উপহার – বিয়ের প্রথম রাত এ স্ত্রীর চাওয়া-পাওয়া

উপহার – বিয়ের প্রথম রাত এ স্ত্রীর চাওয়া-পাওয়া: বাসর রাতে নাকি স্ত্রীকে উপহার দিতে হয়। তুমি তো আমাকে কিছুই দিলে না! তুমি কি জানোনা! জানলে…


মূলগল্প

“তা বাসর রাতে স্বামীর থেকে কি উপহার পেলে শুনি?”

বিয়ের পরদিন সকালে বড় জা এর কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে উত্তর দেয়ার মতো কিছু খুজে পেলাম না আমি। সত্যি বলতে বাসর রাতে সোহেল মানে আমার স্বামী তো আমাকে কোনো বিশেষ উপহার দেয়নি। সেটা কি করে জা কে বলি? আর উপহার দেয়া কি কোনো নিয়ম? আমি তো জানি না। হয়তো উনিও জানেন না নয়তো ভুলে গিয়েছেন। সেটা জা কে না বলে বললাম,

  • “উনি আমাকে উপহার হিসেবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”

একথা শুনে আমার জা হাসলো। গতরাতে আমার স্বামী কোনো উপহার না দিলেও সারাজীবন একসাথে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন৷ আর এটাই আমার কাছে সেরা উপহার।

  • “শোনো দোলা, প্রতিশ্রুতি সবাই দেয়। তোমার ভাসুর ও আমাকে দিয়েছেন আর প্রতিশ্রুতি কিভাবে উপহার হয় হুম? চলো আমার সাথে একটা জিনিস দেখাচ্ছি।”

এ কথা বলেই ভাবী মানে আমার বড় জা আমাকে উনার রুমে নিয়ে গেলেন। আলমারি খুলে দেখাতে শুরু করলেন ভাইয়া উনাকে কি কি দিয়েছে। দুই ভরি ওজনের গলার চেন যার লকেটটা ডায়মণ্ডের। একটা রিং সেটাও ডায়মণ্ডের। আর নাকি হাজার পঞ্চাশের মতো টাকা। বিয়ের পরও আরও কি কি যেন দিয়েছেন। ভাবি হেসে হেসে এগুলো বলছিলেন আর সাথে এটাও বললেন,

  • “দোলা বুঝেছো, সবটাই হচ্ছে মনের ব্যাপার। কে কাকে দিবে না দিবে সবই তার মেন্টালিটির উপর নির্ভর করে তবে নিজের ইনকাম এর দিকটাও দেখতে হবে। চাইলেই তো আর যা মন চায় তা দেয়া যায় না”বলেই ভাবী আবার আলমারিতে উনার চেইন আর রিং এর বক্সটা রেখে দিলেন।

বিয়ের পরদিনই ডিরেক্ট খোঁচা! আরও কত না জানি অপদস্থ হতে হয় আমাকে। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সেটা মূহুর্তেই মুছে ফেললাম ভাবী দেখার আগেই।
রুমে এসে দেখলাম সোহেল বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোন এ ঘাটাঘাটি করছেন। আমাকে দেখেই বললেন,
“ম্যাডামের তাহলে এখন রুমে আসার সময় হলো!”

“আপনি নিজেও তো বাহিরে ছিলেন। রুমে একা একা ছিলাম তাই ভাবী আর ননদেরা নিয়ে গিয়েছিলো উনাদের সাথেই গল্প করছিলাম।”

  • “বুঝলাম! আমি এসেছি অনেকক্ষন হয়েছে তার থেকেও বড় কথা তুমি আমাকে কাল কিছু একটা প্রমিজ করেছিলে মনে আছে সেটা?”

এই লোকটা আমার থেকে বয়সে অন্তত পাঁচ ছয় বছরের বড় হবে। গতরাতে আমাকে প্রমিজ করিয়েছেন আজকে থেকে উনার সাথে তুমি করে কথা বলতেই হবে। আপনি আপনি করা চলবে না। আমি তো লজ্জা এবং অস্বস্তি দুটোর কারনেই পারবো না।

  • “চেষ্টা তো করছি মনে থাকে না এই আরকি!”
  • “মনে যে কি থাকে।”

উনি বিছানা ছেড়ে উঠে এসে আমাকে ড্রেসিং টেবিলের কাছে নিয়ে গেলেন। আমার চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল মুছে দিয়ে বললেন,

  • “নারীর চোখে লেপ্টে যাওয়া কাজল দেখলে মনে হয় সে নারী সাত জন্মের দুঃখিনী।”

আমি অন্য দিকে তাকিয়ে বললাম,

  • “বাসর রাতে নাকি স্ত্রীকে উপহার দিতে হয়। তুমি তো আমাকে কিছুই দিলে না!”

সোহেল খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়লো। তারপর মুচকি হেসে বলল,

  • “তাই নাকি? উপহার দিতে হয়? আমি তো জানি না। কেউ আমাকে বলেও নি। কিন্তু না জেনেও আমি উপহার দিয়েছি।”

আমি বললাম,

  • “কই?”
    সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
  • “এই তো ভালোবাসা দিয়েছিলাম।”

আমি আলতো করে হাসলাম আর লজ্জাও পেলাম৷ তবু মনের ভিতরে একটু হলেও অপমানের ঘা টা খুব জ্বলছিলো।

বিয়ের কয় মাস পরই আমার অনার্স থার্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু আমার শশুড়বাড়ি থেকে বলা হলো বিয়ের পর আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। বিয়ে হয়েছে সংসার করতে। আমি কিছুতেই মানতে পারলাম না। মাত্র একটা বছরই তো। পরীক্ষা গুলো অন্তত দেই! কিন্তু শশুড় শাশুড়ি নারাজ। সেই সময় আমার পাশে দাড়ালো সোহেল। বাবা মাকে সে বুঝালো তাও তারা মানতে চাইলেন না। আমি জানি না কেন। আমার বাবা প্রভাবশালী ছিলো না এইকারনে নাকি অন্যকিছু সত্যি জানতাম না আমি। সোহেল আমাকে পড়াশোনা চালাতে সাপোর্ট করলো। আমি একবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

  • “বাবা মাকে লুকিয়ে তুমি আমাকে সাপোর্ট করছো এটা তো অন্যায়।”
    সে বললো,
  • “তোমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়াও অন্যায়। আমাদের কার কি হয়ে যায় তা কিন্তু আমরা জানি না। ধরো আমার কিছু হয়ে গেলো। তখন তুমি নিশ্চয়ই তোমার বাবার পরিবারে বোঝা হতে চাইবে না। তুমি চাইবে একটা চাকরি। সেই চাকরির জন্য তোমাকে গ্রাজুয়েশন করতে হবে। আবার আমাদের সন্তান বড় হলেও তারা যেন কখনো হেয় না হতে পারে যে তাদের মা গ্রাজুয়েট না। আরও অনেক ব্যাপার আছে যার জন্য মেয়েদের পড়াশোনা করা উচিত।”

আমি যা পড়াশোনা করতাম সন্ধ্যার পর দরজা বন্ধ করে যাতে কেউ না বুঝে। পরীক্ষার সময় সোহেল আমাকে বাবার বাসায় রেখে এসেছিলো। সেখান থেকেই ফোর্থ ইয়ারের পরীক্ষাও দেই। শশুড়বাড়ি ফেরার পর শাশুড়ি আর জা কোনো ভাবে জানতে পারলেন আমার পড়াশোনার কথা। আমাকে তো তারা কথা শুনালেনই সোহেলকেও কথা শুনাতে ছাড়লেন না। তাকে বললেন, বউ এর চামচা! ওই রাতেই সোহেল রংপুর চলে যায়। (সে চাকরি করতো রংপুর)

অবশ্য ধীরে ধীরে আমার শাশুড়ি আমাকেও বড় জায়ের মতো স্নেহ করতে লাগলেন। সেই দিনগুলো যে কতটা সুখকর ছিলো!
তবে সেই সুখ ছিলো ক্ষনস্থায়ী। বিয়ের দুই বছর পরও আমাদের বাচ্চা হলো না। বিভিন্ন ডাক্তার দেখাতাম। টেস্ট করে ফলাফল একটাই আসতো আমার গর্ভধারণ করার ক্ষমতা নেই। আমি মানতে পারতাম না এটা। শতশত ডাক্তার দেখাতামই শুধু যে এই তথ্যটা ভুল হবে। আমিও মাতৃত্বের স্বাদ পাবো। কিন্তু নাহ! ব্যর্থই আমি।

শশুড়বাড়ি এমনকি আমার নিজের বাসার কাউকেই এই খবরটা জানাতে দেয়নি সোহেল। অনেকে অনেক কথা বলতো, বিয়ে হয়ে বছর গেলো বাচ্চার নাম নেই কেন? বাচ্চা হচ্ছে না বুঝি? আরও কত কি! শাশুড়ি মা তখন বলতেন আল্লাহ চাইলেই হবে। দুই বছর পেরিয়ে তিনবছরে পা দিলো তখন শাশুড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাইতে বললেন। কোনো না কোনো সমস্যা আছে সেটা আমার বাবার বাড়ি এবং শশুড়বাড়ি দুইখানেই বুঝতে বাকি নেই।

আমি নিজেও ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। এইসময় সোহেল আমাকে এসে রংপুর নিয়ে গেলো। বাসায় জানালো তার মেসের খাবার দাবারে সমস্যা হচ্ছে। রংপুর যাওয়ার পর বুঝলাম সোহেল হন্য হয়ে একটা নবজাতক বাচ্চা খুজছে এডপ্ট করার আশায়। বিভিন্ন এতিমখানায় ও খুঁজতো। কিন্তু এতিমখানায় একদম নবজাতক পাওয়া দুষ্কর তাও যদি এক দেড় বছরের বেবি পাওয়া যেতো তবু কর্তৃপক্ষ দিতে চাইত না কারণ আমরা লোকাল না আর অনেকেই বাচ্চা এডপ্ট করে বাসায় কাজ করানোর জন্য। কত ধরনের মানুষ দুনিয়ায়!

আমার রংপুর যাওয়ার পাঁচ ছয় মাস পর একটা বাচ্চার সন্ধান পাওয়া যায় সোহেলের এক কলিগের মাধ্যমে। কিন্তু বাচ্চাটা ছিলো পতিতালয়ের এক মেয়ের। কার না কার বাচ্চা! তাও কোনো কিছু না ভেবেই সোহেল মোটা অংকের বিনিময়ে বাচ্চাটাকে গ্রহণ করে। নিষ্পাপ বাচ্চার তো কোন দোষ নেই! ফুটফুটে একটা মেয়ে বাচ্চা। গায়ের রঙ চাপা! সাতদিনের বাচ্চার চোখ কত মায়াবী! জেগে থাকলেই এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে শুধু! রাজ্যের কৌতুহল যেন তার চোখে। আমার আনন্দের শেষ নেই। মেয়ের নাম রাখলাম সুরভী।

সোহেল বাসায় জানালো বেবির কথা। বললো, বাচ্চাটা আমারই। প্রেগন্যান্সি নিয়েই আমি রংপুর এসেছিলাম। বাসার সবাই হতভম্ব। কানাঘুষো শুনতে হতো অনেক। এরমাঝে আমার ভাসুর আর জা সম্পত্তি বাট বাটোয়ারা করে আলাদা হয়ে গেলো। আমি আবার চলে গেলাম শশুড়বাড়ি কারণ ওই মূহুর্তে শশুড় শাশুরির সাথে সোহেলই ছিলো। মেয়ে নিয়ে শশুরবাড়িতে দিব্যি দিন কাটাতাম। অবশ্য কানাঘুষো অনেক শুনতাম তবু পাত্তা দিতাম না।

সুরভির তখন তেরোমাস চলে। ঈদের সিজন। সোহেল জানালো সে বাসায় আসছে। রংপুর থেকে সিলেট পুরো একদিন চলে যায়। আমি একটু পরে পরে ওর খোজ নেই কোথায় আছে। লাস্ট যখন ওর সাথে কথা হয় তখন ও বলেছিলো নরসিংদী পার হয়েছে। আমি ঘন্টা দুয়েক পর ফোন দিলাম। ফোন বন্ধ। অজানা একটা ভয় কাজ করছিলো কেন জানি তাও নিজেকে শক্ত রাখলাম হয়তো ফোনে চার্জ নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা পেরোলো তার ফোন বন্ধই। আমি শশুর শাশুড়িকে জানালাম। সারারাত আমরা তিনজন মানুষ জেগে রইলাম।

বাবা অনেক জায়গায় খোঁজ নিলেন কোথাও কোনো খবর নেই। ভোরবেলা একজন ফোন করে জানালো ঢাকা- সিলেট রোডে একটা বাস এক্সিডেন্ট হয়। একথা শুনেই আমার জান যায় যায় অবস্থা। সৃষ্টিকর্তার কাছে চাইছিলাম যেন আমার মনে আসা সব ধারণা মিথ্যে হয়। মানুষটা যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু নাহ!

আমি পুরো আড়াই মাস কোমায় ছিলাম। আমার শাশুড়ি আমার মেয়েকে তখন আগলে রাখলেন। এরমাঝে আমার শশুর মারা গেলেন। পুরো পরিবারটাই যেন শেষ হয়ে গেলো। আমার ভাসুর আবার এই পরিবারে ফিরে এলেন। হয়তো সেটা অপরাধবোধ থেকে!

মেয়েকে নিয়ে এক গভীর শূন্যতায় দিন কাটতে লাগলো। কেটে গেলো মাস, বছরের পর বছর।

পরিশিষ্টঃ আমার মেয়ে সুরভী বাংলাদেশ- মালয়েশিয়া আয়োজিত “বেস্ট ডক্টর”সম্মাননা পেলো। আমার মেয়ে সেটা উৎসর্গ করলো আমাকে। আমি মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বললাম,

  • “তোমার এই সাফল্যের পেছনে ছিলো একমাত্র তোমার বাবা। তুমি তাকে উৎসর্গ করো মা।”

আমার মেয়ের চোখে অশ্রু দেখতে পেলাম আমি। কি করে আমি বলি তাকে, তোমার বাবাই আমার জীবনে সেরা উপহারটা ছিলো মা। আমার বাসররাতের উপহার সে। হীরে,স্বর্নের তৈরি উপহারগুলো যেমন ক্ষয় হয়ে যায় ঠিক তেমনি আমার উপহারটা পুরো ক্ষয় হয়ে গিয়েছে। সে আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছে!

লেখা – নীলাদ্রি নীরা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “উপহার – বিয়ের প্রথম রাত এ স্ত্রীর চাওয়া-পাওয়া” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – পাপের পরিণাম – নতুন ভয়ানক ভুতের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.