কষ্টের প্রেমের গল্প

নিয়তি – ভালোবাসা কপালের লেখা

নিয়তি – ভালোবাসা কপালের লেখা: জানালা থেকে মাথা বের করে গভীর শ্বাস নেয় সাঁঝ। নিজেকে আজ মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে। রাতে বুক চিরে আস্তে আস্তে মুখ বের করছে সূর্য, সাঁঝের জীবনে নতুন সূর্য উঠছে, যে জীবনে নেই কোনো বাঁধা, নেই কোনো পিছুটান।


পর্ব ১

বিয়ের আসরে বর যখন কনেকে বলে,
‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না। আমি তোমাকে না তোমার ছোট বোনকে ভালোবাসি আর ওকেই বিয়ে করতে চাই। ’

তখন বধূর সাজে থাকা সেই মেয়েটির মনে অবস্থা কেমন হতে পারে তা শুধু সেই মেয়েটাই জানে। নতুন জীবন শুরু করতে গিয়ে শুভেচ্ছার বদলে শুনতে হয় নানা কটু কথা। আশেপাশের লোকজন তখন একমুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় দোষ মেয়েটির, পরে মেয়েটির দোষ খুঁজতে লেগে পরে।

এখানে ঠিক এমনটাই ঘটছে। বিয়ের আসরে সবার সামনে শুদ্ধ সাঁঝকে উপরের কথাটা বলে। একশ্বাসে কথাটা বলে সাঁঝের মুখের দিকে তাকায় শুদ্ধ। মুখে হাসি নিয়ে দাড়িয়ে আছে সাঁঝ, বলে,

মজা করছ তুমি আমার সাথে?
শুদ্ধ বুঝতে পারে সাঁঝ ওর কথায় একটুও বিশ্বাস করে নি। টিসু দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বল,

এটাই সত্যি সাঁঝ। আমি সন্ধ্যাকে ভালোবাসি আর সন্ধ্যা ও আমাকে ভালোবাসে। আমরা তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি বলে এতোদিন কিছু বলিনি, আজ আর না বলে পারলাম না। সরি সাঁঝ।

শুদ্ধের কথা শুনে সাঁঝ সন্ধ্যার দিকে তাকায়, সাঁঝ তাকাতেই সন্ধ্যা মাথা নিচু করে নেয়। সাঁঝ দু পা পিছিয়ে যায়। সন্ধ্যা ছুটে এসে সাঁঝকে ধরতে নিরে সাঁঝ ওকে আটকে দেয়।

খবরদার না,একদম এদিকে আসবি না। তোমরা আমার পিঠে ছুরি না মারলেও পারতে। সন্ধ্যা তুই চল আমার সাথে।
এমন মুহুর্তে সন্ধ্যার এমন শান্ত হয়ে থাকাটা কারোরই বোধগম্য। যার জীবনের এত সুন্দর একটা দিনে এত বিশ্রী এত ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটে সে কি করে এতটা শান্ত থাকতে পারে।

৩০-৪০ মিনিট পর সাঁঝ আর সন্ধ্যা দুজনে আসে। সবাই অবাক চোখ তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কনের সাজে সন্ধ্যা এসেছে আর একটা সুন্দর শাড়ি পরে আসে সাঁঝ।

নাও শুদ্ধ তোর সন্ধ্যাকে। তুমি তো জানো শুদ্ধ আমি স্বার্থপর পর নই, না আমি নিজের ছোট বোনের ভালোবাসাকে তার থেকে কাড়তে পারব না আমি আমার ভালোবাসার মানুষের থেকে তার ভালোবাসার মানুষকে কাড়কে পারব।

এসব কথা পরে হবে। কাজি সাহেব বিয়ের কাজ শুরু করুন,এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।

যেমন ভাবে সাঁঝের বিয়ে হবার কথা ছিল ঠিক সেভাবেই সন্ধ্যার বিয়ে হয়েছে। কারো মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে কনে বদল হয়েছে, না বরের পরিবারের কারোর না কনের পরিবারের কারোর। দুই পরিবারের লোকদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি, মনে হচ্ছে এটাই হওয়ার ছিল।
সবার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাঁঝ। হাসি মুখে এগিয়ে যায় শুদ্ধ আর সন্ধ্যার দিকে। একটা মিষ্টি দুজনকে খায়িয়ে দেয়। ওদের দুজনকে দেখে একটুও অনুতপ্ত মনে হচ্ছে না সবাই কি সুন্দর আনন্দ করছে।

বিদায়ের সময় সন্ধ্যা সাঁঝকে জরিয়ে ধরে অনেক কাঁদে।

আপু পারলে আমাদেরকে ক্ষমা করে দিস।
ক্ষমা চাওয়ার মতো কোনো কাজ তো তোরা করিস নি। তাছাড়া ক্ষমা তো আমার চাওয়ার কথা, আমি তোদের মাঝে এসেছি। তোরা আমাকে ক্ষমা করে দিস।
সাঁঝের কথা শুনে শুদ্ধ হাসে,

তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না সাঁঝ। আমরা তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
শুদ্ধের কথা শুনে হালকা হেঁসে ওঠে সাঁঝ,
তোমাদের ভালো থেকো সুখে থেকো। নাও এবার তোমার হাতটা দাও তো শুদ্ধ।
কেন?

দাও তারপর বলছি।
শুদ্ধ সাঁঝের দিকে হাত এগিয়ে দেয়। সাঁঝ এক হাতে শুদ্ধ অন্য হাতে সন্ধ্যার হাত নিয়ে হাত দুটো মিলিয়ে দেয়।

আমার বোনের খেয়াল রেখ। ওহ সরি, ভুলে গেছিলাম তোমাদের লাভ ম্যারেজ, খেয়াল তো অবশ্যই রাখবে, তাইনা!
চিন্তা কর না, আমি সন্ধ্যার খেয়াল রাখব। কখনো কষ্ট পেতে দেব না।
তাই যেন হয়।

সন্ধ্যার বিদায়ের সময় ওর বাবা-মা অনেক কাঁদে, আর সাঁঝ ঠায় দাড়িয়ে ছিল।
ওই গাড়িতে ওর থাকার কথা ছিল। যা হল সবটা উল্টো হল। চাইলে সাঁঝ যা নিজের তা নিজের করে পেতে পারত।
পিছন থেকে সাঁঝের কাধে হাত রাখে টিয়া, সাঁঝের বেস্ট ফ্রেন্ড আর কাজিন। ছোট বেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে ওরা।
ভিতরে যাবি না?

তা তো যাব। কিন্তু তুই এখানে কি করছিস?
বাড়িতে যাব তাই এলাম। একটা প্রশ্ন করব যদি কিছু মনে না করিস?
হ্যাঁ কর, এটা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি।
এ বিয়েতে তুই হ্যাপি তো?

কি যে বলিস না তুই! আমার বোনের বিয়ে হয়েছে আজ, আমি খুশি হব না তো কে হবে বল।
আমি আজ বাড়ি যাব না, তোর সাথে আজ আমি থাকব, চল ভিতরে চল।
কাকি কিছু বলবে না তো?

আমার মা তোর মায়ের মতো না রে, চল ভিতরে চল। কয়েকদিন বেশ ধকল গেছে রেষ্ট নিবি চল।
গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বাড়ির ভেতর পা রাখে সাঁঝ। সাঁঝের মায়ের রুম থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। সাঁঝ সেদিকে পা বাড়াতে নিলে টিয়া আটকে দেয়।
আটকালি কেন?
ওনাদেরকে ওনাদের মতো থাকতে দে। ওনাদের কথা কয়েকদিন ভাবা বাদ দে তো।
ওরাই তো আমার সব।

এবার সরলতা বাদ দে সাঁঝ, অনেক হয়েছে। এই এদের জন্য তুই ভাবছিস, যারা আজ এতো কিছু হবার পরও তোর পাশে না দাড়িয়ে সন্ধ্যার বিয়েতে আনন্দ করেছে। কতটা স্বার্থপর এরা।
আস্তে বল শুনতে পাবে।

শুনুক আজ ওদের শোনা উচিত। প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা এদের হাতে তুলে দিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল করেছিস তুই। এরা তোকে ওদের মেয়ে না এটিএম মনে করে।

আমার মনে হয় কি জানিস সাঁঝ, আজ যে এতো কিছু হল সবটা তোর বাবা-মা আগে থেকে জানতে আর সন্ধ্যা ও তো ছোট বেলা থেকে তোর পছন্দের জিনিস কেড়ে নিয়েছে, তোর তখন দিতি বলেই আজ ও এমন কান্ড ঘটাল।

তোর জায়গায় আমি হলে এদের মতো সুবিধাবাদী লোকদের ছুড়ে ফেলে দিতাম। ছিহ্ এমন বাবা-মা যেন কারো না হয়, এরা বাবা-মা নামের কলঙ্ক।
সাঁঝ আর সহ্য করতে না পেরে টিয়াকে চর মেরে দেয়..

চুপ কর টিয়া, ওনারা আমার বাবা-মা,। আমার বাবা-মাকে নিয়ে কোনো রকম বাজে কথা আমি সহ্য করব না।
টিয়া আর সাঁঝের কথা শুনে সবাই বাইরে আসে…

তুই এদের কে তোর আপনজন বলিস তাই না, তাহলে আজ বিয়ের আসরে শুদ্ধ যখন তোকে কথা গুলো বলল তখন কেউ কেন তার প্রতিবাদ করল না, এমনকি কাকা মানে তোর বাবাও না, যেখানে তুই নাকি তার চোখে মনি সেও কিছু বলল না, ঠায় দাড়িয়ে ছিল। পরে শুদ্ধর বাবার সাথে সে কি হাসি। এই নাকি আবার বাবা!!

আর কতদিন চোখে কালো কাপড় বেঁধে রাখবি সাঁঝ, এবার তো কালো কাপড়টা সরিয়ে পৃথিবীটা দেখ, এবার তো নিজের কথা ভাব।
আজ প্রমান হয়ে গেল, এ পৃথিবীতে কেউ কারো নয়, এমনকি নিজের জন্মদাতা বাবা অার জন্মদাত্রী মাও না।
চুপ কর টিয়া, চুপ কর। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

শুদ্ধর কথা যখন সহ্য করতে পেরেছিস তখন আমার কথাও তোকে সহ্য করতে হবে। প্লিজ সাঁঝ সবটা বুঝেও অবুঝের মতো থাকিস না। যে তোর জন্য ভাবে তুই তার জন্য ভাব।
সাঁঝ কিছু না বলে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।

মানব জীবন বড়ই অদ্ভুত। মানবজাতি কিশোরকালে যৌবনকালে মরিচিকার পিছনে ছুটে আর জীবনের শেষ ধাপে এসে বুঝতে পারে তারা এতোকাল কি ভুল করেছে।

যদি আগে বুঝতে পারত তাহলে হয়ত জীবনটা অারো সুন্দর হতো।
সাঁঝের রুম থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে আর টিয়ার মুখে হাসি ফুটছে।
কে কার ভালো চায় আর কে ক্ষতি চায় তা বোঝা সত্যিই মুশকিল।


পর্ব ২

বধূবরণ এর বেশ বড় আয়োজন করা হয়েছে শুদ্ধদের বাড়িতে। সন্ধ্যাকে বেশ আদরের সঙ্গে বরণ করেন শুদ্ধের মা। তিনি আগে থেকেই চাইতেন সন্ধ্যা যেন তার পুত্রবধূ হয় কিন্তু কোনো কারনে সেটা হয়নি। এবার তার মনের সাধ পূরণ হয়েছে।

নতুন বউয়ের মুখ দেখে তিনি গলার হার, হাতের বালা, কোমড়ের বিছা, আংটি পরিয়ে দিয়েছেন, সবগুলোই সোনার।
আত্মীয়দের মধ্যে কয়েকজন কানাঘুষা করছে।

বিয়ে করতে গেল যে মেয়েকে, আর বিয়ে করে নিয়ে এল সে মেয়ের ছোট বোনকে। কি কান্ড বাপু!
আমার মনে হয় সেই মেয়ের কোনো দোষ আছে নাহলে এমনটা হবে কেন বল?

আমি তো শুনেছি ১ বছর আগেই নাকি শুদ্ধের সাথে সেই মেয়ের আংটিবদল হয়েছিল।
দেখ মেয়ে হয়ত অন্য কোনো নাগর জুটিয়েছে, তাই মেয়ের বাবা-মা ছোট মেয়েকে গছিয়ে দিয়েছে।
আমার কিন্তু অন্য কিছু মনে হচ্ছে।
তোমার আবার কি মনে হচ্ছে?

শুদ্ধের মাকে দেখে মনে হচ্ছে, এই বউকে পেয়ে সে খুব খুশি,যেন এ মেয়ের সাথেই বিয়ে ঠিক হয়েছিল।
এদের কান্ডকারখানা কিছু বুঝতে পারছি না। দেখি কি হয়।

দূর থেকে নিজের মায়ের এসব কান্ড দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে নম্রতা, নম্রতা শুদ্ধর ছোট বোন। বিয়ের আসরে অমন বিশ্রী কান্ড ঘটার পর ও বাড়িতে চলে আসে। মাকে সবটা জানায়, কিন্তু ওর মা সবটা শুনে খুশি হয়।
মা তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি সবটা আগে থেকে জানতে।

জানতাম তো। আমি তো নিজেই চাইতাম সন্ধ্যা আমার শুদ্ধের বউ হয়ে আসুক কিন্তু তোর দাদীর জন্যই তো সাঁঝের সাথে শুদ্ধর আংটিবদল করতে হয়।
মা, তুমি একজন মা হয়ে এমনটা কি করে করতে পারো।
আমি কিছু করি নি। যেনে শুনে নিজের ছেলেকে কষ্ট দিতে পারব না।

তাই বলে এসব বিয়ের আসরে না করলেই কি চলছিল না। এ কথা গুলো তো বিয়ের ডেট ফিক্স হওয়ার আগে বলতে পারতে।
দেখ নম্র তোর এতো কথার উত্তর দিতে পারব না। যা তো এখান থেকে। আমার বউমা আসবে অনেক কাজ বাকি।

নম্রতা আর কিছু না বলে চলে যায়। বিরক্ত লাগে ওর মা-বাবা আর ভাইয়ের প্রতি।
শুদ্ধর ডাকে ওর ধ্যান ভাঙে,
নম্র সন্ধ্যাকে ঘরে নিয়ে যা। ও অনেক টায়ার্ড।

নম্রতা বেশ কড়া গলায় বলে,
তোর ভালোবাসার বউকে তুইই নিয়ে যা। এর প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। একটা কথা সবাইকে বলে দিচ্ছি, এই মেয়েটার ব্যাপারে কোনো কথা আমাকে বলতে আসবে না।
নম্র কি বলছিস তুই এসব? ও তোর ভাবি।

ভাবি মাই ফুট। একে তো আমি মানুষ বলেই মনে করি না।

নম্রতার কথায় সবাই অবাক হয়। যে মেয়েটা ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে এতো এক্সাইটেড ছিল সে আজ এমন কথা বলছে।
সন্ধ্যার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরে, তা দেখে শুদ্ধর মা পুরো তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। নম্রতাকে মারতে তেড়ে যায় কিন্তু শুদ্ধর বাবা আটকে দেয়।

দরজার ওপাশ থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ এখনো আসছে। সাঁঝের বাবা-মায়ের যেন কোনো হেল দোল নেই। ওনাদের বড় মেয়ে সাঁঝের বিয়ে ভেঙে গেছে, বরের সাথে ওর ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, মেয়েটার এমন মানুষিক অবস্থা কিন্তু বাবা-মা একবারও একটা কথাও বলল না। এমনকি মেয়েটা খেল কিনা তাও জিজ্ঞেস করল না। হায়রে জীবন!!

একটা মেয়ে বড় হবার পর তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বেষ্ট ফ্রেন্ড হয় তার মা। কিন্তু এখানে যে দুজন মায়ের কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে একজনও তাদের মেয়ের বন্ধু হতে পারে নি।

সাঁঝের ফোন হাতে নিয়ে ডাটা কানেকশন অন করে টিয়া। কিছু মেসেজ আর একটা মেইল এসেছে। মেসেজ গুলো একই নাম্বার থেকে এসেছে।
মেইল ওপেন করে তা পরতেই টিয়ার মুখে হাসি ফুটে, দেখে মনে হবে তা যেন বিশ্ব জয়ের হাসি। টিয়া ওর পরিচয় দিয়ে নাম্বারে মেসেজ সেন্ড করে। সাথে সাথে একটা রিপ্লাই মেসেজ আসে। অার তার কিছুক্ষণ পরেই সেই নাম্বার থেকে ফোন আসে।
আপনি যে মেইলটা সেন্ড করেছেন তা কতদিনে কার্যকর হবে?

চাইলে ২-৩ দিনের মধ্যেই কার্যকর হবে।

আপনি সব ব্যবস্থা করুন। কাজ হয়ে যাবে, এটা আমি আপনাকে কনফার্ম করছি।
ওকে।
ফোন রেখে টিয়া একটা স্বস্তির নিশ্বাস নেয়।

তোর জন্য নতুন কিছু অপেক্ষা করছে রে। কার নিয়তিতে কি যে থাকে তা বোঝার সাধ্য কারোর নেই রে।
ঘরের মেঝেতে নানা রকমের জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সাঁঝ সব জিনিস গুলো বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছে। এগুলো শুদ্ধর স্মৃতি। সাঁঝের চোখে শুদ্ধের সাথে কাটানো দিন গুলো ভেষে উঠছে। কত না সুন্দর ছিল সে দিন গুলো।

এই কালো জামদানী শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর মানিয়েছে সাঁঝ। দেখি হাতটা দাও তো।
কেন?
আগে দাও তারপর বলছি।

সাঁঝ হাত দিলে ওর হাতের কড়ে আঙুলের একটু নখ কামড় দিয়ে কেটে দেয়।
এটা কি করলে?

ছোট বেলায় যখন নতুন জামা পরতাম মা তখন এভাবে নখ কেটে দিত বলত, নজর কেটে দিলাম এবার আর কারো নজর লাগবে না।
তাই আমি তোমার নজর কেটে দিলাম, এবার আর কারোর নজর লাগবে না।
সাঁঝ তখন লজ্জা রাঙা দৃষ্টিতে শুদ্ধকে দেখেছিল।

দরজা ধাক্কানোর আওয়াজে ধ্যান ভাঙে সাঁঝের। দরজার ওপাশ থেকে টিয়ার গলা শোনা যাচ্ছে।
সাঁঝ, ওপেন দ্যা ডোর ইয়ার।

সাঁঝ দরজা খুলে দেয়। ঘরে ঢুকে মেঝেতে দেখে অনেক জিনিস ছড়িয়ে আছে। টিয়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
এগুলো নিয়ে নেক্সট প্লান কি?
বলছি বাইরে চল।

কালো জামদানী শাড়িটায় সব জিনিস বেঁধে টিয়ার হাতে দেয়।
এগুলো দিয়ে আমি কি করব?
বাইরে নিয়ে যা আমি আসছি।

টিয়াকে বাইরে পাঠিয়ে রান্নাঘর থেকে কেরোসিন আর দিয়াশলাই নিয়ে বাইরে আসে সাঁঝ। সাঁঝের হাতে এ সব দেখে সবটা বুঝতে পারে সাঁঝ। শাড়িতে ক্যানের পুরো কেরোসিন ঢেলে দেয়। দিয়শলাইয়ের একটা কাঠি পরতেই পুরো শাড়িতে আগুন জ্বলে যায়।
এখন যে কাজটা করলি তাতে যে আমি কতটা খুশি হয়েছি তা তোকে বলে বুঝাতে পারব না। সামনে অনেকটা পথ তোকে চলতে হবে, তৈরী কর নিজেকে।
তুই থাকবি তো আমার পাশে?

আমি সারাজীবন তোর পাশে আছি। তোর ছায়া আমি।
তোর মতো বোন বন্ধু যেন সবাই পাই।

সবার কথা বাদ দিয়ে নিজের কথা ভাব। খাবি চল, কাল থেকে কিছু খাসনি।
চল।
বাড়ির চৌকাঠে দাড়িয়ে বাড়ির ভিতরের কথা শুনে থমকে যায় সাঁঝ। নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না ও, ওখানেই বসে পরে।
আমি এটাই চাইছিলাম সাঁঝ। এবার আমার কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। ওল দ্যা বেষ্ট মাই ফ্রেন্ড।

পর্ব ৩

বাড়ির নতুন বউ সবার জন্য চা করেছে কিন্তু তাতে চিনির বদলে দিয়েছে লবন। শ্বাশুড়ির হাতে চায়ের কাপ দিয়ে পাশে দাড়ায় নতুন বউ। কাপে চুমক দিতেই চোখ কোটর থেকে বের হয়ে যাবার জোগাড়, না পারছে গিলতে না পারছে ওগরাতে। বাকি সবারই একই দশা। নতুন বউ তাই মুখ ফুঁটে কেউ কিছু বলতেও পারছে না। কিন্তু সন্ধ্যা সবার মুখ দেখে কিছু যে একটা হয়েছে তা বুঝতে পারছে। এরই মাঝে নম্রতা এসে কাপের পুরো চা সন্ধ্যার মুখ ছুড়ে দেয়। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ। নম্রতা প্রচন্ড জেদী আর ও সবার উপর রেগে আছে কিন্তু তাই বলে এমন কিছু করবে তা কেউ আশা করে নি।
নম্র কি করেছিস তুই এটা?

মায়ের এমন ঝাঁঝাল কন্ঠ শুনে হেঁসে উত্তর দেয়,
শুকরিয়া কর গরম চা দেই নি। আর তোমার স্বাধের বৌমাকে বলে দিয় তার হাতে একফোঁটা পানিও খাবার ইচ্ছে আমার নেই।
আর হ্যাঁ চা যে চিনি দিয়ে তৈরী করা হয় তা তার কানে একটু ঢুকিয়ে দিও।
তুই কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছি। এর ফল কিন্তু ভালো হবে না।
ওয়েল ইয়র ওউন মেশিন।

নম্রতা চলে গেলে শুদ্ধর মা সন্ধ্যার কাছে যায়।

তুমি ওর কথায় কিছু মনে কর না মা।
না মা আমি কিছু মনে করিনি। আজ আমার উপর রেগে আছে কাল ঠিক রাগ পরে যাবে।
লক্ষী মা আমার। তুমি গিয়ে শুদ্ধকে ডেকে আন।
ভাগ্যিস শুদ্ধ আর সন্ধ্যা ঠিক সময়ে সব বলে দিয়েছিল,নাহলে কি যে হত!

সাঁঝের মা আমরা কি কাজটা ঠিক করলাম? সাঁঝ যদি জানতে পারে আমাদের খারাপ ভাববে।
ও কিছু জানতে পারবে না। আর জানলেও কিই বা করতে পারবে? তাছাড়া ও করতে পারেই বা কি? সারাজীবন তো শুধু লেখাপড়া, ঘরকন্যার কাজ আর বছর চারেক হল চাকরি, এইতো।

আমাদের অন্তত সাঁঝের বিয়ের সাজে সাজার আগে সন্ধ্যার সত্যিটা বলার উচিৎ ছিল। বেচারি কত কষ্টই না পেল।
রাখত তোমার কষ্ট, হুহ। বিয়ে ভেঙেছে বিধবা তো হয়নি। কপালে থাকলে বিয়া করতে পারবে।

সন্ধ্যা শুদ্ধকে ভালোবাসে, তা তো আমরা শুদ্ধর সাথে সন্ধ্যার বিয়েতে রাজি হয়েছি, শুধু সন্ধ্যা কেন শুদ্ধও তো সন্ধ্যাকে ভালোবাসে।
একটা কথা মনে রেখ, আমরা কোনো ভুল করি নি। আর সাঁঝকে বলে দিও পরের মাস থেকে যেন সংসার খরচের টাকা যেন বেশি দেয়। এ বাজারে ও যা দেয় তাতে হয় না।
তুমি শুধু সন্ধ্যার কথাই ভাবলে, সাঁঝের কথা ভাবলে না?

এ কথা তুমি বলতে পারলে? ওকে যে খায়িয়ে পরিয়ে এত বড় করলাম তা কিছু না। ওকে যে জন্মের পর লবন খায়িয়ে মেরে ফেলিনি এই ওর ভাগ্য। মুখ পুড়ি জন্ম নিতে না নিতেই আমার বাবা-মাকে খেয়ে নিয়েছে, ওকে যে বাঁচিয়ে রেখেছি এটাই বাপ-বেটিতে শুকরিয়া কর।
বাবা-মায়ের কথা শুনে সাঁঝের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ওর সমস্ত ভাবনা চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে।

টিয়া সাঁঝের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বুক ফেটে কান্না আসছে ওর। ছোট বেলা থেকে সাঁঝের সাথে ওর ছায়া হয়ে রয়েছে। সাঁঝের মা যখন রেগে গিয়ে সাঁঝকে খেতে দিত না তখন টিয়া ওর ভাগের খাবার সাঁঝের সঙ্গে ভাগ করে নিত, যখন সারারাত ঘরের বাইরে রেখে ঘরের দোর দিয়ে দিত তখন টিয়াও ওর সাথে ঘরের বাইরে থাকত।

টিয়ার এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে ওর মায়ের কোনো সমস্যা না থাকলেও সাঁঝের মায়ের বেশ সমস্যা ছিল।

তিনি সাঁঝের প্রতি অন্যের এতো আদর এতো খেয়াল কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। সাঁঝের জন্মের ৭দিনের দিন ওর নানা-নানি ওকে দেখতে আসছিল,তখন এক অ্যাকসিডেন্ট এ সাঁঝের তারা মারা যায়। সেই থেকেই সাঁঝের মা এটা মনে নিয়ে বসে আছেন যে, তার মা বাবার মৃত্যুর কারণ সাঁঝ, ও অপয়া অলক্ষী। সেদিন থেকে শিশু সাঁঝকে সে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেয়। খুধা পেলে সাঁঝ কাদত কিন্তু ওর মা ফিরেও তাকাত না। তখন টিয়ার মা সাঁঝকে দুধ দিত। এটা সাঁঝের মা কিছুতেই সহ্য হত না, কয়েকবার তো সাঁঝকে মারতে গেছিল কিন্তু প্রতিবারই সে কাজে সে ব্যর্থ হয়। সবাই ওর মা থেকে ওকে দূরে রাখত।

টিয়ার আর ওর মায়ের সাথে সাঁঝের এতো সখ্যতা সহ্য করতে না পেরে সাঁঝের মা সংসারের হাড়ি আলাদা করে দেয়। আর তার পরই শুরু হয় সাঁঝের প্রতি অমানবিক অত্যাচার। ঠিক মতো খেতে দিত না,ঘুমাতে দিত না, সারাদিন কাজ করাত, স্কুলে যেত দিত না, পরতে দিত না। তাও বহু কষ্টে সাঁঝ ওর লেখাপড়া চালিয়ে যেত। এতো কিছুর পরও সাঁঝ মুখ ফুটে কিছু বলত না, হাসি মুখে সবটা মেনে নিত। কেউ কিছু বললে বলত
উনি অামার মা, আমি ওনার কথার অবাধ্য হতে পরব না। অামি ওনাকে অনেক ভালোবাসি।

একটা সময় সাঁঝের বাবাও ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। লেখাপড়ার কোনো খরচ দিত না। টিউশনি করিয়ে আর উপবৃত্তির টাকা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার চালিয়েছে, অবশ্য তা থেকেও অনেকটা টাকা ওর মায়ের হাতে তুলে দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে ৩ বেলার ২ বেলা খাওয়া বন্ধ।
কিন্তু সন্ধ্যার ক্ষেত্রে হয়েছে পুরোটা উল্টো। সাঁঝ যতটা কষ্ট করেছে তার চেয়েও ১০গুন বেশি সুখ সন্ধ্যা পেয়েছে। ওকে কখনো বুঝতে দেয়া হয় নি কষ্ট কি। যথেষ্ট আদরে ওকে বড় করা হয়েছে, কখনো এক গ্লাস পানি নিজ হাতে গড়িয়ে খেতে হয় নি।

কথায় আছে, অভাগা যে দিকে তাকায় সেদিকে সাগর শুকিয়ে যায়। এখানে সাঁঝের হয়েছে সেই অবস্থা।
ওঠ সাঁঝ, ভিতরে চল।

কেন যাব? ওখানে কেউ আমাকে চায় না। আমি কখনো কাউকে সুখী রাখতে পারিনি, যেখানে গেছি সেখানেই কষ্ট নিয়ে গেছি। বেঁচে থেকে কি হবে আমার? সবাই কষ্ট পাবে আমার জন্য, পাবে বলছি কেন পাচ্ছে তো।
সবার কষ্টের দায় তোর নয়। তোর থেকে যদি কেউ কষ্ট পায় সেটা তার সমস্যা।

তোকে অামি আগেও বলেছি অন্ধের মতো কাউকে ভরষা করিস না, যাদের ভরষা করবি তারাই তোর পিঠ পিছে ছুরি মারবে যেমন তোর বাবা-মা, সন্ধ্যা আর শুদ্ধ। এতো ভালোবাসা দিলি এদের, কিন্তু কোনো লাভ হল কি?
সন্ধ্যা তো জানত তুই শুদ্ধকে ভালোবাসিস, তাহলে ও এমনটা করল কি করে?
আমি আর কিছু ভাবতে চাই না।

তোকে আর কিছু ভাবতে হবে না, যা ভাবার সব আমি ভেবে নিয়েছি।
কি ভেবেছিস তুই?
তার আগে বল আমার উপর কি তোর ভরষা আছে?
হুম।

আগে আমাকে কথা দে আমি যা বলব তুই কোনো প্রশ্ন ছাড়া সবটা মেনে নিবি।
আচ্ছা।
নতুন বর-বউকে নিয়ে বসার ঘরে আড্ডার আসর জমানো হয়ে। সবাই গোল হয়ে বসেছে। নম্রতাকে জোর করে আনা হয়েছে।
কাজিনদের একের পর এক প্রশ্নে শুদ্ধ আর সন্ধ্যার নাজেহাল অবস্থা।

তা মি.বর সন্ধ্যার সাথে আপনার প্রেম কাহিনীটা একটু বলুন, আমরাও শুনি।
সন্ধ্যাকে প্রথম দেখাতেই আমার চোখ আটকে গেছিল। যাকে বলে লাভ এট ফাষ্ট সাইড। তার পর কথা, পরে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা আর এখন বিয়ে।
তা হ্যাঁরে শুদ্ধ তোর লাভ এট ফাষ্ট সাইড কয়বার হয় রে?

এক কাজিনের এমন প্রশ্নে পুরো আসরে হাসির রোল পরে যায়। লজ্জায় মাথা নিচু হয় শুদ্ধ সন্ধ্যা দুজনেরই। এর পর একেক জনের একেক রকম খোঁচা দেয়া কথা শুরু হয়। শুদ্ধ আর সন্ধ্যা চাইলেও ওখান থেকে বের হতে পারবে না।
ভাই শুদ্ধ তোকে দেখলে বোঝা যায় না তুই এতো চালু, এক সাথে দুই বোনকেই নাচালি।
কি ভাবে করলি সেই ট্রিকস টা আমাদেরও একটু বল।

আমি ভাবছি অন্য কথা, সন্ধ্যা মানে আমাদের ভাবি কিভাবে পারল নিজের হবু দুলাভাই এর সাথে এমনটা করতে? ও তো জানত সাঁঝ আর শুদ্ধের কথা।
তুই ঠিক বলেছিস। বিয়ে করলে আমি সাঁঝের মতো নিঃস্বার্থ মেয়েকে বিয়ে করব।
রছে না।
সাঁঝ রে আগামিকাল তোর স্বাধীনতা দিবস।
কথা শেষ করে আবারও সেই হাসি….

পর্ব ৪ (অন্তিম)

আরে আগের সাজে হবে না নতুন করে সাজাও। অার একমাত্র ছেলের বৌভাত বলে কথা। এমন ভাবে সাজাও যেন আগামী ২০ বছর সবার মনে থাকে।
শুদ্ধের মা বেশ ব্যস্ত আজ, ছেলের বৌভাত বলে কথা। সারা বাড়িতে লোকজন ভরপুর। নানাজনের নানা রকমের কথা কিন্তু শুদ্ধর মা বেশ কৌশলে তা এড়িয়ে যাচ্ছে।

গত রাতের কাজিনদের আড্ডার পর শুদ্ধকে আর দেখা যায় নি। সন্ধ্যা বেশ এড়িয়ে চলছে।
সাঁঝের মা সাঁঝের সামনে দাড়িয়ে আছে অার সাঁঝের পাশে দাড়িয়ে আছে টিয়া। সবার মুখই থমথমে।
টাকা গুলো দে, সন্ধ্যার জন্য কিছু কিনতে হবে।
আমি সত্যি বলছি আমার কাছে কোনো টাকা নেই।

তাহলে কার্ড বা বিকাশ থেকে তুলে দে।
বিকাশের সব টাকা চুরি হয়ে গেছে, আর কার্ড কোথাও খুজে পাচ্ছি না।
মিথ্যা বলার যায়গা এটা না। তুই টাকা দিবি কি না তাই বল?

কতবার বলব যে টাকা নেই।
কাকিমা সাঁঝ তো বলছে ওর কাছে টাকা নেই, তাও এমন করছ কেন?
দেখ টিয়া আমাদের মা মেয়ের মাঝে তুই কোনো কথা বলবি না।

এ কথা বলতে তোমার জিহ্বা একটুও কাপল না কাকিমা? মা মেয়ে! কোনোদিন ওকে মেয়ের ভালোবাসা দিয়েছ? দিবে কি করে, নিজের বুকের দুধই তো দিতে না আর ভালোবাসা তো দূরের কথা। যাও তো এখান থেকে। সন্ধ্যা তো তোমার মেয়ে, তাহলে ওর জন্য এই অপয়া মেয়েটার কাছে টাকা চাইছ কেন? কাকিমা এই মেয়ের কাছ থেকে দূরে থাকো, তোমার মেয়ের নতুন সংসারে যদি এই অপয়া মেয়েটার নজর লাগে তা কিন্তু কারোর জন্য ভালো হবে না।
টিয়ার এমন টিজ দেয়া কথা সাঁঝের মায়ের সহ্য হয় না, রাহে গজগজ করতে করতে চলে যান।

সাঁঝ ছোট ছোট চোখ করে কোমড়ে হাত দিয়ে টিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সাঁঝের দিকে চোখ পরতেই টিয়া হাসি থামিয়ে দেয়।
সাঁঝ আজ কেন কখনোই টিয়ার কাজের কোনো আগাগোড়া খুঁজে পেত না,কিন্তু দিন শেষ দেখা যেত ও যা করছে তা কারোর ভালোর জন্যই করছে। তবে টিয়ার পেট থেকে কথা বের করা খুবই কঠিন।

দুই বান্ধবীর জুটি এমনই হয় একজন সরল হলে অন্যজন জটিল, একজন মনের দিক দিয়ে নরম হলে অন্যজন শক্ত, তবে দুজনের দুজনকে ছাড়া চলে না।
টিয়া হাসি থামিয়ে রুমের দরজা আটকে দেয় আর তারপর সাঁঝের হাতে ওর মোবাইল টা দেয়। আর বলে,
তুই কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিস আমি যা বলব তুই কোনো প্রশ্ন ছাড়া সবটা মেনে নিবি।
হ্যাঁ অামার সবটা মনে আছে। তার আগে প্লিজ বলবি দরজা কেন বন্ধ করলি?

বন্ধ করেছি কারন এখন আমি যা বলব আমি চাইনা এসব কথা তুই আর আমি ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তি জানুক।
কি কথা?

গত পরশুদিন তোর ফোনে একটা মেইল আসে আর একটা নাম্বার থেকে কয়েকটা মেসেজ আসে, তোকে না জানিয়ে আমার মেইল আর মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছি। আমি সরি চেয়ে নিচ্ছি কারণ আমি তোর পারমিশন ছাড়া তোর জীবনের একটা বড় কাজ করে ফেলেছি।
আমার আর জীবন! এটা জীবন না রে, এটা খেলার মাঠ। যে যেমন পারছে তেমন খেলা খেলছে এ মাঠে।
তুই মেইল আর মেসেজ গুলো চেক কর।

ফোন নিয়ে মেইল আর মেসেজ চেক করে বসে পরে সাঁঝ। নিজেকে সামলে উঠে দাড়িয়ে টিয়াকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দেয়।
তোর কাছে আমার ঋণের পরিমান দিনদিন বাড়তেই যাচ্ছে টিয়া। আমি নিজেই চাইছিলাম সব কিছু থেকে থেকে সরে যেতে। কিন্তু তোর হাত ধরে যে এত বড় একটা সুযোগ আমার পায়ের কাছে আসবে আমি তা ভাবতেও পারিনি।

তোর মুভঅন করার সময় হয়ে গেছে সাঁঝ। এতোদিন অন্যের জন্য ভেবেছিস, এবার তুই নিজের জন্য ভাববি অার নিজের জন্য বাঁচবি।
হুম, তাই করব। এ শহরে থেকে আমি কিছুই করতে পারব না। এখানে থাকলে পিছুটান কখনো আমাকে সামনে আগাতে দেবে না।
আজ রাতেই আমার সিলেটের জন্য রওনা হচ্ছি।
আমরা মানে?

আমরা মানে তুই, আমি আর মা। কি মনে করেছিস তুই, তোকে আমরা একা যেতে দেব? আমিও অফিস থেকে ট্রান্সফার নিয়ে নিয়েছি। আমাদের কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ সিলিটেও আছে। আর আমাকে প্রমোশন দিয়ে ট্রান্সফার করা হয়েছে। ওখানে আমাকে একটা ফ্লাট আর গাড়ি দিবে। আজ থেকে আমরা একসাথে থাকব,সিলেছে।

সেদিন রাতে সাঁঝের কাছে ওর ট্রান্সফারের মেইল আসে। বিয়ের জন্য ছুটি নেয়ায় ওর কাছে ফোন না দিয়ে অফিস থেকে মেসেজ দেয়া হয়। সাঁঝের ট্রান্সফার সিলেটে করা হয়। মেইল দেখে টিয়ার মাথায় বুদ্ধির সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। ও সেই নাম্বারে ফোন দেয়, নাম্বারটা ছিল কোম্পানির এমডির। এমডি আর টিয়া আগে থেকেই একে অপরকে চিনত। টিয়া সাঁঝের কথা খুলে বলে আর বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাঁঝের ট্রান্সফার কার্যকর করার জন্য। তিনি তাতে রাজি হয়ে ২ দিনের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা করে।

টিয়া চেয়েছে সাঁঝকে এ সব নোংরা মানুষদের থেকে দূরে রাখতে, তাই যখন মেইল পায়, সবটা নিজ দ্বায়িত্বে সামলায়।
বিয়ের ওই ঘটনার পর টিয়া মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল সাঁঝকে ওর সাথে সিলেট নিয়ে যাবে, তাতে সাঁঝ রাজি হোক বা না হোক।
সাঁঝের নিয়তিতে হয়ত এটাই ছিল, তাই টিয়ার সাথে ওর ট্রান্সফারও সিলেটে হয়েছে।

তাড়াতাড়ি সব প্যাকিং শেষ করে নে। এবাড়িত থেকে সবাই যখন সন্ধ্যার বৌভাতে যাবে, আমরা তার কিছুক্ষণ পর রওনা হব। সবাই জানে আমি সিলেট যাব কিন্তু কাউকে এটা জানতে দেয়া যাবে না যে তুই সিলেট যাচ্ছিস।
একবার ও বাড়িতে যাব।
তুই..
প্লিজ টিয়া, শেষ বারের মতো।

আচ্ছা তাহলে আমরা রেড়ি হয়ে একেবারে বেরব। ও বাড়ি থেকে বের হয়েই সোজা সিলেট।
আচ্ছা।

নীল বেনারসি, ভারি মেকআপ অার সোনার গয়নায় সাজানো হয়েছে সন্ধ্যাকে। ওর শ্বাশুড়ি এসে কাজলের টিকা দিয়ে গেছে, যাতে কারোর নজর না লাগে। শুদ্ধ তো সন্ধ্যার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না।

সাঁঝকে এ বাড়িতে দেখে অনেকেই চমকে যায়। কারোর ধারণাতেও ছিল না সাঁঝ আসবে। অার ওর মা-বাবাও ওকে আসার জন্য বলেনি।
টিয়া সাঁঝের জন্য জন্য একটা নতুন কালো জামদানী শাড়ি এনেছে, সাঁঝ সেটাই পরেছে, কালো চুড়ি, বড়বড় টানা চোখে চিকন করে কাজল, কোমড়ের নিচ অবধি ছড়ানো কালো চুল। অনুষ্ঠানের সব ছেলের চোখ আটকে গেছে।

কারো দিকে না তাকিয়ে সাঁঝ সোজা সন্ধ্যার কাছে যায়। সাঁঝকে সন্ধ্যার কাছে যেতে দেখে শুদ্ধর মা যেন উড়ে এসে ওদের পাশে দাড়াল। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে হাতের রিং ফিঙ্গার থেকে আংটিবদলের আংটি খুলে শুদ্ধের হাতে দেয়। বলে,
নাও এটা সন্ধ্যাকে পরিয়ে দাও।

শুদ্ধর মা বলে ওঠে,
আমার ছেলের বউ সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস পরবে না।
সাঁঝ হেঁসে বলে,

আপনার ছেলের বউ তো সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস পাশে নিয়ে দাড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতে সেটা নিয়ে সংসারও করবে তাহলে এ সামান্য আংটি কি দোষ করল। এটাও আমার বৌমা ব্যবহার করতে পারবে।

সাঁঝের কথা টিয়া সহ আরো কয়েকজন সিটি বাজায়। অনেকেরই মাথা নিচু হয়ে আছে। সাঁঝ স্টেজ থেকে চোখ বুলিয়ে সবাইকে দেখছে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ওর বাবামায়ের কাছে যায়।

আজ থেকে মনে করবে তোমাদের বড় মেয়ে মরে গেছে। ভুলে যেও কোনোদিন অামি তোমাদের জীবনে ছিলাম অার আমিও ভুলে যাব যে তোমরা কোনোদিন আমার জীবনে ছিলে। তোমাদের মাসিক খরচ ঠিক সময় মতো তোমার দরজায় পৌঁছে যাবে।

জানি আমাকে কোনোদিন এটিএম ছাড়া মেয়ে বলে মনে কর নি। যদি কোনো দিন মেয়ে বলে মনে হয় বা না হয় আমাকে খুঁজতে যেও না। আসছি..
সেদিন বিয়ের আসর থেকে সাঁঝ মাথা নিচু গিয়েছিল আজ এখান থেকে মাথা উঁচু করে বের হচ্ছে। আজ টিয়া ওর পাশে আছে সেদিনও পাশে ছিল।
চোখ মুছে গাড়িতে ওঠে সাঁঝ। শহরের কোলাহল থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিজ গতিতে চলতে থাকে।
গাড়ির জানালা টিয়া খুলে দেয়।

আজ থেকে তুই স্বাধীন সাঁঝ। উপভোগ কর নিজের এ নতুন জীবনকে।

জানালা থেকে মাথা বের করে গভীর শ্বাস নেয় সাঁঝ। নিজেকে আজ মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে।
রাতে বুক চিরে আস্তে আস্তে মুখ বের করছে সূর্য, সাঁঝের জীবনে নতুন সূর্য উঠছে, যে জীবনে নেই কোনো বাঁধা, নেই কোনো পিছুটান।
কেটে গেছে ২৫টি বছর। সিলেট যাবার তিন বছর পর টিয়া আর ওর মায়ের জোরাজুরিতে বিয়ে করে সাঁঝ, মানুষটা বড় ভালো, সাঁঝের সবটা জেনেও বিয়ে করেছে ওকে। এমন মানুষ পৃথিবীতে আছে বলেই আজও পৃথিবীটা এতো সুন্দর। এক ছেলে আছে ওদের, ২০ বছর বয়স। টিয়াও বিয়ে করেছে, ওর মেয়ের বয়স ১৮ বছর।

সন্ধ্যার ২ মেয়ে, বড় মেয়ের নাম ছায়া বয়স ২৩ আর ছোট মেয়ের নাম মায়া বয়স ২০।
এতো গুলো বছরে মাত্র একবার নিজের সেই পুরোনো শহরে গেছিল সাঁঝ, যেদিন ওর বাবামায়ের মৃত্যু হয়। একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে তাদের মৃত্যু হয়। সাঁঝ প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকা পাঠাত। বিয়ে করে একবার ফোন দিয়েছিল তাদের জানাতে। সেদিন ওর বাবা-মা নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনেক কেঁদেছিল কিন্তু সাঁঝ কিছু বলে নি।

আজ আবার যাবে নিজের সেই শহরে। সন্ধ্যার বড় মেয়ের বিয়েতে। সাঁঝের স্বামী আর শুদ্ধ বিজনেস ফ্রেন্ড, সেই হিসেবেই দাওয়াত এসেছে, কোনো আত্মীয় হিসেবে না। এমনকি শুদ্ধ নিজেও জানে না এ সাঁঝের স্বামী।
আজ সাঁঝের সাথে টিয়াও এসেছে। সাঁঝকে দেখে সন্ধ্যা আর শুদ্ধ দুজনেই অবাক হয়। কোনোদিন ভাবেনি সাঁঝ ফিরবে। এতবছর পর দুবোনের দেখা। দুজন দুজনকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দেয়।

২৫ বছর আগের সাঁঝের বিয়ের আসরে শুদ্ধ আর সন্ধ্যা যে ঘটনা ঘটিয়েছিল, ২৫ বছর পর সেই একই ঘটনা সন্ধ্যা আর শুদ্ধর বড় মেয়ে ছায়ার বিয়েতে ঘটিয়েছে ওদের ছোট মেয়ে মায়া আর ছায়ার হবু বর রোশান।

আজ ওদের চোখ খুলেছে, ওরা বুঝতে পারছে সেদিন কি ভুল করেছিল।
মা বাবা আজ তোমাদের খুব ভালো লাগছে নিশ্চয়ই, খুশি হয়েছ তো? যে কাজে তোমরা খুশি হয়েছিলে সেই একই জিনিস যখন তোমাদের মেয়ের সাথে হচ্ছে তখন নিশ্চয়ই তোমাদের খুশি হওয়ার কথা।

তোমাদের নোংরা কাজের জন্য আজ আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে।
ছায়া নিজের রুমের দরজা আটকে হাতের রগ কেটে দেয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এর জন্য ছায়ার মৃত্যু হয়।
সন্ধ্যা সাঁঝের পা ধরে ক্ষমা চায়। টিয়া ওকে নিয়ে আসার জন্য ওর হাত ধরার আগে সাঁঝের স্বামী ওর হাত ধরে নিয়ে আসে। টিয়া হালকা হেসে ওদের সাথে পা বাড়ায়।
প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয় না। তুমি যে কাজ করবে তার ফল তোমাকে এখানেই পেতে হবে।

শুদ্ধ সন্ধ্যা এই ২৫টি বছর খুব সুখে কাটিয়েছে কখনো ভাবেনি এমন কিছু হবে। শেষ বয়সে এসে এতবড় একটা ধাক্কা পেল ওরা। ওদের নিয়তিতে এটাই পাওনা ছিল। এটাই রিভেঞ্জ অব নেচার, এটাই নিয়তি।

লেখা – সানজিদা ইসলাম সেতু

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “নিয়তি – ভালোবাসা কপালের লেখা” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – নীল রংধনু – অজানা ভালোবাসার কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!