ভালোবাসার গল্প

অতঃপর প্রণয় (১ম খণ্ড) – Premer golpo kahini

অতঃপর প্রণয় (১ম খণ্ড) – Premer golpo kahini: তোর এত কৌতুহল কেন? তুই আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলি আমি যেন তোর এখানে আসার কথা আন্টিকে না জানাই, আমি জানাবো না বলেছি। বাকি কে, কি, কেন এলো এসবের তোর কি দরকার?


পর্ব ১

এই হরিণ, ডাকটা শুনেই ইরিন প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে পেছনে তাকালো। বক্তাকে ঠাটিয়ে দুটো চড় মারার ইচ্ছে মনে মনে পোষণ করছিলো সে। কিন্তু ওর আশাতেই তৎক্ষণাৎ ছাই ঢেলে দিলো পেছনে দাঁড়ানো মানুষটা।

নাম আয়াজ রহমান। ইরিনরা যেই আটতলা এপার্টমেন্টে থাকে তার সপ্তম তলায় ইরিনদের পাশের ফ্ল্যাটটা আয়াজদের। সেই হিসেবে আয়াজ ওদের প্রতিবেশি। ইরিনের পিএসসি পরীক্ষার পর ওর বাবা ওদের ফ্ল্যাটটা কিস্তিতে কেনেন। তার একবছর পরেই আয়াজের বাবা ডাঃ হেলাল রহমান ওদের পাশের ফ্ল্যাটে আসেন। আয়াজরা চার ভাইবোন। দুই বোন, দুই ভাই। বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে।

আয়াজ সবার ছোট। ফর্সা টকটকে! সুন্দর স্বাস্থ্যবান। লম্বায় ছফুটের বেশি। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে যখন তখন যেখানে সেখানে ইরিনের সাথে ঝগড়া বাধানো! এছাড়া পড়াশোনাও করেন। একেবারে ফ্রেমে বাধিয়ে রাখার মত ট্যালেন্ট উনার! ঢাকা মেডিকেলের ফাইনাল ইয়ার স্টুডেন্ট, সেই রকম ভাবসাব!

জিরাফের মত লম্বা সুদর্শন এই মানুষটার সাথে পারিবারিক ভাবেই বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল ইরিনের। কিন্তু দুইজনের ঘোর আপত্তির কাছে হার মানতে হলো দুই পরিবারকে। তাদের বর্তমান মারামারিক অবস্থান দেখে পরিবারের সদস্যরা স্বস্তির নিশ্বাসই ফেলছেন। ভাগ্যিস জোর করে বিয়েটা দিয়ে দেন নি দুজনের। তাহলে ওরা দুজন মিলে পারিবারিক বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দিতো!
এককালে ইরিনকে পড়াতো আয়াজ। সেই থেকেই দুজনে রেষারেষি। ইরিনের ভাষ্যমতে ছাত্র হিসেবে তিনি খুব ভালো হলেও টিচার হিসেবে তিনি একেবারে জঘন্য। তার অবশ্য কারনও আছে।

পড়া না পারলেই কানে ধরানো থেকে শুরু করে নীল ডাউন পর্যন্ত সব শান্তি ইরিনকে দিয়ে ফেলেছেন তিনি। তারওপর ইরিনের লম্বা বিনুনি ধরে টানাটানি তো আছেই।
আর আয়াজের ভাষ্যমতে দুনিয়ার সবচেয়ে গাধাটাইপ স্টুডেন্ট হচ্ছে ইরিন।
পড়াতে বসে একদিন আয়াজ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, বলতো, ‘লং লিভ বাংলাদেশ’ এর বাংলা কি?

ইরিন হাঁ করে কিছুক্ষন তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিয়েছিলো, লম্বা বাস বাংলাদেশ!
রাগে আয়াজের মাথায় চাঁদি ফেটে যাওয়ার অবস্থা। আধঘন্টা নীল ডাউন করিয়ে রেখেছিলো ইরিনকে। তারপর ইংরেজী বইটা মুড়িয়ে ঠুসঠাস কতক্ষন ইরিনের মাথায় তবলা বাজিয়ে বেরিয়ে গেলো সে।

আয়াজের ডাক শুনতে পেয়েছে ইরিন। কিন্তু বুঝতে দিতে চাইলো না। শুনেও না শোনার ভান করে দ্রুত পা চালালো। এইমুহূর্তে আয়াজের সামনে থেকে পালাতে হবে তাকে। আয়াজও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ইরিনকে ধরতে রীতিমত দৌঁড়াচ্ছে সে।
আয়াজ ওর কাছে এগিয়ে এসেই মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল, কানে কালা নাকি তুই? কতবার ডাকলাম, সাড়া দিচ্ছিলি না কেন?
~ শুনতে পাই নি।

~ শুনতে পাসনি না ইচ্ছে করে জবাব দিস নি?
ইরিন নিরস কন্ঠে বলল, আমি সত্যিই শুনতে পাই নি।
~ বাসায় নাকি তোর বিয়ের কথাবার্তা চলছে? উৎসাহী চেহারা মাহমুদের।

~ হ্যাঁ। কাল দেখতে এসেছিলো।
~ শুনলাম ছেলে নাকি আর্মি অফিসার? পছন্দ হয়েছে?
~ আপনি জেনে কি করবেন? বিয়ে ঠিক হলে দাওয়াত পেয়ে যাবেন।
~ আগে তো পছন্দ হোক? তারপর বিয়ে?

ইরিন ওর কথার উত্তর না দিয়ে হাঁটা ধরলো। এই মানুষটার সাথে কথা বলতে ওর অসহ্য লাগছে।
আয়াজ প্রায় দৌঁড়ে এসে ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। তারপর ধমকে উঠে বলল, কথার উত্তর না দিয়ে চলে যাচ্ছিস কেন?
ইরিন আবারও পাশ কাটিয়ে যেতে নিলো। কিন্তু আয়াজের কথায় থামতে হলো।

~ তুই একটু আগে রিক্সায় কার সংগে ঘুরছিলি আমি দেখেছি। আন্টিকে গিয়ে যদি না বলেছি তাহলে আমার নামও আয়াজ রহমান না!
আয়াজ গটগট করে হাঁটা ধরলো। ইরিন এবার ওকে ধরার জন্য রীতিমত দৌঁড়াচ্ছে। অনুনয় বিনয় করে ডাকছে। কিন্তু তাকে ইঞ্চি খানেক পাত্তাও দিলো না আয়াজ। এই মুহূর্তে ইরিনের কোন কথা শুনবে না সে;তার সাথে ভাব ধরেছে সে কেন এখন ছাড় দেবে?
কলেজ থেকে ফেরার পথে রাশেদ ভাইয়ের সাথে দেখা ইরিনের, যিনি এক কালে ওর খালাতো বোন মুনার বয়ফ্রেন্ড ছিলো।

মুনা প্রায় রাশেদের সাথে দেখা করার সময় ওকে নিয়ে যেত। তারপর বাসায় যখন ধরা খায় তখন ফ্যামিলি থেকে তাড়াতাড়ি মুনার বিয়ের ব্যাবস্থা করা হলো।
তার পেছনেও আয়াজের হাত আছে। ওর কাছেই প্রথম ধরা খায় মুনা আর ইরিন। সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো রাশেদ ওদের। আর ইবলিশটা সেদিনই বন্ধুবান্ধব নিয়ে সিনেপ্লেক্সে এ হাজির! তারপর আর কি?

ইরিনের মায়ের কানে সুন্দর করে প্রেজেন্ট করে ঘটনাটা। সেদিন জুতো খুলে মেরেছিলো ইরিনের মা ওকে!
আজকে দেখা হতেই রাশেদ মুনার খবর জিজ্ঞেস করার জন্য ওকে ধরেছিলো। আয়াজ তখন নীলক্ষেতের দিকে বই কিনতে গিয়েছিলো। ফেরার পথে ওদেরকে দেখে ফেলে।

ইরিন অসহায় গলায় বলল,
~ সরি! আয়াজ ভাই, আমার ভুল হয়ে গেছে! আম্মাকে কিছু বলবেন না প্লিজ! আম্মা শুনলে মেরে আমার পিঠের ছাল তুলে ফেলবে!
~ আমার কি?
~ আয়াজ ভাই প্লিজ!
~ কি প্লিজ?

~ আম্মাকে কিছু বলবেন না প্লিজ!
~ আমি কি তোর কথামত চলবো? বলবো একশোবার বলবো! তুই আমার সাথে ভাব ধরেছিস না? এখন কেন? যা! সর সামনে থেকে!
ইরিন কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর জীবনেও আপনার কথার উত্তর না দিয়ে যাবো না!
~ ভুল যখন করেছিস শাস্তিও পাবি।

~ আমি সরি বলেছি তো।
আয়াজ এবার বাঁজখাই গলায় বলল, তুই আমার সামনে আর একটা কথা বললে ঠাস করে তোর গালে এক চড় বসিয়ে দেবো। যা সর সামনে থেকে!
ইরিন সরলো না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। আয়াজ রিক্সা ডেকে উঠে পড়লো। একবারও পেছন ফিরলো না! কি নিষ্ঠুর!
ইরিন নিশ্চিত আজকে মাইমুনা বেগম ওর চামড়া তুলে ফেলবে। রাশেদ ভাই নামক ছেলেটাকে আম্মা একদম পছন্দ করেন না। উনার কাছে রাশের ভাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য লোক। তার অবশ্য বিশেষ একটা কারণও আছে।

রাশেদ ভাইয়ের চালচলন একেবারে উড়নচণ্ডী টাইপ! নোংরা কুঁচকানো শার্ট, রংজ্বলে যাওয়া জিন্স পড়ে ঘোরাফেরা করেন। চেহারার কবিকবি ভাব!
বাংলার অধিকাংশ মায়েরাই কবিকবি টাইপ ছেলেদের পছন্দ করেন না! তাদের ধারনা মনে এই কবিকবি চেহারার বোকাসোকা ছেলে গুলো একধরনের সরলতায় মেয়েদের বেধে ফেলে! অর্থাৎ মাথা নষ্ট করে দেয়!

যদিও কৈশোরে তাদের অনেকেই এমন খামখেয়ালি ছেলেদের-ই পছন্দ করতো। পছন্দ না কারলেই মায়া ঠিকই অনুভব করতো, কিন্তু তাদের উত্তরসূরিদের বেলায় এই ছেলেগুলো একেবারে নাজায়েজ! এদের ধারে কাছে ঘেঁষাও দণ্ডনীয় অপরাধ!
রাশেদকে নিয়ে ইরিনের বড় খালা ইরিনের ওপর অসন্তুষ্ট। কেন ইরিন জেনে শুনেও উনাকে সব জানালো না? উনার মেয়ে যে এমন একটা ছাগলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সেটা মা হিসেবে উনার তো জানার অধিকার ছিলো? ইরিন কেন জানালো না? কেন ইন্ধন দিল?
মায়মুনা বেগমের কড়া নিষেধ রাশেদের সাথে যেন ভুলেও যোগাযোগ না রাখে।

ইরিন দরজায় বেল বাজাতেই মাহিন এসে দরজা খুলে দিলো।
ভেতরে আয়াজকে বসা দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো ইরিনের।
আয়াজ নিশ্চই এতক্ষনে রাশেদ ভাইয়ের ঘটনা এক্সটা তেল মরিচ মিশিয়ে আম্মার কাছে পেশ করেছে!
মায়মুনা বেগম এসে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে আজকে এত দেরী যে?

ইরিন ভয়ে ভয়ে আয়াজের দিকে তাকালো। উনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে চা খাচ্ছে যেন ইরিনকে দেখতেই পায় নি।
~ – আজকে এক্সট্রা ক্লাস ছিলো।
ইরিন আর সেকেন্ডেও দাঁড়ালো না। দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকে গেলে। এখানে বেশিক্ষণ দাড়ালেই মুছিবত! বলাতো যায় না আয়াজ ফট করে কোন ভেজাল লাগিয়ে বসে।
ও কাধের ব্যাগটা ওয়ারড্রবের ওপর রেখে দরজাটা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় মায়মুনা বেগম এসে হাজির। মুখ থমথমে!
~ কিছু বলবে?

মায়মুনা বেগম ঠাস করে ওর গালে একচড় বসিয়ে দিয়েছেন। তারপর বিছানার ঝাড়ুটা হাতে নিতেই ইরিন এক লাফে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। ওর বুঝতে বাকি রইলো না কেন হচ্ছে এসব!
মায়মুনা অনেক্ষন বকাবকি করে শেষে বেরিয়ে গেলেন। ইরিনের প্রচণ্ড রাগ লাগছে আয়াজের ওপর। খচ্চরটা তারমানে আম্মাকে সব বলে দিয়েছে? সব সময় ওর পিছে লাগে!

বিকেল বেলা পাশের বারান্দায় আয়াজকে দাঁড়ানো দেখে ইরিন ভেতরে ঢুকে যেতে নিলো। আয়াজ তখন কানে হেডফোন গুঁজে আঙ্গুল নাচাতে নাচাতে গান শুনছিলো ওকে দেখে কান থেকে একটা হেডফোন খুলে ফেললো। ভিলেনটাইপ হাসি দিয়ে বলল,
~ -আজকে কতক্ষন জুতোপেটা করেছে তোকে?

ইরিন এটমবোমার মত দাঁড়িয়ে আছে। আয়াজ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
~ আমি ভাবছি তোর জন্মদিনে আন্টিকে একজোড়া স্পেশাল বাটা জুতো গিফট করবো! নাম হবে হরিন চপ্পল!
ওটা দিয়ে আন্টি তোকে স্পেশাল স্পেশাল টাইমে স্পেশালভাবে আদর করবে।
~ আম্মা আজকে আমাকে কিচ্ছু করে নি।
~ চাপা মারিস না। আমি জুতোপেটার শব্দ শুনেছি।

আয়াজ আবারও গা জ্বালানো হাসি দিলো। ইরিন তৎক্ষণাৎ রাগে পাশের ফুলের টব থেকে একদলা কাদামাটি নিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আয়াজের গা বরাবর ছুঁড়ে মারলো। কিছুক্ষন আগে পানি দেওয়া হয়েছিলো ফুল গাছে। তাই টবের মাটি ভিজে কাদা হয়ে আছে।
ভেজা কাদামাটিতে আয়াজের টিশার্ট মাখামাখি। ওর হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের ভেতর আরেকদলা কাদামাটি ছুঁড়ে মারতে ইচ্ছে করছে ইরিনের!

রাগে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
~ -বেশি বাড়াবাড়ি করলে এবার সোজা মুখের ভেতর মারবো! আমার টার্গেট মিস হয় না!
আয়াজের মুখটা অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেলো। আগুনদৃষ্টিতে ইরিনের দিকে তাকিয়ে আছে সে, পারলে এক্ষুনি কাঁচা গিলে ফেলবে!
ইরিন বারান্দা থেকে সরে এসে বেডরুমের দরজাটা ভালোভাবে লক করে দিলো। তারপর বাবার ওষুধের বক্স থেকে একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সে।

মনে মনে আন্দাজ করে নিলো সে, একটুপর কি হবে, আয়াজ এসে সুন্দর করে নিজের কৃতকর্মের জন্য ওর কাছ ক্ষমা চাইবে। তারপর যখন ইরিন দরজাটা খুলবে নিজের স্বরূপে ফিরে আসবে। শুরু হবে আসল তুফান!
প্রতিবারই ইরিন জানে এমন কিছু ঘটবে কিন্তু প্রতিবারই সে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু আজকে আয়াজের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত ইরিন। তাই দরজা না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে! দরজা আজকে কিছুতেই খুলবে না!
রাত এগারোটার দিকে ধাক্কাধাক্কির আওয়াজে ইরিনের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘড়িতে চোখ পড়তেই একলাফে উঠে দাঁড়ালো। দরজা খুলতেই মাহমুনা বেগম হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলেন।

ওকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলেন। আয়াজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে প্রচণ্ড বিরক্ত সে।
মায়মুনা বেগম বিলাপ করে বললেন,
~ দরজা খুলছিলি না কেন? আমার কত টেনশন হচ্ছিলো জানিস? তোর বাবা মাহিন কেউ বাসায় নেই। দৌঁড়ে গিয়ে আয়াজকে ডেকে নিয়ে এলাম। ছেলেটা পড়ছিলো, পড়া থেকে তুলে নিয়ে এসেছি! তুই আমাকে এভাবে জ্বালাবি?

ইরিন মায়মুনা বেগমকে শান্ত করে বলল,
~ শরীর খারাপ লাগছিলো তাই একটু শুয়েছিলাম। ঘুম আসছিলো না দেখে বাবার ওষুধের বক্স থেকে একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছি, তাই টের পাই নি। এতকান্নাকাটি করার কি আছে? কান্না থামাও!
মায়মুনা বেগম কিছুক্ষন ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ওর জন্য খাবার আনতে। দুপুরে আসার পর থেকে আর কিছু খায় নি মেয়েটা। আয়াজ এতক্ষণ সোফায় বসে ফোন টিপছিলো।

মায়মুনা বেগম বেরিয়ে গেলে ফট করে ভেতরে ঢুকলো গেলো সে, যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো।
ফট করে ইরিনের খোঁপা করা চুল গুলো টেনে ধরে বলল, এবার কোথায় পালাবি? বেয়াদপ কোথাকার আমার গায়ে কাঁদা ছুঁড়িস? আজকে তোকে টিকটিকির গু খাওয়াবো আমি!
~ মাগো! মাআ, ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো ইরিন।

আয়াজ চুলের গোছাটা আরেকটু শক্ত করে টেনে ধরতেই ইরিন কেঁদে দিলো। তবে ব্যথায় যতটা না কাঁদছে তার চেয়ে বেশি নাটক করছে সে। আয়াজ ধমকে উঠে বলল,
~ এখন কাঁদছিস কেন? আমার গায়ে কাদা ছোড়ার আগে মনে ছিলো না? আমি এমনি এমনি ছেড়ে দেবো?

~ মাফ করে দিন আয়াজ ভাই।
~ আগে মাফ চা!
~ পা ধরে চাইবো না মুখে?

~ বাহ দারূন আইডিয়া দিয়েছিস। চা, পা ধরেই চা!
ইরিন বাধ্য হয়ে আয়াজের পা ধরলো ঠিকই কিন্তু মাফ চাইলো না, আয়াজের পায়ের ওপর একদলা থুথু ফেলে ছুটে পালালো। আয়াজ হতবম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! ঘটনার আকস্মিকতায় ও ‘থ’ বনে গেছে, যেন বর্ষাকালের সবচেয়ে শক্তিশালী বজ্রপাত ওর মাথায় পড়েছে। সে সম্বিত ফিরে পাওয়ার আগেই ইরিন পগারপার! ছুটে রান্নাঘরে মায়ের কাছে ঢুকে গেছে সে।


পর্ব ২

ভয়ে ভয়ে কলিংবেল চাপলো ইরিন। মায়মুনা বেগম ওকে সুপারির জন্য পাঠিয়েছেন আয়াজের মা সোহেলির কাছে। মনে মনে দোয়া পড়ছে ইরিন, আয়াজ যাতে বাসায় না থাকে। যদিও এই সময় আয়াজ বাসায়ই থাকে তবুও আশাতো করাই যায়? কথায় আছে, আশায় বাঁচে ভরসা।
ইরিনের আশায় পানি ঢেলে দিয়ে দরজা খুললো আয়াজ। একহাত ট্রাউজারের পকেটে অন্য হাত দিয়ে দরজার হ্যান্ডেল ধরে রেখেছে সে। ইরিনকে দেখেই চোখ উল্টে ফেললো।

~ আন্টিকে একটু ডাক দিন তো!
গতকালের ঘটনার পর থেকেই ভয়ে ভয়ে আছে ইরিন। আয়াজ ওকে ছেড়ে দেবে না। আয়াজ তেতে উঠে বলল,
~ পারবো না। তুই ডাক!

~ আমি ডাকলে শুনবে না। আপনি ভেতরে গিয়ে ডেকে নিয়ে আসুন আমি অপেক্ষা করছি।
আয়াজ নড়লো না। ভ্রূ জোড়া কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে ইরিনের দিকে চেয়ে রইলো। ইরিন তাড়া দিয়ে বলল,
~ কি হলো যাচ্ছেন না কেন?
~ -আমি কি তোর চাকর? বেয়াদপের মত হুকুম করছিস?

ইরিন ভেতরে ঢুকলো না, আয়াজকে ভেংচি কেটে দরজায় দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে সোহেলি বেগমকে ডাক দিলো। ভেতরে ঢুকার সাহস ওর নেই। ও ভালো করেই জানে ভেতরে ঢুকলে আয়াজ ওর বারোটা বাজিয়ে দেবে। আয়াজ ধমক দিয়ে বলল,
~ এই তুই আমাকে ভেঙ্গালি কেন? জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো একদম, অসভ্য, ফাজিল!

ইরিন তাতে কিছু মনে করলো। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দরজার বাইরে অবস্থান করছে সে। উদ্দেশ্য আয়াজের হাতের নাগালের বাইরে থাকা।
আয়াজ ওর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে দরজার বাইরে বেরিয়ে এলো। ইরিনের ডান হাতটা চেপে ধরে বলল, তুই কি ভেবেছিস তুই ভেতরে না ঢুকলে আমি তোকে ছেড়ে দিবো? তোর কতবড় সাহস তুমি আমার পায়ে ছ্যাপ দেস! কি বিশ্রি গন্ধ! কতদিন ব্রাশ করিস না তুই? ওয়াক থু!
আয়াজ শব্দ করে একদলা থুথু ফেললো ইরিনের পায়ের কাছে। ছিটকে সরে গেলো ইরিন। গা গুলিয়ে বমি আসছে তার।
~ আমাকে ছাড়ুন। বমি আসছে!

~ শুধু শুধু বমি আসবে কেন? কার সাথে অঘটন ঘটিয়েছিস?
~ আপনার থুথু দেখে!, দম বন্ধ করে কথাটা বলল ইরিন।

~ আমার থু থু দেখে মানে? তোর কি মনে হয় আমি তোর মত ব্রাশ না করে থাকি? গন্ধ শুঁকে দেখ এলাচির সুঘ্রাণ বাহির হবে, বিশ্বাস না হলে খেয়ে দেখতে পারিস!
ওয়াক! ওয়াক!, ঘৃনায় নাকমুখ কুঁকে ফেললো ইরিন। পেট থেকে বমি চেপে বেরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে যেন নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে যাবে।
আয়াজ দ্রুত দরজার পাশ থেকে সরে গেলো।

~ খবরদার! দরজায় বমি করলে তোকে আবার খাওয়াবো! যা ভেতরে যা।
ইরিন একছুটে ভেতরে ঢুকে হর-হর করে বেসিন ভর্তি বমি করলো। আয়াজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সরু, সামান্য একটা ব্যাপারে বমি করার কি আছে ওর মাথায় আসছে না। হস্পিটালে কত কাঁটাছেঁড়া দেখেছে ও! কই ও তো এমন করে নি? এই মেয়ে আসলেই ড্রামাবাজ!
মুখভর্তি পানির ঝাপটা দিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লো ইরিন।
~ আপনি একটা খাটাস!

~ কি বললি তুই? আমি খাটাস? তুই খাটাস তোর চৌদ্দগুষ্ঠি খাটাস। ফাজিলের ফাজিল!
আয়াজ একটু থেমে আবারও কড়া ধমক দিয়ে বলল,
~ তোর কি মনে হয় আমি তোর ছোট? এই চোখ নামা! নামা বলছি!

ইরিন তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেললো। বখাটে-টার সাথে কথা বলাই বেকার, দ্রুত ভেতরে পা বাড়ালো। আয়াজের মা মানুষ হিসেবে খুবই ভালো। সরল সোজা। ইরিনকে যথেষ্ট স্নেহ করেন তিনি। উনাদের বাসার সবাই-ই ভালো। কেবল আয়াজ ছাড়া। বদের হাড্ডি এই ছেলে! ইরিন সোহেলির কাছ থেকে সুপারি নিয়ে বেরোনোর সময় আয়াজ ওর কানের তালা ফাটিয়ে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করলো।

ইরিন বাসায় ঢুকে রাগে সুপারির থালাটা মায়মুনা বেগমের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।
~ – আর কোনদিন আমাকে তুমি ঐ গুন্ডাটার বাসায় পাঠাবা না!
~ কে গুন্ডা?
~ তুমি জানো না কে?

মায়মুনা বেগম সুপারির থালা নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে গেলেন। আয়াজের সাথে ইরিনের সাপে-নেউলে সম্পর্ক উনি ভালো করেই জানেন। উনার ধারনা ইরিন ইচ্ছে করে আয়াজের সাথে ঝগড়া করতে যায়। এই মেয়ের ধাঁচ ভালো না। বেয়াড়া জাতের মেয়ে। আয়াজ ঠিক কাজই করে একে টাইট দিয়ে। তিনি একা আর কত সামলাবেন? মেয়ের বাবার তো কোন হুঁশই নেই। আদর দিয়ে দিয়ে বাদর বানিয়েছে।
ইরিন রাগে মাহিনের গালে ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিলো। ও না থাকাতেই ইরিনকে আয়াজের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

~ কাজের সময় হাওয়া হয়ে যাস না? কই ছিলি? আব্বারে বলে তোর পায়ের নালা যদি না ভাঙ্গি আমার নামও ইরিন না। বেয়াদপ একটা, সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় টৈ টৈ!
মাহিন গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কাঁদোকাঁদো চেহারা! ইরিন আয়াজ ভাইয়ের ওপর রাগ ওর ওপর ঝেড়েছে! অন্য সময় হলে সে নিজেও দুইএকটা কিল বসিয়ে দিতো ইরিনের পিঠে কিন্তু আজকে লক্ষন ভালো না। ইরিন ক্ষেপে আছে তাই ওকে আর চটালো না সে।

পরেরদিন বারান্দা থেকে কলেজের ড্রেস আনতে গিয়ে ইরিনের মেজাজ বিগড়ে গেলো। কত কষ্ট করে ঘষে ঘষে গতকাল সে ড্রেসটা ধুয়ে দিয়েছিলো। এখন সাদা জামায় ছোপ ছোপ নীল রংয়ের দাগ! কলমের কালি মনে হচ্ছে।

আয়াজ বারান্দায় বসে পড়ছে! সকাল বেলা বারান্দায় বসে কিছু সময় পড়াশোনা করা ওর অভ্যেস!
ইরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে চিৎকার দিলো।
~ আম্মায়ায়ায়ায়া!
মায়মুনা বেগম প্রায় ছুটে বারান্দায় এলেন। আয়াজ আগের মতই বসে আছে, যেন শুনতেই পায় নি। ইরিন বলল,
~ আমার জামায় রঙ লাগলো কীভাবে? আমি কালকে দুইঘন্টাযাবত কলেজ ড্রেস ধুয়েছি!
~ তুই এইজন্য এভাবে চিৎকার করবি? আমি তো ভাবলাম ডাকাত পড়ছে।

ইরিন কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল, আমি কলেজ যাবো কীভাবে?
~ ধোয়ার সময় খেয়াল করবি না? সাদা জামা সময় আলাদা ভেজাবি। রঙ্গিন জামাকাপড়ের সাথে দিলে তো এমন হবেই!
ইরিন ভালো করেই জানে কাজটা কে করেছে? জামাটা ছুঁড়ে ফেলে বলল, জ্ঞান দিও না তো। অসহ্য লাগছে।
বারান্দা থেকে ভেতরে ঢোকার সময় আয়াজের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সে। ‘এর মানে আমি তোমাকে দেখে নেবো। ‘

আয়াজ বই বন্ধ করে গুনগুন করলো,
~ শাখে শাখে পাখি ডাকে
কত সোভা চারপাশে
আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!

পরেরদিন সকালবেলা ইরিন কলেজের জন্য বেরোচ্ছিলো। লিফট এর কাছে আয়াজ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বই। ওর পরনে একটা সাদা টি-শার্ট। টি-শার্টের ওপর কালো নীল চেকশার্ট পরেছে সে! শার্টের সবগুলো বোতামই খোলা, হাতে কালো বেল্টের ঘড়ি, সাথে কালো জিন্স আর পায়ে বেল্টওয়ালা জুতো, কাধে ব্যাগ ঝোলানো। দারুণ স্মার্ট লাগছে। ইরিন মুগ্ধ চোখে একপলক তাকালো। তবে ওর মনে অন্য প্ল্যান চলছে। মনে মনে ধারনা করে নিলো সে নিশ্চই আজকে পরীক্ষা আছে মহাশয়ের। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
~ কোথায় যাচ্ছেন আয়াজ ভাইয়া?

মুড ভালো থাকলে ইরিন আয়াজকে ভাইয়া বলে ডাকে। এইমুহূর্তে আয়াজের পড়ায় ডিস্টার্ব করবে সে। সো এখন তার মুড ভালো। আয়াজ জবাব দিলো না। লিফট এর দরজা খুলে গেছে। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে গেলো সে। ইরিন দাঁতমুখ খিঁচে ওকে একটা ভেংচি কাটলো। অবশ্যই সেটা আয়াজের অলক্ষে। তারপর ভেতরে ঢুকলো।
~ এত সকাল সকাল বই নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন আয়াজ ভাইয়া?
~ বিলাতে যাই!
যাবি?

~ আপনার কি আজকে পরীক্ষা?
~ নাতো। আমাদের কলেজে আজকে নাচের প্রতিযোগিতা হচ্ছে আমি নাচতে যাচ্ছি।
~ আপনি নাচ জানেন?

~ দেখ ইরিন আমার তো আর তোর মত রঙ তামাসা করে বেড়ালে দিন যাবে না! আমার সামনে ফাইনাল প্রফ! পড়াশোনা করতে হবে। সো প্লিজ তোর মুখটা বন্ধ রাখ। আমার হাত কিন্তু নিশপিশ করছে।
~ আমি রং তামাসা করি?
~ আবার কথা বলে?

~ আপনি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর না দেন তাহলে আমি চুপ করবো না।
লিফট থেকে বেরোলো দুজন। আয়াজ বেরিয়ে গাড়িতে উঠলো। ইরিন গাড়ির দরজার টোকা দিয়ে বলল,
~ আমাকে লিফট দিতে পারবেন? আসলে আজকে একটু তাড়া আছে।
~ তুই বকবক করবি না তো?
~ একদম না।

~ ওঠ!
ইরিন সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে গাড়িতে উঠেছে। ওর ইউনিফর্ম এ কালিমা লেপনের শাস্তি আয়াজকে দেবে সে। কিছুদূর যাওয়ার পর মিন মিন করে বলল,
~ আপনার কি সত্যিই মনে হয় আমি রঙ তামাসা করি?
~ করিস না? তোর সাজগোজ দেখলে তো মনে হয় যেন পড়ালেখা শিখতে যাস না প্রেম করতে যাস! বাই দ্যা ওয়ে তুই যে আমাকে জ্বালাতন করতে গাড়িতে উঠেছিস তা আমি ভালো করেই জানি। সুতরাং এবার তুই মুখ বন্ধ না করলে আমি তোর চুলে সুপারগ্ল্যু লাগিয়ে দেবো। নিজের তো পড়ালেখা নাই, আরেকজনকে ডিস্টার্ব করিস!

আয়াজ সত্যি সত্যি ব্যাগ থেকে একটা গ্ল্যু-স্টিক বের করলো। সেদিন কলেজ থেকে বাসায় ফেরার সময় ওর জুতো ছিঁড়ে গিয়েছিলো। জুতোর তলা জোড়া লাগানোর জন্যই কলেজের সামনের দোকান থেকে গ্ল্যু-স্টিকটা সে কিনেছিলো। লাগানো শেষে বুদ্ধি করে ব্যাগে রেখে দিয়েছিলো। তা না হলে ইরিনকে এত সহজে দমানো যেত না। ইরিন হাঁ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আয়াজের বিশ্বাস নেই। সত্যি সত্যি যদি লাগিয়ে দেয়। চুপ করে গেলো যে। আয়াজ আবার বইয়ে মনোযোগ দিলো।


পর্ব ৩

পরীক্ষার সময়টুকু আয়াজ হোস্টেলেই ছিলো। পরীক্ষা গতকাল শেষ হয়েছে। এবার দুমাসের লম্বা বন্ধ।
কিন্তু আরাম করার সময় নেই, বিসিএস এর প্রিপারেশন নিতে হবে ওকে।

বই পত্র নিয়ে হোস্টেল থেকে সোজা বাসায় এসে হাজির হলো সে। রেজাল্টের আগ পর্যন্ত বাসায় থেকে পড়াশোনা করবে।
ইরিন খবর পেয়েছে আয়াজ বাসায় এসেছে। রোজ সকাল বিকাল দুবার নিয়ম করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় সে। আয়াজ ছাড়া তার দিনগুলো কেমন যেন পানসে মনে হচ্ছে।

কোন কোন দিন আয়াজের অপেক্ষায় দুপুরেও বারান্দায় বসে থাকে সে। কিন্তু আয়াজের দেখা নেই।
মায়মুনা বেগম প্রায়ই সোহেলির সাথে গল্পগুজব করে আসে,

ইরিন লজ্জায় কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না, পাছে মা যদি কিছু সন্দেহ করে বসে? কোন ভাবে যদি আয়াজ জেনে যায়? ছি! ছি! আয়াজ তো ওকে নিয়ে দারূণ মশকরা জুড়ে দেবে। এই ভয়ে সে কিছুই জিজ্ঞেস করলো না।
প্রায় একসপ্তাহ পর, দুপুরবেলা ডাটা অন করতেই ফেইসবুকে আয়াজ স্টাটাস:
আলহামদুলিল্লাহ! ফাইনাল প্রফ পাশ করলাম।

কমেন্ট সেকশনে শুভেচ্ছার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ইরিন ফোন হাতে নিয়ে ভাবছে, তারমানে আয়াজের রেজাল্ট বেরিয়েছে, আজকে নিশ্চই বাসায় আছে সে। ইরিন ডাটা অফ করে ফোনটা বিছানায় ওপর রাখলো, বারান্দায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিলো। বারান্দার দরজা খোলা। বারান্দায় কেউ নেই। ভেতর থেকে চিল্লাচিল্লির আওয়াজ আসছে। এত বড় একটা খুশির খবর হেলাল সাহেব বেশ জাঁকজমকভাবে সেলিব্রেট করছেন। ঘরভর্তি মেহমান। আয়াজের বোনেরা এসেছে।
বারান্দায় অনেক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো ইরিন, কেউ এলো না। মনটা খারাপ করে বারান্দা থেকে সরে এলো। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমে তলিয়ে পড়লো।
ঘুম ভাংলো আয়াজের বোনঝি তুতুরীর ডাকে। ওর হাতে ধরে টানাটানি করছে ছয়বছরের ছোট্ট তুতুরী।
ইরিন উঠে বসতেই বলল, ইরি তোমাকে মা আমাদের বাসায় ডাকছে।

~ কেন সোনা?
তুতুরী বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বললো, ছোটমামা ফার্স্ট হয়েছে, বাসায় অনেক মেহমান।
~ তোমার ছোট মামা বাসায় আছেন?

~ না মামা বাইরে।
ইরিন বুঝতে পারছে না ওকে কেন ডাকা হয়েছে? খাট থেকে নেমে মাথা আঁচড়ে ভালো করে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিলো।
তারপর তুতুরীকে নিয়ে আয়াজদের বাসায় ঢুকলো।

আয়াজদের ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেলো ইরিন।
হেলাল সাহেব, মায়মুনা বেগম, সোহেলি বেগম ইরিনের বাবা এমনকি ইরিনের ছোট খালুও আছেন।
কিছু একটা নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করছিলেন তারা ইরিনকে দেখে কিছুক্ষনের জন্য আলোচনা থামিয়ে দিলেন। ইরিন ড্রয়িংরুম পেরোতেই আবার আলোচনা শুরু হলো।

ইরিনের মাথায় আসছে না হঠাৎ কি উনারা এত জরুরী আলাপ করছেন। মায়মুনা এবং এবং ইরিনের বাবা নাহয় আয়াজের ভাইয়ের খবর পেয়ে এসেছে কিন্তু ছোট খালু? উনি এখানে কি করছেন?

আয়াজের বড়বোন রেশমি এসে ইরিনের হাত ধরে ভেতরে টেনে নিয়ে গেলো।
~ কি রে তোর তো দেখাই পাওয়া যায় না। আমি এসেছি একসপ্তাহের মত হলো একবারও বাসায় এলি না। কি নিয়ে এত ব্যস্ত তুই?
~ আসলে সামনে ফাইনাল পরীক্ষা তাই সময় পাই না। সারাদিন টিউশন তারপর রাতে পড়াশোনা।
~ আয়াজের খবর শুনেছিস?

জরিন ফেইসবুকে আয়াজের পোস্ট দেখার বিষয়টা চেপে গেলো।
~ না তো?

~ ওর ফাইনাল প্রফের রেজাল্ট বেরিয়েছে। এবারও প্লেস করেছে। রাষ্ট্রপতি থেকে পদক আনবে!
ইরিন হালকা হাসলো। আয়াজ বাসায় নেই। বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বেরিয়েছে। ইরিন ওর ঘরে খাটের ওপর বসে রেশমির সাথে গল্প করছলো এমন সময় আয়াজ এই মাত্র বাসায় এসে ঢুকলো। হাতে ঠাণ্ডা পানির বোতল। বোতলের মুখেই ঢক-ঢক করে পানি খেলো সে। রোদের তাপে মুখ লাল হয়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে গাড়ি ব্যবহার করে না সে। হেলাল সাহেবই বেশিরভাগ সময় গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি করেন।

ইরিন খাট থেকে নেমে গেলো। রেশমি গেলো আয়াজের জন্য শরবত আনতে। আজকে সকালেই হেলাল সাহেব বেল এনেছেন। বেলের শরবত বানিয়ে আয়াজের জন্য রেখে দিয়েছে সে। আয়াজ শার্টের সামনের দুটো বোতাম খুলেই ফ্যানের নিচ বরাবর বসলো।

রেশমি হাতে করে বেলের শরবত নিয়ে ফিরলো। আয়াজ একটানে পুরোটা শেষ করে করে বলল, হরিণ কে মিষ্টি দিয়েছিস?
~ ওর তো দেখাই পাওয়া যায় না। তুতুরী কে পাঠিয়ে মাত্র ডেকে এনেছি। দাঁড়া আমি মিষ্টি নিয়ে আসছি।
রেশমি চলে গেলে আয়াজ শার্টের আরো দুটো বোতাম খুলে দিল।

ইরিনের হৃদপিন্ডটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো! এটা কেমন অসভ্যতা? রুমে যে একটা মেয়ে আছে সেই খেয়ালতো আয়াজের রাখা উচিৎ?
আয়াজ লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। পা দুটো বাইরে ঝুলছে। চুলে আঙ্গুল বোলাচ্ছে সে। পকেট থেকে ফোন বের করে ডাটা অন করলো। ফোন থেকে মুখ না তুলেই ইরিনকে ডাক দিলো,
~ এদিকে আয় তো ইরিন?

ইরিনের হাত পা কাঁপছে। এইমুহূর্তে কিছুতেই আয়াজের সামনে যেতে পারবে না। অস্বস্তি লাগছে তার।
আয়াজ আবারও ডাক দিলো।

ইরিন ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই বলল, আমার পায়ের কাছে তোষকের নিচে চাবির গোছা আছে। বের কর!
দ্রত আয়াজের কাছ থেকে সরে এসে চাবির গোছাটা বের করলো সে।
~ আলমারিতে মাঝের সারিতে দেখবি র‍্যাপিং করা একটা প্যাকেট আছে, নিয়ে আয় তো।
গোলাপি রংয়ের প্যাকেটটা নিয়ে আসতেই বলল, খোল!
~ আমি?
~ হ্যাঁ, তুই!

ইরিন র‍্যাপটা খুলতেই ভেতরে হলুদ রংয়ের আরেকটা। ওটা খুলতেই লাল রংয়ের আরেকটা। এভাবে প্রায় পাঁচটা র‍্যাপ খোলার পর অবশেষে নীল রংয়ের একটা জামদানী শাড়ি পেলো।

ইরিন শাড়িটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলো। নীল রংয়ের ভেতরে ভেতরে সিলভার কালারের প্রিন্ট! বেশ সুন্দর!
আয়াজ বিরক্ত কন্ঠে বলল,
~ ভাঁজ নষ্ট করছিস কেন?
ইরিন সাথে সাথে হাত সরিয়ে নিলো।

~ কেমন হয়েছে?
~ কার জন্য এটা?
~ যার জন্যই হোক তুই আগে বল কেমন হয়েছে?
~ ভালো।
আয়াজ ভ্রু কুঁচকে ফেললো।

~ শুধু ভালো?
~ খুব সুন্দর!
~ শিলাকে মানাবে?
ইরিন অবাক হয়ে বলল, কোন শিলা?

~ আমার গার্লফ্রেন্ড!
ইরিন মুখ ভেংচি কাটলো। এর মানে, ‘আমি বিশ্বাস করি নি। ‘ আয়াজ হেসে উঠে বলল,
~ আমার বান্ধবী শিলা! গতবার রেজাল্ট বেরোবার পর আমাদের বাসায় এসেছিলো, দেখিস নি? সেবার বলেছিলো ফাইনাল প্রফে ফার্স্ট হলে ওকে একটা নীল জামদানী কিনে দিতে হবে, দেবো বলেছিলাম। এলেই তো ধরবে।

~ ওহ!
~ তুই কি ভেবেছিস তোর জন্য? তোকে আমি শাড়ি দিতে যাবো কোন দুঃখে? তুই কি আমার বউ না বান্ধবী?
আয়াজ আবারও সেই ভিলেনটাইপ হাসি দিচ্ছে।

ইরিনের রাগ লাগছে। আয়াজের চুলগুলো টেনে ধরে ওর নাক বরাবর কামড় বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নিজেকে শান্ত করে বলল,
~ র‍্যাপিং খুললেন যে?
~ তো কি হয়েছে? তুই আবার করে দিবি।
~ আমি পারবো না।
~ কেন পারবি না কেন?

~ আমি র‍্যাপিং করতে পারি না। আপনার বান্ধবী আপনি করুন।
~ তুই পারবি তোর ঘাড় পারবে। খুলেছিস এখন ঠিক করতে পারবি না?
~ আমি কি নিজে থেকে খুলেছি নাকি? আপনি বলেছেন তাই খুলেছি।
~ হ্যাঁ তো এখন আমি বলছি তাই আবার র‍্যাপিং করে দিবি।
ইরিন দৃঢ় গলায় বলল, আমি পারবো না।

কত বড় খারাপ মানুষ, ওর হাত দিয়ে র‍্যাপিং খুলিয়ে এখন বলছে বান্ধবীর জন্য, ছোটলোক!
আয়াজ শাড়িটা র‍্যাপ সহ দলামোচড়া করে সাইডে রেখে দিয়ে বলল, আচ্ছা থাক, লাগবে না!
রেশমি এতক্ষনে মিষ্টি নিয়ে ঢুকলো। লাজুক হেসে বললেন,

~ তোকে অনেক্ষন বসিয়ে রাখলাম। ড্রয়িংরুমে মহসিনের বিয়ের কথা হচ্ছে, তোর ছোট খালার মেয়ে মুক্তার সাথে। আমাদের সবার বেশ পছন্দ হয়েছে।
মহসিন আয়াজের বড় ভাই। পেশায় ব্যাংকার। আয়াজারের চার বছরের বড় সে। কয়েকমাস যাবত তার জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিলো। অবশেষে ইরিনের খালাতো বোন মুক্তাকে পছন্দ হয়েছে সবার। মুক্তা সোশিয়লজি তে অনার্স কমপ্লিট করে আপাতত ফ্রি আছে। মাস্টার্সের ভর্তি এখনো শুরু হয় নি। এর মাঝেই বিয়ের ফুল ফুটে গেলো। ইরিনের এতক্ষনে মাথায় ঢুকলো কেন ওর ছোটখালু আয়াজদের বাসায় এসেছেন।

রেশমি মিষ্টির প্লেট থেকে একটা মিষ্টি ইরিনের মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, দুপুরে আমাদের সাথে খাবি! ঠিক আছে? আমি যাই, ওদিকে কি কথা হয় শুনে আসি।
রেশমি চলে যেতেই আয়াজ বলল, বাবা আর মেয়ে পেলো না?

~ কেন কি হয়েছে?
~ তোর খালাতো বোনগুলা একটাও সুবিধের না। দুনিয়ার সব ছেলে তাদের চেনা। এইটা কেমন কে জানে? আমার সরল সোজা ভাইটার কি হবে বুঝেছিস? এই তুই কি ওদেরকে দেখে দেখে এমন ঢং করা শিখেছিস তাই না? সবসময় এত সেজেগুজে থাকিস কেন?

ছোটবেলা থেকেই ইরিনের সাজগোজের প্রচুর শখ। বড় হয়েও সেই অভ্যেস তেমন বদলায় নি। দিনের বেশিরভাগ সময়ই পরিপাটি হয়ে থাকে সে। গোসল করে রোজ কাজল দেয়, প্রায়ই দিনই তার হাতে রেশমি চুড়ি দেখা যায়। কখনো কখনো ঠোঁটে হালকা কালারের লিপস্টিক দেওয়া হয়। ছোটবেলায় আয়াজ প্রায়ই ওর চুল নষ্ট করে দিতো অথবা হাতের চুড়ি ভেঙ্গে দিতো। আয়াজ যে তখন একেবারে ছোট ছিলো তাই না। ইরিনের থেকে গুনেগুনে পাচবছরের বড় সে। তবুও ইরিনের সাথে খোঁচাখুঁচি করতে তার ভালো লাগে। তবে এর জন্য বহুত মাশুলও দিতে হয়েছে তাকে। মারামারির সময় ইরিন প্রায়ই ব্যথা পাওয়ার ভান করে বড়দের কাছ থেকে সিমপ্যাথি গেইন করেছে। যার ফলাফল স্বরূপ আয়াজকে নানারকম কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হতো। শাস্তির বেশিরভাগই আয়াজের মা সোহেলির নির্ধারিত। ইরিনকে অত্যাধিক স্নেহ করার ফলে ইরিনের সামান্য নেকামিপনাতে আয়াজের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতেন তিনি।

ইরিন আয়াজের কথার জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলো। আয়াজ আবারও খোঁচা মেরে বলল,
~ সত্যি করে বলতো, ভাইয়ার সাথে যার বিয়ে হয়েছে তাকে নিয়ে আবার সিনেপ্লেক্সে ঘোরাঘুরি করিস নি তো? পরে যদি আমি জানতে পারি তোর অবস্থা কিন্তু খারাপ করে দেবো?

~ না যাই নি।
~ সে তোকে নিয়ে গিয়েছে? তুই আবার চুপিচুপি এসব করে বেড়াচ্ছিস না তো?
মুনা আর ইরিন রাশেদের সাথে সিনেপ্লেক্সে ধরা খাওয়ার পর থেকেই আয়াজের খোঁটা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। এই নিয়ে হাজারবারের ওপর খোঁটা দেওয়া হয়ে গেছে তার। ইরিনের চোখমুখ লাল হয়ে ফেললো। আয়াজের চুলের গোছা চেপে ধরে টান মারলো সে। আয়াজ ব্যথায় মুখ বাঁকিয়ে ফেলেছে। ইরিন আরো জোরে টান দিয়ে বলল,
~ বলবেন আর অসভ্য কথা?
~ ইরিনের বাচ্চা হরিণ ছাড় বলছি।

~ আগে বলুন আর এইসব অসভ্য কথা বলবেন?
আয়াজ উঠে বসে ইরিনের হাত থেকে নিজের চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
~ ভদ্রঘরের মেয়েরা এভাবে পরপুরুষের সাথে মারামারি করে না ইরিন। দোজখের বাসিন্দা হবি তুই। সাতটা দোজখের সবচেয়ে খারাপ দোজখে যাবি, ছাড়! ছাড় আমার চুল।

অনেক কষ্টে ইরিনের কাছ থেকে নিজের চুল ছাড়িয়ে নিলো আয়াজ। ঠোঁট উলটে চুলে আঙ্গুল বোলাচ্ছে সে। তার এত সাধের হেয়ারস্টাইল এই মেয়ে নষ্ট করে দিলো।
ছোটবেলা থেকেই ওদের এই মারামারিতে আয়াজই ঝগড়া করেছে বেশি। ইচ্ছে করে অকারণে ইরিনের সাথে ঝগড়া বাধিয়েছে সে। ইরিন খুব সহজে রাগে না। কিন্তু সে রাগলে আয়াজ তখন চুপ হয়ে যায়।
~ আমার এত সাধের হেয়ারস্টাইলের বারোটা বাজিয়ে দিলি তুই!
~ আপনি আমাকে অপমান করছেন কেন?

~ ইহ্, দিবো কানের নিচে একটা! অপমান দেখাতে আসছে আমাকে? কলেজ ফাঁকি দিয়ে যখন বাইরে ঘোরাঘুরি করিস তখন অপমান কোথায় যায়? আমি কিছু বললেই দোষ? আমার কানে সব খবরই আসে!
তেড়ে এলো ইরিন। আয়াজ দুহাত উঁচিয়ে সাবধান করে বলল,
~ গায়ের জোরে তুই আমার সাথে পারবি? তুলে এমন একটা আছাড় দেবো যে এখানেই হিসু করে দিবি!

~ আপনি একটা অসভ্য, বদ!
~ কি বললি? আমি অসভ্য? যাদের জন্য এত সাজুগুজু করে কলেজে যাস তারা?
~ আমি কিন্তু চিৎকার দিবো আয়াজ ভাই। সবাইকে ডেকে বলবো আপনি আমার সাথে অসভ্যতা করছেন।
ঠাস করে ওর গালে একচড় বসিয়ে দিলো আয়াজ।

~ ফাজিলের ফাজিল! সিনেমা পেয়েছিস?
তারপর ইরিনের কন্ঠস্বর অনুকরণ করে বলল,
~ আমি কিন্তু এবার চিৎকার দিবো আয়াজ ভাই। দে! দেখি তোর গলায় কত জোর?

ইরিন গালে হাত দিয়ে হতবম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা চক্কর দিচ্ছে। থাপ্পড় খেয়ে রাগে লাল হয়ে গেলো সে। আয়াজের পাশে রেখে দেওয়া শাড়িটা নিচে ফেলে ইচ্ছে মত পা দিয়ে পিষলো যেন আয়াজকে পিষছে। আয়াজ স্থির দৃষ্টিতে ওর কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করছে। ইরিন শাড়িটা তুলে ঘোমটার মত করে আয়াজের মাথায় পড়িয়ে দিয়ে একদৌঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। পেছন থেকে আয়াজ চেঁচিয়ে উঠে বলল,
~ এই ইরিনের বাচ্চা দাঁড়া! আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন।

পর্ব ৪

ইরিনের সাথে তুমুল ঝগড়া হয়েছে আয়াজের। প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় ইংরেজীতে ত্রিশ পেয়েছে ইরিন। মায়মুনা বেগম আয়াজকে ডেকে নিয়ে বিচার দিয়েছেন। বর্তমানে ডাইনিং এর পাশে ওয়াশরুমে ঢুকে মেঝেতে থম মেরে বসে আছে ইরিন। এই মুহূর্তেই ওর বুক ফেটে কান্না আসার কথা কিন্তু আসছে না। আয়াজ তাকে প্রচুর ধমকাধমকি করেছে। মায়মুনা বেগম সেই সাথে তাল দিয়েছেন।

মূলত তিনি ইরিনের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চাইছিলেন। যেই মেয়ে ইংরেজীতে তেত্রিশ পেয়ে পাশ করতে পারে না তাকে পড়িয়ে লাভ কি হবে? আয়াজ বুদ্ধি করে ইরিনকে বকাবকি করার ফলেই তিনি আর বেশি কিছু বলতে পারছেন না। কিন্তু সেইটুকু বোঝার মত জ্ঞান ইরিনের নেই। তার ধারনা আয়াজ সুযোগ বুঝে পুরোনো সব রাগ তার ওপর ঝেড়ে ফেলেছে। তাই আয়াজের মুখের ওপর দরজায় বাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে আসছিলো সে, কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখন, যখন দেখলো আয়াজ ওর পেছনে দাঁড়িয়েছিলো। দড়াম করে দরজার বাড়ি লাগলো আয়াজের কপালে। কপাল ফুলে আলু হয়ে গেছে। ইরিন ভয়ে তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম ঢুকে যায়। সেই থেকে বিগত পনেরো মিনিট যাবত ওয়াশরুমে বসে আছে।

দুম করে ওয়াশরুমের দরজায় বাড়ি মারলো। আয়াজ। ইরিন সাড়া দিলো না।
~ ~ ইরিন দরজা খোল, কথা আছে তোর সাথে!
অনবরত দরজায় বাড়ি মেরে যাচ্ছে আয়াজ। অনেক্ষন বাদে ইরিন দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। মুখ বাকিয়ে বলল, কি হলো আয়াজ ভাই? আপনি ওয়াশরুমে যাবেন? আমার হয়ে গেছে আপনি যেতে পারেন।

ইরিনের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে একটু আগে কিছুই হয় নি। আয়াজ অগ্নিকন্ঠে বলল,
~ আমার কপালের কি অবস্থা করেছিস দেখেছিস, তারপরেও আবার উলটো রাগ দেখাচ্ছিস? কি রে তুই? দেখি সর আমি মাথায় পানি ঢালবো। মাথা ঘুরছে।
কপালের অবস্থা দেখে ইরিনের খাপার লাগছে। সত্যিই ফুলে আলু হয়ে গেছে। হাতের তালু দিতে কপাল চেপে দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ। ফর্সা না লাল হয়ে গেছে।
~ কি হলো? সর?
~ আমি কি আপনার মাথায় পানি ঢেলে দেবো?

~ লাগবে না। তুই সর আমি ঢালছি।
~ কেন আমি ঢাললে কি সমস্যা?
~ কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমি তোর হাতে পানি ঢালবো না। আমার ইচ্ছে। তুই সর আমার সামনে থেকে।
~ আমি ঢালি না?

~ ইরিন সামনে থেকে সর।
ইরিনের রাগ উঠে গেলো। সে পানি ঢাললে সমস্যাটা কোথায়? ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
~ ভালো ছাত্র হয়েছেন বলে মাটিতে পা পড়ে না তাই না? অন্যদের মানুষ মনে হয় না?
আয়াজ অবাক হয়ে বলল,
~ তোকে আমি কি করেছি?

~ আপনি আমাকে এতগুলো কথা শোনালেন কেন? আমি আপনার খাই না পরি?
আয়াজ চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে, ইরিনের কথা গুলো যতটা না ওর কানে লাগছে তার চেয়ে বেশি অন্য কোথাও লাগছে! কতবড় বড় অসভ্য এই মেয়ে!
~ কি বললি তুই? আবার বল কি বলেছিস? এখন কথা বলছিস না কেন? তুই ভুল করলে আমি তোকে শুধরে দিতে পারবো না?
ইরিন এবার আর একফোঁটাও জবাব দিলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আয়াজের কষ্ট লাগছে। ইরিন তাকে এতবড় কথা বললো কি করে? সে কি ইরিনের খারাপ চায়? দাঁতেদাঁত চেপে বলল,

~ লজ্জা থাকলে আমাকে এই কথা গুলো বলতি না তুই! ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষায় যখন ইংরেজীতে ফেল করেছিলি মনে আছে? তখন তোর আম্মাজান শ্রদ্ধেয় মায়মুনা বেগম এসে আমার হাতে পায়ে ধরেছিলো, তোকে পড়ানোর জন্য। গাধার মত খেটেছি তিনমাস! যেই মেয়ে ইংরেজীতে তেরো পায় সেই মেয়ে ঊননব্বই পেয়ে পাস কারছে কার জন্য? একটা কানা কড়ি দিয়েছিস? তুই এখন আমার সাথে মুড নিয়ে কথা বলিস? যা সর আমার চোখের সামনে থেকে।
~ আপনি আমাকে টাকার খোঁটা দিয়েছেন?

ছলছল চোখে প্রশ্নটা করলো ইরিন। ওর চোখের পানি দেখে আয়াজের রাগ কমে গেলো। শীতল কন্ঠে বলল,
~ হ্যাঁ দিয়েছি। ইটের জবাব পাটকেলে না দিলে হয় না। তুই আমাকে হার্ট করেছিস তাই আমিও তোকে হার্ট করেছি। এবার সর!
~ আপনি জানেন আপনি খুব খারাপ এবং জঘন্য প্রকৃতির একজন লোক? আমি আপনাকে বদদোয়া দিচ্ছি আপনি জীবনে শান্তি পাবেন না। দুনিয়ার সব কষ্ট আল্লাহ আপনাকে দিবেন। আপনার বউয়ের ডেলিভারির সময় যেন পেইন আপনার উঠবে! আপনি তখন ব্যথায় ছটফট করতে করতে নিজের গালে নিজে চড় বসাবেন, মাথার চুল ছিঁড়ে টাক হয়ে যাবেন।

~ শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। আর শোন, পারলে পড়াশোনা করে দেখিয়ে দে। এসব ফালতু রাগ দেখিয়ে কোন লাভ নেই।
আয়াজ ঠাস করে ইরিনের নাকের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো। পানির কল চালু করে মাথায় পানি দিলো সে। তার মাথাটা ঘুরছে। ইরিনের কথা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। ঠাস করে ইরিনের গালে একটা চড় বসাতে ইচ্ছে করছে তার। মাথা ফাটিয়ে দিয়েও শান্তি হয় নি ফাজিল মেয়েটার। উল্টোপাল্টা কি সব জঘন্য বদদোয়া করে গেছে তার জন্য। বদ মেয়ে!
এদিকে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো ইরিন। এখন থেকে জানপ্রাণ লাগিয়ে পড়াশোনা করবে সে। আর কোনরকম ফাঁকিবাজি করবে না। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে।

সেদিনের পর থেকে আয়াজদের বাসার ত্রিসীমানায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ইরিন। বারান্দায় দাঁড়ানোও পুরোপুরি বন্ধ। আয়াজের ইন্টার্নি শুরু হয়ে গেছে। সে ব্যস্ত তার হস্পিটাল, ডিউটি, বিসিএস এর প্রিপারেশন, এসব নিয়ে।
তার প্রায় তিনমাসপর আয়াজের বড় ভাই মহসিন এর বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো ইরিনের খালাতো বোন মুক্তার সাথে। মুখে না বললেও এতগুলো দিন আয়াজকে খুব মিস করেছে সে। একধরনের শূন্যতা অনুভব করেছে।

হলুদের দিন পুরো এপার্টমেন্ট আলোতে ঝলমল করছে। মরিচ বাতি দিয়ে পুরো বিল্ডিং সাজানো হয়েছে। বাড়ির সামনে রাস্তা পর্যন্ত লাইটিং করা হয়েছে। মামীরা, খালামনিরা কাজিনরা সব এক হয়েছে। সবাই একজোট হয়ে গল্পগুজব, হাসি ঠাট্টাতে মজে আছে। ইরিন এসবের কিছুতে যোগ দিলো না।
নেক্সট মান্থে ওর ফাইনাল পরীক্ষা। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে।

ওর পড়ার রুমে কারো ঢোকা নিষেধ। দরজা আটকে ধুমছে পড়াশোনা করছে সে। পানি খাওয়ার জন্য ডাইনিং এ আসতেই আয়াদের গলার আওয়াজ পেয়ে থমকে গেলো। আজকেই এসেছে আয়াজ। ইরিনের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ আওয়াজ শুরু হয়ে গেলো। হাতের গ্লাসটা কাঁপছে। দ্রুত হেঁটে সেখান থেকে সরে গেলো সে। রুমের এসে ভালোকরে দরজাটা লক করে দিলো। বই নিয়ে পড়তে বসে গেলো। কিন্তু পড়ায় মন বসছে না, বসার কথাও না। আজ কতদিন পর মানুষটার গলা শুনেছে সে! কতদিন পর!

ইরিন ঘরের বন্ধ দরজায় অনবরত নক করছে মুনা! ইরিন বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকতে দিলো। মুনা কোন কথাবার্তা ছাড়া খাটের নিচ থেকে একজোড়া নারকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলো। দরজার বাইরে আয়াজ দাঁড়িয়ে ছিলো। ইরিন খেয়াল করে নি। দরজা আটকানোর সময় চোখে চোখ পড়ে গেলো। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইরিনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো,
~ আপনি?

~ কি অবস্থা তোর? পড়াশোনা ঠিক মত করছিস?
~ সেটা জেনে আপনার কি দরজার?

আয়াজ হাসলো। মায়মুনা বেগমের কাছ থেকে সব খবরই পেয়েছে সে। ইরিন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে। খবরটা শুনে আয়াজের ভালো লাগছে, ওর ওপর জেদ করে হলেও পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে ইরিন। ইরিন ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
~ এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
~ ভাবছি। তুই সত্যি সত্যি পড়াশোনা করছিস কি না কে জানে? নাকি ভাব ধরে বসে আছিস?
~ আপনি যান, বেরোন।

~ যাবো না। দেখি ঠেলে বের করতে পারিস কি না?
~ আমার পড়া আছে।
~ কি পড়ছিস তুই?
~ আপনি জেনে কি করবেন?
~ বাব্বাহ্, রাগ করেছিস?

~ আপনি আমার কন্সেন্ট্রেশন নষ্ট করছেন।
~ ইহ্।
~ কিসের ইহ্? আপনি যান আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
~ তুই এমন করছিস কেন আমার সাথে? কি করেছি আমি তোকে?

~ কিচ্ছু করেন নি। কিন্তু আপনি যান। আমি পড়তে বসবো। আমার সময় নষ্ট করছেন আপনি।
আয়াজ ভ্রু নাচিয়ে ভিলেনটাইপ হাসি দিয়ে বলল,
~ যাচ্ছি, যাচ্ছি, আমি তো ভুলেই গেছিলাম তুই বোর্ড ফার্স্ট হওয়া স্টুডেন্ট, দশমিনিট না পড়লে তোর প্লেস করা আটকে যাবে। তখন তো আবার মহা মুসিবত।
~ আপনি আমাকে ইনসাল্ট করছেন?

আয়াজ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
~ ইনসাল্ট বানান কর তো দেখি? তুই তো ইংরেজীতে ডাল। দেখি পারিস কি না?
~ করবো না। আমি কি আপনার কথা মত চলবো?
~ আচ্ছা থাক। আমার কথা মত চলতে হবে না। আমি যাচ্ছি তুই পড়। অবশ্য পড় তেমন কোন লাভ হবে কি না কেন জানে? রেজাল্ট বেরোলে দেখা সেই গোল্লা পেয়েছিস। যাই হোক আমি যাই।

আয়াজ বেরিয়ে গেলো। ইরিনের রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। যে করেই হোক ভালো রেজাল্ট করে আয়াজকে দেখিয়ে দিতে হবে। তার জন্য যতদূর পর্যন্ত যেতে হয় ইরিন যাবে। দরকার হলে দিনরাত এক করে পড়াশোনা করবে। ইরিনকে নিজের অবস্থান তৈরী করতেই হবে। আয়াজের ভোঁতা মুখ যে করেই হোক থোতা করতে হবে।

পর্ব ৫

আয়াজ হেলাল সাহেবের সামনে চুপচাপ বসে আছে। তাকে কেন ডাকা হয়েছে সে জানে না। হেলাল সাহেব নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে মধুর হাসি হেসে বললেন,
~ বাবার তোর সাথে কিছু কথা আছে।

~ বলো বাবা।
~ যদিও এখন এইসব বলা ঠিক না। তবুও জানিয়ে রাখা ভালো। তুই পাশ করে বেরিয়েছিস। ইন্টার্নি শেষ হলে তোর বিয়েশাদী দিতে হবে। তাই তোর মা বলল তোকে আগে থেকেই যেন সব জানিয়ে রাখাই ভালো।
~ বিষয়টা কি বাবা?

~ ইরিন!
আয়াজের ভ্রু জোড়া অটোমেটিক কুঁচকে গেলো। ইরিনের প্রসঙ্গে হেলাল সাহেব কি কথা বলবেন সে বুঝে উঠতে পারছে না।
~ আমার আর তোর মায়ের ইরিনকে খুব পছন্দ, তোর মা বলছিলো তোদের দুজনকে খুব মানাবে, আমারও তাই মত!
আয়াজের হাসি পাচ্ছে। কেন পাচ্ছে সে নিজেও জানে না। হাসি চেপে চুপ করে বসে রইলো সে। ইরিন বাস্তবিকই প্রচন্ড সুন্দরি। ওদের এপার্টমেন্ট সুন্দরী অবিবাহিতা মেয়ে হিসেবে প্রচুর জনপ্রিয়তা আছে তার।

হেলাল সাহেব ছেলের মনোভাব উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন। আয়াজ হালকা হেসে বলল,
~ আমাকে কি করতে হবে বাবা?
~ ইরিনের আম্মারও তোকে খুব পছন্দ। ছোটবেলা থেকেই তোকে খুব পছন্দ করেন তিনি। তোর মা উনার সাথে আলাপ করেছে। উনাদের কোন আপত্তি নেই। এখন তোর মতামত জানতে চাইছি।

সরাসরি বাবার সামনে সম্মতি প্রকাশ করতে লজ্জা লাগছে আয়াজের। বলল,
~ বাবা, ইরিনের সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। এখন এসব আলোচনা ওর কানে গেলে তো পড়াশোনা লাটে উঠবে। কন্সট্রেশন নষ্ট হয়ে যাবে।
ছেলে জবাবে হেলাল সাহেব ছেলের উত্তর বুঝে গেলেন। ছেলেকে আশ্বস্ত করে বললেন,
~ ইরিন কিচ্ছু জানবে না। আমি তোকে কথা দিচ্ছি। ইরিনের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা এই ব্যপারে তাকে কিচ্ছু জানাবো না।

আয়াজ চুপ করে রইলো। হঠাৎ করেই বাবার সামনে বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে। হেলাল সাহেব ধীর কন্ঠে বললেন,
~ আসলে সামনের বছরই ইরিনরা এই বাসা থেকে শিফট হয়ে যাচ্ছে। যাত্রাবাড়ীতে ইরিনের বাবার নামে আরেকটা ফ্ল্যাট আছে। সেখানেই যাচ্ছেন তারা। ওদের সাথে আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক আছে। আর তোর মাও ইরিনকে খুব পছন্দ করে। সেই জন্যই ওরা চলে যাওয়ার আগে কথাবার্তা সব এখনই ফাইনাল করে রাখতে চাচ্ছে।

~ কিন্তু ইরিনের মতামত?
~ ইরিনের মতামত অবশ্যই নেওয়া হবে। তার মতামত ছাড়া তো আর বিয়ে হবে না। তবে এখন থাক, আগে পড়াশোনা শেষ করুক!
~ ঠিক আছে।
আয়াজ উঠে দাড়ালো। হেলাল সাহেব থামিয়ে দিয়ে বললেন,
~ শোন।

আয়াজ দাঁড়িয়ে গেলো। হেলাল সাহেব মুচকি হেসে বললেন,
~ ইরিনের দিকে খেয়াল রাখবি। মেয়েটা ভালো। কিন্তু বয়স তো কম। এই বয়সে মেয়েদের মনমানসিকতা অন্যরকম থাকে। আমার চেয়ে তুই ভালো বুঝবি। তাই ওকে দেখে শুনে রাখার দায়িত্ব তোর। তোর হবু স্ত্রী এখন, তার প্রতি খেয়াল রাখার দায়িত্ব তোর।
আয়াজ লাজুক হাসি হাসলো। ইরিন তার হবু স্ত্রী? ভাবতেই হাসি পাচ্ছে। ইরিনের সাথে দুই সেকেন্ড বনিবনা হয় না তার। বিয়ের পরে যে কি হবে আল্লাহই জানে!

হলুদের প্রোগ্রামে শুরু হয়েছে। সবার শেষে ইরিন সাজগোজ করে বেরোলো। হলুদ লাগিয়েই আবার পড়তে বসবে। যদিও তার সাজগোজের খুব শখ তবে আজকে বেশি সাজগোজ করে নি। হলুদ রংয়ের একটা সেলোয়ার কামিজ পরে চুল বেধে নিলো। হলুদ দিয়ে এসে পড়তে বসতে হবে ওকে, প্রচুর পড়তে হবে! পৃথিবী জুড়ে আইলা, সিডর, টর্নেডো যাই হোক না কেন ওকে পড়তে হবে।

ছাদের সিঁড়ি কাছে উঠতেই আয়াজের সাথে দেখা। সিঁড়িপথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ফোনে কথা বলছে। ইরিন পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।
আধঘণ্টা পর হলুদ লাগিয়ে নামার সময়ও সেই একই জায়গায় আয়াজকে দাঁড়ানো দেখলো। ফোন নিয়ে ব্যস্ত।
এত কার সাথে কথা বলছে? তাও আধঘণ্টা যাবত দাঁড়িয়ে? স্পেশাল কেউ? হোক! ইরিনের কি? ইরিন কেন মাথা ঘামাচ্ছে? দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো সে।

ফোনে কথা শেষ হলে আয়াজ ছাদে উঠলো। রেশমি এসে বলল,
~ ইরিকে একটা ফোন লাগা তো আয়াজ।
~ কেন?
~ আমার ফোন ওর কাছে রাখতে দিয়েছিলাম। ভুলে নিচে নিয়ে গেছে বোধহয়।
~ ঠিক আছে আমি নিয়ে আসছি।
আয়াজ তুতুরীকে নিয়ে নিচে নামলো।
ওদের ফ্ল্যাটের তালা বন্ধ। সোহেলি তালাবন্ধ করে ছাদে আছেন। ইরিনদের ফ্ল্যাটের সদর দরজা খোলা।

ভেতরে ঢুকতেই সোফায় ওপর রেশমির ফোন রাখা দেখলো। তুতুরীকে দিয়ে ছাদে ফোন পাঠিয়ে দিলো সে। ইরিনদের বুয়া রান্মাঘরে কাজ করছে। আয়াজ ফ্যান চালু করে ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসলো। ইরিনের ঘরের দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলো, দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো সে। সে যেখানে বসেছে সেখান থেকে ইরিনের ড্রেসিংটেবিলের আয়না স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ইরিন জামার চেইন খোলার চেষ্টা করছে। আয়াজ উঠে সাবধানে ইরিনের ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিলো। তারপর আবার সোফায় এসে বসলো।

দ্রুত জামা চেইঞ্জ করে বেরলো ইরিন। ড্রয়িংরুমে পানি খেতে এসে দেখলো আয়াজ সোফায় বসে আছে। ইরিনের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছে সে।
ইরিন চোখটা ভালো মত কচলে নিলো। আয়াজ কি সত্যি সত্যি সোফায় বসে আছে নাকি ওর দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে?
আয়াজের ফোন বাজছে। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করল সে। ইরিন এখনো দাঁড়িয়ে আছে। আয়াজ ওকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে ইশারায় পানি খাওয়াতে বলল।

ইরিন পানি এনে ওর সামনে রাখলো। ইতিমধ্যে আয়াজের কথা বলা শেষ। সামনে রাখা পানির গ্লাস তুলে নিয়ে পানিতে চুমুক দিলো সে। পানি খাওয়া শেষ হলে মৃদু শব্দ করে গ্লাসটা সেন্টার টেবিলের ওপর রাখলো। ওর দৃষ্টি ফোনের দিকে। ইরিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ ওড়না গায়ে দিয়ে আয়।

নিজের দিকে তাকিয়ে তব্দা খেয়ে গেলো ইরিন। সে এতক্ষন আয়াজের সামনে ওড়না ছাড়া বসে ছিলো? ইন্নালিল্লাহ!
বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে গেলো। তারপর এক ছুটে এসে রুমে ঢুকলো।

চাদরের মত ওড়না গায়ে জড়িয়ে নিলো। প্রচুর লজ্জা লাগছে। নিজের গালে কষে দুটো চড় বসাতে ইচ্ছে করছে।
আয়াজ হাতঘড়ি খুলে টেবিলের ওপর রাখলো। ইরিনকে বেরিয়ে আসতে দেখে বলল,
~ দরজা খোলা রেখে তুই জামাকাপড় চেইঞ্জ করছিস? তোর আক্কেল আন্দাজ নেই? এখান থেকে বসলে তোর ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সব দেখা যায়। তুই এত বোকা হলি কি করে ইরিন?

ইরিন বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেলো। পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো, সে রুমে জামা চেইঞ্জ করেছে? ওয়াশরুমে যায় নি? মনে করতে পারছে না। মাথাটা খালি খালি লাগছে। সিঁড়িতে আয়াজকে ফিসফিস করে কথা বলতে দেখে সেই চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো, অন্য কিছু ম্যামরিতে ঢুকেই নি। হায় আল্লাহ!
আয়াজ ধীরস্থির শান্ত কন্ঠে বলল,

~ বড় হয়েছিস, বুঝজ্ঞান খরচ করে চলতে শিখ। এমন বোকার মত কান্ড করিস কেন?
ইরিনের এখানে বসে থাকতে লজ্জা লাগছে। লজ্জায় আয়াজের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না সে। আয়াজের সামনে থেকে উঠে যাওয়ার বাহানা করে বলল,
~ আমার অনেক পড়া বাকি আছে আয়াজ ভাই। আমি পড়তে বসবো।

~ পড়ে লাভ কি? পড়াশোনা মানুষ কি জন্য করে? জ্ঞান অর্জনের জন্য। তোর তো ব্রেইনই নেই। পুরো মাথা ফাঁকা, তুই জ্ঞান রাখবি কোথায়?
ইরিন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। আয়াজ হঠাৎ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
~ এভাবে বোকার মত কাজ আর কখনো করবি না। চেইঞ্জ করার সময় হয় ওয়াশরুমে যাবি আর না হলে রুমের দরজা লক করে চেইঞ্জ করবি! মনে থাকবে?
~ থাকবে।
~ -ঠিক আছে যা।

~ আপনি চা খাবেন আয়াজ ভাইয়া?
~ তুই বানাতে পারবি?
~ পারবো।
~ ঠিক আছে, বানা।

আয়াজ চা খাচ্ছে। ইরিন ওর পাশে বসে আছে। আয়াজ ওর দিকে একবার তাকালো। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বলল,
~ বারবার পড়তে বসবো, পড়তে বসবো করছিলি, এখন যাচ্ছিস না কেন?
ইরিন সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বলল,
~ আপনি কি ছাদে যাবেন?

~ নাহ! আমি কিছুক্ষন রেস্ট নিবো। ডিউটি শেষে সরাসরি বাসায় এসেছি, মাথাটা ধরে আছে। ছাদের গেলে আরো বেড়ে যাবে, পুরো বিল্ডিং কাঁপিয়ে ফেলছে সবাই মিলে।
~ কয়দিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন?
~ তিনদিনের।

~ সোফায় শুতে পারবেন? মাহিনের বিছানা ঠিক করে দিই?
~ তোর পড়া আছে না? এতক্ষন তো পড়তে বসবো পড়তে বসবো করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিস, এখন যাচ্ছিস না কেন? যা নিজের কাজে যা।
ইরিন মুগ্ধদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আয়াজ ঠোঁট উলটে বলল,
~ এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমার কথা বুঝিস নি?
~ বুঝেছি!
~ এবার যা পড়তে বয়।

দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলো ইরিন, আশ্চর্য তার একফোঁটাও পড়তে ইচ্ছে করছে না। হঠাৎ করেই আয়াজের পাশে বসে থাকতে মন চাইছে।
বই বন্ধ করে উঠে গেলো সে। বেশ সাজগোজ করলো, এবারে হলুদ লেহেঙ্গার সাথে ভারী মেকাপ করেছে, সাথে মেচিং জুয়েলারি। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই হাসলো কিছুক্ষন। উদ্দেশ্য ছাদে যাবে। এখন আর পড়া হবে না। শুধু শুধু বসে থেকে লাভ নেই। তার চেয়ে মজা করাই ভালো।

আয়াজ কে দেখতে পেলো। সোফায় লম্বা হয়ে ঘুমাচ্ছে। তার একটা হাত সোফার বাইরে ঝুলছে, অন্যহাতে মাথার নিচে রাখা।
ইরিন বেরোতে গিয়ে দরজা থেকে ফিরে এলো। ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে না! আয়াজ এর ক্লান্ত, অচেতন মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছে। এত সুন্দর কেন? চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে। পাঞ্জাবী প্রথম দুটো বোতাম খোলা, ফর্সা বুকের খানিকটা দেখা যাচ্ছে!

ইরিন ওর পাশে এসে হাটুমুড়ে বসলো। ঝুলে থাকা হাতটা তুলে দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। লজ্জা, ভয়, অস্বস্তি ওকে আটকে দিচ্ছে।
একবার ভাবলো আয়াজকে ডাকবে পরে ভাবলো ঘুম নষ্ট করাটা ঠিক হবে না। নিশ্চই ভীষণ টায়ার্ড!
আলতো করে আয়াজের হাতটা বুকের ওপর তুলে দিতেই আয়াজের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
ইরিন থতমত খেয়ে লজ্জিত কন্ঠে বলল,

~ না মানে আমি আপনাকে ডাকতে এসেছিলাম, রুমে গিয়ে শোবেন চলুন। এখানে নিশ্চই ঘাড় ব্যথা হয়ে গেছে?
~ তুই আমাকে ডাকার জন্য এত সেজেছিস? মতলবটা কি তোর?
~ ছাদে যাবো তাই!
আয়াজের মুখটা রাগে ত্যাড়াব্যাড়া হয়ে গেলো।

~ ছাদে যাবি মানে? তুই না পড়তে বসেছিস?
~ হ্যাঁ কিন্তু এখন মন বসছে না, শুধু শুধু বসে থেকে তো লাভ নেই।
~ মন বসছে না মানে কি? মনের নাম মহাশয়! যেভাবে বসাবি সেভাবে বসবে! যা পড়তে বয়।
~ আমি এখন ছাদে যাবো।

~ বেরো তুই! তোর ঠ্যাং যদি আমি না ভেঙেছি তো আমার নামও আয়াজ না।
~ দিন। আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিন। আপনার যা মন চায় করুন।
~ আবার মুখে মুখে তর্ক! যা পড়তে বয়!
~ আমার এখন পড়ায় মন বসবে না। মরে গেলেও না।

~ তুই যাবি?
ইরিন হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালো। রুমে ঢুকে রাগে বই ছুঁড়ে মারলো, ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলতে ইচ্ছে করছে ওর। আয়াজ বুয়াকে দরজা আটকে দিতে বলে ছাদে চলে গেছে। ইরিনের মন চাইছে আয়াজকে টেনে এনে তার সাথে বসিয়ে রাখতে। বদ লোক! ওকে একা ফেলে চলে গেছে।

পর্ব ৬

বিয়ের পরের দিনের পরদিনই আয়াজ চলে গেলো। দুপক্ষের মেহমানে ভর্তি পুরো বাসা! ইরিনের মনে হচ্ছে সে যদি আয়াজের মত কাজের দোহাই দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারতো তাহলে খুব ভালো হত! এদের অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়া যেত। রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পর্যন্ত পারে না এদের জন্য, চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়ি উঠিয়ে ফেলছে।

তারপর প্রায় দুইমাস যাবত পরীক্ষা চললো ইরিনের। এবার অনেক পরিশ্রম করেছে সে। পরীক্ষা শেষেও বিরতি নেই। ভর্তি পরীক্ষার জন্য আগের চেয়ে দ্বিগুন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। সময় কোন দিক দিয়ে কেটে যায় টেরই পায় না। তবে মাঝে মাঝে অবসর পেলে বিয়ের ছবিগুলো দেখে আর হাসে! আয়াজের বিভিন্ন ভাবে পোজ দিয়ে তোলা ছবি। হলুদে মজা করতে না পারলেও বিয়েতে একেবারে জমিয়ে দিয়েছে! নাচানাচি থেকে শুরু করে লুডু খেলা পর্যন্ত সব করে ফেলেছেন! আর ইরিন? আয়াজ যেই কয়দিন ছিলো সেই কয়দিন বইয়ে মুখ গুঁজে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছে সে কিন্তু মাথায় কিছু ঢোকাতে পারে নি।

আজকে সকাল থেকে ভীষণ টেনশনে আছে ইরিন। তার এইচএসসির রেজাল্ট বেরোবে। যোহরের নামাজের বিছানায় বসে আছে সে। এখন বাজে দেড়টা, দুইটায় রেজাল্ট বেরোবে। মায়মুনা বেগম মেয়ের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেছেন, মেয়ে যদি ফেইল করে বসে? বিয়ে দেবেন কি করে? লজ্জায় তো উনার মাথা কাটা যাবে। আয়াজের ভালো একটা ছেলের সাথে বিয়ে হবে, মেয়েকে শিক্ষিত হওয়া দরকার।
ইরিন রেজাল্টের জন্য মেসেজ পাঠিয়ে বসে আছে। হাত পা কাঁপছে ওর। এখনো রিপ্লাই আসে নি। একমিনিট এর ভেতর মেসেজ টিউন বেজে উঠলো। আল্লাহ আল্লাহ করে মেসেজ ওপেন করলো।

রেজাল্ট দেখে পাক্কা তিরিশ সেকেন্ডের মত হ্যাং মেরে বসে ছিলো! তারপর পুরো বাসা কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো। ওর চিৎকারে মায়মুনা বেগম ভয় পেয়ে গেছেন, ছুটে এলেন মেয়ের কাছে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, রেজাল্ট কি আসছে মা? চিৎকার দিলি কেন? খারাপ কিছু?
ইরিন মায়ের গলা জড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল, আমি এ প্লাস পেয়ে গেছি আম্মা।

বলতে বলতে কেঁদে ফেললো সে। ঠিক তখন ওর ফোনে আবারও মেসেজ টোন বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো টেলিটক থেকে মাত্র মেসেজ এসেছে। তাহলে কি সে স্বপ্ন দেখছিলো এতক্ষন? হায় আল্লাহ! দিবাস্বপ্ন? এটা কি করে হয়?

নাহ! আবার দেখলো রেজাল্ট ঠিকই আছে। তাহলে প্রথম মেসেজটা পাঠালো কে? ও ফোন হাতে নিয়ে সেই নাম্বারে কল করলো, কিন্তু রিসিভ হলো না।
মায়মুনা বেগম সন্দিগ্ধ গলায় বললেন,
~ কাকে ফোন করছিস? রেজাল্ট কি ভুল এসেছে?

~ রেজাল্ট ভুল হবে কেন? আমি নিজে মিলিয়ে দেখেছি আমার রোল নাম্বার রেজিট্রেশন নাম্বার, এই যে দেখো?
মায়মুনা বেগমের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলো সে। মায়মুনা বেগম নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, তাহলে ফোন করলি কাকে?
অপরিচিত নাম্বারটা কার ইরিন জানে না। মিথ্যে বলল সে,
~ আমার এক বান্ধবীকে। ওর রেজাল্ট জানার জন্য!
~ ফোন ধরে নি?

~ উহু! এখন তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াও তো আমি সালাম করবো। আব্বা কোথায়?
মায়মুনা বেগম মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, তোর আব্বা মসজিদে।

রাতের বেলা আবার সেই অপরিচিত নাম্বারে ডায়াল করলো ইরিন। দুবার রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো। ইরিন বিনয়ী কন্ঠে সালাম দিয়ে বলল,
~ এই নাম্বার থেকে দুপুরে আমার ফোনে মেসেজ এসেছে!
~ হ্যাঁ তো?

~ আয়াজ ভাই আপনি?
~ হ্যাঁ আমি। রেজাল্ট পেয়ে ভাবলাম তোকে মেসেজ পাঠিয়ে দেই।
ইরিনের কি যে খুশি লাগছে সে বলে বোঝাতে পারবে না। আবার দুঃখও লাগছে আয়াজ তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে না কেন?
~ তুই কি আর কিছু বলবি?

~ না।
~ তাহলে রাখি।
~ শুনুন?
~ আবার কি?
~ আপনি কিছু বলবেন না?

~ আমি আর কি বলবো? ভালো রেজাল্ট করেছিস ভালো কথা। ভর্তি পরীক্ষার জন্য মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আসল চ্যালেঞ্জ ঐখানে। ভালো রেজাল্ট করে কোথাও চান্স না পেলে সেই রেজাল্টের কোন মূল্য থাকবে না। সুতরাং ঢিলেমি করলে চলবে না। প্রত্যেকটা মুহূর্ত কাজে লাগাতে হবে। ঠিক আছে?
~ ঠিক আছে।
~ রাখি আমি। খোদা হাফেজ!
~ খোদা হাফেজ।

ইরিন ফোন রেখে চুপ করে রইলো। ঠিকই বলেছে আয়াজ ভালো রেজাল্ট করে ভর্তি পরীক্ষায় কোথাও চান্স না পেলে মান ইজ্জত শেষ। এবার থেকে আরো অনেক বেশি করে পড়াশোনা করতে হবে তাকে। সবাই নিশ্চই অনেক আশা করে আছে তার ওপর।

অবশেষে জান লাগিয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা ফল ইরিন পেলো, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধা তালিকায় সাতানব্বই তম হয়েছে সে। পুরো এপার্টমেন্টে খুশির রোল পড়ে গেছে। ইরিনের বাবা পুরো মহল্লার লোকজনকে মিষ্টি খাইয়েছেন। উনার মেয়ে যে এত প্রতিভাবান উনি জানতেনই না। মায়মুনা বেগম স্থির করে ফেলেছেন, মেয়ে যতদূর পড়তে চায় পড়বে। মেয়ের অমতে বিয়েশাদী দেবেন না। এত ভালো রেজাল্ট করেছে ভাবতেই উনার বুকটা ভরে যাচ্ছে।
রেজাল্ট বেরোনোর সপ্তাহ খানেক পর আয়াজ বাসায় এলো। ইদানীং তার ভীষণ ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। প্রিলিতে চান্স পেয়ে গেছে সে, বাকি আছে রিটেন আর ভাইবা। ব্যস্ততার জন্য এই কয়েকমাসের মাঝখানে মাত্র একদিন এসেছিলো, তাও সোহেলির অসুস্থতার কথা শুনে, এছাড়া আর কোন ছুটি পায় নি।

বিকেল বেলা ছাদে উঠলো ইরিন। আয়াজকে দেখে চমকে গেলো। দিনদিন কি আরো সুন্দর হয়ে যাচ্ছে নাকি মানুষটা? আর এভাবে কেন এসেছে? ডাক্তার মানুষ! পরনে একটা শর্টস আর টিশার্ট। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে। মনে হচ্ছে সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা টগবগে তরুণ! আয়াজ ওকে দেখতে পায় নি।
ইরিন ছাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এতদিন বাদে আয়াজের সাথে দেখা, সে নিশ্চই ইরিনের রেজাল্টের খবর পেয়েছে?
ছাদে উঠে চুপচাপ গিয়ে রেলিং এর ধার ঘেষে বসলো সে। সাথে সাথেই আয়াজ ধমকে উঠলো।

~ বাদরের মত ঝুলে বসেছিস কেন? তুই কোনদিন মানুষ হবি না তাই না? এখনো দাঁড়িয়ে আছে। নাম!
ইরিনের দৃষ্টি ওর ফর্সা পায়ের মিশকালো লোমগুলোর দিকে, গোড়ালির ওপর থেকে হাটুর সামান্য নিচ পর্যন্ত! উফফ! হার্ট এটাক করে ফেলবে সে। এভাবে শর্টস পরে ছাদে উঠার কি দরকার? দেখানোর জন্য?

~ এই নামতে বলেছি না তোকে? নাম!
ইরিন নেমে গেলো। কোন প্রতিউত্তর দিলো না। আয়াজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে আছে। ইরিনের মনে মনে আনন্দ হচ্ছে। আয়াজের এর কাছে সরে এসে বলল, কবে এসেছেন?

~ তুই জানিস না?
~ আমি জানবো কি করে?
~ তুতুরীকে চকলেট দিয়েছিলি কেন?

ইরিন শুকনো ঢোক গিলল। তুতুরীকে বলেছিলো আয়াজ ছাদে এলে সে যেন ইরিনকে চুপিচুপি এসে বলে যায়। কিন্তু তুতুরী সে কথা আবার আয়াজকে বলে দিয়েছে। ইরিন লাজুক ভাবে হাসল। বাচ্চা মেয়েটাকে বলাটাই ওর উচিৎ হয় নি। আমতা আমতা করে বলল,
~ আসলে আপনার সাথে জরুরী আলাপ ছিলো। আপনি ব্যস্ত মানুষ তাই তুতুরী কে বলেছিলাম আপনি ছাদে এলে যাতে আমাকে ইনফর্ম করে।
~ ছাদে ইনফর্ম করার দরকার কি? বাসায় গেলি না কেন?

মেহরিন বিড়বিড় করে বলল, বিয়ের আগে শ্বশুরবাড়ি বেশি যাওয়া ভালো না। কিন্তু শব্দ করে বলল,
~ আমি তো আপনাদের বাসায় যাবো না। আপনার সাথে না আমার ঝগড়া হয়েছিলো?

~ নাটক করছিস? ঠাস করে একটা মারবো! ফাজিল!
ইরিন আশাহত হলো। আয়াজ তো সেই আগের মতই ব্যবহার করছে। সে কি ইরিনের ঢাকা মেডিকেলে চান্স পাওয়ার খবরটা জানে না?
~ আচ্ছা বাদ দিন। আপনার বান্ধবী শিলা কেমন আছে? ঐ যে যাকে আপনি আপনার রেজাল্টের দিন নীল একটা জামদানী গিফট করেছিলেন।
~ ওর বিয়ে হয়ে গেছে। হাজবেন্ডের সাথে কানাডা চলে গেছে।

ইরিন শুকনো কন্ঠে বলল, ওহ!
~ তুই ওর কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?
~ এমনিতেই, উনি ঢামেক এর ছাত্রী না?
~ হ্যাঁ। তো?

~ কিছু না।
আয়াজ আবারও ফোনে মনযোগ দিলো। ইরিনের বিরক্ত লাগছে। আয়াজকে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে। ইরিনের রেজাল্ট নিয়ে একটা কথাও বলছে না সে? ইরিন উশখুশ করে বলল,
~ আমি ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়েছি মাহমুদ ভাই।

~ শুনেছি। বাসায় আসার পর ভাবী বলেছে।
~ সাতানব্বই তম হয়েছি।
~ হুম।
~ কি হুম? আপনি কি আমার কথা শুনেছেন? আমি সাতানব্বই তম হয়েছি।
~ শুনেছি।

~ না শোনেন নি। এত ভালো একটা কথা বললাম আপনাকে আপনি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন?
আয়াজ বিরক্ত গলায় বলল, তো আমি কি করবো মাথায় তুলে নাচবো তোকে? আজব! এতবার বলার কি আছে?
~ আমি মাত্র দুবার বলেছি।
~ তোর দুবার বলাটাই আমার দুশবার বলার চেয়ে বেশি বিরক্ত লেগেছে।
~ আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন?

~ রাগবো না তো কি করবো? শো অফ করছিস কেন? চান্স পেয়েছিস ভালো কথা, এখানেই তো সব শেষ নয়? আগে পাশ করে বেরো। এখনই নাচানাচি করছিস কেন? এত সহজ না মেডিকেল লাইফ!
ইরিনের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। শিক্ষা হয়ে গেছে ওর। আয়াজ বিরক্ত কন্ঠে বলল,
~ -তুই কি বলতে এসেছিস বলে বিদায় হ।

ইরিন জবাব দিলো না, হাঁটা ধরলো। নিজেকে কি ভাবে আয়াজ? সে কি আরবের খোরমা খেজুর? নায়ক সালমান খান? নাকি ওমার বোরকান আল গালা? ইরিন আর কখনো তার সাথে কথা বলবে না। নিজের মত থাকবে সে, আয়াজ থাকুক তার ভাব নিয়ে। ওকে ফিরে যেতে দেখে তড়িৎগতিতে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো আয়াজ। ইরিনকে এভাবে বলা ঠিক হয় নি তার। ইরিনের সাথে ঝগড়া করতে করতে সব কিছু নিয়ে ঝগড়া করার অভ্যেস হয়ে গেছে তার। কিন্তু এইমুহূর্তে ইরিনকে এভাবে হার্ট করা একদমই উচিৎ নয় নি। নরম কন্ঠে বলল,
~ যাচ্ছিস কেন?

~ কি বলতে এসেছিলাম ভুলে গেছি।
আয়াজ দুষ্টু হেসে বলল,
~ ভুলে গেছিস? এত ভুলে যাস কেন তুই? তোর কি ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া? ওড়না পড়তে ভুলে যাস, চেইঞ্জ করার সময় দরজা বন্ধ করতে ভুলে যাস, কি বলতে এসেছিস সেটা ভুলে যাস! মন কোথায় থাকে?

তবে ইরিনের রাগ পড়লো না। নাকমুখ লাল করে বলল,
~ অ্যামনেশিয়া কি না জানি না, তবে বুঝেন তো গাধাটাইপ স্টুডেন্ট ব্রেইন অতো শার্প না, তাই সব ভুলে যাই।
~ আমি কখন বললাম তুই গাধা টাইপ স্টুডেন্ট?
~ আপনি সরুন আমার সামনে থেকে। আমি নিচে নামবো।

~ না, এখন তুই নামতে পারবি না। হুট করে আমাকে একটা কথা বলে ব্লেইম করে দিলি। উইদআউট এক্সপ্লেনেশন তো তুই চলে যেতে পারবি না।
ইরিন হাত জোড় করে মাফ চাইবার ভঙ্গি করে বলল,
~ আমি সরি আয়াজ ভাই, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর কখনো এমন বেফাঁস কথা বলবো না। এবারের মত মাফ করে দিন।
ওর সূক্ষ্ম তিরস্কারটা ধরতে আয়াজের সময় লাগলো না। ইরিনের রাগের পরিমানটা আন্দাজ করে ফেললো। মুচকি হেসে বলল,
~ আচ্ছা যা সরি।

~ আমি আপনাকে কিছু বলেছি?
ইরিন আবার হাঁটা ধরলো। আয়াজ আবার তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
~ সরি বললাম তো।

~ আপনি আমার সামনে থেকে সরুন।
~ না। আগে বল তুই সরি এক্সেপ্ট করেছিস?
~ না করি নি। আমি কষ্ট পেলে তারপর তো সরি এক্সেপ্ট করবো? আপনি আমার কে যে আমি আপনার কথায় কষ্ট পাবো?
~ ইরিন?
~ ইয়েস। ইউ আর নাথিং টু মি।

আয়াজের মুখটা নিমিষেই কালো হয়ে গেলো। ইরিন কি বদলে যাচ্ছে? আগে তো এমন ছিলো না? তার সাথে অনেক ঝগড়া হয়েছে আয়াজের কিন্তু এমন কথা তো আগে কখনো সে বলে নি? তাহলে? বিয়েতে হ্যাঁ বলে কি কোন ভুল করেছে আয়াজ? ইরিন যদি রাজী না হয়? দীর্ঘশ্বাস ফেললো আয়াজ। হতে পারে! ইরিনের জগৎ আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। ছোটবেলার মত আয়াজের সাথে পাগলামি দুষ্টুমি তার নাও ভালো লাগতে পারে। মলিন মুখে বলল,
~ সব সময় উলটো বুঝিস কেন তুই আমাকে? আমি কি তোর খারাপ চাই?
ইরিন জবাব দিলো না। আয়াজ সামনে থেকে সরে গিয়ে বলল,
~ ঠিক আছে যা তোর যেখানে মন চায় যা।

ইরিন কিছুক্ষন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। তারপর চুপচাপ নেমে গেলো। ফিরেও তাকালো না।
আয়াজ বিষন্ন দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে! । মন খারাপের বৃষ্টি!

পর্ব ৭

দুপুরের দিকে মায়মুনা বেগম ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছেন। উনার প্রেশার বেড়ে গেছেন, সকালে উনি ইরিনের গালে সটাং করে চড় বসিয়ে দিয়েছেন। ওকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে উনি হয়রান হয়ে গেছিলেন, শেষে আর রাগ সামলাতে পারেন নি। ইরিন কিছুতেই ভর্তি হতে যাবে না। এদিকে আজকে লাস্ট ডেইট। অথচ সে গোঁ ধরেছে মেডিকেলে পড়বে না। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জুওলজি পেয়েছে, ওটা নিয়েই পড়বে। হঠাৎ করে ওর এমন মতিভ্রম হলো কেন সবাই বুঝতে পারছে না। আয়াজের বাবা হেলাল সাহেব নিজে এসে বুঝিয়ে গেছেন, তবুও তার সিদ্ধান্ত বদল হলো না।
ঘড়িতে কাটায় কাটায় আড়াইটা বাজে। কলিংবেল বেজে উঠলো। তার সাথে একবার নকও হলো। ইরিন দরজা খুলতে গেলো। মায়মুনা বেগম ঘর আটকে বসে আছেন। উনি বেরোবেন না।

আয়াজকে দেখে ইরিন চমকালো না। তার কেন জানি মনে হয়েছিলো আয়াজ আসবে! ওকে ঝাড়ি মেরে বলবে কি পাগলামি শুরু করেছিস তুই? হ্যাঁ! ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ। কোন রকম ভনিতা ছাড়াই বলল,
~ রেডি হয়ে আয়।

~ কেন? আমি এখন কোথাও যাবো না।
~ আমার মেজাজ খারাপ করিস না ইরিন! যা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়।
ইরিন রেডি হতে চলে গেলো। ফিরে এসে দেখলো আয়াজ সোফায় বসে আছে।
~ রেডি?
ইরিন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

গাড়ি নিলো না আয়াজ। রিক্সা আগেই ঠিক করে রেখেছিলো। বাসার নিচে দাঁড় করিয়ে উপরে উঠে এসেছে সে। ইরিনকে নিয়ে রিক্সায় উঠে বসলো। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে এসে রিক্সা থামলো। রিক্সা থেকে নেমে রাস্তা পার হওয়ার সময় ইরিনের ডান হাত চেপে ধরে রাস্তা পার করলো। ইরিনের লজ্জা লাগছে। এতবড় মেয়েকে কেউ ধরে ধরে রাস্তা পার করায়? ফিসফিস করে বলল,

~ আমার হাত ছাড়ুন আয়াজ ভাই। আমি রাস্তা পার হতে পারবো।
আয়াজ ছাড়লো না। এমনকি ইরিনের কথার জবাবে কোন কথা বললো না। গেটের সামনে এসে হাত ছেড়ে দিলো। তারপর দুজনে একসঙ্গে ভেতরে ঢুকলো।

ভালোলাগা, আবেগ, আনন্দ, লজ্জা সবমিলিয়ে অদ্ভুত এক উত্তেজনা চলছে ইরিনের ভেতর। আয়াজের পাশে রিক্সায় বসে আছে সে। ভর্তি শেষ। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ইয়ার স্টুডেন্ট ইরিন।
আয়াজ থমথমে গলায় বলল,
~ আমার আটহাজার সাতশো টাকা আমাকে ফেরত দিয়ে দিবি।
~ দেবো না।
~ দিবি না মানে?
~ দেবো না মানে দেবো না।

~ তোদের গুষ্ঠিসুদ্ধ সবাই বাটপার নাকি? তোর বোন সেদিন আমার ভাইয়ের পকেট থেকে সাড়ে নয় হাজার টাকা সরিয়েছে। ভাইয়াকে দেখলাম প্যানপ্যান করছে! এটা তো রীতিমত ডাকাতি! তোরা ডাকাতের বংশধর?
ইরিন চোখ পাকালো। আয়াজ সমঝোতার ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে বলল,
~ যাইহোক আমার টাকা আমাকে ফেরত দিবি।
~ আচ্ছা দেবো। কিন্তু ভর্তি তো আটহাজার চারশো আপনি বাকি তিনশো টাকা বেশি চাইলেন কেন?
~ গাড়িভাড়া কি তোর শ্রদ্ধেয় আব্বাজান দিয়েছে?

~ কিপ্টা!
~ কি কিপ্টা?
~ আপনি একটা কিপ্টুস!
~ তুই তো বিরাট নির্লজ্জ রে ইরিন! আমি যে এত কষ্ট করে তোকে ভর্তি করিয়েছি তোর সেই কৃতজ্ঞতা বোধ পর্যন্ত নেই। ডিউটি করতে করতে দম ফেলার সুযোগ পাই না, তাও তোর জন্য জানমাটি করে আসতে হলো। তুই টাকার হিসেব করছিস?
~ আমি কি আপনাকে আসতে বলেছি?

~ তুই বললে আমি আসতাম? তোর শ্রদ্ধেয় আম্মাজান ফোন দিয়ে কান্না জুড়ে দিলেন! তোকে ঠিক করার দায়িত্ব তো উনি আমার ওপরই দিয়েছেন, তাই বাধ্য হয়ে আসতে হলো।
~ আম্মা আপনাকে ফোন দিয়েছে?
~ জ্বি দিয়েছে। আপনার শ্রদ্ধেয় আব্বাজানও দিয়েছে।

ইরিন আবারও আশাহত হলো। আয়াজের ক্লান্ত লাগছে। এই নির্বোধ মেয়েটার জন্য টানা আঠারো ঘন্টা ডিউটি শেষে খেতে পর্যন্ত পারে নি সে। মায়মুনা বেগমের কাছ থেকে সব শুনে ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো। বোকা মেয়েটা যে তার ওপর জেদ করেই মেডিকেলে পড়বে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটুকু বুঝতে ওর অসুবিধে হলো না। অনেক দৌড়ঝাঁপ করে ছুটি নিয়ে ইরিনকে ভর্তি করাতে এসেছে সে। খাওয়ার সময় টুকু পর্যন্ত পায় নি। এখন খিদেয় ওর পেট চোঁ! চোঁ! করছে। রাস্তার পাশে একটা হোটেলের সামনে রিক্সা থামালো।

আয়াজ খাচ্ছে, ইরিন নিচু গলায় বলল,
~ আপনি এমন রাক্ষসের মত খাচ্ছেন কেন আয়াজ ভাই? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কতদিনের অভূক্ত আপনি। জেলখানার কয়েদিদের মত খাবারের ওপর হামলে পড়েছেন!
একটুখানি হাসলো ইরিন। আয়াজ খাওয়া বন্ধ করলো না। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, আমার হাত খালি নেই, তা না হলে এইমুহূর্তে তুই আমার হাতে ঠাটিয়ে দুটো চড় খেতি।
ইরিন আবারও হাসলো। আয়াজ খেতে খেতে বলল,
~ বিল তুই দিবি!

ইরিন ভেংচি কাটলো। অসভ্য লোকটা নিজে নিজেই খেয়ে চলেছে, ওকে একটাবার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করে নি খাবে কিনা! এখন আবার বলছে বিল ওকে দিতে হবে!
~ আমি কেন দেবো? খাচ্ছেন তো আপনি তাছাড়া আমি টাকা আনি নি।
~ কেন দিবি মানে? তোকে নিয়ে যে বেগার খাটলাম? তার কোন দাম নেই? টাকা না থাকলে পরে দিবি।
~ তারমানে আপনি মজুরী চাচ্ছেন? পারিশ্রমিক?

আয়াজ খাওয়া থামিয়ে দিলো। ইরিন হাসছে। আয়াজের রাগী রাগী মুখ দেখেও কোনভাবেই থামছে না তার হাসি। আয়াজ আচমকা ইরিনের মুখের ভেতর আস্ত লেগপিস ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, বেয়াদপি করতে না করেছি না? হাস! এবার ভালো করে হাস! হাত পা ছড়িয়ে হাস! গড়িয়ে গড়িয়ে হাস! তোর যেভাবে মন চায় সেভাবে হাস!
হাসি থামিয়ে ইরিন কাঁদোকাঁদো চেহারা নিয়ে আয়াজের দিকে তাকালো! আয়াজ নামক জল্লাদটার সাথে মজা করার শাস্তি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সে। আশেপাশের লোকজন সবাই হাঁ করে ওর দিকে চেয়ে আছে, আর ভাবছে বেচারী! অসহায়!
তবে আয়াজকে শিক্ষা দেওয়ার ভালো একটা ফন্দি আটলো মনে মনে। মাংসের টুকরোটা মুখে নিয়ে বসে রইলো চুপচাপ। আয়াজ টেনে ওর গাল থেকে লেগপিসটা বের করতে চাইলো। কিন্তু শক্ত করে কামড়ে ধরে বসে আছে সে। ফেলছেও না গিলছেও না।

~ এই তুই খাবি? আমি কিন্তু এটাতে মুখ দিয়েছি!
ইরিন ফেললো না। আগের মতই বসে রইলো।
~ আজব! মুখে ধরে রেখেছিস কেন? হয় খা! নয়ত ফেলে দে!
~ -আম্মার ম্মমুড়ে ঢুকিয়েছিল্লেন গেনো?

ইরিনের এই কথার মানে হচ্ছে ‘আপনি আমার মুখে ঢুকিয়েছেন কেন? ‘ কিন্তু মাংসের টুকরোটা মুখের ভিতর থাকায় তার কথার কিছুই বুঝে নি আয়াজ। সরু চোখে তার দিকে চেয়ে রইলো।
~ তুই মুড়ে গুড়ে কি বলছিস এসব?
ইরিন জবাব না দিয়ে মাংসটা চিবানো শুরু করে দিলো। আয়াজের মুখের ওপর এবার বিরাট আকারের একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলে উঠেছে, এর মানে হচ্ছে, আমার চিবানো মাংস তুই খাচ্ছিস কি করে?

ইরিন হাসলো, আগের মতই আয়াজের আধখাওয়া মাংসটা খেতে খেতে বলল, দারুণ টেস্টি!
~ আস্তে খা! মুখের চারপাশে লেগে যাচ্ছে তো!
এই বলে সে পকেট থেকে রুমাল বের করে ইরিনের দিকে বাড়িয়ে দিলো, মুখ মোছ!
~ মুছিয়ে দিন।
~ ঢং করবি না। নে ধর!
ইরিন ঠোঁট ফুলিয়ে রুমালটা নিয়ে মুখ মুছলো। সে তো ভুলেই গেছে এই মানুষটা বেরসিক, নিরস, জঘন্য রকমের মানুষ। এর কাছে কিছু আশা করাটাই বোকামি।

খাওয়া শেষে দুজনে বেরিয়ে আবার রিক্সায় উঠলো। আয়াজ বিরক্ত গলায় বলল, তুই আমাকে আরো আশিটাকা বেশি দিবি।
~ কেন?
~ আমার নতুন রুমাল তুই নষ্ট করেছিস তাই।

ইরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল, আর কি কি বাদ আছে মিআয়াজ রহমান! আমাকে নিতে আসার জন্য আপনি যেই শার্ট, প্যান্ট পরে এসেছেন তার দাম বাকি কেন? সেগুলোর কথাও বলুন? আমি দিয়ে দেবো! আপনার সব টাকা আমি দিয়ে দেবো চাইলে আন্ডারওয়্যারের দামও দিয়ে দেবো।
~ -এই কি বিড়বিড় করছিস তুই?
ইরিন চুপ মেরে গেলো। ভাগ্যিস আয়াজ শুনতে পায় নি! পেলে হয়ত সত্যি সত্যি আন্ডারওয়্যারের দাম ধরে বসতো! ছি! ছি!

ভর্তি হয়েছে এসেছে মাসখানেকের বেশি হয়ে গেছে। ভর্তি হয়ে আসার পর থেকে অলস সময় কেটেছে ইরিনের।
এখন রাত দুটা, ইরিন বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কালকে ওর অরিয়েন্টেশন ক্লাস, নতুন জীবন শুরু করবে। হালকা টেনশন হচ্ছে, আসলে ঠিক টেনশন না উত্তেজনা। নতুন ক্যারিয়ার! জীবনের নতুন দিক!

আয়াজদের বারান্দায় ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেউ বসে আছে মনে হচ্ছে। আয়াজ তো নেই, তাহলে কে বসে আছে?
ইরিন আবার তাকালো। নেই। একটু পর আবার দেখলো। বিরক্ত লাগছে। কি হচ্ছে এসব তার সাথে? সারাদিন আয়াজকে ভেবে ভেবে মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, রাতদুপুরেও জ্বালাতন!
হঠাৎ আয়াজের ডাক শুনেই চমকে উঠলো।
~ হরিণ?

ইরিন জবাব দিলো না। ওর দৃষ্টিভ্রম এর সাথে কি শ্রুতিভ্রমও হচ্ছে? সিউর না। রুমে ঢুকে যাবে? যদি সত্যি সত্যি আয়াজ হয়?
আয়াজ ফোনের টর্চ অন করে ওদের বারান্দায় আলো ধরলো। আলোটা ঠিক ইরিনের চোখ বরাবর এসে পড়েছে, হাত দিয়ে আলো ঢাকার চেষ্টা করলো সে।
~ এত রাতে বারান্দায় কি করিস? তোর না কালকে ক্লাস?
~ আপনি?
~ হ্যাঁ আমি।

~ আপনি সত্যি সত্যি?
~ আশ্চর্য! আমিই তো!
~ আপনি কবে এসেছেন?
~ আজকে সন্ধ্যায়।

ইরিনের মন খারাপ হয়ে গেলো। কত আশা করে রেখেছিলো কালকে হস্পিটালে গিয়ে ও আয়াজের সাথে দেখা করবে, ওর মেডিকেল লাইফের প্রথম দিন বলে কথা। কিন্তু আয়াজ তো বাসায় চলে এসেছে।
~ থাকবেন নাকি?

~ দুদিন আছি।
ইরিন নিরস গলায় বলল, ওহ!
আয়াজ ওকে মৃদু গলায় ধমক দিয়ে বলল,
~ তুই এত রাতে চুল ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় কি করিস? চুল বাধ!
ইরিন হাতখোঁপা করে চুল বেধে ফেললো।

~ ঘুম আসছে না।
~ অলস লোকের ঘুম কম হয়। তুই তো অকর্মার ঢেঁকি, তাই তোর ঘুম কম হয়। অবশ্য মেডিকেল লাইফে রাত জাগতে পারাটা ভালো অভ্যেস। ঘুম যত কম যেতে পারবি ততই মঙ্গল। রাত জেগে পড়াশোনা করা যায়। তবে তোর ব্যাপার আলাদা, তুই তো বিশ্বফাঁকিবাজ!
~ আপনিও তো রাতে ঘুমান না? গুনগুন করে গান গান আর কফি খান?

আয়াজ হাঁ করে ওর দিকে চেয়ে আছে। তারপর বলল, সে তো অনেক রাতের দিকে। তুই রাত জেগে আমাকে পাহারা দিস?
ইরিন ঠোঁট কামড়ালো। তারপর বলল, পাহারা দেবো কেন? প্রায়ই আপনাকে দেখি তাই।
~ যা শুয়ে পড়! সকালে তো তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।
ইরিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আজকে সারারাত আয়াজের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করছে তার।
~ দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোকে যেতে বললাম না?

ইরিন ভেতরে ঢুকে গেলো, কারন যতক্ষণ না ইরিন ভেতরে ঢুকবে ততক্ষণ আয়াজ চিল্লাচিল্লি করেই যাবে, তার চেয়ে ভেতরে ঢুকে যাওয়াই ভালো।
রুমে ঢুকে ইরিন কাঁথা মুড়ি দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আয়াজ গুনগুন করছে, ইরিনের মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সুর ওর কানে বাজচ্ছে। আয়াজ ভাই সিংগার হলেই পারতো! একটু রোমান্টিকও হতে পারতো! আহ্! আফসোস।

পর্ব ৮

পরেরদিন সকালবেলা লিফটের কাছে আয়াজকে দাঁড়ানো দেখে ইরিন অবাক হয়ে গেলো। কন্ঠে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, এত সকালে কোথায় যাচ্ছেন আপনি?
~ হস্পিটালে!
~ আপনি না ছুটি নিয়েছিলেন?
~ হ্যাঁ! আর্জেন্ট একটা কাজ পড়ে গেছে।

~ ভালোই হলো আপনার সাথে যেতে পারবো।
~ আমার একটা কাজ আছে। কাজ শেষে আমি হস্পিটালে যাবো। তোর দেরী হয়ে যাবে, তুই চলে যা!
~ হোক দেরী আমি আপনার সাথেই যাবো।
~ আমি যেতে যেতে তোর ক্লাস মিস হয়ে যাবে তো?
~ হবে না।

~ আচ্ছা আয়।
~ আপনার আবার কোন সমস্যা হবে না তো? মানে আপনার বন্ধুবান্ধবরা যদি কেউ দেখে?
~ হবে না।
~ ওরা যদি আমার কথা জিজ্ঞেস করে কি বলবেন?

আয়াজ চিন্তায় পড়ে গেলো। সত্যিই তো কি বলবে সে? ইরিন ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
~ কি হলো? কি বলবেন ওদেরকে?
~ বলবো। আমার কাজিন। ছোট বোনের মত।
ইরিন চটে গেলো,
~ আমি কেন আপনার ছোট বোন হতে যাবো?

~ তুই রাগছিস কেন? আমি কি ছোট বোন বলেছি নাকি? আমি ছোট বোনের মত। কাজিন সিস্টার।
ইরিন গটগট করে বেরিয়ে গেলো। পেছন ফিরে তাকালো না পর্যন্ত। আয়াজ মুখ টিপে হাসছে। সে যা ভাবছে ইরিন যদি সত্যি সত্যি সেই কারনে রেগে থাকে তাহলে আজকে আয়াজ সবাইকে ট্রিট দেবে। ইরিন হেঁটে অনেক দূর চলে গেছে। আয়াজ বড়বড় কদম ফেকে ওর কাছে এগিয়ে গেলো। সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকালো। ইরিন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াজ মুচকি হেসে বলল,
~ ইদানীং তুই যে অল্পতেই আমার ওপর রেগে যাস সেটা কি তুই জানিস?

~ জানি।
~ তাহলে রাগিস কেন?
~ আমার ইচ্ছে।

~ আচ্ছা?
~ হ্যাঁ। আপনি সরুন আমার ক্লাসের দেরী হয়ে যাচ্ছে।
~ তুই না বললি আমার সাথে যাবি?
~ না। যাবো না।

~ কেন যাবিনা? তোকে কাজিন সিস্টার বলেছি বলে? আচ্ছা তুই বল আমি কি বলবো তোকে?
~ আপনার বান্ধবী!
আয়াজ হো হো করে হাসা শুরু করে দিলো। ইরিনের মাথায় চাটি মেরে বলল,
~ ইশস! আমার বান্ধবী। আমার বয়স কত জানিস?
~ কতো?

~ ছাব্বিশ!
~ তো কি হয়েছে?
~ বোকার মত কথা বলিস না তো ইরিন। ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট একজন ইন্টার্ন ডাক্তারের বান্ধবী, মানে বুঝিস এর? পরে যখন তোর ব্যাচমেটরা ক্ষ্যাপাবে তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবি না।
~ আপনাকে ক্ষ্যাপাবে না?
~ না।

~ না কেন?
~ সেটা তোর জানার দরকার নেই। আয় গাড়িতে ওঠ। এবার সত্যি সত্যি দেরী হয়ে যাচ্ছে।
ইরিন গাড়িতে উঠে বসলো। আয়াজ ওকে ক্লাসের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। ইরিন সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।

পড়াশোনায় ডুবে থাকতে থাকতে সময় যে কত দ্রুত চলে যাচ্ছে সেটা ইরিনের মাথাতেই নেই। আজকে ওর টার্ম ফাইনাল শেষ। বাসায় আসবে ইরিন। সাথে ইত্তিহাদ আর আসিফ আছে। আসিফ ছেলেটার স্বভাব ভালো না

তবে সাথে ইত্তি আছে তাই ভরসা। ইত্তির বাসাও ধানমন্ডির কাছাকাছি!
ইরিন ব্যাগ পত্র নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আয়াজের নাম্বারে ফোন দিলো, রিসিভ হল না। ইরিনের বিরক্ত লাগছে। এই লোককে ফোন দিয়ে সহজে পাওয়া যায় না। উনি কি ওর ফোন দেখলেই এমন করে নাকি সবার সাথেই এমন?

আয়াজ হোস্টেল থেকে লাঞ্চ শেষে ডিউটির জন্য বেরিয়েছে। ইরিনকে গেটের সামনে দেখে বলল, ব্যাগপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
~ বাসায় যাবো।
~ ছুটি আছে?

~ হ্যাঁ। পাঁচদিন!
~ তো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
~ একা যাচ্ছি না তো। ইত্তি আর আসিফের জন্য ওয়েট করছি। ওদের সাথে যাবো।
~ কার সাথে?

~ ইত্তিহাদ! আমার ক্লাসমেট!
ওদের কথার মাখখানেই ইত্তি ফোন দিয়ে জানালো সে যেতে পারবে না। তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে ঘুরতে বেরোবে। বিরক্তি ফুটে উঠলো ইরিনের চেহারায়। আয়াজ ওর বিরক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
~ কোন সমস্যা?

~ ইত্তি যাচ্ছে না। আমাকে আসিফের সাথে যেতে হবে।
~ তুই ওর সাথে যাবি?

~ হ্যাঁ। আমি ইত্তিকে বাসায় যাবো বলেছিলাম তখন আসিফ বলল সেও যাবে।
~ ওর সাথে যাওয়ার দরকার নেই। ফোন করে বারণ করে দে। বল তুই যেতে পারবি না।
~ কেন? আমার তো ছুটি আছে।

~ আমি বলেছি তাই।
~ আমি আম্মার সাথে দেখা করে চলে আসবো।
~ আমি নিয়ে যাবো তোকে।

ইরিন চোখ বড়বড় করে চেয়ে আছে আয়াজ দিকে। আয়াজ কি ওকে সত্যি সত্যি নিয়ে যাবে?
~ আপনি সত্যি যাবেন? আপনার ডিউটি আছে না?
~ তোকে যা করতে বলেছি কর! এত কথা বলিস কেন?
~ কিন্তু আপনার ছুটি?

~ আবার কথা বলে? আমার ছুটি আমি ম্যানেজ করে নেবো। তুই আগে ওকে ফোন কর!
ইরিন ফোন করে আসিফকে না করে দিলো। আয়াজ ওকে অবাক করে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
~ যা এবার হোস্টেলে যা।

~ কেন? হোস্টেলে কেন যাবো? আপনি না বলেছেন আমাকে নিয়ে যাবেন?
~ হ্যাঁ যাবো বলেছি। এরপর থেকে বন্ধ পেলে আমাকে আগে থেকে জানিয়ে রাখবি আমি নিয়ে যাবো। কিন্তু এবার যেতে পারবি না।
~ এবার কি সমস্যা? আমি অনেক দিন আম্মার সাথে দেখা করি না।
~ শুক্রবারে নিয়ে যাবো। যা এখন হোস্টেলে যা, আমার ডিউটি আছে। দেরী হয়ে যাচ্ছে।
~ আমি বাসায় যাবো।

~ তুই এত ত্যাড়ামি করিস কেন? আমি যখন বারণ করেছি তখন তো নিশ্চই কোন কারন আছে?
~ কোন কারন নেই। আমি জানি আপনি ইচ্ছে করে আমাকে আসিফের সাথে যেতে দিচ্ছেন না।
~ বেশি জানিস না তুই!
~ সত্যি বলেছি না?

আয়াজ পকেট থেকে ফোন বের করে আসিফের নাম্বারে ডায়াল করলো। স্পিকার অন করে দিলো ইরিন যাতে শুনতে পায়।
~ হ্যাঁ, ওয়ালাইকুম আসসালাম আসিফ। কি অবস্থা তোর?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভাই! ভালো আছেন?

~ আছি আলহামদুলিল্লাহ তুই কি বাড়ি যাচ্ছিস নাকি?
~ জ্বী ভাই। পাঁচদিন বন্ধ আছে।
~ ওহ! বেরিয়ে গেছিস?

~ না ভাই, এখনো বেরোই নি। কেন আপনি যাবেন?
~ আরে নাহ, আমার ডিউটি আছে না? তোর সাথে একজনকে পাঠাবো। তুই কষ্ট করে একটু গেটের কাছে আয় তো।
আয়াজ ফোন কেটে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, যা! আমি ওকে আসতে বলে দিয়েছি।
ইরিন রাগে গজগজ করতে করতে ব্যাগ নিয়ে হোস্টেলের দিকে হাঁটা ধরলো। আয়াজ পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, কি রে যাবি না? এতক্ষণ লাফালি কেন তাহলে? বেয়াদব!

ইরিন জবাব দিলো না। রাগ লাগছে তার, প্রচুর রাগ! রাগে আয়াজের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। ওকে জব্দ করে কি আনন্দ পায় আয়াজ?
মনে মনে মায়মুনা বেগমকে দোষারোপ করলো সে। এখানে আসার আগে মায়মুনা বেগম ইরিনকে বলে ছিলো, সাবধানে থাকবি আর কোন সমস্যা হলে তোর আয়াজ ভাইয়াকে জানাবি।

আয়াজ তখন সামনেই ছিলো। গলায় মধু ঢেলে বলেছিলো, আপনি ওকে নিয়ে কোন চিন্তা করবেন না আন্টি। কোন সমস্যা হলে আমি তো আছি।
এরপর মায়মুনা বেগম বাংলা সিনেমার অসহায় মায়েদের মত আয়াজের হাত ধরে কেঁদে ফেলে বললেন,
~ তুমি একটু খেয়াল রেখো বাবা। ওর তো হুঁশজ্ঞান কম। তুমি আছো বলেই ভরসা পাচ্ছি, কোন বিপদ আপদ হলে তোমাকে জানাতে পারবে।

সেই থেকে ইরিনের জীবন তামা তামা। কোথাও যেতে হলে আয়াজকে জানিয়ে যেতে হয়। আয়াজ ভেটো দিলে যাওয়া নিষেধ। ইরিন দুচার বার গোঁ ধরেছিলো, তাতে কোন লাভ হয় নি। মায়মুনা বেগম তার থেকে বেশি আয়াজকে বিশ্বাস করেন। আয়াজ অবশ্য তার কথার মান রেখেছে। খুব বেশি সমস্যা না হলে ইরিনের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে নি সে। কিন্তু ইরিন যতবার তার নিষেধ অমান্য করে কাজ করতে গিয়েছে একটা না একটা গণ্ডগোল পাকিয়েছেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলো সে। ভালো হয়েছে আসিফের সাথে যায় নি। ব্যাচের মেয়েরা আসিফের সম্পর্কে নানারকম আজেবাজে কথা বলে। ইরিনের সাথে তার তেমন কথাবার্তা হয় নি। ছেলেটা সত্যি সত্যি খারাপ কি না কে জানে? তবে আয়াজের ওপর রাগ কমলো না। আয়াজ নিজে ইরিনকে নিয়ে যাবে বলে বোকা বানিয়েছে। তার সাথে কোন কথা বলবে না ইরিন।

সন্ধ্যার দিকে বেলকনিতে হাঁটাহাটি করছিলো ইরিন। হালকা বাতাসে শীত লাগছে ওর, বসন্তের শুরু সবে তাই ঠান্ডা ভাব এখনো আছে। পুরো ফ্লোর ফাঁকা। মেক্সিমামই বাড়িতে চলে গেছে।
ফোনে ভাইব্রেশন হতে স্ক্রিনের দিকে তাকালো। আয়াজ কল করেছে
রিসিভ করলো না। আবারও রিং হলো। এবারেও কেটে গেলো। তৃতীয়বার রিসিভ করলো ইরিন,
~ হ্যালো!

~ দশমিনিট সময় দিলাম তোকে। রেডি হয়ে নিচে আয়। একমিনিট দেরী হলে বাসায় যাওয়া ক্যান্সেল।
ফোন কেটে গেলো। তড়িৎগতিতে রুমে ঢুকলো ইরিন। চিন্তাভাবনার কোন সময় পেলো না। ব্যাগে জামাকাপড় ঢুকিয়ে, গায়ের জামাটা গায়ে দিয়ে নিচে নামলো। আয়াজ ওকে দেখে মুচকি হেসে বলল,
~ এসে গেছিস? ভেরি গুড!
~ আপনি একটা হনুমান। আমাকে এভাবে দৌঁড় করালেন?
আয়াজ হাসিমুখে ওকে নিয়ে সামনে এগোলো।

আধঘন্টা ধরে ইরিন হস্পিটালে বসে আছে। আয়াজ ওকে বসিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকেছে তারপর আর কোন খবর নেই।
আরো পনেরো মিনিট বাদে বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে বেরিয়ে এলো সে। যদিও হাসিটা দেখেই ইরিনের রাগ পড়ে গেছে তবুও ওকে এতক্ষন বসিয়ে রাখার জন্য এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না সে।
আয়াজ হাসি হাসি মুখে বলল,

~ ছুটি পেয়েছি!
~ আপনি আমাকে পৌনে একঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে ছুটি নিতে গেছিলেন? , চেঁচিয়ে উঠলো ইরিন।
~ আরে না। ভেবেছিলাম তোকে দিয়ে আবার চলে আসবো, পরে ভাবলাম যাচ্ছি যখন দুদিন থেকে আসি। তাই ছুটি নিতে গেছিলাম। আয়, আয়! সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে।
~ সেটা আমাকে হোস্টেল থেকে বের করে নিয়ে আসার পর আপনার মনে পড়লো? আমাকে দশমিনিটের আল্টিমেটাম দিয়ে আপনি পৌনে একঘন্টা বসিয়ে রেখেছেন কেন?

~ তুই ইদানীং বেশ বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছিলি। তাই তোকে একটু শিক্ষা দিলাম। এবার চল!
আয়াজ ওর হাত ধরে গেট থেকে বের হতে নিলে ধমকে উঠলো ইরিন।
~ খবরদার আপনি আমাকে ধরবেন না। আমি আপনার সাথে কোন কথা বলবো না।
আয়াজ এবারও হাসলো। মাথা নাড়িয়ে বলল,
~ ঠিক আছে। মনে থাকে যেন?

ইরিনের রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। আয়াজের ভিলেনটাইপ হাসি দেখে। গেট থেকে বেরিয়ে রিক্সায় উঠলো দুজনে।
রিক্সায় বসে ইরিন ওর ডান হাতটা চেপে ধরতেই আয়াজ বলল,
~ এখন তুই আমাকে ধরেছিস কেন? ছাড় আমার হাত।

ইরিনের মনে হচ্ছে আয়াজ যেন আগে থেকেই জানতো রিক্সায় ঝাঁকুনি হবে তাই ইচ্ছে করেই ইরিনের কথার কোন প্রতিবাদ করে নি। কিন্তু এখন ইরিন না ধরে বসলে যে বিপদে পড়ে যাবে। রিক্সা যেই পরিমান ঝাঁকাচ্ছে তাকে যে কোন মুহূর্তে দুম করে নিচে পড়ে যাবে ইরিন। মিনমিন করে বলল,
~ রিক্সা ঝাঁকাচ্ছে, আমি পড়ে যাবো।

আয়াজ হাসল। ইরিনের হাতটা সরালো না। বলল, পড়বি না। শক্ত করে বসে থাক। পা দিয়ে সামনে ঠেস দে। আমাকে ছাড়!
ইরিন দাঁত বাকিয়ে কিড়মিড় করে বলল,

~ কেন আমার হাতের ছোঁয়া লাগলে কি আপনার গা পঁচে যাবে? নাকি চর্মরোগ হবে?
আবারও তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হলো। অল্পের জন্য রিক্সা থেকে পড়ে যেত ইরিন। আয়াজ ওর হাত চেপে ধরে কোনমতে সামলায়।
আয়াজ হাসিহাসি গলায় রিক্সাওয়ালা কে বলল,
~ মামা! আস্তে চালান না। বুঝেনই তো মহিলা নিয়ে উঠেছি পড়ে হাত পা ভাংলে তো সমস্যা!

রিক্সাওয়ালা পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে বলল,
~ রাস্তা খারাপ মামা! গাড়ির দোষ নাই।
এমনিতেই রিক্সার ঝাঁকুনিতে ইরিনের নাজেহাল দশা, তারওপর আয়াজের গা জ্বালানো কথাবার্তা! ওকে বলে কি না মহিলা? কোন দিক দিয়ে মহিলা সে? তার কি বিয়ে হয়েছে? নাকি ডজন খানেক বাচ্চা আছে? খবিশ একটা!

সোজা হয়ে রিক্সার একপাশে চেপে বসতেই আয়াজ ওর বাহু চেপে ধরলো, ছাড়লো না! টেনে নিজের কাছে নিয়ে গেলো ওকে। বিদ্যুৎ খেলে গেলো ইরিনের শরীরে, আয়াজ ওকে নিজের গায়ের সাথে লেপ্টে জড়িয়ে ধরেছে। আয়াজের পারফিউম মেশানো ঘামেভেজা শরীরের উন্মাদনা ওর হৃদয় ছড়িয়ে মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে।
~ শুঁটকির মত ফিগার বানিয়েছিস, বাতাসেও গড়াগড়ি খায়!

~ আমি মোটেও শুঁটকির মত না। রিক্সায় ঝাঁকুনি বেশি হচ্ছে তাই!
~ হু। ঝাঁকুনি শুধু তোরই লাগে। কই আমি তো ঠিকমতই বসে আছি।
ইরিন ভোঁতা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। সংগে সংগেই আয়াজ রিক্সাওয়ালাকে বলল,
~ মামা সামনে একটু রাখেন তো।

আয়াজ লাফ দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে গেলো। সম্বিত ফিরে পেয়ে ইরিন বলল,
~ কোথায় যাবেন আপনি?
~ তুই পাঁচমিনিট বয়। আমি আসছি, যাবো আর আসবো।
~ কিন্তু আপনি যাচ্ছেন কোথায়?

~ বাসার জন্য কিছু নিবো।
~ আসার সময় আমার জন্য আইস্ক্রিম নিয়ে আসবেন।
আয়াজ ইরিনকে অনুকরণ করে বলল,
~ আসার সময় আমার জন্য আইস্ক্রিম নিয়ে আসবেন। শখ কত! আমার টাকা কি কোৎকোৎ করে? তুই আমার আগের টাকাও তো দিস নি।
~ এমন করেন কেন আয়াজ ভাই?

আয়াজ আবারও মেয়েলি সুরে ভেঙ্গালো,
~ কারন টাকা টা যে আমার হরিণ আপু!
~ ঠিক আছে। না আনলে না আনবেন। কিন্তু মনে রাখবেন আইস্ক্রিম না আনলে আপনি একটা মেয়ে!
কথাটা বলেই ফিক করে হেসে দিলো ইরিন। আয়াজ ধমকে উঠে বলল,
~ এই কি বললি তুই? অসভ্য, ফাজিল, বেয়াদপ! হোস্টেলে গিয়ে এইসব শিখেছিস?

ইরিন মুখে হাত দিয়ে আসছে। আয়াজ দাঁতেদাঁত চেপে বলল,
~ বাসায় যাই তারপর তোর হাসি আমি বের করবো! ফাজিলের ফাজিল!
আয়াজের রাগী চেহারা দেখে ইরিন হাসি থামানোর ভঙ্গি করে আবারও হেসে ফেললো।

পর্ব ৯

ছুটি কাটিয়ে হোস্টেলে ফিরে এলো দুজনে। আগের মতই খোঁচাখুঁচি চলমান। কখনো সরাসরি কখনো ফোনে। বেশিরভাগ সময়ই ফোনে হয়। কারন আয়াজ ব্যস্ত থাকে। ওর দেখা খুব কমই পায় ইরিন।
তবে আজকে ইরিনের মন ভালো। তার এক বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সবাইকে দাওয়াত করেছে। আয়াজকে ফোন করে দেখা করার কথা জানালো। হাতে খানিকটা সময় থাকায় আয়াজও রাজী হয়ে যায়।

দুজনে মিলে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে ওরা।
আয়াজ কফি খাচ্ছে, চোখ দুটো হাতে থাকার ফোনের স্ক্রিনের দিকে, একমনে কি যেন দেখছে। ইরিন হাতের তালু ঘষছে। অনেক্ষন যাবত চিন্তাভাবনা করেও কোন রকম আশার আলো খুঁজে পেলো না সে। তবুও একবার বলে দেখবে যদি রাজী হয়।
~ আয়াজ ভাইয়া? ও আয়াজ ভাইয়া?
~ শুনছি বল।

~ একটা কথা আছে।
~ শুনছি তো বলনা?
~ আমার একটা ফ্রেন্ড আছে না রিতু?
~ হুম আছে।
~ ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামীকাল গায়ে হলুদ।
~ তো?

ইরিন ইতস্তত করছে। আয়াজ ভ্রুজোড়া কুঁচকে বলল,
~ এখন কি তোর বিয়ে করার শখ জেগেছে? শখ জাগলেও কোন লাভ নেই, এই বিষয়ে আমি আন্টিকে কিছু বলতে পারবো না। দেখা যাবে উনি কি ভাবতে কি ভেবে বসে আছেন। তোর যদি বিয়ে করার খুব বেশি শখ হয়ে থাকে তুই নিজে গিয়ে বল।
~ উফফ! আপনি সহজভাবে কিছু ভাবতে পারেন না?

~ বিয়ের মত জটিল একটা বিষয়কে সহজ করে ভাবতে যাবো কেন?
~ ঠিক আছে ভাবুন! ভাবতে ভাবতে আপনি ভাবনাবিদ হয়ে যান, কিন্তু দয়া করে আমাকে পুরো কথাটা শেষ করতে দিন।
~ ঠিক আছে বল, তবে তোর বিয়েশাদী নিয়ে কিছু হলে কিন্তু আমি এর মধ্যে নেই!
~ আবার?
~ আচ্ছা, বল, বল।

~ আমার বান্ধবীরা সবাই রিতুর গায়ে হলুদে যাবে। আমাকেও জোর করছে!
~ তুই তো বাচ্চা না যে তোকে জোর করবে?
~ হ্যাঁ আমি বাচ্চা না। কিন্তু ওরা আমাকে জোর করছে। সবাই যাবে।

~ ওরা কি বলছে তুই না গেলে তোকে টেনে নিয়ে যাবে, নাকি ওরা বলেছে যে তোকে কোলে করে নিয়ে যাবে?
~ আপনি আম্মাকে একটু ফোন দিয়ে বলেন না!

আয়াজ ফোন বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল, কেন আমি বলবো কেন? তুই যেতে চাস তুই বলবি! আমাকে টানছিস কেন? তুই আবার আমাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছিস না তো?
ইরিন মনে মনে ভেংচি কাটলো, হ্যাঁ! আপনাকে সাথে নিয়ে যাই তারপর আপনি আমার আনন্দের বারোটা বাজিয়ে দেন! জীবনেও না! আপনি নিজে বললেও আমি আপনাকে নেবো না!

~ আরে না। আমি বলছি যদি আপনি বলেন তাহলে আম্মা রাজী হবে, তাই।
~ তারমানে তুই আমাকে যেতে বারণ করছিস? মতলব কি তোর? আমি গেলে তোর কি? সমস্যা হয়ে যাবে? হাংকি পাংকি করতে পারবি না তাই তো?
~ আশ্চর্য! আমি আপনাকে যেতেও বলছি না আবার বারণও করছি না। আমি শুধু বলছি আপনি আম্মাকে ফোন দিয়ে একটু বলে দিলে ভালো হত!
~ বাসা কোথায় তোর বান্ধবীর?
~ চিটাগাং।

আয়াজ চোখ উলটে ফেললো। যেন ইরিন কোন ভয়াবহ কথা বলে ফেলেছে। বিস্মিত কন্ঠে বলল,
~ তুই ঢাকার বাইরে যাবি? এত সাহস তোর? আবার আমাকে দিয়ে দালালী করাতে এসেছিস? যা ভাগ!
~ প্লিজ আয়াজ ভাই!
~ দেখ ইরিন আমি এই ব্যাপারে নেই। তোর যদি খুব যেতে ইচ্ছে করে তুই আন্টিকে গিয়ে বল। আমি পারবো না। আমার পক্ষে তোকে ঢাকার বাইরে একা ছাড়ার কথা আন্টিকে বলা কিছুতেই সম্ভব না।

আয়াজ উঠে চলে গেলো। ইরিন হতাশ হয়ে বড় একটা নিশ্বাস ফেললো, তারমানে রিতুর বিয়েতেও ওর যাওয়া হচ্ছে না? সবাই কত মজা করবে আর সে হোস্টেলে বসে বসে আফসোস করবে! আহা! জীবন!

বাস এসে গেছে। পুরো আপাদমস্তক বোরখা দিয়ে ঢাকা ইরিনের। হাত মোজা, পা মোজা সব পরেছে সে। কিন্তু বাসে উঠতেই বড়সড় ধাক্কা খেলো। আয়াজ বসে আছে! হায় আল্লাহ উনি কি জেনে গেছেন যে ইরিন রিতুর বিয়েতে যাচ্ছে? ইয়া আল্লাহ! রক্ষাকরার মালিক তুমি। ইরিন নেমে যেতে নিলো। আসিফ নামের ছেলেটা হঠাৎ ওর কনুই চেপে ধরে বলল,
~ কেউ তোমাকে চিনবে না। নিশ্চিন্তে বসো।

ইরিন চমকে গেলো। আসিফ কি করে জানলো ইরিন ভয় পাচ্ছে। বোরখার ভেতর দিয়ে ইরিনকে চিনলো কি করে সে? কৌতুহল দমন করে সীটের দিকে এগোলো।
আয়াজের পেছনের সীট ওর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, আল্লাহ আল্লাহ করে আয়াজের পাশ কাটিয়ে গেলো, কিন্তু কোন রিয়েকশন পেলো না। আয়াজ ফোন নিয়ে ব্যস্ত! স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো ইরিন। যাক আপাতত বাঁচা গেলো। কিন্তু আয়াজ বাসে কেন? সে-ও কি যাবে? কেন?
যাত্রা শুরু হতেই পুরো বাস জুড়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হলো। সবাই হৈ হুল্লোড় করছে। আর ইরিন? চুপচাপ বসে আছে। কথা বললেই সর্বনাশ! গলা চিনে ফেলবে আয়াজ!

~ এই ইরিন একটা গান ধর না?
কথাটা বলেই জিভ কাটলো ইত্তিহাদ! ইরিন দাঁতমুখ বিচ্ছিরিভাবে খিঁচে ফেললো, সাবধানে আয়াজের দিকে তাকালো। নাহ! আয়াজ কানে হেডফোন লাগিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।
ইত্তিহাদ কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
~ সরি, দোস্ত মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।

~ উনি টের পেলে কি হবে জানিস? আমার ওপর আজাব নাজিল হবে!
~ সরি, সরি, আর হবে না।
রিতুদের বাড়িতে পৌঁছানো পর, সবার শেষে বাস থেকে নামলো ইরিন। কোনভাবেই আয়াজ ক্রস করতে চায় না সে। ধরা খেলে সর্বনাশ!

ভেতরে আসার পর রিতুর কাছ থেকে জানতে পারলো ইরিন বরের ছোটভাই আয়াজের বন্ধু। ইরিনের ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। ভীষণ বোকামি করে ফেলেছে এখানে এসে, পুরোপুরি ফেঁসে গেছে। একবার যদি আয়াজ জানতে পারে সে এখানে এসেছে তাহলে ওর হাড্ডিমাংস গুঁড়া হওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। মায়মুনা বেগম ওকে মেরেই ফেলবেন।

পরেরদিন সকাল থেকেই হলুদের আয়োজন চললো। ইরিন আসামী মত লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। সন্ধ্যের দিকে আয়াজ সেজেগুজে হিরো হয়ে বেরিয়েছে। সাদা পাঞ্জাবির ওপর হলুদ কোটি! তার সাথে চুড়িদার পায়জামা! চুলগুলো স্পাইক করা! গলায় ক্যামেরা ঝোলানো!
অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

ইরিন আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে ফলো করছে। স্টেজের কাছে সবাই আনন্দ করছে, কিন্তু সে যেতে পারছে না। তবে খুব বেশি আফসোস হচ্ছে না। তার দৃষ্টি আয়াজের দিকে। বেশ লাগছে আয়াজ নামক বদ ছেলেটাকে।

হলুদ প্রোগ্রাম শেষ হতে হতে অনেক দেরী হয়ে গেলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো সবাই। কেবল ঘুম আসছে না ইরিনের। অন্যদের মত সে লাফালাফি কতে পারে নি। সে ছিলো লুকিয়ে লুকিয়ে। ঘুম আসছে না দেখে এপাশ ওপাশ করছিলো সে। তারপর দরজা খুলে চুপিচুপি উঠানে বেরিয়ে গেলো। আলোতে ঝলমল করছে চারদিক! পুকুরপাড় সহ পুরো বাড়ি লাইটিং করা হয়েছে।

পুকুরপাড়ে সিঁড়ির ওপর গিয়ে বসলো ইরিন, ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস বইছে, ঝিঁঝিঁ পোকার। ডাক, মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ!
আচমকা বিকট আওয়াজে চিৎকার শুনে লাফিয়ে উঠলো। ইত্তিহাদের গলা মনে হচ্ছে! ভূত, ভূত বলে অনবরত চিৎকার করছে, ইরিন লাফ দিয়ে উঠে গেলো। তারপর কোন কিছু না ভেবেই এক দৌঁড়ে ঘরের ভিতর! বুক ধড়ফড় করছে! সাঙ্ঘাতিক ভয় পেয়েছে সে।

উঠানে মানুষ জমা হয়ে গেছে। রিতুর চাচা, আয়াজ, রিতুর বড়ভাই, বর সবাই উঠে চলে এসেছে ইত্তিহাদের চিৎকার শুনে।
রিতুর বড়চাচা গম্ভীর গলায় বললেন, বাত্তির আলোয় চারদিকে ফকফক করতেছে, ভূত আসবো কই থেইক্যা?
~ আমি দেখেছি চাচা। চুল ছেড়ে দিয়ে পুকুর পাড়ে বসে ছিলো।
উনি টর্চ নিয়ে পুকুর ঘাটে নামলেন। ইত্তিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
~ কোন সিঁড়িতে বসা দেখছো?

ইত্তি হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলো। ইরিন ঘরের ভেতর জানালা দিয়ে সব দেখছে। ইত্তিহাদের বাচ্চা ওকে দেখে ভূত ভেবেছে, ওকেও ভয় পাইয়ে দিয়েছিল! বলদের বলদ! এতজোরে কেউ চিৎকার দেয়? ভীতুরাম!
আয়াজ ইত্তিহাদের পিঠে চাপড় দিয়ে বললেন, আয় চল ঘুমাবি। ঘুমের ঘোরে মাঝেমধ্যে এমন হয়। আয়!
ইত্তিহাদ করুণ চোখে আয়াজের দিকে তাকালো। আফসোস হচ্ছে তার। কথা তার কেউ বিশ্বাস করছে না!

বিয়েরদিন সকালবেলা ইরিন চুপিচুপি ইত্তিহাদের রুমে ঢুকলো। ইত্তিহাদ বোধহয় ঘুমাচ্ছে! রাতের ঘটনাটা খুলে বলবে ভেবেই ভেতরে ঢুকেছিলো সে।
কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ভয়ে জমে গেলো। ইত্তিহাদ নয় খাটের ওপর আয়াজ শুয়ে আছে। ইরিন যেভাবে এসেছিলো চুপিচুপি আবার সেভাবে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো, কিন্তু হাতে বাধা পড়লো, পেছন ফিরে দেখলো আয়াজ ওর হাত ধরে রেখেছে।

ইরিনের হাতপাঁ কাঁপছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ভয়ে। বুক ধড়ফড় করছে, আয়াজ এবার ওর কি অবস্থা করবে আল্লাহই জানে, মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে নিলো সে!
~ দরজা বন্ধ করে আয়।
~ দরজা বন্ধ করবো কেন?

ইরিনের ভয় করছে, দরজা বন্ধ করে আয়াজ কি তাকে শাস্তি দেবে?
~ কথা আছে তোর সাথে।
~ আমি রেডি হবো, আপনার কিছু বলার থাকলে পরে বলবেন।
~ ইরিন? তুই কেন শুধু শুধু নাটক করছিস?

ইরিন দরজা বন্ধ করে খাটের কাছে দাঁড়ালো। আয়াজ কিছু বললো না, ঘাড়ের কাছে হাত রেখে উলটো হয়ে শুয়ে পড়লো।
~ এদের বিছানাগুলো প্রচুর শক্ত, রাতে ভালোমত ঘুমাতেও পারি নি, শেষরাতে যা-ও একটু চোখ লেগে এসেছিল তোর ভূতনীগিরিতে সেটাও উধাও হয়ে গেলো। চুল ছেড়ে দিয়ে পুকুরঘাটে বসে ছিলি কেন? এই জন্যই তোকে একা ছাড়তে চাই না।

ইরিনের বুকটা ধক করে উঠলো, তারমানে আয়াজ আগে থেকেই জানতো যে ইরিন এখানে এসেছে? কিন্তু কীভাবে?
~ ঘাড় প্রচণ্ড ব্যথা করছে। আমার ব্যাগে লাল রংয়েরর একটা মলম পাবি, পেইন কিলার। নিয়ে আয়।
ইরিন ব্যাগ খুলে মলমটা পেলো।
~ আমি মালিশ করে দিই?
~ আয়।

ইরিন ঘাড়ে মালিশ করে দিচ্ছে। আয়াজ আরামে চোখ বন্ধ করে আছে।
~ আয়াজ ভাই?
~ হু?
~ আম্মাকে কিছু বলবেন না প্লিজ!
~ কোন ব্যাপারে?

~ প্লিজ!
আয়াজ আরামে উউউউ! করে উঠলো।
~ সত্যি কিছু বলবেন না?

~ আমি কখন বলেছি কিছু বলবো না?
~ তাহলে ‘উউ’ করলেন কেন? প্লিজ আয়াজ ভাই প্লিজ আম্মাকে বলবেন না, প্লিজ, প্লিজ।
~ কেন বলবো না?

~ আম্মা আমাকে মেরে ফেলবে।
~ সেই ভয় আগে ছিলো না? এখানে আসার আগে? এখন ধরা খেয়ে তারপর মনে পড়লো?
~ আর হবে না, আমি সত্যি বলছি এইবারই শেষ।
আয়াজ সামনে ঘুরলো। ইরিন থেমে গেছে। ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো সে। আয়াজ শীতল কন্ঠে বলল,
~ সত্যি বলছিস তো? আর হবে না?

~ হবে না।
~ ঠিক আছে যা, বলবো না।
ইরিন দরজা খুলে আস্তে করে বেরিয়ে গেলো। আয়াজ হাসছে। মিটমিট করে হাসছে। ঘাড়ের কাছে হাত রেখে নিশ্বব্দে হাসছে।

পর্ব ১০

একটু পর আবার ফিরে এলো ইরিন। আয়াজ তখন উপুড় হয়ে শুয়েছিলো। ইরিনের গলার আওয়াজ পেয়ে সামনে ঘুরলো। ইরিন ইতস্তত করে বলল,
~ একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
আয়াজ মোটামুটি আন্দাজ করে নিয়েছে ইরিন কি জানতে এসেছে। হেয়ালি করে বলল,
~ শুধু একটা?

ইরিন প্রসঙ্গ পাল্টাতে দিলো না। সরাসরি প্রশ্ন করলো সে,
~ আপনি হুট করে এখানে কেন এসেছেন আয়াজ ভাই? আপনি কি আগে থেকেই জানতেন আমি বিয়েতে আসছি? কিন্তু কীভাবে? কার কাছ থেকে?
আয়াজ হাসলো। রহস্যজনক হাসি। ইরিন ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে।

~ কি হলো? চুপ করে আছেন যে?
আয়াজ টেবিলের পাশে রাখা তার ফোনটা ইরিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
~ চার্জে লাগিয়ে দে তো।

ইরিন হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলো। কিন্তু সাথে সাথে কানেকশন দিলো না। বলল,
~ আমার উত্তর?
~ আমি জানি না।
~ আপনি তাহলে বলবেন না?

ইরিন রেগে গেলো। আয়াজ আবারও হাসলো। হাসি হাসি মুখে বলল,
~ তোর এত কৌতুহল কেন? তুই আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলি আমি যেন তোর এখানে আসার কথা আন্টিকে না জানাই, আমি জানাবো না বলেছি। বাকি কে, কি, কেন এলো এসবের তোর কি দরকার?
~ এর মানে কি দাঁড়ালো? আপনি আমাকে বলবেন না তাইতো?
~ ইয়েস। নাউ গো ফ্রম হিয়ার।

ইরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা চার্জে লাগালো। আয়াজের মুখ থেকে কোন কথা বেরোবে না সে ভালো করে বুঝে গেছে। ফোন চার্জে লাগিয়ে বেরিয়ে এলো।
আয়াজ হাসলো। ইরিন বড্ড বোকা। সে জানে না, তার বিশ্বস্ত বন্ধু ইত্তিহাদই আয়াজের ইনফর্মার। অসম্ভব ভালো একটা ছেলে। সে-ই ইরিনের লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়েতে এটেন্ড করার ঘটনা আয়াজকে জানিয়েছে। পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ইরিনের একা একা বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়াটা ইত্তি সমর্থন করতে পারে নি। যদিও সে মনে প্রানে চাইছিলো ইরিন তাদের সাথে যাক। কিন্তু কাউকে না জানিয়ে যাওয়াটা রিস্কি। বিপদ আপদের কোন সময়জ্ঞান নেই। কখন কি হিয়ে যায় বলা যায় না। তাই অবশ্যই ফ্যামিলি মেম্বার দের কাউকে জানিয়ে যাওয়া উচিৎ। ইরিনকে অনেক বুঝিয়েছে সে। কিন্তু ইরিন কিছুতেই বাসায় জানাবে না। অবশেষে বাধ্য হয়ে আয়াজকে খবরটা দিলো সে। আয়াজের সাথে তার ভালো সম্পর্ক। এমনকি ইরিনের সাথে আয়াজের বিয়ের কথাটা একমাত্র তাকেই জানিয়েছে আয়াজ।

বিয়েতে খুব সাজলো ইরিন, একেবারে জমকালো সাজগোজ! লাল টুকটুকে লেহেঙ্গার সাথে ম্যাচিং গোল্ডেন স্টোনের গয়না! ভারী মেকাপ, বেশ গর্জিয়াস লাগছে ওকে। ইতোমধ্যে অনেকের কাছ থেকেই প্রশংসামূলক অনেক কিছু শুনে ফেলেছে সে।
সোহাগ ছেলেটাকে আয়াজ সুবিধার লাগছে না, রিতুর খালাতো দেবর, এসেছে থেকেই ইরিনের ওপর চোখ! চোখে চোখে রাখতে হবে ব্যাটাকে।

একটুপরই শোরগোল শুরু হলো। বর এসে গেছে ইরিন ফুলের ডালা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলো, অসাবধানতাবশত সোহাগের সাথে ধাক্কা খাওয়ায় ফুল সব দুজনের মাথার পড়ে, ইরিনের ওড়নাটা হিন্দি ফিল্মের নায়িকাদের মত সোহাগের বাহুতে আটকে যায়।
আর তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো আয়াজ! পড়বি তো পড়, একেবারে মালির ঘাড়ে?
ইরিন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আয়াজের দিকে তকিয়ে আছে। আয়াজ একমুহূর্ত চেয়ে থেকে পাশ কাটিয়ে নেমে গেলো!
সোহাগের মুগ্ধতার সাগর তখন আবেগে টইটুম্বুর!

মোহনীয় দৃষ্টিতে ইরিনের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ইরিনের মেজাজ বিগড়ে গেলো। কিন্তু সেটা সোহাগের চোখে ধরা পড়লো না।
আসার পর থেকেই মেয়েটিকে ওর ভালো লাগে। এমনিতেই বাসায় ওর বিয়ের কথাবার্তা চলছে।
তার দৃঢ় বিশ্বাস ওর মত হ্যান্ডসাম, বিসিএস কেডার প্রফেসরকে যে কোন মেয়ের বাবাই জামাই বানাতে রাজী হয়ে যাবে।
তাই আগে খানিকটা বাজিয়ে দেখতে চাইছে ইরিনকে।

ইরিনের মুখ খুলতেই ওর আবেগের সাগর নিমিষেই মরুভূমির মত শুকিয়ে গেলো।
~ চোখ পকেটে রেখে হাঁটছিলেন? সব ফুল পড়ে গেলো! হাঁ করে আছেন কেন? মুখ বন্ধ করুন!
~ এভাবে কথা বলছো কেন? মেয়েদের কথা হবে নমনীয়, এমন কর্কশ নয়।

~ আপনি আমার কে লাগেন যে আমি আপনার সাথে লুতুপুতু গলায় কথা বলবো?
~ অপরিচিত কারো সাথে ভদ্রভাবে কথাবলা নরমাল ম্যানার্স এর মধ্যে পড়ে।
~ আর অপরিচিত একজন মেয়েকে তুমি বলা? রামছাগল!

ইরিন গটগট করে চলে গেলো। সোহাগ দাঁত খিঁচড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কতবড় সাহস হাটুর বয়সী একটা মেয়ে ওকে রাম ছাগল বলে গেলো? ওর মত ব্রিলিয়ান্ট একজন প্রফেসর এর এই মর্যাদা? দেশ আসলেই রসাতলে যাচ্ছে!

ইরিন স্টেজে বউয়ের পাশে বসে ছিলো। ইত্তি এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
~ তোকে আয়াজ ভাই ডাকছে।
~ কেন?

~ আমি জানি না। আমাকে বলেছে তোকে ডেকে নিয়ে যেতে।
ইরিন চারপাশে চোখ বুলালো। স্টেজ থেকে কিছুটা দূরে আয়াজ ফোনে কথা বলছে। ভালো করে খেয়াল করলো সে। আয়াজের মুড কি ঠিক আছে? সে কি ইরিনের ওপর রেগে আছে? সোহাগ গাধাটা এখনো ইরিনের পিছু ছাড়ছে না। স্টেজের পাশে ঘুরঘুর করছে। ইরিন বিরক্ত হয়ে উঠে আয়াজের কাছ চলে গেলো।
আয়াজ সরাসরি ইরিনের দিকে তাকিয়েই কথা বলছে। অস্বস্তি লাগছে ইরিনের। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে রইলো। আয়াজের মতিগতি কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ভয় লাগছে তার! সকালের ঘটনার জন্য আয়াজ কি এখন তাকে বকাঝকা করবে? উফফ! কেন এই বিয়েতে এসেছিলো সে? আসার পর থেকেই একটা না একটা ক্যাড়াকলে ফেঁসেই যাচ্ছে। আয়াজ ফোন রেখে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
~ সোহাগ তোকে কি বলেছে?

~ কোন সোহাগ?
~ যাকে তুই ফুল দিয়ে বরণ করেছিস, সেই সোহাগ!
~ আই লাভ ইউ!
~ -কী?

~ আই লাভ ইউ।
আয়াজ হতবম্ভ হয়ে চেয়ে রইলো। ধীরে ধীরে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। চাপা কন্ঠে বলল,
~ ইরিন আমি তোর সাথে মজা করছি না। আমি জানতে চাইছি সোহাগ তোকে কি বলেছে?
~ আই লাভ অউ।

~ ইরিন শেষবারের মত জিজ্ঞেস করছি, এবার কিন্তু ঠাস করে গালে একচড় বসিয়ে দেবো।
~ কি আশ্চর্য আয়াজ ভাই? আপনি কানে শুনতে পান না? আমি কতবার করে আপনাকে বলছি, সোহাগ আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে। তাও আপনি আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছেন? এর মানে কি?

~ ফালতু কথা বলবি না একদম। ও তোকে প্রথম দেখাতেই আই লাভ ইউ বলতে যাবে কেন? তুই আমার সাথে মশকরা করিস?
~ প্রথম দেখাতে কে বলল? সে নাকি আমাকে স্বপ্নে দেখেছে। আমি নাকি তার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার মত সুন্দরী!
~ ইরিন? আমার সহ্যের সীমা অতিক্রম করিস না।

~ সত্যি বলছি তো। বিশ্বাস হচ্ছে না? আপনাকে ছুঁয়ে বলবো?
~ তুই কি এখানে এসেও আমার হাতে মার খেতে চাস? এখন যদি আমি তোর গালে কষে একটা চড় লাগাই, তারপর কি বলবি? আয়াজ ভাই খারাপ, আয়াজ ভাই জঘন্য, আয়াজ ভাই অসভ্য
~ আপনি তো খারাপই। আপনাকে ভালো বললো কে?

~ তুই বলবি না সোহাগ তোকে কি বলেছে?
ইরিন না-সূচক মাথা দোলালো। দুষ্টু হেসে বলল,
~ আপনিও তো আমাকে বলেন নি, আপনি কার কাছ থেকে আমার বিয়েতে আসার খবর পেয়েছেন? তাই আমিও বলবো না।
ইরিন ওড়না দোলাতে দোলাতে চলে গেলো। আয়াজ চোখমুখ লাল করে বসে আছে। তার ধারণা ভুল। এই মেয়ে মোটেও বোকা নয়। হাড়ে হাড়ে শয়তান!

পর্ব ১১

ঘটনা এতদূর গড়াবে ইরিন স্বপ্নেও ভাবে নি। মাস তিনেক বাদে সোহাগ বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। হাদারাম লোকটাকে এত অপমান করার পরেও বেহায়ার মত আবার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। বিয়ে বাড়িতে তো কম অপমান করেন তাকে।

একে একটা শিক্ষা দিতে হবে সেই সাথে আয়াজকেও। মনে মনে ফন্দি এঁটে নিলো সে। মায়মুনা বেগম যতই না করতে চান ইরিন ততই উৎসাহ দেখায়। অবশেষে মায়মুনা বেগমনে তার সিদ্ধান্ত জানালো। বিয়ে করলে সোহাগকেই করবে। মায়মুনা বেগম অস্থির হয়ে হেলাল সাহেবের সাথে আলাপ করেছেন। হেলাল সাহেব হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। উনার ধারণা ইরিন আয়াজের সাথে ঝগড়া বাধিয়ে এমন কথা বলছে। কিন্তু মায়মুনা বেগম তো নিজের মেয়েকে চেনেন। উনার পেটের হলে কি হবে, আগাগোড়া শয়তানিতে মোড়া। দুশ্চিন্তায় উনার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে আয়াজের ইন্টার্নি শেষ! বিসিএসও হয়ে গেছে। পনেরো দিন পর জয়েনিং! বেসরকারি একটা হস্পিটালে ডিউটি ডাক্তার হিসেব জয়েন করেছে আপাতত। সকাল দশটায় বেরোয় ফিরে রাত নয়টায়। সারাদিন আর বাসায় আসা হয় না।

আজকে ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার সময় লিফটে ইরিনের সাথে দেখা হয়ে গেলো ওর। হাতে একগাদা শপিং ব্যাগ, সাথে ওর কাজিনরা। আয়াজের সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলো। আয়াজও এত লোকের মাঝখানে কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
রাতে খেতে বসে মুক্তা জানালো আগামী কাল ইরিনের গায়ে হলুদ! আয়াজ হাত মন্থর হয়ে গেলো, প্লেটের চারপাশে আঙ্গুল বোলাচ্ছে আর ভাবছে, ইরিন কি সত্যি সত্যি বিয়ে করছে? আশ্চর্য! ওকে একটাবার জানালোও না?

খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলো সে। তার খানিকক্ষণ বাদে মায়মুনা বেগম ওদের ফ্ল্যাটে এলেন আয়াজের সাথে পরামর্শ করতে। সব শুনে আয়াজ কিছুই বললো না। কেবল শান্তকন্ঠে বললো,
~ ওর যা ইচ্ছে ওকে করতে দিন আন্টি।
অনেক রাত পর্যন্ত মায়মুনা বেগম আয়াজদের ফ্ল্যাটে বসে ছিলো। কিন্তু কোন সুরাহা করতে পারে নি। ইরিনের বাবা না থাকলে মেরে পিঠের চামড়া তুলে ফেলতে উনি। বদ মেয়ে, নিজের বিয়ের পাত্র নিজে ঠিক করেছে। বেহায়ার মত আবার শপিং নিজে করছে।

পরেরদিন সকালে আয়াজ আর থাকতে পারলো না। ফ্রেশ হয়ে সোজা ইরিনদের ফ্ল্যাটে গেলো। ইরিন তখন মাত্র শাওয়ার দিয়ে বেরিয়েছে। আয়াজকে দেখেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কি ব্যাপার আয়াজ ভাই? আপনি আমার রুমে? জানেন তো আজকে আমার হলুদ কালকে বিয়ে। কে কোনখান দিয়ে দেখে ফেলে এভাবে আমার রুমে আসাটা আপনার একদমই ঠিক হয় নি।
~ -তুই যে একটা ম্যানিয়াক পেশেন্ট তুই জানিস?

~ না তো? তাই নাকি? আপনি প্লিজ কাউকে কিছু বলবেন না আমার বিয়ে ভেঙ্গে গেলে সর্বনাশ! অনেক কষ্টে আমার জন্য একটা ভালো পাত্র জোগাড় হয়েছে। বিসিএস কেডার, কে জানেন? সোহাগ! চিনেছেন? রিতুর খালাতো দেবর, যাকে আমি ফুল দিয়ে বরণ করেছিলাম, সেই সোহাগ!
আয়াজ রাগে ফেটে যাচ্ছে। বিয়ে বাড়িতে ইরিনকে সোহাগের ব্যাপার নিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছে আয়াজ। তাই বলে ইরিন এভাবে শোধ নিবে সে ভাবতেই পারে নি।
ফট করে ইরিনের চুলগুলো মুঠোয় নিয়ে বলল,

~ তুই আমার সাথে তেজ দেখাচ্ছিস? আমি তোর তেজের ধার ধারি? এতবড় সাহস তোর হলো কি করে? বিয়ে করার খুব শখ হয়েছে না?
~ হয়েছে তো। খুব শখ হয়েছে। রিতুর বিয়ে দেখে আরো বেশি করে হয়েছে। আপনিও করে ফেলুন। বয়স তো আর কম হয় নি।
~ চুপ বেয়াদপ।
~ এখানে বেয়াদপির কি হলো?
আয়াজ হতাশ হয়ে বলল,
~ আমি আগে জানতে তোকে মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতাম।
~ আপনি বসবেন না বেরোবেন?

আয়াজের রাগ ক্রমাগত বাড়ছে, সে এত রাগ দেখাচ্ছে অথচ ইরিনের ভাব দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি, ওর বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছে আয়াজ! রাগ সামলানোটা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এইমুহূর্তে ইরিনের সামনে থেকে চলে যাওয়াটাই উত্তম। ইরিনকে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো সে।
মায়মুনা বেগম ঘর আটকে বসে আছে। তার মেয়ে এভাবে সবার সামনে তাকে ছোট করবে তিনি ভাবতেই পারেন নি। হেলাল সাহেবের সামনে যেতে উনার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। গতকাল সোহাগের বড় বোন এসে ইরিনকে আংটি পরিয়ে গেছে। তিনি হাঁ হয়ে বসে ছিলেন। মেহমান এলে তো আর তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া যায় না? অবশেষে ওরা চলে গেলে ইরিনকেই ডেকে বললেন,
~ তোর সাথে আয়াজের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে সেটা কি তুই জানিস?

ইরিন রীতিমত আকাশ থেকে পড়লো। মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল রক্তস্রোত বয়ে গেলো। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। খুশিতে লাফিয়ে উঠতে মন চাইছে। মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাবে সে। কিন্তু প্ল্যান? সোহাগকে তো একটা শিক্ষা দিতে হবে। আজকে হলুদের প্রোগ্রামের আয়োজনও হয়ে গেছে। ইরিনের ইচ্ছে ছিলো হলুদ অনুষ্ঠান করে একটু মজা নিবে সোহাগের সাথে। তারপর বিয়ের দিন ফোন বন্ধ করে কোন এক বান্ধবীর বাসায় উঠবে। সেই সাথে আয়াজেরও একটা শিক্ষা হয়ে যাবে। তার দৃঢ় ধারণা আয়াজ তাকে ভালোবাসে। কিন্তু স্বীকার করছে না। কিন্তু এখন যখন আয়াজের সাথে তার বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে আছে তখন সোহাগকে একটা শিক্ষা দেওয়াই যায়। তাই ইত্তিহাদের সাথে পরামর্শ করে বাসার কাউকে কিচ্ছু জানালো মা সে।
এদিকে সব কথা খুলে বলার পরেও মেয়ের সাহস দেখে মায়মুনা বেগম অবাক হয়ে যাচ্ছেন। তিনিও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, এর শেষ তিনি দেখে ছাড়বেন। করুক সোহাগকে বিয়ে ইরিন। তিনি আর কিচ্ছু বলবেন না।

সন্ধ্যার দিকে আয়াজ সেজেগুজে ছাদে এসে হাজির হলো, এসেই হুলস্থূল! চারদিকে ছোটাছুটি দৌঁড়াদৌঁড়ি, ইরিনের বিয়ের সব দায়িত্ব যেন সে একাই নিয়েছে। ইরিন হাঁ করে শুধু তার কান্ড দেখে গেলো। ইরিনের কাজিনগুলোর সাথে আয়াজের মাখামাখি দেখে গা শিরশির করে উঠলো তার, ইচ্ছে করছে স্টেজ থেকে নেমে সবকটার গালে চুনকালি মাখিয়ে দিতে! আর আয়াজ? ওকে তো গোবরপানিতে চুবাতে মন চাইছে, ইরিন সামান্য একটু হাত ধরলে তার হাতে যেন ফোস্কা ড়ে যায়, অথচ এখন মেয়েগুলোর সাথে দিব্যি ফষ্টিনষ্টি করছে, ছিহ! ডাআয়াজ রহমান! ছিহ! এই আপনি? এই আপনার ভালোমানুষি?

মজার ব্যাপার হচ্ছে মুরুব্বি গোছের কেউই নেই। এমনকি ইরিনের বাবাও নেই। ইরিনের কাজিনরা, বন্ধুবান্ধব এরাই মজা করছে। ইরিনের সন্দেহ হচ্ছে আয়াজ কি কোনভাবে তার প্ল্যান সম্পর্কে জেনে গেছে? এত নির্লিপ্ত থাকছে কি করে সে? আয়াজকে রাগাতে কি উলটো ইরিনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ছাদ থেকে নেমে সোজা মায়মুনা বেগমের ঘরের দিকে গেলো সে। মায়মুনা বেগম হাই পাওয়ারের ওষুধ খেয়েও প্রেশার কন্ট্রোল করতে পারছে না। এই মেয়ে শক দিয়ে দিয়ে উনাকে মেরে ফেলবে! কি পেয়েছে টা কি সে? সে যা বলবে তাই হবে? কলেজে উঠার পর থেকেই এই মেয়ের লাগামছাড়া চালচলন শুরু হয়েছে, দিনদিন বাড়ছে তো বাড়ছে! কত বড় স্পর্ধা বিয়ের সব আয়োজন করে, হলুদ প্রোগ্রাম করে এখন বলছে বিয়ে করবে না? উনি কিছুতেই রাগ সামলাতে পারছেন না। ঘাড়ের রগ চিনচিন করছে, এই মেয়ে উনাকে কবরে নিয়ে শান্তি পাবে। ঠাস করে চড় মারলেন ইরিনের গালে। ঠেলে ঘর থেকে বের করে দিলেন ওকে।

প্রচন্ড রাগে সে কিছু বলার আগেই সোহাগই তাকে গড়গড় করে অনেক কিছু শুনিয়ে দিলো। সোহাগ যা বলল তাতে ইরিনের আর কিছুই করা লাগলো না। সোহাগের পক্ষ থেকেই বিয়ের জন্য না করে দেওয়া হলো। কেন সেটা ইরিনকে বলা হলো না।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুনগুন করছে ইরিন। বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে, কি কারনে ভেঙ্গেছে সেটা ওর কাছে ইম্পরট্যান্ট জানে না, ভেঙ্গেছে এই এটাই ইম্পরট্যান্ট!
আয়াজ কফি নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো। ইরিন গলা চড়িয়ে ডাক দিয়ে বলল, আমার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে আয়াজ ভাই!
~ জানি, কিন্তু তুই এত খুশি কেন? বিয়ে বিয়ে করে তো পাগল হয়ে গেছিলি? এখন কি হলো?

~ কি যে বলেন না আপনি? আমি ভীষণ দুঃখিত হয়েছি, সকাল থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে কেঁদেছি, ওয়াশরুমে ঢুকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি, দুঃখে আমার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে, কত ভালো ছিলো সোহাগ মিয়া মানুষটা! তার সাথে বিয়ে হলে আমার জীবনটা আনন্দে ভরে যেত! কি থেকে কি হয়ে গেলো বলুন তো?
~ ~ তুই আমার সাথে ফাজলামো করছিস?
ইরিন জিভ কেটে না বোঝালো।

~ ছি! ছি! আপনি আমার গুরুজন আপনাকে আমি বড় ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করি! আপনার সাথে কেন ফাজলামো করবো? তাছাড়া সোহাগকে নিয়ে ফাজলামো করা যায়? ও কি ফাজলামো করার মত ছেলে? প্রফেসর মানুষ!
আয়াজের ইচ্ছে করছে গরম কফিটা ইরিনের গলায় ঢেলে দিতে, ওর এইসব গা জ্বালানো কথাবার্তা বন্ধ হবে!
~ আমার এত বড় সর্বনাশ কে করলো আয়াজ ভাই? আল্লাহ তার বিচার করবে! তার বিয়ের আগেই বউ মরে ভূত হয়ে ঘাড় মটকাবে! সে জীবনেও !

~ চুপ! বেয়াদব! তোর সাথে কে কথা বলছে? কান ঝালাপালা করে দিয়েছিস! তখন থেকেই বাচালের কত বকবক বকবক করেই যাচ্ছিস, থামাথামি নেই।!
~ আপনি রাগ করছেন কেন? আমি মনের দুঃখ থেকে বলছি, আপনাকে বলছি নাকি? আপনি কি আমার বিয়ে ভেঙ্গেছেন?
~ আমার আর খেয়ে দেয় কাজ নেই আমি তোর বিয়ে ভাঙবো! তুই যাদের জন্য সেজেগুঁজে কলেজে যেতি তাদের ভেতর কেউই হয়ত এই আকাম করেছে, আমার এখন মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা তোর এইসব নিয়ে ভাবার সময় আছে? এইতো নেক্সট উইকে জয়েন করতে হবে! তুই আছিস তোর তালে!

আয়াজ ভেতরে চলে গেলো। ইরিন হাসছে। তার দৃঢ় ধারনা বিয়েটা আয়াজই ভেঙ্গেছে। বাস্তবিকই তাই। বিয়েটা আয়াজই ভেঙ্গছে। ইত্তির সাথে পরামর্শ করে সোহাগের কাছে গিয়েছিল সে। সেখানে গিয়ে অবশ্য কিছু মিথ্যে কথা বলতে হয়েছে তাকে। অনেক কষ্টে সে আর ইত্তি মিলে সোহাগকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলো তার সাথে
ইরিনের অ্যাফেয়ার চলছে। তার সাথে রাগ করে ইরিন সোহাগকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ছাড়া আয় কোন উপায়ও ছিলো না আয়াজের কাছে। ইত্তি তাকে আগেই বলেছিলো ইরিন হলুদের পর পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছে। ইত্তি অবুঝ নয়, ঝোঁকের বশে ইরিনের পাগলামিতে তাল দেওয়ার মত বোকাও
সে নয়। ইরিনের এইসব ছেলেমানুষি কর্মকান্ড যে শেষমেশ ইরিনের ক্ষতিই করবে সেটা সে ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলো। পালিয়ে গেলে আয়াজের ফ্যামিলি, ইরিনের ফ্যামিলি যে খুব সহজভাবে তাকে গ্রহন করবে সেটা ইরিনের মাথায় না এলেও ইত্তির মাথায় কিন্তু ঠিকই এসেছিলো। তারপর এজ ইউজুয়্যাল আয়াজকে পুরো
ঘটনা খুলে বললো সে। ইত্তির কাছ থেকে সব শুনে আয়াজ সময় নষ্ট করলো না। যে করেই হোক ছেলেপক্ষ থেকেই আগে বিয়ে থামাতে হবে। ওদেরকে কিছুতেই
অপমানিত হতে দেওয়া যাবে না। তারা নিশ্চই ছেড়ে কথা বলবে না? যেই মেয়ে বিয়ের দিন পালিয়ে যায় তার সম্পর্কে অনায়াসে যে কোন বদনাম তুলে দেওয়া যায়। যদিও সে জানা ইরিন বোকা বলেই এমন একটা পরিকল্পনা করেছে। সোহাগকে নাজেহাল করতে গিয়ে নিজের গায়ে কাদা ছোঁড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বোধ মেয়েটা। তাই দেরী না করে ইত্তিকে নিয়ে সোহাগের বাসায় গিয়েছিলো সে। সোহাগ প্রথমে বিশ্বাস করে নি। ইত্তি আরো ঘনিষ্ঠ দুএকজন বন্ধুবান্ধবকে খুলে বললো পুরো ঘটনাটা।

অবশেষে সবাই মিলে ইরিনের অলক্ষেই এই ঘটনার সমাধান করলো। অবশ্য সবটাই আয়াজ এবং ইত্তি হেলাল সাহেবের সাথে পরাশর্ম করে করেছে। হেলাল সাহেব
ইরিনের ছেলেমানুষি তে বিন্দুমাত্র অবাক হলেন না। তিনি এবং তার স্ত্রী ছোটবেলা থেকেই এই মেয়েটির স্বল্পবুদ্ধিতার বহু প্রমাণ পেয়েছেন। এবং তাদের ছেলে যে এই বোকা মেয়েটিকে প্রাণাধিক বেশি ভালোবাসে সেটাও তাদের অজানা নয়। অতএব হেলাল সাহেব ছেলের পরিকল্পনাতে সামিল হলেন। বাসার কোন মুরুব্বিকে তিনি কৌশনে হলুদ প্রোগ্রামে আসতে দেন নি। এদিকে মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো আয়াজ। ইরিনের এসব পাগলামি আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। এবার শিক্ষা দেওয়ার পালা আয়াজের। তাকে এভাবে দৌড়ঝাঁপ করার সাজা ইরিনকে ভোগ করতে হবে। এসব উদ্ভট পরিকল্পনা যেন আর কোনদিন না করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। নাউ ইটস টাইম টু ইরিনের বারোটা বাজানোর।

পর্ব ১২

ইরিন আর ইত্তি করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেরই মুড অফ। ইত্তির অবশ্য একটু বেশিই অফ। আজকে আবার মিতুর সাথে ঝামেলা হয়েছে, মিতু ইত্তির গার্লফ্রেন্ড। সপ্তাহে দুদিন ঝামেলা করারাটা মিতুর কাছে কাঁচাবাজার করার মত হয়ে গেছে। এই তো গলকাল রাত দেড়টায় সময় ফোন দিয়ে বলল ওর প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। ইত্তি ভালোমানুষের মত উপদেশ দিল, একটা নাপা খেয়ে শুয়ে পড়ো।
~ নাপা বাসায় নেই।

~ তাহলে মাইল্ড সিডেটিভ থাকলে একটা খেয়ে নাও।
~ আমাদের বাসায় ঘুমের ওষুধ রাখা হয় না।
~ ওকে, দেন মাথায় পানি ঢালার পদ্ধতি ট্রাই করতে পারো।

~ আমার ঠান্ডা লেগে যাবে।
ইত্তি একটু ভাবলো, তারপর বলল, তাহলে চা বা কফি বানিয়ে খাও ভালো লাগবে।
এবার রিপ্লাই এলো, চা খেলে ঘুম আসবে না।

ইত্তি ঘুমে কাদা হয়ে ছিলো। ওর খুব ভালো একটা স্বভাব হচ্ছে ঘুমন্ত অবস্থায়ও সে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারে। কিন্তু মিতুর কথা শুনে এবার আর স্বাভাবিক থাকতে পারলো না। ভেতরে ভেতরে চটে গেলেও ঠান্ডা গলায় বলল, তাহলে তো আর কিছুই করার নেই। তুমি চুপচাপ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে ঘুমানোর চেষ্টা করো।
~ তাতে কোন লাভ হবে না। আমি জানি আমার এই মুহূর্তে ঘুম আসবে না। তবে একটা উপায় আছে।
~ কি?

~ তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। আমার মনে হচ্ছে তুমি এলে আমার মাথাব্যথা ভালো হয়ে যাবে। প্লিজ আসো না।
~ কিন্তু এত রাতে? এখন তো মামা গেট বন্ধ করে ঘুমাচ্ছেন।

~ সমস্যা নেই, উনাকে ডেকে তুলবে। এমন করো কেন প্লিজ!
ইত্তির মাথার মগজ একশো ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটে উঠলেও মাথা ঠান্ডা রেখে বলল, ঠিক আছে আসছি।
এইপর্যন্ত ঠিক আছে। সমস্যা হলো ইত্তিকে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে ওদের বাসার সামনে দাঁড় করিয়ে মিতু জানালো সে আসতে পারবে না। ওর এখন বেশ ঘুম পাচ্ছে। ইত্তিও রাগ সামলাতে না পেরে ওকে কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিলো ফোনে।

ইরিন একদৃষ্টিতে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। কত মানুষ হস্পিটালে ঢুকছে, কতজন সুস্থ হিয়ে কাছের মানুষের নিয়ে হাসিমুখে বাসায় ফিরে যাচ্ছে। কত খুশি লাগছে এদেরকে। অথচ! ইরিন ওর জীবনে কোন আনন্দ নেই। আনন্দ নেই এই কথাটা আসলে ঠিক না। ইরিন আসলে আনন্দ উপভোগ করতে জানে না, যার ইত্তির মত ভালো একটা বন্ধু আছে, ভালো ক্যারিয়ার আছে, ভালো একটা পরিবার আছে, তবুও কেন এত আফসোস?
~ ইত্তি?

~ বল।
~ আমি মরে গেলে তোর দুঃখ হবে?
ইত্তি আটশো আশি ভোল্টের শক খেলো। ট্রান্সমিটার ব্লাস্ট হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। প্রচণ্ড বিস্ময় নিয়ে ইরিনের দিকে তাকালো। ইরিন মজা করেও এইধরনের কথা বলার মেয়ে না। তাহলে আজ কি হলো?

ইত্তি জানেনা ইরিনের সেদিনের ঘটনার পর থেকে আয়াজ ইরিনের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
~ না।
~ সত্যি?
~ হ্যাঁ। সত্যি!
~ আমি খুব খারাপ তাই না?

ইত্তিহাদ হাসলো। ইরিনের নাক টেনে দিয়ে বলল, খুব।
~ মিতুকে খুব ভালোবাসিস তাই না?
ইত্তিহাদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বিড়বিড় করে বলল,
~ বোকা মেয়েটাতো কিছুই বোঝে না। আমার কি মনে হয় জানিস?
~ কি?

~ যারা খুব বেশি ভালোবাসা পায় তারা বোধহয় খানিকটা বোকা হয়।
~ কি করে বুঝলি?
~ এই যে তুই? তুইও তো বোকা।
~ কে বললো আমি বোকা?

~ তুই বোকা নয়ত কি? তুই জানিস আয়াজ ভাই তোকে কতটা ভালোবাসে?
~ না রে। তিনি আর এখন আমাকে ভালোবাসে না।
ইরিনের চোখে পানি টলমল করছে। ইত্তিহাদ আবারও হাসলো। মুচকি হেসে বলল,
~ তোর এমন মনে হওয়ার কারণ?

~ উনি আমাকে কি বলেছে জানিস? আমি নাকি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যই নই। উনি নিজে আম্মাকে বলে আমাদের বিয়েটা ভেঙ্গে দেবেন। উনার এক কলিগ আছে, নাম রেশমা। তাকে বিয়ে করবেন। আমাকে ছবিও দেখিয়েছেন। সেই! মানে একেবারে ককটেল সুন্দরি!
~ তোর চেয়েও সুন্দরি?

~ আমি কি ককটেল সুন্দরি?
~ -ককটেল সুন্দরি কি আমি জানি না, কিন্তু তুই সুন্দরি! খুব সুন্দরি!
~ এরপর তোর কি মনে হয় আয়াজ ভাই আমাকে ভালোবাসে?

ইত্তিহাদ আবারো হাসছে। ইরিনের কান্না পাচ্ছে। তার প্রিয়তম বন্ধুটিও তার দুঃখ বুঝলো না? সবাই এত নিষ্ঠুর কেন? বিগত একমাস ছাব্বিশ দিন যাবত আয়াজ ভাই তাকে এড়িয়ে চলছে। ইরিন কি খুব বেশি বড় হয়ে গেছে যে উনি ইরিনকে মাফ করতে পারছেন না? ইরিন তো খুব বেশি ছোটও নয়, সে একবার যখন বুঝেছে তার ভুল হয়েছে সে কি আর দ্বিতীয়বার এমন ভুল করবে? এই সহজ কথাটা আয়াজ ভাইয়ের মত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রের মাথায় কেন ঢুকছে না?
ইরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও গেটের দিকে তাকালো। কেন জানি লোকজনের আসা যাওয়া দেখতে আজকে খুব ভালো লাগছে। ইত্তি পাশে চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ক্লাসে চলে গেলো।

বারবার মায়মুনা বেগমের কাছে ফোন দিচ্ছে ইরিন। তিনি ধরছেন না। তিনিও ইরিনের ওপর রাগ! ইরিনের কষ্ট লাগছে, এইমুহূর্তে বাসায় যাওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব। পরীক্ষা সামনে। আয়াজও তার ওপর রাগ!

ক্লাস শেষে মাঝেমাঝে বিকেল বেলা যখন ইত্তি আর মিতুর সাথে ইরিন ঘুরতে বের হয়, মনে আক্ষেপ হয় ইরিনের! কি সুন্দর দুজন হাতে হাত রেখে হাঁটে ওরা। চোখে চোখ রেখে মনের ভাষায় কথা বলে! আয়াজ নামক স্বপ্নটা ইরিনকে ভেতর থেকে কতটা কষ্ট দেয় বাইরে থেকে তার ছিঁটেফোটাও কেউ আঁচ করতে পারছে না!
সন্ধ্যেবেলা পড়ার টেবিলে বই খুলে রেখে ঝিমুচ্ছিলো এমন সময় মিতু এসে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো। আগাগোড়া সাজগোজ করা! এসেই উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল, আপু তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিন। বাইরে ইত্তি অপেক্ষা করছে!

~ তোমারা যাও মিতু, কালকে আমার পরীক্ষা আছে আমি আজকে বেরোতে পারবো না।
~ আমারও আছে আপ। কিন্তু তাতে কি হয়েছে? পরে দেবো আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিন।
~ -না মিতু! আমার অনেক পড়া জমে গেছে আমি আজকে যাবো না।
মিতু ওর কোন কথাই শুনলো না। বই বন্ধ করে চেয়ার থেকে টেনে তুলে বলল,
~ আজকে আমার এক কাজিনের বিয়ে, আপনি গেলে আমি খুশি হবো। প্লিজ আপু না করবেন না।
~ তোমার কাজিনের বিয়েতে আমি কেন যাবো মিতু?

~ কিচ্ছু হবে না। চলুন না।
~ আমার বাসায় তো কাউকে না জানিয়ে কিভাবে যাবো?
~ ইত্তি ম্যানেজ করে নেবে।

~ যেতেই হবে?
~ যেতেই হবে।
~ না গেলে হয় না?
~ না হয় না। আমি জানি আপনার মন খারাপ, আপনাকে একা রেখে আমি ওখানে কিছুতেই মজা করতে পারবো না।

বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলো! ইরিন যতটুকু বুঝলো তাতে একনিশ্বাসে তিনবারের জায়গায় চারবার কবুল বলে ফেলেছে। আয়াজ অবশ্য সেরকম কিছু করে নি। ধীরে সুস্থে তিনবার কবুল বলেছে। বিয়ে পড়ানো শেষে ইরিন কতবার আয়াজের দিকে তাকালো। যদি একটাবার চোখাচোখি হয়! মানুষটা কতদিন তার সাথে কথা বলে না। কিন্তু আয়াজ বিয়ে শেষেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হলেও মোটামুটি ছোটখাটো একটা জটলার মত বেধেছে। প্রতিটা রুমেই মেহমান। তারমানে বিয়ের কথা সবাইকেই জানানো হয়েছে কেবল ইরিনকে ছাড়া। মায়মুনা বেগম আর সোহেলি হাসাহাসি করছে। রেশমি আপু বারবারই ইরিনকে দেখে মুচকি হাসছে। আর ইরিনের বর মহাশয় মানিব্যাগ পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে নিচে বাবুর্চিদের রান্নার তদারকি দেখতে চলে গেলেন।

খানিকবাদে গম্ভীরমুখে বাসায় এসে ঢুকলো। ইরিনের সমস্ত আশা, আকাঙ্ক্ষা মাটি করে দিলেন এই অসম্ভব খারাপ রকমের ভালো মানুষটা! বিয়ের খুশিতে ইরিন যখন আত্মহারা তখন এই বদ লোক এসে বললো, খাওয়াদাওয়া শেষ করে নে। কালকে তোর এক্সাম আছে না? আমি দিয়ে আসবো। ব্যস! ইরিনের মুখটা বেলুনের মত চুপসে গেলো। কিন্তু তাতে এই আয়াজের কিচ্ছু এলো গেলো না! একটু পর নিজে এসেই থালা ধরিয়ে দিয়ে, দশমিনিটের আল্টিমেটাম দিয়ে গেলো।
~ দশমিনিটের ভেতর শেষ করে নিচে আয়। আমি ওয়েট করছি।

ইরিনের মেজাজ প্রচুর খারাপ হচ্ছে। নিশ্চই ইত্তির কাছ থেকে তার এক্সামের কথা জেনেছে আয়াজ।
লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ইরিন নিজেই বাসার সবাইকে জান লাগিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলো এই পরীক্ষা টা না দিলে কিচ্ছু হবে না। পরে দিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

অবশেষে শ্বশুরের কাছে যাওয়া সিদ্ধান্ত নিলো ইরিন। তাতে অবশ্য কাজও হতো যদি না আয়াজ এসে তাকে থামিয়ে দিতো, উনি ডাক্তার মানুষ, উনি ঠিকই বুঝতেন ইরিন পরেও পরীক্ষাটা দিতে পারবে। এখন না দিলে খুব বড়সড় কোন ক্ষতি হয়ে যাবেনা।

রুমে নিয়ে এসেই আয়াজের ইরিনকে ঝাড়ি দেওয়া শুরু হয়ে গেলো,
~ তোর লাজলজ্জা বলতে কিচ্ছু নেই? লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছিস নাকি? ছি! ছি! তুই আজকে থাকার জন্য বাবাকে বলতে গেছিস? কাকে বিয়ে করলাম আমি? লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে। এই তোর এত তাড়া কিসের? আমি পুরুষমানুষ হয়ে যদি ধৈর্য ধরতে পারি তোর কি সমস্যা?
ইরিন লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। কানের কাছে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করছে। আয়াজ এভাবে কেন বলছে? ইরিনের বুঝি লজ্জা লাগছে না?
আয়াজ একটু আগে এই নিয়ে সোহেলি বেগমের সাথেও

রাগারাগি করে এসেছে। সোহেলি বেগম যখন ইরিনকে থাকার পারমিশন দিতে চাইলেন আয়াজ তখন কড়া গলায় বললো,
~ খবরদার মা, তুমি ওকে কোন রকম প্রশ্রয় দেবে না। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, দয়া করে, ওর পড়াশোনাটা লাটে উঠিয়ো না। ও আপাতত পড়াশোনায় মনোযোগ দিক, সেই ফাঁকে আমিও একটু গুছিয়ে উঠি। তোমরা যদি এখন ওকে প্রশ্রয় দাও মাথায় উঠে বসবে একেবারে। আর কিছুতেই কন্ট্রোলে রাখা যাবে না।
সোহেলি যে ছেলের দৃঢ় সংকল্পের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে এমনটাও নয়, ইরিনের সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানেন তিনি। একবার লাই পেলে ইরিন পড়াশোনা সব গোল্লায় তুলবে। তাছাড়া আয়াজ ঠিকই বলেছে। আয়াজকেও একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন। সবে ইন্টার্নি শেষ করেছে, আরেকটু গুছিয়ে নিক। অবশেষে ছেলের মতামতে সম্মতি দিলেন তিনি।

আয়াজ আবারও ধমক দিয়ে বলল,
~ কি সমস্যা তোর? কথা বলছিস না কেন?
ইরিন মুখ ফুটে ওপর বলল, আমার অনেক সমস্যা। আমি আপনার মত এত ধৈর্য ধরতে পারবো না।

আয়াজ চরম আশ্চর্য হলো! সাথে সাথেই ধমকে উঠে বলল,
~ খবরদার ইরিন! তুই আমার সাথে এইভাবে কথা বলবি না। বিয়ে হয়েছে তারমানে এই না যে তুই অনেক কিছু বুঝে ফেলেছিস! আমি যেভাবে বলবো সবকিছু ঠিক সেভাবে হবে। আমার কথার বাইরে গেলে পায়ের নালা ভেঙে ফেলবো!
~ বিয়ে তো শুধু আপনি আমাকে করেন নি? আমিও আপনাকে করেছি?

আয়াজের মনে হলো, ইরিন বদ্ধপরিকর, তার অধিকার সে আদায় করে নেবেই। তার জন্য ইরিনকে যদি নির্লজ্জ হতে হয় হবে সে। আয়াজ ডানহাতটা কপালে ছেপে ধরে বড় নিশ্বাস ফেললো। ইরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো,
~ কি চাস তুই?
~ সব মেয়ে যা চায়, তাই।

আয়াজের মাথা ঘুরছে। ইরিনের কথাবার্তা ওর হজম হচ্ছে না। বিয়ে করে মস্তবড় মুছিবতে ফেঁসে গেছে সে। বিয়ের আগেই ভালো ছিলো। এই মেয়ে এখন ওর প্রতিটা কথায় মুখ চালাচ্ছে! কেন যে বোকামি করলি আয়াজ! ওকে শাসনে আটকাতে গিয়ে নিজেই আটকে গেলি। কাশি উঠে গেছে তার। কাশির চোটে চোখে পানি এসে গেছে। ইরিন কাছে এগিয়ে এসে বলল,
~ পানি দেবো?
~ দে!

~ বউকে কেউ তুই করে বলে? বলুন তুমি!
~ আমি কিন্তু এবার ঠাস করে তোর গালে চড় বসিয়ে দেবো ইরিন।
~ বউকে মারবেন?
আয়াজ গলা চড়িয়ে ডাক দিলো, মা? মা? মাআআ!
সোহেলি ছুটে এলো ছেলের ঘরে। তারপর উৎকন্ঠিত হয়ে বলল, কি হয়েছে বাবা?
~ ওকে আমার সামনে থেকে সরাও, নাহলে আমি একসেকেন্ডও এখানে থাকবো না। সোজা বাসা থেকে বেরিয়ে যাবো।
ইরিনও সমান তেজে মুখ চালালো,

~ হ্যাঁ, আপনি বরং আমাকে হোস্টেলেই দিয়ে আসুন। এখানে বসে বসে আপনার ঝাড়ি খাওয়ার চেয়ে হোস্টেলে শুয়ে মনে মনে আপনার সাথে বাসর করি!
মুহূর্তেই আয়াজে মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। কান গরম হয়ে গেলো তার! ইরিনের কি কমনসেন্স বলে কিচ্ছু নেই? সে কেন দেখে শুনে এমন একটা গবেটটাইপ মেয়েকে বিয়ে করলো? কেন? সোহেলির ছেলের অবস্থা বুঝতে পেরে দ্রুত ইরিনের হাত ধরে ওকে টেনে বের করে নিয়ে গেলেন। ইরিন এক বুক হতাশা নিয়ে সোহেলির সাথে বেরিয়ে গেলো।

সবকিছু স্বপ্নের মত লাগছে তার কাছে। সত্যিই কি তার বিয়ে হয়ে গেছে? সত্যিই একটু আগে আগের মতই আয়াজের সাথে ঝগড়া করছে? হাসি আসছে তার! ঝগড়া করুক আর যাই করুক হুট করেই আয়াজ নামক কঠিন বস্তুটার ভালোবাসার গভীরতা সে অনুভব করতে পারছে। ইত্তির কথা গুলো মনে পড়ছে তার। কীভাবে মানুষটা তার সম্মান বাঁচানোর জন্য জোড়হাতে সব হ্যান্ডেল করেছে। সত্যিই তো ইরিন যদি সত্যি সত্যি সেদিন পালিয়ে যেত তাহলে সমাজে ইরিনের পরিবারের অবস্থানটা কোথায় হত?

সমাজ তো তার বাবা মায়ের মুখে থুতু ছিঁটাতো? এখন বুঝতে পারছে ইরিন সে খুব বড় ভুল করেছে, খুব বড়। সে যখন সোহাগকে পছন্দই করে নি তার উচিৎ ছিলো সরাসরি সেটা জানিয়ে দেওয়া। বিয়ের দিন পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান তারজন্য নেহায়েত ছেলেমানুষি হলেও তার পরিবারের জন্য ভয়াবহ তান্ডব হতে পারতো। কিন্তু আয়াজ সেটা হতে দেয় নি। নিজের খুব বকতে ইচ্ছে করছে। কেন সে এই মানুষটার সাথে ঝগড়া করলো? পরোক্ষনেই ভাবলো, নাহ! করবে সে। আয়াজের সাথে ঝগড়াময় ভালোবাসা তাকে করতেই হবে। আবারো হাসলো ইরিন। অথচ কয়েকদিন আগে সে বোকার মত জীবনে নিয়ে আফসোস করছিলো! যার আয়াজের কঠিন ধরনের প্রেমিক আছে সে কেন জীবনের জন্য হা-হুতাশ করবে? এখন আর অফসোস হচ্ছে না তার, এই মানুষটার ইচ্ছে পূরন করতে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারবে সে। কারণ আত্মিক প্রণয় তো হয়ে গেছে তাদের!

লেখা – অরিত্রিকা আহানা

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “অতঃপর প্রণয় – Premer golpo kahini” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – অতঃপর প্রণয় (শেষ খণ্ড) – Premer golpo kahini

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!