তো গিয়েই ছাড়বো। রাজকে যে শিক্ষা দিতে হবে আমায়। হঠাৎ নীরবতা কাটিয়ে সামনে থেকে আব্বু রাগি গলায় বলে উঠল,

~ রাহি অনেক পাগলামো সহ্য করেছি আমরা তোমার? কি হয়েছে বলোতো তোমার? বিয়ের পর থেকেই দেখছি তুমি সব সময় কেমন জেদ নিয়ে চলো। তুমি যখন যেটা জেদ ধরো তখন সেটাই করে ছাড়ো। এতো ছেলেমানুষীর মানে কি? এখন কি বাসা ছেড়ে যাওয়ার সময়? কালকে সকালে গেলে কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে শুনি? আর কি এমন হয়েছে যে তুমি এ সময় যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছ?
আব্বুর কথার উত্তরে আমি কিছু বলার আগেই পাশ থেকে আম্মু আমার পাশে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

~ রাহি মা, বলতো আমায় তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে? হঠাৎ করে এভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলে তুমি? এ কদিন তো জোর করে ও রাজ তোমাকে নিয়ে যেতে পারছিল না। তাহলে আজ কেন যাবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছো? আর এভাবে বসে আছো কেন? আমাদের কথার উত্তর দাও মা! তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? নাকি তোমাকে কেউ কিছু বলেছে বলো মা?
আম্মুর কথার উত্তরে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বেশ কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলাম আমি,

~আম্মু ভাইয়ার বিয়ের দিন তুমি’ই আমাকে বলেছিলে মেয়েদের বিয়ের পর তাদের আসল ঠিকানা হয় শ্বশুরবাড়ি। তাহলে আজ কেন আমাকে এভাবে যেতে দিচ্ছো না তোমরা? আর তাছাড়া এখানে এসেছি আমি 10 দিনের বেশী হলো। তাহলে এখন কি আমার নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়া উচিত নয়? বিয়ে হয়েছে তো বেশিদিনও হয়নি। যদি সারাক্ষণ শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতেই পড়ে থাকি, তাহলে আশেপাশের মানুষ কি বলবে বলো তো? পরে আমার স্বামীর বদনাম হবে। আর আমি সেটা চাইনা। তাই আমাকে তোমরা বাধা দিও না প্লিজ। আমাকে যেতে দাও আমি এখনি ও বাড়িতে যাব, মানে এক্ষুনি যাব। আর কারো কোন কথা শুনতে চাই না। রাজ আপনি কি আমাকে নিয়ে এখন যাবেন? নাকি আমি নিজে নিজেই চলে যাব?

আমার কথা শুনে আব্বু কিছু না বলে রেগে গিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। আম্মু কি বলবে হয়তো বুঝতে পারছে না। তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। এবার ভাইয়া বেশ রাগী গলায় আমার কাছে এগিয়ে এসে বলে উঠলো,

~ আচ্ছা সত্যি করে বলতো পুচকি তোকে কি কেউ কিছু বলেছে? তুই হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ার জন্য উঠে পরে লেগেছিস কেন? আজকে সন্ধ্যা অব্দি তো সব ঠিক ছিল, তাহলে হঠাৎ কী হলো তোর?
ভাইয়ার কথার উত্তরে আমি ভাইয়ার দিকে না তাকিয়ে রাজের দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বললাম,

~ আপনাকে আমি কিছু বলছি, আপনি কি কানে শুনতে পান না? নাকি বিয়ে করার পর বউকে শ্বশুর বাড়িতে ফেলে রাখার ইচ্ছা আছে? এমনটা হলে বলে দিন আমি কালকেই উকিল নিয়ে এসে আপনার আশা পূরণ করে দেব।

আমার কথার উত্তরে রাজ দ্রুত এসে আমার হাত থেকে কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে বললো,
~ তুমি এস আমি গাড়িতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। বলেই সকলের থেকে বিদায় নিয়ে সে বাইরে বের হয়ে গেল। তাকে এভাবে ভয় পেতে দেখে এবার বেশ হাসি পেল আমার। কিন্তু হাসিটা চেপে গিয়ে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম বাসা থেকে। তারপর গাড়িতে গিয়ে রাজের পাশের সিটে চুপ করে বসে পড়লাম।

রাজ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল। গাড়ি চালাতে চালাতে একটু পর পর আমার দিকে বারবার ফিরে তাকাচ্ছে ও। এভাবে অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর আমি ওর দিকে তাকিয়ে জোরে করে বলে উঠলাম,

~গাড়ি থামান, আমি বলছি গাড়িটা থামান।
আমার কথা শুনে গাড়ি ব্রেক করলো উনি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,
~ আবার কি হলো?

আমি রাগী চোখে ওনার দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলে উঠলাম,
~ আপনার সমস্যাটা কি হ্যা? গাড়ি চালাবেন নাকি আমাকে দেখবেন? যদি আমাকে দেখতে হয় তাহলে গাড়ি থামিয়ে রেখে দেন। আমি আপনার সামনেই বসে আছি মন ভরে দেখে নেন। তারপর সামনে দেখে গাড়ি চালান। এভাবে গাড়ি চালিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করে মেরে ফেলতে চান নাকি আমাকে?

আমার কথা শুনে শুকনো ঢোক গিললেন উনি। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করলেন। এবার আর একটিবারের জন্যেও আমার দিকে ফিরে তাকাননি উনি। কেন জানি না খুব দ্রুতই রাগ উঠে যায় আমার। আর সেই রাগটা কন্ট্রোল করতে পারি না সোজাসুজি ঝেড়ে ফেলি সামনের মানুষটির উপর। বিয়ের পর এই কিছুদিনে রাজ বেশ ভালোভাবে নাস্তানাবুদ হয়েছে আমার রাগের কারনে। তবে ও কখনো রাগ দেখায় নি আমায়। বরং সব সময় নিজের ভালবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে।

রাতের সব প্রয়োজনীয় কাজগুলো শেষ করে শুয়ে পড়েছে রাই আর রাকিব। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলে নিরবতা কাটিয়ে রাকিব কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো রাই,
~ তোমার বোনটা আমার ভাইয়াকে একদম নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো। আজকে ভাইয়ার অবস্থাটা দেখেছিলে একবার?

~ হুমম দেখেছি রাজের অবস্থাটা। কিন্তু আমি একটা জিনিস’ই বুঝতে পারিনা, রাজ এত রাগী একজন মানুষ হয়েও কিভাবে আমার বোনকে দেখে এত ভয় পায়? আরে বউ কি কোন ভয় পাওয়ার জিনিস হল নাকি? আমি রাজকে দেখে সত্যিই অবাক হই। এত রাগি আর হ্যানসাম একটি ছেলে হয়ে নিজের বউকে দেখে এতটা ভয় পায় ও।
রাকিবের কথা শুনে পাশ থেকে ভাব নিয়ে বলে উঠল রাই,

~ শুধু ভাইয়ার কথা কেন বলছ? তুমিও তো আমাকে দেখে কম ভয় পাও না? একচুয়ালি দুনিয়ার সব পুরুষই তার বউকে দেখে ভয় পায়। তারা সারা দুনিয়ার কাছে সাহসী হলেও ঘরের বউ এর কাছে তারা একদম হুলো বিড়াল বুঝলে?

রাই এর কথা শুনে বুক ফুলিয়ে বলে উঠলো রাকিব,

~ কে বলেছে আমি তোমাকে দেখে ভয় পাই? হ্যা কে বলেছে? আরে বউ কি কোনো ভয় পাওয়ার জিনিস হলো নাকি হুহহ? আমি তোমাকে দেখে একটুও ভয় পাইনা।
রাকিবের কথা শুনতেই চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে রাগী গলায় বলে উঠলাম রাই,
~ কি বললে তুমি? তুমি আমাকে দেখে ভয় পাও না?

রাইয়ের চোখ রাঙ্গানো দেখে এবার শুকনো ঢোক গিলে রাইকে বুকে আগলে নিয়ে বলে উঠল রাকিব,
~ ইয়ে মানে আসলে, হয়েছে কি জানো? পৃথিবীতে যে পুরুষই তার বউকে অনেক বেশি ভালবাসে! তারাই বউকে দেখে একটু হলেও ভয় পায়। আসলে এটা ভয় পাওয়া নয়, বরং ভালোবাসার টানে তারা এরকম করে। যেমন আমিও তোমাকে দেখে ভয় পাই। কারন তোমাকে অনেক ভালোবাসি যে তাই।

রাকিবের কথা শুনে মুচকি হেসে ওর বুকে মাথা লুকালো রাই। তারপর দুজম মিলে ভালোবাসা রাজ্যে পারি জমালো।

বাসার সামনে এসে গাড়ি থামতেই গাড়ির দরজা খুলে একাই বেরিয়ে পরলো রাহি। তারপর রাজের অপেক্ষা না করে দ্রুত গিয়ে বাসার মধ্যে ঢুকে পড়ল। রাজও আর দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাসার ভিতর দিকে রওনা দিলো। দুজন মিলে বাসার মধ্যে ঢুকতেই দেখতে পেল সোফার উপর বসে থেকে মোবাইলে কিছু একটা করছে আরিশা। আরিশাকে দেখে দুজনেই বেশ অবাক হয়ে গেল। আরিশা পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সামনে তাকিয়ে রাহি এবং রাজকে দেখে বেশ চমকে উঠলো। তারপর তখন’ই নিজেকে আবার সামলে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,

~ তোমরা তাহলে এসে গেছো? আমি সেই কখন থেকে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি এখানে। ভেবেছিলাম এয়ারপোর্ট থেকে ডাইরেক্ট এখানে এসে তোমাদের সারপ্রাইজ করে দেবো। কিন্তু দেখো উল্টো নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেলাম। সেই কখন থেকে একা একা বসে রয়েছি তোমাদের অপেক্ষায়। এক্ষুনি ভাবছিলাম রাজ কে ফোন করবো। আর তোমরা এসেছ।
আরিশার কথা শুনে দুজনেই হাসিমুখে এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। তারপরে ওর হাত ধরে বলে উঠলাম আমি,

~ খুব ভালো করেছো আরিশা। তোমাকে অনেক মিস করেছি জানো। কতদিন হল দেখি না তোমায়। তা হঠাৎ এভাবে চলে আসার মানে কি বলতো?
আরিশা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আবার রাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

~ মানেটা আর কিছুই নয়, তোমাদেরকে অনেক বেশি মিস করছিলাম তাই আর থাকতে না পেরে চলে আসলাম তোমাদের মাঝে। আসলে তোমাদের জীবনের সাথে তো আমার জীবনটাও গাঁথা। মানে বন্ধুত্ব বলতে পারো, তোমার বন্ধু রাজের বন্ধু। তাই তোমাদের ছেড়ে কি থাকতে পারি বিদেশে একা? তাই ভাবলাম বিদেশে না থেকে দেশেই থাকি তোমাদের সাথে। নিজের ভালো সময়ও কাটবে সাথে আর মিস করাটাও হবে না।
আরিশার কথা শুনে রাজ মুচকি হেসে বলল,

~ খুব ভালো করেছো আরিশা , আমরাও তোমায় অনেক মিস করতাম। যাও তুমি তোমার ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে গিয়ে গেস্ট রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমরাও রুমে যাই।
~ তা তোমরা এতক্ষণ কোথায় ছিলে শুনি? রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে গিয়েছিলে বুঝি?
~ আরে না তেমন কিছুই নয়। আসলে রাই এর বেবি হবে তো সেই খুশিতে আমি এ কয়দিন বাবার বাড়িতে ছিলাম। আর রাজও আমার সাথে সেখানেই ছিলো। কিন্তু অনেকদিন হল ওখানে রয়েছি বলে এখন চলে আসলাম।

আমার কথা শুনে বেশ কিছুটা অবাক হয়ে বলে উঠল আরিশা,

~ ওয়াও জাস্ট এ সারপ্রাইজ। রাই প্রেগনেন্ট? শুনে অনেক ভালো লাগলো। আমি তো জানতামই না কিছু। তো তোমরা হঠাৎ এই সময় কেনো বাবার বাড়ি থেকে আসলে? এত রাতে না এসে সকালবেলা ও তো আসতে পারতে?

আরিশার কথার উত্তরে আমি কিছু বলার আগেই রাজ বলে উঠলো,

~ আসলে আমার সকালবেলা অনেক কাজ থাকে অফিসে। ইদানীং অনেক পেশার কাজের। তাই আমি ওকে নিয়ে এলাম সকাল বেলার ঝামেলা যাতে নয় হয়। তাই রাতে নিয়ে আসাই ভালো মনে হলো। এখন কথা না বাড়িয়ে যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি রহিমাকে বলছি তোমাকে খাবার দিয়ে দিতে। খেয়ে শুয়ে পড়ো।
আর আমরাও খুব টায়ার্ড, তাই আমরাও এখনই শুয়ে পড়বো। ও বাসা থেকে ডিনার করে এসেছি।

কথাটি বলে আরিশাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমার হাত ধরে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো রাজ। আমিও আর কিছু বললাম না রাজের সাথে রুমের দিকে চলে আসতে লাগলাম। হঠাৎ থেমে গিয়ে রহিমাকে ডেকে আরিশাকে ডিনার রেডি করে দিতে বললো রাজ। তারপর আমায় নিয়ে আবারও রুমের দিকে পা বাড়ালো।

(রহিমা আমাদের নতুন কাজের মেয়ে। বয়স ২৪ থেকে ২৫ বছর হবে হয়তো। মেয়েটি অনেক মিষ্টি আর ভোলাভালা টাইপের। কাজেও বেশ পারদর্শী। বাসার সব কাজ একা হাতেই সামলে নেয় সে। পৃথিবীতে ওর আপন বলে কেউ নেই। )

রুমে এসে হাতের ব্যাগ টা পাশে রেখে দরজা লাগিয়ে দিল রাজ। তারপর শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওকে এভাবে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে এবার বেশ ভয় করতে লাগল আমার। তাই একপা একপা করে পিছন দিকে পেছাতে পেছাতে বলতে লাগলাম,
~ ক কি কি হয়েছে আপনার? এভাবে আমার দিকে এগিয়ে আসছে কেন?

উনি কোন উত্তর না দিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমাকে ভয় পেতে দেখে হাসতে হাসতে ওয়াশ রুমে চলে গেল। আর একটু হলেতো প্রাণটাই বেরিয়ে যেত আমার। এভাবে কেউ ভয় দেখায় নাকি? ভীষণ রাগ উঠে গেল আমার। মনে মনে বললাম, “একবার ওয়াশরুম থেকে বের হও চান্দু তারপর মজা দেখাবো তোমায়। “


পর্ব ৪২

আকাশে আজ বিশাল বড় একটি থালার মত চাঁদ উঠেছে। আর ঐ চাঁদের মিষ্টি জ্যোৎস্না আলোকিত করে তুলেছে সারা পৃথিবীকে। সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের রুমের মাঝেও। বেলকুনির জানালা ভেদ করে আলো এসে পড়েছে রুমের মাঝে। আমি রুমের মধ্যের লাইট অফ করে দিয়ে রুমের মাঝে পায়চারি করে চলেছি রাজের অপেক্ষায়। সেই আধ ঘন্টা আগে ওয়াশরুমে ঢুকেছে উনি। এখনো যেন বের হওয়ার নামই নেই তার। আমি যে তাকে মজা দেখাতে চাই সেটা কি উনি জেনে গেছে নাকি? কথাটা ভাবতেই মাথার মধ্যে ঘুরে উঠলো আমার। তাই আর দেরি না করে সোজা চলে গেলাম উনার ওয়াশ রুমের দরজার সামনে। তারপর দরজায় বেশ কয়েকবার টোকা দিলাম কিন্তু না, ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।

এবার অনেক বেশি বিরক্ত ফিল করতে লাগলাম আমি। ধুর আর ভালো লাগেনা। কথাটি ভাবতেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন উনি। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বললেন “কি হয়েছে, আমি কেনো এভাবে ডাকছি”। ওনার ইশারাতে কি বলবো বুঝতে পারছিনা আমি। তাই আমিও ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম “কিছু না এমনি”। তারপর সোজা ওনাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে ওয়াশরুমের মাঝে ঢুকে পড়লাম। কেন জানি না ওনাকে হঠাৎ করে এভাবে সামনে দেখে আর কিছু বলার মত সাহস হলো না আমার। তাই ওয়াশরুমে আসলাম সাহস যোগাতে। ওয়াশরুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে সাহস দিতে লাগলাম বেশ কিছুক্ষণ। এখন হবে মজা মিস্টার রাজ চৌধুরী। আপনাকে আজকে আমি দেখাবো মজা কাকে বলে।

মনে সাহস সঞ্চয় করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। ওয়াশরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম উনি সোফার উপর বসে ল্যাপটপ নিয়ে কি যেনো কাজ করছেন। আমি গুটি গুটি পায়ে ওনার সামনে এগিয়ে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে ওনার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে রইলাম। আমাকে এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উনি ল্যাপটপের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে এক নজর তাঁকিয়ে, তারপর আবারো ভাবলেশহীন ভাবে ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ দিলেন। ওনার এমন ভাবলেসহীনপনা দেখে এবার অসম্ভব রাগ হতে লাগলো আমার।

এই মুহূর্তে ল্যাপটপটা কে নিজের চরম শত্রু বলে মনে হচ্ছে আমার। যেন মনে হচ্ছে উনার কাছে আমার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই ল্যাপটপটা। মনে হচ্ছে এই ল্যাপটপটাই যেন আমার সতীন। রাগে সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে আমার। তাই আমি আর একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে এবার শব্দ করে কাশি দিয়ে উঠলাম। কিন্তু না এতেও কোন কাজ হলোনা। উনি সেই একি ভাবে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কাজ করে চলেছেন। বড্ড বেশি রাগ হচ্ছে এবার আমার। তাই গিয়ে ধপ করে উনার পাশে সোফায় বসে পরলাম আমি। আমাকে এভাবে পাশে বসতে দেখে একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন উনি।

তারপরে আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আবারো ল্যাপটপে মনোযোগ দিলেন। এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে উনার মাথার চুলগুলো সব একটা একটা করে টেনে টেনে ছিঁড়ি আমি। এতটা রাগ হচ্ছে আমার। কিন্তু না সেটা তো সম্ভব নয়। তাই এবার আরো জোরে শব্দ করে কাশি দিয়ে উঠলাম আমি। তার পরেও উনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন না। তাই এবার রাগ দেখিয়ে ওনার হাত থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে ঠাস করে বন্ধ করে সোফার উপর রাখলাম। তারপর ওনার সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে কর্কশ গলায় বললাম,

~ সমস্যা কি আপনার?

আমার প্রশ্নের উত্তরে উনি ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,

~ আমার সমস্যা কি মানে? তোমার সমস্যা কি তুমি কেন এমন করছো রাহি? এনি প্রবলেম?

~ হ্যাঁ প্রবলেম, অনেক অনেক বড় প্রবলেম। আপনি মানুষটাই একটা প্রবলেম। বুঝলেন? আমি যে সেই কখন থেকে আপনার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। সেদিকে আপনার কোনো খেয়াল আছে? তা না আপনি তো সেই ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে আছেন। বলি ল্যাপটপের মাঝে পেয়েছেন কি হ্যা?

কি পেয়েছেন আপনি? আমার থেকে ল্যাপটপ টাই আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাই না? আমার কথা শোনার কোন টাইম নেই আপনার কাছে? তাহলে বলে দিন আমি এক্ষুনি চলে যাব আমার বাবার বাড়ি। আর কখনো আসবো না আপনার কাছে। আমি সেই কখন থেকে আপনার সাথে কথা বলার ট্রাই করে চলেছি। আর আপনি ভাবলেশহীনভাবে অন্যদিকে গুরুত্ব দিয়ে রয়েছেন। এটা আমি মানবো না। কিছুতেই মানবোনা। কি পেয়েছেন কি আপনি হ্যা, কি পেয়েছেন।

এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা বলে তারপর থামলাম আমি। তারপর জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলাম। উনি চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছেন। ওনার মাঝে কোন রকম ফিলিংস দেখতে পাচ্ছি না আমি। উনার মনে কি চলছে কিছুই যেন বুঝতে পারছি না।

ওনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরো বেশি রাগ উঠে গেল আমার। আমার কথার উত্তর না দিয়ে উনি কেন এভাবে হামলার মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকে? আজব তো! আমি আবারও রাগী গলায় উনাকে কিছু বলতে যাবো, তার আগেই উনি আমার হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে নিলেন। তারপর আমার চুলের মাঝে হাত গুজে দিয়ে ঘোর লাগানো কন্ঠে বললেন,
~ এখন বল কি বলতে চাও। আমি সব শুনতে চাই।

আচমকা ওনার এমন কান্ডে শক খাওয়ার মত চুপ করে গেলাম আমি। এখন কি বলবো কিছুই যেন মাথায় আসছে না আমার। কথাগুলো যেন পেটের মধ্যেই আটকে গেল। মুখ পর্যন্ত আর পৌঁছালো না কিছুতেই। তাহলে কি উনি এভাবে আমাকে সায়েস্তা করতে চান? আমার আর কোন কিছু বলা সম্ভব হবে না। আমি মনে মনে সাহস সঞ্চয় করতে লাগলাম এভাবে চুপ করে থাকলে তো হবে না। আমার আগে রাই কেন মা হতে চলেছে? ওর আগে বিয়ে হয়েছে আমার, তাহলে কেন ও আমার আগে মা হবে?

এটা তো আমাকে বলতেই হবে ওনাকে। কিন্তু কিভাবে বলবো আমি? উনি আমাকে যেভাবে আকড়ে ধরে বসে মাথায় হাত গুজে রেখেছেন। এভাবে তো কোন কথাই আমার পেট থেকে মুখ পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতা নেই। আমাকে চুপ করে ভাবতে দেখে উনি আবার ও ঘোর লাগানো গলায় বলে উঠলেন,

~ কি হলো কি যেনো বলবে আমায় বলছিলে? তাহলে এভাবে চুপ করে আছো কেন? বল কি বলবে? আর শোনো তোমার চাইতে ইম্পর্টেন্ট পৃথিবীতে আমার কাছে দ্বিতীয় আর কোন কিছুই নেই। তোমার জায়গায় অন্য কেউ নিতে পারবে না। আর ল্যাপটপ তো দূরের কথা। এখন বল কি বলতে চাও আমি সারারাত ধরে তোমার সব কথা শুনতে চাই।

ওনার এইটুকু কথাতেই যেন আমার সব রাগ পানি হয়ে গেল। কি বলব কি করব কোন কিছুই মাথায় আসছে না আমার। আর কোন কিছু বলার উপায় নেই। এভাবে কথা বললে কি কিছু বলা যায় না কি। আমি ওনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলাম,

~ আ আ আমাকে ছাড়ুন। ক কা কাজ আছে আমার।

আমার কথা শুনে উনি আমার কোমর আরো শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলেন,

~ ছাড়বো কেন, আগে বল কি বলতে চাও আমায়? আর এত রেগে আছো কেন তুমি? ও বাড়ি থেকে এভাবে নিয়ে এলে কেন হঠাৎ? বাবা-মা রাকিব ভাইয়া কি মনে করলো বলতো?
ও বাড়ির কথা শুনতেই রাই এর বলা কথাটা মনে পড়ে গেল আমার। আমি এক ঝটকায় উনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর কোমরে হাত দিয়ে রাগী গলায় বলে উঠলাম,
~ নিয়ে এসেছি বেশ করেছি। আপনার বিচার করবো বলে নিয়ে এসেছি আমি।

আপনি বলুন ভাইয়া আর রাই এর তো আমাদের পরে বিয়ে হয়েছে তাই না? আমাদের বিয়ে তো ওদের বিয়ের অনেক আগে হয়েছে তাই না? তাহলে রাই কেনো আমার আগে মা হতে চলেছে? আমি কেন হলাম না? আমাদেরও তো এতদিনে একটা বেবি হওয়ার কথা তাই না? তাহলে আমি কেন মা হচ্ছি না? বলুন আমাকে, এটা আমি মানতে পারছি না। মানতে পারব না। আপনাকে বলতে হবে জবাব দিতে হবে কেন হল এমন?

আমার কথা শুনে উনি ভূত দেখার মত করে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। উনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বেশ অসস্তি বোধ হতে লাগলো আমার। আমি ওনার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললাম,

~ কি হয়েছে? আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন আমার দিকে? উত্তর দিন আমার কথার?

উনি কোন উত্তর না দিয়ে এবার আমার সামনে উঠে দাঁড়ালো। উনাকে দাড়াতে দেখে আমি দু পা পিছিয়ে গেলাম। উনি আমার দিকে গুটি গুটি পায়ে এগোতে লাগলেন। আমিও ধীরে ধীরে পেছনে যেতে লাগলাম। এভাবে যেতে যেতে একসময় আমি দেয়ালের সাথে গিয়ে আটকে গেলাম। উনি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে দুদিকে হাত রেখে আমাকে মাঝখানে আটকে দিয়ে বলে উঠলেন,
~ লাইক সিরিয়াসলি রাহি? তুমি এজন্য রাগ দেখিয়ে ও বাসা থেকে চলে এলে এত রাতে?

~ ত তা নয়তো কি হ্যা, তা নয়তো কি? রাই কেনো আমার আগে মা হবে? আমার কেনো বেবি হবে না?

আমার কথা শুনে উনি স্থির দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর হঠাৎ করেই জোরে শব্দ করে হাসিতে হাসতে বিছানার উপর গিয়ে পড়ে গেল। ওনাকে এভাবে হাসতে দেখে মেজাজ টা যেন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল আমার। ইচ্ছে করছে উনাকে খুন করে ফেলতে।

আমি দ্রুত ওনার কাছে এগিয়ে গিয়ে ওনাকে কিল ঘুষি মারতে লাগলাম। রাগে যেন শরীর জ্বলছে আমার। আমার এত সিরিয়াস মুডের সময় উনি কিনা হাসছেন? কেমন লোক উনি? আমাকে এভাবে মারতে দেখে উনি আমার দুই হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে আমাকে উনার বুকের উপর ফেলে দিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠলেন,

~ তাহলে চলো তোমার কোলে বেবি আনার জন্য মিশন শুরু করা যাক।

ওনার এমন কথায় ড্যাবড্যাব করে উনার দিকে তাকালাম আমি। ওনার কথাটা বুঝতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেল আমার। কিন্তু যতক্ষণে বুঝতে পারব তার আগেই উনি আমাকে আঁকড়ে ধরলেন নিজের বাহুডোরে।

সকাল সাতটা। রাজ ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে এক কাপ কফি খেতে খেতে রহিমাকে ডেকে বললো ব্রেকফাস্ট রেডি করতে। আজ অফিসে একটি জরুরি মিটিং আছে। তাই সকাল সকালেই অফিসে যেতে হবে তাকে। রহিমাকে কথাগুলো বলে কফি মগ হাতে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল রাজ। তারপর পাশে পড়ে থাকা একটি ম্যাগাজিন নিয়ে পড়তে লাগল। সাথে কফি খেতে লাগল। তখনই গেস্ট রুম থেকে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে এলো আরিশা। ওকে ব্যাগ হাতে বেড়িয়ে আসতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো রাজ। তারপর বলে উঠলো,
~ কি হয়েছে আরিশা? এত সকাল-সকাল ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাচ্ছো তুমি?

ওর প্রশ্নের উত্তরে আরিশা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,

~ আসলে আমি নিজের বাসায় চলে যাচ্ছি আরিয়ান। শুধু শুধু তোমার এখানে থেকে কি করবো বলো। আর তাছাড়া আবারও আমি মেডিকাল কলেজে জয়েন করবো ভাবছি। বিদেশে তো আর করা হলো না। তাই দেশে থেকেই করবো।

~ সেটা তো খুব ভালো কথা আরিশা। কিন্তু তুমি এখান থেকে কেন চলে যাচ্ছো? আর তাছাড়া আন্টিও তো এখন দেশে নেই। সে কবে ফিরবে সেটাও তুমি জানো না। তাহলে তুমি এখানেই থেকে যাচ্ছো না কেন? আর তাছাড়া তোমার মেডিকেল কলেজ টা ও তো এখান থেকে কাছে হবে। তোমার বাসা থেকে তো বেশ দূরে হয়ে যায়। এই বাসাতে শুধু আমরা একাই থাকি। তুমি থাকলে তেমন একটা সমস্যা হবে না। এখানেই থেকে যাও। তুমি থাকলে রাহিরও আর একা ফিল হবে না।

সারাদিন ও একা একাই থাকবে, তুমি থাকলে তাও দুজন সময় কাটাতে পারবে একসাথে।

~ কিন্তু আরিয়ান এভাবে তোমাদের এখানে থাকলে তোমাদের আবার যদি অসুবিধা হয়?
~ আরে কিসের অসুবিধা হবে, কিছুই হবে না। তুমি এখানেই থেকে যাও সবার ভালো সময় কাটবে।

রাজের কথা শুনে চোখ মুখ খুশিতে চকচক করে উঠলো আরিশার। ও যেন রাজের মুখ থেকে এই কথাগুলো শোনার অপেক্ষাই করছিল। খুশিতে যেন মনটা লাফিয়ে উঠলো ওর। ও দ্রুত ব্যাগ নিয়ে আবার নিজের রুমে ফিরে গেল। ওকে ফিরে যেতে দেখে রাজ মুচকি হেসে ব্রেকফাস্ট করতে চলে গেলো।

তারপর রহিমাকে বললো রাহি উঠলে ওকে খাবার দিতে। আর ও অফিসে গেছে তা বলতে। তারপর ব্রেকফাস্ট শেষ করে অফিসের জন্যে বেরিয়ে পরলো রাজ। যাওয়ার আগে রুমে গিয়ে ঘুমন্ত রাহির কপালে ছোট করে ভালবাসার পরশ একে দিলো সে।


পর্ব ৪৩

জানালা ভেদ করে সকালের মৃদু রোদ এসে চোখের ওপর পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল আমার। ঘুম ঘুম চোখে হাই তুলতে তুলতে চোখ মেলে তাকালাম আমি। আশেপাশে তাকিয়ে পুরো রুমটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। তারপর বিছানার পাশে তাকিয়ে দেখি রাজ নেই। পুরো রুম টাতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। ধীরে ধীরে উঠে বসে এদিক ওদিক তাকালাম একবার। তারপর ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাজ সেখানে আছে কিনা। কিন্তু না রাজ সেখানেও নেই।

রুমের দরজা হালকা করে ভিড়িয়ে দেওয়া দেখে বুঝতে পারলাম রাজ হয়তো নিচে গেছে। তারপর সামনে থাকা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম সকাল ৮.৪৫ মিনিট বেজে গেছে। এত বেলা অব্দি ঘুমিয়েছি আমি? ভাবতেই মাথায় যেনো বাজ পরলো আমার। এটা কি হলো? এত বেলা অব্দি তো কখনোই ঘুমাই না আমি। আমি দ্রুত বিছানা ছেড়ে নামার জন্য নিচে পা রাখলাম। আর তখনই বিছানার পাশে টেবিলের ওপর রাখা একটি ফুলের তোড়ার দিকে চোখ পরতেই থমকে গেলাম আমি। বিছানা ছেড়ে না নেমে বিছানার উপরে বসে থেকে ফুলের তোড়াটা হাতে নিলাম।

ওটা হাতে নিতেই একটি চিরকুট নজরে এলো আমার। যেটা ঐ ফুলের তোড়াটার নিচে রাখা ছিল। আমি চিরকুটটা হাতে নিয়ে ফুলের তোড়াটা পাশে রেখে দিয়ে চিরকুট টা খুলে পড়তে লাগলাম।
” জান খুব ইচ্ছে করছিল তোমাকে ডেকে তুলে সকালবেলা একটু ভালোবাসার পরশ নিয়ে যাই।

কিন্তু কি করবো বল! তোমার ঐ ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখটা দেখার পর আমার আর সাহস হয়ে উঠল না তোমাকে ডেকে তোলার। তাই তোমাকে না বলেই অফিসে চলে গেলাম। আজ অফিসে ভীষণ জরুরী একটা মিটিং আছে তাই আর দেরি করতে পারলাম না। তুমি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে আমাকে একটা ফোন কোরো প্লিজ। আমি তোমার ফোনের জন্য অপেক্ষায় থাকবো। মিস ইউ জান এন্ড আই লাভ ইউ। “

চিরকুট টা পড়ে আনমনেই মুখে হাসি ফুটে উঠল আমার। চিরকুটটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে ওনাকে অনুভব করলাম আমি। সত্যিই আমি খুব ভাগ্যবতী, তাই ওনার মতো একজন ভালবাসার মানুষ পেয়েছি আমি। উনি সত্যিই একটা পাগল। এতটা পাগলের মতো যে কেউ কারো স্ত্রী কে ভালবাসতে পারে উনাকে না দেখলে হয়তো জানতামই না!

আমি ওনাকে এত এত জ্বালাতন করি তবুও কখনো একটুও রাগ করেননি উনি। বরং নিজের ভালোবাসা দিয়ে আমার সব রাগ ভুলিয়ে দেয়। কথাগুলো ভেবে মুচকি হাসি দিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেলাম আমি। একটু পর ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে বালিশের পাশে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে ওনার নাম্বারে ডায়াল করলাম আমি। একবার রিং হতেই ফোনটা রিসিভ করলেন উনি। হয়তো এতক্ষণ উনি আমার ফোনের জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। রিসিভ করেই মায়া জরানো গলায় বলে উঠলেন,

~ জান ঘুম থেকে উঠেছো তুমি?
ওনার কথায় মুচকি হাসলাম আমি। তারপর দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে ছোট্ট করে বললাম,

~ হুমম!
~ চিরকুট টা পেয়েছিলে?
~ হুমম!
~ ফ্রেশ হয়েছো?
~ হুমম!

~ আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করবে না? কথা বলবেনা আমার সাথে? নাকি শুধু এই হুম হুম ই করতে থাকবে?
বেশ কর্কশ গলায় বললেন কথাটা উনি। উনার কথা শুনে আবারও মুচকি হাসলাম আমি। তারপর শান্ত গলায় বলে উঠলাম,
~ আপনার না জরুরী মিটিং আছে? তাহলে আমার সাথে কথা বলছেন যে? আর একবার রিং হতেই সাথে সাথে ফোন রিসিভ করে ফেললেন কিভাবে?
আমার কথা শুনে উনি হালকা হেসে ঘোর লাগানো গলায় বলে উঠলেন,

~তোমার চাইতে জরুরি আমার কাছে অন্য কোন কিছুই নয় জান। আর মিটিং একটু পরে, এখন নয়। এতক্ষণ তোমার ফোনের অপেক্ষাই করছিলাম আমি।
উনার কথা শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেল আমার। ওনার মিটিং যদি আরেকটু পরেই থাকে, তাহলে কি প্রয়োজন ছিল এত সকাল সকাল আমাকে রেখে চলে যাওয়ার? আমি চুপ করে বসে রইলাম ওনার কথার কোন উত্তর দিলাম না। আমার কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে উনি আবার বলে উঠলেন,

~ কি হল জান কথা বলবে না আমার সাথে? চুপ করে আছো কেন তুমি? জানো সকাল থেকে তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি দেখে আমার কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছিল? তাইতো তোমার ফোনের অপেক্ষায় বসে ছিলাম এতক্ষণ।

~ মিটিং যদি আরেকটু পরেই থাকে তাহলে কি দরকার ছিল এত তাড়াতাড়ি আমাকে না জাগিয়ে চলে যাওয়ার? আরেকটু পরে গেলে কি এমন ক্ষতি হতো?
আমার কথার উত্তরে উনি শব্দ করে হেসে দিয়ে বললেন,
~ আরে পাগলি মেয়ে আমি কি এত তাড়াতাড়ি এসেছি সাধে? এসেছি তোমার জন্যই। তোমার জন্য একটি সারপ্রাইজ আছে। সেটাই করতে হবে আর তাছাড়া মিটিং তার জন্য প্রিপারেশনও নিতে হতো নাকি?

~ সারপ্রাইজ! কি সারপ্রাইজ আছে আমার জন্য? বলুন না প্লিজ। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে?
~ উহুহ কি সারপ্রাইজ এখন বলে দিলে আর সেটা সারপ্রাইজ থাকবে নাকি? আমি অফিস থেকে ফিরে তোমাকে সব বলে দিবো। তুমি ওয়েট করো প্লিজ। এখন বলো ব্রেকফাস্ট করেছো?
~ উহু এখনো করিনি।

~ কি বলছ কি তুমি রাহি? এখন বেলা বাজে সাড়ে নয়টা! তুমি এখনো ব্রেকফাস্ট করোনি? যাও তাড়াতাড়ি গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নাও। আমি দশ মিনিট পর আবার ফোন দিবো। এর মাঝে তুমি যদি ব্রেকফাস্ট না করো, তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম। তাড়াতাড়ি যাও আর ব্রেকফাস্টটা করে নাও জান। আমি এখন ফোন রাখছি কেমন! আমাকে কিন্তু ব্রেকফাস্ট হয়েগেলে ফোন দিয়ে জানাবে যে তুমি ব্রেকফাস্ট করেছ। আমি ওয়েট করে থাকবো তোমার ফোনের।

~ আপনাকে আর অপেক্ষা করতে হবে না মিষ্টার বর মশাই। আমি খেয়ে নিচ্ছি আপনি আপনার মিটিং সামাল দেন। আর বাসায় একটু তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করেন। বাই
কথাটি বলেই ফোনটা কেটে দিলাম আমি। তারপর একা একাই হাসতে লাগলাম।

এখন হয়তো উনিও হাসছেন। সত্যিই আমি ওনাকে একটু বেশিই জ্বালাতন করি। কথাগুলো ভেবে ফোনটা রেখে নিচের দিকে পা বাড়ালাম আমি। তারপর নিচে সিড়িতে গিয়ে দেখি আরিশা ডাইনিং টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট করছে। আমাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালো ও। ওকে উঠে দাঁড়াতে দেখে আমি ওর পাশে এগিয়ে গিয়ে বললাম,

~ কি হলো আরিশা খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে কেনো?
আরিশা মুচকি হেসে বললো,

~ এখনো খেতে বসি নি আমি। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম এতক্ষণ। দুজনে একসাথে খাব বলে। এসো একসাথে ব্রেকফাস্ট করা যাক।
ওর কথায় মুচকি হেসে দুজন মিলে পাশাপাশি চেয়ারে বসে বলে উঠলাম আমি,

~ তুমি ব্রেকফাস্ট করে নিলেই পারতে! আমার উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেল আজ। এত বেলা অব্দি না খেয়ে আছো তুমি শুধু শুধু।
আমার কথায় আরিশা হেসে দিয়ে বললো,

~ আরে সমস্যা নেই আমার অভ্যাস আছে। আমি তো আরো দেরীতে ব্রেকফাস্ট করি।
ওর কথায় আর কিছু না বলে দুজন মিলে খাবার খাওয়ায় মন দিলাম। খেতে খেতে আরিশা আবার বলে উঠল,
~ জানো রাহি, আমি ভোরবেলা উঠে নিজের বাড়িতে যাবো বলে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়েছিলাম।

কিন্তু আরিয়ান এত জোর করলো না কি বলবো! জোর করেই বললো এখানে থাকতে। তুমি নাকি সারাদিন একা একা ফিল করো। তাই তোমার সাথে থেকে তোমাকে সময় দিতে বলল ও। নইলে এতক্ষণ তো আমি নিজের বাড়িতে চলে যেতাম।

আরিশার কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললাম আমি,

~ কেন আরিশা? তুমি কেন চলে যেতে নিয়েছিলে? আরিয়ান তো ঠিকই বলেছে। আমি সারাদিন একদম একা একা খুব বোর হতাম বাসায়। তুমি আছো এখন একটা সঙ্গি আছে। দুজন মিলে খুব ভালো সময় কাটবে আমাদের। কি বল?

~ হুমম আমিও তাই আর না করতে পারিনি।

আরিশার কথা শুনে মুচকি হেসে আবারও খাবারে মনোযোগ দিলাম দুজন। তারপর খাওয়া শেষ করে যখন উঠতে যাব তখন’ই রহিমা এসে দুজনের সামনে দুই বাটি পায়েস দিয়ে বললো,
~ ম্যাডাম এটা আপনাদের জন্যে। খেয়ে নিন, খাবার শেষে মিষ্টি মুখ করতে হয়।

ওর কথা শুনে মুচকি হেসে ওর দিকে তাকিয়ে পায়েসের বাটিটা হাতে তুলে নিলাম আমি আর আরিশা। তারপর এক চামচ পায়েস মুখে দিতেই মনটা যেন জুড়িয়ে গেল আমার। সত্যিই মেয়েটির হাতের রান্নার তুলনা হয়না। অনেক সুন্দর রান্না করে ও। প্রতিটা খাবার’ই অনেক সুস্বাদু করে রান্না করতে পারে।

আমি এক চামচ মুখে দিয়ে রহিমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললাম,
~ সত্যিই রহিমা, তোমার হাতের কাজের তুলনা হয়না। প্রতিটি খাবার কি রকম নিখুঁত ভাবে তৈরি করো তুমি। খুবই ভালো লাগে তোমার তৈরি খাবার খেতে।
আমার কথা শুনে খুব খুশি হলো রহিমা। তারপরে হাসি দিয়ে বলল,
~ ম্যাডাম আরেকটু পায়েস দেই?
~ এখন নয় পরে খাবো আবার। এখনি এটুকুই থাক।

আমার পরে আরিশাও রহিমার রান্নার অনেক প্রশংসা করল। তারপর দুজন মিলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে উপরে ছাদে চলে গেলাম। আড্ডা দেওয়ার জন্য। আরিশা অনেক মিশুক একটা মেয়ে এবং অনেক মিষ্টি। ওর সাথে গল্প করতে গেলে কখন সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না। দুজন মিলে বেশ জমে গেছে আমাদের। সারাক্ষণ গল্প করে কাটিয়ে দিচ্ছি সময়।


পর্ব ৪৪

সেই কখন থেকে রাজের পিছু পিছু এদিক থেকে ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি। কিন্তু পাজিটা একটুও শান্ত হয়ে বসছে না। উনার সাথে অনেক কথা আছে, সেটা কিভাবে বোঝাবো ওনাকে। তাছাড়া উনার সারপ্রাইজটাও তো জানার আছে আমার। কিন্তু উনি আসার পর থেকে সেই তখন থেকে শুধু ফোনে কার সাথে যেন কথা বলে যাচ্ছেন।

একটুর জন্যও আমাকে সময় দিচ্ছেন না। এবার বড্ড বেশি রাগ হচ্ছে আমার। ইচ্ছে করছে উনার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে একটা আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলি। অনেকক্ষণ এভাবে উনার পিছু পিছু হাঁটার পর এবার বেশ বিরক্ত লাগছে আমার। তাই আর উনার পিছু পিছু না হেটে চুপটি করে গিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। উনি আরো কিছুক্ষণ এভাবে ফোনে কথা বলে ফোনটা পকেটে রেখে আমার পাশে এসে বসলেন। তারপর জোরে একটা নিশ্বাস ছেড়ে ভাবলেশহীন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

~ কী হয়েছে? এমন গাল ফুলিয়ে বসে আছো কেন?

~ সেটা জেনে আপনি কি করবেন? আপনার কোনো ইচ্ছে আছে এটা জানার মত? আপনার হাবভাব দেখে আমার তো তা মনে হয়না! আপনি আসার পর থেকে যে আমি আপনার পিছু পিছু ঘুরে চলেছি সেটা কি আপনার নজরে পড়েনি? এটাই আপনার ভালোবাসা? সকালে তো চিরকুটে বেশ ভালোভাবেই লিখে দিয়েছিলেন, আমার সাথে কথা বলতে না পেরে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসছে! তাহলে আসার পর থেকে তো একটুও কথা বললে না আমার সাথে? সেই তখন থেকে ফোনে কথা বলে চলেছেন। বলি আপনার বউ কি আমি? নাকি ফোনে যার সাথে কথা বলছিলেন সে? সেই কখন থেকে কথা বলেই যাচ্ছেন তো বলেই যাচ্ছেন। আমার দিকে তাকানোর সময় টুকুও নেই আপনার! এখন কথা থামালেন কেন হ্যা? বলুন না বলুন সারাদিন সারারাত কথা বলুন। আপনার কথা বলা শেষ করতে হবে না। আমি চললাম আমার বাপের বাড়ি।

কথাগুলো একনাগাড়ে বলে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস টেনে তারপর রাগি চোখে উনার দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। সামনের দিকে দু একপা বাড়াতেই উনি এসে আমার হাত ধরে বললেন,
~ আরে আরে তুমি চলে গেলে আমি সার্প্রাইজ টা দেবো কাকে? আর আমার সাথে কক্সবাজার যাবে কে?
ওনার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভির গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

~ কক্সবাজার যাবে মানে?
আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পিছন থেকে আমাকে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে চুলে মুখ গুজে দিয়ে উনি বলল,
~ মানে আজ বিকেলে আমরা কক্সবাজার পাড়ি দিচ্ছি।

ওনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওনার দিকে ঘুরে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলাম,
~ হঠাৎ কক্সবাজারে কেন যাব আমরা?
উনি আমার কথায় গম্ভীর মুখ করে অসহায় কণ্ঠে বললেন,

~ আচ্ছা তুমি কি কোন কিছু বুঝতে পারো না রাহি? কক্সবাজার মানুষ কেন যায়? অবশ্যই ঘুরতে যায় তাই না? তোমাকে নিয়ে আমি সেখানে ঘুরতেই যাব। মানে হানিমুনে যাবো আমরা বুঝলে। সাতদিন সেখানেই থাকব। সেখানে আমাদের সাথে অন্য কেউ থাকবে না। শুধু তুমি আর আমি। সেখানে কোনো কাজ থাকবে না। সারাক্ষণ তুমি আর আমি একসাথে থাকবো। আর সারাদিন শুধু রোমান্স করব।
~ রো রো রোমান্স করবো মানে?

~ মানে তোমার তো বাচ্চা চাই তাইনা বলো? বাচ্চা তো আর এমনি এমনি আসবে না। সে জন্যে বাচ্চার বাবা মাকে একটু রোমান্টিক হতে হবে। একটু স্পেস থাকতে হবে সবার থেকে। তাহলেই তো সে আসবে। আর তাই এই ব্যাবস্থা বুঝলে। এখন কথা না বাড়িয়ে চলো। দুজন তাড়াতাড়ি খেয়ে নেই। রেডি হতে হবে তো, বিকাল চার টায় রওনা হতে হবে আমাদের।

ওনার কথায় বেশ লজ্জা পেয়ে গেলাম। লজ্জায় ওনার দিকে তাকানোরও সাহস হচ্ছে না আমার। তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর দেওয়াল ঘড়িটার দিকে ফিরে তাকালাম। দেওয়াল ঘড়িতে অলরেডি তিনটা বাজতে চলল। আমি ওনার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললাম,

~ আপনার কি মাথা ঠিক আছে রাজ? আমরা চারটার সময় যদি এখান থেকে বের হই তাহলে এখন সময় আছে মাত্র এক ঘণ্টা। মাত্র এক ঘন্টার মাঝে কিভাবে রেডি হবো আমরা? আর তাছাড়া কক্সবাজার যেতে হলে তো নিজেদের একটা গোজ গাজও আছে তাই না? আমি কাপড় গোছাবো কখন আর নিজেই বা রেডি হবো কখন? আর আমার বাড়িতেও তো জানাতে হবে নাকি?
~ কুল ম্যাডাম কুল। আপনাকে কোনো গোজগাজ করতে হবে না। আর আমি রাই আর রাকিব ভাইয়াকেও ফোন করে সব বলে দিয়েছি। তাই শুধু আপনাকে নিজে রেডি হতে হবে। কাপড় চোপড়ের গোছগাছ যেটা করতে হবে সেটাও করা আছে। তাই চিন্তা না করে এখন তাড়াতাড়ি চলো দুজন মিলে একসাথে লাঞ্চ টা করে নিয়ে রেডি হতে হবে।

কথাগুলো বলে আমার হাত নিচে নিয়ে আসতে লাগল রাজ। আমিও কিছু না বলে চুপ করে আসতে লাগলাম। নিচে আসতেই আরিশা আমাদের পাশে এগিয়ে সে বলে উঠল,
~ কি ব্যাপার আরিয়ান? আসার পর থেকেই দেখছি তুমি কার সাথে যেন ফোনে কথা বলে চলেছো। আর রাহিও তোমার পিছে পিছে ঘুরে চলেছে। কি হয়েছে বলোতো, কিছু কি হয়েছে তোমাদের মাঝে?
ওর কথা শুনে রাজ মুচকি হেসে বলে উঠলো,

~ তেমন কিছুই নয় আরিশা। আসলে আমরা বিকেলে কক্সবাজার যাচ্ছি। আর তাই এতক্ষণ ফোনে একটু কথা বলে সব ঠিকঠাক করছিলাম।
~ হঠাৎ কক্সবাজার কেনো? এনি প্রবলেম আরিয়ান?

~ নো প্রবলেম আরিশা। আসলে আমি রাহিকে নিয়ে কিছু দিনের জন্যে সেখানে ঘুরতে যাচ্ছি। আই মিন আমরা হানিমুনে যাচ্ছি।
হানিমুনের কথাটা শুনতেই আরিশার মুখে যেন এক রাশ মেঘ এসে জমলো। ওর মুখটা একদম কালো হয়ে গেল। আরিশা একদম চুপ হয়ে রাজের কথার কোন উত্তর না দিয়ে দ্রুত হেঁটে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ওর এমন আচরণে রাজ কিছু মনে না করলেও, ওর আচরণটা মোটেও আমার কাছে স্বাভাবিক লাগলো না।

কেন জানি মনের মাঝে একটা খটকা লাগল। তবে কি আরিশা আমাকে নিয়ে জেলাস ফিল করছে? রাজের সাথে আমাকে দেখে সহ্য করতে পারছে না ও? কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। যদিও আমি জানি আরিশা আজকে পছন্দ করে। তাই বলে ও তো এখন জানে যে রাজ শুধু আমাকে ভালবাসে। আর আমি তার বিয়ে করা বউ। এখন কি আমাকে নিয়ে জেলাস ফিল করা ঠিক ওর? এসব ভাবতে ভাবতেই রাজ আমায় ডেকে বলে উঠল,

~ কই রাহি আবার দাঁড়িয়ে রইলে কেনো? জলদি আসো আমাদের খেয়ে রেডি হতে হবে তো।

ওর কথার উত্তরে মৃদু হেসে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলাম আমি। খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলেও মনের মাঝে একটা খটকা থেকেই গেলো আরিশাকে নিয়ে।
আমাদের সামনে খাবার রেডি করে দিতে দিতে মুচকি হেসে বলে উঠলো রহিমা,

~ স্যার, ম্যাডাম আপনারা বুঝে হানিমুনে যাবেন কক্সবাজারে? বিয়ের পর সব জামাই বউ’ই হানিমুনে যায়। আপনারাও মনে হয় সেখানে যাইতাছেন। সেখানে খুব মজা হইব তাই না স্যার?
~ হ্যা রহিমা আমরা কক্সবাজারেই যাচ্ছি। কেন ওখান থেকে তোমার জন্য কিছু আনতে হবে? কিছু লাগলে বলে দাও, তোমার জন্য আসার সময় নিয়ে আসবো আমরা।
আমার কথা শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে রহিমা বলে উঠলো,

~ আরে ম্যাডাম, আসলে আমি তো এটাই বলতে চাইছিলাম। কিন্তু কিভাবে বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমি শুনছি ঐ কক্সবাজারে নাকি শামুকের তৈরী অনেক কিছু পাওয়া যায়। এই যেমন শামুকের দুল, শামুকের মালা, শামুকের কিলিপ। আমার না সেগুলো পড়ার খুব শখ। আপনারা ঐ খান থেকে আসার সময় আমার জন্যে ওগুলা নিয়া আইসেন। আর তার বদলে আমার বেতন থেকে টাকা কেটে দিয়েন।

রহিমার কথায় হেসে ফেললাম আমরা দুজন। তারপর মৃদু হেসে রাজ বললো,

~ তোমার বেতন থেকে কাটতে হবে না রহিমা। তোমার জন্য আসার সময় এমনিতেই ওগুলো নিয়ে আসবো আমরা। তুমি চিন্তা করো না। এখন তাড়াতাড়ি আমাদের খেতে দাও দেরি হয়ে যাচ্ছে।
তারপর দুজন মিলে দ্রুত খেয়ে রুমে চলে এলাম। তারপর যত দ্রুত সম্ভব রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

এখন সারে তিনটা বাজে। বাইরে বের হয়ে আরিশা আর রহিমার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরলাম আমরা। বের হওয়ার সময় আরিশার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। একদম মেঘে ঢেকে ছিলো ওর মুখটা। ও যে মন থেকে মোটেও খুশি নয়। এটা বেশ ভালই বুঝতে পেরেছি আমি।

বাইরে বের হয়ে গাড়ির কাছে আসতেই থমকে দাঁড়ালাম আমরা। কারণ সেখানে একটি অচেনা লোক দাঁড়িয়ে আছে। লোকটির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি লোকটি কে। তখনই লোকটা দৌড়ে রাজের সামনে এসে বলে উঠলো,

~ ভালো আছেন স্যার? আমারে চিনতে পারছেন? আমি রাজু, রাজু অটো ড্রাইভার।
লোটির নাম শুনে চিনতে পেরে রাজ মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

~ হ্যাঁ, হ্যাঁ কেনো চিনতে পারবো না। চিনতে পেরেছি তোমায়। কিন্তু তুমি এখানে কি করছ? আর আমার বাসায চিনলেই বা কি করে?
রাজু ড্রাইভার তখন হেসে দিয়ে বলে উঠলো,

~ ভুলে গেছেন স্যার আপনে না আমারে আপনের বাড়ির ঠিকানা দিছিলেন, আর বলছিলেন কোন দরকার পরলে আপনের কাছে আইতে। তাই আমি আপনের কাছে আসছি। আসলে আমার একটা কাজের খুব দরকার এখন। আপনি কি আমায় একটা কাজ দিতে পারবেন?

উনার কথা শুনে বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবল রাজ। তারপর মৃদু হেসে বলে উঠল,
~ তুমি প্রাইভেট গাড়ি চালাতে জানো?

রাজের কথা শুনে লোকটি এক মুহূর্ত দেরি না করে বলে উঠল,
~ হ স্যার আমি সব গাড়ি চালাতে জানি। প্রাইভেট গাড়ি চালানো তো আমার বাঁহাতের খেল।

~ তাহলে আর চিন্তা কিসের আজ থেকেই তোমাকে চাকরি দিয়ে দিলাম। তুমি আমাদেরকে গাড়িতে করে নিয়ে কক্সবাজার যাবে আজকে আর এখনি। আমরা কক্সবাজার যাচ্ছি কয়েক দিনের জন্যে। তুমিও চলো আমাদের সাথে। বাই দ্যা ওয়ে, তোমার কোনো সমস্যা নাই তো?

~ না না স্যার, আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি অবশ্যই আপনার লগে যামু। খালি যাওয়ার আগে রাস্তাতেই আমার বাড়ি পরে সেখান থিকা আমার কিছু কাপড় চোপড় নিয়া যামুনি।
~ তাহলে দেরি কিসের চলো যাওয়া যাক। আর শোনো সেখানে আমরা বেশ কয়েকদিন থাকবো। তোমাকেও কিন্তু আমাদের সাথে সেখানেই থাকতে হবে। আর একটা কথা, আমি চেয়েছিলাম নিজেই ড্রাইভিং করে তোমার ভাবিকে নিয়ে যেতে। কিন্তু যেহেতু তুমি সাথে যাচ্ছ তাই আমিও আর ড্রাইভিং করবো না। ওখানে যেখানে যেখানে যেতে হবে তুমি আমাদেরকে নিয়ে যাবে ঠিক আছে?
~ স্যার এইটা নিয়ে আপনে কোন চিন্তা করবেন না। সব আমি করমু যা করা লাগে আপনাগো লাইগা।

কথাটা বলেই আমরা কক্সবাজার এর জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আর রাজু নামের অটো ড্রাইভারটা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো। আমরা পিছন সিটে বসেছি আর ড্রাইভারটা সামনে। লোকটার আচার-ব্যবহার কেমন যেনো রহস্যজনক লাগছে আমার কাছে। তাই রাজুর দিকে তাকিয়ে বললাম,

~ আচ্ছা রাজ এভাবে একটা অপরিচিত লোককে আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়া কি খুবই জরুরী ছিল? মানে হঠাৎ করে এসে চাকরি চাইল আর আপনি দিয়ে দিলেন? আর উনিও সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। এভাবে আমাদের সাথে কয়েকদিনের জন্য যাওয়ার জন্য। এটা কি ঠিক হলো বলেন? আমার কাছে কিন্তু লোকটাকে মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না।
আমার কথার উত্তরে রাজ এক হাত দিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে মুচকি হেসে বলল,

~ আরে ধুর পাগলী তুমি শুধু শুধুই চিন্তা করছ। এটা কে জানো? তোমার বলা মিথ্যা কথায় যাকে ধরে আমরা পিটিয়ে ছিলাম। এটা সেই অটো ড্রাইভার রাজু। শুধুশুধু বেচারারে অনেক মেরেছিলাম সেদিন আমরা। তখন বুঝতে পেরেছিলাম লোকটা বেশ ভালো। সেদিন ওনাকে টাকা দিয়েছিলাম সে টাকা টাও নিতে চাইনি। পরে বলেছিলাম যে কোন প্রয়োজনে তাকে সাহায্য করবো। তাহলে আজ যখন সে প্রয়োজনে আমার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে আমি কি করে তাকে ফিরিয়ে দেবো বলো? তুমি এসব নিয়ে ভেবনা তো। কিচ্ছু হবে না। আর তাছাড়া এই লোকটাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।
রাজের কথার উত্তরে আমি চুপ করে গেলাম। আর কিছু বললাম না। আসলে কি বলব সেটাই খুঁজে পেলাম না।

তাই চুপ করে থাকাই বেটার মনে করলাম। তবে কেন জানিনা এই লোকটিকে নিয়ে বেশ খটকা লাগছে আমার। বেছে বেছে এই সময়টায় তেই আসার সময় হলো উনার? আর এক কথায় আমাদের সাথে যাওয়ার জন্যও রেডি হয়ে গেলো। তাই মোটেও ব্যাপারটা স্বাভাবিক লাগছে না আমার কাছে। যদিও জানি আমার এই ভাবনার কোন ভ্যালু নেই। হয়তো রাজ’ই ঠিক বলছে। তবুও কেন জানি বারবার মনের মাঝে বড্ড কু ডাকছে আমার।


পর্ব ৪৫

দীর্ঘ 10 থেকে 11 ঘণ্টা একটানা জার্নি করে আসার পর পৌছালাম কক্সবাজার। জায়গাটা এতটা সুন্দর যে এখানে আসতেই যেনো এতক্ষণ জার্নি করে আসার ক্লান্তিটা হারিয়ে গেল এক নিমেষে। প্রকৃতির সৌন্দর্য যে এতটাও ভালো হতে পারে সেটা হয়তো এখানে না আসলে জানতে পারতাম না কখনোই। আমি ছোট বেলা থেকেই প্রকৃতিপ্রেমী। কিন্তু কখনোই দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি কারো সাথে। শুধু বাসার আশেপাশের পার্ক গুলোতে মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতাম ভাইয়ার সাথে। তাছাড়া সব সময় বাসায় থেকে অভ্যস্ত আমি। কক্সবাজার আসার ইচ্ছে ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু কখনও সেই সুযোগ হয়ে ওঠেনি। রাজ যে আমাকে এভাবে সারপ্রাইজ দিয়ে এখানে নিয়ে আসবে সেটা আমার ভাবনার বাইরে ছিল।

সত্যিই জায়গাটা এতটা সুন্দর যে বলে বোঝাতে পারব না। গাড়ি থেকে নামতেই সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া এসে বারবার গা স্পর্শ করে যাচ্ছে আমার। সেই হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে আপন খেয়ালে উড়ে চলেছে আমার মাথার চুলগুলো। আমরা যে হোটেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি সেই হোটেলটা মস্ত বড় ও অনেক সুন্দর একটি হোটেল। তার ঠিক সামনেই রয়েছে সমুদ্র সৈকতের একটি দিক। এখান থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সমুদ্র সৈকত ও হাজার মানুষের আনাগোনা।
আমাকে গাড়ি থেকে নেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে রাজ ডেকে বললো,

~ ভেতরে যাবে না? প্রকৃতি দেখার অনেক সুযোগ পাবে রাহি। এখন চলো ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক। অনেকটা রাস্তা জার্নি করে এসেছি আমরা।
ওর কথায় ধ্যান ভাঙল আমার। ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ওর সাথে সামনের দিকে হাটা দিলাম। গাড়িটাকে এক সাইডে পার্কিং করে রেখে গাড়ি থেকে ব্যাগ পত্র গুলো নিয়ে আমাদের পিছু পিছু আসতে লাগল রাজু ড্রাইভার। তিনজন একসাথে হোটেলের ভেতরে ঢুকতেই দুজন লোক হাসিমুখে এগিয়ে এসে রাজ কে সালাম দিয়ে বলল,

~ স্যার আমরা এতক্ষণ আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আপনাদের আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?
তার কথার উত্তরে রাজ মৃদু হেসে বলে উঠলো,

~ না তেমন কোনো সমস্যা হয়নি, বরং বেশ ভালোভাবেই এসেছি। তবে আমাদের জন্য রুম বুক করা হয়েছে তো?
~ জ্বি স্যার সে নিয়ে আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমরা সবকিছু রেডি করে রেখেছি। ভিতরে চলুন আপনাদের এখানে অবশ্যই ভালো লাগবে। আপনাদের জন্য স্পেশাল রুমের ব্যবস্থা করে রেখেছি আমরা।

লোকটির কথার উত্তরে ড্রাইভার রাজুকে ডেকে এনে সামনে দেখিয়ে বলে উঠল রাজ,

~ ইনি হলেন আমার ড্রাইভার রাজু। উনি আমাদের সাথেই এসেছেন। আপনারা উনার জন্য একটি রুমের ব্যাবস্থা করে দিন। আর আমাদের নিজের রুমে নিয়ে চলুন। খুব টায়ার্ড লাগছে আমাদের।
রাজের কথার উত্তরে লোক দুটির মাঝে একজন রাজু কে সাথে নিয়ে আরেকটি রুমের ব্যাবস্থা করতে চলে গেলেন। আর অপরজন আমাকে আর রাজকে সাথে নিয়ে দোতালায় একটি বিশাল বড় রুমের সামনে নিয়ে গেলেন। তারপর দরজা খুলে চাবি আমাদের হাতে দিয়ে আমাদের জন্যে খাবারের ব্যাবস্থা করতে চলে গেলেন। রুমটা অসম্ভব সুন্দর এবং সাজানো গোছানো ও পরিপাটি। অনেক বড় একটি রুম এটা। দেখে বোঝাই যাচ্ছে রুমটা হয়তো শুধু স্পেশাল গেস্টদের জন্য। কারণ আমার জানামতে হোটেলের রুম গুলো এর চাইতে অনেক ছোট ছোট হয়।

আমি রুমের মধ্যে ঢুকে চারিপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। রুমের দেওয়ালের সাথে সুন্দর সুন্দর বেশ কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্যের পেন্টিং সাথে নানা রকমের ফুলের পেন্টিং লাগানো আছে। রুমের মাঝে থাকা বিছানাটাও অনেক বড় এবং খুব গোছানোভাবে রাখা।

রুমের এক পাশে রয়েছে এক জোরা সোফাসেট আর ঠিক তার সামনেই রয়েছে একটি বড় আলমারি। তার পাশেই দেওয়ালের সাথে লাগিয়ে রাখা আছে এলইডি টিভি। আর অপরপাশে রয়েছে বেশ বড় একটি বেলকনি। আমি দৌড়ে বেলকুনির ভেতরে চলে গেলাম। সেখানে যেতেই দেখতে পেলাম সেখান থেকে সমুদ্রসৈকত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর সেই সাথে বেলকুনিতে রয়েছে ছোট ছোট ফুল গাছ এর টপ। যে গাছ গুলোতে ছোট ছোট অসংখ্য ফুল ফুটে আছে।

জায়গাটা এতটা বেশি ভালো লাগছে আমার, যা বলে বোঝাতে পারবোনা। আমি এদিক থেকে ওদিক বারবার ছুটে চলে সবকিছু দেখতে লাগলাম। বিশেষ করে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র সৈকত দেখাটা যেন অত্যন্ত ভালো লাগছে আমার। যখন আমি এসব দেখতে ব্যস্ত, তখন’ই কোমরে হঠাৎ কারও ঠান্ডা হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। আর পেছনে ঘুরে তাকালাম আমি। তাকিয়ে দেখলাম রাজ আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘারে মুখ গুজে দিয়েছে। চুলের মাঝে নাক ডুবিয়ে নেশা ভরা গলায় বলে উঠল,

~ জায়গাটা তোমার পছন্দ হয়েছে জান? কেমন লাগছে এখানে এসে?
রাজের কথার উত্তরে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর নাকটা হালকাভাবে টিপে দিয়ে বলে উঠলাম আমি,

~ এতটা ভাল লাগছে যা আপনাকে বলে বুঝাতে পারব না রাজ। সত্যিই এমন একটি জায়গায় ঘুরতে আসা কল্পনা ছিল শুধু আমার। কখনো ভাবতেও পারেনি সত্যিই এখানে এমন কোন জায়গাতে আসতে পারবো। আমার যে কত দিনের ইচ্ছা ছিল এখানে বেড়াতে আসা আপনাকে বলে বুঝাতে পারব না। আপনি যে এভাবে আমাকে সারপ্রাইজ দিবেন, সত্যি কি বলব অসম্ভব ভালো আছে আমার রাজ। আপনাকে অনেক বেশি ধন্যবাদ।

~ উহু শুধু ধন্যবাদ দিলে তো চলবে না! আমিতো এখানে তোমার ধন্যবাদ এর আশায় তোমাকে নিয়ে আসিনি জান। আমার যে অন্য কিছু চাই। তার কথায় একটি মাতাল করা ভাব স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমি। তার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললাম,

~ আমার অনেক টায়ার্ড লাগছে রাজ। অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছি। চলুন একটু ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। খুব ক্ষুদা লেগেছে আমার।
আমার কথার উত্তরে উনি আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের কোলে তুলে নিলেন। তারপর কোলে করে নিয়ে এসে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে বললেন,
~ তুমি বস আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তারপর তুমি ফ্রেশ হয়ে আসবে, আর সেই ফাকে আমি খাবার আনিয়ে নিবো কেমন।
কথাটি বলেই আমার কপালে একটি চুমো একে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলেন উনি।

সে চলে যেতেই আমিও বাধ্য মেয়ের মতো বিছানায় নিজের গা এলিয়ে দিলাম। বেশ অনেকক্ষণ সময় এভাবে জার্নি আর হাঁটাহাঁটির পর সত্যিই অনেক ক্লান্ত লাগছে শরীরটা। তাই বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। অনেক সময় পর ঘুম ভাঙলো গালে কারো নরম স্পর্শ পেয়ে। চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেলাম রাজ আমার কাছে এসে গালে নিজের হাত দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করছে। আমাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে সে আমার মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে মিষ্টি সুরে বলে উঠল,
~ ঘুম হয়েছে আমার ঘুম কুমারি? নাকি আরো ঘুমাতে চান? আমার তো মনে হচ্ছে আপনি এখানে ঘুম পাড়ার জন্যই এসেছেন।

তার কথায় চোখ দুটো হালকা ডলে নিয়ে উঠে বসলাম আমি। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারিদিকে বেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। বুঝতেই পারিনি এতটা সময় কখন পেরিয়ে গেছে। আমি ওনার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বলে উঠলাম,

~ এত বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি আমি? আর আপনি আমাকে একবারও ডাকেননি রাজ? ইস কত বেলা হয়ে গেছে, আমাদের বুঝি আজ আর সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যাওয়া হলো না। তাই না রাজ?
উনি আমার কথায় হালকা হেসে নিয়ে আমার নাকে আলতো করে টেনে দিয়ে বলে উঠল,

~ আরে পাগলি ঘুম থেকে উঠে এসব কি আবোল তাবোল বলছ? ভালো ভাবে বাইরে তাকিয়ে দেখো এখনো সন্ধ্যা হয়নি। আমরা যখন এসেছি তখন থেকে জাষ্ট কয়েকটা ঘন্টা সময় পেরিয়েছে মাত্র। কিন্তু আকাশে অসম্ভব মেঘ করায় প্রকৃতিটাকে দেখতে এতো ভয়ানক লাগছে। মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

উনার কথায় বেলকুনি দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম আমি। সত্যিই আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে এসেছে চারিদিক। গাছের পাতাগুলোও একদম নিরব নিস্তব্ধ হয়ে আছে। একটুও নড়াচড়া করছে না তারা। যেন মনে হচ্ছে সবাই মিলে আজ কোন সমাবেশে বসেছে। কেউ একটু নড়াচড়া করলেই তার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি ধিরু পায়ে খাট থেকে নেমে বেলকুনিতে চলে গেলাম। আমার পিছু পিছু রাজও এসে পাশে দাঁড়ালো। তারপরে আকাশ পানে তাকিয়ে দেখলাম একদম ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশটা।

সমুদ্রের ঢেউ গুলোও ধিরু গতিতে আছড়ে পড়ছে তীরে। চারিদিক থেকে কেমন একটা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে সুই এর মতো গেথে যাচ্ছে শরীরে। যদিও গাছের পাতা তেমন নড়াচড়া করছে না। কিন্তু সমুদ্রের এই ঢেউ এর কারনেই হয়তো এমন ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভুতি হচ্ছে আমার।

আমি যখন এসব নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছি তখনই রাজ আমার হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে উঠল,
~ কি ব্যাপার রাহি তুমি কি ফ্রেশ হবে না? তাড়াতাড়ি যাও না প্লিজ ফ্রেশ হয়ে এসো। আমাদের তো খেতে যেতে হবে নাকি? মনে হচ্ছে ঝর আসতে পারে। এখন এখান থেকে চলো তো।
ওর কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে রুমে চলে আসলাম। তারপর রুমে ঢুকেই ওয়াশরুমে চলে গেলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য।

বেশ কিছুক্ষণের মাঝে ফ্রেশ হয়ে যখনি নিজের জামা কাপড় পড়ার জন্য জামা-কাপড় নিতে যাব! তখনই আমার খেয়াল হলো আমি তো বাসা থেকে কোন কাপড়-চোপড় নিয়ে আসিনি! তাহলে এখন আমি পড়বো কি? এবার ভীষণ মাথা ঘুরছে, কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। তাই তাওয়ালটা নিজের সাথে কোনরকম জড়িয়ে নিয়ে হালকা একটু দরজা খুলে উঁকি মেরে বলে উঠলাম,
~ রাজ আপনি কি এখানে আছেন?

একবার ডাকার সাথে সাথে যেন দৌড়ে চলে আসলেন উনি। তারপর একদম আমার মুখের সামনে মুখ নিয়ে চোখ টিপ মেরে বলে উঠলেন,
~ বলো জান কি দরকার? আমি কি ভিতরে আসব তোমাকে ফ্রেশ হতে হেল্প করার জন্যে?

উনার এমন কথা শুনে চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল আমার। কেমন বেশরম লোক একটা। আমি দরজাটা হাল্কা লাগিয়ে দেওয়ার মতো করে বলে উঠলাম,
~ আপনাকে কি আমি বলেছি ভিতরে আসার জন্য? আজব লোক তো আপনি! আমাকে তো বাসা থেকে কোন কাপড়’ই আনতে দিলেন না। তাহলে এখন আমি পড়বো টা কি? এখন কি সারাদিন এই তাওয়াল পরেই থাকবো আমি?

~ হুমম থাকতেই পারো তাতে আমার কোনো অসুবিধা নাই। কিছু না পরে থাকলেও সমস্যা নাই।
ওনার কথায় রাগি চোখে তাকালাম ওনার দিকে। আমাকে এভাবে তাকাতে দেখে হাসতে হাসতে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে একটি ব্যাগ খুলে তার মধ্যে থেকে একটি জামা নিয়ে এসে হাতে দিলেন উনি আমার। জামাটা হাতে নিয়েই আমি দ্রুত দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমের ভেতরে চলে আসলাম।

তারপর ড্রেসটাকে খুলে দেখতেই চোখদুটো যেন ছানাবড়া হয়ে গেল আমার। কেননা অসম্ভব রকমের কাজ করা একটি জরজেট কাপড়ের গাউন জামা তুলে দিয়েছেন উনি আমার হাতে। এটা কি যখন তখন পড়ে থাকার জন্য নাকি? লোকটা কি পাগল হয়ে গেছে? এসব কথা ভেবে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে রইলাম আমি। তারপর কোন উপায় না পেয়ে জামাটা পড়ে নিলাম। ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে সোজা ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কোমরে হাত দিয়ে বলে উঠলাম,

~ এটা কি এনেছেন কি আপনি আমার জন্যে? এসব জামা কি সব সময় পরে থাকা যায়?

~ হুমম যায়, আর তুমি এগুলোই পরবে বুঝলে। তবে চিন্তা করো না রাতে ঘুমোনোর সময় এসব পরে ঘুমাতে হবে না তোমায়। এখন কথা না বাড়িয়ে জলদি চলো খাবার খেয়ে নেই।
তার কথায় আমি কিছু বলতে যাবো, সে আমাকে থামিয়ে দিয়ে সোজা আমার হাত ধরে পাশে থাকা সোফায় রাখা খাবারের কাছে নিয়ে গেলেন আমায়। তারপর সামনে বসিয়ে রেখে নিজে হাতে খাবার মেখে তুলে ধরলেন আমার সামনে।

খাবার দেখে ওনাকে আর কিছু বলতে পারলাম না আমি। কারন আমারও অনেক খুধা লেগেছে।


পর্ব ৪৬

বাইরে অসম্ভব ঝড় হচ্ছে। আর সেই ঝড়ের সাথে তাল মিলিয়ে হচ্ছে অসম্ভব বজ্রপাত। বেশ কিছুক্ষণ পরপরই অনেক জোরে জোরে ডেকে উঠছে মেঘ। আমি গুটিসুটি মেরে বিছানার এক কোনায় বসে আছি। রাজ এতক্ষণ আমার পাশেই বসে ছিল। তাই খুব একটা ভয় হচ্ছিল না। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ হলো রাজ ওয়াশরুমে গিয়েছে যে কারণে রুমের মাঝে একদমই একা বসে আছি আমি। আর মেঘের এমন গর্জনে অসম্ভব ভয় লাগছে। ছোটবেলা থেকেই আমি মেঘের গর্জন খুব ভয় পাই।

আর সেটা যদি হয় রাতের বেলা তাহলে তো কথাই নেই। এখন রাত প্রায় সারে আটটা বাজতে চললো। বেশ অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পরেও রাজ যখন ওয়াশরুম থেকে না ফিরলো, তখন আমি বিছানা থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে ওয়াশরুমের কাছে এগিয়ে গেলাম।

তারপর দরজায় টোকা দিব কি দিব না এমনটা ভাবতে ভাবতেই দরজায় টোকা দিয়ে বসলাম। কিন্তু না, রাজ তবুও দরজা খুলছে না। এবার সত্যিই অনেক ভয় লাগছে।

এদিকে মেঘও বারবার ডেকে চলেছে আপন মনে। ভয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার। তাই আরো বেশ কয়েকবার টোকা দিলাম দরজায়। সাথে সাথে খুব জোরে বিকট শব্দ করে মেঘ গর্জন করে উঠল। সেই সাথে তাল মিলিয়ে কারেন্টও চলে গেল। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। ভয়ে আমি জোরে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলাম। তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো রাজ। বুকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো,

~ এই পাগলি এভাবে ভয় পাচ্ছ কেন তুমি? আমি আছি না তোমার কাছে! এই দেখো আমি এসেছি। ওয়াশরুমে গেলে কি এত তাড়াহুড়ো করে বের হওয়া যায় বলো? আমি অনেকক্ষণ হলো বের হতে চাইছিলাম কিন্তু কাজ শেষ না করে কি করে বের হবো বলো। এই দেখো কিছুই হয়নি সব ঠিক আছে। ভয় পেওনা জান আমার। দেখো আমি আছি তো তোমার কাছে।
ওর কথায় আমি ওর শার্ট দুহাতে খামচে আঁকড়ে ধরে ওর বুকে শক্ত করে মাথা গুঁজে রেখে কান্না করতে লাগলাম। সত্যিই অসম্ভব ভয় পেয়েছি।

এতটা ভয় হয়তো কখনই পাইনি। এমনিতেই মেঘের গর্জন অসম্ভব ভয় পাই, তার ওপর যখন আশেপাশে কেউ নেই একদন একা। আর অপরিচিত জায়গা বলে ভয়টা যেনো আরো বেশি জেঁকে বসেছে আমার মনে। আমাকে এভাবে ভয় পেতে দেখে রাজ আমাকে কোলে তুলে নিল। তারপর কোলে নিয়ে বিছানার উপরে গিয়ে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল। ওনার বুকে মাথা গুঁজে যেন নিজেকে এখন অনেক বেশি নিরাপদ লাগছে।

সত্যিই একটি মেয়ের জন্য তার স্বামীর বুক’ই সবচাইতে নিরাপদ এবং শান্তির জায়গা। এরকম শান্তি হয়তো অন্য কারো কাছেও হয়না। যে শান্তি টা নিজের ভালবাসার মানুষ স্বামীর বুকে মাথা রেখে পাওয়া যায়। আমি ওনার বুকের মাঝে যতটা সম্ভব ঢুকে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে রইলাম। সে আমায় আলতো হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। সাথে চুলের মাঝে বিলি কেটে দিতে লাগলেন বারবার। আমি পরম আদরে উনার বুকে মাথা গুঁজে চুপ করে রইলাম। এভাবেই কেটে গেল বেশ অনেকটা সময়। বাইরে ঝড়ও অনেকটা কমে এসেছে। মেঘের গর্জনও তেমন নাই।

সেই সাথে কারেন্ট এসে চারিদিকে বেশ আলোকিতও হয়ে গেছে। কিন্তু আমার যেন ওনার বুক থেকে সরতেই ইচ্ছা করছে না। দুপুর থেকে একটানা ঝড় হওয়ার আজকে বাইরে ঘুরতে যাওয়া হয়নি আজ। সেই দুপুর থেকেই অসম্ভব জোরে ঝড় শুরু হয়েছে। যার কারণে আর ঘুরতে যাওয়া হয়নি। তখন থেকে রুমের মাঝেই রয়েছি আমরা। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ার শব্দে ধ্যান ভাঙগো আমাদের। রাজ আমাকে আলতো হাতে মাথাটা নিজের হাতের ওপর থেকে বালিশে নামিয়ে দিয়ে, কপালে ছোট করে একটি চুমো একে দিয়ে দরজা খুলতে চলে গেলেন।

দরজা খুলতেই একটা সার্ভেন্ট আমাদের রাতের খাবার দিতে রুমের ভিতরে ঢুকলো। তার পিছু পিছু ছোট্ট একটি গুলুমুলু বিড়াল রুমের মধ্যে ঢুকে পড়ল। বিড়ালটাকে দেখে আমি বিছানা থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে বিড়ালটার কাছে এগিয়ে গেলাম। এত সুন্দর বিড়াল আমি কখনো দেখিনি। যখনই হাত বাড়িয়ে বিড়ালটাকে ধরতে যাব তখনি ৫ থেকে ৬ বছর বয়সি একটি মেয়ে দৌড়ে এসে আমার সামনে থেকে বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে নিল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

~ আমার বনিকে নিচ্ছ কেন? এটাতো আমার বিড়াল বনি। তুমি কেন নিচ্ছিলে?

মেয়েটিকে এতটা মিষ্টি দেখতে যে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। আমি হা করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি আবারও বলে উঠলো,
~ এই যে আন্টি তোমার কি মন খারাপ? তুমি আমার বনিকে নেবে? কিন্তু এটাতো আমার বনি! আচ্ছা আমি আব্বুকে বলবো তোমার জন্য এমন একটা বনি বিড়াল এনে দিতে কেমন।
এই মিষ্টি মেয়েটির মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে যেন মনটা ভরে গেল আমার। আমি ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ওর গালে হাত রেখে বললাম,
~ মামনি নাম কি তোমার? আর তুমি এখানে কি করছ?

~ আমার নাম মিষ্টি আর আমি এখানে আব্বু-আম্মুর সাথে ঘুরতে এসেছি। আমরা তো ওই পাশের রুমেই থাকি। তোমার নাম কি?
~ তোমার নামের মতো তোমাকে অনেক মিষ্টি দেখতে। আর তুমি অনেক মিষ্টি করে কথাও বল। আমার নাম রাহি। তুমি আমায় রাহি আন্টি বলে ডাকতে পারো।
আমার কথার উত্তরে মেয়েটি মুচকি হেসে দিয়ে বলে উঠলো,

~ না তোমাকে আমি রাহি আন্টি না, পরী আন্টি বলে ডাকবো। তোমাকে না এই ড্রেসটা তে একদম পরীর মত লাগছে। অনেক সুন্দর তুমি ঠিক আমার আম্মুর মত।
মেয়েটির কথার উত্তরে আমি কিছু বলবো তার আগেই রাজ এসে ওর সামনে বসে গাল টিপে দিয়ে বলল,
~ এই যে পাকনা বুড়ি তুমি এখানে কি করছ?

~ আরে বোকা আঙ্কেল তুমি? আমি তো এখানে বনিকে নিতে এসেছি। কিন্তু বোকা আঙ্কেল এখানে কি কর তুমি?
ওদের কথা শুনে অবাক হয়ে বলে উঠলাম,

~ এই এক মিনিট এক মিনিট! রাজ আপনি ওকে চেনেন? মানে আপনারা এমন ভাবে কথা বলছেন যেন আপনারা আগে থেকেই পরিচিত?
আমার কথার উত্তরে রাজ মিষ্টির গাল টেনে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,

~ আর বলো না রাহি। আজকে দুপুরে যখন তোমাকে রেখে কিছুক্ষনের জন্য বাইরে গিয়েছিলাম, তখন যাওয়ার সময় লিফটে ওর সাথে আমার দেখা হয়ে যায়। আর সেখানে ভুল বশত ওর এই বিড়ালটাকে আমি পুতুল ভেবে ছিলাম। তখন থেকেই আমাকে ও বোকা আঙ্কেল বলে ডাকে।

~ কি বলছেন কি আপনি রাজ? এই এত টুকুন মেয়ে লিফটে একা উঠেছিলো?

আমার কথার উত্তরে রাজ কিছু বলার আগেই মিষ্টি বলে ওঠে,

~ না না পরী আন্টি, আমি তো একা উঠেছিলাম না। আমার সাথে আব্বুও ছিল। তাই না বোকা আঙ্কেল?
মিষ্টির কথার উত্তরে রাজ হেসে বলল,

~ হ্যা তখন ওর আব্বুর সাথেও পরিচিত হয়েছি আমি। ওরা আমাদের পাশের রুমেই উঠেছে। আচ্ছা মামনি তুমি এখন এখানে একা এসেছো কেন? তোমার আব্বু আম্মু তো চিন্তা করবেন তোমাকে নিয়ে তাই না?

রাজের কথাটা শুনেই জিভে কামড় দিলো মিষ্টি। তারপর অসহায় গলায় বলে উঠল,
~ এই রে আমিতো একদমই ভুলে গেছি। আচ্ছা বোকা আঙ্কেল, পরী আন্টি এখন আমি যাই আম্মু মনে হয় আমাকে খুঁজছে। আবার পরে কথা হবে আচ্ছা।

কথাগুলো বলেই দৌড়ে চলে গেলো মিষ্টি। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থেকে হাসতে লাগলাম। সত্যিই নামের মত মেয়েটি অনেক মিষ্টি এবং ওর কথাগুলো খুব মিষ্টি লাগছিলো শুনতে।
মিষ্টি চলে যেতেই রাজ গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। তখনই সার্ভেন্ট লোকটি আবার আসলো আর রাজের হাতে কিছু একটা দিয়ে বলে উঠল,
~ এটা স্পেশালি আপনার জন্য স্যার। এটা শুধু মাত্র যারা হানিমুন করতে আসে এখানে তাদের জন্য স্পেশালি দেওয়া হয়।

কথাগুলো বলেই লোকটা দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো। রাজ দরজা লাগিয়ে দিয়ে হাতে থাকা মাটির পাত্রে রাখা তরলটা নিয়ে টেবিলে রাখলো। তারপর আমার কাছে ফিরে আসলো। আমি বিছানায় বসে পা ঝুলাতে ঝুলাতে জিগ্যেস করলাম,
~ ওটাতে কি আছে রাজ?

রাজ আমার প্রশ্নে ঐ মাটির পাত্রের দিকে একবার তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকিয়ে বাকা হাসি দিয়ে বললো,
~ ওটা তেমন কিছু না, আর ওটা কিন্তু তোমার জন্যে নয়। তাই ওটার কাছেও যাবেনা বুঝলে? আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। দেখে আসি রাজু কিছু খেয়েছে কি না।

কথাটা বলেই রাজ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি অনেক কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ঐ মাটির পাত্রটার দিকে। তারপর গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে পাত্রটাকে হাতে তুলে নিলাম। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম তাতে তরল শরবত জাতিয় কিছু রাখা। কিন্তু রাজ আমায় এটা খেতে বারন করলো কেনো? কথাটা ভাবতেই কৌতুহল নিয়ে এক চুমুক খেয়ে নিলাম আমি তরলটা। তারপর,
রাজ রাজুর সাথে দেখা করে সব কাজ শেষ করে রুমে চলে আসে। আর রুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই ওর চোখ দুটো যেনো বেড়িয়ে আসার উপক্রম হয়। কারন সামনে তাকিয়ে দেখে,


পর্ব ৪৭

দরজা খুলে রুমে ঢুকতেই চোখ যেন কটোর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো রাজের। কারণ ও সামনে তাকিয়ে দেখল, রাহি বিছানার ওপর মাথা নিচের দিকে আর পা উপর দিকে দিয়ে সটান হয়ে শুয়ে আছে। চুল গুলো নিচের দিকে ছড়িয়ে রেখেছে। পরোনের জামা কাপড় গুলো কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। রাজ দৌড়ে গিয়ে ওর পাশে বসে ওর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলল,

~ রাহি, কি হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে পড়ে আছো কেন? এই রাহি তাকাও আমার দিকে, বলো আমায় কি হয়েছে তোমার?

ওর কথা শুনে ওর দিকে বড় বড় চোখ করে ড্যাব ড্যাব করে তাকাল রাহি। ও তাকাতেই ওর চোখ দেখে যেন আঁতকে উঠল রাজ। কারণ ওর চোখ দুটো ভীষণ লালচে লাগছে। তার সাথে মুখটাও কেমন অগোছালো লাগছে। রাহি ওর কোল থেকে লাফিয়ে উঠে বসে পিটপিট করে ওর দিকে তাকিয়ে। ঘারটা একদিকে কাত করে রাজের গাল টেনে দিয়ে ওর কোলে উঠে বসলো। তারপর ওর দিকে কিছুটা ঝুকে ওর ঠোঁটে আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে নেশা মাখা গলায় বলল,

~ স্বামী, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে স্বামী? তুমি জানো আমি তোমাকে ছাড়া একটুও থাকতে পারি না। তুমি কই ছিলা স্বামী?
রাহির এমন আচরণে রাজ বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বোঝার চেষ্টা করল ওর আসলে কি হয়েছে। পরক্ষণেই ওর মনে পড়লো নিশ্চয়ই ও কোন কিছু খেয়েছে। রাজ আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সেই মাটির পাত্র টা একদম খালি। সেটা দেখতেই নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠল,

~ ওহ সিট, এখন কি হবে? এই মেয়ে তো সবটুকু ভাঙ খেয়ে নিয়েছে। এখন কি কি করবে ও আল্লাহই জানে?
এতোটুকু বললেই রাহি ওর কোল থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে ভাব নিয়ে বলল,

~ এই ছেলে তোমার সাহস তো কম নয়? তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সামনে এভাবে বসে আছো ক্যান হুহহ? আমি নাচ দেখতে চাই। তাই এভাবে বসে না থেকে নাচো। আমি প্রধানমন্ত্রী তোমার সামনে বসে থেকে তোমায় আদেশ করছি, তুমি নাচো আর আমার মনোরঞ্জন করো।

রাহির এমন কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালো ওর দিকে রাজ। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে এসে ওকে সান্ত করার জন্যে বলে উঠলো,
~ ইশশ রাহি, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো। কি বলছো এসব আবোলতাবোল। প্লিজ কন্ট্রোল ইউরসেল্ফ।

~ ওই বেটা তুই কী বললি আমায়? আমি নিজেরে নিয়ন্ত্রণ করবো? আরে ব্যাটা তুই প্রধানমন্ত্রীর উপরে কথা কস। আমি এখানে চুপ করে বসে আছি তুই নাচ। আমি তোর নাচ দেখে মনোরঞ্জন করমু। নাচ ব্যাটা।
~ রাহি প্লিজ নিজের জ্ঞানে আসো। বোঝার চেষ্টা করো তুমি কোন প্রধানমন্ত্রী নও আর আমি রাজ তোমার বর। ভালো করে তাকিয়ে দেখো নিজেকে কন্ট্রোল করো। কি আবোল তাবোল বলছ এসব তখন থেকে?

~ ফাজিল পোলা কি বললি তুই? আমায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মানোস না? আজকে তো তোকে আমি?
কথাটা বলেই পুরা রুমজুড়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো রাহি।

বেশ কিছুক্ষণ খুঁজতে খুঁজতে পাশের টেবিলে থাকা একটি কাঠের স্কেল হাতে পেলো রাহি। তারপর সেটাকে নিয়ে চলে এসে রাজের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে নিজে আলতো ভাবে মারতে মারতে বলে উঠলো,

~ তুই জানোস না দেশের প্রধানমন্ত্রী কোন কিছু অর্ডার করলে সাধারন জনগনের সেটা মানতে হয়। তুই কি নাচবি, নাকি তোরে আমি এটা দিয়ে পিটনি দিমু?

কথাগুলো বলেই রাজকে তাড়া করতে লাগলো ও। ও বেচারাও কোনো উপায় না দেখে ছোটাছুটি শুরু করলো। রাজ এখন কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে বেশ ভালভাবেই বুঝে গেছে যে রাহি নিজের মাঝে নেই। সে এখন পুরোপুরি মাতাল হয়ে গেছে। এভাবে বেশ কিছুক্ষন ধরে রুম জুড়ে ছোটাছুটি করার পর এবার হয়রান হয়ে চুপ করে এক জায়গায় দাঁড়ালো রাজ। সেই সুযোগে রাহি গিয়ে ওর পিঠের উপর স্কেল দিয়ে দুটো লাগিয়ে দিয়ে বলল,

~ কিরে ব্যাটা এখন নাচবি নাকি আমি তরে এটা দিয়ে বাইরামু?
রাহিকে রাগি ভাবে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ে কোন উপায় না পেয়ে এবার নাচার জন্য রাজি হলো রাজ। তবে শর্ত দিল সে মোবাইলে ভিডিও করে রাখবেন সব কিছু। রাহিও নাচতে নাচতে রাজি হয়ে গেলো ওর শর্তে।

বিছানার ওপর পায়ের উপর পা তুলে লাঠিটা হাতে নিয়ে ইশারায় নাচতে বলল রাজকে। কিন্তু কিসের সাথে নাচবে সেটা বুঝতে না পেরে রাজ জিজ্ঞেস করল,
~ নাচবো তো ঠিক আছে। কিন্তু গান না চালালে নাচবো কার সাথে আমি?
ওর কথা শুনে রাহি বললো,

~ ঠিকই তো বলেছিস। তোর তো বুদ্ধি আছে রে বেটা। আচ্ছা দাঁড়া দেখি কি করা যায়।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে চিন্তা করে রাহি বললো,

~ আমি না, অনেক সুন্দর গান গাইতে পারি। আমি গান গাই আর তুই নাচ কেমন?
কথাটা বলেই গান গাইতে শুরু করল রাহি,
~ ঐ বেটা তুই শুনতে কি পাশ,

ঐ বেটা তুই শুনতে কি পাআআআশ,
হাতে লাঠি আমার, ওও হাতে লাঠি আমার!
যদি তুই না নাচিস মাইর খাবি আমার,
হাতে লাঠি আমার,ওও হাতে লাঠি আমার।

রাজ যা ও একটু নাচতে পারতো রাহির এমন গান শুনে সেটাও ভুলে গেলো। চুপ করে দাঁড়িয়ে হা করে রাহির দিকে তাকিয়ে রইলো। ও এটা কি গান গাচ্ছে সেটা বোঝার চেষ্টা করলো। ওকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাঠি হাতে ওর পাশে এগিয়ে এসে ওর পা__র ওপর একটা বারি মেরে দিয়ে রাহি আবারও গাইতে লাগলো,

~ প্রধানমন্ত্রী বসে আছে দেখ তোর সামনে,
তবু কেনো না নেচে দাঁড়িয়ে আছিস আনমনে।
ভালো ভাবে নেচে দেখা, নইলে তরে মারমু একা

তখন বুঝবি রাহির মাইরে কতটা মজার,
হাতে লাঠি আমার, ওও হাতে লাঠি আমার।
(এইডা কি একটা গান? ভাভা রে ভাভা)

ওর গান শুনে আর লাঠির বারি খেয়ে কোনো উপায় না পেয়ে রাজ এবার কোমর দুলিয়ে উল্টাপাল্টা নাচতে লাগলো। রাহিও নিজের মতো উল্টাপাল্টা গান গাইতে লাগলো। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর। রাহি ঢুলু ঢুলু পায়ে ওর কাছে এগিয়ে এসে হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়ে ওকে জরিয়ে ধরলো। তারপর বললো,

~ তুই অনেক সুন্দর নাচতে পারিস। আই লাইক ইউ। কিন্তু তুই এত লম্বু কেনো রে? একটু বেটে হতে পারিস না। আমি তোরে কিসি দিবো। কথাটা বলেই পা উঁচু করে রাজের ঠোট জোরা আকড়ে ধরলো রাহি। (বাকিটা অজানাই থাক)

সকালের তীব্র রোদ চোখে এসে লাগায় ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। ঘুম ঘুম চোখে উঠে বসে হাই তুলতে তুলতে ভালোভাবে চারি দিকে তাকালাম। চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সকাল হওয়ার বেশ অনেকটাই সময় পেরিয়ে গেছে। অনেক বেলা হয়ে গেছে হয়তো। এত বেলা অব্দি ঘুমিয়েছি আমি, তো বুঝতে পারছি না। কিন্তু কালকে রাত্রে কি হয়েছিল কিছুই মনে পড়ছে না। আমার মাথাটাও বেশ ব্যথা করছে। মাথায় হাত দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। তখনই খেয়াল হলো নিজের শরীরের দিকে। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম আমার শরীরে খুব ছোট একটি নাইটি ছাড়া আর কোন কিছুই নেই। কিন্তু কাল রাতে তো আমি এটা পড়ে ছিলাম না? কালকে তো একটা খুব সুন্দর গাউন পড়েছিলাম আমি।

এটা কখন পড়লাম তাহলে? তখনই মনে হলো এটা নিশ্চয়ই রাজের কাজ। ও হয়তো রাতে চেঞ্জ করে দিয়েছে আমায়। কিন্তু রাতে কি হয়েছে কোনো কিছুই মনে করতে পারছিনা আমি। নাইটিটা এতই ছোট যে বিছানা থেকে নামতে লজ্জা লাগছে আমার। তাই চাদর দিয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে ঢেকে নিলাম। তবে মাথা ব্যথার কারণে যেন সহ্য করতে পারছি না। মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলাম চুপ করে। তখনই রাজ এক গ্লাস শরবত হাতে আমার কাছে এগিয়ে এসে পাশে বসে বলল,
~ এই লেবুর শরবত টা খেয়ে নাও একটু বেটার ফিল হবে। কাল রাতে যা করেছ না তুমি আমি জিন্দেগীতে ভুলবো না।

উনার কথা শুনে উনার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালাম আমি। তারপর আমতা আমতা করে বলে উঠলাম,
~ কা কাল রাতে কি করেছি আমি? আমার তো কিছুই মনে পরছে না। আর এত বেলা অব্দি ঘুমিয়েছি আপনি আমায় ডাকেন নি কেনো?

~ কি করেছ সেটা পরে জানতে পারবে। এখন শরবত টা খেয়ে নাও মাথাব্যথা কমে যাবে। আর ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো তোমার জন্য এখনও নাস্তা করিনি আমি। বড্ড ক্ষুদা লেগেছে।
তার কথা শুনে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম। সত্যিই মনে করতে পারছিনা কিছু রাতে কি এমন করেছি আমি। কিন্তু মাথাব্যথায় কোন কথা বলতেও ইচ্ছা করছে না। তাই ওনার হাত থেকে শরবতের গ্লাস টা নিয়ে এক চুমুকে সবটুকু সাবাড় করে ফেললাম। তারপর গ্লাসটা উনার হাতে দিয়ে আবার ওনার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললাম,

~ বলুন না প্লিজ কাল রাতে কী হয়েছিল? আর আমার শরীরে তো গাউন পরা ছিল। তাহলে এই নাইটিটা এলো কি করে? আর এত ছোট নাইটি কোথায় পেলেন আপনি?
আমার কথায় উনি গম্ভীর গলায় অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন,

~ যেহেতু এই রুমে তুমি আর আমি ছাড়া অন্য কেউ থাকেনা। তাহলে নিশ্চয়ই গাউনটা খুলে নাইটিটা আমি তোমাকে পরিয়ে দিয়েছি তাই না? এখন কথা না বাড়িয়ে জলদি যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমার কিন্তু খুব ক্ষুধা লেগেছে রাহি। কাল রাতে তুমি যা করেছ আর কি বলব?


পর্ব ৪৮

~ যেহেতু এই রুমে তুমি আর আমি ছাড়া অন্য কেউ থাকেনা। তাহলে নিশ্চয়ই গাউনটা খুলে নাইটিটা আমি তোমাকে পরিয়ে দিয়েছি তাই না? এখন কথা না বাড়িয়ে জলদি যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমার কিন্তু খুব ক্ষুধা লেগেছে রাহি। কাল রাতে তুমি যা করেছ আর কি বলব?

উনার কথা শুনে আমি আমতা আমতা করে বললাম,
~ ক কি করেছি আমি কাল রাতে? আসলে আমার না, কালকে রাতের কোন কথাই মনে পড়ছে না! শুধু এতটুকু মনে আছে যে কাল রাতে আমি ওই সার্ভেন্ট এর দিয়ে যাওয়া মাটির পাত্রের শরবতটা খেয়েছিলাম। খুব মজার ছিলো শরবতটা। তারপর আর আমার কিছু মনে নাই। বলুন না প্লিজ কি হয়েছিলো কাল রাতে?

~ কি হয় নি, কি করনি সেটা বল রাহি? কাল রাতে তুমি যেটা করেছো আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেগুলো ভুলব না। আচ্ছা এখন কথা না বাড়িয়ে শরবত টা খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। আর শুনো বেশি সময় লাগাবে না। জলদি করে ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসো। এমনিতেই কালকে রাত্রে অনেকক্ষণ পানিতে ভিজে থাকতে হয়েছে তোমায়।

উনার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালাম আমি। তারপর মনে করার চেষ্টা করলাম কালকে রাত্রে আমি কখন পানিতে ভিজে ছিলাম। কিন্তু না আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না। তাই আবারও ওনার দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে অসহায় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,

~ বলুন না প্লিজ কালকে রাত্রে কি হয়েছিল? আর আমি পানিতেই বা কেন ভিজে ছিলাম?
আমার কথা শুনে রাজ আমার দিকে ঘুরে বসে আমার চোখে চোখ রেখে বলতে শুরু করল,

~ কালকে রাত্রে ওই মাটির পাত্রে যেটা ছিল সেটা কে ভাঙ বলে। মানে সেটা একটা নেশা জাতিয় তরল। তুমি সেটা খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলে। আর নেশা করে আমাকে তুমি যা নয় তাই করিয়েছো। এমনকি এই স্কেলটা হাতে নিয়ে আমাকে নাচিয়েছো। আর শুধু নাচিয়েই সান্ত হওনি, শেষ মুহূর্তে আমাকে কিস করার নাম করে নিজেকে সহ আমাকে জরিয়ে বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছিলে। আর সেই কারণেই তোমাকে অনেকক্ষণ পানিতে ভিজে থাকতে হয়েছে। কারণ বমি গুলো পরিষ্কার করে তোমার ড্রেস চেঞ্জ করে দিয়েছি আমি। আর কিছু বাকি রাখো নি আমার জীবনে। জীবনে যে টা করিনি, কালকে তোমার জন্য সেটা করতে হয়েছে আমাকে। পুরা একঘন্টা পাগলের মতো নাচিয়েছো তুমি আমায়। আর কি গান ধরেছিলে তুমি! এমন গান জীবনেও শুনিনি আমি।

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন উনি। ওনার কথা শুনে ড্যাব ড্যাব করে ওনার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে কথাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। তারপর আচমকাই হা হা করে হাসতে শুরু করলাম। যখন শুনেছি ওনাকে কাল রাতে আমি নাচিয়েছি, সত্যি বলতে এতটা মজা লেগেছে আমার যা বলার বাহিরে। কেন যে কালকে রাতের কথাগুলো মনে পড়ছে না? খুব মিস করছি সময়টাকে। আমাকে এভাবে হাসতে দেখে উনি একটা ধমক দিয়ে বললেন,

~ এই মেয়ে এত হাসি আসছে কোথা থেকে তোমার? আমার অবস্থা নাজেহাল করে এখন খুব হাসি পাচ্ছে তাই না? দিবো টেনে এক চড়।
ওনার ধমক খেয়ে থেমে গেলাম। থেমে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও দম ফাটানো হাসিতে ভেঙ্গে পড়লাম আমি। আমাকে এভাবে হাসতে দেখে উনি মাথায় হাত দিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। বুঝতে পারলাম অনেক বেশি বিরক্ত বোধ করছেন উনি। আর ওনার এই বিরক্তবোধ টাও আমার কাছে খুবই ভালো লাগছে।

খুবই মজা পাচ্ছি এটা ভেবে যে এমন একজন রাগি লোককে আমি পিটিয়েছি নাচিয়েছি। ভাবতেই কি যে আনন্দ লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। এভাবে বেশ কিছুক্ষন হাসার পর আমি উঠে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালাম। ফ্রেশ হব বলে। নাইটির ওপরে চাদর পেচিয়ে নিজেকে ভালো করে মুড়িয়ে নিয়েছি। ওয়াশরুমের দরজার কাছে যেতেই দেখলাম সেদিনের সেই বনি বিড়ালটা আমার আগেই ওয়াশরুমে ঢুকে পরলো। রাজ দরজা খোলা রাখায় বিড়ালটা আমাদের রুমে চলে এসেছে। আমি বিড়ালটাকে ধরব বলে ওটার পিছু পিছু ওয়াশরুমে ঢুকলাম। আর তখনই বিড়ালটা দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে বাথটাবে পড়ে গেল।

আর পড়ার সাথে সাথে বিড়াল টা যেনো কেমন ছটফট করতে লাগল। যেনো ওটা কারেন্টে আটকেছে। বিড়ালটাকে এমন করতে দেখে সন্দেহ হল আমার। তাই আমি চিৎকার দিয়ে রাজকে ডাক দিলাম। ডাকার সাথে সাথে রাজ চলে আসলো। এসে দেখে অবাক হয়ে গেল। কেননা বিড়ালটা বাথটাবে পরে ছটফট করতে করতে মারা গিয়েছে অলরেডি। বিড়াল টার এমন অবস্থা দেখে আমি রাজ কে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না করতে লাগলাম। বুঝতে বাকি রইল না এইভাবে কারেন্ট দেওয়া আছে। রাজ ভালো করে খুঁজে খুঁজে দেখল বাথটাবের মাঝে একটি কারেন্টের তার ফেলে রাখা।

এটা দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেউ প্ল্যান করে এভাবে রেখে দিয়েছে তারটা বাথটাবের পানিতে। রাজ আমাকে বুকে আগলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বাইরে নিয়ে এলো। তারপর আমার হাতে একটি সুন্দর সালোয়ার কামিজ ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত ওটা পরে নিতে বললো। আমিও বাদ্ধ মেয়ের মতো কোনো প্রশ্ন না করে সালোয়ার কামিজটা পরে নিলাম। তারপর ও আমাকে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে হাতের মুঠো শক্ত করে চিৎকার করে সিকিউরিটি কে ডাকতে লাগলো। সাথে সাথে একজন সার্ভেন্ট এসে হাজির হলো আমাদের রুমে। রাজ দাঁত কিড়মিড় করে রাগ দেখিয়ে কর্কশ কন্ঠে বলল,

~ আপনাদের হোটেলের ম্যানেজার কে ডাকুন। এই মুহূর্তে এখানে ডাকুন তাকে। তার সাথে কথা আছে আমার।

রাজ কে এমন রাগান্বিত হতে দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেল সার্ভেন্টটা। সে দ্রুত ম্যানেজারকে ডাকার জন্য ছুটে গেল। ওর দিকে তাকিয়ে যেন ভয় পেয়ে গেলাম আমিও। রাগে ওর চোখ মুখ একদম লাল রং হয়ে আছে। থরথর করে কাঁপছে ওর শরীর। বুঝতে পারছি অসম্ভব রেগে আছে ও। কিন্তু এখন আমার ওর চাইতেও বেশী ভয় লাগছে ওই বিড়ালটাকে ওইভাবে চোখের সামনে মরতে দেখে। বুঝতে পারছি না এখানে কারেন্ট আসলো কিভাবে? বেশ কিছুক্ষণ সময়ের মাঝেই হোটেলের ম্যানেজার এসে হাজির হলো আমাদের রুমে। তারপর রাজের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললো,

~ এনি প্রবলেম স্যার? আপনি এমন রেগে আছেন কেনো? মি আই হেল্প ইউ?
~ এই রুমের চাবি আমার কাছে ছাড়া আর কার কাছে আছে?

~ স্যার হোটেলের প্রতিটি রুমের চাবি’ই একটা কাস্টমারের কাছে আর একটা আমাদের কাছে থাকে। তেমনি এই রুমের চাবিও একটা আপনার কাছে আর একটা আমাদের কাছে আছে। কেনো স্যার কোনো সমস্যা হয়েছে কি?

ম্যানেজারের কথার কোন উত্তর না দিয়ে ওনার হাত ধরে টানতে টানতে ওয়াশ রুমে নিয়ে গেল রাজ। তারপর উনাকে বাথটাবের পানির দিকে লক্ষ্য করে দেখিয়ে রাগি গলায় বলে উঠল,
~ যদি তাই হয় তাহলে আপনারা বলুন এই কাজটা কে করেছে? আপনারা কেন এভাবে মারতে চাইছেন আমাদের? সব সত্যি করে বলবেন! এটা প্ল্যানিং কাজ ছাড়া আর কোন কিছু নয়। কিছুক্ষণ আগেও আমি এখানে ফ্রেশ হয়েছি। কই তখন তো আমার কারেন্ট লাগে নি! তাহলে এই এতোটুকু সময়ের মাঝে এখানে এভাবে কারেন্ট সিস্টেম কে করেছে? আজ এই বিড়ালের জায়গায় হয়তো আমার বা আমার স্ত্রীর কিছু হতে পারতো? আপনি বলুন এই কাজটা কে করেছে আমি এটার সঠিক প্রমাণ সহ জানতে চাই।

রাজের কথা শুনে আর বাথটাবের মধ্যে কারেন্ট সিস্টেম করে তার রেখে দেওয়া দেখে ম্যানেজার অনেক ঘাবড়ে গেলেন। উনি দরদর করে ঘামতে শুরু করলেন। তার মধ্যে রাজের এভাবে রাগ করতে দেখে যেন আরো বেশি অবস্থা খারাপ হলো তার। কারণ তারা খুব ভালোভাবেই জানেন রাজ কতটা পাওয়ারফুল একজন লোক। তাই সে রিকোয়েস্ট করে বলে উঠলেন,

~ প্লিজ স্যার আপনি এভাবে হাইপার হবেন না। আমরা দেখছি কি করা যায়। আর আমাদের কোন লোক এরকম টা কখনোই করবেনা। আর আপনার সাথে তো কথাই নেই। নিশ্চয় এখানে অন্য কারো হাত আছে বা কোন এক্সিডেন্টলি এটা হয়ে গেছে। প্লিজ আপনি শান্ত হন আমি দেখছি কি করা যায়।

উনি এভাবে মিনতি করে বললে ও রাজকে যেন শান্ত করতে পারলেন না। কারণ ও অনেক বেশি রেগে আছে রাগের চোটে থর থর করে কাঁপছে পুরো শরীর। রাগ যেন মাথায় উঠে গিয়েছে ওর। চোখ দুটো রক্ত লাল হয়ে আছে। ওকে এভাবে রাগান্বিত হতে দেখে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ম্যানেজার একজনকে ডেকে বললেন বাথটাব থেকে কারেন্ট এর তার সরিয়ে সেটাকে ঠিক করার জন্য।

লোকটিও ম্যানেজার এর কথা মতো কাকে যেনো ডাকতে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। আমি শুধু চুপটি করে বিছানার এক কোণে বসে সবার সবকিছু দেখছি। ম্যানেজার অনেক আকুতি-মিনতি করে রাজের কাছে বলে রুম থেকে বিদায় হলেন। তারপর ও গুটিগুটি পায়ে আমার পাশে এসে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে শান্ত করে নিয়ে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে বলল,

~ রাহি মনে করে বলতো আমি যখন এই রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম মানে তুমি তখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলে। তখন কি তোমার কারো কথা মনে হয়েছে বা তোমার এমন অনুভূতি হয়েছিল যে রুমে কেউ ঢুকেছে? আসলে আমি বাইরে থেকে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে গেলেও আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমি বাইরে যাবার পর এই রুমে অন্য কেউ ঢুকে ছিল। আর সে’ই এই কাজটা করেছে।
~ আমার কোন কিছু মনে পড়ছে না রাজ। আমিতো কালকে রাতে কি হয়েছে সে সবই ভুলে গিয়েছি।

তাহলে আপনি দরজা লাগিয়ে চলে যাওয়ার পর আমার ঘুম ভাঙার আগে রুমে কে এসেছিল আমি কিভাবে বলব বলুন? আমি তো ঘুম থেকে ওঠার পর আপনাকে সামনে দেখেছি। আর কাউকে নয়। বুঝতে পারছিনা কেউ কেন এমনটা করবে আমাদের সাথে। আমাকে কেনই বা কেউ মারতে চাইবে?
আমার কথার উত্তরে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল রাজ। তারপর কোন কিছু একটা ভেবে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ম্যানেজারকে ডাকতে লাগলো। সেই মুহূর্তেই রুমের মাঝে প্রবেশ করল মিষ্টি। তারপর রাজের দিকে তাকিয়ে ওর হাত ধরে বলল,

~ এই আংকেল, আংকেল! তুমি আমার বনিকে কোথাও দেখেছ? ওকে না আমি কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা। ও কি তোমাদের রুমে এসেছে?
মিষ্টির কথা শুনে রাজ এবার নিজেকে কিছুটা শক্ত করল। তারপর মিষ্টির সামনে হাটু গেরে বসে ওর গালে হাত দিয়ে বললো,

~ মামনি তুমি একটু তোমার আব্বুকে ডেকে নিয়ে আসতে পারবে? উনার সাথে আমি একটু কথা বলতাম। একটু ডেকে নিয়ে আসো প্লিজ!
রাজের কথা শুনে চুপ করে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল মিষ্টি। তারপর মুচকি হেসে বলল,
~ আচ্ছা আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।

কথাটা বলেই আব্বু আব্বু বলে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে ওদের রুমের দিকে চলে গেল। মিষ্টি চলে যেতেই রাজ ছলছল চোখে আমার দিকে একবার তাকালো। তারপর আবার মিষ্টিদের রুমের দিকে তাকালো। আমি বেশ বুঝতে পারছি মিষ্টি বনির কথা বলায় রাজ কষ্ট পেয়েছে। এই ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটি যখন জানতে পারবে ওর আদরের বিড়াল টা মারা গেছে! তখন কতই না কষ্ট পাবে ও। কথাটা ভাবতেই আমার বুকের মাঝে যেনো চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে। চোখ দুটো আপনা থেকেই ভিজে যাচ্ছে বার বার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মিষ্টি ওর আব্বুর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে আমাদের রুমের কাছে চলে আসলো। মিষ্টি আর ওর আব্বুকে আসতে দেখে ওদের কাছে রাজ এগিয়ে গিয়ে প্রথমে হ্যান্ডশেক করল মিষ্টির আব্বুর সাথে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভির কন্ঠে বলে উঠল,

~ এভাবে আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে সরি ভাইয়া। আসলে আপনার সাথে আমার কিছু কথা বলার আছে। মিষ্টির বিড়াল মানে বনি কে নিয়ে।

রাজের কথা শুনে মিষ্টির আব্বু একবার ওর দিকে আর একবার আমার দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে উঠলেন,
~ কি হয়েছে আসলে বলুন তো? কিছুক্ষণ আগে দেখলাম হোটেলের ম্যানেজারের সাথে আপনি চিৎকার চেঁচামিচি করছেন! এনি প্রবলেম ব্রো?

উনার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাজ একে একে সবকিছু খুলে বললেন ওনাকে। সবকিছু শোনার পর উনি কিছুক্ষণ চুপ করে দম নিয়ে থেকে বলে উঠলেন,
~ মিষ্টির বনিকে নিয়ে আপনারা টেনশন করবেন না। আমি মিষ্টিকে আরেকটা বিড়াল এনে দিবো বনির মতো। তবে আপনি একটি কাজ করে দেখতে পারেন মিস্টার রাজ।

ওই যে দেখুন এখানে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। তাহলে নিশ্চয়ই আপনাদের রুমে আপনারা ছাড়া অন্য কেউ যাওয়া আসা করলে ওইটাতে দেখা যেতে পারে। আপনি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করছেন না কেনো?
লোকটির কথা শুনে রাজের চোখ মুখ চকচক করে উঠল। কারন এতক্ষণ এই আইডিয়াটা ওর মাথাতেই আসেনি। আসলে ও সিসি ক্যামেরাটা সেভাবে খেয়াল করেনি কখনো। ওর আইডিয়াটা মাথায় আসতেই মিষ্টির আব্বুকে সাথে নিয়ে দ্রুত চলে গেলো ও ম্যানেজারের কাছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করবেন বলে।


পর্ব ৪৯

হোটেলের পাঁচ তলার উপরে একটি গোপন কক্ষ থেকে ভেসে আসছে কারো চিৎকারের আওয়াজ। চিৎকারটা আর কারোর নয় ড্রাইভার রাজুর। হ্যাঁ ওকে এলোপাতাড়ি মারধর করছে রাজ। কারণ রাজুই সেই ব্যাক্তি যে কিনা বাথটাবে কারেন্ট লাগিয়ে রেখেছিলো। হোটেলের সিসি ক্যামেরায় চেক করার পর একজন হুডিওয়ালা জ্যাকেট পরা লোককে দেখা গিয়েছিল। যে লোকটি ওদের রুমে প্রবেশ করে। লোকটার গায়ে হুডিওয়ালা জ্যাকেট থাকার কারণে লোকটাকে চিনতে না পারলেও লোকটির হাতের বেসলেট দেখে রাজের আর চিনতে অসুবিধা হয়না যে এটা রাজু ড্রাইভার। তাই সেই মুহুর্তেই ড্রাইভার রাজুকে হোলেটের একটি গোপন কক্ষে তুলে নিয়ে এসে মারধর করছে রাজ। ওর মুখ থেকে সব সত্যিটা জানার জন্য।

~ তোকে আমি বিশ্বাস করে এক কথায় তোকে আমার ড্রাইভার বানিয়ে চাকরি দিয়েছিলাম। আর তুই আমার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করলি? আমার স্ত্রীকে মারার জন্য আমারই রুমের বাথটাবে কারেন্ট সিস্টেম করে রেখেছিলি। তোর এত বড় সাহস আমি ভেবে পাচ্ছি না তুই এতটা সাহস কোথা থেকে পেলি? সত্যি করে বল তুই কে আর কার কথা মত এইসব করে বেড়াচ্ছিস? সত্যি করে বল রাজু, না হলে আজকেই পৃথিবীতে তোর শেষ দিন হবে।

কথাগুলো বলে আবারো হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে লাগল রাজুকে। অনেক মার খাওয়ার পর এবার রাজু আর সহ্য করতে না পেরে দুহাত তুলে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়ে বলতে শুরু করল,
~ দয়া কইরা আমারে মাফ করে দেন স্যার। টাকার লোভে আমি ভুল করছি। আর জীবনে এমন ভুল করুম না। আমি অনেক টাকা পাইছিলাম আপনাদের কে মারার জন্য। তাই একাজগুলো করছি। কিন্তু এইভাবে ধরা খাইয়া যামু একটুও জানতাম না।

ড্রাইভার এর কথা শুনে রাজ একটু শান্ত হল। তারপর ওর গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

~ তাহলে বল কে দিয়েছিল তোকে টাকা আমাদের কে মারার জন্য? কে সেই ব্যক্তি তার সব কিছু বল আমাকে?
ওর কথা শুনে লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করল,

হানিমুনের জন্য আর দেরি না করে সন্ধ্যার ফ্লাইটে করে আমাকে নিয়ে রাজ বেরিয়ে পরলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। আমাদের এবার আসল কালপিট কে ধরতে হবে। যে আমাদের পিছনে এমন ভাবে লেগে আছে আমাদেরকে মারার জন্য। এখানে আসার সময় গাড়িতে করে আসার কারণ ছিল আমাকে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখাতে দেখাতে নিয়ে আসা। কিন্তু যাওয়ার সময় যাওয়ার প্ল্যান ছিল ফ্লাইটে। আমরা ফ্লাইটে ওঠার আগে রাজুকে নিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে রাজ। আর ওকে যতটা সম্ভব শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে এসেছে।

আর এখানে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার ট্রাই করেছে রাজ। যেন আসল কালপ্রিট কোনভাবেই পালাতে না পারে। তাই আমরা দ্রুত বাসায় যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছি। তবে বাড়িতে কাউকে ফোন করে কিছু বলা হয়নি, যে আমরা বাড়িতে ফিরছি। ফ্লাইটে থাকাকালীন পুরোটা সময় আমি খেয়াল করেছি রাজ কতটা রেগে আছে। রাগে যেন হাত-পা থরথর করে কাঁপছে ওর। যেন পারলে এখনি আসল কালপ্রিট কে ধরে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে ও। যদিও আমি জানিনা এখনও আসল কালপিটটা কে। তবে যতটুকু বুঝতে পেরেছি রাজ অলরেডি জেনে গিয়েছে কে সেই ব্যক্তি যে আমাদের পিছনে এভাবে লেগে আছে আমাদের মারার জন্য।

অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আমরা এসে পৌছালাম ঢাকা এয়ারপোর্টে। ফ্লাইট থেকে নেমেই রাজ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আমার হাত ধরে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল সামনের দিকে। তারপর একটা ট্যাক্সিতে উঠে আমাকে নিয়ে রওনা হল বাসার উদ্দেশ্যে। ওকে কোনো কিছু প্রশ্ন করব সে সাহস টুকু আমার নেই। এতটা রাগী অবস্থায় ওকে কখনো দেখিনি। এ রাগটা নিশ্চয়ই আমার কারণেই হয়েছে ওর। আমাকে হারানোর ভয়ে হয়তো এতটা রেগে আছে। কারন কাল যদি বিড়ালটার জায়গায় আমি থাকতাম তাহলে তো আজকে বিড়ালটার করুণ পরিণতি আমার সাথে হতো। এটা হয়তো রাজ কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। যতই হোক আমি তো ওর ভালোবাসার মানুষ। যাকে ও নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসে।

গাড়ি থেকে নেমে বাসার মধ্যে ঢুকে আমার হাত ধরে নিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে লাগল বাসার ভিতরে। বাসার কলিং বেল চাপতেই আরিশা এসে দরজা খুলে দিল। আর রাজের চোখের দিকে তাকিয়ে যেন আঁতকে উঠল সে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করল,

~ ক কি কি ব্যাপার আরিয়ান তোমরা এখন কিভাবে? তোমরা না হানিমুনে গিয়েছিলে তাহলে এখন কিভাবে এলে?

ওর কথার কোন উত্তর না দিয়ে রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। ওর এমন আচরণে আরিশার সাথে আমিও বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। বুঝতে পারছিনা রাজ ঠিক কি করতে চাইছে। আরিশা আবারও দু’কদম এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

~ কি ব্যাপার আরিয়ান কিছু তো একটা বলো? তোমরা হঠাৎ এভাবে চলে এলে কেন? কি হয়েছে বলোতো? আচ্ছা রাহি তুমি আমাকে বল কি হয়েছে? তোমরা হঠাৎ এভাবে চলে এলে কেন? আর ও এত রেগেই বা আছে কেন? কেন কিছু বলছে না বলতো?

ওর কথার উত্তরে আমি কিছু বলার আগেই রাজ চিৎকার করে বলতে লাগল,
~ ফারিয়া ঐ ফারিয়া কোথায় তুই? আর তোর নাটক চলবে না যদি নিজের ভাল চাস তাহলে বাইরে আয়! না হলে তুই ভাবতেও পারবি না তোকে আমি কিভাবে মারবো।

রাজের কথা শুনে আমি এবং আরিশা দুজনেই বেশ অবাক হয়ে গেলাম। ফারিয়া বলে তো এ বাড়িতে কেউ থাকে না! তাহলে এভাবে কাকে ডাকছে ও? তখনই হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম আমাদের পিছনের সোফার আড়াল দিয়ে কাজের মেয়ে রহিমা লুকিয়ে লুকিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ডেকে বললাম,

~ কি ব্যাপার রহিমা তুমি এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে কোথায় যাচ্ছ?

আমার কথাটা শেষ হবার সাথে সাথে রহিমা উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে দৌড় লাগালো। আমি কোন কিছুই বুঝতে পারলাম না হঠাৎ কেন এমন করলো ও? আর তখনি খেয়াল করলাম রাজও ওর পিছু পিছু দৌড়ে যাচ্ছে। আর দৌড়ে গিয়ে এক লাফে ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে ফেলে দিলো মাটিতে। রহিমা পড়ে গিয়ে পিছাতে পিছাতে একদম শুদ্ধ ভাষায় বলতে লাগলো,

~ দেখ আরিয়ান নিজেদের ভালো চাস তো আমাকে ছেড়ে দে। আমি তাহলে তোদের কোন ক্ষতি করব না। প্লিজ আমাকে কিছু করিসনা। আমি বুঝতে পেরেছি তুই সবকিছু জেনে গেছিস। আমাকে ছেড়ে দে, দেখ আমি তো তোর বোন হই তাই না। আমাকে ছেড়ে দে প্লিজ আমি আর কখনো তোদের ক্ষতি করার চেষ্টা করব না!

ওর কথা শুনে কোন উত্তর না দিয়ে দাঁত দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে আবারও ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে দাড় করিয়ে রাজ বলল,

~তুই কিভাবে ভাবলি তোকে আমি বোন বলে মেনে নেব? পৃথিবীতে আমার কোনো ভাই বোন নেই। তোর এত বড় সাহস তুই আমাকে আর আমার স্ত্রীকে মারার চেষ্টা করেছিস? তুই ভাবলি কি করে তোকে আমি ক্ষমা করে দেবো। ছেড়ে দেবো? আজকে আমার হাতে তোর মৃত্যু আছে ফারিয়া।

কথাগুলো বলেই সজোরে একটি থাপ্পর বসিয়ে দিলো রাজ ওর গালে। আমি আর আরিশা পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বোকার মত তাকিয়ে ওদের কথা শুনছি আর সিন দেখছি। বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে এসব? আর রাজ কেনইবা ওকে রহিমা না বলে ফারিহা বলে ডাকছে? আর ওই বা কেন রাজের নাম ধরে তুইতোকারি করে কথা বলছে? কি হচ্ছে কি এসব?

~ দেখ ভাই আমি তোদের জীবন থেকে চলে যাব। আর কখনোই তাদের জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াবো না। তোদের ক্ষতি করার চেষ্টা করব না। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে আমাকে যেতে দে।

কথাগুলো বলে আকুতি-মিনতি করতে লাগল রহিমা রাজের কাছে। কিন্তু সে যেন থেমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে একের পর এক গালের উপর চড় বসাতে লাগলো রহিমার। আমি যে গিয়ে ওকে আটকাবো, সে ক্ষমতা আমার নেই। এদিকে কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছি না। তখনই আমাদের মাঝে এসে হাজির হলো গাড়িতে করে বেশ কয়েকজন পুলিশ। তারা গাড়ি থেকে নেমে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর তাদের মাঝ থেকে দুজন মহিলা কনস্টেবল রহিমাকে ধরে হাতে হ্যান্ডকাপ পড়ালো। পুলিশের মধ্যে থেকে অফিসার রাজের কাছে এগিয়ে এসে বললো,

~ মিস্টার আরিয়ান আমরা চিটাগাং এর পুলিশের থেকে সবকিছু জানতে পেরেছি। তাই আপনাকে আর নতুন করে কিছু বলতে হবে না। আর আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করবো ওকে ওর প্রাপ্য শাস্তি দেওয়ার জন্য। আপনি টেনশন করবেন না।
কথাটা বলে রাজের সাথে হ্যান্ডশেক করে রহিমাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেল তারা। আমি আর আরিশা এখনো চুপ করে আগের মতোই দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু দেখছি। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ চলে যেতেই রাজ আমার দিকে একবার তাকিয়ে সোজা বাসার ভেতর ঢুকে গেল। তারপর সোফার ওপর গিয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে পরলো।

আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। তারপর ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর হাত ধরে মৃদু গলায় বললাম,

~ কি হয়েছে রাজ আপনি এভাবে এখানে এসে বসলেন কেন? আর রহিমা কেই বা পুলিশ ধরে নিয়ে গেল কেনো? আপনি ওকে রহিমা না ডেকে ফারিহা বলেই বা কেন ডাকছিলেন? আমি তো কোন কিছুই বুঝতে পারছি না! প্লিজ আমাকে সব কিছু খুলে বলুন?

আমার কথার উত্তরে ও আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। তারপরে কোন কথা না বলেই আমাকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। আরিশা পাশেই দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের সিন দেখছে। বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে ছোট বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগল রাজ।

তাকে এভাবে কাঁদতে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। বুঝতে পারছি না ওনাকে কি বলে সান্তনা দেওয়া উচিত। বা এখন আমার কি করা উচিত। তাই ওনার বুকের মাঝে চুপ করে রইলাম। কোন কথা বললাম না। উনি বেশ কিছুক্ষন এভাবে কান্না করার পর আমাকে ছেড়ে দিয়ে চোখের জল মুছে কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে নিলো। তারপর মৃদু গলায় বলতে লাগল,

~ তুমি জানো রাহি ওই রহিমা রূপি ছদ্দবেশী মেয়েটি আসলে কে ছিল?
উনার কথায় আমি কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নাড়িয়ে ইশারায় বললাম, “না আমি জানি না”। তখনই রাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল,

~ ওই মেয়েটি আর কেউ নয় আমার গর্ভধারিনী মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া অন্য পক্ষের মেয়ে ছিল। যে কিনা এতদিন ধরে ষড়যন্ত্র আটছিল তোমাকে আর আমাকে মেরে ফেলে, আমার এই সব সম্পত্তির মালিক হওয়ার। আর এই কারনেই অনেকবারই মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে আমাকে। এর আগে যখন একদিন আমি অজ্ঞান অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিলাম তখন ওই আমাকে মারার প্লান করেছিল। কিন্তু তখন আমাকে মারতে সফল হয়নি কারণ তুমি আমায় বাঁচিয়েছিলে। তারপরে ও অনেক ট্রাই করেছে আমাদেরকে মারার জন্য। কিন্তু কখনো সফল হতে পারেনি। তাই আমাদের বাসায় কাজের মেয়ে সেজে এসেছে সে। আমাদের ব্যপারে সবকিছু জেনে প্ল্যান করে আমাদের মারার চেষ্টা করেছে। আমরা যেটা ধরতেও পারে নি।

এতটুকু বলে থামল রাজ। ওকে থামতে দেখে আরিশা এবার এগিয়ে এসে আমাদের পাশের সোফায় বসে বলে উঠলো,

~ তাই যদি হবে তাহলে তো ও অনেক ভাবেই তোমাদেরকে মারতে পারত! খাবারে বিষ মিশিয়েও তো মেরে ফেলতে পারতো। কারণ তখন তো আর তোমাদের বাঁচানোর মত কেউ থাকতো না। তাহলে এতদিন কেন মারে নি ও তোমাদের?

ওর কথায় আবার একটি ছোট করে নিশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল রাজ,
~ কারণ আমরা যদি বিষ খেয়ে বা কোন রকম অস্বাভাবিক ভাবে আমাদের মৃত্যু হতো, তাহলে সম্পত্তি ও পেত না। পুরো সম্পত্তিটাই চলে যেত সরকারের হাতে। এমন সিস্টেম করেই আমার নামে আব্বু সম্পত্তির দলিল করেছিলেন। কারন সে জানতেন এই সম্পত্তির কারনে আমার বিপদ হতে পারে। আর কক্সবাজারে রাহি কারেন্টে আটকে মারা গেলে ওর শোকে আমিও হয়তো ধুকে ধুকে মরতাম। তখন ওর রাস্তা টাও ক্লিয়ার হয়ে যেতো। তাই ও এমন একটি প্লান করেছিলো। আর ওর আসল নাম আসলে ফারিয়া। রহিমা নয়।

এতটুকু বলে থেমে গেলো রাজ। ওকে থামতে দেখে আরিশা বললো,
~ যা হওয়ার হয়ে গেছে আরিয়ান এখন নিজেকে শান্ত করো। পুলিশ তো ওদের ধরে ফেলেছে এখন যা শাস্তি পাওয়ার ওরা সেখানে পাবে। প্লিজ তুমি এতটা ভেঙে পড়ো না। নিজেকে শান্ত করো।
ওর কথা শুনে রাজ কাঁদোকাঁদো গলায় বলে উঠলো,

~ আমি কিভাবে নিজেকে শান্ত করব বলতে পারো আরিশা? আজ আমার জন্য আমার রাহির এত বড় বিপদে পরে ছিলো। একবার ভাবতে পারো ওই বিড়ালটার জায়গায় যদি আজকে আমার রাহি থাকতো তাহলে আমি কিভাবে বেঁচে থাকতাম? আমি জীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না। আমার জন্য যদি আমার রাহির কোন কিছু হয়ে যেত?

কথাটা বলেই আবারও কান্না করতে লাগল রাজা ওকে এভাবে কান্না করতে দেখে আমি মুচকি হেসে ওর ঘাড়ের উপর নিজের মাথাটা রেখে আদুরে গলায় বললাম,

~আমার তো হয়নি তাই না? এই দেখুন আমি আপনার কাছেই আছি একদম সুস্থ ভাবে। প্লিজ আপনি শান্ত হন রাজ। আপনার চোখে পানি মানায় না।


পর্ব ৫০ (অন্তিম পর্ব)

নতুন দুজন কাজের লোক রেখেছেন রাজ। যারা বাসার সবকিছু দেখা শোনা করেন। আর রান্নার জন্যে মধ্যম বয়সের একজন মহিলা আর একজন লোককে রেখেছেন। তারাই বাসার যাবতীয় কাজ কর্মগুলো করেন। এবার আর কাজে রাখার আগে ভুল করেনি রাজ। সব কিছু ভালো করে জেনে শুনে তারপর তাদের সিলেক্ট করেছেন কাজের জন্যে। ওদিকে ফারিয়া সহ ওর সাথে জরিত থাকা সবাইকে জেলে পাঠানো হয়েছে। আর তাদের কঠিন শাস্তিরও ব্যাবস্থা করা হয়েছে। ফারিয়ার সাথে জরিত ছিলো রাজের মা সহ তার বর্তমান স্বামী মানে ফারিয়ার বাবা। আরো অনেকেই। যাদের একে একে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করিয়েছে রাজ।

ইদানিং বিজনেসের কাজ বেড়ে যাওয়ায় রাজকে বেশিরভাগ সময় অফিসে থাকতে হয়। আর আমি বাসায় সারাক্ষণ আরিশার সাথে সময় কাটাই। মেয়েটা বড্ড মিশুক এবং ভালো। সত্যিই ওর মতো একজন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি জানি ও রাজকে ভালোবাসে তবুও একটু অভিযোগ নেই ওর আমার প্রতি বা কোন হিংসা।

সবসময় নিজের ছোট বোনের মত খেয়াল রাখে আমার। সারা দিন ওর সাথে ভীষণ ভালো সময় কেটে যায় আমার। একটুও যেনো একাকীত্ব অনুভব হয় না ওর সাথে সময় কাটিয়ে। তবে ইদানিং আরিশা সারাদিনের মাঝে বেশিরভাগ সময়ই ফোনে কার সাথে যেন কথা বলে। ওর হাব ভাব দেখে যতটা বুঝতে পারি নিশ্চয় ওর পছন্দের কারো সাথে হয়তো কথা বলে। হয়তো কারো প্রেমে পড়েছে। কিন্তু কখনো ডাইরেক্ট জিজ্ঞেস করিনি আমি। ভেবে রেখেছি যখন ও নিজে থেকে বলবে তখনই না হয় জানবো। আমিও চাই ও একটি সুন্দর জীবন সঙ্গী পাক এবং অনেক সুখি ও হাসি খুশি থাকুক।

দুপুরে ডাইনিং টেবিলে বসে আমি আর আরিশা একসাথে লাঞ্চ করছি। কাজের চাপ থাকার কারণে আজকে রাজ আসতে পারেনি। বলেছে অফিসেই লাঞ্চ করে নেবে। যদিও প্রথমে আমার মন একটু খারাপ হয়েছিল! কিন্তু পরে আরিশা অনেক দুষ্টামি করায় এখন মনটা অনেক ভালো। তাই দুজন মিলে একসাথে বসে হাসাহাসি করছি আর লাঞ্চ করছি। সত্যি সময় গুলো অনেক ভাল ভাবে কেটে যাচ্ছে আমার। আরিশার সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ নাকে মুরগির মাংসের গন্ধ আসতেই যেন পেট উল্টে বমি আসতে লাগলো আমার। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দূরে গিয়ে নাক চেপে ধরে বললাম,
~ ছিঃ ছিঃ এটা কি এনেছ টেবিলের উপর? এমন গন্ধ কেন, আমার বমি চলে আসছে?

আমার কথা শুনে আরিশা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারপর চেয়ার ছেড়ে আমার পাশে উঠে এসে বলল,
~ কি হয়েছে রাহি? তুমি হঠাৎ এভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসলে কেন? আর কিসের গন্ধ পাচ্ছো তুমি?

~ দেখনা আরিশা টেবিলের উপর মুরগির মাংস টা কেমন বিশ্রী একটা গন্ধ বেরোচ্ছে! আমার নাড়িভুঁড়ি উল্টে যেন বমি আসতে চাইছে।

কথাটা বলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে উটকি করতে লাগলাম আমি। আমাকে এমন করতে দেখে আরিশা আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়ে দিল। তারপর আমার ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

~ কি হয়েছে আমাকে ঠিক করে বলতো রাহি? তোমার কি ইদানিং শরীর খারাপ যাচ্ছে? বেশ কিছুদিন হলো লক্ষ্য করছি তুমি খুব কম কথা বলছো! আগের মত তেমন চনচলা নেই তুমি! কি হয়েছে আমাকে সব কিছু খুলে বলো তো?

~ জানিনা আরিশা আমার ঠিক কী হয়েছে! তবে কিছুদিন হল সত্যিই আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না! সব সময় কেমন একটা বমি বমি লাগে। আর বেশ কিছু খাবারের গন্ধ নাকে লাগতেই শুধু উটকি আসে বমি করতে ইচ্ছে করে। সাথে মাঝে মাঝে মাথাও ঘুরায়। কালকে তো মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিয়েছিলাম। কিন্তু ঐ মুহূর্তে রাজ আমায় ধরে ছিল বলে পড়ে যাইনি। ও অবশ্য বারবার জিজ্ঞেস করছিল কি হয়েছে! কিন্তু আমি কথা কাটিয়ে গেছি। বুঝতে পারছি না কি হয়েছে। হয়তো শরীরটা খুব দুর্বল আমার তাই এমন হচ্ছে?

আমার কথাগুলো চুপ করে বসে থেকে মনোযোগ দিয়ে শুনল আরিশা। তারপর কিছু একটা ভেবে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কাকে যেন ফোন করল। একটু পর ফোনটা রিসিভ হতেই বলে উঠলো,
~ হ্যালো আরিয়ান! তুমি কি এখন একটু বাসায় আসতে পারবে?
~…….
~ না তেমন কিছু না, আসলে রাহিকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল!

কথাটা বলতেই ওপাশ থেকে ফোন কেটে দিল রাজ। বুঝলাম না কি হলো আরিশা হঠাৎ কেন ওকে ফোন করতে গেল।
~ তুমি হঠাৎ রাজকে ফোন কোরলে কেনো আরিশা? আমি তো এমনি ঠিকই আছি এখন দেখো! বেশ ভালো লাগছে আমার এখন। তেমন কিছুই হয় নি শুধু শুধু ওকে ফোন করে টেনশন দেওয়ার কি দরকার ছিল বল?

~ দরকার আছে রাহি, দরকার আছে মানে খুব বেশি দরকার আছে। আমি যেটা সন্দেহ করছি যদি সেটা হয়ে থাকে তাহলে তো অনেক বেশি দরকার আছে। এখন তুমি চুপ করে এখানে লক্ষী মেয়ের মত বসে থাকো আমি তোমার জন্য জুস বানিয়ে আনছি কেমন?

কথাটি বলেই আরিসা আমার পাশ থেকে উঠে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। আমিও লক্ষী মেয়ের মত সেখানেই বসে রইলাম আর ভাবতে লাগলাম কি হল হঠাৎ আলিশার? বেশ কিছুক্ষণের মাঝেই হুরমুর করে বাসার মধ্যে প্রবেশ করল রাজ। আমাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে ছুটে এলো আমার কাছে। তারপর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে একবার আমার গালে একবার হাতে একবার মুখে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে করতে বলল,

~ কি হয়েছে তোমার জান? কি হয়েছে তোমার? তোমার কি শরীর খুব খারাপ লাগছে? কি হয়েছে তোমার তুমি অসুস্থ হলে কি করে? চোখ-মুখ এমন কালচে লাগছে কেন? তুমি এত শুকিয়ে গেলে কি করে একদিনের মধ্যে? হঠাৎ কি হয়েছে তোমার? আরিশা ফোন করে কেন বলল তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে? তুমি জানো আমি একটুর জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। শুধু ইচ্ছে করছিল যেন উড়ে চলে আসতে পারি তোমার কাছে। জান কি তোমার হয়েছে বলো আমায়?

রাজকে এমন পাগলামো করতে দেখে আমি ওর প্রশ্নের কী উত্তর দেবো কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ওর পাগলামি মাখা কথাগুলো শুনছি। এমন করছে যেন ওর কলিজাতে কেউ হাত দিয়েছে। এ লোকটা সত্যিই একটা পাগল শুধুমাত্র আমার জন্যে। আমি ওর প্রশ্নের কোন উত্তর দেওয়ার আগেই পিছন থেকে আরিশা জুস নিয়ে আসতে আসতে বলল,
~ তোমার বউয়ের কিছুই হয়নি আরিয়ান। তবে ওকে একটু ডাক্তারের কাছে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এমনি শুধু শরীর দুর্বলতা তো তাই!

আরিশার কথা শুনে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রাজ আমাকে কোলে তুলে নিল। তারপর সোজা হাঁটা দিল বাইরের দিকে। ওর এমন কান্ডে আরিশা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর পাগলের মত হাসতে শুরু করল। আর আমি লজ্জায় মরে যেতে লাগলাম। সত্যিই এই লোকটা আসলেই একটি পাগল।

আমরা এখন বসে আছি ডাক্তারের চেম্বারে। কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার ফেরদৌস আরা, আমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। এখন সেটার রিপোর্ট দেখা বাকি। রাজের দিকে তাকিয়ে বেশ ভালই বুঝতে পারছি ও অনেক টেনশনে আছে। কিছুক্ষণের মাঝেই ডাক্তার ফেরদৌস একটি রিপোর্ট হাতে এসে চেম্বারে বসলেন। তারপর রাজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
~ আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?

রাজ ওনার গম্ভীর গলার কথা শুনে বেশ ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
~ এই তো হবে দেড় বছরের বেশি! কেনো কি হয়েছে আমার রাহির?

~ আপনাকে আমি কথাটা কিভাবে বলবো ঠিক বুঝতে পারছিনা মিস্টার আরিয়ান। আপনি আসলে কথাটা কিভাবে নিবেন আর সহ্য করতে পারবেন কিনা সেই টেনসনে আছি আমি।
ডাক্তার ফেরদৌসের এমন কথা শুনে যেন আরো বেশি ঘাবড়ে গেল রাজ। ওর সাথে সাথে এবার আমিও বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম নিশ্চয়ই আমার বড় কোন রোগ হয়েছে। তা না হলে ডাক্তার এভাবে বলবেন কেন? আমি মন খারাপ করে চুপ করে বসে রইলাম। তবে আমার মন খারাপটা নিজের জন্য নয়! আমি চিন্তা করছি রাজের জন্য। আমার কিছু হয়ে গেলে ও পাগল হয়ে যাবে এটা আমি নিশ্চিত। ওর দিকে তাকিয়ে দেখি ও দরদর করে ঘামছে। আর মুখ একদম ছোট হয়ে গেছে ওর। হয়তো অনেক বেশি টেনশনে আছে। রাজ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
~ ক কি হয়েছে আমার রাহির? আপনি প্লিজ বলেন ডাক্তার ফেরদৌস। ওর কিছু হবেনা তো?

ওকে এমন ভয় পেতে দেখে এবার ডাক্তার ফেরদৌস মুচকি হেসে দিয়ে বলে উঠল,

~ আপনি বাবা হতে চলেছেন মিস্টার আরিয়ান চৌধুরী। আর আপনার স্ত্রী মা হতে চলেছে। সে তেরো সাপ্তাহর প্রেগন্যান্ট।

ওনার কথায় মুহূর্তেই রাজ একদম নিরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ওর মুখে কোন কথা নেই। হা করে তাকিয়ে রইল ডাক্তার ফেরদৌসের দিকে। যেন শক লেগেছে ওর। আর এদিকে আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে চুপ করে রইলাম। আরিশাও অনেক খুশি। আমার পাশে বসে মুচকি মুচকি হাসছে সে। যদিও রিপোর্টের ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতো আরিশা। কারন আমরা যে ডাক্তারের কাছে এসেছি সে সম্পর্কে আরিশার খালা হন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর রাজ খুশিতে কান্না করে ফেলল। ওর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুই ফোঁটা জল। ওকে কান্না করতে দেখে এবার আরিশা হাসি থামিয়ে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

~কি হলো আরিয়ান তুমি এভাবে কান্না করছ কেন? তোমার বেবি হবে জেনে তুমি খুশি হও নি?
ওর কথা শুনে আচমকাই ওকে জড়িয়ে ধরলো রাজ। তারপর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কান্না করতে করতে বলে উঠলো,
~ বিশ্বাস করো আমি এতটা খুশি যে, খুশিতে চোখে জল চলে এসেছে আমার। আজকে আমি এতটাই খুশি মনে হচ্ছে সারা পৃথিবীতে মিষ্টি বিতরণ করে সবাইকে বলি আমি বাবা হবো। আমার রাহি আমার সন্তানের মা হবে।

কথাগুলো বলে আরিশাকে ছেড়ে দিয়ে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো রাজ। তারপর আমার পাশে এসে হাটু গেড়ে বসে আমার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,
~ তুমি আজকে আমাকে যা দিয়েছো রাহি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার এটা। তুমি জানো না আমি কতটা খুশি কতটা আনন্দিত। আমাদের বেবি হবে, আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া যে তিনি আমাদের সংসারটা পরিপুর্ন করে দিলেন। খুশিতে পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছা করছে আমার।

কেটে গেছে তিনটি বছর,

এই তিন বছরে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। আরিশার বিয়ে হয়ে গেছে ওর পছন্দ করা একটি ছেলের সাথে। বিয়ের পর ওকে নিয়ে সে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ওর মত সেই ছেলেটিও একজন ডাক্তার। আরিশা বিদেশে গিয়ে ডাক্তারি পড়াশোনা করছে। ওরা খুব সুখে আছে। তবে বিয়ের আগে আমি যতদিন অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম আরিশা আমার পাশে থেকে বড় বোনের মত আমাকে দেখাশোনা করেছে। সব দিকে খেয়াল রেখেছে। কোন দিকে কোন কমতি রাখেনি সে। সত্যি আমি অনেক ভাগ্যবতী যে ওর মত একজন বন্ধু পেয়েছি। যে আমাকে নিজের ছোট বোনের মত করে দেখাশোনা করেছে ভালো বেসেছে ভালো রেখেছে। আর রাজের কথা তো বলার কোন প্রশ্নই আসে না।

ও তো অফিসের সব কাজ সবকিছু বাদ দিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থেকেছে আমার কাছে। আমার কখন কি লাগবে কখন কি লাগবেনা সব কিছু খেয়াল রেখেছে সে। সবসময় খাইয়ে খাইয়ে আমাকে মোটা বানিয়ে ফেলেছে। এই তিন বছরে বেবি হওয়ার পর আমি সত্যিই একটু মোটা হয়ে গিয়েছে। রাজের ভাষ্য মতে মোটা হওয়ার পর আমাকে নাকি তার আরো বেশি কিউট লাগে। আমাদের ঘর আলো করে একটি ছেলে হয়েছে। রাজ ওর নাম রেখেছে আরাফ। আরাফের এখন আড়াই বছর বয়স। ওকে দেখতে একদম আরিয়ানের মতো হয়েছে। যেমন গুলুমুলু তেমনই কিউট। আমার সংসারটা আজ সুখ শান্তিতে পরিপুর্ন।

রাকিব ভাইয়া আর রাই এর কোলজুড়েও এসেছে একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান। তাকে দেখতে যেমন মিষ্টি তার কথা ও তেমনি মিষ্টি। রাকিব ভাইয়ের মেয়ের বয়স 3 বছর। ও এত মিষ্টি বলে আমি ওর নাম রেখেছি মিষ্টি পাখি। ওকে সবাই মিষ্টি বলেই ডাকে। ওদের সংসারটাও এখন সুখে-শান্তিতে পরিপূর্ণ। আমরা সবাই অনেক সুখে আছি আলহামদুলিল্লাহ।

সবাই দোয়া করবেন আমাদের জন্য, আমরা সবাই যেন এভাবেই চিরকাল সুখে শান্তিতে থাকতে পারি। আমাদের মাঝে যেনো আর কোনো বাঁধা বিপদ না আসে। আল্লাহ হাফেজ।

লেখা – এম সোনালী

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “তুমি আমার প্রোপারটি – আই লাভ ইউ জান”গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ুন – তুমি আমার প্রোপারটি – আই লাভ ইউ (সিজন ০১)

তুমি আমার প্রোপারটি – আই লাভ ইউ সোনা (সিজন ০২)