রিলেশনশিপ

ডেস্পারেট লাভ (১ম খণ্ড) – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক

ডেস্পারেট লাভ (১ম খণ্ড) – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক: মিম ঘরের পর্দাগুলো সব সরিয়ে দেয়। বারান্দার থাই খুলে দেয়। অর্নীল কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। মিমের চুল থেকে টপটপ পানি পরছে। মিম লাল পাড়ের অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি পরা।


পর্ব ১

আমেরিকা! এই দেশের নাম শুনে যে কেউ বিশাল কিছুই ভাববে। ভাবাটাই স্বাভাবিক৷ পুরো পৃথিবী রাজ করছে এই আমেরিকা ই। মানুষ জন ঠিক কেমন এইটা তাদের ব্যবহারে বোঝা না গেলেও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। সেই দেশেই পড়াশোনা করে এসেছে অর্নীল। কখনো ক্লাসমেট অথবা শিক্ষকদের সাথে অর্নীলের কোনো ভাব ছিলো না। সবাই অর্নীলকে জানতো ক্রাশ আর টপার বয় হিসেবেই।

৭৮০ টা প্রেম প্রস্তাবে অর্নীল একটা কথাই বলেছে চাইলে সুইসাইড করতেই পারো। আমেরিকা থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেশে ফিরছে অর্নীল। ফ্লাইটে বসে ইংলিশ ম্যাগাজিন পড়ছিলো আর আব্বু, আম্মু আর দিভাইয়ের কথা ভাবছিলো। সাড়ে ছাব্বিশ বছর লেগে গেলো পড়াশোনা শেষ করতে করতেই। দেশে গিয়ে এখন কি করবে সেইটাই ভাবা হয়নি অর্নীলের। রাত আড়াইটায় অর্নীলের ফ্লাইট বাংলাদেশে ল্যান্ড করলো। অর্নীলকে রিসিভ করতে এসেছে অর্নীলের আব্বু, আম্মু আর দিভাই। অর্নীলের বড় ভাই আছে তবে সে ব্যস্ততার জন্য আসতে পারেনি।

~ How are you my son? (অর্নীলকে হাগ করে আব্বু)
~ I am fine. তোমরা কেমন আছো? (সবার উদ্দেশ্যে অর্নীল)
~ অবশ্যই ভালো আছি। ১৭ বছর পর তোমায় সশরীরে দেখছি। ভালো আছো আব্বু? (অর্নীলের মা)
~ হয়ত ভালো আছি।
~ আব্বু আগে ভাইকে নিয়ে বাসায় তো চলো। ভাই তো আর কোথাও যাচ্ছে না। (অনন্যা) (অর্নীলের দিভাই)
~ ভালো আছিস দি?

~ এবসুলিউটলি! (অর্নীলের হাত ধরে দিভাই)
অর্নীলের কোনোদিন ই ইচ্ছে ছিলো না দেশে আসার। কিন্তু পরিবার থাকলে যা হয় আর কি! বাধ্য হয়েই দেশে আসলো অর্নীল। অর্নীলকে রিসিভ করতে নতুন প্রাইভেট কার নিয়ে এসেছে অর্নীলের আব্বু অর্নীলের জন্য কারণ অর্নীল সবার আদরের আর সবচেয়ে ছোট সন্তান। অর্নীল আর দি ভাই গেলো অর্নীলের গাড়িতে আর আব্বু আম্মু আরেকটা গাড়িতে গেলো। ভোর পাঁচটায় বাসায় ঢুকলো অর্নীল। অর্নীলের বউমনি আর ভাইয়া অর্নীলকে ওয়েলকাম করার জন্য আগে থেকেই রেডি ছিলো। অর্নীল ব্লেজার রেখে আগে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলো।

~ আমার সেই ছোট্ট ভাইটা এত বড় হয়ে গেছে? (অর্নীলের বড় ভাইয়া আরুশ)
~ তুমি কি ভেবেছিলে ছোটই থাকব? তোমার থেকে তিন ইঞ্চি বেশি লম্বা আমি। (অর্নীল)
~ মা তুমি এই ছেলেকে রেখে সতেরো বছর কিভাবে কাটাইলা? (আরুশ)
~ আর আফসোস করতে হবেনা আমার। আমার অর্নীল আমার কাছে এসে গেছে। (অর্নীলের মা)
~ আমার তো এখন আফসোস হচ্ছে কেনো আমার দেবরটা আমার বিয়ের আগে দেশে ছিলো না! (অর্নীলের বউমনি)

~ থাকলে কি হতো? (বউমনির দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ এই ড্যাশিং ছেলেটাকে বিয়ে করতাম।
~ আমার ভাইয়াও কম ড্যাশিং নয় ওকে?
~ তোমার থেকে বেশি না।

~ আচ্ছা আমি ঘরে যাচ্ছি।

~ তোর ঘরটা কোনদিকে মনে আছে? (অনন্যা)
দি ভাইয়ের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে অর্নীল পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাল্কা হাসলো।
~ দেখি মনে আছে কি না! (অর্নীল)
অর্নীল ব্লেজারটা তুলে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে উঠছে আর বামদিকের দ্বিতীয় ঘরটা দেখিয়ে অনন্যাকে জিজ্ঞেস করলো,
~ ঠিক এইটাই তো?
~ অনন্যা মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল।

অর্নীল ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। এই ঘরের কিছুই অর্নীল চিনেনা৷ সব কিছুই নতুন। কাবার্ড, বেড, আর্ম চেয়ার, সোফাসেট সবই নতুন। কার্পেট গুলোও নতুন। হয়ত অর্নীলের জন্যই সব পালটানো হয়েছে। অর্নীল শার্টের দুইটা বোতাম খুলে এসি অন করে আর্ম চেয়ারে বসলো। আর সবার আগে ভাবছে,
~ গড আমার যেন শাইমার সাথে কোনোদিন দেখা না হয়। সেদিন তাহলে নিজের জমানো রাগ কন্ট্রোল করতে পারবনা আমি। ও তো হাজবেন্ড নিয়ে এই দেশেই আছে। হ্যাপি থাকুক।
সকাল সকাল অর্নীল গোসল করতে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে কুশন ধরেই বিছানায় ত্যাড়া হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পরে।
সকাল এগারোটায়,

~ অর্নীল? উঠবেনা ঘুম থেকে? এই যে তোমার ব্ল্যাক কফি। এইটা ছাড়া নাকি তোমার ঘুম ভাঙে না। (বউমনি)
~ থ্যাংক ইউ। ভাইয়া কোথায়? (উঠে বসে অর্নীল)
~ ও তো অফিসে গেলো। এসে পরবে। তুমি কফি খেয়ে ব্রেকফাস্ট করে যাও।
~ কামিং।

অর্নীল টি শার্ট, ট্রাউজার আর স্যান্ডেল পরে নিচে আসলো। ততক্ষণে আরুশ চলে আসে। ড্রইংরুমে সবাই বসে অর্নীলকে নিয়েই গল্প করছে।
~ কি কথা বলছো আমায় নিয়ে? (নিউজপেপার হাতে নিয়ে অর্নীল)
~ আব্বু বসো। (অর্নীলের আব্বু)
~ সমস্যা নেই।

~ অর্নীল বাবা ডিসাইড করেছে তোর উপর ফ্যাশন ডিজাইং এর দায়িত্ব দিবে। (আরুশ)
~ চৌধুরী ক্রিয়েশন? (পেপার পড়তে পড়তে অর্নীল)
~ হ্যা।

~ কেনো ভাইয়া? তুমিই না দেখছিলে সব। আমি চেয়েছিলাম নতুন করে নিজে কিছু করতে।
~ আমি একা কয়টা দেখবো? বাকি চারটা কোম্পানি আমি দেখছি। তুমি এই একটা দায়িত্ব ই নাও। তাছাড়া নিজেদের এত বিজনেস থাকতে তুমি কেনো আলাদা করবে? (আরুশ)
~ কবে যেতে হবে অফিসে? (অর্নীল)

অর্নীলের প্রশ্ন শুনে সবাই অর্নীলের দিকে তাঁকায়। এত ইজিলি অর্নীল রাজি হয়ে গেলো কিভাবে? কোনোকিছু ফোর্স না করে তো ওকে শোনানো যায় না।
~ তুমি রেডি থাকলে আগামীকাল। (অর্নীলের বাবা)

~ আচ্ছা ঠিক আছে। আম্মু আমার ব্রেকফাস্ট কোথায়? (অর্নীল)
~ বাবা তুই ঠিক আছিস? এত বড় ক্রিয়েশনস এর দায়িত্ব তুই নিয়ে নিলি? (অর্নীলের আম্মু)
~ অর্নীল দায়িত্ব নিতে পছন্দ করে। তাছাড়া আমিই আব্বুকে বলতাম বিজনেসের কথা। এক মিনিট ও আমি ফ্রি থাকতে চাইনা। (অর্নীল)
~ এই নে তোর খাবার।

~ এইসব রিচ ফুড আমি খাইনা মা। জাস্ট স্যালাড আর জুস দাও আমায়। নিশ্চই ভুলে যাওনি আমার শ্যুগার আছে।
~ এতদিন পর বাড়িতে এসে ওইসব খাবি তুই?
~ হ্যা।
বউমনি তারাতারি করে অর্নীলকে স্যালাড বানিয়ে দিলো। ব্রেকফাস্ট কোনোরকম করে অর্নীল বের হলো পুরোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। যথারীতি ফিরতে রাত করলো অর্নীল। সবার আদরের বলে কেউ কিছু বলল না অর্নীলকে কারণ সবেই দেশে এসেছে। বেশি কিছু বললে যদি আবার চলে যায়? রাতে অল্প কিছু খেয়ে ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে বসে অর্নীল। সারারাত এইসব নিয়েই কাটিয়ে দিয়ে ভোরে ঘুমাতে যায় ও।
সকাল নয়টায় অর্নীল রেডি হয়ে নিচে এলো অফিসে যাবে বলে। ডায়নিং টেবিলে বসে অর্নীলের বাবা পেপারস সাইন করছিলো। অর্নীলকে দেখে বউমনি বলে,
~ অর্নীলের জীবনে কি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছাড়া আর কোনো রঙ নেই? কালকে দেখলাম ব্ল্যাক পরে আসতে আর আজকে হোয়াইট শার্ট!

~ না বউমনি এত রঙ আমার জীবনে নেই। আমার জীবন হয় অন্ধকার হবে নয়ত আলো। মাঝে এইসব লাল, নীল, সবুজ, হলুদের চাহনির প্রয়োজন নেই। (অর্নীল)
বউমনি অর্নীলের কথার টুকটাক জবাব দিচ্ছিলো কিন্তু ওইসব কানে নিচ্ছিলো না অর্নীল। কারণ মেয়েদের কে দুই নয়নে পছন্দ হয়না ওর। তাই মেয়েদের কথার জবাব ও তোলা রাখেনা।

ব্রেকফাস্ট করে অর্নীল অফিসে গেলো। নতুন এমডি হিসেবে একমাত্র এখন এই অফিসে অর্নীলই বসবে। এই কথাই হয়েছে সব স্টাফদের সাথে। অর্নীলের জন্য অফিসে সব নতুন করে আনা হয়েছে আর সব সাজানো হয়েছে। অর্নীল প্রথম দিনেই সব কম্পিটিটরদের ফাইল দেখছিলো। ম্যানেজার অর্নীলকে অক্ষরে অক্ষরে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। চৌধুরী ক্রিয়েশন এর মেইন প্রতিযোগী হলো রায়হান গ্রুপ।

~ রায়হান গ্রুপের এমডি কে? (অর্নীল ম্যানেজারকে প্রশ্ন করলো)
~ মিম রায়হান ম্যাডাম স্যার।
~ একটা মেয়ে? (ফাইল হাত থেকে রেখে অর্নীল)
~ জ্বি স্যার।
~ একটা মেয়ের কাছে এইভাবে হেরে যাচ্ছিলেন আপনারা? প্রতি মাসে ওরা তিনটা প্রজেক্ট লঞ্চ করে আর আমরা মাত্র দুইটা?

~ স্যার মিম রায়হান ম্যামের মতো ডিজাইনার বাংলাদেশে নেই। প্রতি বছর উনি বেস্ট ডিজাইনিং এওয়ার্ড পায়। আর ওনার কোম্পানির ডিজাইনগুলো উনি নিজ হাতে করে তাই এত পপিউলার উনি।
~ হাহাহাহা! দেশের বাইরে তো আছে। সেখান থেকে কেনো আনলেন না?
~ আরুশ স্যার এ ব্যাপারে কিছু বলেনি তাই।
~ অফিসের স্ট্রাকচার আজকে থেকে চেঞ্জ। প্রত্যেকটা স্টাফের লিস্ট আমায় দিবেন আর প্রগ্রেস রিপোর্ট আজকে বিকেলের মধ্যে আমায় জমা দিবেন।
~ জ্বি স্যার।

~ যান এখন।
ম্যানেজার যাওয়ার পর অর্নীল পেন্সিল হাতে নিয়ে ঘুরাচ্ছে আর বলছে,
~ ওয়ান্স এগেইন একটা মেয়েকে ফেইস করতে হবে। কেনো গড? আমি যাদের লাইক করিনা তারাই কেনো বারবার আমার বিপরীতে দাঁড়ায়?

অর্নীল প্রথম দিন অফিসে বসে রায়হান গ্রুপের সব তথ্য ঘাটলো। র‍্যাংকিং এ এরাই এক নাম্বার আর চৌধুরী ক্রিয়েশন দুই নাম্বার। অর্নীল ইনফরমেশন ঘাটতে ঘাটতে রায়হান গ্রুপের এমডির কনফারেন্স দেখলো। কনফারেন্সের ভিডিও অন করে অর্নীল কফি খাচ্ছে আর দেখছে।
~ এইটুকু একটা মেয়ে চৌধুরী ক্রিয়েশনকে এইভাবে হারাচ্ছে! ওকেহ দেখা যাক।
অর্নীল অফিসের ডিজাইনারদের ডাকলো। সকলের ডিজাইন দেখলো অর্নীল। ডিজাইন দেখে অর্নীল সম্পুর্ন রেগে গেলো। ম্যানেজারসহ সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

~ ম্যানেজার সাহেব!
~ জ্বি স্যার।
~ আজকেই পেপারে নিউজ পাবলিশ করুন নতুন ডিজাইনার চেয়ে আর আমার জন্য একজন ছেলে পিএ। আর এদের আমার সামনে থেকে সরান।

~ প্লিজ তোমরা বের হও। (ম্যানেজার)
অর্নীলের কথামতো পরেরদিন ই ম্যানেজার ডিজাইনার চেয়ে খবর ছাপালেন।
ওইদিন সকালবেলা,
মিম কফি খেতে খেতে পেপার পড়ছিলো। চৌধুরী ক্রিয়েশনের নিউজ দেখে মিম শৈলিকে (মিমের পিএ) কল করলো।
~ গুড মর্নিং ম্যাডাম!
~ মর্নিং।

~ ম্যাম পেপার পড়েছেন?
~ পরলাম তো। চৌধুরী ক্রিয়েশন হঠাৎ ডিজাইনার পাল্টানোর সিদ্ধান্ত কেন নিলো? (মিম)
~ সবই নতুন এমডির সিদ্ধান্ত।
~ কে নতুন এমডি?
~ চৌধুরী পরিবারের ছোট ছেলে অর্নীল চৌধুরী।
~ নাম শুনিনি তো কখনো।
~ দেশে নাকি ছিলেন না তিনি। রিসেন্টলিই এসেছেন।
~ অফিসে আসছো কখন?
~ এইত ম্যাম রেডি হচ্ছি।
~ এসো।
মিম কফি খেতে খেতে মিমের বাপি মিমের জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে হাজির৷ মিমের বাপি মিমকে খাওয়াচ্ছে আর মিম কন্টেন্ট রেডি করছে।

~ মামনি কানের দুলটা পাল্টাও। (মিমের বাপি)
~ কেনো বাপি? (কাগজে মনোযোগ দিয়েই মিম)
~ কালো শার্টের সাথে এস কালার বল রিং মানাবে তোমায়।
~ এক্ষুণি চেঞ্জ করে আসছি মাই সুইটহার্ট।
~ আর চুলের রিবন ঘুরিয়ে লাগিয়ো।

~ আচ্ছা বাপি।
বাপির কথামতো মিম আবার শার্ট পাল্টালো, কানের দুল পাল্টালো। এরপর রেডি হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো।


পর্ব ২

মিম অফিসে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসেই ডিজাইন গুলো চেক করছে আর ভুল জায়গা গুলো ঠিক করছে।
~ ম্যাডাম আজকে কয়টায় ফিরবেন? (গাড়ির ড্রাইভার)
~ সম্ভবত রাত বারোটা বাজবে। কেনো? (ল্যাপটপেই মনোযোগ দিয়ে মিম)
~ ম্যাডাম আজকে তো আমার একটু তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়া লাগবে। আমি আসতে পারব কি না জানিনা!
~ কখন যাওয়া লাগবে?

~ রাত দশটায় ম্যাডাম।
~ আচ্ছা তুমি তখনি চলে যেয়ো। আমি ড্রাইভ করে বাসায় যাব নে।
~ ম্যাডাম স্যার তো আমায় বকবে পরে!
~ আমি বাপিকে ম্যানেজ করে নিব। তুমি রাতে চলে যেয়ো।
~ ধন্যবাদ ম্যাডাম।

মিম অফিসে গিয়ে ডিজাইনারদের হাতে ডিজাইন গুলো সাবমিট করলো। সবাইকে বুঝিয়ে দিলো কোন কটন দিয়ে কোন ড্রেসটা বানাতে হবে। মিম যখন অফিস ভিজিটে বের হলো তখন শৈলি বলল,
~ ম্যাডাম আজকে লাঞ্চের পর থেকেই কিন্তু নেক্সট প্রজেক্টে হাত দেওয়া উচিৎ।
~ হ্যা সেইটা নিয়েই ভাবছি আমি।

~ বাই দি ওয়ে ম্যাম আজকে কিন্তু আপনাকে সুন্দর লাগছে।
~ থ্যাংক ইউ। বাপির চয়েজেই আজ সব পরে এসেছি।
~ স্যারের পছন্দ আছে।
~ হুম।

অর্নীল সকালে অফিসে এসেই এপ্লিক্যান্টদের এপ্লিকেশন দেখছে। দুপুরের পর ভাইবা বোর্ডে বসতে হবে অর্নীলকে। ম্যানেজার থাকবে সাথে। হঠাৎ করে একটা এপ্লিকেশনে চোখ আটকে যায় অর্নীলের। এপ্লিক্যান্টের নাম শাইমা সেন। অর্নীল পুরো সিভিটা পড়ে দেখে আর ম্যানেজারকে তখনি বলে,
~ এনার ভাইবার প্রয়োজন নেই। ওনাকে এপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দিন আজকে বিকেলের মধ্যে।
~ কিন্তু স্যার ভাইবা ছাড়া? (ম্যানেজার)

~ এনি প্রবলেম? (অর্নীল চোখ রাঙিয়ে)
~ নো স্যার। এক্ষুণি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শাইমার কথা শেষ করেই অর্নীল পৈশাচিক হাসি হাসলো।
~ আর কোনো জায়গায় জব পেলে না শাইমা? চৌধুরী ক্রিয়েশনেই এপ্লিকেশন করলা? জানতে না অর্নীল চৌধুরী এখানকার বস? (টেবিলে থাকা গ্লোব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অর্নীল)

আগের সব ডিজাইনারকে বাদ দিয়ে নতুন করে বিশজন ডিজাইনারকে সিলেক্ট করেছে অর্নীল। ওইদিনই অফিসের সমস্ত নিয়ম পালটে ফেলেছে ও। অফিস ছুটির আগে রাত এগারোটায় অর্নীল মিটিং এ সব নিয়ম সবাইকে জানিয়ে দেয়। সব স্টাফ তটস্থ এই দুইদিনেই। মিম পৌণে বারোটার সময় অফিস থেকে বের হয়।

রাস্তায় আলো জ্বললেও মানুষ দেখা যাচ্ছে না। মিম অবশ্য এসবে ভয় পায়না। গাড়ির লক খুলে মিম ড্রাইভ করতে শুরু করলো। আশেপাশে কয়েকটা দোকান খোলা কিন্তু মানুষ নেই। কোনোমতে রাত একটায় মিম বাসায় আসে। এসে বাপির সাথে কোনোরকম কথা বলেই ঘরে চলে যায়। ব্যবসার কাজে নিজেকে যা ডোবানোর তা মিম ডুবিয়েই দিয়েছে। সারাদিন অফিস, ডিজাইন নিয়েই ব্যস্ত মিম। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আবার কাজ নিয়ে বসে মিম। মিমের ঘরে খাবার রাখা ছিলো। সেসবে নজর না দিয়ে আবার কাজে মনোযোগ। রাতে কোনোরকম এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার প্রতিদিনের মতো সেই অফিস। এইরকম করেই চলছে মিমের জীবন গত তিন বছর ধরে।

এইদিকে অর্নীল কফি খাচ্ছে আর পাইচারি করছে। অর্নীলের মাথায় এখন একটাই চিন্তা কি করে চৌধুরী ক্রিয়েশন কে টপে আনা যায়৷ এইদিকে শাইমাকে নিয়েও ভাবছে অর্নীল। কালকে যখন শাইমা অর্নীলকে বসের জায়গায় দেখবে তখন ও কি ভাববে? কি করবে ও? কিছুক্ষণ পর অর্নীল বারান্দার উপরের দেয়ালে বসে ফোন ইউজ করছে আর বিজনেসের কথাই ভাবছে।

কিছুতেই ও বিশ্বাস করতে পারছেনা মিম রায়হানের মতো পিচ্চি একটা মেয়ে এতকিছু হ্যান্ডেল করে নিজের রেপুটেশন বজায় রেখেছে। তখন অর্নীলের মাথায় ভূত চাপলো মিম রায়হানের বায়োডাটা জানার। অর্নীল মিমের সবকিছু জানলো ওর কোম্পানির মাধ্যমে। বাংলাদেশেই পড়াশুনা করেছে মিম। দেশের বাইরে খুব একটা যায়নি বিজনেসের কাজ ছাড়া। বাপি ছাড়া দুনিয়ায় কেউ নাই। সবেমাত্র পড়াশোনা শেষ করেই বিজনেসে ঢুকেছে ও। অর্নীল সব দেখার পর দেয়ালের উপর থেকে নেমে মিমের ছবি দেখে যেখানে মিম মাউথ স্পিকার লাগানো।

~ দেখতে তো ভালোই। কিন্তু এত ট্যালেন্ট কোথায়? এত বড় বিজনেস একা সামলাচ্ছে? আনভিলিভেবল!
অর্নীল ঘুমাতে যায়। যা হওয়ার পরেরদিন সকালবেলা শাইমার সাথে হবে।
ব্রেকফাস্ট টেবিলে,

~ অর্নীল শাইমাকে নাকি তুই আমাদের অফিসে এপয়েন্টমেন্ট করিয়েছিস? (আরুশ)
~ হুম। তো? (অর্নীল)
~ হয়ত তুই ভেবে করেছিস কিন্তু কাজটা কি ঠিক করলি? যেই মেয়ে তোকে কষ্ট দিলো তাকে আমাদের কোম্পানিতে এপয়েন্ট করালি!

~ ভাইয়া অর্নীল চৌধুরী যা করে ভেবে করে। এ বিষয়ে তোমাদের কথা আর শুনতে চাইনা। আব্বু তোমার মুখেও না।
~ আচ্ছা তোমার যা ভালো মনে হয় করো তুমি। আমরা কেউ আটকাবো না। কোম্পানি তোমার আর ডিসিশন ও তোমার। (অর্নীলের আব্বু)
~ থ্যাংক ইউ।

~ অর্নীল খেয়ে যাও। (বউমনি)
~ খাওয়া শেষ।
অর্নীল আজকে একটু লেট করেই অফিসে গেলো। অফিসে ঢুকে নতুন ক্যান্ডিডেটদের কেবিনে ডাকলো অর্নীল। অর্নীল টেবিলের উপর বসে বসে পেন্সিল ঘুরাচ্ছে। ম্যানেজার সব ক্যান্ডিডেটদের নিয়ে কেবিনে ঢুকলো।
~ স্যার সবাই এসেছে। (ম্যানেজার)

অর্নীলকে দেখে শাইমার হাত থেকে কাগজ পড়ে যায়। অর্নীল ও শাইমার দিকেই তাঁকিয়ে আছে। শাইমার কপালে সিঁদুর, হাতে নোয়া, গলায় মঙ্গলসূত্র আর পরনে থ্রি পিস। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বিয়ে হয়েছে। শাইমা মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কি বলবে ও? কিছু বলার নাই।

~ গুড মর্নিং স্যার। (ক্যান্ডিডেটরা)
~ মর্নিং। যে যার যার পোস্ট পেয়ে গেছেন। আর নিয়ম ও জানেন নিশ্চই। এখন থেকে ঠিক করে কাজ করতে হবে আদারওয়াইজ রেজাল্ট কি হবে বুঝতেই পারছেন। আজকে থেকেই কাজ শুরু করে দিন। যেতে পারেন আপনারা। (হাত ইশারা করে অর্নীল)

সবাই চলে গেলেও শাইমা দাঁড়িয়ে আছে। শাইমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অর্নীল নিজের চেয়ার খামচে ধরে আছে।
~ আপনাকে কি স্পেশালি ইনভাইট করব যাওয়ার জন্য? (পেছনে ঘুরেই অর্নীল)
~ অর্নীল তুমি এই কোম্পানির বস? (হতবাক হয়ে শাইমা)
~ অর্নীল? লাইক সিরিয়াসলি? বসকে নাম ধরে ডাকার ভদ্রতা কোন ইন্সটিউশন শিখিয়েছে? (টেবিলে হাত দিয়ে নিচু হয়ে অর্নীল)

~ অর্নীল আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা তুমি এখানে? দেশে কবে এসেছো?
~ হোয়াট ননসেন্স! কল মি স্যার ড্যাম ইট! (ফাইলগুলো ফেলে দিয়ে অর্নীল)
~ আচ্ছা স্যার। শান্ত হন আপনি। আমি যাচ্ছি।
শাইমা যাওয়ার পর অর্নীল গ্লাস ভেঙে ফেলল।

~ অভিনয় কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি সেইটা তুমি দেখবে মিসেস শাইমা সেন। স্বার্থ ছাড়া অর্নীল কিছু করেনি আর তোমাকেও শুধু শুধু এখানে জয়েন করায় নাই। দেখতে থাকো হোতা হ্যা কেয়া! (অর্নীল)
অর্নীল লাঞ্চ করতে একটা রেস্টুরেন্টে গেলো। আনফরচুনেটলি মিম সেখানেই ছিলো। অর্নীল মিমকে সরাসরি দেখেনি আর মিম অর্নীলকে কখনো দেখেনি। অর্নীল ২১ নম্বর টেবিলে ছিলো আর মিম ২২ নম্বর। একদম সরাসরি দুজন বসে আছে। অর্নীল খাবার অর্ডার করতে গিয়ে দেখে পাশের মেয়েটাকে চেনা লাগছে। অনেক কষ্টে অর্নীল মনে করলো এইটা মিম রায়হান। শৈলি অর্নীলকে দেখে চিনে ফেলল। শৈলি মিমকে অর্নীলকে দেখিয়ে বলল,
~ ম্যাম হি ইজ মিস্টার চৌধুরী। চৌধুরী ক্রিয়েশনের নতুন এমডি।
~ সো হোয়াট? (হাত উচিয়ে মিম)

~ ম্যাম দেখালাম আপনাকে। প্রতিদ্বন্দ্বী কে চিনে রাখা ভালো।
~ দরকার নেই আমার।
~ দেখতে কি হ্যান্ডসাম ম্যাম! (গালে হাত দিয়ে শৈলি)
~ ক্লাসলেস মানুষের মতো করনা প্লিজ। খাও চুপচাপ। (মিম)
অর্নীল খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে আসে রেস্টুরেন্ট থেকে। মিম কিছুক্ষণ বসে ডিসকাস করছিলো শৈলির সাথে। অর্নীল ড্রাইভ করছে আর ভাবছে,

~ মেয়েদের এত ইগো কোথা থেকে আসে? আমি ভুল না করলে উনিই মিম রায়হান বাট এত সুন্দরি ছিলো না তো ছবিতে! মনে হয় শান্ত মেজাজের। যাইহোক একে নিয়ে ভেবে আমার কি কাজ?

ওইদিন অর্নীল শাইমাকে দিয়ে অফিসের সব ফাইল রেডি করায়। রাত এগারোটায় ছুটি দেয় শাইমাকে। অফিসের সব নতুন ক্যান্ডিডেটদের পাঁচটায় ছুটি হলেও শাইমাকে দেরি করে ছাড়ায় শাইমার কোনো অভিযোগ নেই কারণ ও জানে অর্নীল রিভেঞ্জ নিচ্ছে। আর চাকরিটাও ওর দরকার। এত সহজে চাকরি এখন আর কেউ দিবেনা ওকে।
শাইমা যখন অফিস থেকে বের হচ্ছিলো তখন অর্নীল ম্যানেজারকে বলল,
~ ওনাকে অফিসের গাড়িতে করে পাঠিয়ে দিন। অর্নীল চৌধুরী বিবেকহীন হলেও দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়। এত রাতে একটা মেয়েকে একা ছাড়া ঠিক না।

~ নো স্যার। লাগবেনা। আমি যেতে পারব।
~ জেদ আমার একদম পছন্দ না। (শাইমাকে চোখ রাঙিয়ে অর্নীল)
~ শাইমা প্লিজ। স্যার যখন বলছে গাড়ি করেই যাও। জেদ করনা স্যারের সাথে।
~ না স্যার। বসের সাথে সামান্য স্টাফ জেদ করতে পারেনা। আমি অফিসের গাড়িতেই যাব।
~ ভেরি গুড। যান। (অর্নীল)

শাইমা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অর্নীল অফিস থেকে বের হলো। কিছু রাস্তা যাওয়ার পর প্রচন্ড বাতাস আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। কিছুতেই ব্যালেন্স রাখতে পারছেনা অর্নীল। তাই গাড়ি এক সাইডে রেখে টঙ দোকানে দাঁড়ালো। সেই বন্ধ দোকানের আরেকপাশে মিম দাঁড়িয়ে আছে অর্নীল সেইটা খেয়ালই করেনি। অর্নীলকে দেখে মিম মনে মনে বলে,
~ এইটা সেই আমেরিকার কুত্তাটা না? মনে তো হয়। এখানে কি করছে?

অর্নীল চুল ঝেরে পাশে তাঁকাতেই মিমকে দেখলো। মিম তখন দাঁড়িয়ে হাতের ঘড়ি দেখছিলো। হয়ত সময় দেখছে। অর্নীল পকেটে হাত দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ কেটে গেছে কিন্তু বৃষ্টি থামার নাম নেই বরং বেড়ে যাচ্ছে। এইদিকে কেউই কারো সাথে কথা বলছেনা। মিম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুইংগাম চিবুচ্ছে আর ডালভাজা খাচ্ছে। মিমের হাতে ডালভাজার প্যাকেট দেখে অর্নীল হাসছে। মিম খেয়াল করলো অর্নীল হাসছে। মিম অর্নীলের সামনে এসে বলল,

~ এক্সকিউজমি! হোয়াই আর ইউ লাফিং?
~ আমার মুখ দিয়ে আমি হাসলে আপনার সমস্যা হচ্ছে? (অর্নীল)
~ এখানে আমি ছাড়া আর কেউ নেই যার জন্য আপনি হাসবেন।
~ আচ্ছা আপনাকে কে বলল আমি আপনার জন্য হাসছি? একবারো বলেছি?
~ ওকেহ। হাসুন।

~ মিস মিম আমি কোনো বিজনেস টাইকুনকে দেখিনি এইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডালভাজা খেতে। দ্যাটস হোয়াই একটু হেসেছি, বেশি না। (হাত দেখিয়ে অর্নীল)
~ আপনার খেতে ইচ্ছে করছে বললেই হতো। এই নিন খান। (ডালের প্যাকেটটা অর্নীলের দিকে এগিয়ে দিয়ে মিম)
~ নাহ। আপনিই খান। আমার এইসব হজম হবেনা।

~ হবে কি করে? কুকুরের পেটে কি ঘি সহ্য হয়? (মনে মনে বলল মিম) ওহ আচ্ছা তাহলে দরকার নেই খাওয়ার।
~ আপনি এমন চাইল্ডিশ জানা ছিলো না।
~ চাইল্ডিশের কি করেছি?
~ অনেক কিছুই। হোয়াটএভার বৃষ্টি কি থামবেনা?

~ আমি তো গড নই যে বলতে পারব বৃষ্টি থামবে কি না!
~ আপনি একা একা এই শুনশান জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভয় করলো না?
~ ভয় মিমকে ভয় পায়। তাছাড়া আমি ক্যারাটে জানি।
অর্নীল এইবার জোরে জোরে হাসলো। অর্নীলকে হাসতে দেখে মিম এইবার রেগেই গেলো।
~ আপনার সমস্যা কি মিস্টার?
~ অর্নীল চৌধুরী।

~ সে যাই হোক। এত হাসেন কেনো আপনি?
~ আমি মোটেও এত হাসি না। আপনাকে দেখেই হাসি পাচ্ছে কেনো যেনো।
~ কেনো আমি কি জোকার?
~ ও মাই গড! এইটা কি আমি বলেছি নাকি?
~ তো হাসছেন কেন?

~ ক্যারাটে জানেন তাই।
~ ক্যারাটে জানলে হাসতে হবে?
~ না তা না।
~ তো কি?
~ যেখানে মেয়ে সেখানে ঝামেলা নিশ্চিত। (মিমের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে অর্নীল)
~ তো বিয়ে কি কোনো ছেলেকে করেছেন নাকি?
অর্নীল এইবার হাসতে হাসতে বেঞ্চের উপর বসে পরলো।


পর্ব ৩

মিমের প্রশ্ন শুনে অর্নীল হাসতে হাসতে বেঞ্চে বসে পরলো। মিম অপর পাশের আরেকটা বেঞ্চে বসলো।
~ আমি হাসির কি বললাম? (মিম)
~ আমিও সেইটাই ভাবছি আপনি হাসির কি বললেন! বাই দি ওয়ে আমি আনমেরিড। কোনো ছেলেকেও বিয়ে করিনি আর কোনো মেয়েকেও না।

~ ও তাহলে ধানমন্ডি গেলে আপনার জীবন সঙ্গীনি পেয়েও যেতে পারেন। ওখানে আরো এক ধরনের মানুষ আছে যাদের চাইলেই বিয়ে করতে পারেন। (ডালভাজা চিবুতে চিবুতে মিম)
~ আপনি হাজরা( হিজড়ার ইংলিশ শব্দ) দের কথা বলছেন?
~ এইত বুঝেছেন।

~ নাহ সেইসবের আর দরকার নেই। বিয়ে করার ইচ্ছে বা মোটিভ কিছুই নেই। (ব্লেজার থেকে ধুলা ঝেড়ে অর্নীল)
~ এমন দুর্দান্ত ছ্যাকা কিভাবে খেলেন? বলছেন বিয়ে করবেন না!
~ সবকিছু ছ্যাকা নিয়ে ভাবলে তো সমস্যা। বিয়ে করবনা দ্যাট ডাজেন্ট মিন আমি ছ্যাকা খেয়েছি। বাই দি ওয়ে বৃষ্টি কমে গেছে। বাসায় যাবেন না?

~ অফকোর্স। আসছি আমি। নাইস টু মিট ইউ মিস্টার চৌধুরী।
মিম ওতটুকু বলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। অর্নীল ও আর সেখানে থাকলো না। বাসায় এসে দেখে আম্মু বসে আছে খাবার নিয়ে। অর্নীল আম্মুকে না করে দেয় এত রাতে আর খাবেনা। অর্নীলের আম্মুও সব গুছিয়ে রেখে দেয়। এখন ছেলেকে জোর করা মানেই মাঝরাতে চেঁচামেচি টলারেট করা। অর্নীল বাসায় এসেই ওইদিন ঘুমিয়ে যায়।
সকালবেলা,

~ অর্নীল কালকে তোমার এত রাত হলো ফিরতে? (আব্বু)
~ বৃষ্টি ছিল বাইরে।
~ ওহ! এত রাতে বাইরে থেকো না। এইটা কিন্তু তোমার আমেরিকা না, এইটা বাংলাদেশ। খুব সাবধানে চলাফেরা কর। (আব্বু)
~ হুম।
~ অফিস কেমন চলছে?
~ চলার মতই চলছে।

~ মিম রায়হানকে চিনো? জেনেছো ওর সম্বন্ধে কিছু?
~ আমি কি ওকে বিয়ে করব নাকি যে ওর সম্বন্ধে আমায় জানতে হবে?
~ আমি কি সেইটা বলেছি অর্নীল? ও তোমার কম্পিটিটেটর সো ওর সম্বন্ধে তোমার জানা উচিৎ।
~ হয়ত কিছু কিছু জানি।

~ কিভাবে?
~ ও ডালভাজা খায়, চুইংগাম খায়। ১৫ বছর বয়সী মেয়েদের মতো কথা বলে৷
অর্নীলের কথা শুনে বউমনি, আরুশ, অর্নীলের আব্বু হাসছে।
~ মানে কি অর্নীল? এইসব কবে জানলা তুমি? (বউমনি)
~ গতকাল রাতে ওই মেয়ের সাথে এক ঘণ্টা থেকে।

~ কিহ? মিমের সাথে তুমি একঘন্টা থেকেছো মানে কি? (বউমনিসহ সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে অর্নীলের দিকে)
~ বৃষ্টির জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছিলো৷ সেখানে মিম রায়হান ও দাঁড়িয়ে ছিলো। ওইভাবেই পরিচয় আর কি। এতে অবাক হওয়ার কি আছে?

~ মাই গুডনেস! বাবা ভেবেছেন আপনার ছেলে কতদূর চলে গেছে! (বউমনি)
~ সেইটাই তো দেখছি বড় বউমা। তারপর কি হলো?
~ এরপর এখন আমি অফিসে যাব।
অর্নীল বিরক্ত হয়ে উঠে এলো টেবিল থেকে৷ কোনোরকম ব্রেকফাস্ট করেই অর্নীল অফিসে চলে এলো। অফিসে এসেই অর্নীল শাইমাকে ডাকলো।

~ মে আই কাম ইন স্যার? (শাইমা)
~ কাম ইন। (অর্নীল)
~ কেনো ডেকেছেন স্যার?
~ গতকালকের টাস্ক কমপ্লিট হয়েছে?
~ সো সো।

~ সো সো কেনো? আমি বলেছিলাম না আজকেই আমায় ফাইল জমা দিতে?
~ সরি স্যার বাসায় আর এসব করতে পারিনি।

~ দ্যাটস নান অফ মাই বিজনেস। দুই ঘন্টা সময় দিচ্ছি ফাইল রেডি করে আমায় দিয়ে যাবেন। আসতে পারেন এখন।
~ ওকে স্যার।
শাইমা যাওয়ার পর অর্নীল সব ডিজাইন চেক করছে আর প্রজেক্ট নিয়ে ভাবছে। তখন ম্যানেজার একটা ইয়াং ছেলেকে নিয়ে অর্নীলের কেবিনে ঢুকলো।

~ স্যার এ হচ্ছে আকাশ। আপনার পার্সোনাল সেক্রেটারি।
~ সব বলেছেন একে?
~ জ্বি স্যার৷ আপনি ওকে নিঃসন্দেহে ভরসা করতে পারেন।
~ আচ্ছা যান আপনি।

অর্নীল আকাশের সাথে কথা বলে বুঝতে পারে ছেলেটাকে ভরসা করাই যায়। অর্নীল আকাশকে সব বোঝাচ্ছে আর এই সময় ম্যানেজার কেবিনে ঢুকে বলে,
~ স্যার এক্ষুণি BBF এর মিটিং আছে। চেম্যারম্যান ইমার্জেন্সি কল করেছে।
~ BBF এর চেয়ারম্যান মিম রায়হান না?
~ ইয়েস স্যার।

~ কয়টায় মিটিং?
~ ১২ টায়।
~ দুই ঘণ্টা পর! আকাশ তুমি যাবে আমার সাথে।
~ ওকে স্যার। (আকাশ)

~ স্যার আরুশ স্যার আর শিশির (অর্নীলের বউমনি) ম্যাডাম ও থাকবেন সেখানে।
~ বউমনি কেনো থাকছে?
~ স্যার শিশির ম্যাডাম অন্যান্য কোম্পানিগুলোর কো ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাই।
~ ওহ আচ্ছা।

দুপুর সাড়ে এগারোটায়,
~ শৈলি বাপি এসেছে? (তাড়াহুড়ো করে মিম)
~ হ্যা স্যার রাস্তায় আছেন।
~ সব কোম্পানি এসে গেছে?

~ হয়ত সবাই অন দ্যা ওয়ে।
~ আর আধা ঘণ্টা বাকি। এখনো স্পিচ রেডি হয়নি আমার। পাগল হয়ে যাব আমি। (পেপার উল্টিয়ে মিম)
~ ম্যাম রিলাক্স। আর আপনি হঠাৎ মিটিং কল করলেন কেন?
~ ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন করতে হবে। চাইল্ড হোমগুলো কিন্তু BBF ই চালায়। আরো কিছু ভর্তুকি দেওয়ার আছে।
~ এইজন্যই ইমার্জেন্সি কল করলেন সবাইকে।
~ হুম।

বারোটার আগে সবাই BBF এ প্রেজেন্ট হলো। কিন্তু মিম এখনো আসতে পারেনি। জ্যামে আটকে গেছে। মিমের বাপি, অর্নীল, আরুশ, শিশিরসহ BBF এর সব সদস্যরা চলে এসেছে কিন্তু মিম এখনো এসে পৌঁছাতে পারেনি। ঘড়ির কাটায় বারটা দশ। মিম শর্ট ব্লেজার আর মাথায় হ্যাট পরে গাড়ি থেকে নেমে যায়, শৈলিও মিমের সাথে নামে।
~ গাড়ি নিয়ে তুমি এসো। আমি হেঁটে যাচ্ছি। অলরেডি আই এম লেইট! (মিম ড্রাইভারকে বলল)
~ আচ্ছা ম্যাডাম।

মিম শৈলির হাতে সব ফাইল দিয়ে দ্রুতগতিতে দৌড়াতে শুরু করলো। BBF এর সামনে গিয়ে মিম হ্যাট খুলে শৈলির হাতে দেয় আর চুলগুলো ছেড়ে দ্রুত কনফারেন্স রুমে ঢুকে। মিমকে ঢুকতে দেখে সকলেই দাঁড়ালো এমনকি মিমের বাপিও।

~ প্লিজ সিট ডাউন গাইজ। আই এম সরি ফর লেইট। (চেয়ারে বসে মিম) আপনাদেরকে ইমার্জেন্সি এখানে ডাকার রিজন একটাই সেইটা হচ্ছে ফান্ড পুনরায় গঠন করা। সকালে চ্যান্সেলররা জানিয়েছেন সাতদিনের মধ্যে ফান্ড গঠন করতে। এই BBF এর মেম্বার রেনাউনেড ৩০ টা কোম্পানি। আমার নির্ধারিত এমাউন্টগুলো আমি বলছি অভিযোগ থাকলে জানাবেন। ২০~ ৩০ এ যারা আছেন তাদের এমাউন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ আর ১০~ ১৯ এ যারা আছেন তাদের ৭৫ লাখ, ৪~ ৯ এ যারা আছেন তাদের জন্য এক কোটি আর ১~ ৩ যারা আছেন তাদের জন্য দেড় কোটি। আগামী সাতদিনের মধ্যে এমাউন্টগুলো BBF এর ব্যাংকে জমা করবেন। কারো কোনো অভিযোগ আছে? (পেন্সিল ঘুরিয়ে মিম)

~ না ম্যাম। আপনার ডিসিশন ঠিক আছে। (এক কোম্পানির এমডি)
~ মিস্টার রায়হান, মিস্টার চৌধুরী, এন্ড মিস্টার খান আপনাদের কিছু বলা আছে 3 টপ হিসেবে? (মিম)
~ নো ম্যাম আই হ্যাভ নাথিং টু সে। (মিস্টার রায়হান)
~ থ্যাংক ইউ।

~ নো ম্যাম আই অলসো হ্যাভ নাথিং টু সে। ইউর ডিসিশন ইজ আওয়ার প্লেজার। (আরুশ)
~ থ্যাংক ইউ। যাওয়ার আগে ফর্ম নিয়ে যাবেন সবাই। দিজ মিটিং ইজ ডিসমিস টুডে। থ্যাংক ইউ এভ্রিওয়ান ফর ইউর প্রেজেন্স।

মিম কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে বাপির জন্য ওয়েট করছে। কিছুক্ষণ পরেই মিমের বাপি বেরিয়ে এলো।
~ মামনি লেইট কেনো করলা? (বাপি)
~ জ্যাম ছিলো বাপি। দৌড়ে দৌড়ে এসেছি।

~ তোমায় যখন আমি ম্যাম বলি তখন অনেক বেশি প্রাউড ফিল করি আমি। ভেবে আনন্দ হয় আমার মেয়ে BBF এর চেয়ারম্যান, বিজনেস টাইকুন। দোয়া করি মা আরো বড় হও।
~ থ্যাংক ইউ বাপি। তুমি তাহলে বাসায় যাও আমি ফর্ম নিয়ে বের হচ্ছি এরপর অফিসে যাব।
~ সাবধানে এসো বাড়িতে।

~ আচ্ছা। তুমিও সাবধানে যাও।
মিম ফর্ম আনতে একাউন্টেন্ট এর কাছে গেলো। সেখানে অর্নীল, আরুশ, শিশির আর আকাশ দাঁড়িয়ে ছিলো। মিমকে দেখে শিশির বলল,
~ ম্যাম হাও আর ইউ?

~ আই এম ফাইন মিসেস চৌধুরী। হোয়াট এবাউট ইউ?
~ আই এম অলসো ওয়েল। ম্যাম বিয়ের দাওয়াত কবে পাচ্ছি?
~ হাহাহা ভাবতে হবে সেইটা নিয়ে। ওতদূর ভাবিনি এখনো। আচ্ছা আমি আসছি মিসেস চৌধুরী। সি ইউ সুন।
~ বাই।
মিম শৈলিকে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলো। অর্নীল কিছুই বলল না। অর্নীল মনে মনে বলল,
~ কালকে রাতে ছিলো চাইল্ড আর এখন পাক্কা ভাবওয়ালি৷ এত ক্যারেক্টার একসাথে প্লে করে কিভাবে কে জানে! মনে হয় একে আরেকটু চিনতে হবে।
আট/দশদিন পর,

এক শুক্রবারের ছুটিতে অর্নীল বিকেলে শপিং করতে বের হয়। অর্নীল ওইদিন ফর্মাল ড্রেসে ছিলো না। একটা হুডি আর গ্যাবার্ডিন পরা ছিলো। হাতে ঘড়ি ছিলো। বেশ লাগছিলো অর্নীলকে। মিম সবসময় নিজের ডিজাইন করা ড্রেস পরে। ওইদিন ফরচুনেটলি মিম ও শপিং করতে বেরিয়েছিলো। শপিং করা শেষ হলে অর্নীল ধানমন্ডি লেকের পাশে গিয়ে বসে। কফি খেতে খেতে ও খেয়াল করলো মিম ও একটু দূরে বসা। মিম সেখানে বসে বসে ডালভাজা খাচ্ছে। আর সামনে ফুচকার প্লেট রাখা। অর্নীল কফি বিল দিয়ে সানগ্লাস খুলে গলার নিচে ঝুলিয়ে মিমের কাছে গেলো। মিমের সামনে গিয়ে অর্নীল চেয়ারে উল্টো করে বসলো।

~ মিস্টার চৌধুরী আপনি এখানে? (মিম)
~ আসলাম ঘুরতে। বাট আপনি এখানে কেনো?
~ আমি ফ্রাইডে তেই এখানে আসি। যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরোনোর এই একটা দিনই তো। আপনি তো কখনো আসেননি এখানে।

~ হ্যা আজকেই প্রথম। ফুচকা কি খাওয়ার জন্য? (নাক ছিটকিয়ে অর্নীল)
~ আরে না। এগুলো ভেঙে মাথায় দিব। চুল সিল্কি হবে। (ফেইক একটা স্মাইল দিয়ে মিম)
~ রেগে কেনো যাচ্ছেন? ফুচকা মানুষ খায়?
~ আমি খাই। এখন বলুন আমি মানুষ না!
~ না আপনি মানুষ ই। এখানে এত ফ্রিলি বসে আছেন কিভাবে? কেউ অটোগ্রাফ চাইছেনা? (সোজা হয়ে বসে অর্নীল)

~ হাহাহাহা। না চাইছেনা। ফুচকা অর্ডার করি?
~ নো থ্যাংক্স। ফুচকা খাইনা আমি।
দুজন কথা বলতে বলতেই মিম ফুচকা খেয়ে ফেলল। অর্নীল বিলটা দিতে চাইলেও মিম দিতে দেয়নি। এরপর মিম বলে,
~ চলুন সামনে যাই। সমস্যা আছে কোনো?
~ না।

অর্নীল পকেটে হাত দিয়ে হাঁটছে আর মিমের সাথে কথা বলছে। মাঝখানে মিম ফুল কিনলো আর চারজন স্ট্রিট চাইল্ডকে আর্থিকভাবে সহায়তা করলো। অর্নীল জাস্ট দেখছে মিম কি করছে। সারা বিকেল দুজন একসাথে কাটিয়ে দিলো। সন্ধ্যা পার হয়ে যাওয়ার পরেও মিম অর্নীলের সাথে বকবক করেই যাচ্ছে। অর্নীল এর ও কেনো যেনো ইচ্ছে করছেনা উঠে চলে আসতে।
~ আপনি গাড়ি আনেন নি? (অর্নীল)
~ না। আমি ঘুরতে এলে গাড়ি নিয়ে আসিনা।
~ কেনো?
~ রিক্সায় কমফরটেবল আমি।

~ ফেভারিট ফুড কি?
~ ডাল আর পটেটো স্ম্যাশ।
~ সিরিয়াসলি? আলুর ভর্তা পছন্দ আপনার?
~ হ্যা। অবাক হওয়ার কি আছে?
~ চাইনিজ, ইটালিয়ান বাদ দিয়ে বাঙালীয়ানা। ভেরি গুড।
~ আমি ওইরকমই। দেখতে যতটা স্টাইলিশ ভেতরে তার চেয়ে দশ গুণ বেশি ক্ষ্যাত।

পর্ব ৪

অর্নীল আর মিম সারা বিকাল এমনকি সন্ধ্যা পর্যন্তও একসাথে ছিলো। কেউ কারো সাথে বোর হচ্ছিলো না। গতকালকে BBF এর চেয়ারে যেই মিমকে দেখেছিলো অর্নীল সেই মিম না এইটা। কিছুতেই মিল খুঁজে পাচ্ছেনা অর্নীল। এশারের আযানের আগে আগে মিম বলে,
~ আমাকে এইবার উঠতে হবে। অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাপি বাড়িতে একা রয়েছে। (মিম)
~ চলুন আমি ড্রপ করে দেই। আপনি গাড়ি আনেননি বললেন তো! (অর্নীল)
~ আরে না না, আমি রিক্সায় চলে যাব।

~ এই রাতে রিক্সায় করে যাবেন?
~ কেবল তো সন্ধ্যা হলো। রাত কোথায়?
~ আচ্ছা আপনার যা ইচ্ছা। আসুন তাহলে৷ বাই।
~ বাই। আর এগেইন থ্যাংক ইউ।
~ কেনো?

~ আমায় কোম্পানি দেওয়ার জন্য।
~ ইটস মাই প্লেজার মিস রায়হান।
এরপর মিম অপরুপ হাসি দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো। মিম রিক্সায় না উঠা পর্যন্ত অর্নীল মিমের দিকে তাঁকিয়ে ছিলো। এরপর মিম পিছু ফিরে তাঁকাতেই অর্নীল হাত নেড়ে বাই বলল। অর্নীল ও সেখান থেকে চলে এলো। বাসায় এসে অর্নীল শপিং ব্যাগ গুলো রেখে আগে মিমকে কল করলো।

~ হ্যালো? কে বলছেন? (জামাকাপড় গুছাতে গুছাতে মিম)
~ অর্নীল।
~ ওহ মিস্টার চৌধুরী, হ্যা বলুন।
~ বাসায় কখন গেলেন?
~ এইত কিছুক্ষণ আগেই।

~ এখন কি করছেন?
~ জামাকাপড় গুছাচ্ছি।
~ বাহ! আপনি এইটাও করেন?
~ মোটামোটি আর কি! আপনি কোথায়? ওখানেই নাকি বাসায়?

~ বাসায়।
দুজনের কথা বলা শেষ হলে অর্নীল কিছুক্ষণ পরেই নিজের কিনে আনা জামা কাপড় গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। পরে অর্নীল বাধ্য হয়ে ওর আম্মুকে বলল জামাকাপড় গুলো ওর কাবার্ডে তুলে রাখতে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অর্নীল ভাবছে,
~ বাংলাদেশে প্রথম এসে ভাবলাম মিম রায়হান মেয়েটা আমার কম্পিটিটর। বাট এখন মনে হচ্ছে মেয়েটা ভালো, শুধু ভালো না একটু বেশিই ভালো। কি কিউট দেখতে, কথা ও বলে কত সুন্দর করে৷ আর কোনো বাংলাদেশী মেয়ের সাথে তো কথা হলো না এখনো শুধু মিম ছাড়া।

ঘুম আসছিলো না দেখে অর্নীল উঠে কফি খাচ্ছে আর বারান্দায় পাইচারি করছে। পাইচারি করতে করতে অর্নীল হঠাৎ ই দেখলো রাত সাড়ে তিনটা বাজে। অর্নীল তখন মিমকে ফোন দিলো। হয়ত ঘুমিয়ে গেছে তবুও দিলো। কিন্তু অর্নীলকে অবাক করে দিয়ে মিম ফোন রিসিভ করলো।
~ আপনি ঘুমান নাই? (অর্নীল কফি মগটা হাত থেকে রেখে)
~ না এত আগে ঘুমাই না।
~ তো কি করছেন?

~ আপাতত রান্না করছি। এরপর কাজ করব।
~ ও মাই গুডনেস! আপনি রান্না ও পারেন? (অর্নীল পুরো শকড)
~ একটু আধটু পারি আর কি।
~ তো এত রাতে রেঁধে কাকে খাওয়াবেন? বয়ফ্রেন্ড?
~ আরে না, আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। নিজেই খাব।

~ এত ট্যালেন্ট দেখে তো আপনার ফিউচার পার্টনার মাথা ঘুরে পরে যাবে। (কফিতে চুমুক দিয়ে অর্নীল)
~ হাহাহা। আমার ফিউচার পার্টনার এত সহজে আমার জীবনে আসবেনা। তাকে খুঁজে পাওয়াই টাফ।
~ টাফ কেনো? নিঃসন্দেহে আপনাকে পছন্দ করার মতো অনেক ছেলেই আছে।
~ সে তো আছে। বাট আমি যাকে চাই সে তো নেই।
~ মানে?

~ আমার পছন্দমতো কাউকে এখনো চোখে পরেনি আমার সেইটাই বললাম।
~ কেমন ছেলে পছন্দ আপনার? (বারান্দার গ্রিলে হ্যালান দিয়ে দাঁড়িয়ে অর্নীল)
~ আপনি এতকিছু জেনে কি করবেন? তাছাড়া এত রাতে জেগে আছেন?
~ এইত ঘুম আসছিলো না।

~ মিস্টার চৌধুরী জানেন, আপনার মতো কারো সাথে এত ফ্রিলি কথা বলিনি কখনো।
~ রিয়েলি?
~ হুম। আর আমার কেমন ছেলে পছন্দ জানতে চাইলেন না?
~ সেইটা তো বলবেন না বললেন।

~ আমার বেটার হাফ একদম গরিব হবে। দেখতে চলনসই হলেই হবে। আমাকে প্রচুর ভালবাসবে আর আমায় নিয়ে প্রাসাদে না, সাধারণ ঘরে থাকবে। আমার রান্না শিখা, এতকিছু শিখা সবকিছুই তার জন্য। বাট তারই দেখা নেই।
~ আবেগ তাড়িত হয়ে এসব বলছেন না তো? আপনি প্রাসাদে থেকে সাধারণ ঘরের ছেলেকে বিয়ে করবেন? ব্যাপারটায় মানাতে পারবেন তো?
~ আপনি তাহলে আমাকে চিনেনই না মিস্টার চৌধুরী। আমি দেখতে যা আসলে আমি তা নই। যাইহোক আপনার কি খবর? বিয়ে করছেন কবে?
~ বিয়ে করবনা।

~ ও হ্যা সেইদিন বলেছিলেন। কিন্তু কারণ কি? প্রেমে ব্যর্থ? (মজা নিয়ে মিম)
~ আরেহ না। এমনিতেই বিয়ে করবনা। বিয়ে মানেই প্যারা আর বউ তো আস্ত একটা প্যারা।
~ হাহাহা। বউয়ের প্যারা সব ছেলের ভাগ্যেই জুটে। আপনার না জুটলে ক্ষতি কি তাইতো? (হেসে মিম)
~ হ্যা সেইটাই তো কথা। এইজন্যই বিয়ের ইচ্ছে নেই। আর আপনার ওই হ্যান্ডসাম গায় কে খুঁজে নিয়েন খুব শীঘ্রই। আজীবন তো অফিস, ডিজাইন এসব নিয়ে পরে থাকলে হবেনা।
~ ঠিকই বলেছেন। এইত বিয়ে করে ফেলব খুব তাড়াতাড়ি।
~ আপনার রান্না শেষ হয়নি?
~ হ্যা শেষ। খাব এখন।

~ ঠিক আছে খান তাহলে। রাখছি আমি।
~ বাই।
অর্নীল ফোন রাখার পর মিম ভাবছে,
~ ব্যাপার কি? মিস্টার চৌধুরী আমায় আজকে দুইবার ফোন দিয়ে ফেলল আবার জানতে চাইলো আমার কেমন হাজব্যান্ড পছন্দ! কোথাও কি কোনো ঘাপলা আছে নাকি হুদাই? যাইহোক আমার খাওয়া আমি খাই।
মিম খাওয়া শেষ করে কাজ নিয়ে বসলো। অর্নীল ও ঘুমিয়ে গেলো। এইভাবে দুজনের সম্পর্ক আস্তে আস্তে তুমিতে চলে আসে। আর রাতে কাজের চেয়ে বেশি ফোনালাপই বেশি হয়। অর্নীল ও এক অদ্ভূত মজা পায় আর মিম ও। কয়েকমাস পর মিম একদিন অর্নীলকে ফোনে বলে,
~ অর্নীল জানো?
~ কি বলো?

~ তোমায় ফার্স্ট যেদিন ওই টঙ দোকানে দেখলাম না তখন আমি তোমায় আমেরিকার কুত্তা বলেছিলাম।
~ আমি কুত্তা? মানে কুকুর? (একটু রাগ হয়ে অর্নীল)
~ আরে রিলাক্স তখন কি জানতাম নাকি তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হবা। কি ভাব নিয়ে চলতা সেসব ভুলে গেছো?
~ এইজন্য কুত্তা? সিরিয়াসলি?

~ হু তার জন্য সরি। তুমি যে এত ভালো মানুষ তা তো জানতাম না তখন।
~ তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে মাফ করে দিলাম। আমায় সবাই ভয় পায় জানো?
~ আমি তো পাইনা।
~ একদিন ঠিকই পাবা।

অর্নীল আস্তে আস্তে মিমের বাপির ও প্রিয় পাত্র হয়ে উঠলো। দুই পরিবারের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হলো অর্নীল আর মিমের জন্য। অর্নীলের পরিবার ভেবে রেখেছে অর্নীলের বউ মিমই হবে। এইটা ভেবেই সবাই খুশি। আর ওইদিকে মিমের বাপিও ভেবেছেন অর্নীলকে মেয়ের জামাই বানানোর কথা। কিন্তু অর্নীল বা মিমের কারোরই এই ফিলিংস আসেনি যে দুজন দুজনকে ভালবাসে। প্রায় প্রায় শুক্রবারের ছুটিটা কাটায় মিম আর অর্নীল নিজেদের মতই করে। অর্নীল ও এখন শুক্রবার গাড়ি নিয়ে বের হয়না। বাইক নিয়েই দুজন ঘুরে। মিম মাঝে মাঝে অর্নীলকে তুই ও বলে ফেলে। মোহাম্মদপুরের ক্যাফেতে একদিন,
~ এই অর্নীল শুন তো। (মিম)
~ কি বললা? (অবাক হয়ে অর্নীল)
~ বেস্ট ফ্রেন্ডকে তুই বলতে মজা বেশি।

~ উপরওয়ালাই জানে আর কি কি শুনব এ জীবনে? তুমি কি জানো সবাই জানে আমরা রিলেশনশিপে আছি? রীতিমতো মিডিয়া তোলপাড়!
~ হতে দাও। আমার লাইফের লাস্ট চারমাস বাঁধিয়ে রাখার মতো। তুমি অনেক ভালো অর্নীল। (অর্নীলের গাল টেনে মিম)

~ হুহ হইছে। আজকে না তোমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসার কথা? ভুলে গেছো?
~ ওহ নো! এইটা আগে মনে করবি তো গাধার বাচ্চা! (অর্নীলকে থাপ্পর মেরে মিম ক্যাফেটেরিয়া থেকে উঠে যায়)
~ ওই দাঁড়াও আসতেছি তো আমি।
~ তাড়াতাড়ি বাইক চালাবি নয়ত তোকে পিটিয়ে এখানেই শোয়ায় রাখবো। (হেলমেট পরতে পরতে মিম)
~ হ্যা আমি তো গাঁধার বাচ্চা আরো কত কি!

~ চল এইবার। (অর্নীলের পিঠে চাপড় মেরে মিম)
~ তোমার বর যদি তোমায় পছন্দ করে ফেলে তাহলে তো তোমার বিয়ে হয়ে যাবে।
~ হ্যা। বাট তোমার সাথে ঘুরাঘুরি, আড্ডা দেওয়া এইসব মিস করব।
~ আমিও তোমাকে মিস করব।

~ বাপি কেনো যেনো এই সম্বন্ধে রাজি না।
~ আংকেল কেনো রাজিনা? আংকেল তো চায় ই তুমি বিয়ে করে সেটেল হও।
~ সেইটাই তো কথা। বাট এই ছেলে একটু রিচ জানো।

~ আহারে বেচারী! তোমার গরিব বর পাওয়া স্বপ্নই থেকে গেলো। (হাসতে হাসতে অর্নীল)
~ এই যে কম হাসো। চলো তারাতারি। (মিম)
মিমকে নামিয়ে দিয়ে অর্নীল বাসায় চলে আসে। সন্ধ্যায় মিমকে দেখতে আসার কথা। মিম দ্রুত লং ড্রেস পরে রেডি হচ্ছিলো তখন মিমের বাপি মিমের ঘরে ঢুকলো।

~ জানিস মামনি গত চারমাসে তোকে আমি অনেক আনন্দে থাকতে দেখেছি। (বাপি)
~ হ্যা বাপি। সব অর্নীলের জন্য। ও অনেক ভালো, স্মার্ট একটা ছেলে। (মেকাপ করতে করতে মিম)
~ আজকের সম্বন্ধতে তুই রাজি তো মা?
~ হ্যা বাপি। রাজি কেনো হবনা? আর তুমি খুব ভালো জানো আমার কোথাও কোনো এফেয়ার নেই তাই রাজি না হওয়ার প্রশ্ন কেন আসছে?
~ আর অর্নীল?

~ বাপি ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার বন্ধুহীন জীবনের একমাত্র বন্ধু ও।
~ সেই বন্ধুকে ভালবাসা যায়না? স্বামীর আসনে দেখা যায়না?
~ বাপিইই! প্লিজ এই নোংরা কথাগুলো আর বলো না। বন্ধুকে স্বামী বানানো যায়না বরং স্বামীকে বন্ধু বানানো যায়।
~ ঠিক আছে। জীবনটা তোর তাই তুই যা খুশি কর। আমি আছি তোর সাথে।

বাপির কথা শুনে মিমের মনটা একদম খারাপ হয়ে গেলো। মিম কোনোরকম মন ঠিক করে পাত্রপক্ষের সামনে গেলো। ছেলের নাম জারিফ। ছেলের মা, বাবা আর বড় ভাইয়া এসেছে মিমকে দেখতে। এক দেখাতেই মিমকে পছন্দ হয়ে গেলো সবার। কিন্তু মিমের মন এখনো খারাপ বাপির কথার জন্য। ছেলের বাবা ছেলেকে পাঠালো মিমের সাথে আলাদা কথা বলার জন্য। মিম জারিফকে নিয়ে নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়ালো আর জারিফের হাতে এক মগ কফি দিলো।

~ আপনার কি মুড অফ? (জারিফ মিমকে জিজ্ঞেস করলো)
~ না তো।
~ দেখে মনে হচ্ছে। আচ্ছা আপনি আমায় কেন বিয়ে করতে চাইলেন এইটা হলো আমার প্রথম প্রশ্ন।
~ আর দ্বিতীয় প্রশ্নটা?

~ দ্বিতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে যতদূর শোনা যায় অর্নীল চৌধুরী নাকি আপনার বয়ফ্রেন্ড?
~ ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আর ও যদি আমার বয়ফ্রেন্ড হতো তাহলে আপনাদের আর আজ এই বাসায় আসা লাগতো না। আর আমিও সঙ সেজে আপনাদের সামনে বসতাম না। (রেগে গিয়ে মিম)
~ হেই রিলাক্স! আই জাস্ট কিডিং উইথ ইউ। আর আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে, সঙ লাগছেনা তো।
~ থ্যাংক ইউ। আপনি কি এই বিয়েতে রাজি? (জারিফের দিকে তাঁকিয়ে মিম)
~ রাগী মেয়ে বউ হিসেবে আমার পছন্দের। তাই রাজি না হওয়ার আর কোনো অপশন খুঁজে পাচ্ছিনা। (কফি মগ হাত থেকে রেখে জারিফ)
~ কফি খেলেন না?
~ আপনার কথা শুনতেই ভালো লাগছে।
~ আমার কেমন ছেলে পছন্দ জানেন?

~ জানিনা তো। এখন চাইলে জানাতেই পারেন।
~ খুব বেশি পয়সাওয়ালা ছেলে আমার পছন্দ না, নরমাল জীবন লিড করতে চাই আমি। কারণ এই তেইশ বছরে জীবনের উপোভোগ্য সবই শেষ। বাস্তবতায় ফিরে বাস্তবকে দেখতে চাই আমি। আমাকে খুব ভালবাসতে হবে আমার মতো করে।
মিমের কথা শুনে জারিফ হাসতে শুরু করলো।

~ হাসছেন কেনো? (জারিফের দিকে ভ্রু উঁচু করে তাঁকিয়ে মিম)
~ আপনি আজব মানুষ। আপনার মতো করে আমি আপনাকে কিভাবে ভালবাসবো বলেন? ট্রাই করব।
~ থ্যাংক ইউ।
~ আমার কিছু কথা ছিলো।
~ হ্যা বলুন।
~ বিয়ের পর এই ধরনের স্টাইলিশ ড্রেস আর পরবেন না প্লিজ। আমি একটা ফেমিলিতে বিলং করি তো তাই সেই ফেমিলি মেইনটেইন করেই আপনাকে চলতে হবে। শাড়ি পরবেন সবসময়। দেখতে ভালো লাগবে আপনাকে।
~ আপনি আজকেই আমার পায়ে শিকল পরিয়ে দিচ্ছেন?

~ এ মা ছিহ! শিকল কই পরালাম? জাস্ট বললাম ড্রেসাপ মেইনটেইন করে চলবেন। তাছাড়া বিয়ের পর প্রতিটা মেয়েরই লাইফস্টাইল পালটায়।
~ আই নো দ্যাট ভেরি ওয়েল।
~ আর বিয়ের পর আপনার অফিসে যাওয়াও বন্ধ করতে হবে।

জারিফের এই কথা শুনে মিম পারছেনা ফ্লাওয়ার ভাস তুলে জারিফের মাথায় ভাঙতে। মিম রাগে গজগজ করতে করতে নিচে যায়। জারিফের ফেমিলির সবার সামনে বলে,
~ এই বিয়ে ক্যান্সেল। ওনার মতো আনরোমান্টিক আর অত্যাচারি ছেলে আমার বর হিসেবে আমি চাইনা। আপনারা চাইলে আসতে পারেন।
মিমের এই সিদ্ধান্তে মিমের বাপি মহাখুশি। জারিফ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো মিমের আচরণে। জারিফ মিমের বাপিকে বলল,
~ ভাগ্যিস ওনার সাথে কথা বলেছিলাম। মেয়েদের এতটা উচ্ছৃঙ্খলতা মানায় না আংকেল। এমন উদ্ভট আচরণের মেয়ে বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। অর্নীল চৌধুরীর সাথে এত কিছু শোনার পরেও আমি এসেছিলাম ওনাকে দেখার জন্য। যাইহোক থ্যাংক ইউ, আসছি।

জারিফ মিমের বাপিকে এসব বলার পর আর এক সেকেন্ড দাঁড়ায়নি। মিমের বাপি সাথে সাথে অর্নীলকে ফোন দিয়ে বলে বিয়ে ক্যান্সেল। অর্নীল ও হা হয়ে যায় শুনে।

~ আরে আর বলো না ওই উজবুকটা বলে কিনা আমাকে শাড়ি পরতে, অফিস যাওয়া বন্ধ করতে। এভাবে না বলে বিয়ের পর ও আমায় এইটা বুঝিয়ে বলতে পারতো। বাট সেইটা না বলে কন্ডিশন রাখলো। (রেগে রেগে কথা বলছে মিম) এতটা আনরোমান্টিক মানুষ হয়? ইম্পসিবল ওই ছেলেকে বিয়ে করা ইম্পসিবল।
~ হাহাহা। এইজন্য রেগে থাকতে হয়নাকি? রিলাক্স বাচ্চা! কালকে আমি তোমার অফিসে তোমার ফেভারিট আইসক্রিম নিয়ে যাব নে। খেয়ে মাথা ঠান্ডা কর।

পর্ব ৫

অর্নীল মিমকে দেওয়া কথামতো পরেরদিন সকাল দশটায় মিমের অফিসে যায়। মিমের কেবিনে গিয়ে বলে,
~ এই আসব?

~ আসো। পার্মিশন নেওয়ার কি আছে? (মিম)
~ আকাশ আইসক্রিমের কার্টুনটা রেখে চলে যাও। (অর্নীল আকাশলে বলল)
~ এত্তগুলো আইসক্রিম নিয়ে এসেছো কেনো? (অবাক হয়ে মিম)
~ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড রেগে আছে। ওর মাথা ঠান্ডা করার জন্য এইটা কমই। (চেয়ারে বসে অর্নীল)
~ বলছে তোমাকে কম! বাট এত আইসক্রিম! সব গলে পানি হয়ে যাবে তো।
~ ফ্রিজে রেখে দাও।

~ ভালো কথা বলেছো। দাঁড়াও আগে দুটো নিয়ে নেই।
মিম উঠে দাঁড়িয়ে দুইটা আইসক্রিম নিলো দুই হাতে আর অর্নীলকে নিতে বললে অর্নীল নিলো না। এরপর বাকি আইসক্রিম গুলো শৈলিকে দিয়ে ফ্রিজে রেখে দিলো। মিম দুইহাতে আইসক্রিম নিয়ে খাচ্ছে আর অর্নীল গালে হাত দিয়ে দেখছে।

~ ওই কি হইছে? এইভাবে তাঁকায় আছো কেন? (মিম)
~ ভাবছি তোমার বেটার হাফের কথা। বেচারা কত বড় ছ্যাকাই না খাবে।
~ কেন?

~ এই যে এইভাবে আইসক্রিম খেতে দেখলে!
~ আর বেটার হাফের কথা বলো না। আমি মনে হয় আমার বেটার হাফকে খুঁজেই পাবনা। কতগুলো ছেলে দেখলাম বাট একটাও আমার মন মতো না।
~ তোমার চয়েজ পাল্টাও বুঝছো। বাই দি ওয়ে শুনো!
~ বলো?

~ বিকেলে ফ্রি আছো?
~ একদমই না। কেনো? (আইসক্রিম খেতে খেতে মিম)
~ ফুচকা খেতাম তোমার সাথে। এরপর ডিনার করে বাসায় যেতাম।
~ তুমি খাবা ফুচকা? (হাসতে হাসতে মিম)
~ এত সুইটলি কেউ হাসে? পরে কিন্তু আমি ক্রাশ খেলে কিছু বলতে পারবানা!
~ ইডিয়েট! আচ্ছা আগামীকাল ট্রাই করব।
~ আচ্ছা। তাহলে আজ আমি আসছি। বাই।
~ রাতে ফোন দিও।

~ না বললেও দিতাম। (মুখ বাঁকিয়ে অর্নীল)
~ জানি তো। বাই।

অর্নীল যাওয়ার পর মিম আবার ওর কাজে মনোযোগ দেয়। মিমের ভাবনা এখন অন্যকিছু। এইভাবে ছেলেদের রিজেক্ট করতে থাকলে তো ওর আর সংসার করা হবেনা! সংসার ধর্ম নিয়ে ওর তো অনেক স্বপ্ন। এইভাবে আর স্বপ্নকে বাতিল করা যায়না। যত তারাতারি সম্ভব একটা কিছু করতেই হবে। অর্নীলকেই বলতে হবে ওর জন্য বর খুঁজে দিতে।

অফিসের পাশাপাশি দুজন চুটিয়ে মাস্তি করেই যাচ্ছে। শাইমার দেওয়া আঘাতের পর অর্নীল হাসছে, মজা করছে এইত বেশি!
দুইদিন পর,
~ অর্নীল আমি তোমার অফিসে আসছি। সমস্যা হবে? (ফোনে মিম)
~ একটুও না। আসো। (অর্নীল)
~ আচ্ছা তাহলে আসছি।

ঘণ্টা দুয়েক পরে মিম অর্নীলের অফিসে যায়। মিমকে অর্নীলের অফিসে দেখে সবাই তাঁকিয়ে ছিলো। মিম শার্ট আর গ্যাবার্ডিন পরা ছিলো আর চুল উঁচু করে ঝুটি করা ছিলো।
~ ব্যস্ত তুমি? (চেয়ারে বসে মিম)
~ না। হঠাৎ তুমি আমার অফিসে? (অর্নীল চেয়ার থেকে উঠে গেলো)
~ ঘুরতে যাব চলো।

রে হাত দেখিয়ে অর্নীল)
~ কেন? রোদে কালো হয়ে যাবা দেখে ভয় পাচ্ছো? (মুখ বাঁকিয়ে মিম)
~ আরে না।

শাইমা ওদের দুইজনকে হাসিমুখে গল্প করতে দেখছে। তখনি শাইমার একটা পেপার দেওয়ার কথা অর্নীলকে। মিম থাকা অবস্থায় শাইমা পার্মিশন নিয়ে অর্নীলের কেবিনে ঢুকলো।
~ স্যার আপনার পেপার।
~ থ্যাংক ইউ। নাও ইউ ক্যান গো। আমরা গল্প করছিলাম নিশ্চই দেখছিলেন তো এইভাবে বিরক্ত না করলেও হতো। পেপারটা পরে দিলেই পারতেন।
~ সরি স্যার।

~ যান এখন।
শাইমা যাওয়ার পর,
~ বেচারীকে এভাবে না বললেও পারতে! (মিম)
~ বেচারী না কি সব জানলে বুঝতা! (মনে মনে অর্নীল) কোথায় ঘুরতে যাবা বলো?
~ চাঁদপুর যাই? ঢাকা থেকে চাঁদপুর তো কাছেই।

~ বইলো না যে গাড়ি নিয়ে যাবা না! (পেপার গুছাতে গুছাতে অর্নীল)
~ লঞ্চে যাব লঞ্চে।
~ এই না! আমি পানিকে প্রচন্ড ভয় পাই। (চিল্লিয়ে অর্নীল)
~ ওই চুপ। ভয় পাওয়ায় দিব নে। আমরা এখন লঞ্চে করে চাঁদপুরে যাব, কথা শেষ। এইবার চলো। নো এক্সকিউজ হ্যা?

~ এই তুই বুঝিস না আমি পানিতে আসলেই ভয় পাই! আমার গাড়িটা নিয়ে যাই? আমি ড্রাইভ করব। (অর্নীল)
~ যাহ। আমি আর তোর সাথে কোথাও ঘুরতেই যাব না। থাক তুই। আমি যাই, বাই।
মিম উঠে চলে যেতে শুরু করলো তখন অর্নীল মিমের হাত ধরলো। অর্নীল ওই প্রথমই মিমকে ছুঁয়ে দিলো। মিমের শরীরে কেমন অজানা এক শিহরণ বয়ে গেলো। শিরশির করে উঠলো মিমের শরীর।
~ যাও লঞ্চেই যাব। পাঁচমিনিট সময় দাও। শার্টটা চেঞ্জ করে আসি। (অর্নীল)
~ যাও।

অর্নীল চলে যাওয়ার পর মিম চেয়ারে বসে ভাবছে অর্নীল ছোঁয়ার পর এমন হলো কেন ওর? এইরকম তো আগে হয়নি। মিম পানি খেয়ে নিজের শার্ট ঠিক করলো। অর্নীল তখন শার্টের হাতা ভাঁজ করতে করতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। ওয়ালেট, সানগ্লাস আর ঘড়ি নিয়ে অর্নীল বলে,
~ চলো।
~ হ্যা চলো। (মিম)
অর্নীল ঘড়ি পরতে পরতে আকাশকে বলে অফিসের সবকিছু দেখার জন্য। অফিস থেকে বেরিয়ে মিম অর্নীলকে বলে,

~ এখন সদরঘাটে যাব কিভাবে?
~ তুমিই ডিসাইড কর কিভাবে যাবা।
~ একটা ক্যাব বুক করে চলে যাই চলো।
~ অর্নীল চৌধুরীকে এখন ক্যাবেও চড়তে হবে। ভাবা যায়? (পকেটে হাত দিয়ে অর্নীল)
~ এই ভাব কম নাও। টাকা পয়সা আছে দেখে কি দেখানো লাগবে হু?
~ দাঁড়াও ক্যাব ভাড়া করছি।

অর্নীল অফিসের দারোয়ানকে পাঠালো ক্যাব ভাড়া করার জন্য। কিছুক্ষণ পর দারোয়ান ক্যাব নিয়ে আসলে অর্নীল আর মিম ক্যাবে উঠে সদরঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সদরঘাটে গিয়ে অর্নীল ক্যাবের ভাড়া দিয়ে লঞ্চের কেবিনের টিকিট কাটে। সব ফর্মালিটি শেষ করে লঞ্চে উঠতেই অর্নীল ভয় পাচ্ছে। অর্নীল বুড়িগঙ্গার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আর ভেতরে ভেতরে কাঁপছে!
~ এই দামড়া ছেলে এখনো ভয় পাচ্ছে! আজব। (মিম)
~ কি ছেলে আমি? (না শুনার ভান করে অর্নীল)
~ দামড়া।

~ দামড়া কি?
~ বড় ছেলে।
~ তুমি এইসব শিখছো কিভাবে?
~ ভার্সিটি থেকে। ক্যাম্পাসে যখন আড্ডা দিতাম ফ্রেন্ডরা এসব বলতো। আরো কয়েকটা গালি পারি। (দুই পাটি দাঁত বের করে মিম)
~ কি কি?

~ শুয়োরের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা।
গালি দুইট দিয়েই মিম জিহ্বায় কামড় দিয়ে হাসতে শুরু করলো।
~ তুমি বাচ্চাদের থেকেও বেশি খারাপ। (অর্নীল)

~ এখন কি লঞ্চে উঠবা নাকি ধাক্কা মেরে নদীতে ফেলে দিব? (ভ্রু উঁচু করে মিম)
~ না, না। এই নোংরা পানিতে মরার ইচ্ছে নেই। উঠছি আমি।
অর্নীল আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে লঞ্চে উঠলো। মিম তো দৌড়ে দৌড়ে লঞ্চে উঠে একদম সাইডে চলে গেলো। অর্নীল তখন বাসায় ফোন করে বলে ও চাঁদপুর যাচ্ছে, বাসায় যেতে দেরি হবে। মিম তো আনন্দে লাফাচ্ছে।
~ ব্লেজার আনো নি তুমি? (অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করলো)
~ না, শুধু শার্ট পরেই তো চলে আসলাম। কেনো?

~ মানুষগুলো যেনো কিভাবে তাঁকাচ্ছে। আসো কেবিনে চলে যাই।
এরপর অর্নীল মিমকে নিয়ে কেবিনে চলে এলো।
~ শার্টের উপর তো শর্ট ডিজাইনার ব্লেজার গুলা পরা যায়? পরে আসো নাই কেন? (অর্নীল)
~ ভুলে গেছিলাম। (লজ্জা পেয়ে মিম)

~ থাক আর বাইরে যেয়ো না।
সাড়ে তিনঘণ্টা পর লঞ্চ চাঁদপুর ঘাটে গিয়ে থামলো। অর্নীল মিমকে ধরে ধরে নামাচ্ছে। তখনো সন্ধ্যে হয়নি। পড়ন্ত বিকেল বলা যায়। রোদের সোনালি আভা চিকচিক করছে নদীর পানিতে। অর্নীল ও ওইদিন ব্লেজার পরে আসেনি। শুধু ব্ল্যাক শার্ট আর ব্ল্যাক প্যান্ট পরা। আর মিম পিংক কালার শার্ট আর বাদামী রঙের প্যান্ট পরা। লঞ্চ থেকে নেমে মোটামুটি ভালো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুজন কিছু খেয়ে নিলো কারণ এখানে ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট নেই। খাওয়া শেষ করে মিম অর্নীলকে বলল,
~ গ্রামে ঘুরতে যাব এখন। চলো।

~ ফিরতে কিন্তু তাহলে অনেক রাত হবে।
~ হোক। সমস্যা কি?
~ কোনো সমস্যা নেই মেডাম, চলুন।

দুজন একটা রিক্সা নিয়ে গ্রামসাইডে গিয়ে নেমে যায়। অর্নীল অনেক আগেই সানগ্লাস খুলে শার্টে ঝুলিয়ে রেখেছে। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে তাও ছেলেমেয়েরা খেলছে। মিম অর্নীলকে বলছে কোনটাকে কি খেলা বলে। চারিদিকে শুধু ধানক্ষেত আর সরষে ক্ষেত। মিম কতগুলো সরিষা ফুল ছিঁড়ে অর্নীলকে ছুঁড়ে মারে। অর্নীল গ্রামের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ! আমেরিকার ফ্লোরিডাতে এইসব কিছুই দেখেনি অর্নীল।
~ সাচ এ বিউটিফুল ভিলেইজ মিম। এত সুন্দর বাংলাদেশ? (অর্নীল)
~ ইয়েস বেইবি। ট্যুর এখনো অনেক বাকি। কিছুই দেখোনি তুমি বাংলাদেশের সৌন্দর্যের।
~ তুমি দেখাবা, সমস্যা কি? (মিমের হাত ধরে অর্নীল)
~ চলো সামনে আগাই।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে মিম হাঁটছে আর আঁকাবাঁকা পথ মুগ্ধ হয়ে দেখছে অর্নীল। যেতে যেতে যতগুলো ফুল চোখে পরেছে সবগুলো অর্নীলকে চিনিয়েছে মিম। বাড়িঘরগুলো নিঃসন্দেহে শিল্পীর আঁকা ছবি! মাগরিবের আযান যখন দিচ্ছে তখন দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো সরষে ক্ষেতের পাশে। আস্তে আস্তে যখন আঁধার ঘনিয়ে আসছে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে হৃদয় আটকে যাচ্ছে। ক্রমশ ভয় পেয়ে উঠছে অর্নীল। থেকে থেকে আলো আর বাড়িঘরগুলো যেন অর্নীলের নতুন আবিষ্কার।

~ আগে বলতা এই প্যারাডাইসে আমাকে নিয়ে আসবা তাহলে ক্যামেরাটা নিয়ে আসতাম। (অর্নীল)
~ একেই প্যারাডাইস বলছো? প্রেমের শহর রাঙামাটিকে কি বলবা তুমি?
~ তোমাকে নিয়েই এখন থেকে ট্যুরে যাব।

~ আমিও। (দাঁত কেলিয়ে মিম)
~ তোমার বেটার হাফ আমায় পিটাবে পরে।
~ তাহলে বেটার হাফের ঠ্যাং খোঁড়া করে দিব আমি।
~ আস্তে দৌড়াও পরে যাবা তো। (অর্নীল)
~ না পরবনা।

~ ফিরবে কখন?
~ আমার তো ইচ্ছে করছেনা ফিরতে। ইচ্ছে করছে এখানেই থেকে যাই। অর্নীল চা খাব আমি।
~ এই টঙ দোকানের? (নাক ছিটকিয়ে অর্নীল)
~ খেয়ে দেখোই না ভালো লাগবে। কাম অন।

বাঁশ দিয়ে তৈরি একটা চায়ের দোকানে ঢুকলো মিম। আশেপাশের সব ঘুটঘুটে অন্ধকার। অর্নীল চায়ের দোকানের বেঞ্চের উপর বসলো সাথে মিম ও। এখানে চায়ের কাপ থাকলেও মিম মাটির ছোট্ট ঘটে চা দিতে বলল। অর্নীল চা খুব কম খায় তবুও আজকে মিমকে শান্ত করার জন্য চা খেলো। মিম চা খাচ্ছে আর দোকানের বাঁশ ধরে ঘুরছে। অর্নীল তখন আরেকটা বাঁশে হ্যালান দিয়ে চা খাচ্ছে আর মিমকে দেখছে। চা খাওয়ার পর্ব শেষ করে অর্নীল টাকা দিতে যাবে তখন দেখে পকেটে খুচরা টাকা নেই। একশো টাকার নোট আর হাজার টাকার নোট। মিম তখন অর্নীলকে টিজ করে বলে,
~ বড়লোকের বেটা! খুচরা টাকা নিয়ে বের হয়না।

~ সমস্যা কি? আংকেল আপনি একশো টাকাই রেখে দিন। চেঞ্জ দিতে হবেনা। (চা ওয়ালাকে টাকা দিয়ে অর্নীল)
~ এই না হলে ছেলে! জ্বি আংকেল রেখে দিন।
~ তোমরা সুখে সংসার কর এই দোয়া করি মা। তোমার বরটা অনেক সুন্দর আর তুমিও খুব সুন্দর। (চা ওয়ালা)
~ না আংকেল ও আমার বর নয়। ও আমার বন্ধু। (হেসে দিয়ে মিম)
~ ওহ! (চা ওয়ালা)

চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ফোনের ফ্ল্যাশ অন করলো অর্নীল। আবারো সেই ঝিঁঝি পোকার ডাক! রাত নয়টা পর্যন্ত দুজন শুধুই ঘুরছে। আর অর্নীল ফিল করছে প্রকৃতিকে। রাত নয়টায় মিম বলে,
~ এখন ফেরা উচিৎ। চলো ঘাটে যাই। (মিম)
~ হ্যা চলো।
যাওয়ার পথে অর্নীল একটা লোককে জিজ্ঞেস করলো,
~ আংকেল এখান থেকে ঘাটে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা কোনটা?
~ এখন ঘাটে গিয়ে কি করবা বাবা? (বৃদ্ধ লোক)
~ আমরা ঢাকায় ব্যাক করব লঞ্চের মাধ্যমে।

~ রাত সাড়ে আটটার পর তো ঢাকার কোনো লঞ্চ নাই বাবা। সাড়ে আটটায় ঢাকার লঞ্চ ছেড়ে চলে গেছে।
~ হ্যাএএএএ! আচ্ছা ধন্যবাদ আসুন আপনি। (অর্নীল)
~ এইটা কি হলো? যাব কিভাবে এখন আমরা? (মিম)
~ আশরাফ আংকেলের বাচ্চা মিম এখন বল যাব কিভাবে? (চিল্লিয়ে অর্নীল)
~ রিলাক্স বেইবি যেতে তো হবেই। (নখ কামড়াতে কামড়াতে মিম)
মিম আর অর্নীল দুজনেই টেনশনে পরে গেলো। মিম বলল,
~ বাসে যাই চলো।

~ এই মেয়ে তোমার মাথা খারাপ? আমি ভুলেও বাসে যাবনা।
~ আমিও তো বাসে চলতে পারিনা। এখন উপায়? (মিম রীতিমতো ভয়ে আছে)
~ আরো আসো প্রাইভেট কার ছাড়া! উহ গড। ওয়েট আমি ভাইয়াকে ফোন দেই।
অর্নীল আরুশকে ফোন দিলো। আরুশ সব শোনার পর হাসছে। অর্নীল রেগে গেছে আরুশের হাসি শুনে।
~ না হেসে সলিউশন দাও। কি করব এখন? (অর্নীল)
~ কালকে ঢাকা ব্যাক করিস। একটা হোটেল বা ঘর বুক করে ওখানে থেকে যা ভাই। (আরুশ)

পর্ব ৬

অর্নীল আরুশের বুদ্ধি শুনে ফোন কেটে দিলো। অর্নীল এইবার বিপদেই পরে গেলো। মিম তো গাছের নিচে বসে নখ কামড়াচ্ছে।
~ এই যে চকচকে আর রঙচঙে নখ কামড়ালেই বুদ্ধি বেরিয়ে যাবেনা। নখ কামড়ানো অফ কর। (অর্নীল)
~ অর্নীল এখন কি করি বল তো? (উঠে দাঁড়িয়ে মিম)

~ কোনো হোটেল বুক করে থাকবা?
~ না ভুলেও না। গ্রাম সাইডের হোটেলগুলোতে কোনো সেফটি নেই। যদি জানে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মিম রায়হান এখানে এসেছে তাহলে সব লুট করে নিয়ে যাবে। (পায়চারি করতে করতে মিম)
~ এনেছো কি সাথে করে? ফোনটাই তো আছে সাথে। (মিমকে টিজ করে অর্নীল)
~ দেড় লাখ টাকার ক্রেডিট কার্ড ও আছে। (মুখ বাঁকিয়ে মিম)
~ ওই চুপ।

অর্নীল পকেটে হাত দিয়ে ভাবছে কি করা যায়। আর মিম গাছের পাতার সাথে খেলছে আর জোনাকিপোকা ধরছে। আস্তে আস্তে সব আলো নিভে যাচ্ছে। ঘড়িতে তখন বাজে সোয়া এগারোটা। চারিদিকে যখন ঘন আঁধার নেমে এসেছে তখন মিমের বুক হুহু করে উঠলো ভয়ে। মিম তখন অর্নীলের সাথে সাথে হাঁটছে।
~ ঠিক করলে কিছু? রাতে থাকব কোথায়? (মিম)

~ চলো গাছতলায় থাকি। আর প্রাইভেট কার ভাড়া করা যাবে? (অর্নীল)
~ মাথা খারাপ? এত রাতে আমাদের জন্য কে বসে আছে প্রাইভেট কার নিয়ে?
~ তাহলে আর কি? ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে হাঁটি শুধু। একসময় ভোর হয়েই যাবে।
~ প্রানীর আওয়াজগুলো শুনেছো? কি ভয়ঙ্কর লাগছে! (ঢোক গিলে মিম)
~ তুমিই শুনো। আমার রাগে শরীর জ্বলছে।

~ আমি কি জানতাম নাকি যে এমন কিছু হবে?
~ হ্যা তুমি তো কিছুই জানতানা! এখন এই অচেনা এলাকায় ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে কতক্ষণ হাঁটবো বলো? (অর্নীল)
~ চলো কোথাও শেল্টার নেওয়া যায় কি না দেখি।
~ দেখো।

অর্নীল আর মিম হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখলো ৫/৬ টা ছেলে একটা গাছের নিচে বসে তাশ খেলছে আর পাশে বিভিন্ন নেশাদ্রব্য রাখা। মিম আর অর্নীল দুজনেই এইটা স্কিপ করতে চাইলো কিন্তু তার মধ্যে একটা ছেলে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে মিমের হাত ধরলো৷ অর্নীল প্রথমে খেয়াল করেনি। যখন ছেলেটা কথা বলতে শুরু করলো তখন অর্নীল পিছু ফিরে দেখে ছেলেটা মিমের হাত ধরে আছে আর মিম ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্নীল তখন সামনে এসে ওই ছেলেটার হাত ঝাড়া দিয়ে মিমের হাত ছাড়িয়ে নেয়।

~ মেয়েদের সাথে কি ব্যবহার করা উচিৎ বাসায় শিখায় নি? (ছেলেটাকে বলল অর্নীল)
~ এত রাতে বউকে নিয়ে এই পাড়ায় আসতে নেই সেইটা তোমার বাসায় শিখায় নি? (ছেলেটা)
~ অর্নীল ছেড়ে দাও। এদের সাথে ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নাই। (মিম)
~ যেতে চাইনি তো। যেতে বাধ্য করলো তো এরাই। (অর্নীল)
~ ছেড়ে দাও। চলো এখান থেকে। (অর্নীলের হাত ধরে মিম অর্নীলকে নিয়ে আসলো)
রাত বারোটা বেজে গেছে কিন্তু এখনো কোনো থাকার উপায় দেখছেনা অর্নীল আর মিম। হঠাৎ মিম দেখলো একটা বাড়িতে আলো জ্বলছে।

~ ইউরেকা! পেয়ে গেছি। চলো এই বাড়িতেই থাকব আজকে।
~ বাড়ির অবস্থা দেখেছো? লওয়ার মিডেল ক্লাস টাইপ। (নাক ছিটকিয়ে অর্নীল)
~ সো হোয়াট! রাত কাটাতে পারলেই হলো। নাক না ছিটকিয়ে চলো। আগে তো থাকার ব্যবস্থা করি।
মিম ওই বাড়িতে গিয়ে দরজায় নক করলো। কিছুক্ষণ পর সতেরো বছর বয়সী একটা কৃষ্ণ বর্ণের মেয়ে দরজা খুলল।
~ কারা আপনারা? (মেয়েটি)

~ আমাদের তুমি চিনবেনা। আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। কিন্তু ফেরার জন্য লঞ্চ বা গাড়ি কিছুই পাইনি। তাই রাতটুকু কাটানোর জন্য তোমাদের বাসায় থাকা যাবে প্লিজ? (মিম)
~ আপনাদের দেখে তো অনেক বড় ঘরের মাইয়া পোলা মনে হয়। নিজেগো গাড়ি নাই? (মেয়েটি)
~ ছিল বাট নিয়ে আসিনি। (মিম)
~ দাঁড়ান আমি আম্মুরে ডাইক্কা নিয়া আসি।

কথাটুকু বলেই মেয়েটি দৌড়ে ঘরে যায় আর আম্মুকে ধরে নিয়ে আসে।
~ আসসালামু আলাইকুম। (মিম আন্টিকে সালাম দিলো)
~ ওয়ালাইকুম সালাম। তোমরা কে?
~ আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। বিপদে পরেই এসেছি আপনার বাসায় আশ্রয়ের জন্য। (মিম)
~ কাজল (মেয়েটির নাম) আমারে সব কইছে। তোমরা কি জামাই বউ লাগো? (আন্টি)
~ হ্যা। (অর্নীলের হাতে চিমটি দিয়ে মিম মিথ্যে টুকু বলল যাতে ওনারা থাকতে দিতে রাজি হয়)
~ আসো ঘরে আসো।

মিম আর অর্নীল ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালো। কাজল ওদের বসার জন্য দুইটা মোড়া দিলো। মিম একটা মোড়ায় বসলো আর অর্নীলকে বসার জন্য ইশারা করলো। অর্নীলের মাথা ঘুরছে এই পরিবেশে রাত কাটাতে হবে বলে।
~ তোমরা খাও নাই কিছু তাই না? (আন্টি)
~ না আন্টি খেয়েছি সন্ধ্যায়। (মিম)
~ এখন বাজে বারোটা। আমি তোমাগো ভাত দেই, খাইয়া লও। তোমরা গরিবের ঘরে আইছো। যা হয় তাই কষ্ট করে খাইয়া লও।
~ আচ্ছা আন্টি সমস্যা নেই।

মিমকে দেখে কাজল বলছে,
~ তোমার মতো জামা আমি টিভিতে একটা আপুরে পরতে দেখছিলাম। চায়ের দোকানে দোকানীর কাছ থেকে এনে প্রতিদিন পেপার পড়ি। সেইখানেও তোমার মত একটা আপুর ছবি দেখছিলাম। আপুটার নাম ছিল মিম রায়হান। আপুটাকে আমার খুব ভালো লাগছিলো। কত সুন্দর সুন্দর জামা বানায়!
~ ওহ তাই? আমি মিম রায়হনাকে বলে দিব তোমার জন্য যেন সুন্দর সুন্দর ড্রেস ডিজাইন করে পাঠিয়ে দেয়৷ (অর্নীলকে না করলো মিম যাতে নাম না বলে)
~ তুমি চিনো ওই আপুটাকে? (অবাক হয়ে কাজল)
~ হ্যা চিনি।
~ কি ভালো তুমি!

~ তুমিও অনেক ভালো।
অর্নীল আর মিম বাইরে কলপাড়ে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসলো৷ অর্নীল হাত ধুচ্ছে আর মিমকে বলছে,
~ আমার ঘরের বাথরুম ও এদের বাসা থেকে বড়। এখানে মানুষ গোসল করে? (বিরক্ত হয়ে অর্নীল)
~ তুমি এদের চিনো না তাই বলছো। বাংলাদেশে কয়টা পরিবার আছে যারা তোমার আর আমার মতো স্টেবল? জানো কিছু?
~ আর জানতেও চাইনা।
অর্নীল আর মিমকে খাওয়ার জন্য কাজল যখন পাটি বিছিয়ে দিলো তখন অর্নীল বলে,
~ এখানে বসে খেতে হবে?
vvvvvvvvvb
হ! আমাগো তো ডায়নিং টেবিল নাই। তাই এখানেই বসতে হইব৷ (কাজল)
অর্নীলের অবস্থা দেখে মিম হাসছে। মিম কোনোরকম হাসি কন্ট্রোল করে অর্নীলকে বলল,
~ বসো প্লিজ। আলাদা কিছু ফিল পাবা যা টাকার বিনিময়ে কোনোদিন পাবা না।

~ আর কি কি হবে আমার সাথে আমি সত্যিই জানিনা। (বাধ্য হয়ে অর্নীল পাটির উপর আসন পেতে বসলো)
অর্নীল আসন পেতে বসে কমফোর্টেবল নয় এইটা মিমকে বলছে আর তখনি কাজল আর কাজলের মা খাবার নিয়ে আসলো। খাবারের মেনু দেখে অর্নীলের মাথায় হাত। এসব তো ও কোনোদিন চোখেও দেখেনি! খাবে কি করে ও? আর ভাতের চাল ও তো সরু নয়। কেমন লালচে লালচে ভাত। মিম শুধু অর্নীলকে দেখছে আর হাসছে।
~ তোমার জামাইয়ের মনে হয় খাবারগুলো পছন্দ হয়নি না? (আন্টি)
~ না, আন্টি ও এমনি। তবুও খেতে পারবে। তাইনা অর্নীল? (মিম)

~ ও কি বলছো? জামাইয়ের নাম ধরতে নাই জানো না? (আন্টি)
~ ভুল হয়ে গেছে আন্টি। আচ্ছা আন্টি খাবার গুলোর নাম কি? (মিম)
~ এইটা ছোট মাছের চচ্চরি, এইটা পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ির ঝোল আর এইটা ঢেড়স পাতুরি। (আন্টি)
~ আমি ভুলেও খেতে পারবনা এসব। আমি খাইনা এগুলো। (অর্নীল উঠে যেতে নেয় তখন মিম অর্নীলের হাত ধরে)
~ খেয়ে দেখো। খারাপ লাগবেনা হয়ত। প্লিজ।

মিমের রিকুয়েষ্ট রাখতে গিয়ে অর্নীল খেতে বসলো। যে ছেলে ইটালিয়ান আর চাইনিজ ফুড ছাড়া খেতেই পারেনা সে এগুলো খাবে কি করে? মিম অর্নীলের প্লেটে দুই চামচ ভাত দিলো আর নিজের প্লেটে দেড় চামচ ভাত নিলো। মিম অর্নীলকে প্রথম ছোট মাছ খেতে দিলো। অর্নীল পারছেনা কেঁদে দিতে। হাত দিয়ে ভাত খায় কিভাবে? অর্নীল তো চামচ ছাড়া কোনো খাবারই খায় না! এরপর মিমের মতো করে অর্নীল ভাত মেখে এক লোকমা মুখে তুলল। মিম ভয় পাচ্ছে অর্নীল খেতে পারবে কি না! কিন্তু মিমকে অবাক করে দিয়ে অর্নীল মনোযোগ সহকারে সবগুলো ভাত খেয়ে শেষ করলো। মিম খাচ্ছে আর অবাক হচ্ছে। খাওয়া শেষ করে অর্নীল মিমকে বলে,
~ আরেকটু ভাত দাও তো।
~ কি হলো চৌধুরী? মজা লেগেছে? (ভাতের চামচ হাতে নিয়ে মিম)
~ ভীষণ! আমি কখনো এত মজাদার খাবার খাইনি। থ্যাংক ইউ আন্টি। তিনোটা রেসিপিই দুর্দান্ত হয়েছে। (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অর্নীল)

~ হ্যা সত্যিই। (মিম)
খাবার খেয়ে রাত একটায় অর্নীল আর মিম ঘুমাতে গেলো। কিন্তু আফসোস মার্বেল পাথরে বাঁধানো সেই রাজমহলের মতো নয় এই ঘর। নেই কোনো সাজ৷ তারপরেও কেনো যেন শান্তি লাগছে। মিম আর অর্নীল কেউই ঘুমায় নি কারণ নিজেদের কাছে তো ওরা স্বামী স্ত্রী নয়। অর্নীল পা ঝুলিয়ে চৌকির উপর বসে আছে। অর্নীলের পায়ে জুতা নেই কিন্তু মোজা আছে। মিম চুল খুলে বাঁধছে।
~ আমি কালকে বাসায় গিয়ে আগে আম্মুকে বলব আমাকে ছোট মাছের চচ্চরি, পুঁইশাক আর ঢেড়স রান্না করে দিতে। (অর্নীল)

~ হাহাহা। দেখো কেউ যেন শক না খায়।
~ সে তো খাবেই। আমি একটু আগে পর্যন্ত এদের নাম জানতাম না।
~ আন্টি আসলেই অবাক হয়ে যাবে। (হাসতে হাসতে মিম)
অর্নীল আর মিম কমপক্ষে দুই ফুট দূরত্ব বজায় রেখে গল্প করছে। অর্নীলের ভীষণ গরম লাগছে কিন্তু এখানে এসি নেই। প্রাকৃতিক বায়ু খেয়েই বাঁচতে হবে। ভোরে আযান শুনে দুজনেরই আলাপ শেষ হয়। একটু আলো ফুঁটতেই মিম দ্রুত বাইরে চলে আসে। অর্নীল ও মিমের সাথে বাইরে আসে।

~ প্রকৃতি কি নির্মল দেখেছো? আমরা শহুরে জীবনে আকৃষ্ট হয়ে এইসব ভুলেই গিয়েছি। (মিম)
~ গ্রামটা সত্যিই সুন্দর। থ্যাংকস এগেইন। তুমি এখানে না আনলে আমার সবকিছু মিস হয়ে যেতো।
~ ওয়েলকাম।
পেছন থেকে আন্টির কথার আওয়াজ শুনে দুজনেই তাঁকায়।
~ উঠে গেছো তোমরা?

~ হ্যা আন্টি। আমরা এখন বের হব তো। (মিম)
~ বের হব মানে? আমি সকালের খাওন তৈয়ের করতাছি। খাইয়া তারপরে বাইর হইবা। মেমানগো না খাওয়াইয়া বিদায় দিতে নাই মা।
~ আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন তাই অনেক। আপনাকে আর কষ্ট করতে হবেনা আন্টি।
~ সেইটা আমি মানুম না। তোমরা ওই ভিডিতে গিয়া চৌকির উপর বহো। আমি এহনি সব তৈয়ার করতাছি।
~ কি করব? (মিম অর্নীলকে জিজ্ঞেস করলো)

~ এজ ইউর উইশ। আমার থাকতে আপত্তি নেই। বরং ভালই লাগছে। (অর্নীল)
~ আচ্ছা আন্টি আমরা বসছি।
মাটির বারান্দায় গিয়ে একটা চৌকির উপর বসলো মিম। অর্নীল চারপাশ দেখছে। কিছুক্ষণ পর কাজল একটা বোতলে করে কয়লার গুড়া নিয়ে আসলো দাঁত মাজার জন্য। কয়লার গুঁড়া দেখে অর্নীল আর মিম দুজনেই হাসছে।
~ এগুলো দিয়ে দাঁত মাজে? (অর্নীল)
~ হ। আপনারা মাজেন নাই কখনো? (কাজল)

~ জ্বি না। এগুলা দিয়া দাঁত মাজে কিভাবে? (মিম)
~ হাতের তালুতে একটু ছাই নিবেন এরপর অঙ্গুলি করবেন মুখে। (কাজল)
~ হাহাহা এইটা কোনো কথা? জীবনে এই চিজ তো কোনোদিন দেখিনি। আজকে এইটা দিয়েই দাঁত মাজব দাও। (মিম)
কাজল অর্নীল আর মিমকে ছাই দিয়ে দাঁত মাজা শিখাচ্ছে আর কাজলের কথামতো দুজনেই দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে ফেলে। অর্নীল বলে,
~ বুঝেছি। জীবনে আরো অনেক কিছুই দেখা বাকি আর ফেইস করা ও বাকি।

~ অফকোর্স। জীবন সম্পর্কে কিছুই জানোনা তুমি।
~ তুমি জানিয়ে দিও।
হাত মুখ ধুয়ে মিম কাজলের সাথে গল্প করছে আর অর্নীল উঠানে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছে। ব্রেকফাস্টের জন্য পাটিসাপটা আর পরোটা বানিয়েছে কাজলের আম্মু। সাথে একটা তরকারি। মিমের ব্রেকফাস্ট খুব পছন্দ হকো আর পেট ভরে খেলো ও। অর্নীল খেতে খেতে বলছে,
~ সিরিয়াসলি আজীবন মনে থাকবে আমার এই খাবারের কথা।

~ আসলেই। সো মাচ টেস্টি। (মিম)
খাওয়া দাওয়া করে মিম আর অর্নীল বিদায় নিয়ে সেখান থেকে ঘাটে চলে এলো। কিছুক্ষণ লঞ্চের জন্য ওয়েট করে সোজা ঢাকায় পা রাখলো দুজন। সদরঘাট থেকে মিম মিমের বাসায় গেলো আর অর্নীল অর্নীলের বাসায়। অর্নীলকে দেখে৷ বউমনি রীতিমতো পিঞ্চ করতে শুরু করলো মিমকে নিয়ে। আর অর্নীল সেসবে কান না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে যায়। ফ্রেশ হয়ে অর্নীল নিচে আসে তখন আম্মু দুপুরের রান্না করছে। ডায়নিং এ বসে অর্নীল আম্মুকে ডাকে।
~ হ্যা বল। (অর্নীলের আম্মু)

~ দুপুরে কি রাঁধছো আমার জন্য? (পেপার হাতে নিয়ে অর্নীল)
~ চিকেন কারি আর ফ্রাইড রাইস।
~ সেসব বাদ। আমার জন্য ছোট মাছের চচ্চরি, পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ির ঝোল আর ঢেড়স রান্না কর। (পেপার উল্টাতে উল্টাতে অর্নীল)
~ কি? (কান ঝারা দিয়ে অর্নীলের আম্মু)
~ যা বললাম শুনো নি?
~ ঠিক শুনলাম নাকি সেইটাই বোঝার চেষ্টা করছি। এইসবের নাম কি করে জানলি তুই বাবা?
~ বউমনি!
~ বলো।

~ আম্মুকে বোঝাও আমাকে যেন ওইসব রান্না করে দেয় আর বেশি কথা যেন না বলে।
~ কোনসব? (বউমনি)
~ আমি বলছি বউমা! ছোট মাছের চচ্চরি আরো দুইটা কি যেন বললো! (অর্নীলের মা)
~ পুঁইশাক আর ঢেড়স। (অর্নীল)

~ এগুলো কে খাবে? (বউমনি)
~ তোমার একমাত্র দেবর। (অর্নীলের আম্মু)
~ এ্যাঁএএএএ! (বউমনি)
~ রান্না করে দিলে দাও নইলে নাই। এমন করার কি আছে? আজব! (পেপার রেখে অর্নীল)
~ না বাবা দিব। ফ্রাইড রাইস ক্যান্সেল তাহলে? (অর্নীলের আম্মু)
~ হ্যা। (অর্নীল)

পর্ব ৭

অর্নীলের এহেন কথায় বউমনি আর আম্মু দুজনেই অবাক। কিন্তু বউমনি ব্যাপারটা ইজিলি নিয়ে বলে,
~ সবই মিমের কারিশমা বুঝছেন মা? আপনার ছেলেকে কত তারাতাড়ি পালটে ফেলল দেখুন!
~ না বউমনি। হয়ত আমি বাইরে থেকে শুধরে গেছি কিন্তু ভেতরে সেই মানুষ টাই আছি যা দেখে আব্বু পর্যন্ত ভয়ে কাঁপে। আমি একটু অফিস থেকে ঘুরে আসি। ফিরে এসে লাঞ্চ করব।

অর্নীল নিজের ঘরে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে অফিসে যাবে বলে। তখন অর্নীলের আম্মু শিশিরকে বলছিলো,
~ জানো তো বউমা অর্নীল এতটা ডেস্পারেট যা দেখে ওর আব্বু পর্যন্ত ভয় পেতো। গতকাল রাত্রে ছেলের আচরণে ওর বাবা পর্যন্ত খুশি হয়ে আমার সাথে কথা বলেছে। তিনি বলছিলেন অর্নীল নাকি পালটে গেছে। আল্লাহ না করুক আগের অর্নীলকে যদি কোনোদিন দেখতে পাই তবে সেইদিন যে আরুশ আর তোমার বাবার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। (অর্নীলের আম্মু)

~ চিন্তা করবেন না মা। দেখবেন অর্নীল ঠিকই পালটে যাবে। মিমের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে হয়না? (শিশির)
~ তা যা বলেছো। কিন্তু অর্নীলের ভাবগতিই তো বুঝতে পারছিনা আমি। ও কি সত্যিই মিমকে ভালবাসে? (অর্নীলের আম্মু)
~ বাসে মা। নয়ত এত স্যাক্রিফাইস করত মিমের জন্য?
~ কিন্তু বউমা আমার ভয়টা যে অন্য জায়গায়।
~ কি ভয় মা? (কাজ থামিয়ে শিশির)
~ ওদের বিপরীতে কিছু করে ফেললে যদি অর্নীল রিয়েক্ট করে?
~ করবেনা মা। নিশ্চিন্ত থাকুন। বাকিটা আমি দেখছি।

অর্নীল অফিসে চলে যায়। বলে যায় বাসায় এসে লাঞ্চ করবে। ওইদিকে মিম চাঁদপুর থেকে ফেরার পরই একা একা ঘরে বসে আছে। আর্ম চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে আর হুমায়ুন আহমেদের হিমু~ রুপা পড়ছে। বাইরে তখন মেঘ করেছে। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। বাইরের আকাশ দেখে মিম বারান্দার ছোট্ট দোলনাটায় গিয়ে বসলো। চুলের ব্যান্ড খুলে দিয়ে চশমাটা টবের উপর রাখলো মিম। এরপর নিশ্চিন্ত মনে আকাশ দেখছে। তখনি মিমের বাপি এসে মিমের খোঁজ করছে। এসে দেখে মিম নিশ্চিন্ত মনে বারান্দায় বসে আছে।
~ মামনি? (মিমের মাথায় হাত রেখে বাপি)
~ হ্যা বাপি বলো।
~ সেই কখন থেকে দেখছি তুমি অন্যমনস্ক। কি হয়েছে? বাপিকে কি বলা যাবে? (মোড়ার উপর বসে বাপি)
~ কেনো যাবেনা? (টি শার্ট টা ঠিক করে মিম)

~ তাহলে বলে ফেলো কি হয়েছে তোমার? আর মামনি তুমি ব্ল্যাক টি শার্ট পরেছো? এইটা না তোমার সবচেয়ে অপছন্দের রঙ? (অবাক হয়ে মিমের বাপি)
~ ওইদিন তোমার কথায় ব্ল্যাক পরেছিলাম বাপি। শৈলি বলেছিলো ভালো লাগছে। তাছাড়া আরো একটা কারণ আছে বাপি।
~ কি?
~ একটা কথা জিজ্ঞেস করব বাপি? (দোলনা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মিম)
~ হ্যা বলো।
~ আমি যদি কাউকে ভালবাসি তুমি কি মেনে নিবে? (বারান্দার থাই খুলে দিয়ে মিম)
~ কেনো মেনে নিব না? অবশ্যই মেনে নিব। ছেলেটা কে মামনি? (এক্সাইটমেন্টে মিমের বাপি বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়)
~ বাপি আমি মনে হয় অর্নীলকে ভালবাসি। কেনো যেনো এলোমেলো লাগে আমার ওর কাছে গেলে। গত কালকে এইটা আমি স্ট্রংলি ফিল করেছি।

~ ইউরেকা! মামনি তুমি বিশ্বাস কর অর্নীলকে জামাই বানানোর জন্য আমরা দুই পরিবার রাজি৷ কিন্তু মিয়া, বিবিই কিছু বলছিলো না তাই এগোইনি। আজকেই আমি অর্নীলের আব্বুকে কল করব। (মিমকে হাগ করে বাপি)
~ কিন্তু বাপি অর্নীল? ও আমায় ভালবাসে কি না জানিনা তো।

~ অবশ্যই বাসে। অর্নীলকে বলে দাও তোমার ভালবাসার কথা। এরপর আগামী সপ্তাহতেই বিয়ে।
~ না বাপি। আমি ওর মুখ থেকে শুনবো। আগামী সপ্তাহে ওর জন্মদিন। সাতাশ বছরে পরবে ও।
~ তাহলে সেই পার্টিতেই তোমার মনের কথা ওরে বলে দিও।
~ দেখি। আচ্ছা বাপি যদি অর্নীল না বলে?

~ কেনো এমনটা ভাবছো? বি পজিটিভ মামনি। আচ্ছা আসছি আমি।
মিমের বাপি মিমকে না জানিয়েই অর্নীলের আব্বু আম্মুকে জানায় মিমের কথা। সবাই খুশি হয় কিন্তু ভয় অর্নীলকে নিয়ে। ও কি বলে এখন কে জানে?

অর্নীলের জন্মদিনের সন্ধ্যায়,
~ তুমি কখন আসবা? অলমোস্ট সবাই চলে এসেছে তো! (ব্লেজার পরতে পরতে অর্নীল ফোনে মিমের সাথে কথা বলছে)
~ আসছি৷ রেডি হওয়া শেষ। বের হব এখন। (জুতা পরতে পরতে মিম)
~ আংকেল আসছে তো?
~ হ্যা।
~ আচ্ছা তো সাবধানে এসো। রাখছি এখন।
~ ওকে।

মিম ফোন হাতে নিয়ে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। বাপি ড্রইংরুমে বসে মিমের জন্য ওয়েট করছে। মিম নিচে নামার পর বাপিকে বলছে,
~ দেখো তো কেমন লাগছে? (গাউনটা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিম)
~ অনেক সুন্দর লাগছে। হেয়ার স্টাইলটাও ইউনিক হয়েছে। নজর না লাগ যায়ে!
~ থ্যাংক ইউ। অর্নীলের নজর লাগলেই হবে বাপি।
~ লাগবে মামনি। বের হই এখন?

~ শিওর।
অর্নীলের বন্ধুরা সবাই অর্নীলের সাথে গল্প করছে। শিশির এখনো সাজুগুজু করছে। অর্নীলের মা গহনা নিয়ে ব্যস্ত আর আরুশ ব্যস্ত খাবার দাবারের দিক নিয়ে। আর অর্নীল অপেক্ষা করছে মিম কখন আসবে। অর্নীল সেইদিন কফি কালার শার্ট আর শর্ট ব্লেজার পরেছিলো আর মিম হোয়াইট গাউন। বাড়ির সবাই যখন গার্ডেনে আসে তখন অর্নীল মিমের জন্য অপেক্ষা করছে। মিমকে ফোন দিতে যাবে তখনি মিমের গাড়ি এসে থামে বাড়ির বাইরে। মিমকে শিশির আর আরুশ এগিয়ে আনতে যায়।

দূর থেকে অর্নীল মিমকে দেখছে। অন্যদিনের তুলনায় আজ বেশ ভালই লাগছে। বড় কথা আজ মেয়ে মেয়ে লাগছে। মিম আসার পর অর্নীল কেক কাটে আর সবার আগে আম্মুকে কেক খাইয়ে দেয়, এরপর মিমকে। মিম অর্নীলের জন্য একটা ফুলের বুকে আর চিরকুটে ভরা একটা বক্স নিয়ে এসেছে গিফট পেপারে মুড়ে। আর বাহ্যিক গিফট ডায়মন্ডের রিং। অর্নীল গিফট গুলো হাতে নিয়ে শিশিরের হাতে দিয়ে দেয়। কেক কাটার পর অর্নীল মিমের সাথে কথা বলছে আর তখনি অর্নীলের আব্বু এনাউন্স করে মিম আর অর্নীলের এনগেজমেন্ট। দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়ে। অর্নীল দ্রুত ওর আব্বুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
~ কি হচ্ছে আব্বু? এইসব কি উলটাপালটা বলছো?

~ এইটা তোমার জন্য সারপ্রাইজ ছিল অর্নীল। আজকেই মিমের সাথে তোমার এনগেজমেন্ট। বড় বউমা রিং দুটো নিয়ে এসো। (অর্নীলের আব্বু)
~ এসব কি হচ্ছে আম্মু? মিমের সাথে আমার এনগেজমেন্ট মানে? আমাকে কেউ একবার না জানিয়েই এইসব কেন করলা?
~ তোর জন্য এইটা সারপ্রাইজ ছিলো। যাইহোক মিমের হাতে আংটি পরা, ছোট বউমা এইদিকে এসো। (মিমকে ডেকে অর্নীলের আম্মু)
~ ছোট বউমা? প্রাঙ্ক করছো নাকি আমার সাথে?
~ বলেছিনা সারপ্রাইজ।

সবার সামনে আরুশ, অর্নীলের আব্বু, শিশির সবাই অর্নীলকে বাধ্য করলো মিমের হাতে রিং পড়াতে। মিম ও হাসিমুখে অর্নীলের হাতে রিং পড়ায় এইটা ভেবে যে অর্নীল ও ওকে ভালবাসে। আংটি পরিয়ে অর্নীল বাসা থেকেই বেরিয়ে যায়। মিম, অর্নীলের বন্ধুরা, অর্নীলের পরিবার কেউই বুঝলো না এইভাবে কেনো অর্নীল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মিম সাথে সাথে অর্নীলকে কল করে কিন্তু অর্নীল রিসিভ করেনা। রাত বারোটা পর্যন্ত মিম ওয়েট করে অর্নীলের জন্য কিন্তু অর্নীল আসেনা। শেষে মিম আর বাপি বাসা
য় চলে আসে। আর অর্নীলের পুরো পরিবার চিন্তায় পরে যায়।

ঘড়ির কাটায় তখন রাত সাড়ে তিনটা। অর্নীল ব্লেজার হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে। ড্রইংরুমে সবাই বসা। অর্নীল সোজা উপরে উঠতে যাবে তখন অর্নীলের আব্বু বলে,
~ তখন এইভাবে বেরিয়ে যাওয়ার মানে কি ছিল?

~ আমাকে না জানিয়ে এনগেজমেন্ট এনাউন্স করার কি ছিলো আব্বু? চিরটাকাল তোমাদের ইচ্ছের বলি হতে হবে আমাকে তাইনা? অর্নীল তুই নয় বছর বয়সে বাইরে যাবি পড়াশোনার জন্য, গেলাম। অর্নীল প্রতিটা এক্সামে ফার্স্ট হবি তুই, হলাম। অর্নীল তুই একবারে পড়াশোনা শেষ করে দেশে আসবি, আসলাম। অর্নীল তুই বিজনেস জয়েন করবি, করলাম। আরে আব্বু আর কত? কোনোদিন জিজ্ঞেস করেছো অর্নীল তুই কি চাস? আজকে বললা অর্নীল তোর এনগেজমেন্ট, সেইটাও মানলাম শুধু মাত্র তোমাদের মুখ চেয়ে। এতগুলো মানুষের সামনে তোমার ফেইস লস করতে চাইনি আমি আব্বু তাই চলে গিয়েছিলাম। কেমন মেয়ে আমার চাই, কাকে চাই সেইসব না জেনেই মিম আমার বউ হয়ে গেলো? বন্ধুত্ব একটা আর স্বামী স্ত্রী আরেকটা আব্বু। কেনো বুঝো না? (শো পিস আছাড় মেরে ভেঙে অর্নীল)

~ তুই ভালবাসিস না মিমকে? (ধপাস করে সোফায় বসে অর্নীলের আম্মু)
~ হাহাহাহাহা! অর্নীল শাইমাকে ভালবাসতো মা। ওর পর আর কোনো মেয়েকে ভালবাসবে কিভাবে?
~ শাইমা হিন্দু মেয়ে ছিলো তাছাড়া ওর বিয়েও হয়ে গেছে। (অর্নীলের আব্বু)
~ তার মানে তো এই নয় যে আমাকেও বিয়ে করতে হবে! আব্বু এইবারো তোমরা ভুল, এইবারো ভুল। আমার জীবনটাতে যা একটু আলো জ্বলছিলো তা নিভিয়ে দিলে তোমরা। হয়ত আমি তোমাদের জন্য কার্স ছিলাম তাই এরকম করতে পেরেছো আমার সাথে। ছোটবেলা থেকে বই আর ফেমিলি ছাড়া কিছুই চিনিনি। আজও সেইটাই করব আব্বু। মেনে নিলাম তোমাদের সিদ্ধান্ত। বিরক্ত করনা আমায় আর।

অর্নীল নিজের ঘরে যেতে নেয় তখম অর্নীলের আব্বু বলে,
~ অর্নীল এভাবে কেন বলছো? কোনো রাস্তার মেয়েকে তো তোমার জন্য ধরে আনিনি। সবার সামনে আজ এনাউন্স হয়ে গেছে তোমাদের এনগেজমেন্ট। একবার যদি তুমি বেঁকে বসো তাহলে কোথায় যাবে আমার মান সম্মান ভেবেছো?
~ বিয়ে কবে সেইটাও আমায় জানানোর দরকার নেই আব্বু। বিয়ের দিন সকালে বলো যে অর্নীল আজ তোর বিয়ে। বিয়ে করতে চলে যাব, নো প্রবলেম। (অর্নীল)

~ অর্নীল (অর্নীলকে ধমক দিয়ে আব্বু)
~ ইনাআয়ায়ায়ায়ায়াফ আব্বু, ইনাফ। (অনেক জোরে চেঁচিয়ে অর্নীল)
অর্নীলের চেঁচানো শুনে শিশির আৎকে উঠে। শিশির সোজা অর্নীলের মায়ের কাঁধ চেপে ধরে। আরুশ ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

~ আমার এত রেপুটেশন, মান সম্মান এইভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? (চশমা খুলে অর্নীলের আব্বু)
~ না আব্বু হবেনা। ভাই তো রাজি হলো মাঝখানে ওর ইচ্ছেগুলো মরে গেলো। ছোট ছেলে, ছোট ছেলে বলতেনা আব্বু? এইত তোমার ছোট ছেলে। আজকে ভাইয়ের আচরণে খুব খুশি হয়েছি আমি আব্বু। ছোট বেলা থেকে ও যেন তোমার স্বপ্ন পূরনের হাতিয়ার ছিলো। কেনো আব্বু? একটু পার্সোনাল স্পেস সবাই ই চায়। যাইহোক ঘুমাতে যাও। (আরুশ)
আরুশ আব্বুকে কথাগুলো বলেই ঘরে চলে আসে। আরুশের পিছু পিছু শিশির ও যায়। মিস্টার চৌধুরী এখন ভাবছেন।

~ কিছু ভেবো না। ভুল তো হয়েই গিয়েছে। তাছাড়া অর্নীল তোমার মান সম্মান নষ্ট করবেনা। সেইটা যদি ওর মোটিভ থাকতো তাহলে অনেক আগেই তা করে ফেলতো। আমি শুধু ভাবছি মেয়েটার কি হবে? শান্তি পাবে তো ও? (মিসেস চৌধুরী)
~ রেনু আমার ভাবনা এখানেই। তোমার ছেলেকে চেনো না তুমি? ও মিমকে ছাড়বেনা। অথচ দেখো মেয়েটার কোনো দোষ ই নেই। কি করব আমি এখন? বলো? ওদের জীবন নষ্ট করব নাকি আমার মান সম্মান বাঁচাবো?
~ একটা কথা বলি?

~ বলো
~ আগামী তিনদিনের মধ্যে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলো। যাকে যাকে সম্ভব নিমন্ত্রণ করো। তোমার ছেলের মতামত ঘুরে গেলে কিন্তু তোমাকে বেগ পেতে হবে। আর বিয়ের পর আমি মিমকে বুঝিয়ে বলব। ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে যদি একবার বিয়েটা হয়।
~ আরুশকে আর বড় বৌমাকে ডাকো। (অর্নীলের আব্বু)

আরুশ আর শিশির আসার পর অর্নীলের আব্বু সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়ে তিনদিন পরেই হবে। ভোর পাঁচটায় মিমের বাপিকে খবরটা দিলেন মিস্টার চৌধুরী। এই তিনদিনে যতটা সম্ভব ততটুকুই করার জন্য অনুরোধ জানালেন মিস্টার চৌধুরী মিমের বাপিকে। মিম তো মহাখুশি। লজ্জায় ও আর অর্নীলকে ফোন দেয়না। তিনদিন পর বিয়ের আসরেই দেখা হবে। অর্নীল ও মিমকে কল করেনি। পরেরদিন সকাল থেকেই দুই বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছে। অর্নীলের স্বপ্ন ছিলো ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এর। কিন্তু শাইমা চলে যাওয়ার পর সেইটা আর হলো না। তাই বিয়ের ভাবনা অর্নীল বাদই দিয়ে দিয়েছিলো। গায়ে হলুদ, মেহেন্দি এইসব কিছুই হলো না মিম আর অর্নীলের বিয়েতে। বিয়ের দিন অর্নীল শুধু কাগজ ছিঁড়েছে আর ফ্লোরে ফেলেছে। একে একে ওর স্বপ্নগুলো ভেঙে যাচ্ছে।
বিয়ের দিন দুপুর সাড়ে বারোটায়,
~ অর্নীল শেরওয়ানি আর চুরিদারটা পরে নে।
~ বিয়েটা তাহলে তোমরা দিচ্ছোই? (কাগজ মুড়তে মুড়তে অর্নীল)
~ এছাড়া আর কোনো উপায় নাই ভাই। শিশির ও কিন্তু আমার অপছন্দের ছিল। মানিয়ে নিয়েছিনা আমি? তাহলে তুই পারবিনা?

~ যাও আমি আসছি।
অর্নীল কালো শেরওয়ানি আর কালো চুরিদার পরলো। শিশির অর্নীলের জন্য এইটাই পছন্দ করলো কারণ সাদা কালো ছাড়া অর্নীল জামাকাপড় পরেনা।
~ মিম তুমি আমার গুড ফ্রেন্ড ছিলে। আমাদের ফ্রেন্ডশিপ টার ও পতন ঘটতে যাচ্ছে আজ। আমি এমন কিছু ভাবিনি মিম। আমি চাইনি তোমায় কষ্ট দিতে। কিন্তু কি করব বলো তোমাকে তো পারবনা বউয়ের জায়গা দিতে। কথা হবেনা তোমার সাথে আমার। প্রেমের শহরটায় ও যাওয়া হলো না তোমায় নিয়ে। তোমার মতো ফ্রেন্ড পাওয়া যায়না। কিন্তু আমার বউ হওয়ার যোগ্য মেয়ে তো তুমি ছিলেনা! (মনে মনে অর্নীল)

পর্ব ৮

দুপুর একটায় বরযাত্রী রেডি করছে আরুশ আর শিশির মিলে। অর্নীলের সাদা প্রাইভেট কারটা শুধুমাত্র কালো গোলাপ দিয়ে সাজানো হয়েছে। অর্নীলের জীবনে কালো ছাড়া আর কিছু নেই মনে হয়। কালো গায়ের রঙটা হলেও ভালো হতো মমে হয় কিন্তু ফর্সা হয়ে জন্মেছে এখন আর কিছু করার নাই। আরুশ অর্নীলের শেরওয়ানিতে ব্রোঞ্জ লাগিয়ে দিচ্ছে আর অর্নীল মুড অফ করে বসে আছে। মিমের দেওয়া বার্থডে গিফট গুলো ছুঁয়েও দেখেনি অর্নীল। চিরকুটের বক্সটা স্টোর রুমে পরে আছে আর রিংটা কাবার্ডের ভেতরে।

অর্নীলকে রেডি করানোর পর সবাই বেরিয়ে যায়। শিশির আর আরুশ যায় অর্নীলের সাথে, মা বাবা আরেক গাড়িতে আর বাকিরা অন্যান্য গাড়িতে। অর্নীল চেঁচাচ্ছে না কারণ বাবার সম্মান যাবে। যা হওয়ার আজকে ফিরে এসে হবে। মিমের বাড়িতে যাওয়ার পর ডেকোরেশন দেখে কেউই অবাক হয়নি কারণ ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মিম রায়হানের বিয়ে বলে কথা। ডেকোরেশন টাও ওইরকম ই হবে, সময় যতই কম থাকুক না কেনো। মিম শাড়ি পরেনি কখনো তাই পরতেও জানেনা। তাই বিয়ের দিন মিম গর্জিয়াস ল্যাহেঙ্গা পরলো মিষ্টি রঙের। যদিও ল্যাহেঙ্গাটা শিশিরের পছন্দের তাও দারুণ মানিয়েছে মিমকে। বিয়ের সাজে মিমকে চেনাই যাচ্ছেনা। শিশির প্রথম মিমকে দেখতে গেলো। অর্নীল মিমের বাসার ড্রইংরুমে বসে আছে। ভীষণ বিরক্ত অর্নীল। কারো সাথেই কথা বলছেনা ও।

যখন বিয়ে পরানোর জন্য মিমকে অর্নীলের পাশে বসানো হলো মনে হলো অর্নীল কারেন্টে শক খেয়েছে। একটু পাশ কেটে বসলো অর্নীল। কিন্তু মিমের চোখ এইটা এড়ালো না। মিম ভেবেছে সবাই সামনে তাই হয়ত লজ্জা পেয়েছে। বিয়ের সময় অর্নীলের মাথায় আরুশ টুপি পরাতে গেলে অর্নীল টুপিটা ছুড়ে ফেলে দেয়। তখন আর আরুশ জোর করে অর্নীলকে টুপি পরাতে যায়নি। কবুল অর্নীল বলছিলোই না। কবুল বলার সময় রাগে অর্নীলের চোখ, মুখ লাল হয়ে গেছে। আরুশের কথা শুনে কিছুক্ষণ পর অর্নীল কবুল বলল। এরপর মিম কবুল বলার পর রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন শেষে মিম বাপিকে সালাম জানায় এরপর শ্বশুর, শ্বাশুরিকে সালাম করে। অর্নীল আর এক মিনিট ও এখানে থাকতে চাইছে না।

কোনো খাবার ই অর্নীল খাবেনা। মিম ও সারাদিন কিছুই খায়নি। সারাদিন সাজগোজ করতে করতেই কেটে গেছে। বিয়ের রেশ আর অতিথির সমাগম কাটতে কাটতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে যায়। অর্নীল চুপ করে সোফার উপরেই বসে ছিলো। সেই জায়গা থেকে নড়ছেই না। অর্নীলের ব্যবহার কেমন যেন লাগছে মিমের কাছে। মিম দুর্বল হয়ে গেছে সারাদিন না খেয়ে থেকে। পরে শিশির মিমকে কিছু খাবার খাওয়ায়। সাড়ে সাতটার পর মিমকে অর্নীলের বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অর্নীলের ফেমিলি তাড়া দিচ্ছে। বাপি তো কিছুতেই মেয়েকে ছাড়বেনা আর মেয়েও বাবাকে একলা রেখে যাবেনা।

মিম তো হাউমাউ করে কাঁদছিলো৷ মিমের বাপিকে কে দেখবে? পরে মিম ওর কাজিনকে রেখে যায় বাপির দেখাশোনা করার জন্য আর বুয়াকে স্ট্রিক্টলি বলে বাপির খোঁজ রাখার জন্য। অর্নীল আগে থেকেই গাড়িতে উঠে বসে আছে। অর্নীল জানালার পাশে আর মিম অর্নীলের সাথে। আর ড্রাইভারের সামনে আরুশ আর মিমের সাইডে বউমনি। দেড় ঘণ্টার জার্নি করে মিম এলো তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নামার পর অর্নীল সোজা বাসায় চলে যেতে নেয় আর আম্মু অর্নীলকে বলে,
~ অর্নীল বিয়ের দিন বউকে কোলে করে বাসায় ঢুকাতে হয়। তুই কোথায় যাচ্ছিস?

~ আমার দায়িত্ব ছিল বিয়ে করা। এরপর আমি কি করব না করব সেইটা আমার উপর ছেড়ে দাও, ওকেহ!
ওতটুকু বলেই অর্নীল ভেতরে চলে আসে। অর্নীলের কথা শুনে মিম খুব কষ্ট পায়। পরে মিম একা একাই বাসায় আসে। শিশির মিমকে নিয়ে ওর ঘরে বসায়। এসির পাওয়ার টা বাড়িয়ে দিয়ে শিশির মিমকে বলে,
~ অর্নীলের কথায় কষ্ট পেয়ো না। ও এমনি।

~ ও এমন ছিল না মিসেস চৌধুরী।
~ এখনো মিসেস চৌধুরী বলবা?
~ তাহলে কি বলব?
~ দিভাই বলবা।
~ আচ্ছা দিভাই।

মিম ফ্রেশ হয়ে ল্যাহেঙ্গা পালটে শাড়ি পরলো। শিশির মিমকে শাড়ি পরিয়ে দিলো। ওইদিকে আরুশ ডেকোরেশনের লোককে দিয়ে অর্নীলের বাসর ঘর সাজাচ্ছে। অর্নীল আটকাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর অর্নীল গোসল করে শার্ট আর প্যান্ট পরে নিচে আসে। অর্নীলকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও কোথাও বের হবে। অর্নীলের আম্মু অর্নীলকে থামায় আর আরুশ ও দৌড়ে নিচে আসে।
~ অর্নীল কোথায় যাচ্ছিস তুই? (আম্মু)

~ ফ্রেন্ডদের সাথে পার্টিতে। (কথাটা ত্যারা ভাবেই বলল অর্নীল)
~ পার্টতে মানে? আজকে তোমার বিয়ে হয়েছে। আজকে পার্টিতে যাচ্ছো মানে কি? (আব্বু)
~ আজকে দুপুর পর্যন্ত অর্নীল চৌধুরী তোমাদের ছেলে ছিলো তাই তোমাদের কথা শুনেছে। আজ থেকে অর্নীলের জীবন আলাদা আর তোমরাও অর্নীলের কেউ নও, ওকেহ? আজ থেকে আমি আমার মতো চলব। কেউ বাঁধা দিবানা আমাকে। আমার স্বচিত্র তোমরা দেখতে চাইছিলে না? দেখো।

~ অর্নীল? (অর্নীলকে খুব জোরে ধমক দিয়ে অর্নীলের বাবা)
~ আস্তে আব্বু, এত তারাতারি হাইপার হয়ো না। কেবল তো শুরু।
ড্রইংরুমে চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে মিম আর শিশির বাইরে এলো। মিম অর্নীলকে ফর্মাল ড্রেসে দেখে ঘাবড়ে যায়। মিম সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে অর্নীলের সামনে দাঁড়ায়। অর্নীল তাঁকায় না মিমের দিকে।
~ তুমি কি কোথাও যাচ্ছো? (মিম)

~ সেইটা কি তোমায় বলে যেতে হবে মিম? (মিমের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ এইভাবে কেনো কথা বলছো তুমি? আজকে আমাদের বিয়ে হয়েছে। তুমি আজই বাইরে যাচ্ছো?
~ এই ন্যাকা বিয়ে আমার সামনে উচ্চারণ করো না তো। তুমি না আমার বন্ধু ছিলে? বউ হতে কে বলেছিলো? ভেবে দেখেছো একবারো তোমার যোগ্যতা আছে কি না অর্নীল চৌধুরীর বউ হওয়ার?

~ চৌধুরী? কি বলছো তুমি এইসব? তুমি আজ আমার যোগ্যতা জানতে চাইছো? (আস্তে করে বলল মিম)
~ হ্যা চাইছি আর ক্লিয়ারলি বলছি অর্নীল চৌধুরীর যোগ্য বউ তুমি নও। নিজেকে আমার বউ দাবী করনা। আমার দেরি হচ্ছে বের হব আমি।

অর্নীল চলে যায় আর অর্নীলের‍ যাওয়ার দিকে তাঁকিয়ে থাকে সবাই। মিমের মাথা ঘুরছে। ওর ভালবাসার মানুষ কি বলছে এসব? মিম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। শিশির আর অর্নীলের আম্মু এসে মিমকে ধরে। আরুশ আর অর্নীলের বাবা সম্পূর্ণ ভেঙে পরে। অর্নীলের বাবা কপালে হাত দিয়ে কাঁদছেন, ছেলের জন্যে নয়, বউমার জন্য। শিশিরকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কান্না করে মিম। অর্নীলের আম্মু মিমকে সব বলছে যে অর্নীল এই বিয়েতে রাজি ছিলো না। অর্নীলের আম্মু শেষে মিমকে একটাই কথা বলে,
~ বউমা কষ্ট পেয়ো না। তুমি আমার ছেলেকে তোমার করে নিও। চেষ্টা কর মা। হয়ত তুমি পারবেও।

মিম বিয়ের জন্য পার্ফেক্ট ছেলে চেয়েছিলো। মিমের প্রধান চাওয়া ছিল ভালবাসা। আজ সেই ভালবাসা থেকেই মিম বঞ্চিত। মিম স্বামীর টাকা পয়সা চায়নি, স্বামীর থেকে ঐশ্বর্য চায়নি শুধু ভালবাসা ই চেয়েছিলো। কিন্তু ঘটলো তার উলটা। সবকিছুই আছে শুধু ভালবাসা নেই। এই কষ্টে মিম আরো জোরে চিৎকার করে কাঁদছে। রাত সাড়ে এগারোটায় শিশির মিমকে নিয়ে অর্নীলের সাজানো ঘরে যায়। মিমের চোখ ফুলে গেছে, নাক লাল টকটকে হয়ে গেছে কাঁদার ফলে। অসম্ভব মায়াবতী লাগছে এখন মিমকে দেখে। শিশিরের ভীষণ মায়া হচ্ছে মিমের জন্য।
~ আজ থেকে তুমি আমার জা নও, আমার একমাত্র বোন। তোমার সব ভাল মন্দ চাইলেই আমায় শেয়ার করতে পারো। বন্ধু ভাবতে পারো আমাকে। জানি আজ তোমায় এই সাজানো ঘরে একা ঘুমাতে হবে। কষ্ট হবে ভীষণ কিন্তু মিম তুমি না স্ট্রং গার্ল? পারবেনা অর্নীলকে তোমার ভালবাসায় বেঁধে ফেলতে?

~ আমি জানিনা দিভাই। আমি আমার এমন জীবন কখনো আশা করিনি। আমি ভালবাসা চেয়েছিলাম, আভিজাত্য না। এই বিছানায় আমি কোনোদিন ঘুমাতে পারবনা, আসবেনা ঘুম।
~ অর্নীল তো রাতে বাইরে থাকেনা। হয়ত আসবে, জানিনা। তুমি ঘুমানোর ট্রাই কর প্লিজ। আমি শ্যামলীকে (কাজের মেয়ে) দিয়ে হেলথ ড্রিংক পাঠাচ্ছি তোমার জন্য। খেয়ে নিও।
~ না দিভাই এখন আর কিছু খাব না।

~ সারাদিন তো কিছুই খাও নি। সেই দুপুরে একটু খাবার খেয়েছিলে। অসুস্থ হয়ে যাবা তো পরে।
~ সুস্থ থেকেও লাভ নেই দিভাই। তুমি গিয়ে শুয়ে পরো। আমি শুয়ে পরছি।
~ আর কেঁদো না হ্যা? (মিমের গালে হাত রেখে শিশির)
~ হুম।

শিশির চলে যাওয়ার পর মিম দরজাটা চাপিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরে। রাত তখন প্রায় বারোটা। মিম সিলিং এর দিকে তাঁকিয়ে আছে আর ঘরের ফুলগুলো দেখছে। সাদা বেডে কালো গোলাপ। বেশ মানিয়েছে। মিম এপাশ ওপাশ করছে কিন্তু ঘুম আসছেনা। বাপির কথা ভীষণ মনে পরছে। কিন্তু এখন বাপিকে ফোন দিলে বাপি সন্দেহ করবে। বাসরঘরে একা ঘুমাতে হবে এইটা মিমের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। কিন্তু এখন এইটাই বাস্তব। চোখের পানি ফেলতে না চাইলেও পরছে। অসহ্য লাগছে মিমের। মিমের এখন প্রথমে জানতে হবে অর্নীল কেনো ওকে অযোগ্য বলল? কিসে কম ছিলো মিম? ধন দৌলত, রুপ, গুণ সব দিক থেকেই তো পার্ফেক্ট ছিলো।

ঘড়ির কাটায় রাত পৌণে তিনটা। মিম খাটের এক কোণায় শুয়ে ঘুমিয়ে গেছে। হাতের নেইলপলিশ গুলোতে ল্যাম্পশেডের আলো পরে চিকচিক করছে। অর্নীল তখন ঘরে ঢুকে। মিমকে এখানে দেখে ও চমকেই গেলো। অর্নীল ঘরের লাইট অন করার পর মিম জেগে গেলো। অর্নীলকে দেখে মিম দ্রুত বিছানা থেকে উঠে শাড়ির আচল কাঁধে ঝুলালো। এতে মিমের কোমড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অর্নীল ও দেখলো বাট হু কেয়ারস? অর্নীল কাবার্ড থেকে টি শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে ঢুকলো। ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসলো।
~ তুমি খাটে ঘুমাও। আমি বসছি। (মিম)

~ দরকার নেই। তুমিই উপরে ঘুমাও। আমি এখানে শুয়ে পরছি। (সোফায় শুয়ে অর্নীল)
মিম আর কথা না বাড়িয়ে লাইট অফ করে গিয়ে শুয়ে পরে। বেড সাইড ল্যাম্পশেড গুলোও অফ করে দেয় মিম। পুরো ঘর অন্ধকার। মিম বালিশ খামচে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই মিম ঘুমিয়ে যায়।
সকালে,
অর্নীল কুশন বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। জানালা দিয়ে আলো এসে সোজা মিমের মুখে পরলো। মিমের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম থেকে উঠে মিম দুইবার অর্নীলের দিকে তাঁকায়। এরপর একটু নিচু হয়ে মিম অর্নীলের চুলে হাত দেয়। কিন্তু অর্নীল ঘুমে বিভোর বলে বুঝতে পারেনা। মিমের ইচ্ছে করছিলো অর্নীলের কপালটায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে কিন্তু অর্নীল তো মিমকে সেই অধিকারটাই দেয়নি। অযোগ্য বলে দূরে সরিয়ে রেখেছে। চুল ঠিক করে মিম নিচে যায়। বাড়ির সবকিছু গোছানো হচ্ছে, হয়ত বউভাতের আয়োজন চলছে। মিমকে নিচে নামতে দেখে শিশির এগিয়ে যায় মিমের সামনে।
~ অর্নীল বাসায় এসেছিলো রাতে? (শিশির)
~ হ্যা এসেছিলো।
~ কথা হয়েছে?

মিম মাথা নাড়িয়ে না করে। আরুশ গিয়ে অর্নীলকে ডেকে তুলে টেনে নিচে নিয়ে আসে।
~ আজকের দিনে বর বউকে একসাথে ব্রেকফাস্ট করতে হয় ভাই। (আরুশ)
~ তো আমি কি করব? তুমি আমায় তুলে নিয়ে এলে কেনো? (বিরক্ত হয়ে অর্নীল)
~ ভাইয়া ছেড়ে দিন ওকে। চৌধুরী তুমি নিজের ঘরে যাও। (মিষ্টি হাসি দিয়ে মিম)
অর্নীল এই প্রথম মিমকে লক্ষ্য করলো। মিম শাড়ি পরেছে! ভাল লাগলেও কেনো যেনো অর্নীল চোখ ফিরিয়ে নিলো নিজের বউয়ের থেকে।

~ তোমায় আজকে রিসিপশনে থাকতে হবে অর্নীল। (আরুশ)
~ সরি ভাইয়া। আমি বের হব একটু পর।
~ অর্নীল সবকিছুতে জেদ করনা, বারাবারি করনা। রিসিপশনে তোমার থাকাটা জরুরি। এতে আমাদের রেপুটেশন জড়িয়ে আছে। (আব্বু)
~ তোমার রেপুটেশন রক্ষার দায় শেষ আমার আব্বু। আসছি।
অর্নীল ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়। বের হওয়ার জন্য অর্নীল প্রস্তুতি নিচ্ছে। মিম অর্নীলের জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে তখন ঘরে যায়।
~ খেয়ে বের হও।
~ দ্যাটস নান অফ ইউর বিজনেস। খাবারটা নিয়ে চলে যাও। (ঘড়ি পরতে পরতে অর্নীল)
~ আচ্ছা আমি কি এমন অন্যায় করে ফেলেছি তোমার কাছে? এভাবে শাস্তি কেন দিচ্ছো?
~ তোমার সবচেয়ে বড় অন্যায় আমায় বিয়ে করা। বন্ধু ছিলে আমার, বউ হওয়ার স্বপ্ন কেন দেখলে?
~ ভালবাসি তাই।

পর্ব ৯

অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করলো,
~ আমার বন্ধু ছিলে, স্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন কেন দেখলে?
~ ভালবাসি তাই।
~ কিহ? (হাল্কা হেসে অর্নীল) আমায় ভালবাসো? কোনোদিন তো শুনিনি মিডেল ক্লাস ছেলে ছাড়া আর কোনো ধনাঢ্য পরিবারের ছেলেকে ভালবাসবে। তবে আমাকে ভালবাসো মানে? (শার্টের কলার ভাঙতে ভাঙতে অর্নীল)
~ দেখো ভালবাসা কখন আর কিভাবে হয়ে যায় তা হয়ত কেউ জানেনা। আমিও তোমায় ভালবেসে ফেলেছি তাই আমিও জানিনা কেনো আর কিভাবে বেসেছি। যাইহোক খেয়ে বের হয়ো।

অর্নীল কিছু বলছেনা দেখে মিম বলছে,
~ বন্ধু হিসেবে তো তোমার যোগ্য ছিলাম। তাহলে স্ত্রী বাদ, বন্ধু হিসেবেই না হয় আমার সাথে কথা বলো। আগের মতো কথা বলি আমরা?

~ হুম।
~ তাহলে বন্ধুর কথাটা রেখে খেয়ে বাইরে যেয়ো। আর হ্যা তোমার না শুগার আছে? ওষুধ খেয়েছো?
~ না।
~ শুগারের ওষুধ টাও খেয়ে বের হয়ো। আসছি আমি।
মিম অর্নীলকে খাবার প্লেট দিয়ে নিচে চলে আসে। বউমনি মিমকে ব্রেকফাস্ট করানোর পর দ্রুত মিমকে সাজতে পাঠায়। পার্লার থেকে লোকজন আসবে। তারা আসার আগেই যেন মিম গোসল করে রেডি হয়ে থাকে। মিম তখন বলে,
~ কি দরকার এইসবের দিভাই? ও তো থাকছেনা। হয়ত বেরিয়ে গেছে এতক্ষণে। (মাথা নিচু করে মিম)
~ তোমায় তো থাকতে হবে। নিয়ম তো আছে একটা তাইনা বোন? (শিশির)
~ হুম।
শিশিরের কথামতো মিম গোসল করতে যায়। অর্নীল খেয়ে বেরিয়ে গেছে। মিম গোসল করে এসে অর্নীলের ঘরে সাজতে বসে৷ একদিনেই মিমের চোখের নিচে কালোদাগ হয়ে গেছে। কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে গায়ের রঙ।
ঘন্টাখানেক পরে,

মিমের সাজ অর্ধেক কমপ্লিট হয়েছে। চুল আচড়ানো আর শাড়ি পরানো এখনো বাকি। ঠিক তখনি অর্নীল এসে ঘরে ঢুকে। খুব বিরক্ত অর্নীল। ওর ঘরে এতগুলো মেয়ে দেখে অর্নীল রেগে যায় কিন্তু সামনে এসে যখন মিমকে দেখলো তখন আর কিছু না বলে ছাদে চলে যায়। অর্নীলের আম্মু আর বউমনি অর্নীলের পিছু পিছু ছাদে যায়।
~ অর্নীল? (অর্নীলের মা)

~ আবার কি চাও? তোমার কথামতো আমি এসেছি বাড়িতে। খুশি না তুমি? (চেঁচিয়ে অর্নীল)
~ শান্ত হ। কেন এমন করছিস তুই বাবা? মেয়েটা রুপে যেমন আচরণেও তেমন। কেন এইভাবে কষ্ট দিচ্ছিস তুই মেয়েটাকে? প্রতিটা মেয়েই তো স্বপ্ন দেখে তার স্বামী তাকে ভালবাসবে। আজকে এইদিনে তুই বাইরে থাকলে মেয়েটার মনে কি চলবে ভাবছিস?

~ আম্মু শুধু চেহারা সুন্দর বলে ওকে আমায় মেনে নিতে হবে? পাঁচমাসের মতো সময় ধরে তো ওকে চিনি। কই কোনোদিন এমন ফিল করিনি তো যে ওকে দেখে আমার শরীরে কাঁপন ধরে? কোনোদিন তো আমার ফিল ই হয়নি যে আমি ওকে ভালবাসি। আমার একান্তই চাওয়া ছিলো একটা জীবন সঙ্গীনি যার সাথে শেষ পর্যন্ত থাকা যায়। কিন্তু মিমের প্রতি আমার এমন কোনো ফিল হয়নি মা। স্রেফ বন্ধু ছিল ও আমার। এখন কি আমি জোর করে আমার মনকে মানাবো? জোর করে সুখি হব ওর সাথে? মা আমার চাওয়া ছিলো একটা সাদাসিধে মেয়ে। যার পুরোটা জুড়ে শুধু আমি থাকব আর কেউ না, কিচ্ছু না। আমারো কিছু বাহ্যিক চাওয়া ছিলো মা ওইসব মিম কোনোদিন আমায় দিতে পারবেনা সো ও আমার বন্ধু হয়েই থাক। স্ত্রী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

~ অর্নীল লাইফ পার্টনার কে নিজের মতো বানিয়ে নিয়ে হয়, রেডিমেড লাইফ পার্টনার হয়না। তোমার মতো করে তুমি মিমকে বানিয়ে নিও তাহলেই তো হলো। (বউমনি)
~ বচন শেষ? Now both of you can leave.
~ হুম যাচ্ছি। ছোট বউমা রেডি হওয়ার পর তুই রেডি হয়ে নিস। প্লিজ বাবা একটু স্বাভাবিক আচরণ করিস। অন্তত আমার মুখ চেয়ে। (অর্নীলের আম্মু)

অর্নীল ছাদে দাঁড়িয়ে গাছের পাতা কাটছে আর ভাবছে এই সাংসারিক জটিলতা থেকে ও কিভাবে বের হবে? ওইদিকে মিমের রেডি হওয়া শেষ। মিম আয়নায় নিজেকে দেখছিলো আর তখন অর্নীল জামাকাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। অর্নীলের ঘরে মিম বসে আছে। সাতমিনিট পর অর্নীল ড্রেসাপ করে বেরিয়ে আসে। মিম তখন অর্নীলকে বলে,
~ কলারটা ঠিক কর।

~ হুম করছি।
অর্নীল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে আর মিম তাঁকিয়ে আছে।
~ একটা কথা বলি চৌধুরী? (হাতে চুরি পরতে পরতে মিম)
~ হুম
~ সত্যি উত্তর দেবে তো?
~ বলো আগে
~ তুমি কি কাউকে ভালবাসতে?

এই প্রশ্নটা শুনে অর্নীল মিমের দিকে তাঁকায়। এই তাঁকানোতে কেমন যেন একটা রাগ মিশে আছে।
~ সেইটা জেনে তুমি কি করবে? বন্ধু বলে আমার ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে যাবে? (অর্নীল)
~ হয়ত একদিন তুমিই তোমার ব্যক্তিগত জীবনে আমায় ঢুকাবে। অপেক্ষা করব সেইদিনের। আমার প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেই খুঁজে নিব।
~ হ্যা তাই নাও৷
বউভাতের অনুষ্ঠান শুরু হতে আর কিছুক্ষণ দেরি। শিশির রেডি হয়ে মিমকে নিয়ে নিচে নামলো আর অর্নীল আগে থেকেই নেমে বসে আছে আর ফোন টিপছে। মিস্টার চৌধুরী সবার সাথে মিমের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন আর মিম সবাইকে সালাম দিচ্ছে। মিমকে পাঁচ ইঞ্চি হিল পরতে দেখে অর্নীল পুরো বিরক্ত। কেনো যেনো অর্নীল মেয়েদের হিল পরা দেখতে পারেনা। অর্নীল ভাবছে মিম কখন না শাড়িতে আটকে পরে যায়।

শাড়ি তো অর্ধেক হিলের নিচে চলে গেছে। মিমকে দেখে অর্নীলের ভীষণ গরম লাগছে তবে বারবার কেনো যেনো দেখতে ইচ্ছে করছে। তাই ফোনের আড়ালে অর্নীল মিমের দিকে বারবার তাঁকাচ্ছে। সবাই যখন খাবার খাওয়ার জন্য গার্ডেনের দিকে যাচ্ছে তখন মিম একটু উপরে যেতে চায় গয়না কিছু খুলে রাখার জন্য। অর্নীল তখনো ড্রইংরুমে বসে গেইম খেলছে। মিম উপরে যাওয়ার জন্য যেই পা বাড়াবে ওমনি হিলে শাড়ি পেচিয়ে পরে যায়। পরার আওয়াজ শুনে অর্নীল পিছু তাঁকায় আর দেখে মিম পরে গেছে। অর্নীল উঠে গিয়ে মিমকে ধরে উঠায়। চুরির জন্য হাতে অল্প ব্যাথা পেয়েছে আর হিলটা ভেঙে গেছে।

~ একদম উচিত কাজ হয়েছে। এই পাঁচ ইঞ্চি হিল পরার পর এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। (মিমকে উঠানোর পর অর্নীল)
~ প্রচুর ব্যাথা পেয়েছি আমি।

~ সাত ইঞ্চি হিল নেই তোমাদের? সেইগুলো পর তাহলে আর ব্যাথা পাবা না।
অর্নীলের সাথে আর তর্কে না গিয়ে ঘরে গিয়ে মিম গয়না কিছু খুলে রাখে আর শাড়িটা ঠিক করে আবার নিচে আসে। একটু পর বউমনি এসে মিমকে খাবার খাইয়ে দেয় আর অর্নীলকে বলে খেয়ে নিতে। সন্ধ্যায় সবার সাথে আলাপ দ্রুত শেষ করে মিম। মেকাপ নিয়ে থাকতে আর ভাল লাগছেনা। মিমের বাপিও চলে এসেছে ওদের নেওয়ার জন্য। মায়ের কথামতো অর্নীল আজ রাতে মিমের বাসায় থাকতে রাজি হলো কারণ অর্নীলের মা প্রমিস করেছে বিয়ের ঝামেলার পর এইসবে আর টানবেনা অর্নীলকে। অর্নীলের গাড়িতে করে দুইজন যাচ্ছে আর বাপি যাচ্ছে বাপির গাড়িতে করে। গাড়ি থেকে নামার পর পায়ের ব্যাথায় মিম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
~ মামনি তোমার পায়ে কিছু হয়েছে? (বাপি মিমকে ধরে)

~ হ্যা আংকেল। পাঁচ ইঞ্চি হিল পরার ফল এইটা। হাঁটতে পারছো না? কোলে নেবো? (অর্নীল)
অর্নীলের কথা শুনে মিমের রাগ হচ্ছে। দেখছে বউ হাঁটতে পারছেনা তার উপর জিজ্ঞেস করছে কোলে নিব নাকি!
মিমের উত্তরের অপেক্ষা না করে অর্নীল মিমকে কোলে নিলো। কোলে নিয়ে সোজা মিমের ঘরে গেলো। বাপি খুশি হয়েছে মিমের প্রতি অর্নীলের কেয়ারিং দেখে। ঘরে নিয়ে মিমকে নামিয়ে দেয় অর্নীল।
~ এইসব মেকাপ তুলো এখন৷ গরম লাগছেনা তোমার ভাই? (বিরক্ত হয়ে অর্নীল)
~ থ্যাংক ইউ।

~ কেনো?
~ এই যে বাপিকে কিছু বুঝতে দাও নি।
~ এক্সকিউজমি! তুমি আমার বন্ধু বলেই করেছি। দুপুরে না বললে আমরা বন্ধু হয়ে থাকি। এইটা বিয়ের আগে হলেও আমি সেইম কাজ করতাম।

~ ওহ। আচ্ছা তুমি বসো। আমি চেঞ্জ করে আসি। ট্রলিতে তোমার টি শার্ট এনেছি দেখো। চেঞ্জ করে নাও৷
মিম শাড়ি পালটে আর মেকাপ তুলে টি শার্ট আর শর্ট ট্রাউজার পরলো যা হাঁটুর নিচ অবধি। অর্নীল ও চেঞ্জ করে টি শার্ট আর ট্রাউজার পরলো। আস্তে আস্তে মিমের পায়ের ব্যাথা বাড়ছে। মিম কাজের মেয়েকে ডেকে বলে পায়ে একটু মলম ঘষে দিতে। অর্নীল চেয়ারে বসে তখন বই পড়ছিলো।
~ পায়ে কি বেশি ব্যাথা করছে? (অর্নীল)
~ হ্যা ফুলে যাচ্ছে।

~ কেন পরতে যাও হিল?
~ আর পরব না। শান্তি?
~ হুহ
রাতে অর্নীল সোফার উপর ঘুমিয়ে যাওয়ার পর মিম বউমনিকে ফোন দেয়। এত রাতে মিমের কল পেয়ে বউমনি ভাবে নিশ্চই অর্নীল কিছু করেছে।
~ হ্যা মিম বলো। কোনো সমস্যা হয়েছে? (বউমনি)
~ না দিভাই। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিবে?
~ বলো।

~ চৌধুরী কি কাউকে ভালবাসতো?
~ হ্যা বাসতো। (আস্তে গলায় বউমনি)
~ কাকে? (উত্তেজিত হয়ে মিম)
~ শাইমা নামে কাউকে।

~ কবে সেইটা আর কিভাবে? চৌধুরী তো ছোট থেকেই বিদেশে ছিলো!

~ আমেরিকাতেই। বাংলাদেশী মেয়ে ছিলো শাইমা। একই ইউনিভার্সিটি তে পড়ত শাইমা আর অর্নীল। ইউনিভার্সিটি থেকেই দুজনের পরিচয় আর পরবর্তীতে অর্নীল পুরো ডুবে যায় শাইমার প্রতি৷ কিন্তু শাইমা হিন্দু ছিলো। শাইমা অর্নীলের জন্য মুসলিম হতে রাজি ছিলো কিন্তু তিন বছরের প্রেমের পর শাইমা জানায় ও মুসলিম হতে পারবেনা কারণ ওর ফেমিলি চায়না। বলতে পারো ওয়ান টাইপ অফ বেঈমানী। কারণ রিলেশনের শুরুতে কথা ছিলো শাইমা মুসলিম হবে আর তিন বছর প্রেমের পর বলে বাবা মানবেনা তাই ও পারবেনা। এরপর শাইমা বাংলাদেশে চলে আসে আর বিয়ে করে। আর অর্নীল ওখানেই পরে থাকে। দেশে আসতে চাইছিলো না, আব্বু আম্মু, আরুশ আর অনু দি মিলে একে দেশে আনিয়েছে। কিন্তু একটা মজার কথা কি জানো?
~ কি?
~ শাইমা এখন অর্নীলের অফিসের এমপ্লয়ি।
~ হোয়াট? ও তো আমায় এসব কোনোদিন বলেনি।
~ এইটাই হয়ত হাইড করেছে কারণ ও নিজের সমস্যাগুলো পাবলিক করতে চায়না।
~ শাইমা কেমন মেয়ে ছিল?
~ বেশ সাদামাটা, শ্যাম বর্ণের আর অনেক হাসতো। বেশ মিশুক ছিল। আর ওর আরেকটা গুণ হচ্ছে খুব নরমাল
থাকত। এইটাই ভাল লেগেছিলো আমার দেবরের।

~ ও আচ্ছা আচ্ছা! এই জন্য আমি অযোগ্য? আমি গর্জিয়াস ইন ন্যাচার, একটু স্টাইলিশ এইসব ই কি চৌধুরীর সমস্যা? (বিছানা থেকে উঠতে চেষ্টা করে মিম)
~ হয়ত। কিন্তু মিম তোমায় একটা সিক্রেট বলি। অর্নীল কিন্তু ভালবাসার জন্য ডেস্পারেট। ও চায় ওর লাইফ পার্টনার ওর মতো হোক, শুধু ওকে নিয়েই থাকুক।
~ হুম দিভাই এখন আমার কাছে ক্লিয়ার কেন আমি অযোগ্য! থ্যাংক ইউ দিভাই। তোমার সময় নষ্ট করলাম বলে সরি।
~ এই মেয়ে না, কি বলে এসব। অর্নীল কই?

~ ঘুমায়। সোফার উপর।
~ ওর ত্যারামী গুলো গেলো না! আচ্ছা আমি রাখছি। ঘুম পেয়েছে অনেক।
~ আচ্ছা।
ফোন কেটে দিয়ে মিম ভাবে কালকে একটু অর্নীলের অফিসে যাবে।

পর্ব ১০

মিম ভাবলো আগামীকালই একবার অর্নীলের অফিসে যাবে আর সেখানে গিয়ে শাইমার সাথে কথা বলবে। রাতে মিম বিছানায় শুয়ে দেখে অর্নীল সোফার উপর শুয়ে আছে। কত শান্ত লাগছে ওকে। আর এই ছেলেই কি না মিমকে এত কষ্ট দিচ্ছে! পারছে কিভাবে ও? শাইমা কি খুব স্পেশাল ওর কাছে? আর কেনোই বা স্পেশাল? এসব ভেবে ভেবে মিম আর রাতে ঘুমাতে পারেনা।
পরেরদিন সকালে,

অর্নীল রেডি হচ্ছে অফিসে যাবে বলে। অর্নীলকে রেডি হতে দেখে মিম কাজের মেয়েকে বলল খাবার রেডি করতে। কাজের মেয়ে দ্রুত খাবার বানিয়ে মিমের বেডরুমে নিয়ে আসলো। মিম অর্নীলকে খেতে বলল। অর্নীল এক পিস পাউরুটি খেয়ে বেরিয়ে গেলো। দুধ আর ডিম সেদ্ধ পরে রইলো। অর্নীল বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মিম রেডি হওয়া শুরু করে। শার্ট আর প্যান্ট বের করার পর হঠাৎ মিমের মনে হলো অর্নীল একদিন বলেছিলো বিয়ের পর মেয়েদেরকে রুচিশীল হতে হয় অন্তত পোষাকের দিক থেকে। নয়ত পারিবারিক ঝামেলা বেশি হয়। কথাটা মনে পরার পর মিম শার্ট আর প্যান্ট রেখে গাউন বের করলো। সিম্পল একটা গাউন আর প্লেন হিল পরে মিম অর্নীলের অফিসে গেলো। গাউনের সাথে মিম ওড়না না পরে কোটি পরেছে। অর্নীলের হয়ত এইটা খারাপ লাগতে পারে বাট কিছু করার নেই। হুট করেই নিজেকে পাল্টে ফেলা সম্ভব না। মিম অর্নীলের অফিসে যাওয়ার পর রিসিপশনে জিজ্ঞেস করে,
~ শাইমা কে?

~ ম্যাম আপনি? গুড মর্নিং ম্যাম। (রিসিপশনিস্ট)
~ নো নিড ফর্মালিটি। জিজ্ঞেস করেছি শাইমা কে?
~ থার্ড ফ্লোরে উনি কাজ করেন৷ ওনার ডেস্ক নাম্বার ৪২ ম্যাম। (কম্পিউটার চেক করে রিসিপশনিস্ট)
~ থ্যাংক ইউ।

মিম সোজা থার্ড ফ্লোরে যায়। অনেক ওয়ার্কার মিমকে দেখেছে এবং সালাম ও জানিয়েছে কিন্তু ওইসব কিছুই মিমের মাথায় ঢুকেনি। ৪২ নাম্বার ডেস্কে গিয়ে দেখে এই মেয়েটাকে মিম চিনে! ওরা যেদিন চাঁদপুর গিয়েছিলো সেইদিন এই মেয়েটার সাথেই অর্নীল ওর কেবিনে মিস বিহেইভ করেছিলো।
~ তুমি কি শাইমা? (মিম)
~ ইয়েস। মিসেস চৌধুরী আপনি? (দাঁড়িয়ে শাইমা)
~ তোমার কিছুক্ষণ সময় হবে আমার সাথে কথা বলার জন্য?
~ স্যার? উনি তো অনেক টাস্ক দিয়েছেন।

~ তোমার স্যারকে আমি ম্যানেজ করব। এসো আমার সাথে।
মিম শাইমাকে নিয়ে অফিসের ছাদে যায়। সেখানে বসার জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর সোফা রয়েছে, মাথার উপর চালা রয়েছে। মিম শাইমাকে বসতে বলল। অর্নীল তখনো জানেনা মিম অফিসে এসেছে।
~ সোজা প্রশ্ন করি। চৌধুরী তোমার লাভার ছিল? (দাঁড়িয়ে থেকেই মিম)
~ শাইমা মাথা নিচু করে আছে।

~ ডোন্ট এংরি মি শাইমা! চৌধুরী কি তোমার লাভার ছিল? ইয়েস অর নো? (শান্ত গলায় মিম)
~ হ্যা আমি অর্নীলকে ভালবাসতাম। অনেক বেশিই ভালবাসতাম।
~ তারপর? সেই অনেক বেশি ভালবাসা শেষ হলো কিভাবে? (শাইমার দিকে তাঁকিয়ে মিম)
~ শেষ হয়নি, শেষ করতে বাধ্য হয়েছি ধর্মের জন্য। ও মুসলিম আর আমি হিন্দু ছিলাম। যতটা সহজ ভেবেছিলাম ওতটা সহজ ছিল না সবকিছু।
~ ওহ আচ্ছা? কেনো সহজ ছিল না?

~ আমার বাবা মানেনি। আমার ধর্ম উনি কিছুতেই পাল্টাতে দিতে চান নি।
~ প্রেম করার সময় কি তোমার বাবার পার্মিশন নিয়ে করেছিলে?
~ না। (মাথা নিচু করে শাইমা)
~ তবে বিয়ে কেনো তোমার বাবার ইচ্ছাতে হবে? প্রেম করে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে একটা ছেলের মন তো নষ্ট করার অধিকার তোমার ছিল না। তোমার ভাবা উচিৎ ছিল ফিউচারে এর প্রভাব সম্পর্কে। তুমি তা ভাবোনি উলটো স্বপ্ন দেখিয়ে মাঝপথে ছেড়ে দিছো। আচ্ছা শাইমা চৌধুরী তো আমায় বিয়ে করলো। বিয়ের দুইদিন পর কেনো আমায় তোমার কাছে আসতে হলো জানো?
~ না।

~ তোমার এই বাবা মানেনি’র জন্য। চৌধুরী তো শেষ হয়েছেই সাথে আমি হব এখন। আর শোনো তোমায় একটা কথা বলি।
~ কি?
~ আজকেই তুমি চৌধুরীকে রিজাইন লেটার লিখো।
~ মিসেস চৌধুরী চাকরিটা আমার খুব দরকার। আমার স্বামী অসুস্থ। বাচ্চা আছে আমার একটা। আমি চলব কিভাবে চাকরি ছেড়ে দিলে? (দাঁড়িয়ে গিয়ে শাইমা)
~ স্যালারি কত তোমার?

~ বত্রিশ হাজার।
~ আমি তোমায় চৌষট্টি হাজার টাকা দিব। এই কোম্পানির থেকে ডাবল টাকা। আমার কোম্পানিতে কালকে জয়েন করবে।

~ কিন্তু মিসেস চৌধুরী আমার তো এক বছরের রেস্ট্রিকশন আছে।
~ রিজাইন লেটার লিখো আগে। বাকিটা আমি দেখছি। আর হ্যা ভবিষ্যতে চৌধুরীর মুখাপেক্ষী ও হবেনা। তুমি শুধু চৌধুরীকে ভালবেসেছো আর আমি আমার ভালবাসার পূর্নতা দিয়েছি। তুমি বললেনা তোমার স্বামী অসুস্থ? কেনো জানো? একটা মন ভেঙে তুমি আরেকটা মন সাজাতে গিয়েছিলে। অভিশাপ লাগেনি শাইমা? অনুশোচনা হয়নি?
~ এর জন্য আমি এখনো লজ্জিত।

~ যাও গিয়ে রিজাইন লেটার লিখো। দশ মিনিটে আমি আসছি।
শাইমা চলে গেলো। মিম ছাদে দাঁড়িয়ে রইলো। শাইমা মেয়েটা দেখতে আহামরি সুন্দর না। আচরণ স্বাভাবিক। ভদ্র মেয়েই মনে হয়েছে মিমের কাছে। চেহারায় মায়া আছে। কিছুক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে নিজের বিয়ের কথা ভাবলো মিম। এরপর নিচে এসে রিজাইন লেটার সহ শাইমাকে নিয়ে অর্নীলের কেবিনে ঢুকলো। অর্নীল তখন কফি খাচ্ছিলো আর আকাশের সাথে কথা বলছিলো। মিমকে দেখে বড়সরই শক খেলো অর্নীল তাও শাইমার সাথে। অর্নীল কফি মগ রেখে মিমকে জিজ্ঞেস করলো,

~ তুমি এখানে?
~ আসতে হলো কিছু করার নেই। আকাশ একটু বাইরে যাও। (মিম)
~ ওকে ম্যাম। (আকাশ বাইরে চলে গেলো)
~ শাইমা রিজাইন লেটার টা দাও তোমার বসকে। (মিম)

শাইমা অর্নীলের কাছে রিজাইন লেটার এগিয়ে দিলো। মিম তখন শাইমাকে বলে,
~ সোজা ডেস্কে চলে যাও। রিজাইন লেটার সাইন করে আমি আকাশকে দিয়ে পাঠাচ্ছি।
~ ওকে।
শাইমাও কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
~ মিসেস সেনের এক বছরের রেস্ট্রিকশন রয়েছে এই অফিসে। এক বছরের আগে উনি অফিস ছাড়তে পারবেন না। (অর্নীল)
~ আমি যখন ডিসাইড করেছি ও এই অফিসে থাকবেনা তার মানে থাকবেনা। লেটারে সাইন কর। (লেটার খুলে দিয়ে মিম)

~ মিম আমি নিয়মের বাইরে কিছু করতে পারবনা। রুলস ইজ রুলস। (চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অর্নীল)
~ চৌধুরী তুমি সাইন করবে? আমাকে রুলস শিখিয়ো না। ভুলে যাচ্ছো আমিও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। রুলস আমিও জানি। (অর্নীলের চোখের দিকে তাঁকিয়ে মিম)

~ তুমি কি আমায় জোর করছো?
~ যদি তা~ ই হয় তো তা~ ই। এখন সাইনটা কর।
~ অফিস আমার, কোম্পানি আমার আর এমপ্লয়ি ও আমার। তুমি কেন আমায় জোর করছো? (মিমের সামনে এসে অর্নীল)

~ জোর করার অধিকার আছে তাই করছি। তুমি কি চাইছো নিজের এক্স এর সাথে এখানে থাকতে? এজন্যই কি বিয়ের দুইদিন পর অফিসে আসতে হয়? এইসব তো আমি সহ্য করবনা চৌধুরী। চুপচাপ সাইনটা কর। এতদিন আমার যেই রুপ তুমি দেখোনি আজ কিন্তু সেইটাই দেখবে যদি সাইন না কর। আমি এক মিনিট সময় দিচ্ছি তোমায়।
মিম কথাটা বলেই সোফার উপর বসলো। মিম সোজা অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে আছে। অর্নীল পকেটে হাত দিয়ে গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কি যেন ভাবছে অর্নীল।
~ চৌধুরী ৩০ সেকেন্ড হয়ে গেছে কিন্তু৷

~ বলেছি তো আমি সাইন করতে পারবনা। তোমার যা খুশি করে নাও তুমি।
এই বলে অর্নীল বাইরে যাওয়ার জন্য মিমের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। মিম তখন বসা অবস্থাতেই অর্নীলের হাত ধরে। অর্নীল থেমে যায়। মিম অর্নীলের হাত ধরেই দাঁড়িয়ে যায়।
~ সাইনটা তুমি করবেনা? (শান্ত গলায় মিম)
~ নেভার। ফোর্স করে এসব হয়না।

মিম অর্নীলের সামনে গিয়ে অর্নীলের শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিয়ে বলল,
~ নেক্সট টাইম থেকে যেন বুকের পশম গুলো না দেখা যায়। এসো এখন।
মিম অর্নীলকে টানতে টানতে টেবিলের সামনে এনে থামালো৷ মিম অর্নীলের বা হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে নীল কালি লাগিয়ে লেটারে টিপসই নিলো।

~ তোমাকে মূর্খ বলছিনা। বাধ্য করলে তুমি আমায় এমন কিছু করতে। আসছি। আমার কাজ শেষ।
মিম লেটার নিয়ে বেরিয়ে গেলো আর অর্নীল তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে দেখলো।
~ ও কি মেয়ে? এত শক্তি কেন গায়ে? হাতটা শেষ আমার। মিম কি তাহলে সত্যিই আমায় ভালবাসে? (মনে মনে অর্নীল)
মিম বাইরে বেরিয়ে আকাশকে ডেকে শাইমার কাছে রিজাইন লেটারের কপি পাঠিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো লাঞ্চে অর্নীলকে অয়েল ফ্রি খাবার দিতে।

মিম নিজের অফিসে এসে ভাবছে কি করবে ও? অর্নীল তো বাসায় এসে ওর সাথে যাচ্ছে তাই ব্যবহার করবে। কিভাবে সামলাবে মিম তখন? শৈলি এসে মিমকে জিজ্ঞেস করে,
~ ম্যাম আপনার আসতে লেইট হলো কেন?
~ বেরিয়েছি লেইট করে তাই। কালকে শাইমা সেন নামে একজন আসবে ওনাকে অফিসে জয়েন করে নিও। যেই পোস্টটা খালি আছে সেখানেই দিয়ে দিও তাকে।

~ ম্যাম কোনো জয়েনিং তো ছিল না!
~ আমি জয়েন করিয়েছি।
~ ওকে ম্যাম। এপয়েন্টমেন্ট লেটার লিখব তাহলে?
~ হ্যা অবশ্যই।

মিম অফিসের কাজ শেষ করে চেষ্টা করে একটু আগে বের হতে কিন্তু রাত এগারোটা বেজে যায়। ড্রাইভারকে নিয়ে আসেনি মিম আজকে অর্নীলের অফিসে যাবে বলে। রাত এগারোটায় মিম অফিস থেকে বের হয় আর অর্নীল তখন মিমের বাসায় গিয়ে কফি খাচ্ছে। মিমকে কিছু বলার ইচ্ছা ওর নেই কারণ মিমের জায়গায় মিম ঠিক৷ কোনো মেয়ে মানবেনা এসব।

রাত একটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট,
মিমের বাপি আর অর্নীল ওয়েট করছে মিমের জন্য। মিম এখনো বাসায় আসেনি। অর্নীল ফোন করেছিলো কিন্তু ফোন অফ। বাপি অফিসে ফোন করে জানল মিম এগারোটায় বেরিয়েছে। এগারোটায় বেরিয়ে বারটার মধ্যে চলে আসার কথা কিন্তু এখন বাজে পৌণে দুইটা। বাপি প্রচন্ড টেনশনে পরে যায়। অর্নীল বাপিকে বলছে চিন্তা না করতে। কিন্তু একটা সময় অর্নীল ও চিন্তায় পরে যায়। রাত তিনটা বেজে গেছে কিন্তু মিম কোথায়? অর্নীল বাপিকে বলে,
~ আংকেল আপনি থাকেন। আমি বেরিয়ে দেখছি।

~ আমিও যাব। আমায় নিয়ে চলো। (বাপি রীতিমতো কান্না করছে)
~ আচ্ছা আসুন।

অর্নীল বাপিকে নিয়ে দ্রুত ওর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। পুরো রাস্তা শুনশান। কোনো গাড়ি নেই রাস্তায়। চেকপোস্ট গুলোও বন্ধ। মিম যেই রাস্তা দিয়ে রোজ বাসায় আসে অর্নীল সেই রাস্তা ধরেই অফিস পর্যন্ত গেলো কিন্তু কাউকে পেলো না অর্নীল। ফেরার পথে একটা বড় গাছের নিচে অফ হোয়াইট রঙের গাড়ি দেখলো অর্নীল। রাস্তা পার হয়ে বাপি আর অর্নীল গাড়ির কাছে যায়। বাপি বলে,

~ এইটাই তো আমার মামনির গাড়ি। আমার মেয়ে কোথায় তাহলে?
অর্নীল দ্রুত পুরোটা গাড়ি চেক করলো কিন্তু মিমের ফোন ছাড়া কিছুই পেল না। ফোন এখানেই সুইচড অফ করে রাখা। অর্নীল ফোনটা অন করে। বাপিকে জিজ্ঞেস করে মিমের ফোনের পাসওয়ার্ড জানে নাকি! কিন্তু বাপি জানেনা। অর্নীল মিমের গাড়ি লক করে বাপিকে বলে,

~ আংকেল আমার মনে হচ্ছে মিম কিডন্যাপড। মিমের লাস্ট কল চেক করাটা জরুরি। ফোন খোলার চেষ্টা করতে হবে আগে।
~ অর্নীল আমার মেয়ে নিশ্চই বিপদে আছে। প্লিজ অর্নীল আমার মেয়েকে নিয়ে আসো, প্লিজ। (বাপি কাঁদছে)
~ প্লিজ আংকেল কাঁদবেন না। আমি দেখছি। (অর্নীল ও চিন্তায় আছে)

অর্নীল বিভিন্ন ধরনের পাসওয়ার্ড গেস করে মিমের ফোন খোলার চেষ্টা করে কিন্তু সম্ভব হচ্ছেনা। পরে অর্নীল কি ভেবে যেন নিজের নাম লিখে ট্রাই করলো আর ফোন খুলে গেল। অবাক হওয়ার সময় অর্নীলের নেই। অর্নীল দ্রুত কললিস্ট চেক করে। লাস্ট কল প্রায় পাঁচ ঘন্টা আগে। প্রায় এগারোটার দিকে আর এখন বাজে সাড়ে চারটা। নাম্বারটা সেইভ করা নেই। বাপিকে দেখানোর পর বাপিও জানেনা এইটা কার নাম্বার। অর্নীল নিজের ফোন বের করে নাম্বারটা ট্র‍্যাক করার চেষ্টা করে কিন্তু আনরিচড।

~ আংকেল পুলিশ স্টেশন চলুন। অনেক টাইম ওয়েস্ট করে ফেলেছি অলরেডি।
~ তারাতারি চল।

অর্নীল সেখান থেকে বেরিয়ে পুলিশ স্টেশনে গেলো। অর্নীল পুলিশকে সব বলার পর পুলিশ ইন্সট্যান্ট অর্নীলকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। এত বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট গার্ড ছাড়া চললে কিডন্যাপড তো হবেন ই। কিন্তু কে করলো এমন কাজ? বাপিকে বাসায় রেখে টি শার্ট আর ট্রাউজার পরেই অর্নীল পুলিশের সাথে বের হয়। ড্রেস চেঞ্জ করার সময় নেই এখন। পুলিশ বাপির থেকে ইনফরমেশন কালেক্ট করে সন্দেহভাজন সবাইকে ইন্টারোগেট করে কিন্তু কেউ কিছু জানেনা। শৈলি বলে,

~ আমি জানতাম ম্যামের সাথে এমন কিছু হতে চলেছে। ম্যামকে আমি সাবধান করতাম কিন্তু উনি শুনত না। (কান্নায় ভেঙে পরে শৈলি) মিস্টার খানকে ইন্টারোগেট করুন স্যার। উনি ম্যামকে থ্রেট করেছিলো চেয়ারম্যান এর পদবির জন্য।
~ থ্যাংক ইউ শৈলি। (অর্নীল)

ভোরে অর্নীল আর পুলিশ অফিসার মিস্টার খানের বাসায় যায়। মিস্টার খান বাসায় নেই। ওনার ওয়াইফ জানায় মিস্টার খান বিজনেসের কাজে আজ রাতে ঢাকার বাইরে গেছেন কিন্তু কোথায় গেছেন জানেন না। ওতক্ষণে আরুশ আর অর্নীলের বাবা হুরমুর করে মিস্টার খানের বাসায় ঢুকে। অর্নীলের চোখে মুখে ভয় মিমের জন্য। পুলিশ অফিসার কিছু বলার আগেই আরুশ অর্নীলকে জিজ্ঞেস করে,
~ এসব কিভাবে হলো? (আরুশ)
~ জানিনা ভাইয়া। (অর্নীল বসে পরে)

~ পুলিশ অফিসার জানতে পেরেছেন কিছু? (অর্নীলের আব্বু)
~ এখনো না মিস্টার চৌধুরী তবে সন্দেহ হচ্ছে সৈকত খানের উপর। উনি কোথায় আছেন ওনার স্ত্রী জানেন না। আমাদের ওনার অবস্থান জানতে হবে আগে। আপনারা সবাই থানায় আসুন। (পুলিশ)
সকাল হওয়ার আগেই খবর ছড়িয়ে গেছে সদ্যবিবাহিতা টপ ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মিম চৌধুরী কিডন্যাপড। আরুশ বলে,
~ মিডিয়া জানার আগেই কিছু একটা করতে হবে অফিসার। কমিশনার কোথায়?
~ স্যার আসছেন। অন দি ওয়ে। (পুলিশ অফিসার)

পর্ব ১১

কমিশনার থানায় আসার পর মিমের কিডন্যাপ হওয়ার সব ডিটেইলস চেক করলো। সৈকত খানের নাম্বার ট্র‍্যাক করা সম্ভব না কারণ নাম্বার আউট অফ রিচ। কমিশনার অলরেডি ঢাকার বাইরের পুলিশ স্টেশনগুলোকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছে। তারা ও খুঁজছে সৈকত খানকে। অর্নীল চুপচাপ বসে আছে। সবাই যখন কেইস নিয়ে ডিসকাস করছে তখন অর্নীল বলে,

~ আপনারা প্লিজ যা করার তাড়াতাড়ি করুন। ওইদিকে মিমের কি অবস্থা হচ্ছে কে জানে!
~ মিস্টার চৌধুরী আমরা শুরু করব কোথা থেকে সেইটাই তো বুঝতে পারছি না।
~ আপনারা না পারলে ফাইলটা আমার কাছে হ্যান্ড ওভার করুন, আমি দেখে নিচ্ছি। সকাল হয়ে গেলো আর আপনারা এখনো ভাবছেন শুরু কোথা থেকে করবেন! ফাইল দিন আমাকে। আমিই দেখছি। (উঠে দাঁড়িয়ে অর্নীল)
~ মিস্টার চৌধুরী আপনি কিভাবে দেখবেন? আপনি তো কয়েক মাস হলো এখানে এসেছেন। (কমিশনার)
~ কমিশনার এইসব ভাবছি না এখন আমি। ফাইলটা দিন।

কমিশনার ফাইল দেওয়ার পর অর্নীল বলল,
~ ল্যাপটপ আছে?
~ অফিসার? (কমিশনার)
~ হ্যা স্যার আছে। (অফিসার)
~ এনে দিন।

অর্নীলকে অফিসার ল্যাপটপ এনে দিলো। এইদিকে পুলিশ চেষ্টা করছে নাম্বারটা ট্র‍্যাক করার। অর্নীল একটা চেয়ারে বসে সৈকত খানের ডিটেইলস চেক করলো। সৈকত খান যেহেতু ক্ষমতাধর মানুষ সেহেতু তার কোনো সিকিউরিটি নিশ্চই থাকবে। অনেক খুঁজে অর্নীল সৈকতের সাথে ওর সিকিউরিটির ছবি দেখে ওর পরিচয় খুঁজে বের করলো।
~ কমিশনার? (কমিশনারকে ডেকে অর্নীল)

~ হ্যা মিস্টার চৌধুরী! (অর্নীলের সামনে এসে কমিশনার)
~ ওর নাম আসিফ। সৈকত খানের সিকিউরিটি গার্ড। খিলগাঁও থাকে, বাড়ি নাম্বার ৩২৭. আশা করি ওর কাছ থেকেই কিছু পাবেন। (উঠে দাঁড়িয়ে অর্নীল)

~ অফিসার এসো। মিস্টার চৌধুরী আপনিও চলুন। (কমিশনার)
অর্নীল পুলিশের সাথে খিলগাঁও যাচ্ছে। আরুশ ও ছিল সাথে। অর্নীলের বাবা মিমের বাপির কাছে যায় ওনাকে স্বান্তনা দিতে। ঘিন্টাখানের পর ৩২৭ নাম্বার বাড়িতে ঢুকে অর্নীল, আরুশ আর পুলিশ। অফিসার বাসায় ঢোকার আগে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে আসিফ কত নাম্বার ফ্লোরে থাকে? দারোয়ান উত্তর দিয়েছিলো তিনতলায় থাকে। তিনতলার ফ্ল্যাটে গিয়ে খুব দ্রুত কলিং বেল বাজাচ্ছে পুলিশ। বিরক্ত হয়ে দরজা খুলল আসিফ। পুলিশ দেখে ও ঘাবড়ে যায়। অর্নীলকেও চিনে আসিফ। BFF এর মিটিং এ দেখেছিলো দুইবার। অফিসার আসিফকে জিজ্ঞেস করে,
~ তোমার বস কোথায়?
~ আমি জানিনা।

~ তুমি ওনার রক্ষাকর্তা আর তুমি জান না তোমার বস কোথায়? (কমিশনার)
~ স্যার আমি সত্যিই জানিনা উনি কোথায়। (আসিফ)
অর্নীল পুলিশের ইন্টারোগেট একদম পছন্দ করছেনা। অর্নীল সোজা আসিফের কলার ধরে জিজ্ঞেস করে,
~ সৈকত খান কোথায়? তুই কি ইজিলি বলবি নাকি আমি মারতে শুরু করব?
~ অর্নীল থাম। কি করছিস তুই? (অর্নীলকে ধরে আরুশ)
~ মিস্টার চৌধুরী শান্ত হন।

~ আসিফ আমি শেষ বারের মতো জিজ্ঞেস করছি সৈকত খান কোথায়? (চিল্লিয়ে অর্নীল)
~ স্যার আমি সত্যিই জানিনা। (আসিফ)

~ তোর ফোনটা কই? ভাইয়া দেখো তো ওর ফোন কই। তাড়াতাড়ি। (অর্নীল আসিফের শার্টের কলার ধরেই আছে)
কিছুক্ষণ পর আরুশ আসিফের ফোন খুঁজে পায়। অর্নীল জোরেশোরে আসিফের গালে চড় মেরে বলে,
~ ফোন খোল। তোর সাথে হেয়ালি করার সময় আমার নেই।

আসিফ প্রথমে ফোন খুলতে না চাইলেও শেষে বাধ্য হলো ফোন খুলতে। আসিফের শেষ কল ছিল বস নামে কাউকে। অর্নীল নাম্বার চেক করে দেখে এইটা সৈকত খানের সিক্রেট নাম্বার। ৪৯ মিনিট আগে এদের কথা হয়েছে।
~ অফিসার এই নাম্বারটা ট্র‍্যাক করুন। এই নাম্বারটা খোলা আছে।
~ দিন। (অফিসার)

অফিসার আসিফকে এরেস্ট করে পুলিশকে মিথ্যে বলার জন্য। আসিফের ফোন ও নিয়ে নেয় অর্নীল। পুলিশ কিছুক্ষণ পর কমিশনারকে জানায়,
~ স্যার লোকেশন বলছে ঠাকুরগাঁও। সৈকত খান ঠাকুরগাঁয়ে আছেন।
~ আরো তিনজন অফিসার নিয়ে তুমি আমাদের ফলো কর। আমি আর মিস্টার চৌধুরী বের হচ্ছি। কুইক। (কমিশনার)

গাড়ি করে ঠাকুরগাঁও যেতে প্রায় একদিন সময় লাগবে। অর্নীল এখন একদমি সময় নষ্ট করবেনা। অর্নীল আধাঘন্টার মধ্যে বাড়ি থেকে পাসপোর্ট আনায় আর আরুশ ও ওর পাসপোর্ট নিয়ে আসে। পুলিশ কমিশনারের পাসপোর্ট সাথেই ছিল। ওনাকে যখন তখন একেক জায়গায় যেতে হয় বলে পাসপোর্ট সাথেই রাখেন। এয়ারপোর্টে এসে অর্নীল ইমার্জেন্সি তিনটা টিকিট কাটলো। সাধারণত ৩৫০০ করে টিকিট কিন্তু ইমার্জেন্সি হওয়ায় ৪০০০ করে কিনতে হলো। আধা ঘণ্টা পর ওদের ফ্লাইট। ফ্লাইটে উঠে অর্নীল আরুশকে জিজ্ঞেস করে,
~ মিম ভাল আছে তো ভাইয়া? ওর কিছু হবেনা তো?

~ তুই ওর জন্য চিন্তা করছিস অর্নীল?
~ ভাইয়া ও আমার বন্ধু হয়। ওর জন্য চিন্তা হবেনা?
~ ওহ! বন্ধু হয়? বউ হয়না?
~ হয়ত হয়।

কিছুক্ষণ পর ফ্লাইট ছেড়ে দেয়। ফ্লাইটে উঠার আগে কমিশনার অফিসারদের নিষেধ করে আসতে। ঠাকুরগাঁও এর পুলিশ নিয়েই উনি যা করার করবে। প্রায় দেড় ঘন্টা পর ঠাকুরগাঁও এয়ার লাইন্সে এসে থামলো প্লেন। দ্রুত সব ফর্মালিটি শেষ করে সেখানকার পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে কমিশনার। সৈকত খানের লোকেশন লালমোহন গ্রামে৷ একদম ই ইন্ডিয়ার বর্ডার ঘেঁষে এই গ্রাম। এতদূর ও মিমকে নিয়ে একরাতের মধ্যে আসলো কিভাবে? এই প্রশ্নটাই বারবার অর্নীলের মনে আসছে। দুই ঘন্টা পর সেখানে গিয়ে পৌছালো সবাই। তখন বাজে দুপুর দেড়টা। কমিশনার অর্নীল আর আরুশকে বাইরে দাঁড়াতে বলে ওনারা পুরোনো বাড়িতে ঢুকতে চায় কিন্তু অর্নীল বলে,
~ আমি যাব কমিশনার।

~ আমরা জানিনা কি বিপদ সেখানে আছে৷ আপনি কেন যাবেন?
~ আমি যাব কমিশনার যা বিপদ ই থাকুক৷
~ আচ্ছা আসুন।

আরুশ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সৈকত খান সেখানে ছিলো৷ সৈকত খানের বয়স অর্নীলের মতই। সৈকত খান শুধু BFF এর চেয়ারম্যান পদের জন্যই মিমকে কিডন্যাপ করেনি, সৈকত খান মিমকে ভাল ও বাসে। সৈকত খান নিজের বিয়ের আগে অর্থাৎ প্রায় দুই বছর আগে মিমকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় কিন্তু মিম রিজেক্ট করে দেয়। এইটা অর্নীল জানতো না। আজকে সকালে শৈলি জানিয়েছে। ভেতরে ঢুকে কমিশনার পুলিশকে অর্ডার করে সৈকত খানকে এরেস্ট করার জন্য আর তিনটা গার্ডকে বলে হাতের চাকু ফেলে দিতে। এরপর পুলিশ ওদের এরেস্ট করে নিয়ে আসে আর পাশের ঘরে মিম পরে রয়েছে। অর্নীল দ্রুত সেই ঘরে যায়। মিম সেন্সলেস৷ মিমকে ড্রাগস খাইয়েছে সৈকত খান! জামাকাপড়ের ঠিক নেই। পুরো হাতে মুখে চাকুর আঘাত। ফিনকি দিয়ে রক্ত পরছে পুরো শরীর থেকে। আরুশ তখন বাড়িতে ঢুকে আর অর্নীলকে বলে,

~ বের হ এখান থেকে। দেখে তো মনে হচ্ছে স্লো পয়জন ও আছে। ভাই দ্রুত বের হ। (আরুশ)
অর্নীল মিমকে কোলে নিয়ে বাড়িটা থেকে বের হয়। কমিশনার সেখানকার এম্বুলেন্স কল করে মিমকে সেখানেই হাসপাতালে ভর্তি করে। ঢাকা ব্যাক করার সময় এখন নেই। একদম ই নিম্ন মানের একটা হাসপাতাল এইটা। এখানে কি চিকিৎসা হবে মিমের? মিমের গাল ত্যাছড়া ভাবে পুরো কাটা! কি ভয়ংকর লাগছে মিমকে দেখতে! অর্নীল পাগলের মতো হয়ে যায় মিমকে দেখে।

~ ভাইয়া মিমকে ঢাকা নিয়ে চল। সেখানে ভর্তি করাবো ওকে। ওর অবস্থা দেখেছো?
~ অর্নীল মিনিমাম দুই ঘণ্টা লাগবে এখন এখান থেকে বের হতে। আর মিমের পাসপোর্ট সাথে নেই। ফ্লাইটে যাওয়া যাবেনা। কি করব এখন বল তুই?

~ এখানকার সিটিতে নিশ্চই ভাল মানের হাসপাতাল আছে? সেখানে চল। তুমি দ্রুত একটা এম্বুলেন্স ঠিক কর। ভাইয়া প্লিজ ফাস্ট।

আরুশ সেই হাসপাতালেরই একটা এম্বুলেন্স ঠিক করে মিমকে নিয়ে ঠাকুরগাঁও সিটিতে এলো। সেখানে একটা প্রাইভেট হাসপাতালে মিমকে ভর্তি করালো অর্নীল। ডক্টর বলল,
~ এই রকম হলো কি করে?

~ গতকালকে রাতে ও কিডন্যাপ হয়েছিলো। কিডন্যাপার রাই এ অবস্থা করেছে। ডক্টর আপনি কাইন্ডলি চেক করুন স্লো পয়জন আছে কি না! (আরুশ)
~ হ্যা স্লো পয়জন দেওয়া হয়েছে। ওনাকে অনেক বেশি ড্রাগস খাওয়ানো হয়েছে। একদম ই সেন্স নেই ম্যাডামের। আমরা এখানে এর কিছুই করতে পারবনা। ওনাকে যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা নিয়ে যান। আমি পয়জন নষ্ট করার ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি এর বেশি কিছু আমি করতে পারবনা। আর এখানে কোনো নামীদামী ডক্টর ও নেই যারা এই ক্রিটিকাল কেইস হ্যান্ডেল করবে।

~ ডক্টর পারিনা, পারবনা এসব শব্দ আমি শুনব না। আমার বউ হয় ও। ওর যদি কিছু হয়….! আপনি যত টাকা চান আমি দিব তাও ওকে ঠিক করে দেন প্লিজ। (অর্নীল)
~ দেখুন টাকার কথা তো পরে আসবে। আমি তো বললাম এখানে ভাল কোনো ডক্টর নেই। এরকম ডাইং পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট এখানে কিভাবে করব আমি বলেন?

~ আপনার ভালো ডক্টর চাই তো? আমি ব্যবস্থা করছি। (অর্নীল)
অর্নীল পকেট থেকে ফোন বের করে আকাশকে ফোন করে।
~ আকাশ আমি যা বলছি মন দিয়ে শোনো। ঢাকায় বেস্ট মেডিক্যাল কয়টা? (অর্নীল)
~ স্যার আপনি কি কাঁদছেন? ভয়েস এমন কেন লাগছে?
~ আকাশ আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছি।

~ অনেক গুলোই আছে। ল্যাব এইড, ইবনেসিনা, স্কয়ার, পপুলার। কেনো স্যার?
~ সেইসব হাসপাতালে যতগুলো রেনাউনেড ডক্টর আছে সবাইকে তিন ঘণ্টার মধ্যে ঠাকুরগাঁও নিয়ে এসো।
~ স্যার প্রায় ত্রিশ জন ডক্টর! আর ঠাকুরগাঁও কেন? কি হয়েছে স্যার?
~ অফিস থেকে টাকা তুলে দ্রুত ওনাদের এখানে নিয়ে এসো। শুধু তিন ঘন্টা সময়। আমি কমিশনারকে বলছি ওনাদের জানাতে।
~ আচ্ছা স্যার আসছি আমি।

অর্নীল আবার কমিশনারকে ফোন দিয়ে বলে হাসপাতালের ডক্টরদের যেন উনি বলে দেয় এখানে আসতে। কমিশনার ও তাই করলো। সবাই ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে সাড়ে তিন ঘন্টা পর ঠাকুরগাঁও এলো। পঁচিশজন ডক্টর আর আকাশ সবাই একসাথে এলো। অর্নীল এইবার হসপিটালের ডিউটি ডক্টরকে বলল,
~ এরা দেশের সেরা পঁচিশজন ডক্টর। এখন হবে তো আপনার? এখন আমার ওয়াইফের ট্রিটমেন্ট এখানে হবে তো?
~ ভালবাসার জন্য মানুষ পাগল হয় শুনেছি, কিন্তু আজ নিজের চোখে দেখলাম। ডক্টরস প্লিজ কাম উইথ মি। (ডক্টর)
তিনজন ডক্টর মিমকে দেখে বলল,
~ এত ড্রাগস খাওয়ানো হয়েছে যে চোখ মুখ ফুলে গেছে। আগে ড্রাগস বের করতে হবে। এরপর ট্রিটমেন্ট। ওটিতে নিয়ে যান। আমরা আসছি।

মিমের বাপি সহ অর্নীলের পুরো পরিবার রওনা হয়ে গেছে ঠাকুরগাঁও এর উদ্দেশ্যে। বাপিকে মিমের অবস্থা সম্পর্কে জানানো হয়নি নয়ত উনি অসুস্থ হয়ে যেতেন পরে। অর্নীল হাসপাতালের বারান্দায় একটা চেয়ারের উপর মাথা নিচু করে বসে আছে আর মিমের হাসিমুখটা কল্পনা করছে। আরুশ পায়চারি করছে। আকাশ জিজ্ঞেস করার সাহস ও পাচ্ছেনা এসব কি করে হলো। সবাই প্রচন্ড টেনশনে আছে। কিছুক্ষণ পর কমিশনার হাসপাতালে আসে তিনজন পুলিশ অফিসারকে সাথে নিয়ে। কমিশনার সৈকতকে ঢাকার কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। মিম সুস্থ হলে ওর বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। রাতে পরিবারের সবাই হাসপাতালে আসে। ডক্টররা জানায় মিমের অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল। ফিজিকালিও মিমকে টর্চার করেছে সৈকত খান। এইটা শুনে অর্নীল নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। রাগে অর্নীল নিজের হাতে আঘাত করে। সৈকত খান তো মরবে আগে মিম সুস্থ হোক।
৪৮ ঘন্টা পর,

মিমের জ্ঞান ফিরেছে তবে কথা বলতে পারেনা। মুখের ভেতর মোটা নল ঢুকানো। মিমের গালে ব্যান্ডেজ করা, হাতে ব্যান্ডেজ করা, কপালে ব্যান্ডেজ। গোলাপি ঠোঁট দুটো একদমই কালো হয়ে গেছে। চোখের নিচে মনে হয় কেউ কাজল লেপ্টে দিয়েছে। মিমের হাতের নখগুলো ও কালো হয়ে গেছে। হাতের আঙুলে ব্যান্ডেজ দেখে অর্নীল ডক্টরকে জিজ্ঞেস করে,

~ ওর হাতে কি হয়েছে ডক্টর? (মিমের হাত ছুঁয়ে অর্নীল)
~ হাতের আঙুল থেতলে দেওয়া হয়েছে। মনে হয় পা দিয়ে পিষেছে। (ডক্টর)

অর্নীল এই কথাটাও হজম করে নিলো। মিম অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে আছে কিন্তু কিছু বলতে পারছেনা। পুরো আড়াই দিন ধরে সবাই মাওয়া খাওয়া ভুলে হাসপাতালে পরে আছে। হাসপাতালের পাশেই একটা হোটেল বুক করে আরুশ। রাতে সবাই ওখানেই থাকে কিন্তু অর্নীল মিমের কাছেই বসে থাকে। একই টি শার্ট আড়াই দিন ধরে পরা অর্নীল। চুলগুলোও যেন কেমন উশকো খুশকো হয়ে গেছে। চোখ মুখ একদম শুকিয়ে গেছে। মিম বোধহয় এইটা বলারই চেষ্টা করছে অর্নীলকে।

অর্নীলের জীবনে ভয়াবহ দিনগুলোই ছিল এই কয়েকটা দিন। মিম আস্তে আস্তে সুস্থ হচ্ছে। শরীরের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। অর্নীলের ভয়ে ডক্টররা সারাক্ষণ মিমের পাশেই থাকছে। সাতদিন পর মিমের মুখ থেকে পাইপ সরিয়ে নেওয়া হয়। শরীরে আর কোনো ড্রাগস নেই। মিমকে খুব সাবধানে খাওয়াতে হয়েছে এই কয়টাদিন। অর্নীল নিজেও ঘুমায়নি আর ডক্টরদের ও ঘুমাতে দেয়নি।
আটদিনের দিন বিকেলে,

~ কেমন আছো তুমি? (মিমের মাথায় হাত রেখে অর্নীল)
~ ভাল আছি। তুমি আজকে টি শার্ট টা পাল্টেছো? (অনেক আস্তে কথা বলল মিম)
~ আর কি করব? আমি তো আর মার্কেটে যেতে পারছিলাম না তাই কালকে বউমনি গিয়ে টি শার্ট, শার্ট, প্যান্ট কিনে নিয়ে এসেছে।
~ কতদিন ধরে খাও না?
~ লাঞ্চ করেছি তো।

~ কতদিন পর? চেহারার অবস্থা দেখেছো?
~ দেখেছি আর সুস্থ আছি এতেই হবে।
~ স্যার ম্যামকে ড্রেসিং করাতে হবে। যদি একটু বের হতেন! (নার্স)
~ শরীরের ক্ষতগুলো শুকায়নি? (অর্নীল)
~ এখনো না। আশা করি খুব দ্রুত শুকিয়ে যাবে। (নার্স)
~ আচ্ছা আমি বের হচ্ছি।

অর্নীল উঠতে নেয় তখন মিম বাম হাত দিয়ে অর্নীলের হাত ধরে।
~ কিছু বলবে? (মিমের কাছে এসে অর্নীল)
~ আজকে তুমি আমার ড্রেসিং করে দাও।
মিমের কথা শুনে অর্নীল সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মিমের হাত ধরে নার্সকে বলল,
~ আমাকে দিন, আমি করে দিচ্ছি। মেডিসিন গুলো রেখে আপনি বেরিয়ে যান। (অর্নীল)

পর্ব ১২

মিমের কথা শুনে অর্নীল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নার্সকে বলে মেডিসিন রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। অর্নীলের কথামতো নার্স ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আর দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে গেলো। অর্নীল মিমের হাত ছেড়ে দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো আর জানালার পর্দাগুলো ফেলে দিল। মিমের কাছে এসে অর্নীল মিমের গা থেকে সাদা চাদরটা সরালো। হসপিটালের দেওয়া সাদা ঢিলে জামা পরে আছে মিম। চুলগুলো ও একদম এলোমেলো। অর্নীল চোখ বন্ধ করে মিমের জামার বোতাম গুলো খুলছে আর মিম হাসছে। মিমের হাসির শব্দ অর্নীলের কানে যাচ্ছে তবুও অর্নীল তাঁকাচ্ছেনা। জামা খুলে অর্নীল ঘাড় ঘুরিয়ে তুলার মধ্যে মেডিসিন ঢালে। মিম অর্নীলের গালে হাত দেয় যাতে অর্নীল ঘাড় না ঘুরাতে পারে। মিম বলে,

~ ভেরি স্মার্ট না? আমার পতি হয়েও চোখ বন্ধ করে আমার জামা খুলছেন? দেখি মেডিসিন কিভাবে না দেখে লাগান। (অনেক আস্তে কথা বলছে মিম)
~ সেইটাও না দেখেই লাগাব। ফিল করে।

~ ওকে দেখি, কেমন ফিলিংস পাওয়ার আপনার!
অর্নীল চোখ বন্ধ করে আবার ঘাড় ঘুরায়। অর্নীলের হাত কাঁপছে। এইভাবে কোনো মেয়ের সামনে আসেনি তো কখনো তাই হয়ত এমন লাগছে। অর্নীল প্রথমে মিমের পেটে হাত রেখে তুলো দিয়ে ঘষছে। মিম হাসছে।
~ তুমি হাসছো কেনো? (অর্নীল রেগে গিয়ে)
~ আমার পেটে কিছু হয়নি পতি বাবু। আর আপনি মেডিসিন আমার পেটে লাগাচ্ছেন।
~ তো কোথায় লাগাবো বল? (চোখ বন্ধ করে অর্নীল)

~ পেটের একটু নিচে, কোমড়ের পেছনে। আর তাঁকালে সমস্যা কি? আমি কি পর কেউ নাকি?
~ বেশি কথা কম বল!
অর্নীল মিমের কাছে গিয়ে কোমড়ের পেছনে মেডিসিন লাগিয়ে দেয়। মিম অর্নীলের হাত খামচে ধরে ছিল। কোমড়ে লাগানো শেষে অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করলো,
~ আর কোথায়?
~ পুরো পিঠে।

অর্নীল না দেখেই মিমের পুরো পিঠ মেডিসিন দিয়ে ধুয়ে দিল। পায়ের উপরের অংশের লাগিয়ে দিল ওষুধ। সবশেষে অর্নীল মিমকে জামা পরিয়ে দেয় এরপর নিজের চোখ খুলে।
~ সব জায়গায় ঠিকঠাক ওষুধ লেগেছে তো? (অর্নীল ওষুধের মুখ লাগাতে লাগাতে)
~ হ্যা লেগেছে। (চুলগুলো ধরার চেষ্টা করে মিম)
~ আরে আস্তে কি করছো? কি দরকার আমায় বল! (মিমকে থামিয়ে অর্নীল)
~ চুলগুলো একটু বেঁধে দিবা?

~ শিওর!
অর্নীল কোনোরকম একটা হাতখোপা করে দিল মিমকে। মিমের হাত পায়ের নখগুলো এখনো কালো। ডক্টর, নার্স আর অর্নীলের পয়সায় মিম আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছে। দশদিন পর সবাই ঢাকায় চলে আসে শুধু অর্নীল, আরুশ আর শিশির ছাড়া। ওরা একেবারে মিমকে নিয়েই ঢাকা ফিরবে।
মিমের কিডন্যাপের দিন থেকে আঠারো দিন পর,

গতকালকে অর্নীল মিমকে ঢাকা নিয়ে এসেছে। মিম এখন সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও প্রায় সুস্থ। আগে থেকে একটু জোরে কথা বলতে পারে মিম। অর্নীলের ঘরে থাকে মিম। মিমকে গাড়ি থেকে নামিয়ে অর্নীল কোলে করে মিমকে বাসায় ঢুকায়। মিমের ড্রেসিং ও অর্নীল রেগুলার চোখ বন্ধ করেই করে দেয়। মিম শুধু সারাক্ষণ খাটের উপর শুয়ে বসে থাকে আর অর্নীল মিমের সেবা করে। অর্নীল নিজেও জানে না কেনো করছে ও এসব? এসব তো ওর করার কথা না!

ঢাকায় আসার তিনদিন পর বিকেলে,
অর্নীলের বাড়ির সবাই গার্ডেনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মিম জানালা দিয়ে তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে দেখছে। অর্নীল সোফায় বসে ইংলিশ নোভেল পড়ছে। মিম অর্নীলকে বলে,
~ চৌধুরী আমায় গার্ডেনে নিয়ে যাবা? আমিও দিদিভাই, মা বাবার সাথে গল্প করব।
~ সুস্থ হও আগে। (বইয়ের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ আমি সুস্থ চৌধুরী। প্লিজ নিয়ে চল না। আমার আর ভাল লাগছেনা। চৌধুরী প্লিজ।
~ আচ্ছা চল।

অর্নীল বই রেখে মিমকে হাত ধরে নামায়। মিমের উপর একটা সাদা চাদর দেয় কারণ মিমের শরীরে পোড়া দাগগুলো এখনো মিশিয়ে যায়নি। অর্নীল মিমকে ধরে ধরে নিচে নামায়। ড্রইংরুমে এসে কাজের মেয়েকে অর্নীল বলে,
~ মিমের জন্য শরবত বানিয়ে গার্ডেনে নিয়ে এসো।
~ একটু আগে খেয়েছি।
~ চুপ। (মিমকে ধমক দিয়ে অর্নীল)

অর্নীল মিমকে ধরে ধরে সবুজ ঘাসের উপর হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে আর দূর থেকে সবাই দেখছে। শিশির শাড়ির আচল টান দিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে এলো। মিমকে ধরে বলল,
~ কতদিন পর হাঁটছো?
~ কুড়ি, বাইশ দিন তো হবেই। (হাসি দিয়ে মিম)
~ কষ্ট হচ্ছে না তো?

~ একদম ই না। বরং ভাল লাগছে। একা একা আর কত রুমে বসে থাকব? (চেয়ারে বসতে বসতে মিম)
~ ভাল কাজ করেছো। জুস নিয়ে আসছি আমি তোমার জন্য। (শিশির)
~ না বউমনি। আমি বলে এসেছি জুস দিয়ে যাওয়ার জন্য।
~ কত কেয়ার করে তোমায় দেখেছো! (মিমকে পিঞ্চ করে শিশির)
~ হ্যা তা তো করেই।

সবাই মিলে গল্প করছে আর মিম অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে জুস খাচ্ছে। মিম ভাবছে সত্যিই কি অর্নীল মিমকে ভালবাসতে পারেনি? সন্ধ্যা পর্যন্ত সবাই আড্ডাবাজি করে বাসায় এলো। অর্নীল মিমকে ধরে ধরেই ঘরে নিয়ে এলো। মিম ঘরে এসে সোফার উপর বসলো আর অর্নীলকে বলছে,
~ অফিসে যাব কবে আমি? আর কত বাড়িতে বসে থাকব? (বিরক্ত হয়ে মিম)
~ সুস্থ হও এরপর যেয়ো। ড্রেস চেঞ্জ করবানা?
~ কেনো?
~ তুমি তো প্রতিদিন এই সময় ড্রেস চেঞ্জ কর।
~ না আজ এখন করবনা।

~ কেনো?
~ দেখো হাত পা কেমন কালচে হয়ে গেছে। (অর্নীলের দিকে হাত বাড়িয়ে মিম) এগুলোর একটু কেয়ার তো নিতে হবে।
~ সে পরে হবে। আর সুস্থ হলে এগুলো এমনিতেই চলে যাবে।
~ তাও তুমি কি আমায় একটু হেল্প করতে পারবা?
~ কি?

~ বাথরুম থেকে একটা বোলে করে পানি এনে দাও আমায়। হালকা ডিটারজেন্ট মিশিয়ে নিয়ে এসো।
~ এইসব ও আমায় করা লাগবে?
~ না আমিই করব। তুমি শুধু এনে দাও।
~ আনছি।
অর্নীল মিমকে বোলে করে সাবান পানি এনে দিল।
~ দুই টুকরা লেবু এনে দিতে পারবা নিচ থেকে?

~ হ্যা এইটাও পারব। আর ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা ব্রাশ আছে দিয়ে যাও।
অর্নীল মিমকে ব্রাশ দিয়ে নিচ থেকে লেবু নিয়ে এলো। মিম হাতে পায়ের নখে লেবু ঘষছে আর অর্নীল আড়চোখে দেখছে মিম কি করে। আধা ঘন্টা পর মিম বলে,
~ এখন আমায় একটু ওয়াশরুমে নিয়ে চল।
~ রুপচর্চা শেষ?

~ আপাতত শেষ।
অর্নীল মিমকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। মিম হাত মুখ ধুয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে অর্নীলকে ডাকলো নিয়ে যাওয়ার জন্য। মিম খাটের উপর বসে অর্নীলকে বলে,
~ বডি লোশনটা দাও।

~ তোমাকে না ডক্টর লোশন লাগাতে নিষেধ করেছে?
~ বেবি লোশন লাগাতে বলেছে। তুমি কিনে আনোনি? (ভ্রু কুঁচকে মিম)
~ মনেই তো নেই। (আস্তে করে বলল অর্নীল)

~ এখন কি দিব আমি হাতে?
~ বিশ মিনিটে আসছি।
অর্নীল মিমের কথা না শুনেই সন্ধ্যা সাতটায় ছুটলো বউয়ের লোশন আনতে। মিম পিছু ডেকে অর্নীলকে থামাতেই পারলো না। একটা লোশন আনার জন্য গাড়ি বের করা বোকামি। তাই অর্নীল রিক্সায় করেই কসমেটিকস এর দোকানে গেলো। অর্নীল ঘর থেকে বের হওয়ার পর কাজের মেয়ে আসে মিমের কিছু লাগবে নাকি জিজ্ঞেস করতে। মিম বলে,

~ কিছুই লাগবেনা। গিটারটা আমায় দিয়ে চলে যাও।
সার্ভেন্ট মিমকে গিটার দিয়েই মিমের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিম অর্নীলের গিটারটা এখনো ছোঁয়নি তবে আজ ছুঁলো। গিটারটাও কালো রঙের, দেখতে খুব সুন্দর। মিম চেষ্টা করছে বাজানোর। কিছুক্ষণ পর মিম গিটার টা কোনোরকম বাজাতে পারলো৷ গিটারটা পাশে রেখে খাটের পাশের ফুলদানী থেকে মিম একটা রেড রোজ হাতে নিয়ে পাপড়ি গুলো ছিঁড়ছে আর ফ্লোরের উপর ফেলছে।

হঠাৎ ই মিম চোখ বন্ধ করে গুণগুণ করতে শুরু করলো। গুণগুণ শব্দটা আস্তে আস্তে প্রখর হলো। উপর থেকে গানের আওয়াজ শুনে অর্নীলের আম্মু নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। শিশির আম্মুকে নিয়ে উপরে এসে দেখে মিম খাটের সাথে হ্যালান দিয়ে চোখ বন্ধ করে গান গাইছে আর ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ছে। ওরা বাইরে থেকে মিমের গান শুনছে। আর অর্নীল বাড়িতে ঢুকেই গানের আওয়াজ পায় সাথে গিটারের টুংটাং শব্দ। অর্নীল উপরে গিয়ে দেখে বউমনি আর মা ওর ঘরের বাইরে দাঁড়ানো। অর্নীল সাইডে এসে দেখে মিম গান গাইছে!
যেমন করে নীড়ে একটি পাখি
সাথীরে কাছে তার নেয় গো ডাকি

যেমন করে সে ভালবাসে
কই তাহার মত তুমি আমায় কভুও ভাল বাসো না তো!
অলিরও কথা শুনে বকুল হাসে
কই তাহার মত তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো!
ধরার ও ধূলিতে যে ফাগুন আসে

কই তাহার মত তুমি আমার কাছে কভু আসো না তো!
মিম গান গাওয়া শেষেও চোখ বন্ধ করে গিটারটা টুংটাং করে বাজাচ্ছেই। মিমের চোখের কোণে পানি। হয়ত অর্নীলের কথাই ভাবছে আর অর্নীলের ভালবাসাই চাইছে! শিশির আর মা ঘরে ঢুকে। অর্নীল ও লোশনের প্যাকেটটা ড্রেসিংটেবিল এর উপর রেখে সেখানেই দাঁড়ায়।

~ তুমি এত সুন্দর গান গাও জানতাম না তো! কখনো শুনিনি। (শিশির)
শিশিরের আওয়াজ পেয়ে মিম বাস্তবে ফিরে আসে। হাত থেকে গিটারটা রেখে ভাল মত বসে।
~ গান আর কোথায় গাই! এমনিতেই গুণগুণ করি জাস্ট। তোমরা কখন এলে?
~ তুমি যখন স্বপ্নে ভাসছিলে তখন!
~ বস না।

~ একদম বসব না। স্ন্যাকস বানাতে হবে। অলরেডি আই এম লেইট।
~ আই এম সরি দিদিভাই। আমিও তো এই বাড়ির বউ কিন্তু কাজ করছো তুমি একা। (মিম)
~ ছোট বউমা এইসব কি বলছো তুমি? তুমি অসুস্থ না? (অর্নীলের আম্মু)
~ মেয়েটা এখনো স্বপ্নে ভাসছে মা। চলুন আমরা যাই। আপনার ছেলে সেই কখন থেকে ড্রেসিংটেবিল এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে!

অর্নীলের আম্মু বেরিয়ে যাওয়ার পর শিশির অর্নীলকে জিজ্ঞেস করে,
~ গানের মানেটা বুঝেছো তো?

~ বুঝে কি লাভ?
~ তুমি জানো সেইটা। একটু পর মিমকে নিয়ে নিচে এসো। স্ন্যাকস বানাচ্ছি আমি।
~ হুম।
বউমনি যাওয়ার পর অর্নীল মিমকে লোশনের বোতল দিলো।
~ এই যে তোমার বেবি লোশন।
~ থ্যাংক ইউ পতি বাবু।

~ এত ভাল গান গাও জানতাম না তো।
~ আরো কত কিছুই তো জানো না! আস্তে আস্তে জানবে।
~ মনে হয়। তো গানটা কাকে ডেডিকেট করলে?
~ যাকে করার তাকেই।
~ একটা কথা জিজ্ঞেস করব মিম?

~ অবশ্যই কর।
~ তোমায় বউ না মানলে কি হবে? কি হবে দুই চারটা বেবি না হলে? এভাবে ভাল আছি না?
~ এইটাকে যদি ভাল থাকা বলে তো ভাল আছো। (লোশন মাখতে মাখতে মিম)
~ আসলেই ভাল আছি। তবে গত তেইশদিনে আমি কেমন যেন হয়ে গেছি। তোমার প্রতি সেই আগের ফিলিংস গুলো পাইনা। কেমন যেন লাগে এখন তোমার পাশে আসতে। আগে তো লাগত না!
~ চৌধুরী আর ইউ ইন লাভ উইথ মি? (ভ্রু কুঁচকে মিম)
~ তুমি এইভাবে আর তাঁকাবেনা আমার দিকে মিম। অসস্তি হয়। তাছাড়া আমি প্রেমে পরিনি। আমার প্রেম কি যা তা নাকি যখন তখন পরে যাবে?

~ সেইটাই তো জিজ্ঞেস করলাম তোমায়।
~ শুধু আমায় সুস্থ হতে দাও, ঠিকমতো দাঁড়াই সেইদিন যদি তোমায় নাচিয়ে না ছেড়েছি তো আমি মিম না।
~ আরো নাচানো বাকি? তাছাড়া তুমি সুস্থ হওয়ার পর তোমার জন্যেও একটা সারপ্রাইজ আছে।
~ কি?
~ সুস্থ হও এরপর।

পর্ব ১৩

অর্নীলের দেওয়া সারপ্রাইজের কথা শুনে মিম মোটামুটি টেনশনে পরে গেল। কি করতে চাইছে মিস্টার চৌধুরী? মিম ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। শরীরের ক্ষতগুলো শুকিয়ে গেছে প্রায়। অথচ অর্নীল একদিন ও চোখ মেলে দেখলো না! প্রতিটাদিন অর্নীল চোখ বন্ধ করে মিমের শরীর ড্রেসিং করিয়ে দেয়। মিমের এইটাই ভাল লাগে। ড্রেসিং এর নামে তো অর্নীল ওর কাছে আসে, এতেই হবে। সারারত অর্নীল জেগে থাকে, এইটা ওর পুরনো অভ্যাস। এখন আরো মিমের জন্য জাগতে হয়।

মেয়েটা কখন কি চায়, না চায়! সবশেষে নয়দিন পর মিম নব্বই শতাংশ সুস্থ। মিম এখন হাঁটতে পারে। হাঁটতে গেলে কোনো কষ্ট হয়না। হাত পায়ের কালচে দাগগুলো ও যাচ্ছে আস্তে আস্তে। মিম খুশি হয়ে যায় সাথে অর্নীল ও। মিমের শ্বশুর মিমের সুস্থতার জন্য মসজিদে মিলাদ পড়ায় আর মসজিদে অনেক টাকা দান করে কাউকে না জানিয়ে। মিমকে এখন ধরে ধরে হাঁটাতে হয়না। মিম একদিক থেকে আপসেট কারণ এখন আর অর্নীল ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়ে হাঁটবেনা।
মিমের সুস্থতার দুইদিন পর,

ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে দশ৷ অর্নীল যেন কার সাথে ফোনে কথা বলছে খুব সিরিয়াস মুডে। মিম বসে বসে বই পড়ছে আর অর্নীলকে দেখে বোঝার চেষ্টা করছে কি হয়েছে! কথা বলা শেষে অর্নীল মিমকে বলে,
~ একদিন বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য? সারপ্রাইজ তোমায় আজকেই দিব। চল আমার সাথে। (জ্যাকেট পরে অর্নীল)
~ কোথায় যাব? চেঞ্জ করে আসি?

~ না। শুধু ওড়নাটা গায়ে জড়াও তাহলেই হবে। (অর্নীল ওর বন্দুকটা পকেটে ঢুকিয়ে)
~ তুমি গান নিচ্ছো কেনো চৌধুরী? কি করতে চাইছো তুমি?
~ লেটস গো!

মিমের হাত ধরে টানতে টানতে মিমকে ধরে গাড়িতে এনে বসায় অর্নীল। এরপর অর্নীল ও দ্রুত গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়।
~ কোথায় যাচ্ছি আমরা চৌধুরী? (মিম)

~ আগে তো চলো।
~ তুমি গান কেনো নিলা?
~ হুসসসসস। একদম চুপচাপ বসে থাকো৷

অর্নীল হাইস্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে আর দেখেই বোঝা যাচ্ছে অর্নীল ভীষণ বিরক্ত। অর্নীলের ফ্যাক্টরির গোডাউনে এসে গাড়ি থামালো অর্নীল। মিমকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মিমের হাত ধরে ভেতরে ঢুকলো অর্নীল। মিম বারবার জিজ্ঞেস করছে এখানে কেন কিন্তু অর্নীল কোনো জবাব দিচ্ছেনা। গোডাউনের ভেতরে গিয়ে মিম দেখলো পুলিশ অফিসার আর চারটা ছেলে সৈকত খানকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সৈকত খান হাসছে।
~ ওরা এখানে কি করছে চৌধুরী? (অর্নীলের হাত জড়িয়ে ধরে মিম)

~ অফিসার আগামীকাল সকালে সবাই জানবে সৈকত খান জেইল থেকে পালাতে গিয়ে এনকাউন্টারে মারা গেছে। লাশ একটা ওর নামে চালিয়ে দিবেন। কি তাই তো? (অর্নীল)
~ আপনি যা বলবেন স্যার!

~ আগামীকাল সময়মতো আপনার টাকা আপনি পেয়ে যাবেন। এখন আসুন। (অর্নীল)
~ গুড নাইট স্যার!
অর্নীলকে গুড নাইট জানিয়ে পুলিশ অফিসার চলে যায়। অর্নীল বাকি চারটা ছেলেকে বলল,
~ ড্রাগস কোথায়?

~ এই যে স্যার! (একটা ছেলে অর্নীলের হাতে প্যাকেটগুলো দিয়ে)
~ যে যার জায়গায় দাঁড়াও। আর মিম কোনো কথা ছাড়া তুমি ওই চেয়ারে বস আর দেখে যাও কি হয়। যাও!
মিম চেয়ারে গিয়ে বসলো এক ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে। কি করতে চাইছে অর্নীল? ও কি সৈকত খানকে মেরে ফেলবে নাকি? এই সারপ্রাইজ দিবে ও আমায়?

~ তারপর এতদিন জেইলখানা ভাল ছিল না আজ এই জায়গা ভাল লাগছে? (সৈকতকে জিজ্ঞেস করলো অর্নীল)
~ দুটোই এক লাগছে। (সৈকত খান)
~ আচ্ছা? বাংলাদেশে এত মেয়ে থাকতে আমার বউকেই কেন কিডন্যাপ করলি?
~ আমি মিমকে ভালবাসতাম আর এখনো বাসি।

সৈকত খান এই কথা বলার সাথে সাথেই অর্নীল সৈকত খানকে চড় মারল। সৈকত খান চড় খেয়ে নিচু হয়ে যায়। অর্নীল আবার ওর চুল ধরে চেয়ারে বসায়।

~ তুই মিমকে মলেস্ট কেন করলি? (অর্নীল)
~ শুধু মলেস্ট ই করেছি, ধর্ষণ করিনি। ধর্ষণ করলে তো খাওয়া মাল আবার তোমায় খেতে হতো। সেইটা কি তোমার ভাল লাগত অর্নীল চৌধুরী? (অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে সৈকত খান)
অর্নীলের রাগ এইবার আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যায়। অর্নীল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা সৈকত খানের বুক বরাবর লাথি মারে। মিম উঠে দাঁড়িয়ে অর্নীলের কাছে যায়। অর্নীলকে থামানোর চেষ্টা করছে মিম। কিন্তু অর্নীল না থেমে সৈকত খানের বুকে পা রেখে চার প্যাকেট ড্রাগস সৈকত খানকে খাইয়ে দেয়। মিম প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে সৈকত খানের কাশি দেখে। কাশতে কাশতে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা সৈকত খানের কিন্তু তাও অর্নীল ওকে ড্রাগস খাইয়েই যাচ্ছে।

~ তোর শাস্তি এইটাই। তুই মিমকে ড্রাগস খাইয়েছিলি না? ওর শরীরে এলকোহল ঢেলেছিলি না? রাফিইইই এসিড কোথায়? (চিল্লিয়ে অর্নীল)
~ এইযে স্যার। (রাফি)

~ চৌধুরী এসব করনা তুমি। চৌধুরী ওর শাস্তি আইন দিবে। তুমি ছেড়ে দাও ওকে প্লিজ। ও তো মরে যাবে। চৌধুরী? (কান্না করতে করতে মিম)
~ সানি মিমকে ওই চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখ তো। আমি ধরছি তুই বাঁধ। (অর্নীল)
~ চৌধুরী? (শান্ত গলায় মিম)

~ ইয়েস! চৌধুরী। (অর্নীল)
অর্নীল মিমকে চেয়ারে বসিয়ে বেঁধে দেয় যাতে মিম নড়তে না পারে। সৈকত খানের শার্ট খুলে ওর পুরো শরীরে এসিড ঢেলে দেয় অর্নীল। সৈকত খান খুব জোরে চিৎকার করছে। সৈকত খানের হাতের আঙুল গুলো একটা একটা করে কাটে অর্নীল। এইটা দেখার পর মিম অজ্ঞান হয়ে যায়। দশটা আঙুল কাটার পর সৈকত খানের যখন মরমর অবস্থা তখন অর্নীল সৈকত খানকে বলে,
~ এইটা তোর শাস্তি মিমকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। ভাল থাকিস ওইপারে। অকালে তোর বউকে বিধবা করতে চাইনি আমি কিন্তু কি করব বল আমার বউকে কষ্ট দেওয়ার বদলা তো আমাকে নিতেই হত কারণ আমি ভালবাসার জন্য ডেস্পারেট!

এই কথা বলেই অর্নীল সৈকত খানের কপাল বরাবর শুট করলো। তখনি মারা গেল সৈকত খান। অর্নীল ওর জ্যাকেট খুলে জ্যাকেটের ট্যাগটা উঠিয়ে সেই জ্যাকেটটা সৈকত খানের বডির উপর ছুড়ে মারলো। এরপর ছেলে চারটাকে বলল,

~ আঙুল গুলো গুণে গুণে ওর বডির সাথে রেখে ফেলে দিয়ে আয়। আর এইখান থেকে রক্তের দাগ সব মুছে ফেল। কালকে সকালে যেন সবকিছু স্বাভাবিক থাকে। (পানি দিয়ে হাত ধুতে ধুতে অর্নীল)
~ ওকে স্যার। ম্যাম অনেক আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছে স্যার।
~ দেখছি আমি। (মিমের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)

হাত ধুয়ে মিমের কাছে গেলো অর্নীল। মিমের বাঁধন খুলে দিয়ে মিমকে অজ্ঞান অবস্থাতেই কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠালো অর্নীল। সিটবেল্ট বেঁধে দিয়ে মিমের মাথাটা অর্নীল ওর ঘাড়ের উপর রেখে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে গেল। বাসায় এসে নিজের ঘরে মিমকে শুইয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো অর্নীল। এরপর মিমের মুখে পানি ছিটানোর কিছুক্ষণ পর মিমের জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ খুলে অর্নীলকে দেখে মিম অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে।
~ এইটা তুমি কি করলা চৌধুরী? কেনো মারলা তুমি মিস্টার খান কে? (কাঁদতে কাঁদতে মিম)
~ ওর কপালে মৃত্যু ছিল তাই। (মিমকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ এত ভয়ঙ্কর ভাবে কেনো মারলা তুমি?
~ ইচ্ছে ছিল তাই।

~ আমাকে যে কষ্ট দিবে তাকে এইভাবেই শাস্তি দিবা তুমি চৌধুরী? (ছলছল চোখে অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে মিম)
~ এরপরেও সন্দেহ আছে? (মিমের চোখের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ তবে নিজেকে কি শাস্তি দিবা তুমি?
~ মানে?

~ সেই বিয়েরদিন থেকে তুমি আমায় কষ্ট দিচ্ছো না আমাকে তোমার থেকে দূরে সরিয়ে রেখে?
মিমের এই প্রশ্নের উত্তর অর্নীলের কাছে নেই। অর্নীল খাট থেকে নেমে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। মিম খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদছে। অর্নীল জানালার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। অর্নীল এক সময় টি টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে গ্লাসটা চেপে ধরে ভেঙে ফেলে। গ্লাস ভাঙার আওয়াজ শুনে মিম মাথা তুলে তাঁকায়। তাঁকিয়ে দেখে অর্নীলের বাম হাত থেকে রক্ত ঝরছে আর গ্লাসের কাঁচগুলো হাতে বিঁধে আছে। অর্নীল তখনো বাইরে তাঁকিয়ে জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। মিম দ্রুত খাট থেকে নেমে এসে অর্নীলের হাত ধরে একটা একটা করে কাঁচ তুলে হাত থেকে।

~ পাগল হয়ে গেছো তুমি? কি করছো এসব? (চিল্লিয়ে মিম)
মিমের চিল্লানো শুনে আরুশ আর শিশির দৌড়ে ওদের ঘরে আসে। আরুশের ঘর অর্নীলের ঘরের পাশেই। মিম চোখ মুছে দরজা খুলে আবার অর্নীলের হাতের কাঁচ তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
~ এ কি? অর্নীল? হাত এইভাবে কেটেছো কিভাবে? (শিশির)
~ কিরে ভাই? কি করেছিস তুই এসব? হাত কাটলো কিভাবে? (আরুশ)

~ মিম তোমার কি হয়েছে? চোখ মুখ ফোলা কেনো? কেঁদেছো কেনো? কি হয়েছে? (শিশির)
~ কিছুনা দি ভাই। তোমরা গিয়ে ঘুমাও। আমি ওর হাত ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি। (মিম)
~ বললেই হলো ঘুমাও? আরুশ ফার্স্ট এইড আনো। (শিশির)
~ আনছি।

মিমকে খাটে বসিয়ে শিশির অর্নীলের হাত ব্যান্ডেজ করে দিলো। অর্নীলের চোখ মুখ রক্তের মতো লাল হয়ে আছে। একটা কথাও অর্নীল বলছেনা। মিম খাটে বসেই মাথা নিচু করে কাঁদছে। আরুশ ফ্লোরে পরে থাকা কাঁচগুলো তুলে বাস্কেটে ফেলল আর রক্তগুলো মুছে দিলো। অর্নীলের হাতে ব্যান্ডেজ করা শেষ হলে শিশির বলে,
~ কি হয়েছে তোমাদের? একজন হাত কেটেছো আরেকজন কাঁদছো! কি হয়েছে মিম? (শিশির)
~ ভাই তুই তো কিছু বল কি হয়েছে? (আরুশ)

~ বউমনি, ভাইয়া তোমরা একটু বের হও। আমার মিমের সাথে কথা আছে। (দাঁড়িয়ে অর্নীল)
~ কিন্তু হয়েছে টা কি? (শিশির)

আরুশ শিশিরকে ইশারা করলো বের হওয়ার জন্য। শিশির বেরিয়ে এলো। আরুশ বলল,
~ প্লিজ আর অশান্তি করিস না ভাই।

আরুশ ওতটুকু বলেই চলে গেল। মিম পা ঝুলিয়ে বসেছিলো খাটে। অর্নীল মিমের সামনে ফ্লোরে আসন পেতে বসে। মিমের কোলের উপর ডান হাত রেখে বলে,

~ আমি তো নিজেই নিজেকে মেরে ফেলতে পারবনা মিম। আমি বড়জোর নিজের ভুল শুধরে নিতে পারি। আসলেই তো আমি অপরাধী। কান্না কইরো না প্লিজ (মিমের হাত ধরে অর্নীল)। ও মিম তাঁকাও না প্লিজ!
মিম তাও কেঁদেই যাচ্ছে। পরে অর্নীল ওর ব্যান্ডেজ করা হাতটা মিমের অশ্রুসিক্ত গালে রাখলো। মিম তাও তাঁকাচ্ছেনা।

~ আই এম সরি মিম। অর্নীল কখনো এভাবে কারো কাছে ক্ষমা চায়নি মিম। মাফ করবানা আমায়? নাকি চাইছো আমি নিজেই নিজেকে মেরে ফেলি? (অর্নীল)
~ না৷
~ কি না?

~ আমি চাইনা তুমি মরে যাও।
পরে মিম নিজেও নিচে নেমে অর্নীলের কোলে বসে অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে।
~ আই লাভ ইউ! (কাঁদতে কাঁদতেই মিম)

~ আই লাভ ইউ ঠু। (মিমের ঘাড়ে চুমু দিয়ে অর্নীল)
প্রায় দশ মিনিট দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে রাখে। অর্নীলের শার্ট ভিজিয়ে ফেলেছে মিম চোখের পানি দিয়ে। অর্নীল পরে মিমের কোমড় জড়িয়ে ধরে উঠে দাঁড়ায়। মিম ও কান্না থামায়। মিম বিছানা ঠিক করে আর কান্নাভেজা গলায় অর্নীলকে বলে,
~ শার্ট, প্যান্ট সব চেঞ্জ করে আসো। এই ড্রেসগুলো আর কখনো পরবানা। সৈকত খানের রক্ত লেগে আছে এই জামাতে।
~ আচ্ছা পরবনা।

অর্নীল কোনোরকম প্যান্ট চেঞ্জ করে ট্রাউজার পরে আসে কিন্তু শার্টের বোতাম একহাত দিয়ে খুলতে পারলেও শার্ট খুলতে পারছেনা। শার্ট অর্ধেক খোলা অবস্থায় অর্নীল মিমের সামনে এসে বলে,
~ খুলতে পারছি না।
~ ঘুরো।

অর্নীল ঘুরে দাঁড়ালে মিম অর্নীলের শার্টটা খুলে দেয় খুব সাবধানে। এরপর একটা টি শার্ট পরিয়ে দেয় অর্নীলকে। মিম ও চেঞ্জ করে এসে শুয়ে পরে। অর্নীল বিছানায় উঠেই লাইট অফ করে দেয়। অর্নীল সোজা হয়ে শুয়ে পরে আর মিমের দিকে তাঁকায়। এরপর ডানহাত দিয়ে মিমকে ধরে নিজের বুকে শোয়ায় অর্নীল। মিম অর্নীলের দিকে তাঁকায়।

~ সরি ফর এভ্রিথিং। (মিমের কপালে চুমু দিয়ে অর্নীল)
~ আর কখনো কষ্ট দিবা না তো? (মিম)
~ না অভিমানী।
মিম অর্নীলের বুকে শুয়ে অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে যায়। অর্নীল ও ঘুমিয়ে যায় মিমের পিঠে হাত রেখে।
সকালে,

রোদ যে উঠেছে সেই খেয়ালই নেই মিম আর অর্নীলের। দুজন অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সকাল নয়টা বেজে গেছে কিন্তু কারো কোনো খবর নেই। শিশির ভাবছে কি হলো ওদের? ওত রাতে ঝামেলার পর এখনো কারো হুশ নেই কেন? শিশির চিন্তায় পরে যায়। শিশির দ্রুত উপরে আসে। এসে দেখে ওদের দরজা চাপানো। অর্নীল কি কালকে আর দরজা লাগায়নি? শিশির ইতস্তত করে ওদের ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে দেখে মিম অর্নীলের বুকে ঘুমাচ্ছে আর অর্নীল বাম হাত খাটের উপর ছড়িয়ে রেখেছে আর ডানহাত দিয়ে মিমকে জড়িয়ে রেখেছে। শিশির ওদের এইভাবে দেখে হেসে দেয়। শিশির আস্তে আস্তে ওদের সামনে যায় আর এলার্ম ঘড়িতে এক মিনিট পরের এলার্ম দিয়ে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর হাসছে।
এক মিনিট পর,

অর্নীলের বেড সাইডে এলার্ম বাজছে। মিমের ঘুম ভেঙে যায়। মিম ঘুম ভেঙে শিশিরকে দেখে চরম লজ্জা পায়। শিশির হাসছে। মিম ঘুম থেকে উঠে অর্নীলের টি শার্ট টান দিয়ে নিচে নামিয়ে দেয় আর ও খাট থেকে নেমে এসে এলার্ম অফ করে।
~ দিভাই তুমি? (চুল আটকে মিম)

~ জ্বি আমি। রাতে এত প্রেম করেছেন যে নয়টা দশ বাজে সে খেয়াল নেই, না? (হেসে শিশির)
~ না তা না। চৌধুরী? এই চৌধুরী? উঠো না? (অর্নীলকে ধাক্কিয়ে মিম)
~ বলো?
~ নয়টা দশ বাজে।
~ কিহ? (চোখ খুলে অর্নীল)

পর্ব ১৪

অর্নীল ঘুম থেকে জেগে থেকে বউমনি ওদের ঘরে। অর্নীল দ্রুত উঠে আঙুল দিয়ে চুলগুলো ঠিক করলো। মিম অর্নীলকে বলছে,
~ ফ্রেশ হয়ে এসো। ব্রেকফাস্ট করবেনা?

~ কতদিন ধরে অফিসে যাই না! আমি ভেবেছিলাম আজকে অফিসে যাব। বউমনি আমার খাবারটা ঘরে পাঠিয়ে দাও। আমি খেয়েই বের হচ্ছি।

এই বলেই অর্নীল দ্রুত ওয়াশরুমে গেলো। মিম মুখ ধুয়ে নিচে আসে। শিশির মিমকে দিয়ে অর্নীলের খাবার পাঠালো। খাবার খেয়ে অর্নীল রেডি হতে শুরু করলো। মিম বলছে,
~ আসবা কখন?

~ রাত তো হবেই। (শার্টের বোতাম লাগানোর চেষ্টা করছে অর্নীল)
~ দাঁড়াও আমি লাগিয়ে দেই।
মিম অর্নীলের শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিয়ে অর্নীলের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে অর্নীলের চুল ঠিক করলো। অর্নীল মিমকে বলছে,
~ ঘড়ি?
~ দাঁড়াও সেইটাও পরিয়ে দিচ্ছি। (মিম)

মিম অর্নীলকে পুরোপুরি রেডি করিয়ে দিলো। মোজা, জুতা ও মিম পরিয়ে দিয়েছে। অর্নীল নিচে নেমে যাচ্ছে আর মিম ও আসছে পিছু পিছু। বাড়ির সবাইকে বাই বলে অর্নীল বেরিয়ে গেল। বাড়ির বাইরে পর্যন্ত মিম এগিয়ে গেছে অর্নীলের সাথে। অর্নীল গাড়িতে উঠতে যাবে তখন মনে হলো কিছু একটা মিস করে যাচ্ছে। অর্নীলের কিছুদূরে গার্ডেনে মিম দাঁড়িয়ে আছে। অর্নীল গাড়ির দরজা বন্ধ করে আবার মিমের কাছে ব্যাক করলো।
~ এখনো বাসায় যাচ্ছো না কেনো? (অর্নীল)
~ আজকে তুমি ড্রাইভ করনা। ড্রাইভারকে নিয়ে যাও। হাত কাটা তো তোমার! (মিম)
~ আচ্ছা।
~ বাই। রাতে দেখা হচ্ছে। যাও এখন।

মিম একথা বলেই ঘুরে চলে আসতে নেয় তখন অর্নীল ডান হাত দিয়ে মিমের হাত ধরে মিমকে ঘুরায়। মিম অবাক হয়ে অর্নীলের দিকে তাঁকায়।
~ কি হলো? (মিম)

অর্নীল মিমের কপালে চুমু দিয়ে বলে,
~ এইটা না করেই যাচ্ছিলাম বলে বারবার পিছু তাঁকাতে ইচ্ছে করছিলো। যাও বাসায় গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিও আর সকালের ওষুধ মনে করে খেয়ে নিও। আসছি।
~ থ্যাংক ইউ।

এরপর হেসে মিম চলে যায় আর দশটায় অর্নীল অফিসের জন্য বের হয়। আজকে অর্নীল নিজে ড্রাইভ করছেনা, ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। অর্নীল জানালার পাশে বসে ভাবছে কি থেকে কি হয়ে গেল? তবে যা~ ই হয়েছে ভালই হয়েছে। অর্নীল অফিসে এসে নিজের কেবিনে যায়। অর্নীলকে দেখে আকাশ বলে,
~ স্যার, ম্যাম ফোন করেছিলো আমাকে কিছুক্ষণ আগে।
~ কেনো?

~ আপনার হাত কেটে গেছে তাই আপনাকে কোনো কাজ করতে দিতে মানা করেছে। ল্যাপটপ ধরতেও নিষেধ করেছে।
~ আচ্ছা তুমি গত এক মাসের ফাইলগুলো আর হিসাব আমাকে বুঝিয়ে দাও।
~ ওয়েট স্যার।

~ নতুন ডিজাইনস গুলো ও নিয়ে এসো।
~ তবে স্যার গত মাসে আমাদের প্রফিট ৪০% বেড়েছে। রেকর্ড সংখ্যক প্রফিট এই প্রথম ই।
~ তাই?

~ জ্বি স্যার। বলতেই হচ্ছে ম্যাম আপনার জন্য অনেক লাকি! আপনার বিয়ের পরই কিন্তু এত প্রফিট!
~ আচ্ছাহ? (হেসে দিয়ে অর্নীল)
~ ইয়েস স্যার৷ আমি ফাইল নিয়ে আসছি।

আকাশ যাওয়ার পর অর্নীল চেয়ারে বসে ভাবছে মিমের কথা। কালকে রাতে ও মিমকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছে এইটাই ভাবছে অর্নীল বারবার। অর্নীল অফিসের ফাইল চেক করে দেখলো সব ঠিক আছে আর আকাশের কথাও সত্যি। অর্নীল পুরো অফিস ঘুরে ঘুরে নতুন ডিজাইন দেখলো আর ডিজাইনারদের ডিজাইনগুলোর ভুল ধরে দিলো। সবাই জিজ্ঞেস করছিলো অর্নীলের হাতে কি হয়েছে? অর্নীল শুধু বলেছে কেটে গেছে।

সারাদিন অফিস নিয়ে কাটিয়ে দিলো অর্নীল। দুপুরে মিম ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে খেয়েছে কি না। রাত এগারোটা বেজে যায় অর্নীলের সব ঠিকঠাক করে অফিস থেকে বের হতে। মিম ডিনার না করেই বসে আছে অর্নীলের জন্য। বাসায় আসতে আসতে পৌনে বারটা বেজে গেছে অর্নীলের। গাড়ির আওয়াজ পেয়ে মিম বারান্দায় তাঁকিয়ে দেখে অর্নীল এসেছে। মিম নিচে নেমে আসে দ্রুত। সবাই শুয়ে পরেছে। মিমকে দেখে অর্নীল বলে,
~ এখনো জেগে আছো?
~ তো কি ঘুমিয়ে যাব?

~ এইটাই করা উচিৎ ছিল।
~ ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো। আমি খাবার বারছি।
~ তুমি ঘরে আসো আগে। শার্ট টা খুলে দিবা।
~ আচ্ছা আসতেছি।
মিম অর্নীলের শার্ট খুলে দিয়ে নিচে এসে খাবার বারতে শুরু করে। অর্নীল ফ্রেশ হয়ে নিচে যায় খেতে।
~ তুমি খাওনি? (অর্নীল)
~ না। কি দিয়ে খাবা?
~ শুধু সবজি দাও। মাছ খাব না।

~ শুগার মাপাইছিলা রিসেন্টলি?
~ না।
~ আগামীকাল ডক্টরের কাছে যাবা গিয়ে শুগার চেক করাবা।
~ এই আস্তে! আমি এত ভাত খাইনা রাতে। (মিমকে থামিয়ে অর্নীল)
~ আচ্ছা অল্পই দিচ্ছি। শুরু কর।
~ তুমি?
~ খাচ্ছি তো।
দুজন একসাথে খাওয়া শেষ করে অর্নীল ঘরে চলে আসে। মিম প্লেটদুটো ধুয়ে সব গুছিয়ে রেখে আসে। এসে দেখে অর্নীল বই পড়ছে। মিম দরজা লাগিয়ে দিয়ে বলে,

~ আজ থেকে ডক্টর ওষুধ লাগাতে নিষেধ করেছে। দাগ নাকি সেড়ে গেছে।
~ তাহলে তো সেইটা খুব ভাল খবর।
~ তুমি ঘুমাবা কখন?
~ এইত কিছুক্ষণের মধ্যেই। কেনো? (বই থেকে মুখ সরিয়ে অর্নীল)
~ কতদিন ধরে আমি সাজুগুজু করিনা। অনেক ইচ্ছে করছে সাজতে৷
মিমের কথা শুনে অর্নীল হেসে দিলো।
~ হ্যা তো সাজো। না করেছে কেউ?
~ শাড়ি পরাবে কে? আমি তো শাড়িই পরতে পারিনা।

~ চেষ্টা কর। আর সাজতে গেলে শাড়ি পরা লাগে নাকি?
~ হ্যা লাগে তো। আমি রোমান্টিক উপন্যাস গুলোতে পরেছি সাজ আর শাড়ি এই দুয়েই নাকি নারি!
~ তাহলে আর কি! শুরু কর। আমি ঘুমিয়ে গেলে ডাক দিও। তোমার সঙ সাজা দেখব নে।
~ চৌধুরীইইই? (চোখ পাঁকিয়ে মিম)
~ আরে না আমি মজা করছিলাম। তুমি আরামসে সাজো। (অর্নীল)
~ আচ্ছা।

মিম কাবার্ড থেকে একটা শাড়ি বের করলো। মিম ওয়াশরুম থেকে ব্লাউজ পরে আসে আর শাড়িটা উপর দিয়ে পেঁচিয়ে ঘরে আসে।
~ ব্লাউজের সাথে জিন্স! নাইস কম্বিনেশন। (মিমকে টিজ করে অর্নীল)
~ এইইই একদম টিজ করবানা হ্যা? পেটিকোট আমি পরতে পারিনা।
~ আমি কি কিছু বলেছি? সাজো তোমার যেভাবে ইচ্ছা!
~ ওকেহ। এমন সাজ সাজব না, দেখে চোখ ফেরাতে পারবানা!
~ হইছে!

অর্নীল বই পড়ছে আর মিমকে দেখছে ও কি করে। মিম কোনোরকম শাড়িটা পরতে পারলেও সামলাতে পারছেনা। শেষে ও শাড়ির আচল কাঁধে ঝুলিয়ে সাজতে বসে গেলো। অর্নীল ড্রেসিংটেবিল এর উপর হাত রেখে মিমকে বলে,
~ এগুলো সব মেকাপ?
~ হ্যা।
~ কোনটার নাম কি?
~ চিনো না?
~ এইটার নাম কি?
~ কন্সেলর।
~ এইটা?

~ আই শ্যাডো।
~ আর এইটা?
~ মাশকারা।
~ ভাগ্যিস বিয়ে করেছিলাম! নাহলে এইসব তো চিনতাম ই না! তুমি সাজো, আমি দেখি হ্যা?
~ দেখেন।

মিম সাজছে আর অর্নীল সাইডে দাঁড়িয়ে দেখছে। সাজা শেষ হয়ে গেলে অর্নীল মিমের কপাল থেকে টিপটা সরিয়ে দেয়।
~ টিপে একদম তোমায় মানায় না। সত্যিই দারুণ লাগছে। (অর্নীল)
~ থ্যাংক ইউ।
~ শাড়িটা ঠিক করে পরো।
~ পারছিনা।
~ আমি হেল্প করছি

~ সত্যি?
~ হুম। খুলো শাড়ি।
অর্নীল চেষ্টা করলো কাটাহাতে মিমকে শাড়ি পরিয়ে দেওয়ার। খুব ভালো না পারলেও মোটামুটি পেরেছে অর্নীল।
~ এফোর্টলেস লাগছে! (অর্নীল)
~ তুমি পরিয়ে দিয়েছো না তাই সুন্দর লাগছে।
~ এখন কি ছবি তুলবা? তুলে দিব?
~ না। আমি ছবি তোলার জন্য সাজিনি চৌধুরী।
~ তো?
~ তো কি আমি বুঝিয়ে দিব?

~ দাও। (অর্নীল বুঝেও না বুঝার ভান করছে কারণ ও চাইছে মিম ওর কাছে আসুক)
~ ঠিক আছে।
মিম অর্নীলের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে অর্নীলের গলা জড়িয়ে ধরলো। লিপস্টিক ঠোঁটে যা লাগিয়েছিলো মিম তার সব অর্নীলের ঘাড়ে মেখে দিলো। অর্নীল একহাতে মিমকে জড়িয়ে ধরে আছে। অর্নীল মিমকে ওর পা থেকে নামিয়ে মিমের দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে ছিলো। মিমের চুল গলা থেকে সরিয়ে অর্নীল নিচু হয়ে মিমের গলায় কিস করলো। মিম একটু দূরে সরে যায়।

অর্নীল মিমের সামনে গিয়ে মিমকে কাবার্ডের সাথে দাঁড় করালো। মিমের মুখ লাল হয়ে গেছে। সে কি লজ্জায় না আনন্দে সেইটাই অর্নীল বুঝছে না! মিমের ঠোঁট নিজের আয়ত্ত্বে নিয়ে আসলো অর্নীল। অর্নীলের কাটা হাত মিমের কোমড়ে আর ডান হাত মিমের এক হাতের উপর। মিম সরে আসতে চাইলেও অর্নীল আসতে দেয়না মিমকে। অর্নীলের সাদা টি শার্টে মিমের কাজল আর লিপস্টিক লেগে আছে।
~ কাঁপছো কেনো? (অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করলো)
~ তুমি কাঁপাচ্ছো কেনো? (অর্নীলের মুখের দিকে তাঁকিয়ে মিম)
~ এইটাই তো চেয়েছিলে তুমি!

~ তুমি চাও নি?
~ এখন চাইছি। (অর্নীল)
অর্নীল এই কথা বলার পর মিম শক্ত করে অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে।
~ একটা রিকোয়েস্ট করি?
~ কি?

~ কাল থেকে জিন্স, টপস, শার্ট এসব পরা বাদ দিও। প্রতিদিন সকালে তুমি ভেজা চুলে লাল পাড়ের শাড়ি পরে আমার সামনে এসো। আর কিছু চাইনা আমার। তুমি একটু আগেই বললে না শাড়িতেই নারী? একটু গহনা পরার চেষ্টা কর। স্বর্ণ পরতে না পারলেও সমস্যা নেই, তোমার তো কত ডায়মন্ডের গহনাও আছে। এত খালি বিবাহিত মেয়েদের মানায় না মিম। হাতে ব্রেসলেট না পরে চিকন চুড়িগুলো ও তো পরতে পারো। মেকাপের বদলে হালকা পাউডার তো ব্যবহার করতে পারো। নাকফুল পরলে তোমায় আরো কত সুন্দর লাগবে তুমি জানো? ছোট্ট একটা নাকফুল পইরো। হাতে রিং পরবা। কেনো এত সিম্পল থাকো তুমি?
~ এইসব তুমি চাও?

~ এসব আমার ড্রিম ছিল আমার বউয়ের জন্য। ঠিক একারণে তোমাকে আমার অযোগ্য বলতাম কারণ তুমি জেদি। কারো কথা শুনে কিছু করনা। আমি বললেই কি তুমি পালটে ফেলতা নিজেকে?
~ হয়ত না। তবে এখন পারব।
মিম ড্রেসিংটেবিল এর সব দামী দামী মেকাপ ঝুড়িতে ফেলে দিলো। তবে সেইটা রাগ করে নয়, অর্নীলকে ভালবেসে। কাবার্ড খুলে কতগুলা গহনার বাক্স বের করলো মিম। গলায় ছোট্ট একটা লকেট পরলো আর কানে টপ। হাতে দুইটা স্বর্ণের রিং পরলো আর নাকে ছোট্ট একটা নাকফুল। বিয়ের দিন নাকফুল পরে খুলে রেখেছিলো মিম। হাত থেকে ব্রেসলেট খুলে স্বর্নের চিকন চিকন চারটে করে মোট আটটা চুরি দুইহাতে পরলো মিম। চুল হাতখোপা করে অর্নীলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

~ এখন কেমন লাগছে আমায়?
~ ভীষণ মিষ্টি লাগছে, অনেক লক্ষ্মী একটা মেয়ে লাগছে। এতদিনে বউ বউ লাগছে।
~ কালকে সকালে সব জামাকাপড় ফেলে দিব শুধু শাড়ি কিনব।
~ আমি তোমার মনের উপর জোর করছিনা মিম।
~ আমি তো বাধ্য হয়ে এসব করছিনা চৌধুরী। আমি সত্যিই তোমাকে ভালবাসি। তোমায় ভালবেসেই করছি। (অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে মিম)
~ এসো।
অর্নীল মিমকে নিয়ে খাটে বসালো। মিমকে বলল,

~ আজীবন এইভাবে থাকতে পারবা তো? প্রতিদিন ভেজা চুলের বারি দিয়ে আমায় ঘুম ভাঙাতে পারবা তো? মাঝে মাঝে ফুল দিয়ে একটু সাজতে পারবানা আমার জন্য?
~ সব পারব। আই ক্যান ডু এভ্রিথিং ফর ইউ। তুমি আমায় কোনোদিন কষ্ট দিও না তাহলেই হবে।
~ দিবনা।
(এরপর যাহলো তা বলার অপেক্ষা রাখেনা)
সকাল ঠিক ছয়টায়,

মিম ঘরের পর্দাগুলো সব সরিয়ে দেয়। বারান্দার থাই খুলে দেয়। অর্নীল কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। মিমের চুল থেকে টপটপ পানি পরছে। মিম লাল পাড়ের অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি পরা। হাতে চুরি, আংটি আর গলায় একটা পেনডেন্ট, নাকে নাকফুল আর কানে ছোট্ট দুল। মিম আস্তে আস্তে অর্নীলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুলের পানি চিপড়িয়ে সব অর্নীলের উপর ফেলল। এম্নিতেই রাতে ঘুমাতে অনেক দেরি হয়েছে তার উপর এত সকালে কে পানি মারলো? অর্নীল চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে মিম দাঁত বের হাসছে। সত্যি সত্যিই মিম অর্নীলের চাওয়া মতো সেজেছে! অর্নীল শিউর হওয়ার জন্য মিমের হাত ধরে টান মারলো। মিম সোজা এসে অর্নীলের বুকের উপর পরলো। মিম অর্নীলের চুল সরিয়ে দিয়ে অর্নীলের কপালে চুমু দিলো।

~ আমি কি ভুল কিছু দেখছি? (অর্নীল)
~ জ্বি না চৌধুরী, আপনি ঠিকঠাক দেখছেন। উঠবেন না? আটটায় না অফিস? মর্নিং ওয়াকে যাবেন না?
মিমের সব ভেজাচুল অর্নীলের মুখের উপর।

~ ছাড়বানা? শাড়ি খুলে যাচ্ছে তো! (মিম)
~ খুলুক। আমি একটু আমার বউকে দেখি।
~ হইছে থাক। উঠো, এক্সারসাইজ করে আসো যাও।

~ আমি এই প্রথমবার কোনো নারীর উপর ক্রাশ খেয়েছি। এর আগে শাইমা ভালবাসা ছিল কিন্তু ক্রাশ ছিল না।
~ আবার শাইমা? (চোখ রাঙিয়ে মিম)
~ সরি বাট তোমায় এত সুন্দর লাগছে কেনো? মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি তো! (মিমের কোমড়ে হাত দিয়ে অর্নীল)
~ তুমি ছাড়ো আমায়। রোমান্স আবার রাতে কইরো। আমিও অফিসে যাব আজকে।
~ শাড়ি পরেই?
~ হ্যা।
~ আদর কর একটু আমায়? (অর্নীল)
~ এইযে কি শুরু করছে! আমার শাড়িটা খুলেই ফেলবা দেখছি!
~ খুলুক।

লেখা – নীলিমা জেবিন তনয়া

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “ডেস্পারেট লাভ – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – ডেস্পারেট লাভ (শেষ খণ্ড) – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক