সাইকো থ্রিলার গল্প

জেরি ভার্সেস টম (শেষ খণ্ড) – রোমাঞ্চকর রহস্য গোয়েন্দা গল্প

জেরি ভার্সেস টম (শেষ খণ্ড) – রোমাঞ্চকর রহস্য গোয়েন্দা গল্প: মেহরিনের বুকের ভেতর কান্নার দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। এতটা খারাপ মানুষ কি করে হতে পারে? .একবার ওকে আলুর বস্তা বলছে, এখন আবার বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চাইছে! ইয়া আল্লাহ! তুমি সাক্ষী।


পর্ব ৬

রুমের ঢুকতেই মেহরিনের দিকে চোখ পড়লো মাহমুদের। কি নিষ্পাপ লাগছে! বেঘোরে ঘুমাচ্ছে সে! ওর মাথার কাছে বসে একদৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে আছে এনা। মাহমুদ পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ওকে দেখে এনা ঠোঁটে আঙ্গুলে রেখে ইশারায় কথা বলতে নিষেধ করলো। মনে মনে হাসলো মাহমুদ! চিন্তা দূর হলো মন থেকে।

এনা ওর হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেলো। তারপর উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “বাসা থেকে খালামনি ফোন দিচ্ছে বারবার করে, আজকে তুশমির জন্মদিন, আমাকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে বলেছে। ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়ে মার্কেটে যাবো, তুশমির বার্থডে গিফট কিনতে। কিন্তু বাসায় তো মেহরিন আপু একা। উনাকে এই অবস্থায় একা বাসায় রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি বরং উনার কাছে থাকো।
~ “তুমি কি একা যেতে পারবে?”

~ “ডোন্ট আন্ডাস্টিমেট মি, মি.মাহমুদ!”
মাহমুদ হেসে উঠে বলল,
~ “ঠিক আছে যাও। পৌঁছে আমাকে ফোন দিও।”
~ “ওকে বাই!”

মেহরিনের ঘুম ভাঙলো রাত নটায়। আড়মোড়া ভেঙে উঠতেই সামনের সোফাতে মাহমুদকে বসা দেখলো। সোফার ওপর পা তুলে ল্যাপটপে কাজ করছে সে। মেহরিন মাথার একপাশ চেপে ধরে খানিকক্ষণ বসে রইল। ঝিনঝিন করছে মাথা! প্রচন্ড দুর্বল লাগছে! সমস্ত শরীর মনে হয়ে যেন ব্যথা হয়ে আছে।
মাহমুদ ল্যাপটপ থেকে মুখ না উঠিয়েই বলল, “কিছু খাবে?”
~ “আমি তোমার বাসায়?”
~ “হ্যাঁ।”

মেহরিন নিজেকে দেখে অবাক হয়ে বলল, “আমার জামা? .আমার জামা কে চেইঞ্জ করলো?”
মাহমুদ ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে সরাসরি মেহরিনের মুখের দিকে তাকালো। বলল,
~ “বাসায় আমি ছাড়া আর কেউ আছে?”

আতংকিত হয়ে উঠলো মেহরিনের চেহারা। চেঁচিয়ে বলল,
~ “তুমি? তুমি আমার জামা চেইঞ্জ করেছো? কেন?”

~ “কেন আবার? বমি করে সারা গা ভাসিয়ে ফেলেছো তাই। আমাকেও ভাসিয়েছো! সহ্য যখন করতে পারো না খেতে গেলে গেলো ওইসব ছাইপাঁশ?”
~ “আমার ইচ্ছে হয়েছে খেয়েছি। দরকার হলে আবার খাবো! খাবো আর বমি করবো তোমার কি? তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন?”
~ “সাধ করে আনিনি। বস আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলো তোমাকে খুঁজে বের করতে!”
~ “আমার জামা কেন চেঞ্জ করলে?

“, রাগে লাল হয়ে গেলো মেহরিনের চেহারা!
~ “বললাম তো। বমি করে ভাসিয়ে ফেলেছিলে তাই! আমার কোন শখ নেই যে তোমার আলুর বস্তার মত শরীর ইচ্ছে করে দেখবো! চোর ছ্যাঁচড় দিয়ে পিছনে দৌড়ে পুরো বডিটাকে তো কিমা বানিয়ে ফেলেছো।”

মেহরিনের চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে গেলো। ও মাই গড! মাহমুদ এসব কি বলছে? অসভ্য, জানোয়ার!
ওকে আশ্চর্য হওয়ার সময়টুকুও দিলো না মাহমুদ। তার আগেই বলল, পেটের ওপর দেখলাম বেশ বড়সড় কাটা দাগ! ঐ জায়গায় কাটলো কি করে?”
রাগে ফেটে পড়লো মেহরিন! উত্তেজিত হয়ে বলল, “বদমাইশ, অসভ্য! জানোয়ার লজ্জা করলো না তোমার? আমার সেন্সলেস অবস্থার সুযোগ নিয়ে..”
ওকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে মাহমুদ বলল, “এত রেগে যাচ্ছো কেন তুমি? আজ নাহোক কাল আমারই তো দেখার কথা?”

~ “ছিঃ ইতরের মত আচরণ করছো তুমি, মাহমুদ। আশ্চর্য! .একটা মানুষ কি করে এত বদলে যেতে পারে?”

~ “আমি তো ইতরই। খুবই উন্নত প্রজাতির ইতর! যাইহোক তুমি যখন বদলেছো আমাকে তো বদলাতেই হতো? । তুমি তো আর আগের সেই মেহরিন নেই।”
~ “মানে?”
~ “মানে আগে তোমার জিরো ফিগার ছিলো এখন সেটা আলুর বস্তায় পরিণত হয়েছে। বাকি সব ঠিক আছে। একটুও বদলাও নি।”
~ “খবরদার আলুর বস্তা আলুর বস্তা করবে না তুমি! আমি না তোমার টাকায় খাই না তোমার বাপের টাকায় খাই?”

~ “আমার বাপের অতো ঠেকা পড়ে কি তোমার মত আলুরবস্তাকে খাওয়াবে। যাই হোক আই লাভ ইউ!”
স্তম্ভিত হয়ে গেলো মেহরিন। মাহমুদের মাথা কি ঠিক আছে? কি বলছে সে? মাহমুদ মিটমিট করে হাসছে। মেহরিন তেড়ে এসে বললো,
~ “কি বললে তুমি?”

~ “লেট মি ফিনিস! আমি বলতে চাইছিলাম আমি আমার আই লাভ ইউ ফেরত নিচ্ছি।”
~ “মানে কি?”
~ “মানে খুব সোজা। এতদিন যাবত আমি তোমাকে যতগুলো আই লাভ ইউ বলেছি সব ফেরত নিয়ে নিলাম। অতএব মিস আলুরবস্তা আপনি এবার দয়া করে একটু চুপ করুন।”

রাগে মেহরিনের সমস্ত শরীর কিড়মিড় করেছে, একে তো দোষ করেছে তারওপর ওকে বাজে কথা শোনাচ্ছে? .শয়তানটার অনুশোচনা পর্যন্ত নেই। অনুবিক্ষন যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেও কেউ বলতে পারবে না সে মোটা। অথচ এই বর্বর, বদ বলছে সে নাকি আলুর বস্তা! .আর একবার বলুক এক বক্সিং মেরে ওর থোবড়া উড়িয়ে দেবে মেহরিন।

রাগে গজগজ করতে করতে খাট থেকে নেমে দাঁড়ালো মেহরিন। মাহমুদ শান্ত গলায় বলল, “কিছু খাবে?”
~ “হ্যাঁ খাবো। বিষ আছে? থাকলে দাও! খেয়ে মরে যাই।”
~ “আমি ফেঁসে যাবো!” নির্বিকার জবাব মাহমুদের।

মেহরিনের বুকের ভেতর কান্নার দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। এতটা খারাপ মানুষ কি করে হতে পারে? .একবার ওকে আলুর বস্তা বলছে, এখন আবার বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চাইছে! ইয়া আল্লাহ! তুমি সাক্ষী। .ইরফান আহমেদের ওপরেও যথেষ্ট রাগ হচ্ছে ওর। দুনিয়ায় এত লোক থাকতে মাহমুদকেই পাঠাতে হলো ওকে খুঁজতে?

অসভ্যটা সুযোগমত মেহরিনকে একা পেয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। কেন যাবে সে? এত অপমানের পর আর কোন ভাবেই এই চাকরী করবে না মেহরিন। ইম্পসিবল!
~ “তোমাকে খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথেই বসের কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ ছিলো।”

~ “নিয়ে গেলে না কেন? আমাকে একা পেয়ে সুযোগ নেওয়ার জন্য? লজ্জা করলো না তোমার?”
~ “ডোন্ট বি ক্রেজি মেহরিন! ইউ নো দ্যাট আই হেভ আ বিউটিফুল গার্লফ্রেন্ড! সি ইজ কোয়াইট মোর বিউটিফুল দ্যান ইউ!
~ “তাহলে আনলে কেন আমাকে?”

~ “কারন তখন তোমাকে অফিসে নিয়ে যাওয়ার মত অবস্থা ছিলো না। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ছিলে, কোন হুঁশ ছিলো তখন..শার্টের বোতাম খোলা গেঞ্জি কোমরের ওপরে উঠানো! ছি! ছি! কি একটা অবস্থা। অফিসের সবাই তোমার শরীরের লাল, নীল, বেগুনি দাগগুলো দেখলে খুব ভাল হতো তাই না?
চুপ হয়ে গেলো মেহরিন। চোখের পানি চিকচিক করছে, মাহমুদ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি তোমার জামা চেইঞ্জ করিনি। এনা এসেছিলো বাসায়। সেই চেইঞ্জ করেছে। আমি মজা করেছি।”

মাহমুদের থমথমে কন্ঠস্বরটা এবার অন্যরকম একটা চাপা কষ্ট দিলো মেহরিনেকে। কেন যেন মনটা খারাপ হয়ে গেলো! মাহমুদ এভাবে কেন বললো? ওর কি একটুও অনুভূতি নেই মেহরিনের জন্য? চোখদুটো ভিজে এলো ওর। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।
মাহমুদ অধৈর্য গলায় বলল, “বললাম তো এনা চেইঞ্জ করেছে? কাঁদছো কেন? বিশ্বাস না হলে এনাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে নাও।”

মেহরিনের কান্নার গতি বেড়ে গেলো। ছুটে বেরিয়ে গেলো সে। আর একমুহূর্তও থাকবে না মাহমুদের সামনে। একমুহূর্তও না! এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে সে! ও গাড়িতে উঠতে গেলে মাহমুদ আটকালো। মেহিরিনের দুহাতে নিজের একহাতের মুঠোয় নিয়ে বন্দী আসামীদের মত মেহরিনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো মাহমুদ। সদর দরজা বন্ধ করে তার চাবি ট্রাওজারের পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। মেহরিন বিষন্ন মুখে বলল,
~ “আমি বাসায় যাবো মাহমুদ..আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।”

~ “তুমি এখন কোথাও যেতে পারবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমাকে বসের কাছে নিয়ে যেতে না পারি ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার জিম্মাদারিতে থাকবে! .ডু ইউ গেট দ্যাট?”

~ “আমি চাকরী ছেড়ে দিয়েছি! আমাকে যেতে যাও।”
~ “তুমি চাইলেই যখন তখন চাকরী ছাড়তে পারো না। কোন ভরসায় আমরা তোমাকে ছেড়ে দেবো? তুমি যে শত্রুদের কাছে আমাদের ইনফরমেশন লিক করবে না তার কি গ্যারান্টি?”

মেহরিন হাঁ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে! কি বলছে মাহমুদ? ও ইনফরমেশন লিক করবে? .হাউ কুড হি সে দ্যাট! মেহরিন মরে গেলেও এমন কোন কাজ করবে না সেটা কি মাহমুদ জানে না? তারপরও কি করে বললো কথাটা? ও মাহমুদের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি শুরু করে দিলো।
মাহমুদ ওর হাত ছেড়ে দিলো। ওকে ইশারায় রুমে যেতে বলে সে কিচেনের দিকে গেলো। একটা প্লেটে ভাত আর তরকারী নিয়ে রুমে ঢুকলো। ইশারায় মেহরিন কে খেতে বলল। মেহরিন সাফ গলায় জানিয়ে দিলো সে খাবে না।

মাহমুদ নির্দেশের সুরে বলল, “না খেলে গুলি করে দেবো একদম! জানোই তো আমার পিস্তল অলওয়েজ লোডেড থাকে!
~ “আমি খাবো না, বলেছি না।”

~ “তাহলে আর কি করার মাতাল অবস্থায় তোমার যেই ছবিগুলো তুলেছি সেগুলো লায়লা শারাফাতের কাছে পাঠিয়ে দেবো এক্ষুনি।
মেহরিন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। রেগে গিয়ে বলল, “তুমি আমার ছবিও তুলেছো?”

~ “তোমার কুকীর্তির প্রমাণ রাখাতে হবে না? যে কোন সময় তোমার ঘাড়ের ত্যাড়া রগটাকে সোজা করার জন্য কাজে লাগতে পারে।”
~ “মাহমুদ? তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছো?”
~ “বেশি উৎপাত করলে ব্ল্যাকমেইল, হোয়াইট মেইল রাইসমেল সব বাদ দিয়ে মেইল করে সোজা উপরে পাঠিয়ে দেবো।”

মেহরিন রেগে কিছু বলতে নিচ্ছিলো মাহমুদ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
~ “শোনো মেহরিন তোমার ধারনা তুমি খুব ভালো ঝগড়া করতে পারো। ভুল ধারণা! তুমি খুব বাজে ধরনের ঝগড়ুটে, ঝগড়া করার সময় তুমি তোতলাও যেটা ঝগড়ার কন্সেন্ট্রেশন নষ্ট করে দেয়। আর শোনো, লাফালাফি না করে শান্তভাবেও ঝগড়া করা যায়। উদাহরণ হিসেবে আমাকে ফলো করতে পারো! কারন আমি খুব ভালো ঝগড়া করতে জানি। ইনফেক্ট তোমার চাইতে বেশি জানি। আমি কেন চুপ করে থাকি জানো?”

মেহরিন বুঝতে পারছে না পাগল কি মাহমুদ না মেহরিন? গোলগোল চোখে চেয়ে বলল,
~ “কেন?”

~ “কারণ আমি জানি তুমি মাথামোটা।”
মেহরিন আবারও কিছু বলতে নিচ্ছিলো। মাহমুদ কড়া ধমক দিয়ে বলল,
~ “তুমি কি খাবে? নাকি আমি ছবিগুলো তোমার মায়ের কাছে পাঠাবো।”

মেহরিন আশ্চর্য কন্ঠে বলল, “তুমি আমাকে আসামীর মত ট্রিট করছো কেন? আমি কি আসামী?”
~ “এজেন্সি ছেড়ে চোরের মত যারা পালায় তারাও একধরনের আসামী। ইনফেক্ট তারা অনেক বড় আসামী। তাদের দ্বারা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সেই হিসেবে তুমিও আসামী।”

~ “ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন মি.মাহমুদ সিদ্দিকি, আমি চোরের মত পালিয়ে আসি নি। অফিসে গিয়ে রিজাইন দিয়ে তারপর এসেছি! সুতরাং আপনি কোন ভাবেই আমাকে আসামী বলতে পারেন না।”

~ “তোমাকে চাকরী থেকে রিজাইন দেওয়া হবে কি না সেটা এখন এজেন্সি ঠিক করবে। তুমি নও! তাছাড়া তোমার রেজিগনেশন লেটারটা তো বস গ্র‍্যান্টেড করেন নি? কে শুধু শুধু বোকার মত কাজগুলো করছো? অযথা সময় নষ্ট! তুমি জানো হায়ার লেভেলে তোমার কথা পৌঁছালে শুট এন্ড সাইট ওর্ডার হয়ে যেতে পারে? বস তোমাকে বাঁচানো চেষ্টা করছে। তুমি শুধু শুধু উনাকে ভুল ভাবছো।”
~ “আর তুমি? তুমি কি করছো?”

~ “আমি আমার ডিউটি পালন করছি।”
~ “আমাকে আসামীর মত বন্দী করে, কথায় কথায় গুলি করার হুমকি দিয়ে, তুমি ডিউটি পালন করছো? নাকি প্রতিশোধ নিচ্ছো? কিন্তু কিসের? নিজের গার্লফ্রেন্ডের কথা অন্তত ভাবো। সে যদি জানতে পারে তুমি আমাকে পুরো একরাত নিজের বাসায় বন্দী করে রেখেছিলে কি হবে বুঝতে পারছো?”

~ “ওকে নিতে তোমার ভাবতে হবে। যার নিজের বুদ্ধি হাটুর নিচে সে এসেছে আমাকে জ্ঞান দিতে।”
মেহরিন বসা থেকে দাঁড়াতেই মাহমুদও উঠে দাঁড়ালো। আসামীদের সাথে যেমন পুলিশি পাহারা থাকে মাহমুদের ভাবভঙ্গিও তেমন। যেন ছাড় দিলেই মেহরিন পালিয়ে যাবে।

মেহরিন রাগে মুখ বাকিয়ে বলল,
~ “ওয়াশরুমে যাবো! সেখানেও যাবে?”

~ ” ঠিক আছে যাও!”
~ “না চলো! আমার সাথে যাবে।”

~ ঠিক আছে চলো!”
মেহরিম চোখগুরম করে তাকাতেই মাহমুদ হেসে ফেললো। নরম গলায় বলল, “যাও!”
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে চুপচাপ খাবার নিয়ে বসলো। সেই সকাল থেকেই না খেয়ে আছে। খিদেয় নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাচ্ছিলো!
~ “কিছু লাগলে রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসতে পারো।”

খাওয়া শেষে মেহরিন আপাদমস্তক কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। সাথে সাথেই ঘুম!
সকালে যখন ঘুম ভাঙলো মাথার কাছে টেবিলের ওপর একটা চিঠি দেখলো। মাহমুদ রেখে গেছে। ও চিঠিটা খুললো।

“মাথামোটা, বদরাগী মেহরিন,
তোমার বালিশে নিচে বাসার চাবি আছে। তালা বন্ধ করে অফিসে চলে এসো। আর হ্যাঁ টেবিলে নাশতা রাখা আছে। এনা নিয়ে এসেছিলো, তোমার সাথে একসাথে ব্রেকফাস্ট করবে বলেই এসেছিলো তুমি ঘুমে ছিলে তাই আমিই ডিস্টার্ব করতে বারণ করলাম! তুমি ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে নিও। আর হ্যাঁ আই ডোন্ট লাভ ইউ, বাট আই ডেফিনেটলি লাভ ইউ!
বাই, অফিসে দেখা হচ্ছে।”

ইতি
মাহমুদ।

মেহরিন চিঠি নিয়ে দুম মেরে বসে রইলো কতক্ষন। কি হচ্ছে তার সাথে? মাহমুদ কেন ওকে আবার দুর্বল করে দিতে চাইছে?
পৌনে একঘণ্টা লাগলো মেহরিনের অফিসে পৌঁছাতে। অর্থাৎ এগারোটা পঁয়ত্রিশ এ অফিসে পৌঁছেছে সে। মাঝখানে আধাঘণ্টার মত জ্যামে বসে ছিলো। আশ্চর্যজনক ভাবে এত দেরী দেখেও অফিসের কেউ ওকে ফোন দেয় নি।

অফিসে ঢুকতেই রাতুলের সাথে দেখা। মেহরিনের হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিলো, ওর বিয়ের কার্ড। নেক্সট উইকেন্ডে! মেহরিন তাকিয়ে দেখলো লাজুক লাজুক ভাব রাতুলের চেহারায়। মেহরিনের মনটা ভালো হয়ে গেলো রাতুলকে দেখে! কেউ দেখলে ভাবতেই পারবে না এই সহজ, সাধারণ শান্ত চেহারার ছেলেটাই বাঘা বাঘা ক্রিমিনাল পেছনে জীবন বাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়ে, দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য। ওর চোখ দুটো আনন্দে, ঝাপ্সা হয়ে এলো।

রাতুলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ইরফান আহমেদের রুমে ঢুকলো সে। মাহমুদ, সোহাগ, এনা শিলা সবাই বসে আছে। কোন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছে ভেবে মেহরিন বেরিয়ে যেতে নিলো। আজকাল আর নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় ওর। কিন্তু ইরফান আহমেদ ডাক দিয়ে থামালেন।
~ “চলে যাচ্ছো কেন মেহরিন? ভেতরে এসো।”

মেহরিন ভেতরে ঢুকতেই এনা উঠে চেয়ার ছেড়ে দিলো। মেহরিম বারণ করে বলল, “ওঠার দরকার নেই। তুমি বসো! আমি বসের পাশে দাঁড়াচ্ছি!”
ইরফান আহমেদ বাধা দিয়ে ওকে বসতে বললেন। তারপর ওকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “নেক্সট মান্থে মাহমুদের আন্ডারে আমাদের চারসদস্যের একটা টিম পাঠাচ্ছি জাম্বিয়াতে। তুমি, সোহাগ, আর এনা যাবে মাহমুদের সাথে।”
মেহরিন অবিশ্বাসের সুরে বলল, “আমি?”
~ “হ্যাঁ তুমি।”

~ “কিন্তু স্যার..”
~ “লেট মি ফিনিশ মেহরিন!
মেহরিন চুপ হয়ে গেলো। ইরফান সাহেব বললেন, ” তোমাদের চারজনকে যেহেতু সিলেক্ট করা হচ্ছে সুতরাং তোমার যাচ্ছো। এনি অবজেকশন?”

সবাই মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। কারো কোন অবজেকশন নেই। ইরফান সাহবের মুখের ওপর না বলার সাহস চারজনের একজনেরও নেই।
ইরফান আহমেদ বললেন, “গুড! অবজেকশন যেহেতু নেই তার মানে যেতেও কোন আপত্তি নেই! এম আই রাইট?
চারজনই একসঙ্গে বলল, “ইয়েস স্যার।”

~ “ওকে। এবার আসল কাজের কথা বলি, আমরা খবর পেয়েছি বাংলাদেশি একটা মাফিয়া গ্যাং জাম্বিয়ার একটা দুর্গম এলাকায় ঘাঁটি গেড়েছে। তাদেরকে ধরার জন্য তোমাদের পাঠানো হচ্ছে। সেখান কার স্থানীয় পুলিশ তোমাদেরকে সাহায্য করবে। ঐ মাফিয়া দলের ডিটেইলস আজকে সন্ধ্যা নাগাদ আমার হাতে এসে যাবে, আমি তোমাদের প্রত্যেককে মেইল করে পাঠিয়ে দেবো।

ইরফান আহমেদ একটা ফাইল খুলে তাতে মনযোগ দিলেন এর অর্থ হচ্ছে,! আমার কথা শেষ হয়েছে..তোমরা এবার আসতে পারো।”
ওরা চারজন নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো।


পর্ব ৭

ইরফান আহমেদের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এনা মেহরিনের পিছু নিলো। সেদিনের পার্টির ঘটনার পর থেকে এনার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে সে।
~ “আপু একটু দাঁড়ান।”

~ “কি ব্যাপার মিস এনা? আপনার কি আমার সাথে কোন প্রয়োজন আছে?”
এনা নতমুখে বলল,
~ “আছে।”

~ “কোন ব্যাপারে?”
~ “সরি আপু।”
~ “ফর হোয়াট?”

~ “সেদিনের খারাপ ব্যবহার এর জন্য!”
মেহরিন চুপ করে রইলো। এদের হলো টা কি? কালরাতে মাহমুদও কেমন রহস্যজনকভাবে কথা বললো। আজকে এনা ক্ষমা চাইছে?
~ “মাহমুদ কি তোমাকে কোনভাবে ফোর্স করেছে আমার কাছে ক্ষমা চাইবার জন্য?”

এনা চমকে উঠার ভান করে বলল,
~ “কেন? ও কেন ফোর্স করবেন? আমি ভুল করেছি তাই আমি নিজেই ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

মেহরিন নিশ্চিন্ত হলো। যাক মাহমুদ তাহলে এনাকে ওদের দুজনের ব্যাপারে কিছু বলে নি। এনা হঠাৎ ওর হাতদুটো চেপে ধরে কাঁদোকাঁদো কন্ঠে বলল,
~ “আমি সত্যিই অনুতপ্ত আপু। আমার ভুল হয়ে গেছে।”

বলতে বলতেই কেঁদে দিলো মেয়েটা। মেহরিন হতবাক হয়ে চেয়ে আছে। আশ্চর্য মেয়ে! ওর হাতে হাত রেখে মেহরিন মোলায়েম কন্ঠে বলল,
~ “সেদিন আমারও ওভাবে রিয়েক্ট করা উচিৎ হয় নি। অনেক কথা বলে ফেলেছি তোমাকে। যাই হোক দুজনেই যখন ভুল করেছি তখন এসব মনে রেখে লাভ নেই। ভুলে যাও!”

হাসি ফুটে উঠলো এনার মুখে। মেহরিনের ভালো লাগছে। এনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
~ “তুমি সবসময় হাসবে। তোমার হাসি খুব সুন্দর!”
~ “আপনার রাগের মত?”

~ “রাগ কখনো সুন্দর হয় না।”
~ “হয়! যারা ভালোবাসে তাদের কাছে হয়!”
~ “তাই বুঝি?”

~ “ইয়েস!”
~ “ভালো কথা। আপনার পেটে ব্যথা কমেছে?”
মেহরিন চমকে উঠে বলল,
~ “আমার তো পেটে ব্যথা নেই?”

~ “কমে গেছে তাহলে। আসলে গতকাল আপনার জামা চেইঞ্জ করতে গিয়ে দেখলাম পেটের ওপর ছিলে গেছে। মাহমুদের কাছ থেকে ওয়েনমেন্ট নিয়ে লাগিয়ে দিয়েছি। এখন তাহলে ব্যথা নেই! যাক আমি তো ভয়ে ছিলাম। ইনফেকশন হয়ে গেলে তো সমস্যা!”
~ “নাহ! নেই মানে আমি টেরই পায় নি।”

~ “মাহমুদ ঠিকই বলে। আপনি নিজের প্রতি একদম যত্ন নেন না।”
মেহরিন দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টালো। বলল,
~ “ঠিক আছে আমি আসি।”

মেহরিন চলে গেলে এনা মাহমুদের কাছে ছুটলো। মেহরিনের সাথে কি কথা হয়েছে সব মাহমুদকে জানাতে হবে! মিটমিট করে হাসছে সে। মেহরিনকে কি চিন্তায় না ফেলে দিলো! মেহরিন এখন সারা রাস্তা ভাববে, এনা কি ওকে আর মাহমুদকে কে নিয়ে কিছু সন্দেহ করেছে? বেশ মজা লাগছে এনার।

অফিস থেকে ফিরে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে মেহরিন। শাওয়ার নিতে গিয়ে দেখলো আসলেই পেটের কাটা জায়গাটা চলছে।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে টাওয়েলটা বিছানার ওপর ফেলে ডাইনিং রুমে এলো সে। প্রচন্ড ক্ষিদে পেয়েছে, ইদানীং দুপুরে সে ভালো করে খেতে পারে না।
ভাত বেড়ে টেবিলে চেয়ার টেনে বসলো। ভাতের লোকমা মুখের কাছে ধরতেই কেউ একজন বলে উঠল, “সন্ধ্যেবেলা ভাত নিয়ে বসেছো? তাই তো বলি দিন দিন এত মোটা হচ্ছো কি করে?”

মেহরিন লোকমা টা নামিয়ে রেখে দিলো। বলল,
~ “তুমি? আমার বস্তিতে?”

মাহমুদ জবাব দিলো না। ওর সামনে চেয়ার টেনে বসলো। লোকমাটা নিজের মুখে ঢুকিয়ে আয়েশ করে ভাত চিবুচ্ছে সে। মেহরিন হতবম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে।
~ “হাঁ করে তাকিয়ে আছো কেন? ক্ষিদে পেয়েছে খেয়েছি, ভাত ই তো এমন ভাব করছো যেন তোমার কোটি টাকা খেয়ে ফেলেছি! অফিস শেষে বাসায় গিয়ে দেখলাম তালা দেওয়া। পকেটে হাত রাখতেই মনে পড়লো চাবি তো সকালে তোমাকে দিয়ে গেছিলাম। তারপর টানা দেড়ঘন্টা জার্নি করে বসে তোমার বস্তিমহলে এসে পৌঁছেছি। বাই দ্যা ওয়ে তুমি ভালো করে হাত ধুয়েছো তো?”

মেহরিন রাগলো না। মাহমুদের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ ক্লান্ত সে। মায়া হলো মেহরিনের। ওর জন্যই বেচারা জার্নি করে এতদূর এসেছে! চাবি দেওয়ার কথা একদমই মনে ছিলো না ওর। ইশস! মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে নিশ্চই খুব খিদে পেয়েছে?

ভাত মাখিয়ে মাহমুদের মুখের সামনে ধরলো সে। মাহমুদ কোন সংকোচ করলো না। নির্দ্বিধায় খেয়ে নিলো।
ওকে খাওয়ানোর সময় হাঁত কাঁপছিলো মেহরিনের। মাহমুদ সেটা লক্ষ্য করে বলল, “মেহরিন তুমি এমন কাঁপছো কেন?”
মেহরিন মিথ্যে বলল, “শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছি তো ফ্যানের বাতাসে ঠান্ডা লাগছে।”

~ “তুমি শাওয়ার নিয়েছো ভালো কথা। সেটা আমাকে জানানোর কি দরকার? জানিয়েছো আরো ভাল কথা আমি বুঝতে পেরেছি তোমার হাত পরিষ্কার আছে কিন্তু মাথা মোছোনি কেন? চুল থেকে এখনো পানি পড়ছে।”

মেহরিন চোখ রাঙ্গালো। মাহমুদ হাসছে। ওর মুখের সামনে আরেক লোকমা ভাত দিতেই বলল, “আর খাবো না। এত জঘন্য তরকারি কে রান্না করেছে? ঝালে আমার মুখ পুড়ে যাচ্ছে।”
~ “আজকে রান্না করার সময় পাই নি। আসার সময় রেস্টুরেন্ট থেকে নিয়ে এসেছি।”

মাহমুদ উঠে বেসিনের সামনে মুখ ধুয়ে নিলো। তারপর ওর কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “চাবি দাও!”
মেহরিন ব্যাগ থেকে চাবি বের করে দিতেই চলে গেলো। ঝড়ের মত এসেছে ঝড়ের মত চলে গেছে।
মেহরিন কিছু বলতে পারলো না। সৌজন্য বোধ দেখানোর জন্য হলেও ওর কিছু বলা উচিৎ ছিলো। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ওর মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোলো না।

রাতুলের বিয়েতে এসেছে সবাই। ওর বউ কলেজের টিচার। নাম ফারজানা। অল্পবয়স্কা সুন্দরী! গায়ের রঙ খুব বেশি ফর্সা না হলেও চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব আছে। বেশ মিশুক এবং হাসিখুশি মেয়ে। সবার ওকে পছন্দ হয়েছে। এখানে আসার পর জানা গেলো লাভ ম্যারেজ দুজনের। খবরটা শোনার পর অফিসের সবাই রীতিমত আকাশ থেকে পড়ছে! রাতুলের মত চুপচাপ শান্ত ছেলে শেষে প্রেম করে বিয়ে করবে এটা যেন তাদের কল্পনার বাইরে।

সোহাগ ঠাট্টা করে বলল, “রাতুল যে এত বড় ছুপারুস্তম সেটা তো আমাদের জানা ছিলো না। এতদিন ধরে আমাদের সাথে আছে অথচ আমরা কেউ টেরই পেলাম না। ভেতরে ভেতরে কত রোমান্টিক সে? আর আমাদের অবস্থা দেখো জুনিয়র প্রেম করে বিয়ে করে ফেলছে আমরা মেয়েই পটাতে পারলাম না।”

ফারজানা হেসে বলল, “আর যাই বলুন সোহাগ ভাই ওকে রোমান্টিক বলবেন না। প্রথমে যদি জানতাম রাতুল এত বেরসিক তাহলে ধারে কাছেও ঘেঁষতাম না। আমার কলিগরা সবাই ওকে নিয়ে ঠাট্টা করে। একটু আগে আমার এক কাজিন এসে কানে কানে কি বলল জানে? বলল, “কনে কি তুই? না তোর বর? তুই লাজ শরম বাদ দিয়ে ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস আর তোর বর নতুন বউয়ের মত লজ্জায় কাঁচুমাচু করছে। খবর নিয়ে দেখেছিস, সত্যি সত্যি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরী করে নাকি তোকে ব্লাফ দিচ্ছে। এই ছেলেকে দেখে তো মনে হয় না গোয়েন্দা!” কি কপাল আমার ভাবুন?

এবার থেকে ভাবছি ওর আইডি কার্ডের একটা কপি আমার কাছেও রাখবো। বর কি করে জিজ্ঞেস করলে আইডি কার্ডটা দেখিয়ে দেবো। ভালো হবে না?”
হাসতে হাসতে বেহাল দশা ফারজানার। রাতুল এখনো লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় ওর নাকের ডগা মেয়েদের মত লাল হয়ে গেছে।

ফারজানা হাসি থামিয়ে বলল, “এইবার আপনারাই বলুন আমার যদি লজ্জা না থাকে আমি কি করবো? লজ্জা পাওয়ার ভান করবো?”
ফারজানা একটু থেমে আবার বলল, “সেদিন কি হয়েছিলো জানেন? . আমি ওকে ফোন দিয়ে বললাম তোমার অফিসের সামনে আমি ওয়েট করছি! তুমি নিচে নামো। সে লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে বলল..ইয়ে মানে আমি তো আজকে অফিসে আসি নি।

আমার তখন একটু কাজ থাকায় আমি কিছুক্ষন অফিসের নিচে দাঁড়ালাম। কাজটা শেষ করে যাওয়ার সময় দেখলাম, অফিস থেকে চোরের মত লুকিয়ে লুকিয়ে বেরোচ্ছে আপনাদের রাতুল সাহেব।

আমি গিয়ে ফট করে সামনে দাঁড়াতেই লজ্জায় শেষ! টানা তিনঘন্টা তাকে নিয়ে মার্কেটে ঘুরেছিলাম। তিনি পকেটের টাকা সব খরচ করে ফেলেছেন ঠিকই কিন্তু তিনটা বাক্য আমার সাথে খরচ করেছেন কি না বলতে পারবেন না। আমি ইচ্ছে করেই এটা ওটা কিনছিলাম র ভাবছিলাম এইবার হয় কিছু বলবে, এইবার তো বলবেই। কিন্তু সে পকেট ফাঁকা হওয়া অব্দি চুপ করে ছিলো। শেষে শুধু বলল, “তুমি আগে বললে আমি কার্ড নিয়ে আসতাম।

সংগে করে তো বেশি টাকা আনি নি!”
রাতুল ঘামছে, এই মেয়ে ওর মান সম্মান সব শেষ করে দিচ্ছে। কি দরকার ছিলো আগবাড়িয়ে এত কথা বলার? সেদিন অফিস থেকে ওর নানী অসুস্থ বলে বেরিয়েছিলো, এখন সবাই কি ভাববে ওকে? ইসশ! কি লজ্জা! কি লজ্জা! ওর এতদিনের ইমেজ একদিনেই শেষ!

এনা ফোড়ন কেটে বলল, “রাতুল ভাই তোমার নানীর অসুখের আসল কারন তাহলে ফারজানা?”
সবাই একসাথে হেসে উঠলো এনার কথা শুনে। ফারজানা কিছু বুঝলো না। বোকা দৃষ্টিতে এনার দিকে তাকাকেই এনা রাতুলের মিথ্যে বলার ঘটনাটা খুলে বলল।
ফারজানা জিভ কেটে বলল, “ইশস! বরের সিক্রেট ফাঁস করে দিলাম? ভেরি ব্যাড! .ভেরি ব্যাড!”

সবাই আবারও হেসে ফেললো ওর কান্ড দেখে। রাতুলও হাসলো!
রাতুলের বিয়ে খেয়ে ফিরতে না ফিরতেই ইরফান সাহেব ওদেরকে মিশনে পাঠিয়ে দিলেন।

বর্তমানে জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকাতে অবস্থান করছে ওরা। সেখান থেকেই ওদেরকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মাফিক সব ব্যবস্থা নিয়ে শত্রুদের এলাকায় তাবু গেড়েছে ওরা। জাম্বিয়ার স্থানীয় পুলিশ সহ মোট সত্তর জনের একটা টীম নিয়ে এসেছে এলাকাটিতে। শত্রুদের ঘাঁটি স্থানীয় বাজার ঘেঁষে। পাশে ছোট্ট একটা স্কুল!

“ভালো জায়গা বেছে নিয়েছে ওরা!” বিড়বিড় করে কথাটা বলল মাহমুদ। আক্রোমণ করে না পেরে উঠলে স্কুল কিংবা বাজারটাকে জিম্মি করে ফেলতে পারবে ওরা। সুতরাং ওদেরকে এমনভাবে এগোতে হবে যাতে শত্রুরা টের না পায়। জাম্বিয়ার আদিবাসীদের সাথে মিশে গেছে ও। উদ্দেশ্য শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা। ওর পোশাকের সাথে লাগানো সিক্রেট ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করছে বাকিরা।

মাহমুদ ওদের এলাকায় ঢুকে পড়েছে গোপন রাস্তা দিয়ে, উদ্দেশ্য ওদের লিডারকে বন্দী করা।
ঘাঁটি কাছাকাছি কয়েকজন পাহারা দিচ্ছে। হাতে বন্দুক! মাহমুদের প্ল্যান কোনভাবে এদের একজনজে কাঁবু করতে পারলে তার পোশাক দিয়ে মিশে যেতে পারবে বাকিদের সাথে।

~ “ওকে একা একা যেতে দেওয়াটা আমাদের একদমই উচিৎ হয় নি, চলো বেরিয়ে পড়ি?” অধৈর্য গলায় বলল এনা।
সোহাগের ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে এই নেকুরানীকে বুঝ দিতে দিতে। বিরক্তি চেপে বলল,
~ “আমাদেরকে বলা হয়েছে উনি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোন ঝুঁকি না নিতে।”

~ “তাই বলে আমরা এখানে বসে থাকবো?” প্রতিবাদ করলো এনা।
রাতুল ওকে শান্ত করার জন্য বলল, “আরেকটু ধৈর্য ধরুন স্যার নিশ্চই আমাদেরকে কোন সিগনাল পাঠাবেন?”
এনা সোহাগের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভেতরে ঢুকে গেলো। সোহাগ তার আগামাথা কিছুই বুঝলো না।

এদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত ভাবে বসে আছে মেহরিন। গালে হাত রেখে সবার কথা শুনছে! যতক্ষণ পর্যন্ত নির্দেশ না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত পুতুলের মত বসে থাকতে হবে ওদেরকে। মেহরিনও প্রথম প্রথম আতংকে অস্থির হয়ে যেত, কোনভাবেই শান্ত থাকতে পারতো না, এই নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে বসের কাছে থেকে ওকে। ওকে নিয়ে নাকি বিভিন্ন দেশের এজেন্টরা কমপ্লেইন করে, মেহরিন নাকি কমান্ড মেনে চলে না। ইত্যাদি! ইত্যাদি! .এই মিশনে সে কোন গন্ডোগল পাকাবে না, নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞা করে এসেছে সে। যথাসম্ভব শান্ত ভাবে বসলসে থাকার চেষ্টা করলো। যতক্ষণ না নির্দেশ পাচ্ছে ততক্ষন আগ বাড়িয়ে কোন স্টেপ নেবে না সে।

গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। মাহমুদের উপস্থিতি কোনভাবে টের পেয়ে গেছে শত্রুরা। মাহমুদ একটু আগে টিমের সবাইকে এলাকাটা ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলো, কিন্তু এখন শত্রুরা পজিশন নিয়ে ফেলেছে।

~ “কি করবো স্যার? ওরা এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ছে।” , ওয়াটকির মাধ্যমে মাহমুদের নির্দেশের অপেক্ষায় জানালো সোহাগ।
~ “তোমরা আর এগিয়ো না, কুইক সবাই ব্যাক করো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব! ওরা মিসাইল হামলা করতে পারে!” আর্তনাদ করে উঠলো মাহমুদ।
~ “কিন্তু স্যার আপনি..?”
~ “আমি বেরিয়ে আসবো।”

~ “আপনাকে একা ফেলে..”
~ “ডোন্ট আরগ্যু সোহাগ, দিস ইজ এন ওর্ডার!”
ইতিমধ্যে কানেকশন ব্রেক হয়ে গেছে। ওয়াটকিটা সম্ভবত খারাপ হয়ে গেছে। ক্যামেরাটা কাজ করছে কি না কেন জানে?

সোহাগ বাকিদের উদ্দেশ্য করে অসহায় গলায় বলল, “স্যার ওর্ডার করেছেন। আমদেরকে পিছু সরতে বলা হয়েছে। শত্রুরা মিসাইল এট্যাক করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অলরেডি রেড এলার্ম দিয়ে ওদের সব সৈন্যরা পজিশন নিয়ে ফেলেছে।”

চেঁচিয়ে উঠলো এনা। তুমুল ঝগড়া শুরু হলো সোহাগের সাথে। এনা ধমকে উঠে বলল,
~ “অসম্ভব আমরা মাহমুদকে একা ফেলে চলে যেতে পারি না।”

সোহাগ তার মস্তিষ্ককে বহু কষ্টে পোষ মানিয়ে শান্ত করল। ঠান্ডা গলায় বলল,
~ “দেখুন মিস এনা, এইমুহূর্তে এত অল্প জনবল দিয়ে আমরা ওদের সাথে লড়তে পারবো না। প্লিজ ট্রাই টু আন্ডাস্ট্যান্ড দ্যা সিচুয়েশন! দিস ইজ নট প্রপার টাইম টু গেট ইমোশনাল!”

আরো কিছুক্ষন ঝগড়া করে এনা ক্ষ্যান্ত হলো। সোহাগ রীতিমত হাঁপিয়ে গেছে। অসম্ভব বেয়াদপ এই মেয়ে। মাহমুদ কি করে একে সহ্য করে? এর চেয়ে মেহরিন ঢেঁর ভালো। বিগত ত্রিশ মিনিটে তাকে দিয়ে তিনহাজার কথা বলিয়েছে এই ম্যানারলেস মেয়েটা।

~ “ওহ! শিট!”
কপালে আঙ্গুল চেপে দেওয়ালে লাথি মারলো মাহমুদ।
ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। হাতপাঁ অনবরত কাঁপছে, মেহরিন ভেতরে ঢুকে পড়ছে! মাথামোটা, ঘাড়ত্যাড়া মেয়েটার বোকামির জন্য ফাঁসবে দুজনে। সোহাগকে এতবার করে বলে দেওয়ার পরও মেহরিন ভেতরে ঢুকলো কি করে?

শত্রুরা ওদেরকে লিডারকে বের করে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছিলো, মাহমুদ পজিশনও নিয়ে ফেলেছিলো বেরোতে গেলেই শুট করে দেবে, কিন্তু মেহরিনের জন্য সব ভেস্তে গেলো। মেহরিন এমন অসাবধান ভাবে এগিয়ে আসছিলো যে একটু হলেই ধরা পড়ে যেত। আতংক ফ্যাকাসে হয়ে গেলো মাহমুদের চেহারা।

কোন রকমে টান দিয়ে সরিয়ে দিলো মেহরিনকে। আচমকা ভয় পেয়ে চিৎকার দিতে যাচ্ছিলো মেহরিন। চিৎকার বেরোনোর আগেই মাহমুদ ওর মুখ চেপে ধরলো।
মেহরিনের চোখে পানি। মাহমুদ মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে হাসলো। মেহরিনের রাগ উঠে গেলো। দাঁতমুখ খিচে বলল,
~ “সিগন্যাল পাঠাচ্ছিলে না কেন? ঐদিকে তোমার এনা তো সোহাগকে অস্থির করে ফেলছে।”

~ “কে যে অস্থির হয়েছে আমি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি।”
নিজেকে সামলে নিলো মাহমুদ। এইমুহূর্তে ইমোশনাল হওয়ার সময় নেই। মেহরিনের প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলল,
~ “ওয়াকিটকি গেছে।”

তারপর মেহরিনের দিকে ঝুঁকে বক্তৃতা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
~ “শোনো ওরা টের পেয়ে গেছে ভেতরে আমরা আছি। আমাদের যেভাবেই হোক ওদের নাগাল থেকে বেরোতে হবে। কোন ধরনের বোকামি করা যাবে না। বুঝেছো?”
মেহরিন মাথা ঝাঁকালেও মাহমুদের কথা যে সে কানে নেয় নি তা একটু পরেই বোঝা গেলো। ওরা প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু বেরোনো সময় মেহরিন, টার্গেট নাগালে থাকায় শুট করে দিলো শত্রুদের নেতাকে!
~ “সর্বনাশ! কি করেছো তুমি?”

ওর হাত ধরে সোজরে দৌড়ানো শুরু করলো মাহমুদ। এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়ছে শত্রুরা। তবে ওদের অবস্থান এখনো টের পায় নি। নেতাকে গুলি খাওয়ায় কিছুসময়ের জন্য অপ্রস্তুত হয়ে গেছিলো ওরা। মাহমুদ সে সময়টাকে কাজে লাগিয়েছে। ক্ষিপ্রগতিতে মেহরিনকে নিয়ে পেছন দিকে দৌঁড়ানো শুরু করে দিলো, যাতে গুলির রেঞ্জের বাইরে চলে যাওয়া যায়।

ঘন জঙলে ঢুকে পড়েছে ওরা। দৌড়াতে দৌড়াতে পায়ের জয়েন্ট গুলো সব ঢিলা হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন এক্ষুনি খুলে পড়ে যাবে। এই মেয়ে জাস্ট ইম্পসিবল!
মেহরিনের দিকে তাকালো সে, ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়েছে। ভাঙ্গা ওয়াকি টকি নিয়ে গুঁতোগুঁতি করছে। হাসলো মাহমুদ। বোকামি করলে শত্রুদের পালের গোদাটাকে মেরে এসেছে।

পরোক্ষনেই মেজাজ গরম হয়ে গেলো। প্রচন্ড রিস্ক নিয়ে ফেলেছে মেহরিন, যে কোন মুহূর্তে গুলি খেতে পারতো! মাহমুদ ঝাড়ি মেরে বলল,
~ “এরজন্যই তোমাকে মিশন থেকে বাদ দিলে খুশি লাগে। সেই ঝামেলা বাধালে তো?”

~ “তো কি করতাম? মিশনে এসে চুপচাপ বসে থাকতাম? ভুলে যেও না আমিও একজন সিনিয়র এজেন্ট! ভালোখারাপ সিদ্ধান্ত আমিও নিতে পারি।”
~ “তাই নাকি? তাহলে বসকে বললে না কেন তোমাকেই লিডার করে পাঠাতো?”

~ “আমার যা ঠিক মনে হয়েছি আমি করেছি!”
কোমরে গুটানো পিস্তলটা বের করে মেহরিনের কপালে ঠেকালো মাহমুদ, দাঁতেদাঁত চেপে বলল,
~ “শুট করে দেই?”

মেহরিন জবাব দিলো না। মাহমুদ পিস্তল দিয়ে ওর কপালটা পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, “চুপ করে আছো কেন? দেবো শুট করে?”
~ “পিস্তল আমার কাছেও আছে এবং সেটার ব্যবহার আমি খুব ভালো করেই জানি। তার প্রমাণ তুমি পেয়েছো!”
~ “তারমানে কি তুমি আমাকেও গুলি করবে?”

মেহরিনের নির্বিকার জবাব,
~ “করতেও পারি!”
পিস্তল নামিয়ে ক্লান্তভাবে বসে পড়লো মাহমুদ। মেহরিন শারাফাত কে ভয় দেখানো ওর কর্ম নয়!

পর্ব ৮

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে দুজনে। শুকনো মাথার ওপর চড়চড় আওয়াজ হচ্ছে। মেহরিনের গা ছমছম করছে। সন্ধ্যা হতে আর বেশি বাকি নেই।
হঠাৎ একটা সংকেত শুনে দুজনেই চমকে উঠে একে অপরের দিকে তাকালো। সাথে সাথে এইদল জংলী নরখাদক ওদের সামনে লাফিয়ে পড়লো। মেহরিন ভয়ে মাহমুদের কনুই চেপে ধরলো।

~ “এবার কি হবে মাহমুদ?”
মেহরিনকে আড়াল করে দাঁড়ালো মাহমুদ। ছয়সাত জনের মত হবে ওদের ঘিরে উদ্ভট নৃত্য শুরু করে দিলো। ক্রমেই এগিয়ে আসছে। মেহরিন ভয়ে সেঁটে যাচ্ছে। এরা কি ওদের ধরে নিয়ে বলি দেবে?

মাহমুদ রিভলভার বের করে নিলো। ওর দেখাদেখি মেহরিনও তার গান বের করে নিলো। ধমকি দিয়ে বলল,
~ “ডোন্ট টাচ আস, আদারওয়াইজ আই উইল শুট ইউ!”

মাহমুদ ফিসফিস করে বলল,
~ “ওরা ইংরেজী বুঝবে না মেহরিন!”
~ “বাংলা বুঝবে? বাংলা বলবো?”

~ “ইংরেজী বাংলা কিছুই বুঝবে না।”
~ “তাহলে কি করবো? ডিরেক্ট শুট করে দেবো?”

মেহরিন একজনের বুক বরাবর নিশানা ঠিক করে নিয়েছে। মাহমুদ বাধা দিয়ে বলল,
~ “বুকে নয় পায়ে গুলি করো। শুধুশুধু মারার দরকার নেই। মনে হচ্ছে পায়ে গুলি করলেই ভয়ে পালাবে।”

পরপর তিনটা গুলি করলো ওরা। বাকি জংলী নরখাদক গুলো ওদের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল কিছুক্ষন। তারপর আবার অদ্ভুত রকমের সংকেত দিলো ওরা। মাহমুদ দ্রুত বাকি তিনজনের পায়ে তিনটে গুলি করে মেহরিনের হাত ধরে ছুটটে শুরু করলো। নিশ্চই সঙ্গিদের সংকেত দিয়েছে ওরা। বাকিরা এসে পড়লে পালানো মুশকিল।

ইতোমধ্যে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। স্থানীয় একটা গ্রামে আশ্রয় নিলো ওরা। ওখান থেকেই শহরে এসে টেলিফোন করলো। পরেরদিন সোহাগ সার্চ টিম নিয়ে এসে ওদের উদ্ধার করলো।

মিশন থেকে ফিরে তিনদিন করে ছুটি দেওয়া হলো ওদেরকে। ইরফান আহমদের বেশ খুশি! মিশন সাকসেসফুল।
এদিকে লায়লা শারাফাত মেয়েকে অনেক করে বোঝাচ্ছেন চাকরীটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য। মেহরিনের কষ্ট লাগছে নিজের যোগ্যতায় এত ভালো একটা চাকরী পেলো সে সেই চাকরিটা ছাড়তে মন চাইছে না। তসবে সবে মিশন শেষ করে এসেছে এখন চাকরী ছাড়ার কথা শুনলেই কান্না পায়।

লায়লা শারাফাত দমলেন না। মেয়েকে বোঝালো চালু রাখলেন।
অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তা সিদ্ধান্ত নিলো মেহরিন। লায়লা শারাফাত ঠিকই বলেছে চাকরীটা ওর ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। এখানে থাকলে মাহমুদের প্রতি দুর্বল হয়ে যাবে সে।

পুনরায় রেজিগনেশন লেটার তৈরী করলো সে।

তিনদিন বাদে মাহমুদ অফিসে ঢুকেতেই এনা এসে বলল,
~ “মেহরিন আপু চাকরী ছেড়ে দিয়েছে মাহমুদ। লায়লা আন্টি নাকি সকালে বসের কাছে ফোন করে হুমকি দিয়েছে মেহরিন আপুকে যেন জোর করে আটকে রাখা না হয়।”

~ “তুমি কার কাছ থেকে জানলে?”
~ “সোহাগ ভাইকে মেহরিন আপু জানিয়ে গেছে। কিন্তু সোহাগ ভাই একটু পরে এসে জানালো মেহরিন আপু নাকি উনার মায়ের কাছে যায় নি। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না উনার। তোমাকে ফোনে পাওয়া যায় নি তাই স্যার খুঁজতে বেরিয়েছেন।”

মাহমুদের মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। সব তো ঠিকই ছিলো তাহলে মেহরিন কোথায় গেলো?
একটু পরেই ফোন এলো ওর ফোনে। সোহাগ ফোন করেছে। ইরফান সাহেবের অবস্থা বেশি ভালো নয়। প্রেশার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে, বুকে ব্যথা করছে, উনাকে হস্পিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আধঘন্টার ভেতর হস্পিটালে পৌঁছে গেলো মাহমুদ। ইরফান সাহেবকে সিসিইউ তে রাখা হয়ে গেছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। অস্থিরভাবে বারান্দায় পায়চারি করছে মাহমুদ। মাথায় সূক্ষ্ম যন্ত্রনা হচ্ছে, চারদিকের টেনশনে নিজেকে পাগল পাগল লাগছে ওর।

আঠারো ঘন্টা পরে ইরফান সাহেবের জ্ঞান ফিরলো। মাহমুদকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন। মাহমুদ কাছে বসতেই ওর হাত ধরে ডুঁকরে কেঁদে উঠলেন। ছোট বাচ্চাদের মত অসহায় ভাবে বললেন, “আমার মেয়েটা কখনো আমাকে বাবা বলে ডাকে নি মাহমুদ, আমি হাত জোড় করে আমার মেয়েটাকে ভিক্ষা চাইছি, আমাকে মেয়েকে আমার কাছে এনে দে। তারমুখ থেকে একবার বাবা ডাক শুনে আমি মরতে চাই..আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দে বাবা। আমি আর কিচ্ছু চাইবো না তোর কাছে। তোর চাচীকে বলিস আমি আর বেশিদিন বাচবো না। আমাকে যেন সে মাফ করে দেয়!”

চোখে পানি চলে এলো মাহমুদের। সারাটা জীবন একা একা পার করেছেন এই মানুষটা, অথচ কোনদিন তাকে এতটা অসহায় হতে দেখেন নি। ভাবতেই পারে নি এই কঠিন মানুষটা ভেতরে ভেতরে এতটা নরম। সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষায় তিনি হয়ত একটা ভুল করে ফেলেছিলেন, কিন্তু সারাজীবন তার মাশুল গুনে গেছেন কখনো ভেঙে পড়েন নি। আজ তার এই অসহায় মুখটা দেখে মাহমুদের কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। মেহরিনকে ফিরিয়ে আনবে সে যে করেই হোক, এই মানুষটাকে আর কষ্ট পেতে দেবে না, কিছুতেই না।

ইরফান সাহেব ডুঁকরে উঠে বললেন, “আমি বুঝতে পেরেছি মেয়েটা তোকে পাগলের মত ভালোবাসে মাহমুদ, আমি আমার মেয়ের মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারি! আমার ভুলের জন্য মেয়েটা..”
কান্নার চোটে কথা বলতে পারছেন না উনি। মাহমুদ উনার হাতে হাত রেখে বলল, “তুমি শান্ত হও চাচ্চু! মেহরিনকে আমি খুঁজে বের করবো, ও যেখানে থাকুক আমি ওকে তোমার কাছে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি!

মাহমুদ প্রথমে মেহরিনের মা লায়লা শারাফাতের কাছে গেলো। উনি মেয়ের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মেহরিন যে উনার কাছেও আসবেন না এটা উনি ভাবতে পারেন নি। মাহমুদকে দেখে চিনতে পারলেন, মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। মাহমুদ ভেতরে ঢুকে উনাকে সালাম করলো। তারপর হাসিমুখে বলল, “কেমন আছো ছোটমা?”

লায়লা কঠিন গলায় বললেন, “কিসের ছোটমা? আমি কারো ছোট মা নই। আমি লায়লা। লায়লা শারাফাত। মেহরিনের মা!”
~ “তুমি না রাগ করো আর যাই করো আমি তোমাকে ছোট মা বলেই ডাকবো।”
~ “কি জন্য এসেছো?”

মাহমুদ মুখের হাসি রেখে বলল, “ধমকাচ্ছো কেন? .তোমার জন্য আমি কতবড় স্যাক্রিফাইস করেছি তুমি জানো? শুধু মাত্র তোমার জন্য তোমার মেয়ে আমাকে তার লাইফ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। তুমি জানো আমার কত কষ্ট হয়েছিলো? .চাচ্চু ভুল করেছিলো চাচ্চুকে শাস্তি দিচ্ছো ঠিক আছে, সে এখন হাসপাতালে মরনদশায় আছে, কিন্তু আমাকে কেন?

মাহমুদ খেয়াল করলো লায়লা বানুর চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে গেছে, উনি কাঁপছেন। মাহমুদ থামলো না। বলল,
~ “আমি তো কোন দোষ করি নি? এই যে তোমার জন্য তোমার মেয়ে আমাকে ছেড়ে দিলো এটা কি ঠিক হলো?”

লায়লা ওর কথার জবাব না দিয়ে অসহায় গলায় বললেন, “কি হয়েছে তোমার চাচ্চুর?”
হস্পিটালে ইরফান আহমেদের অসহায় মুখটা মনে পড়লো মাহমুদের। কষ্ট হচ্ছে ওর। কিন্তু আপাতত ওকে নরমাল থাকতে হবে। অবজ্ঞার স্বরে বলল, “কি আবার হবে? .

.মেয়ে নিরুদ্দেশ শুনে অসুস্থ হওয়ান ভান করছে। সবাইকে বোঝাতে চাইছেন মেয়ের প্রতি কত ভালোবাসা! ভালোবাসা না ভং সেটা তো আমরা সবাই জানি। ভালোবাসলে আবার বিয়ে করতেন? মেহরিনের কাছে শুনেছি দ্বিতীয় বিয়ে করে তোমার খোঁজ খবর পর্যন্ত নেয় নি। আল্লাহ্‌র তরফ থেকে আল্লাহ্‌ই শাস্তি দিচ্ছেন। সারাজীবন তো একা কাটিয়েছেন, এখন মরার সময়ও একা মরবেন।”
লায়লা শারাফাত চাপা কন্ঠে বললেন, “তিনি তোমার চাচা। তার সম্পর্কে এভাবে বলাটা তোমার উচিৎ নয়।”

মাহমুদ যেন শুনতেই পায় নি। বলল, “তবে সময় আর বেশি নেই বোধহয়। আমাকে আসার সময় বলল তোর ছোট মাকে বলিস মরবার আগে আমি তার কাছে শেষবারের মত মাফ চাইছি। হাশরের ময়দানে যেন আমাকে মাফ করে দেয় সে। আমি বলেছি এখন এসব বলে লাভ নেই। ছোট মা এই জীবনে তোমার মুখ দেখবে না। কম অন্যায় তো করো নি তার সাথে? যাইহোক, আমার চাচ্চুকে নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। আমি এসেছি মেহরিনকে খুঁজতে। ওর কাছে অফিসের একটা জরুরী ফাইল রয়ে গেছে। সেটা তো জমা করে যায় নি।”
~ “মেহরিন এখানে আসে নি।”

মনে মনে হতাশ হলো মাহমুদ। সে ভেবেছিলো মেহরিন হয়ত এখানেই আছে। বলল,
~ “না থাকলে আর কি করার। ঠিক আছে আমি আসি।”
~ “তোমার চাচ্চুর এখন কি অবস্থা?”

~ “ডাক্তার আটচল্লিশ ঘন্টার ডেডলাইন দিয়েছে, তবে আমার মনে হয় না মরবে। খারাপ মানুষ অনেকদিন বাঁচে।”
লায়না বেগমের ইচ্ছে করছে কষে এই অভদ্র ছেলেটার গালে একটা চড় বসিয়ে দিতে। ভদ্রতা নম্রতা বলে কিছু জানে না। উনার সাথে অন্যায় করেছে ঠিক আছে কিন্তু তার তো আপন চাচা, সে কি করে বাপের বয়সী একটা মানুষের মৃত্যু কামনা করে?

বয়সকালের কথা মনে পড়ে গেলো। কতসুন্দর মুহূর্তগুলো কাটিয়েছিলো তিনি আর ইরফান আহমেদ। কিন্তু হঠাৎ করেই মানুষটা একটা সন্তানের জন্য উনাকে ছেড়ে চলে গেলো। মূর্খ বাঙ্গালী নারী নিজেকে বুঝ দিলেন সন্তান চাওয়াটা তো অন্যায় কিছু নয়। একটা মানুষতো চাইতেই পারে ফুটফুটে একটা বাচ্চা তাকে বাবা বলে ডাকবে। তাই বলে তিনি তো আর অসুস্থ মানুষটাকে এভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন না। করুক সে অন্যায় কিন্তু তিনি তো তাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
~ “আমি তাকে দেখতে যাবো মাহমুদ! আমাকে নিয়ে চলো।”

মাহমুদ অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “আপনি গলে গেলেন? উনি আপনার সাথে কি করেছে সেগুলো ভুলে গেছেন? এত সহজে উনাকে ক্ষমা করে দেওয়াটা আপনার উচিৎ হচ্ছে না।”
~ “উচিৎ অনুচিত আমি তোমার কাছে শুনবো না।”

~ “যাই বলুন আমি বলবো আপনার যাওয়ার দরকার নেই। চাচ্চু আপনার সাথে কি করেছে সেগুলো মনে করুন?”
~ “আমি তার ওপর রেগে আছি। ভেবেছিলাম তাকে কোনদিন মাফ করবো না। আমার প্রতি অন্যায় করেছে সে।”
~ “তাহলে?”

~ “কিন্তু রাগ, দুঃখ, মান অভিমান সুস্থ মানুষের ওপর দেখানো যায়, অসুস্থ মানুষের ওপর নয়।”
~ “তারমানে আপনি হস্পিটালে যাবেন?”
~ “হ্যাঁ।”

উনার মুখের দিকে তাকিয়ে মাহমুদের মায়া হলো। অভিমান করে দূরে সরে গেছেন ঠিকই কিন্তু এখনো ভালোবাসেন, কতটা গভীর ভাবে ভালোবাসলে এতটা অভিমান করা যায়?

লায়লা শারাফাত হস্পিটালে এসে জানতে পারলেন ইরফান আহমদের বাস্তবিকই গুরুতর অসুস্থ। অধীরভাবে তার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করতে লাগলেন উনি। জ্ঞান ফিরতেই ইরফান আহমেদ উনাকে যারপরনাই খুশি হলেন। তিনি ভাবতেই পারেন নি লায়লা শারাফাত হাসপাতালে আসবেন। অনেক অনুনয়, বিনয়, মান, অভিমানের পর শেষে মাহমুদের চালাকিতে এক হলো দুজনে।

এদিকে স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ায় ভীষণ খুশি ইরফান আহমেদ। আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ। তবে মেয়ের চিন্তায় স্বামী স্ত্রী দুজনে এক হওয়ার আনন্দটা উপভোগ করতে পারছেন না! একমাত্র মেয়ে নিখোঁজ! এই অবস্থায় তারা আনন্দ করেন কি করে?

দুদিন হয়ে গেছে মেহরিন নিখোঁজ। ইরফান সাহেব অধৈর্য গলায় রাতুলকে বললেন, “দুদিন হয়ে গেলো আমার মেয়ে টা নিখোঁজ, ওকে তোমরা খুঁজে বের করতে পারো নি? কিসের গোয়েন্দা তোমরা?”

রাতুল বিরক্তিতে ঠোঁটদুটো চেপে ধরলো। বউকে ফিরে পেয়ে টাকলা আবার নিজের স্বরূপে ফিরে এসেছেন। শুরু হলো ধমকাধমকি!”
ইরফান সাহেব রাগত স্বরে মাহমুদকে বললেন, “এরা আমাকে রিলিজ দিচ্ছে না কেন? আমার মেয়েকে আমিই খুঁজে বের করবো। কচুর গোয়েন্দা তোরা! দুদিন ধরে একটা মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারলি না।”

উনার দৃঢ় বিশ্বাস স্ত্রীকে যখন ফিরে পেয়েছেন মেয়েকেও ফিরে পাবেন। হস্পিটাল কর্তৃপক্ষ এখনো কেন উনাকে ডিসচার্জ করছেন না তাই নিয়ে ক্ষুব্ধ! মেয়েকে কাছে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেছেন।

রাতুল জানালো ঢাকা শহরের সম্ভাব্য সব জায়গায় মেহরিনকে খোঁজা হয়ে গেছে, কিন্তু ওর কোন হদিস পাওয়া যায় নি।
ইরফান সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, “হদিস পাওয়া যায় নি মানে? দরকার হলে সারা বাংলাদেশ খোঁজার ব্যবস্থা করতে হবে, তবুও আমার মেয়েকে আমার চাই।!
রাতুল মুখ কালো করে বেরিয়ে গেল। মাহমুদের মুখ থমথমে। মেহরিন গাড়িও নেয় নি। টাকা পয়সা নিয়েছে কি না কে জানে?

উনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তুমি ভুলে যাচ্ছো চাচ্চু মেহরিন নিজেও একজন এনএসআই এজেন্ট! ও চাইলেই কিন্তু খুব সহজে আমাদের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখাতে পারে। কিন্তু তাই বলে আমরা চুপচাপ বসে থেকে নেই। ওকে খুঁজে বের করার যথেষ্ট চেষ্টা করছি। তুমি প্লিজ আমাদের ওপর একটু ভরসা রাখও। এই শরীর নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি একদম ঠিক নয়।”

লায়লা হকও মাহমুদের কথায় সায় দিলেন। স্বামীকে সান্ত্বনা দিয়ে নারীসুলভ ভাষায় বললেন, “আল্লাহ, আল্লাহ, করো। আল্লাহ নিশ্চই আমাদের মেয়েকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন।”

ইরফান আহমেদ ঠান্ডা হলেন। কিন্তু নিশিন্ত হতে পারছেন না। সারাক্ষণ শুধু মাথার ভেতর একটা কথায়ই ঘুরপাক খাচ্ছে, মেয়েটার কোন বিপদ আপদ হয় যদি! একা মেয়ে যতই শক্তিশালী হোক কোথায় আছে কেন যানে? কোথায় থাকছে, খাচ্ছে কোথায়। এসব চিন্তা মাথায় আসে।

পেপারে বাবা মায়ের ছবি একসাথে দেখে চমকে উঠলো মেহরিন। বড় বড় করে হেডলাইন ছাপা হয়েছে, “ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স(এনএসআই)এর প্রধান জনাব ইরফান আহমেদ গুরুত্ব অসুস্থ হয়ে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।”

এইটুকু পরেই পেপার রেখে দিলো মেহরিন। অস্থির লাগছে তার। যতই রাগ থাকুক রক্তের টান থাকবেই। নিজেকে কোনভাবেই শান্ত রাখতে পারছে না। মন মানছে না। ইরফান আহমেদের কিছু হয়ে গেলে সে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না। যদিও সে জানে হস্পিটালে গেলে মাহমুদের সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ কিন্তু না গিয়েও থাকতে পারবে না।

মেহরিন ভাবছে বাবার অসুস্থতার কথা শুনে মা ছুটে গেছেন। তারমানে কি দুজনের মাঝে ভাব হয়ে গেছে? আনন্দে চোখ চিকচিক করে উঠলো ওর। সেই সাথে একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এলো, ইশস! আরো আগে কেন বাবা মায়ের ভাব হলো না? তাহলে তো তাকে মাহমুদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে হতো না। কিন্তু এখন?

এখন তো মাহমুদের লাইফে এনা আছে? .টলমল করতে থাকা চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো মেহরিনের গাল বেয়ে। মাহমুদের কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠে, অসহ্য লাগে সবকিছু!
পেপারে ছবি ছাপানোর কাজটা ইচ্ছে করে করেছে মাহমুদ। লায়লা হক আর ইরফান আহমেদকে একসাথে দেখলে মেহরিন নিশ্চই হস্পিটালে আসবে।

সারাদিন নাওয়াখাওয়া বাদ দিয়ে মেহরিনকে খুঁজে চলেছে মাহমুদ। কিন্তু একটা মানুষ নিজে থেকে ধরা না দিতে চাইলে তাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল নয় অসম্ভব! আজকেও খোঁজাখুঁজির পর সন্ধ্যার দিকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তাড়াহুড়ো করে হস্পিটালে ঢোকার সময় বোরখা পরিহিতা একজনের সাথে ধাক্কা খেলো মাহমুদ। মেয়েটির আপাদমস্তক মস্তক কালো বোরখায় ঢাকা।

এমনকি চোখে কালো চশমা পরা! হাত মোজা, পা মোজা দিয়ে হাত পা গুলোও ঢাকা। ধাক্কা খেয়ে মেয়েটি তার মুখোশ চেপে ধরলো যেন খুলে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে। চোখের চশমাটা খুলে পড়ে গেছে। আতংকিত হয়ে গেলো সে! মাহমুদ তাড়াহুড়ো করে চশমাটা তুলে দিয়ে ব্যস্তভাবে সামনে এগিয়ে গেলো। চশমা হাতে দেওয়ার সময় মেয়েটির চোখে চোখ পড়েছে একবার। কিন্তু মাহমুদ দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো। মেয়েটিও যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে গেছে।

তিন চার কদম এগোনোর পর মাহমুদ থমকে গেলো। একদৌঁড়ে আবার গেটের কাছে এল। সজোরে লাথি মারলো গেটে সে!” মেহরিন! শিট! আবারও পালিয়েছে!”
রাগে ফেটে পড়লো মাহমুদ। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো একবার খালি হাতের কাছে পাক মেহরিনকে যত রকমের কঠিন সাজা আছে সব দেবে। খালি একবার পাক, কোন মাফ হবে না! শাস্তি কত প্রকার ও কি কি উদাহরণ সহ বুঝিয়ে দেবে।

সকাল বিকাল নিয়ম করে তার পা টেপাবে! জামাকাপড় ধোয়াবে! রান্না করা, বাসন মাজা সব করাবে। দরকার পড়লে অফিসের সিঁড়িগুলো দুবেলা নিয়মকরে মোছাবে! কোমরের সব জয়েন্ট যদি আলগা না করেছে ওর নামও মাহমুদ সিদ্দিকি নয়! ওকে রাস্তায় রাস্তায় দৌড় করানো? ছাড়বে না সে, কোনমতেই ছাড়বেন না।

পর্ব ৯ (অন্তিম)

মাহমুদ ছাদের রেলিংয়ের ওপর বসে আছে। মেহরিন এসে প্রথমে একটু দূরে সরে দাঁড়ালো মাহমুদের। কথা বলতে বলতে তারপর একেবারে মাহমুদের বুক বরারব এসে দাড়ালো। তার বুকের সাথে আলগাভাবে মেহরিন পীঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো। হাসি ফুটে উঠল মাহিমুদের ঠোঁটে। দুষ্টু মেয়েটা এখনো হার স্বীকার করবে না। ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না। একহাত দিয়ে কাছে টেনে নিলো মেহরিনকে। এবার একেবারে ওর বুকের সাথে লেপ্টে গেছে মেহরিনের পিঠ।

মাহমুদ ফিসফিস করে বলল,
~ “চুপিচুপি আমার গা ঘেঁষা হচ্ছে না?”

~ “আমার ভালোবাসা চাই, খুব বেশি ভালোবাসা!”
~ “ইনপুট না দিলে আউটপুট পাবে কি করে?”
মেহরিন ওর শার্ট খামচে ধরে রেলিং থেকে প্রায় টেনে করে নামালো ওকে! ওর গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
~ “ইনপুট চাই না? দিচ্ছি তোমাকে ইনফুট!”

ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকালো মাহমুদ। আশেপাশের ছাদে কেউ দেখেছে কি না চেক করলো! মেহরিন মুচকি মুচকি হাসছে। মাহমুদ ভীত কন্ঠে বলল,
~ “সর্বনাশ! ডুবাবে দেখছি!”
দ্রুত মেহরিনকে কোলে তুলে নিলো মাহমুদ। মেহরিন ওর গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসছে। কি মিষ্টি মধুর হাসি।

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো মাহমুদের। অদ্ভুত ভাবে চারপাশে তাকালো সে। রাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় গাড়িতে বসেই তন্দ্রাভাব হচ্ছিলো তার। বসে বসেই স্বপ্ন দেখে ফেলেছে সে। স্বপ্নের কথা ভেবে হাসলো মাহমুদ। পরোক্ষনেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। মেহরিন কবে ধরা দেবে? ওকে খুঁজতে খুঁজতে যে হয়রান হয়ে গেছে মাহমুদ। মেহরিনের কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না?

তাড়া দিলো সোহাগকে,
~ “আর কতদূর সোহাগ?”

~ “পৌঁছে গেছি স্যার।”
হস্পিটালে ইরফান আহমেদের সাথে দেখা করে আবার বেরিয়ে পড়লো ওরা।

প্রতিদিনের কত আজকেও খোঁজাখুঁজির পর মাহমুদ ক্লান্ত ভাবে বাসায় এসে ঢুকলো মাহমুদ। সারা শরীর অসাড় মনে হচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর অবস হয়ে আসছে। হালকা কুসুম গরম পানিতে শাওয়ার নিয়ে, বারান্দায় এসে বসলো সে।
মেহরিনের যাওয়ার সম্ভাব্য সকল জায়গাতে খোঁজ নেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও যাও নি সে।

হতাশ হয়ে রুমে এসে ঢুকলো সে। বিছানায় শুয়ে স্থিরভাবে সিলিং ফ্যান এর দিকে চেয়ে রইলো। দুদিন হয়েছে মেহরিনের সাথে তার হাসপাতালে দেখা হয়েছে। এর পর আর কোন খোঁজ নেই। অসহায় লাগছে তার। বুকের ভেতর বড়সড় পাথর চেপে বসে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

এদিকে ইরফান আহমদেও অস্থির হয়ে আছে মেহরিনের চিন্তায়। মাহমুদ উঠে টিভিটা চালু করে দিলো। ভালো লাগছে না দেখে আবার বন্ধ করে দিলো।
ঘড়িতে এখন রাত দেড়টা। অথচ তার ঘুম আসছে না। সারাদিন ছোটাছুটির ফলে চোখ ফেটে ঘুম আসার কথা। কিন্তু আসছে না।

ফোনের ওপাশ থেকে ভাইব্রেশন হলো। সাথে সাথেই রিসিভ করলো মাহমুদ, যেন এর অপেক্ষাতেই ছিলো। ফোনের ওপর পাশের মানুষটা কথা বলছে না। মাহমুদ দ্রুত অন্য আরেকটা ফোন থেকে সোহাগকে মেসেজ করলো।
~ “জলদি নাম্বারটা ট্র‍্যাক করো সোহাগ।”

ওপাশের মানুষটা তখনো নিশ্চুপ। মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
~ “কেন আমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো মেহরিন?”

ওপাশ থেকে কোন জবাব এলো না। মাহমুদ আবারও অধৈর্য কন্ঠে বলল,
~ “তুমি আমার আর এনার সম্পর্কে পুরোটা জানো না মেহরিন। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি। প্লিজ মেহরিন কথা বলো। মেহরিন? চুপ করে আছো কেন? কথা বলো মেহরিন। আমি তোমার কন্ঠ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। মেহরিন আই বেগ ইউ! দোহাই তোমার একটা কথা অন্তত বলো। মেহরিন? প্লিজ মেহরিন?
ওপাশ থেকে ফোন কেটে গেলো। শূন্য দৃষ্টিতে ফোনের দিকে চেয়ে আছে মাহমুদ। মেহরিন কি করে এত নিষ্ঠুর হতে পারছে? নিজেকে শক্ত করে সোহাগের নাম্বারে কল দিলো।

সোহাগ ওপাশ থেকে জানালো,
~ “সরি স্যার! আমরা লোকেশন ট্র‍্যাক করতে পারে নি। ম্যামের লোকেশন অন করা নেই। তাছাড়া হঠাৎ করেই সার্ভার ডাউন করছে।”

রাগে নিজের হাতের ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেললো মাহমুদ। টিটেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা সজোরে আছাড় দিয়ে ফেলে দিলো। ভাগ্যকে কিছু কুৎসিত গালি দিতে ইচ্ছে করছে তার। কথায় আছে অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়, মাহমুদের অবস্থা সেরকম।

ফোন রেখে দিলো মেহরিন। এর বেশিক্ষণ হলে দুর্বল হয়ে পড়তো সে। এনা ওর পাশে অবাক হয়ে বসে আছে। এতবার করে বলার পরেও মেহরিন কেন মাহমুদের সাথে কথা বললো না সে বুঝতে পারছে না। গতকাল কয়েকদিন যাবত সে নিজে তার আর মাহমুদের সম্পর্কের বিষয়ে মেহরিনকে সব খুলে বলেছে।

এমনকি তার পরামর্শেই মেহরিন নিখোঁজ হওয়ার ভান করেছে। লায়লা শারাফাত এবং ইরফান আহমেদকে এক করার জন্য তাদের এই প্ল্যান দারূণ কাজে নিয়েছে। এবার মেহরিনের মাহমুদের কাছে ফেরার পালা কিন্তু সে এমন দুম ধরে বসে আছে কেন?

এনা যখন মেহরিনকে সব খুলে বলে তখন থেকে মেহরিনের মাথায় শুধু একটা কথাই এসেছে এই মেয়েটাকে ঠকাচ্ছে সে। এই মেয়েটা মাহমুদের দুঃখের সময় তার পাশে ছিলো। নিজের সর্বস্ব দিয়ে মাহমুদকে আগলে রাখতে চেয়েছে, আর মেহরিন স্বার্থপরের মত তার কাছ থেকে মাহমুদকে কেড়ে নিতে চাইছে।

একটা মেয়ে কতটা ভালোবাসলে এতটা নিঃস্বার্থভাবে, নির্দ্বিধায় তার জায়গা ছেড়ে দিতে পারে। সে তো চাইলেও মাহমুদকে ধরে রাখতে পারতো। উপযুক্ত কারণও আছে। কিন্তু মাহমুদের খুশির জন্য সে হাসিমুখে নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। এই মেয়েটাকে আর অপমান করার সাহস মেহরিনের নেই। মাহমুদের যোগ্য সঙ্গিনী সে।

এনা দুশ্চিন্তায় সারারাত ঘুমাতে পারে নি। মেহরিনের মনে কি চলেছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেহরিনের ঘুম ভাঙ্গার আগে খুব ভোরে ভোরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো সে। মাহমুদকে জানাতে হবে মেহরিন তার বাসায় আছে।

অনেক্ষন যাবত বেল বাজানোর পরেও যখন কেউ দরজা খুললো না, তখন এনা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে মাহমুদকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আতংকে মাহমুদের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো সে।

মেহরিন বিছানায় নেই। এনা ওয়াশরুম কিচেন বারান্দা সব জায়গায় চেক করে বেডরুমে ফিরে আসতেই দেখলো মাহমুদের হাতে একটা চিঠি। খুলছে না সে। চিঠি হাতে নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মত চেয় আছে। এনার বুঝতে বাকি রইলো না কিছু একটা ঘটেছে। মাহমুদকে ইশারা দিয়ে বলল,
~ “চিঠিটা খোলো মাহমুদ।”
মাহমুদ ওর দিকে একবার তাকালো। তারপর চিঠিটা খুললো।

মাহমুদ,
আমার মাহমুদ! তোমার মনে আছে মাহমুদ প্রথম যখন আমি অফিসে জয়েন করেছিলাম তখন আগের বসে আমাদের দুজনের ঝগড়া দেখে কি নাম দিয়েছিলো আমাদের? তোমাকে ডাকতো টম! আমাকে জেরি! অফিসের সবার কি হাসাহাসি আমাদের নিয়ে। তুমি খুব পাঁজি ছিলে সারাক্ষণ আমার সাথে ঝগড়া করতে। আস্তে আস্তে সেই ঝগড়া যে কখন ভালোবাসায় রূপান্তরিত হলো তুমি বুঝতেও পারলে না। আমি কিন্তু ঠিক বুঝেছি। মেয়েরা খুব সহজেই অনেক কিছু বুঝতে পারে।

তাইতো এনএসআই এর এই দক্ষ, সুদর্শন, মুডি ছেলেটা আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে জেনে মনে মনে খুব হেসেছি। একসময় আমাদের ভালোবাসাও হয়ে গেলো। তারপর আস্তে আস্তে সব কিছু বদলে গেলো। আমরা একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে গেলাম। অনেক দূরে। আমাদের দুজনের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেলো, ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা সেই আগের মতই আছে। আমি জানি তুমি আমাকে আগের কতই ভালোবাসো। ঠিক বলেছি না? । এনা কিন্তু আমাকে সব বলেছে দিয়েছে।

ও কি বলেছে জানো? ও বলেছে, “জানেন মেহরিন আপু, মাহমুদকে ভালোবাসা খুব সহজ। যে কেউ ওকে ভালোবেসে ফেলবে। কিন্তু ও যাকে ভালোবাসবে শী মাস্ট বি ভ্যেরি স্পেশাল। ওর সেই স্পেশাল মানুষটা আপনি মেহরিন আপু। হাজার নারী মাহমুদের জীবনে আসলেও সে শুধু আপনাকে ভালোবাসবে। কারো ক্ষমতা নেই সে জায়গা দখল করার।” আনন্দে আমি এনাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছি মাহমুদ। আর কোন আক্ষেপ নেই আমার। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ আছে। তুমি রেখো প্লিজ। তোমার মেহরিনের শেষ অনুরোধ, আমার অনুরোধটা হচ্ছে তুমি এনাকে বিয়ে করবে। বলো করবে? তুমি প্লিজ ওকে কষ্ট দিও না।

ও তোমাকে খুব ভালোবাসে। নিঃস্বার্থ ভাবে যে মেয়েটা আমাদের জন্য এতকিছু করেছে তাকে তার প্রাপ্যটা না দিলে অন্যায় হবে। ওকে তুমি আর ফিরিয়ে দিও না, প্লিজ। আর হ্যাঁ বাবাকে বলে দিও তার ওপর আমার কোন রাগ নেই। আমার মা যখন তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি তখন আমার আর কোন রাগ নেই। আমি শুধুমাত্র বাবা আর তোমার জন্যই মায়ের হাজার বারণ সত্বেও চাকরীটা ছাড়তে পারি নি মাহমুদ। কিন্তু এবার না ছাড়লে অন্যায় হতো। এনার ওপর ঘোরতর অন্যায়।

একটা মেয়ে শুধু দিয়েই যাবে, দিয়েই যাবে তার বিনিয়ময়ে কিছু পাবে না এ কেমন বিচার? তুমি আমার অনুরোধটা রেখো মাহমুদ। অনেক কথা লিখবো ভেবেছিলাম, কিন্তু লিখতে পারছি না। যাই হোক আমার জন্য চিন্তা করো না। তোমরা আসার আগে আমার ফ্লাইটেই টেইক অফ করেছে। দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি আমি। আমার জন্য অপেক্ষা করো না, আমি সেদিনই ফিরবো যেদিন জানবো তুমি এনাকে তার যোগ্য সম্মান দিয়েছো।
ইতি
তোমার বদরাগী, মাথামোটা মেহরিন।

মাহমুদ চিঠি হাতে নিয়ে ফ্যালফ্যাল কিরে এনার দিকে চেয়ে আছে। দুপ মেঝেতে বসে পড়লো সে। খানিকবাদেই বাচ্চাদের মত হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো। এনা ভয়ে ওর পাশে নেমে বসলো। ওর কাধে হাত রেখে আতংকিত কন্ঠে বলল,
~ “কি হয়েছে মাহমুদ? মেহরিন আপু ঠিক আছে?”

মাহমুদ জবাব দিলো না। এনা নিজেই ওর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করলো। ভয়ে ওর বুক কাঁপছে। কিন্তু পুরো চিঠিটা পড়া শেষে বিস্ময়ে, হতবাক হয়ে মাহমুদের দিকে তাকালো সে। মাহমুদ হাতদুটো মুঠো পাকিয়ে অনবরত মেঝেতে বাড়ি মারছে। কি সান্ত্বনা দেবে তাকে এনা? সে নিজেই বুঝতে পারছে না এইমুহূর্তে তার কি করা উচিৎ, মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না।

মাহমুদ বাচ্চাদের মত ফোঁপাচ্ছে। এই প্রথম তাকে কাঁদতে দেখছে এনা, এতটা অসহায় লাগছে তাকে। চোখে পানি চলে এলো এনার। মাহমুদের কষ্ট সে অনুভব করতে পেরেছে বলেই স্বেচ্ছায় নিজের জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু মেহরিন আপু কেন এই মানুষটাকে আবার একা করে দিয়ে চলে গেলো? কি করে সামলাবে এই মানুষটাকে সে।

এনা বিড়বিড় করে বলল,
~ “একটা মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে, অবচেতনমনে একটা ভুল করে ফেলেছে তাকে কি আরেকটা সুযোগ দেওয়া যেত না মেহরিন আপু? কেন আমার জন্য আপনি তাকে কষ্ট দিলেন? এখন আমি কি করে তাকে সামলাবো?”

লেখা অরিত্রিকা আহানা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “জেরি ভার্সেস টম – রোমাঞ্চকর রহস্য গোয়েন্দা গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – জেরি ভার্সেস টম (১ম খণ্ড) – রোমাঞ্চকর রহস্য গোয়েন্দা গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!