রিলেশনশিপ

গ্যাংস্টার লাভ স্টোরি (বাংলা)

গ্যাংস্টার লাভ স্টোরি (বাংলা): “এত ভুল হয় কি করে? তখনো তো আমার পায়ে তুমি পা লাগিয়ে দিয়েছিলে। এখন এলাম না দাঁড়িয়েছো। আর না নিজের মাঝে আছো। মনে হয় ভাবনার সাফাত্যে চলে গিয়েছিলে।


পর্ব ১

আজ কলেজে নতুন স্যার আসবে। সবার মাঝে টানটান উত্তেজনা। বিশেষ করে মেয়েদের। তবে একজন বাদে।

হুম লিমার সেদিকে না আছে কোনো আগ্রহ আর না আছে কোনো উত্তেজনা। কলেজের আসার পর থেকে দেখছে মেয়েদের হুড়াহুড়ি আর কলরব। সবার মুখে এক কথা “নতুন স্যার।” নতুন স্যার কে নিয়ে সবাই কথা বলছে। শুনা গেছে সে দেখতে খুবি সুদর্শন আর স্মার্ট। কিন্তু একমাত্র লিমারই সে দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ তার মন দখল করে আছে অন্য কেউ।

প্রিন্সিপাল সহ সব প্রফেসর আর স্টুডেন্ট হাতে হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নতুন স্যার কে শুভেচ্ছা জানাবে। সবার হাতে ফুল আর মুখে হাসি। কিন্তু লিমার মুখ বেজার। বিষয়টার তার “ডোন্ট কেয়ার” ভাব পাত্তাই দিচ্ছে না এটার মাঝে।

ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে আরিফা।
“তুই এত লাফালাফি করছিস কেন? দম যেন তোর আহামরি করছে। ভালো করে একটু দাঁড়া। এখনি তো আমার পা টা বর্তা করে দিতি।”
লিমার কথা শুনে আরিফা জবাব দেয়,

“দেখ আজ এমন করিস না। শুনেছি নতুন স্যার নাকি অনেক সুন্দর। দেখতে নাকি প্রিন্স। ইসস আমার যে আর তর সইছে না।”
“তো আমি কি করব? তোর মতো কি আমি লুচ্চা নাকি? পারলে তুই গলায় ঝুলিয়ে নাচতে থাক। আজাইরা।”

“ঢং। যতসব বাজে কথা।”
“বাজে কি বললাম আমি?”
“এএ তুমি পাইছো একজন রে। চিনো না জানো না দেখোনি। তার জন্যেই দেওয়ানা হয়ে থাকো সবসময়। আর কারো দিকে নজর দেস না তুই। কত ভালো ভালো ছেলে কে তুই রিজেক্ট করেছিস জানিস? একেক জন কতটা সুন্দর আর স্মার্ট ছিল দেখেছিলি কি একটু নজর দিয়ে?”

আরিফার কথা শুনে লিমা রেগে যায়।
“বান্দরনী ভুলেও আমার সাফাত কে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না। না হলে এখানেই তোর মাথা ঘেরে রাখব।”
আরিফা একটা মুখ ভেংচি দেয়। বিড়বিড় করে বলে,

“পাইছে এক আবাল। যাকে কোনো দিন দেখেওনি তার জন্যে তিনি পাগল। কিছু বললেও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে।”
“কি বললি? কি বললি তুই?”
“দোস্ত সিনক্রিয়েট করিস না। এখনি হয়তো..”

আরিফার কথা শেষ হতে না হতেই মেয়েদের চিৎকার শুনা যায়। নতুন স্যার চলে এসেছে।

সবাই এক সাথে চিৎকার করছে। যেন স্যার না মডেল এসেছে।
কলেজের গেইট দিয়ে ইয়া বড় এক হোয়াইট গাড়ি এলো। সেখান থেকে কালো একজোড়া সু দেখা গেল। ভেতর থেকে যে বেরিয়ে এসেছে তাকে দেখে সবাই চুপ করে রইল। সবার নজর তার দিকে। মেয়েদের বুকের ভেতর হার্টবিট বাড়তে থাকে। আরো কিছু হচ্ছে কি না তা শুধু তারাই জানে।

সাদা প্যান্ট সাদা কোট সাদা ট্রাই কালো সানগ্লাস। লম্বা খাড়া চুল। চিকন লাল আভা যুক্ত ঠোঁট। এক হাত প্যাকেটে দিয়ে এগিয়ে আসছে।
খুব লম্বা, গায়ের রং ধবধবে সাদা। বডি তো দেখার মতো। সব মিলিয়ে সুদর্শনের থেকেও বেশি।
তার এমন স্টাইল দেখে সব মেয়েদের জান যায় যায়। সবাই মুখ হা করে তাকিয়ে আছে।

একে একে সবাই তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। শুধু লিমা অন্যমনে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
নতুন স্যার এগিয়ে আসতে আসতে লিমার কাছে যায়। লিমা অন্য দিকে মুখ করে ফুল এগিয়ে দেয়। স্যার এক মনে তাকিয়ে থেকে বিষয়টা খেয়াল করে। অন্যমনস্ক থাকায় স্যারের পায়ে তার পা লেগে যায়।

“হোয়াট দ্যা হ্যাল..”
লিমা ঘাবড়ে সামনে তাকায়। লোকটার দিকে লিমা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। এই কয়েক সেকেন্ডেই তার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। লোক টা আসলেই সুদর্শন। শুধু সুদর্শন বললেও ভুল হবে তার থেকেও বেশি। কি বডি। জিম বডির মাংস গুলি কোট বেদ করেও লিমার যেন খেয়াল হলো। আবার চোখ নামিয়ে নিচে তাকায়।
স্যারের পায়ের উপর তার পা। খুব ভয় পেয়ে যায়। পা সরিয়ে,

“স সরি স্যার।”
এই টুক বলে লিমা আরিফার হাত টেনে কোনো রকম সেই জায়গা থেকে চলে যায়। যাওয়ার সময় আরিফা বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে স্যার কে দেখছিল।
স্যার দুই আঙ্গুল দিয়ে সানগ্লাস টা খুলে লিমার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।

মনে মনে বলে উঠে,
“এই মেয়ে প্রথম দিনি এমন কান্ড করল?”
তার সামনে এসে প্রিন্সিপাল বলে,
“ওয়েলকাম টু আওয়ার কলেজ মিস্টার শুষ্ক আহমেদ।”
“ও ইয়েস।”

দুজন হাত মিলিয়ে অফিস রুমের দিকে যায়। যাওয়ার সময় একবার পিছন ফিরে লিমা কে দেখার চেষ্টাও করল।
চিকন লম্বা ফর্সা মেয়েটার মুখ বারবার তার চোখের সামনে ভাসছে। টানা চোখ, ঘন চোখের পাঁপড়ি, লাল ঠোঁট লম্বা চুলের সেই মুখখানা শুধু ভাসছে শুষ্কের চোখে।
শুষ্ক অফিস রুমে চলে গেলে সব মেয়ে রা তাকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। কি এটিডিউট, কি স্টাইল, কি স্মার্ট। এক কথায় পারফেক্ট। মন কেড়ে নেওয়ার মতো মানুষ।

লিমা আরিফা কে নিয়ে মাঠের এক কোণায় চলে যায়। ভাবতে থাকে লোকটা কে নিয়ে সবাই এমনি তেই মাতামাতি করছে না। লোকটার মাঝে সত্যিই এমন কিছু আছে। লিমা দাঁড়িয়ে আছে। আরিফা রাগে বলল,
“আমাকে টেনে আনলি কেন? তোর ভালো লাগছিল না কিন্তু আমার তো সেই ভালো লাগছিল তবে?”

“….
“কি ভাবছিস তুই? বল কেন আনলি?”
“চুপ করবি তুই? মনে হচ্ছিল চোখ দিয়েই গিলে ফেলছিলি তুই।”

“তাতে তোর কি? সবাই তো তাই করছিল।”
“চল ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।”
“ইসস আজ যদি নতুন স্যার টা শুরুতে ক্লাস নিত।”
লিমা রাগে আরিফার দিকে তাকায়।

“আর একটা কথা বললেও তোকে ফোসকা বানিয়ে গিলে ফেলব। মনে থাকে যেন।”
লিমার কথা শুনে সে চুপ করে লিমার সাথে যেতে থাকে।

ক্লাসের মাঝে থাকা যাচ্ছে না শুধু নতুন স্যার, নতুন স্যার আর নতুন স্যার। সব মেয়েদের মুখে এই এক মানুষের নাম ডাক। একেক জন একেক কথা বলছে। সবাই তার স্মার্ট আর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলছে। তারা বলা বলি করছে উনার সাথে যদি রিলেশন করা যায়। এমন একজন কে পেলে জীবন ধন্য। এখন থেকে প্রতিদিন সেজেগুজে আসবে যদি একবার উনার নজর পড়ে। আরো কত রকম কথা।
লিমার শুধু এই গুলি বিরক্ত লাগছে।

কানে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় সে। মুহূর্তে ভাবনার জগতে ডুব দেয়। ভাবতে থাকে কবে সাফাতের সাথে তার দেখা হবে?


পর্ব ২

নতুন স্যার ক্লাসে এসেছে সবাই খুশি মনে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানাল। সবাই কে বসতে বললেও মেয়ে রা তার দিকে হা করে আছে।
শুষ্কের নজর গেল একজনের উপর। চোখ আটকে যাওয়া সেই মেয়ের দিকে।

লিমা কানে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঠোঁটের কোণায় হাসি টেনে আনে। স্যার যে ক্লাসে এসেছে তার সেদিকে বেমালুম খেয়ালই নেই। সে তার কল্পনার জগতে সাফাত নামাক ব্যক্তি কে নিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে।

শুষ্ক সবাই কে চোখ রাগিয়ে বসতে বলে। সব মেয়ে রা তাই করল।
সে এগিয়ে গেল লিমার দিকে। তখনো লিমা যেই কে সেই। শুষ্ক এগিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। ২ মিনিট দাঁড়িয়ে রইল। আরিফা নিচ দিয়ে লিমা কে চোখ খুলতে বললেও কোনো কাজ হয়নি। অবশেষে শুষ্ক টেবিলে সজোরে এক থাপ্পড় দেয়। সাথে সাথে লিমা সহ বাকিরা কেঁপে উঠে।

লিমা ধরফড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। সামনে তাকিয়ে নতুন স্যার কে দেখে ঘাবড়ে যায়। শুষ্ক ঢুক গিলে লিমা।
“এটা ক্লাস রুম তাই নয় কি? এটা তোমার ঘুমানোর জায়গা মনে হয়?”
“….

“ডেমেট আন্সার মি।”
শুষ্কের ধমকে লিমা খুব ভয় পায়। মুখ তোতলাতে তোতলাতে জবাব দেয়,
“স সরি স্যার।”

“এত ভুল হয় কি করে? তখনো তো আমার পায়ে তুমি পা লাগিয়ে দিয়েছিলে। এখন এলাম না দাঁড়িয়েছো। আর না নিজের মাঝে আছো। মনে হয় ভাবনার সাফাত্যে চলে গিয়েছিলে।”
“….
“কিছু বলছি।”
“স সরি স্যার।”

“হোয়াট দ্যা সরি?”
“স্যার সরি মানে আমায় মাফ করে দিন।”
“হোয়াট?”

শুষ্কের রাগি কন্ঠ শুনে লিমা বুঝতে পাড়ে এই ভাবে হুটহাট যা তা বলা যায় না। নিজের বলা কথায় সে নিজেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
“নেক্সট টাইম যেন না হয়।” এটা বলে শুষ্ক সামনে যায়।

ইকনোমিক্স নিয়ে পড়াবে শুষ্ক। লিমার এই ক্লাস টায় বড্ড ঝুঁক থাকলেও ভালো লাগছে না। নতুন স্যার এসেই তার উপর ধমকানি শুরু করল। তাই লিমার মন খারাপ।
শুধু মাত্র সাফাতের কারণে সে ইকোনোমিক্স নিয়ে অনার্স শেষ করবে। সবে অনার্স ১ম বর্ষে পড়ে। সাফাতের কথা ভেবে সে এই সিদ্ধান্ত নেয়।
যদি এর উছিল্লায় একবার সাফাত কে দেখতে পায়। স্বপ্নের সাফাতপুত্র কে যদি একবার চোখে দেখার সুযোগ পায়।

শুষ্ক ক্লাস করাচ্ছে সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মেয়েরা শুনছে বললে দোষ হবে। একরকম তার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সব কিছু গিলছে।
লিমা মাথা নিচু হয়ে বিড়বিড় করে বলছে,
“আরিফার বাচ্চা তোকে এনাকন্ডার মতো চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।”

“কি?”
“যা শুনেছিস ঠিক তাই।”

“আমি আবার কি করলাম? তুই তো তোর সাফাত কে নিয়ে স্বপ্নে চলে গিয়েছিলি। আমি তো তোকে ডেকেও ছিলাম। তুই তো শুনিস নি। তাই স্যারের কাছে বকা খেয়েছিস। আমার কি দোষ?”
“যা দোষ সব তোরই। বান্দরনী কে বলেছিল তখন বলতে ইসস আজ শুরু তে যদি নতুন স্যার আসত। তোর অপয়া মুখের কথাই সত্যি হলো। কি হতো তখন এটা না বললে? তুই বলেছিলি বলেই তো স্যার এলো আর আমি বকা খেলাম। এখন দেখ দোষ কার তোর না অন্যকারো কুত্তি কোথাকার।”

লিমার কথা শুনে আরিফা তার দিকে তাকায়। অবাক হয় না। কারণ সে জানে লিমা কি কি বলতে পাড়ে আর কতটা উদ্ভট।
“যা এতে আমার দোষ কোথায়?”

“তোরই দোষ সব দোষ তোর। ওই রাক্ষস টা চোখ রাঙ্গিয়ে আমায় কত ধমক দিয়ে গেল। তুই কিছুই বললি না। বান্ধবী নামে তুই কলঙ্ক। আর ওই রাক্ষস টা স্যার নামে। প্রথম দিন এসেই কেউ এসব করে? কই অন্য কেউ তো…”
শুষ্ক প্যান্টের প্যাকেট দুই হাত দিয়ে বলল,

“অন্য কেউ তো কি?”
“অন্য কেউ ওই রাক্ষসের মতো প্রথম দিন এসেই এমন করেনি। বরং সুন্দর…”
লিমা থেমে গিয়ে বলে,

“সামু তোর গলা টা এমন বেটা বেটা লাগে কেন? আমার বকা খেয় কি তোর গলার আওয়াজ মোটা হয়ে গেল নাকি?”
আরিফা বেচারা ভয়ে চুপ করে আছে।
শুষ্ক বলল,

“লিসেন এই দিকে তাকাও। ওদিকে নয়।”
কথা অনুযায়ী লিমা মাথা উঁচু করে সামনে তাকাতেই দেখে শুষ্ক প্যান্টের মাঝে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।
লিমা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সাথে ঢুক গিলে।

“আমি ক্লাস করাতে আসছিলাম। তোমার ননস্টপ বকবক শুনতে নয়। নিজের কারণে বকা শুনবে আবার দোষ দিবে অন্য কাউকে?”
“….
“সেই কখন থেকে দেখছি মাথা নিচে করে রেখেছো। এখানে না আসলে তো জানতামি না তুমি কি কি বলছিলে। বের হও।”
শুষ্কের কথায় লিমা মাথা তুলে তার দিকে তাকায়।

“কি হলো? বললাম না বের হও।”
“স সরি স্যার।”
“শাট আপ। বের হও এখনি।”

শুষ্কের ধমক শুনে লিমা তাড়াতাড়ি করে বের হয়ে পড়ে।
“ক্লাস থেকে বের হও।”
“কি?”

“বললাম ক্লাস থেকে বের হও। বারান্দায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো এটাই তোমার পানিশমেন্ট।”
“স্যার আর হবে…”
শুষ্ক কিছু না বলে লিমার হাত ধরে টেনে দরজার কাছে নিয়ে যায়।
“এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে।”
“….

শুষ্ক ক্লাসে ঢুকে গেলে লিমা মুখ ভেংচি কাটে।
“উমমম ঢং। ঢং দেখলে গায়ে আগুন জ্বলে। আরে যা যা তোর মতো কত ছেলে আমার কাছে আসল আর গেল। আর উনি আসছে কোন ঢং। উনি ভাবে না জানি আমি কি। আরে তুমি একটা ঢং। ঘোড়ার আন্ডা। স্যার কে এই সব বলা ঠিক হচ্ছে? আরে দূর দূরে স্যার এমন করলে স্টুডেন্ট রা এমন বলবেই।”

লিমা বিড়বিড় করে চুপ হয়ে গেল। শুষ্ক ভেতরে ক্লাস করাচ্ছে।
লিমা আবার বকবক করা শুরু করল।

“হায় সাফাত চৌধুরী। কবে আমি আপনাকে দেখব? আর কত দিন ১ বছরের উপর তো হলো অপেক্ষা করছি। আর কবে দেখা দিবেন আপনার লিমা কে? আপনাকে দেখার জন্যে তো আমি উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। হায় মাবুদ উনাকে আমার সামনে আনো। আল্লাহ প্লিজ প্লিজ প্লিজজ।”
লিমা দরজার পাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে তার মনের কথা জানাচ্ছিল।

শুষ্ক লিমার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল,
“কার জন্যে এত অপেক্ষার প্রহর গুনা? কার জন্যে এত উদ্বিগ্নতা? কার জন্যেই বা এভাবে সময়ে অসময়ে আল্লাহর কাছে এত দোয়া চাওয়া?”
ফিসফিসানি কথা কানের কাছে শুনে লিমার অন্তর কেঁপে উঠে। সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠে। থতবত খেয়ে চোখ খুলে শুষ্ক কে দেখে ঢুক গিলে।
চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে থাকে লিমা শুষ্কের দিকে।

“চলো।”
“ক কোথায়?”
“আমাকে ফারদার প্রশ্ন করবে না। আই ডোন্ট লাইক ইট।”
শুষ্ক টানতে টানতে লিমা কে মাঠ দিয়ে নিয়ে গেল। আর সবাই হা করে তাকিয়ে আছে।
শুষ্কের জন্যে বরাদ্দ করা রুমে লিমা কে নিয়ে যায়। চেয়ার টেনে বলে,

“বসো।”
“ম মানে?”
“সিট ডাউন।”
“কে কেন?”
শুষ্ক চোখ গরম করলে লিমা তাড়াতাড়ি করে বসে। শুষ্ক নিজের চেয়ারে বসে।

লিমা অনেক অস্বস্তি ফিল করছে। শুষ্ক তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে বাতাসে সামনের চুল গুলি তার মুখ ঢেকে দিচ্ছে। লিমা বারবার সরাচ্ছে। ফ্যানের বাতাসে আবার এলোমেলো করে দিচ্ছে। শুষ্ক মুচকি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে লিমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে লিমা একটু পিছনে হেলে পড়ে।
শুষ্ক তার চুলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঠিক করার বদলে এলোমেলো করে দেয় আরো।
লিমা চুল ঠিক করে মুখ ভেংচি কাটে। শুষ্ক জোরে হেসে উঠে।

লিমা ভাবতে থাকে,
“আজব উনি আমাকে এখানে সঙ এর মতো বসিয়ে কেন রেখেছে? আর কি অদ্ভুত আচারন। কোনো স্যার স্টুডেন্টের চুল এমন করে? এ তো আমার থেকেও অদ্ভুত। যাই হোক ভালোই হলো সবাই আমাকে অদ্ভুত অদ্ভুত বলে। এখন না হয় তাকে দেখিয়ে বলবো উনি আমার থেকেও অদ্ভুত।”
লিমা আরো বেশ কিছু সময় বসে ছিল। পুরো টা সময় শুষ্ক লিমার দিকেই পলকহীন তাকিয়ে ছিল।

বেশ কিছু সময় দুজনে এভাবেই বসেছিল। শুষ্কের চোখে ছিল লিমার মুগ্ধতা আর লিমার শুধু ছিল বিরক্তি।
তারপর শুষ্ক লিমা কে জোর করে কিছু বিষয় বুঝিয়ে দিল। তারপর লিমা কে ছুটি দিয়ে দিল। যাওয়ার আগে লিমা কে বলে দিল,
“এমন ভুল যেন আর না হয়। এবং কারো জন্যে এত অপেক্ষার পাহাড় পাড়ি না দিয়ে নিজেকে নিয়ে ভাবো।”

শুষ্কের কথায় লিমা কোনো পাত্তা দিল না তা সে বেশ বুঝেছে।
লিমা একটু নাক ফুলিয়ে চলে গেল।
যেতে যেতে বলতে লাগল,

“লোকটা যেমনি হোক মন্দ পড়ায় না। দূর লিমা তুই এত ভাবছিস কেন? তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে ঘুম দে। সাফাত কে নিয়ে কল্পনা করলেও তোর মন মাথা দুটোই ঠিক থাকবে।”
লিমা তাড়াতাড়ি করে বাসায় চলে যায়। আজ একটু শান্তি তেই আসতে পেরেছে বখাটে ছেলে টাকে আজ আর দেখা যায়নি।

লিমা বাসায় এসেই শাওয়ার নিতে চলে যায়।
তার মা সিনথিয়া এসে খাওয়ার জন্যে অনেক ডেকে গেছে কিন্তু সে মানা করে দিয়েছে। যখন তার সময় হবে তখন সে খেয়ে নিবে।
শাওয়ার নিয়ে ভিজে চুল গুলি ছেড়ে সে ব্যালকুনিতে চলে যায়।

মুক্ত বাতাসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
নিচ থেকে তার দিকে দুটি চোখ নজর দিচ্ছে। এক জোড়া চোখ লুকিয়ে থেকে তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।
তারপর লিমা নিজের রুমে চলে যায়। গিয়ে এক ঘুম দেয়। সাফাত কে সে কল্পায় আঁকে।

ড্রিম বয় তার স্বপ্নেই থেকে গেল কবে যে সে সামনে আসবে তা লিমার জানা নেই। কিন্তু তবুও কল্পনা জল্পনা করতে সে পিছু হাটে না।
সাফাত চৌধুরী বিখ্যাত বিজনেসম্যান। শুধু যে দেশ জুরে তার নাম তা নয়। বিদেশেও তার নাম ডাক প্রচুর। ইভেন বিশ্বের সেরা বিজনেসম্যানেও সে দ্বিতীয় স্থান কেড়ে নিয়েছে। বয়স তেমন নয় ২৮ বছর বয়সী এই ছেলে বিশ্বের মাঝে নামডাক তৈরি করে নিয়েছে। উদ্দাম সাহস চেষ্টা আর স্বপ্ন তাকে সেখানে নিয়ে পৌঁছেছে।

এত নামডাক হলেও তাকে চেনার মতো মানুষের বড্ড অভাব। সে নিজের প্রাইভেসি নিয়ে চলে। মিডিয়ার সামনেও আসে না। কখনো কোনো ক্যামেরায় তাকে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। সে কখন কোথায় কোন দেশে থাকে তা তার গার্ডরা ছাড়া কেউ জানে না। কানাঘুষা শুনা গেছে তাকে দেখতে কোনো প্রিন্সের চেয়ে কম নয়। এত বড় একজন ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ মানুষ হয়েও সে সবার অগোচরে। তার নাম সবার মুখে তবে চোখে দেখা নয়।

লিমাও তাকে দেখেনি। যা শুধু নাম ডাকই শুনেছে।
“মানুষের নিষিদ্ধ আর অদৃশ্য বিষয়ে প্রবল ঝুঁক বিদ্যমান।” লিমারও হয়েছে তাই। না দেখেই সে সাফাতে মশগুল। সাফাত অন্তঃ প্রাণ তার। চোখে দেখেনি তবুও মারাত্মক এক ইচ্ছে মনে পোষন করে রেখেছে।

দেশের নাম করা এমন এক মানুষের সাথে সবারই তো দেখা করতে ইচ্ছে হয়। লিমাও খুব করে হয়।
সবাই নায়ক, খেলোয়াড় বা বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তি কে পছন্দ করে। মনে মনে কত আশা করে। লিমাও করে সাফাত কে নিয়ে সেরা বিজনেসম্যান কে নিয়ে তারও অনেক স্বপ্ন কল্পনা জল্পনা আছে। লিমা তো অনেক ছেলেকে রিজেক্ট করেছে। তারা দেখতেও যেমন ছিল প্রভাবশালীও ছিল। দেখতে তো সে রূপে কোনো অংশে কম নয়। যে কোনো ছেলের নজর কাড়া সৌন্দর্য তার। তবুও লিমা তাদের সবাই কে মানা করে দিয়েছে।

লিমা তো মনে মনে ঠিকও করে নিয়েছে সে সাফাত কে ছাড়া বিয়েই করবে না। দরকার হলে চিরকুমারী থাকবে। বিয়ের নামটাও শুনতে চায় না সে।
বাবা বা মা কেউ বিয়ের কথা তুললে সে চিল্লায়ে বাসা মাথায় তুলে নেয়। যা মুখে আসে অদ্ভুত সব কথা বলে। নিজেকে রুমে আটকে রাখে। পরিস্থিতি ঠিক হলে আবার বদ্ধ ঘর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠলে তার মা তাকে খায়িয়ে দেয়।
রাতে পড়া, ফেসবুকিং করে লিমা ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে তার মা ঘুম থেকে ডেকে দিলে ফ্রেশ হয়ে কলেজে চলে যায়।
রাস্তায় আরিফা কে কল দেয়। লিমার দেরি হয়ে যাওয়াতে আরিফা কলেজের সামনে তার জন্যে অপেক্ষা করছে।

লিমা ইনুশা ভাড়াটা দিয়ে নামতে নামতে বলল,
“তালগাছের মতো এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিস কেন? গেইট টা পাড় করলেই পারতি। ভাব দেখাচ্ছি যে তুই আমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছিস।”
“আমি কি করব? তুই তো দেরি করে ঘুম থেকে উঠিস, তাই!”

“থাক আর টেঙ্গরামাছের মতো ভাব দেখাতে হবে না। আমার ঘুম নিয়ে এত মরিস কেন বুঝি না। দেখিস তুই ঘুম গাধা এক জামাই পাবি।”
“কি?”
“তোর মাথা তাড়াতাড়ি চল।”

আরিফা আর কথা না বাড়িয়ে দুজনে কলেজের ভেতর ঢুকে গেল।
শুষ্ক ক্লাসে আসতেই লিমা না পেড়ে সবার সাথে উঠে দাঁড়ায়।
শুষ্ক সবাই কে কিছু ইমপটেন্ট বিষয় বুঝিয়ে দেয়। বিদেশ থেকে কোর্স শেষ করে এসেছে কি এমনি এমনি?
ক্লাস শেষের এক পর্যায় শুষ্ক লিমার সামনে যায়।

“অফিস রুমে এসো দরকার আছে।”
এটা বলেই চলে যায়। আর সবাই হা করে তাকিয়ে থাকে লিমা দিকে।
লিমা এত না ভেবে শুষ্কের কথায় তার কাছে যায়।
“আসব?”
“হুম।”
“আপনি প্লিজ আমাকে আর ক্লাসের সবার সামনে এমন করে অফিস আসতে বলবে না।”
“কেন?”
“এমনি। ।”
“কেন কেউ কিছু বলেছে?”
“কেউ না বললেও ভাবে।”

শুষ্ক নিজের ফোন রেখে উঠে দাঁড়ায়। তার কাছে গিয়ে বলে,
“কি ভাবে?”
“…..
“কি হলো বলো।”
“জা জানি না।”
“তাহলে আমি যখন বলব তখন আসবে তুমি।”

“পারব না।”
বলে লিমা চলে যেতে নিলে শুষ্ক তার হাত ধরে থামায়। হেঁচকা টানে নিজের কাছে আনে।
“আমি কোনো রকম না শুনতে অভ্যস্ত নই। আমার ডিকশনারি তে ‘না’ নেই। সো..”
“সো কি?”
“প্রশ্ন করছো আমায়?”
“আপনাকে আমি প্রশ্ন করতে যাবো কেন? ছাড়ুন।”
লিমা একটু ঝাড়ি দিয়ে শুষ্কের হাতের আবদ্ধ থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়।
শুষ্ক এবার রেগে লিমার বাহু টেনে দেওয়ালের সাথে চেঁপে ধরে। দাঁত কটমট করে বলে,

“না আমি প্রশ্ন শুনতে চাই। আর না আমার কথা না শুনা মানতে চাই। আমার রাগ উঠিও না। তাহলে তোমারই ক্ষতি হবে।”
শুষ্কের চোখ আর এমন ব্যবহারে লিমা খুব ভয় পায়। গলা শুকিয়ে আসছে তার। ভয়ে বুক কাঁপছে। মুখ দিয়ে কথাও বলতে পারছে না।
শুষ্ক তাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের জায়গায় চলে যায়।
“বসো।”

“….
লিমা তখনো ওখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
“ডেমেট হোয়াট ডিড আই টেল ইউ?
“…

শুষ্কের ধমকে লিমা তাড়াতাড়ি করে চেয়ারে বসে।
শুষ্ক টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস টা তার দিকে এগিয়ে দেয়। লিমা টগটগ করে সব টা পানি খেয়ে ফেলে।
“ভেতর শুকিয়ে গিয়েছিল?”
“….

“আমার রাগ উঠিও না। আগুনের চেয়েও আমি কম নই। রাগ চলে আসলে ভেতরে আগুন জ্বলে। ফলে অপর মানুষ টা কে আমি সেই আগুনে নিক্ষেপ করি।”
শুষ্কের ধারালো অস্ত্রে মতো কথায় লিমা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ভেতর আত্মা শুকিয়ে আসছে তার।
শুষ্ক বেশ কিছু সময় লিমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আর লিমা মাথা নিচু করে বসে ছিল।

“শুনেছি ইকনোমিকসে তোমার বেশ ঝুঁক আছে। তুমি নাকি খুব পাঁকা। সব সময় ইকনোমিকসে টপ রেজাল্ট করো।”
“জ্বি।”
“বই বের করো।”
“হ্যাঁ।”

“বই বের করতে বললাম।”
শুষ্ক আরো কিছুক্ষণ লিমা কে একা পড়ায়। তারপর যেতে বলে।
লিমা গুটিগুটি পায়ে রুম থেকে বের হতে থাকে। শুষ্ক আবার তাকে পেছন থেকে ডাকে। লিমা সেখানে দাঁড়িয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে শুষ্কের দিকে তাকায়।
“তোমার ফোন নাম্বার টা দাও তো।”

লিমা আর দেরি না করে শুষ্কের এমন কথা শুনে এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। এক দৌড়ে মাঠে চলে আসে।
শুষ্ক সেখানে বসেই বলতে থাকে,
“ডেমেট হোয়াট হ্যাপেন? ওহ শীট।”


পর্ব ০৩

লিমা হাপাতে হাপাতে আরিফার কাছে যায়। আরিফা তাকে দেখে অবাক হয়।
“কিরে স্যার তোকে কেন ডেকে নিয়ে গিয়েছিল? আর এমন হাপাচ্ছিস কেন?”
“বইন তাড়াতাড়ি চল না হলে রাক্ষস টা আমায় খেয়ে ফেলবে তাড়াতাড়ি চল।”
“মানে কে তোকে খেয়ে ফেলবে?”

“আগে চল তো।”
লিমা আরিফার হাত টেনে নিয়ে যেতে থাকে। গেটের কাছে আসতেই ইনু কে দেখতে পায়।
এই একমাত্র ছেলে যাকে লিমা এত এত কথা শুনায় তবুও সে লিমার পিছু ছাড়ে না। লিমার খুব বিরক্ত হয় ওকে দেখলে। এত বেহায়া মানুষ এর আগে সে একটাও দেখেনি। ইনু খুব বাজে আর বখাটেও বটে। না হলে কেউ অপমান করলেও বারবার পিছু ঘুরে?

“হাই লিমা। মাই ড্রারলিং সরি কাল আসতে পাড়ি নি। একটু বিজি ছিলাম।”
লিমা সেই কথায় পাত্তা না দিয়ে আরিফা কে বলল,
“সামু তাড়াতাড়ি চল।”
তাদের পথ আটকে ইনু আবার বলে,
“আরে আরে যাচ্ছো কোথায়? চলো না একটু কফি খাই। তোমাকে কাল না দেখতে পেয়ে মন আনচান করছিল। আর তুমি আমার কষ্ট টা না বুঝে চলে যাচ্ছো?”

“আপনার মতো কুত্তা আর আমি একটাও দেখিনি। রাস্তার কুত্তা কেও পা দিয়ে লাথি দিলে সে আবার ফিরে আসতে ভয় পায়। আর আপনি সেই কুত্তাও নন। যতসব ফালতু খারাপ লোক।”
“কি করব বলো? তোমাকে না দেখে যে থাকতে পাড়ি না।”
“আপনি কুত্তার সাথে গলায় গলাগলি করে বসে থাকুন এটাই আপনাকে মানাবে। মিডিল ক্লাস লোক কোথাকার “
লিমা আর কিছু না বলে আরিফা কে নিয়ে রাগে চলে যায়।

দূর থেকে এক জোড়া চোখ আবার লিমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার আর তার চোখে ছিল না মুগ্ধতা।
শুধু ছিল রাগ আর ক্ষোভ।
বিকেলে লিমা ব্যালকুনিতে যায়।
সেখানে থাকা গাছ গুলিতে পানি দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু আজ আর এক জোড়া চোখ মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখল না।
রাতে খেয়ে লিমা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।

একটু পর তার রুমে তার বাবা আসে।
“লিমা লিমা মা।”
লিমা তখন ঘুমিয়ে গিয়েছে। বাবা এসে মুচকি হেসে তার গায়ের উপর চাদর টেনে দেয়। তারপর লাইট টা অফ করে চলে যায়। এসেছিল মেয়ের সাথে একটু কথা বলবে কিন্তু ঘুম পাগলি লিমার জন্যে তা আর হলো না। অজ্ঞাত তিনি চলেই গেলেন।

সকালে উঠে আরিফা আর লিমা কলেজের জন্যে রওনা দেয়।
গেটের ভেতরে গেলেই কোথা থেকে দৌড়ে ইনু আসে। হাটু গেড়ে নিচে বসে পড়ে।
আরিফা আর লিমা বেশ অবাক হয়।
আবার প্রোপজ ট্রোপজ করে বসবে নাকি?

পাশ থেকে শুষ্ক নিজের গাড়ির চাবি আঙ্গুলের ঢগায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অফিস রুমে যাচ্ছিল। সবে মাত্র গাড়ি পার্ক করে সে এসেছে।
চলে যেয়েও আবার লিমার কাছে ফিরে আসে।
“হোয়াট হ্যাপেন?”
ইনু বিমড়ি খেয়ে শুষ্কের পায়ে পড়ে,

“স্যার আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আর হবে না।”
“মানে? কিছু বুঝলাম না।”
“স্যার আমি লিমা কে মানে উনাকে প্রতিদিন বিরক্ত করতাম। আর এমন করব না আমি। মাফ চাইছি।”
“এখানে আমার কাছে মাফ চাওয়ার কি আছে? যাকে এতদিন বিরক্ত করেছিস তার কাছে মাফ চা।”

ইনু তড়িঘড়ি করে লিমার পায়ে হাত দিতে চাইলে লিমা এক হাত দূরে সরে যায়।
“আমায় মাফ করে দিন। আমায় মাফ করে দিন। এমন আর হবে না।”
“আরে আরে করছেন কি? মাফ চাইতে হবে না। শুধু আর বিরক্ত না করলেই চলবে।”

“আমি আর আপনাকে বিরক্ত করব না। আমায় শেষে বারের মতো মাফ করে দিন।”
” সত্যি তো? মনে থাকে যেন। ঠিক আছে আপনি যান।”
ইনু একবার শুষ্কের দিকে তাকিয়ে চলে যায় আস্তে আস্তে।
লিমার সে কি লাফালাফি।

“ইয়ে আমাকে আজ থেকে আর কেউ বিরক্ত করবে না। ইয়ে কি মজা।”
লিমা বেশ খুশি হয়ে আরিফা কে জড়িয়ে ধরে।
পাশ ফিরে শুষ্কেও জড়িয়ে ধরতে চায়। কিন্তু তার অনেক টা কাছে গিয়ে লিমা তার প্রসারিত হাত গুটিয়ে নেয়।
ঢুক গিলে আমতা আমতা করে বলে,
“স সরি স্যার”

“মন্দও ছিল না।”
শুষ্ক লিমার দিকে তাকিয়ে এক গালে হেসে চলে যায়। লিমা হা করে দেখছিল সেই হাসি। কি সুন্দর কত টা মায়াময় সে হাসি।
লিমা খুশি তে আবার লাফালাফি শুরু করে।
আরিফা তখন বলে উঠে,
“লিমা এটা তোর বা আমার বেডরুম না। কলেজ এটা।”

লিমা নিজেকে সামলে আশপাশ তাকায়। তারপর আরিফা কে নিয়ে ক্লাসে চলে যায়।
প্রতিদিনের মতো শুষ্ক আজো প্রথমে ক্লাসে এলো। সবাই কে ক্লাস করায়। কিছু টপিক হাতে কলমে বুঝিয়ে দেয়। ক্লাস শেষে আজো লিমা কে তার অফিস যেতে বলে।
“আসব?”
“হুম কাম।”

“স্যার আমি আপনাকে আবারো বলেছি আজো বলছি প্লিজ আমাকে এই ভাবে আর ডেকে পাঠাবেন না।”
“আমি কেন ডাকব। কেন ডাকব না তা তোমাকে বলে করতে হবে নাকি? অযথা কথা বাড়াচ্ছো লিমা।”
“স্যার এই গুলি সবাই ভালো চোখে নেয় না।”

“ও রেয়লি? তো কোন গুলি ভালো চোখে নেয়? তোমাকে বিরক্ত করা গুলি? কই এত দিন সে কলেজের সামনে তোমাকে ও বিরক্ত করেছে তাতে তো তারা কিছু বলেনি। তারমানে ও গুলি ওরা ভালো চোখেই নিয়েছে। তাই কিছু বলেওনি করেওনি।”

“…
“তোমাকে আমি এমনি এমনি তো ডেকেও পাঠাই না। কিছু টপিকও বুঝিয়ে দেই।”
“….
“এই কথাটা যেন আর মুখে না আসে। বসো।”
“…
“কি হলো?”
“হুম।”
লিমা গিয়ে চেয়ারে বসে।

শুষ্ক পাঁচ মিনিট লিমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর পড়া শুরু করে।
লিমাও মন দিয়ে পড়ে।
যাওয়ার আগে লিমা কে পিছু ডেকে বলে,
“লিমা আমার কথার অবাধ্য হইও না ফলসরূপ খুব ভালো হবে না।”

লিমা চলে যায়। যেতে যেতে ভাবতে থাকে,
“সাফাত চৌধুরীর বিষয়ে স্যার কে কিছু জিজ্ঞাস করব? যদি উনি কিছু জানে। না না থাক। কি না কি ভাববে।”
বাকি আরেক টা ক্লাস করে লিমা আর আরিফা বসায় চলে যায়।

আজ মন টাও ভালো লাগছে। ইনু নামক বিরক্ত তার এখন থেকে দূর হলো। কিন্তু যাকে এত বকার পরেও কোনো কাজ হলো না। সে নিজ থেকে এসে এমন ভাবে মাফ চাইল কেন? বিষয়টা লিমা ভেবে উঠতে পারে না। তবুও মনে মনে খুশি হয়।
..
বিকেলে ঘুম থেকে উঠে খেয়ে ঘরে আসতেই লিমার কল আসে। ফোন নিয়ে দেখে আননোন নাম্বার।
তাই সে আর কল রিসিভ না করে বিছানার উপর রেখে দেয়।

পরপর দুই বার কল হয়ে কেটে যায়। তিন বারের সময় লিমা বিরক্ত নিয়েই কল ধরে। শক্ত গলায় ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আরে কে মশাই এত বার কল দি..”
“শাট আপ। রাবিশ কল ধতে এত সময় লাগে? কি করছিলে?”

লিমা শুকনো ঢুক গিলে। মানুষটা তার নাম্বার পেলো কোথায়?
“কি হলো? আমি কল দিচ্ছিলাম না?”
“আ আসলে..”

“নিচে নামো।”
“কি?”
“তোমার বাসার নিচে নামে।”
“শুধু শুধু নিচে নামতে যাবো কেন স্যার? এখন আমি পারব না।”

“ডেমেট আমি দাঁড়িয়ে আছি। আড়লি নিচে আসো।”
শুষ্কের কথা শুনে লিমা চমকে যায়। বলে কি লোক টা? নিচে মানে? সত্যিই চলে এলো নাকি?
লিমা জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়।

হ্যাঁ সত্যিসত্যি শুষ্ক কালো একটা ফিটফাট শার্ট পড়ে তার সাদা গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কানে ফোন ধরে রাখা। চোখে কালো সানগ্লাস।
এক কথায় দিল কেড়ে নেওয়ার মতো স্টাইল। লিমা হা করে আছে। জিম করা বডি যেন শার্ট বেদ করে আসবে আসবে। লিমার বুক টা ধক করে উঠে এমন রূপ দেখে। এই প্রথম এই ভাবে কোনো ছেলে কে দেখছে। যেন কোনো সিনেমার হিরো শুটিং করছে।

লিমা আমতাআমতা করে বলল,
“আ আপনি এখানে কি করছেন? আর আ আমার বাসায় চিনলেন বা কি করে?”
“চুরের মতো জানালা দিয়ে উঁকি না দিয়ে তাড়াতাড়ি নিচে নামো।”
“কি কি বলতে চাইছেন? আমার বাসায় আমি চুরি করতে যাবো কেন?”

“চুরি করেই তো আমায় দেখছো।”
লিমা জানালার পাশ থেকে সরে এসে বলে,
“মু মুটেও না। আমি আ আপনকে দেখছিলাম না।”

“সেটা আমি বেশ দেখেছি। আর কি বললে? তোমার বাড়ি? মেয়েদের আসল বাড়ি হয় তার অর্ধাঙ্গের বাড়ি। মানে নিজের হাজবেন্টের বাড়ি। বাজে বকবক না করে নিচে নামো।”
“ন না আমি নামব না।”
“ওকে ফাইন আমিই উঠছি উপরে।”
“না না আ আমি নামছি।”

“গুড গার্ল। ফাস্ট আসো।”
“…..
লিমা ফোন হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে।
তার মা সোফায় বসে টিভি দেখছিল,
“কিরে কোথায় যাস?”
“আম্মু আসছি একটু।”

লিমা কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে। গেইট খুলে এগিয়ে যায় সামনের দিকে।
শুষ্ক গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লিমা শুষ্কের এই রূপের দিকে তাকাতে চাইছে না। কারণ শুষ্কের এমন স্টাইল দেখে লিমার কেমন কেমন লাগছে। তাই মাথা নিচু করে আছে।
আর ও দিকে শুষ্ক লিমা কে দেখেই চলছে।
“তাকাচ্ছো না কেন? আমাতে ফেঁসে যাবে নাকি?”

শুষ্কের কথায় লিমা ঘাবড়ে যায়। শরীর দিয়ে যেন ঘাম বের হয়। অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠে,
“কে কেন আসতে বললেন আমায়?”
“…
“কি হলো?”
কথাটা লিমা শুষ্কের দিকেই তাকিয়ে বলেছে।

“কি কি দেখছেন?”
“নিশ্চয় তোমাকে না। বাড়ি টা দেখছিলাম।”
লিমা মনে মনে বলতে লাগল,
“ছিঃ কি মিথ্যা কথা বলে ডেভিল টা। আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে কি না বাড়ির দিকে? ড্রাগন একটা।”

শুষ্ক গাড়ির ভেতর থেকে একটা শীট বের করে আনে। সেটা লিমার দিকে এগিয়ে দেয়। লিমা চোখ বুলিয়ে শুষ্ক কে প্রশ্ন করে,
“কি এটা?”
“তোমার মতো পিচ্চি কে তো আর লাভ লেটার দিব না।”

“কি আমি পিচ্চি? আরে ডেভিল তুমি তো জানো না কত ছেলে আমার পিছন ঘুরেছে। এখনো যদি হ্যাঁ বলি ছেলের লাইন লেগে যাবে আর তুমি কিনা বলছো আমায় পিচ্চি? খাডাস।”
কথা গুলি লিমা মনে মনে আওড়াতে লাগল।
শুষ্ক আবার বলে উঠে,

“তুমি পিচ্চি কি না সেটা মনে মনে আর ভাবতে হবে না। এটা নাও আর বাসায় ঢুকো।”
শীট টা শুষ্ক লিমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গাড়ির ভেতর বসে। তারপর লিমার সামনে দিয়ে সাই সাই করে চলে যায়।
লিমা ভ্যাবলার মতো চোখ বড় বড় করে শুষ্কের গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে।

গাড়ি টা আড়াল হয়ে গেলে লিমা ঘনঘন চোখের পাতা ফেলে পরে একটা ঢুক গিলে বাসার ভেতরে যায়।
মায়ের প্রশ্ন,
“কি রে কোথায় গিয়েছিলি?”
“আম্মু শীট আনতে।”
শুধু এটা বলে লিমা দৌড়ে উপরে নিজের রুমে চলে যায়।

শীট টা ভালো ভাবে দেখে বুঝে এটা বেশ কাজের। তাই সাথে সাথে বই নিয়ে বসে পড়ে। শীট টা শেষ করার প্রচেষ্টা করে।
রাতে খেয়ে এসে ঘুমাবে এমন সময় তার কল আসে।
স্কিনে “ডেভিল রাক্ষস” এর নাম ভেসে আসে। লিমা ইচ্ছা করে কল টা না ধরে ফোন রেখে দেয়।
দুই বার কল দিলেই লিমা ধরে। ওপাশ থেকে বলে উঠে,

“হাউ ডেয়ার ইউ? আমার কল পিক করছিলে না কেন? ডেমেট বাসায় কি করো তুমি?”
“….
“তোমাকে না..”
“ডেভিল রাক্ষসের মতো খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে না?”
“হোয়াট?”
“ন না আ আসলে আমি নিচে ছিলাম।”
“খেয়েছো?”
“হুম।”

“আমি খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করবে না?”
লিমা বিড়বিড় করে বলল,
“আমার কিসের ঠেকা লাগছে?”
“কি বললে তুমি?”

“কিছুই না স্যার।”
“না আমি শুনলাম তুমি কিছু একটা বলেছো।”
“না স্যার আসলে বলছিলাম শীট টা দেওয়ার কারণে আপনাকে একটা ধন্যবাদ দিব।”
“রা.. আসলে আমি শুকনো ধন্যবাদ নেই না।”

“তাহলে?”
“আমি তার সাথে সময় মতো যা নেওয়ার নিয়ে নিব।”
“কি বললেন স্যার?”
“পড়া শুনা কেমন চলছে বলো।”

লিমা শুষ্কের সাথে বেশ কিছুক্ষণ পড়া নিয়ে কথা বলল। লিমাও সে গুলি মনোযোগ দিয়ে শুনল। শুষ্ককে তার ভালো না লাগলেও। পড়া নিয়ে কথা শুনতে সে নাসাফাত হয় না।
শুষ্ক ঘড়িতে সময় দেখে বলে,
“রাত ১১ টার উপরে বাজে যাও শুয়ে পড়ো।”
“ওকে বাই।”

“বাই।”
শুষ্ক ফোন রেখে ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি ফুটিয়ে আনে। লিমা ফোন রেখে তার স্বপ্নের সাফাত কে নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি দেয়।


পর্ব ০৪

বেশ কিছুদিন পরে সেদিনের এক ঘটনা, লিমা কলেজের গেইট দিয়ে ঢুকতে গেলে দেখে মাফি তার সঙ্গপঙ্গ নিয়ে বসে আছে বাইকের উপর।
মাফি খুব রকম বকে যাওয়া একটা ছেলে। সাথে তার সাথে থাকা ছেলে গুলিও। সব রকম খারাপ কাজে তাদের পাওয়া যায়। মেয়েদের টিজ করা ছেলেদের সাথে ঝগড়া মারামারি করা। এমন কি প্রোফেসরদেরও সম্মান না করা তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা। এমন অনেক খারাপ কাজে তারা লিপ্ত।

লিমা আর আরিফা একটু দূর দিয়ে গেলে মাফি বলে উঠে,
“ওয়ে ওয়ে ও সুন্দরি কোথায় যাও চুপি চুপি? একটু কাছে আসো না।”

মাফি আর তার সাথে ছেলে গুলি হুহু করে হেসে উঠে। লিমা ঘৃণা নিয়ে মাফির দিকে তাকিয়ে আবার চলে যেতে চায়।
“ওই সুন্দরি তোকে না আমি ডাকলাম। এদিকে আয়।”
মাফির কথা শুনে লিমা আর আরিফা বেশ ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি করা উচিৎ বুঝে পাচ্ছে না।

পিছন থেকে কেউ একজন এসে লিমার হাত ধরে মাফির কাছ দিয়ে লিমা কে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। লিমা হা করে আছে। সাথে অনেকেই।
মাফি চোখ গরম করে শুষ্কের কাঁধ ধরে আটকে বলে উঠল,
“আরে কে রে তুই?”
“আর ইউ টকিং টু মি?”
“তো এখানে কে আছে মাফির খাবার কে নিয়ে যাওয়ার?”
“হাত টা ছাড়।”

“এই এই দেখেছিস তোরা? ও আমার সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছে। আবার তুই করেও বলছে দেখেছিস? কে রে তুই? মাফির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস।”
শুষ্ক মাফির কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পরিচয় পেলে আমার কাঁধ ধরা তো দূরে থাক চোখের দিকেও না তাকিয়ে পা ধরে বাপ বাপ করতি।”
শুষ্কের কথা শুনে মাফি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

শুষ্ক মাফির হাত নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে তার কাঁধ চাপড়াতে চাপড়াতে জোরে বলে,
“আমি এই কলেজের প্রোফেসর।”
এটা শুনা মাত্র মাফি খিল খিল করে হেসে দেয়। তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করে বলে,

“শুনেছিস তোরা? ওর পরিচয় পেলে নাকি আমি বাপ বাপ করব ওর পা ধরে। শুনলি তোরা ও কি পরিচয় দিল? ও নাকি এই কলেজের প্রোফেসর। এটা শুনে নাকি আমি..”
মাফি হাসছে তো হাসছেই সাথে তার ছেলে গুলিও।
শুষ্ক ফোন নিয়ে কি একটা করে আবার রেখে দেয়।
মাফি হাসি থামিয়ে বলে উঠে,

“তোর এই পরিচয়? আরে আমি যদি আমার পরিচয়..”
কথাটা শেষ করার আগেই মাফির কল বেজে উঠে। ফোনে কি কথা বলে তাড়াতাড়ি বাইক স্টার্ট দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যাওয়ার সময় বলে,
“তোকে পরে দেখে নিব।”
শুষ্ক রহস্যের একটা হাসি দিয়ে লিমা কে নিয়ে ক্লাসে চলে যায়।

শুষ্কের টেবিলে সে আর লিমা দুজন মুখোমুখি বসে আছে।
“মাফি খুব বাজে ছেলে। এই কদিন ও দেশের বাড়ি ছিল। আজই হয়তো ফিরেছে। ওর জন্যে কলেজের কেউ শান্তি পায় না। স্যার ম্যামরাও না।”
“ওর চাপ্টার ক্লোজ। এখন নিজের কথা ভাবো।”

শুষ্কের কথায় লিমা ঠোঁট ফুলিয়ে দেয়।
“আপনি যে ওর সাথে লেগেছেন যদি আপনার কি…”
“শাট আপ স্টুপিড। হোয়াট আই ক্যান সে? চুপ করতে বললাম না?”
শুষ্কের ধমকে লিমা ভয় পায়। চুপ করে বসে থাকে।

শুষ্ক রাগে ফুসফুস করছে। রাগ উঠলে সে কিছু তেই নিজেকে সামলাতে পাড়ে না। কি থেকে কি করে কে জানে? শুষ্ক পানির ক্লাস টা নিয়ে ঢগ ঢগ করে পানি গিলতে থাকে।
লিমা কি মনে করে বলে উঠে,
“স্যার আপনি কি সাফাত চৌধুরী কে চিনেন?”

কথাটা শুনা মাত্র শুষ্ক বিশম খেয়ে পড়ে। মুখে থাকা পানির ছিটেফোঁটা লিমার মুখের উপর গিয়ে পড়ে।
শুষ্ক কাশ তে থাকে। কাশতে কাশতে বলল,
“স সরি। আমি দেখিনি। ডোন্ট মাইট।”
লিমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। চোখ মুখ খিঁচে বসে আছে নাক ফুলিয়ে। শুষ্ক কিছু টিস্যু লিমার দিকে এগিয়ে দেয়। লিমা সে গুলি দিয়ে মুখ মুছে নেয়।
“তুমি এখন যাও। আজ আর কিছু পড়াব না। আমি পরে কথা বলব।”

“কিন্তু স্যার সাফাত..”
“যেতে বললাম তো তোমায়? জাস্ট গো।”
লিমা তাড়াতাড়ি করে সেখান থেকে মন খারাপ করে বাসায় চলে যায়। কি এমন হতো সাফাতের খবর দিলে তাকে?
বাসায় গিয়ে শাওয়ার নিয়ে খেয়ে এক ঘুম দেয় লিমা।

শুষ্ক আর কলেজ থাকে না তার খুব কাজ আছে। এখনি যেতে হবে তাকে। ফোনে কারো সাথে কথা বলে সে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে।
খুব কালো এক অন্ধকার জায়গায় শুষ্ক নিজের গাড়ি থামায়। তারপর সাথে সাথে বিশাল দেহী দুই মানব “বস বস” করে দৌড়ে তার কাছে এলো। গাড়ির দরজা খুলে দিল। তারা শুষ্ক কে নিয়ে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার রুমের ভেতরে নিয়ে গেল।
ছোট একটা লাইটের নিচে একটা চেয়ার রাখা।

সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে মাফি আর তার সঙ্গরা এক সাথে বাঁধা অবস্থায় নিচে পড়ে আছে।
শুষ্ক চেয়াট টেনে বসে।
“তারপর বল। তখন কি যেন বলছিলি?”
শুষ্কের কথায় মাফি কাকুতিমিনতি করতে থাকে।
শুষ্ক মাফির গলা টিপে ধরে।

“কি কি বলছিলি লিমা কে? মেয়েদের খাবার মনে হয় কুত্তারবাচ্চা? সব মেয়েদের টিজ করিস না কলেজে? আমাকে কি বলছিলি?”
“মাফ করে দিন। স্যার আমায় মাফ করে দিন। আমি আর এমন করব না।”
শুষ্ক কিছু না বলে এলোপাথাড়ি মারে সবাই কে।

প্রায় আধঘণ্টা পর সে আবার চেয়ার টেনে তাদের সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে। হাত দিয়ে চুল ঠিক করে।
সবাই তার পায়ে হুমড়ি খেয়ে পরছে আর যেন না মারে।
“তোদের আর কলেজের সামনে পাওয়া যাবে?”
“না বস না।”

“কখনো আর কোনো মেয়ে কে অসম্মান করবি?”
“না বস।”
“অসহায় মানুষ কে আর মারবি?”

বলেই রুল দিয়ে একটা বারি দেয় মাফি কে। মাফি আর্তনাদ করে বলে,
“কখনো করব না বস।”
“ভালো হয়ে থাকবি?”
“জ্বি বস জ্বি।”
শুষ্ক উঠে দাঁড়ায়।
বিশাল দেহী দুজনের উদ্দেশ্য করে বলে,

“ওদের হসপিটালে দিয়ে আসবে। আর হ্যাঁ তোকে বলছি কাল কলেজে গিয়ে সবার কাছে মাফ চাইবি। ভুল যেন না হয়।”
“ওকে বস সবার কাছে মাফ চেয়ে আসব। যা বলবেন তাই করব।”
শুষ্ক এক অদ্ভুত রহস্যের হাসি হেসে সেই জায়গা ত্যাগ করল।

লিমা সেই যে ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় উঠেছে। বিছানার পাশ থেকে ফোন নিয়ে দেখে ৫৬ টা কল দিয়েছে “ডেভিল রাক্ষস”। লিমা ভয়ে ফোন টা বন্ধ করে ফেলে।
না জানি রাগে কি করবে। ধমক দিতে তো আর কম জানে না লোকটা। মনে হয় কান ফেটে মগজে ঢুকে যাবে সেই ধমক।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে লিমা কলেজের উদ্দেশ্য রওনা দেয়।
কলেজে গিয়ে দেখে আজ তাড়াতাড়ি এসে পড়েছে। আরিফা আর সে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে।
শুষ্ক আসলে একটু পর পিছুপিছু মাফি আর তার সাথে থাকা ছেলে গুলিও আসতে থাকে।

অবাক করা বিষয় কাল যারা ভালো ছিল আজ তাদের কারো হাতে কারো কপালে কারো নাকে কারো পায়ে ব্যান্ডেজ করা। মাফির হাত ভেঙ্গে আছে। কপালে পায়ে ব্যান্ডেজ করা। হাত গলায় ঝুলিয়ে সে কলেজে আসছে।
সবাই ভাবছে তাদের এমন অবস্থা করল কে?

মাফি এসে আগে দৌড়ে লিমার কাছে যায়। তার কাছে মাফ চায়। আস্তে আস্তে কলেজের ছোট বড় সবার কাছে মাফ চাইছে। অদ্ভুত এক বিষয় মাফি আড় চোখে চোখে শুষ্কের দিকে তাকাচ্ছিল। বিষয়টা লিমা বেশ খেয়াল করছে। শুধু কারণ বুঝতে পারছে না।
শুষ্ক দূরে প্যান্টের প্যাকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে তার রহস্যের হাসি।

সর্বশেষ মাফি শুষ্কের কাছে যায়। তার পায়ে হুমড়ি খেয়ে মাফ চায় কালকের জন্যে। শুষ্ক তাকে নিচ থেকে তুলে ভাঙ্গা হাতে আস্তে একটা চর দেয়। মাফি উহহহ করে উঠে।
শুষ্ক চোখ দিয়ে ইশারা করলে মাফি আর বাকি ছেলে গুলি চলে যায়।
বিষয়টায় কলেজের সবাই অবাক হয়। সব চেয়ে বেশি লিমা অবাক হয়। কারণ তার কাছে সন্দেহ লাগছে।
লিমা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। শুষ্ক এসে লিমা কে হেঁচকা টান দিলে তার ধ্যান ভাঙ্গে।
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”

শুষ্ক তাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। দরজাটা বন্ধ করে দেয় ঠাস করে। লিমা কে দেওয়ালের সাথে চেঁপে ধরে। মুহূর্তেই তার চোখে রাগের রূপ দেখা যায়। একটু আগেও যার ঠোঁটে রহস্যের হাসি দেখল এখন তার চোখে রাগ দেখছে লিমা। তবুও চোখ মুখে লিমা রহস্যের ঘনঘটা দেখতে পাচ্ছে।
“হাউ ডেয়ার ইউ ননসেন্স? রাত থেকে ফোন অফ ছিল কেন?”

শুষ্কের কিড়িমিড়ি কথায় লিমা ঘনঘন চোখের পাতা নাড়ে।
“কি হলো কি বলছি আমি?”
“কি?”
“মানে কি বলছি আমি তুমি তা শুনতে পাচ্ছো না?”
“না আসলে..”

“ফোন অফ ছিল কেন?”
“চার্জ ছিল না।”
“কারেন্ট তো ছিল চার্জে লাগাও নি কেন?”
“মনে ছিল না।”
“কেন তোমার এই টুকু মন কোথায় থাকে?”

“সাফাত চৌধুরীর কা.. না মানে আ আসলে কিছু না।”
শুষ্ক ফ্যালফ্যাল করে লিমার দিকে তাকিয়ে আছে।
“ইসস হাতির মতো শরীর নিয়ে ঝুঁকে আছে আমার উপর। ইসস সরুন।”
“হোয়াট আর ইউ সেয়িং ডেমেট?”

“কিছু না। সরুন।”
শুষ্ক লিমার বাহু চেঁপে ধরে। মুখ খুব কাছে নিয়ে,
“সারা দিন এত সাফাত চৌধুরী সাফাত চৌধুরী করো কেন? কি আছে ওর মাঝে? যা অন্য কারো কাছে পাও না।”
“পারসোনালিটি। উনাকে আমি আমার সব টা দিয়ে দিয়েছি। সব ভালো লাগা। সব। এখন ছাড়ুন আমায়।”
শুষ্ক লিমার মুখের আরো কাছে চলে যায়।

“কেন তা আমাকে দেওয়া যায় না লিমা? প্লিজ বলো না।”
“কি কি যা তা বলছেন?”
লিমা ধাক্কা দিয়ে শুষ্ক কে ঠেলে দেয়। শুষ্ক একটু দূরে গিয়ে পড়লে তার প্যাকেট থেকে একটা কার্ড পড়ে যায়। শুষ্ক মাথা নিচু করে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। বিষয়টা তার রুচি তে লাগে। তার রাগ উঠেছে।
লিমা কার্ডটা তুলে দেখে বুঝতে পারে আইডি কার্ড। অপর পৃষ্টায় চোখ বুলালে দেখে তার ছবি। নামের দিকে নজর দিলে দেখতে পায় “রা..
বাকি টা দেখার আছে ছো মেরে শুষ্ক সেটা নিয়ে নেয়।

লিমা দেখতে চাইলেও শুষ্ক তা কেড়ে নিজের কাছে রেখে দেয়। লিমা কাড়াকাড়ি করেও পাড়ে না নিতে।
“মাফি কে আপনি মেরেছেন তাই না?”
লিমার কথায় শুষ্ক অবাক হয়। মুখ ঘুরিয়ে নেয়। লিমা আবার তার দিকে ফিরে।
“কি হলো বলুন স্যার।”
“ক্লাসের টাইম হয়ে গিয়েছে ক্লাসে যাও।”
“তার মানে আপনিই মাফি কে মেরেছেন তাই না স্যার?”
“বললাম না ক্লাসে যাও।”

“স্যার আগে আমায় বলুন আপনার নাম আসলেই শুষ্ক তো? তাহলে আইডি কার্ডে আপনার ছবির সাথে না..”
শুষ্ক আর কিছু না বলে দরজা খুলে সেখান থেকে হনহন করে বের হয়ে যায়।
লিমা পিছন থেকে অনেক ডাকে কিন্তু সাড়া পায় না।

ক্লাসে শেষে শুষ্ক আজ আর লিমা কে তার রুমে যেতে বলে না। লিমা তাড়াতাড়ি করে বের হয়। কিন্তু তার আগেই শুষ্ক নিজের গাড়ি নিয়ে চলে যায়।
লিমা বাসায় গিয়েও শুষ্ককে কল করে কিন্তু পায় না। লিমার রাগ হয় সাথে সন্দেহের পাহাড় জমে।

শুষ্ক নিজের বাসায় সুইমিংপুলের পাশে রাখা ডিভানে বসে আছে। মুখের উপর হাত রাখা। তার মাঝেও চিন্তার ছাপ। চোখ গুলি টগটগ করে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা পরছে না।
“আর কত এই ভাবে? অনেক দিন তো হলো এই লুকোচুরি খেলা। আর কত দিন এই লুকোচুরি খেলা চলবে? এখনো কি সময় হয়নি? এখনো এইভাবে আড়ালে থাকার কোনো মানে আছে? হয়তো বা না। আর না নিজের ভালোবাসার কাছে আত্মপ্রকাশের সময় চলে এসেছে। প্রেয়সী সময় যে আগত।”
ভাবতেই মানুষটার মুখে হাসি ফুটে আসে।
এমন সময় তার কল আছে,

“হ্যালো।”

“ইয়েস বলো।”

“কাল কেই?”


“কানাডা?”

“ঠিক কত দিন সময় লাগবে?”

“ওকে ফাইন। কনফার্ম করে দাও। আর পার্সফোট টাও রেডি করে নাও। কাল ১২ টার ফ্লাইটে।”

“ওকে রাখছি।”

কাজের জন্যে তাকে দুই দিনের জন্যে কানাডা যেতে হবে। তারপরে এসেই প্রেয়সীকে সারপ্রাইজ দিবে। বড় ধামাকা অপেক্ষা করছে।
লিমা রাতেও স্যার কে কল দেয় কিন্তু ফোন বন্ধ পায়। এবার খুব রাগ হয় লিমার।

সে রাতে লিমার ঘুম হয় না। রাগ, চিন্তা, ভাবনা আর সন্দেহ সব মিলেমিশে এক হয়ে উঠেছে তার। আইডি কার্ড টা দেখার পর থেকে আরো কেমন যেন লাগছে। ছবি তো ঠিকি আছে তবে নাম? নামের জায়গায় রা.. কেন? উনার নাম শুষ্ক তবে? নাকি শুষ্কের আগে আরো কিছু আছে?
লিমা মাথার চুল টেনে বলতে থাকে,

“ইসসস আর পারছি না। এত চিন্তা করতে আর পারছি না। প্রচন্ড ধরেছে মাথা টা। উফফ। না কাল উনার সাথে কথা বলতেই হবে। আমার থেকে পালিয়ে গেলেও উনাকে আর ছাড়ছি না। উনার সব কিছু বলতেই হবে। কেন সেদিন ইনু আমার কাছে মাফ চাইল? যাকে এত এত অপমান করেও পিছু ছাড়াতে পারলাম না।

সে কি না দৌড়ে উনার পায়ে পরল মাফ চাইতে? উনি বলার পর আমার কাছে মাফ চাইছে কেন? আর মাফি? যাকে কলেজের স্টুডেন্ট সহ প্রোফেসরা পর্যন্ত ভয় পায় তার কি না এ হাল হলো? কেন এমন করল তাদের? আবার এসে সবার কাছে মাফও চাইল। বড় কথা বারবার কেন স্যারের দিকে তাকাচ্ছিল মাফি? তবে কি মাফি কে স্যারই…. না না সব না জানা পর্যন্ত আমি আর ঠিক থাকতে পারছি না। কিছু তেই না।”
দরজার ওপাড় থেকে তার বাবা বলে উঠল,

“কিরে লিমা মা কি বিড়বিড় করছিস? এখনো ঘুমাসনি?”

“নিশ্চায় বাবা আমার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হায় হায় কি বলব এখন?”
“কিরে লিমা মা?”
“হ্যাঁ বাবা আসি।”
লিমা গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
“মা কি করছিলি এতক্ষণ?”

“…
“কি রে?”
“বাবা পড়ছিলাম।”
“মিথ্যে বলছিস? লাইট তো অফ ছিল।”
লিমা মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“আসলে বাবা ইয়ে মানে আমার ঘুম আসছিল না।”

মেয়ের কথা শুনে আরমান হেসে একাকার।
“চল তোকে ঘুম পারিয়ে দেই।”
“না বাবা লাগবে না। তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি ঠিক ঘুমিয়ে যাবো।”
“আরে আয়। গল্প শুনে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বি।”
আরমান মেয়ে কে নিয়ে বিছানায় যায়। যেতে যেতে বলে,

“জানিস ছোট থাকতে তুই গল্প না শুনে কিছুতেই ঘুমাতি না। সে কি বায়না ছিল তোর।”
লিমা মুচকি হেসে বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তার বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গল্প করতে থাকে। সাফাতপুত্র আর সাফাতকন্যার গল্প। লিমা সাফাতপুত্রের জায়গায় সাফাত কে কল্পনা করতে করতে চোখ নেতিয়ে আনে।

“বাবা তো এক জাদুর পরশ। এই ছায়া মাথার উপর থাকলে সব কিছু খুব মনোরম লাগে। নিজেকে খুব হাল্কা হাল্কা লাগে। বাবা নামক জাদুকর হলো দুনিয়ার সব চেয়ে বড় জাদুকরের সেরা। বাবার সাথে ঠিক কারো তুলনা হয় না। বাবারা প্রতিটা সন্তানের ভালোবাসা হয়। বাবার ছায়ার তলে থাকলে চিন্তা ভাবনা কম থাকে। কারণ মাথার উপর তো বাবা আছেই। আর যদি সেই বৃক্ষ টার ছায়া পাওয়া না যায় তবে আকাশ সমান চিন্তা মাথায় চেঁপে বসে। বাবার ছায়া এমন হয়।”

পরের দিন লিমা খুব তাড়াতাড়ি করে কলেজে যায়। কিন্তু কলেজের সময় হয়ে যাচ্ছে শুষ্ক তো আসছে না।
অবশেষে প্রথম ক্লাস অন্য স্যার এসে করিয়ে গেল।

লিমা ভেবেছে হয়তো স্যার আজ আসবে না। লিমা সোজা প্রিন্সিপালের কাছে যায়।
“মে আই কামিং স্যার।”
“ইয়েস।”
“স্যার শুষ্ক স্যার আজ আসবে না।”
“না।”
“স্যার একটা কথা।”
“বল লিমা।”

“স্যার আমি কি স্যারের ডিটেল্স সম্পর্কে একটু জানতে পাড়ি?”
“লিমা তুমি আমার মেয়ের মতো। আমার কলেজের খুব ভালো একটা স্টুডেন্ট তুমি নিজেও খুব ভালো। সব মিলিয়ে তোমাকে খুব স্নেহ করি আমি। আমি চাই না এমন কিছু বলো যা তোমাকে কটু কথা শুনাবে। আশা করি বুঝতে পেরেছো কি বললা।”
“জ্বি স্যার। সরি ভুল হয়ে গিয়েছে।”

“যাও কাজ আছে আমার।”
লিমা চলে এলো রাগে কটমট করছে। সেদিন আর ক্লাস করে নি। বাসায় চলে যায়।
এর পরের দিনও কলেজে গিয়ে দেখে আজো শুষ্ক কলেজে আসেনি। লিমার রাগ সন্দেহ যেন হিমালয় ছুঁয়েছে। মুখ ভুতা করে আবার বাসায় চলে যায়।


পর্ব ০৫

ঠিক তিন দিনের মাথায় শুষ্ক কলেজে যায়। প্রিন্সিপাল কে সে বলেই গিয়েছিল।
লিমা তখন আরিফার সাথে কথা বলছিল,
“লিমা তুই এই ভাবে কেন বসে আছিস?”

“তো কলেজের এত লোকের সামনে কি নাচব?”
“না মানে হাসি হাসি মুখে কথা তো বলতে পারিস।”
“তোর মতো পাগল ছাগল আমি?”

“কি?”
“জিজ্ঞাস করলাম তোর মতো কি আমি পাগল ছাগল যে কোনো কারণ ছাড়া বেক্কলের মতো হাসব।”
“এই ভাবে কথা বলছিস কেন?”
“তোর ভাগ্য ভালো এখনো যে তোর ২৪ গোষ্ঠী কে ধুয়ে দেই নি।”
আরিফা আর কিছু বলে না। চুপ করে যায়। তা না হলে লিমার বলা শেষ হবে না।

লিমা বসে বসে মাঠের ঘাস উবরাচ্ছিল।
“তুই গরু হয়ে গেলি?”
“হোয়াট ননসেন্স?”
“না মানে কখন থেকে ঘাস উঠাচ্ছিস।”
“এই গুলি ভেজে মোমের ভেতর চিকেনের বদলে দিয়ে তা আবার ভেজে তোর হবু জামাইয়ে খাওয়াব। সাথে তোর গলার উপর উঠে তোকে গিলাব।”
“কি?”
“..
লিমা মন খারাপ করে ঘাসে হাত দিতে গিয়ে সামনে তাকাতেই দেখে শুষ্ক কি সুন্দর কলেজের ভেতর আসছে।
লিমা আর চিন্তা বা সময় নষ্ট না করে দৌড়ে তার সামনে যায়।

“কোথায় ছিলেন দুদিন?”
লিমার কথায় শুষ্ক থেমে একবার তার দিকে তাকায়।
পরে কোনো কথা না বলে হাটতে থাকে। সে ভালো করেই জানে লিমা কে কিছু না বললে সে তার সাথে যেতেই থাকবে।

শুষ্ক আপন মনে হাঁটছে। যেতে যেতে সে নিজের রুমে চলে যায়। আর লিমা তো তাকে প্রশ্নের উপর প্রশ্নের আবরণে মুড়িয়ে দিচ্ছে। বকবক করতে করতে এটাও তার খেয়াল নেই যে সে রুমের ভেতর চলে এলো।
লিমা ভেতরে যেতেই শুষ্ক দরজা বন্ধ করে দেয়।
এবার লিমার হুশ ফিরে। ঢুক গিলে বলে,
“আ আপনি দরজা বন্ধ ক করলেন কেন?”
“….

“আ আমি পরে কথা বলব। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে আমি যাই।”
লিমা তাড়াতাড়ি কথা গুলি বলে দরজার দিকে যেতে চাইলে শুষ্ক তার হাত ধরে পথ আটকে বলে,
“উম উম কোথাও নয়। কোথাও যাওয়া হবে না। এতক্ষণ না ননসেন্সের মতো ননস্টপ বকবক করছিলে? সো এখন প্রশ্ন করো। শাহজাদীর উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত।”
“ম মানে?”
“মানে প্রশ্ন করো।”
“ন না আমার তো কোনো প্রশ্ন নেই। আমি যাই।”
লিমা আবার যেতে চাইলে সাফাত হাত প্রসারিত করে তাকে বাঁধা দেয়।
এবার লিমা ভয়কে যায়। ঢুক গিলছে আর ঘনঘন চোখের পাতা ফেলছে। শুষ্ক তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
“ডো ইউ সাসপেক্ট মি?” (আমাকে তুমি সন্দেহ করছো? )

“ম মানে?”
“তাহলে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন ছুড়ছো কেন?”
“এ এমনি”
“ও রেয়লি? ডোন্ট ইউ সাসপেক্ট মি? বাট আই ক্যান সী দ্যা আবিউস ডাউট ইন ইউর আইস।” (ও সত্যি? তুমি আমাকে সন্দেহ করছো না? কিন্তু আমি তোমার চোখে স্পষ্ট সন্দেহ দেখতে পাচ্ছি।)
“কি কি যা তা বলছেন আমাকে যেতে দিন।”
এবার শুষ্ক লিমার কোমর জড়িয়ে টেনে আনে।

“কি কি করছেন? ছাড়ুন আমায়। ছাড়ুন বলছি।”
“কেন জানতে চাইবে না আমার আসল পরিচয়?”
“গুলি মারি আপনার পরিচয়। জান বাঁচানো ফরজ কাজ। ছাড়ুন আমায়।”
লিমা শুষ্কের বুকে হাতে কিল চর দিতে থাকে। শুষ্ক মুচকি হেসে লিমা কে ছেড়ে দেয়। লিমা হুড়মুড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে পড়ে।
শুষ্ক তার হাসি টা ভেতরে রেখে বলে,

“ওকে দ্যান ডোন্ট টক এভাউট দিজ এনিমোর।”
“নিজে বাঁচলে বাপের নাম। আর কখনোই বলব না।”
লিমা আর দেরি না করে শুষ্কের পাশ কাটিয়ে দৌড়ে দরজা খুলে বের হয়ে যায়।
শুষ্ক মুচকি হেসে হেসে বলে,

“প্রেয়সী ইউ উইল রিম্মেবার ইট এগেইন এন্ড এগেইন।” (প্রেয়সী এটা তুমি বারবার মনে করবে।)
লিমা যেতে যেতে ভাবতে থাকে।
“মানুষটার মাঝে সত্যিই কিছু একটা আছে। না হলে কি আর এমন করে? কেনই বা বলল পরিচয় জানার কথা? তবে সত্যিই কি উনি উনার পরিচয় গোপন করছে? না হলে কেন এমন কথা বলবে? নিশ্চয় কোনো গণ্ডগোল আছে। বিষয়টা ছেড়ে দিলে চলবে না। না রাতের ঘুম হারাম করার চেয়ে ঘুটিয়ে দেখা ভালো।”
শুষ্ক দ্বিতীয় ক্লাসে গিয়ে দেখে লিমা নেই।
এদিক সেদিক তাকিয়েও তাকে পাওয়া গেল না।

সে আরিফার কাছে যায়।
“আরিফা!”
“জ্বি স্যার।”
“লিমা কোথায়?”
“স্যার আপনার সাথে সেই যে গেল তারপর তো আর এলো না।”

“হোয়াট?”
“হুম স্যার এর পর থেকে তাকে আর দেখা যায় নি।”
শুষ্ক ভেবে নিয়েছে, হয়তো ভয়ে পালিয়ে গিয়েছে।
“ওকে বসো।”
শুষ্ক ক্লাস শেষে বের হয়ে গেল। লিমা কে সারা কলেজ খুঁজেও পাওয়া যায়নি। শুষ্কও গটগট করে কলেজ থেকে বের হয়ে এলো।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে চলে যায়।

একটা বিশাল বড় বিল্ডিংয়ের সামনে গাড়ি থামায়। তারপর শুষ্ক বের হয়ে ভেতরে চলে যায়।
লিমা গাড়ির পেছনের দরজা একটু খুলে উঁকি দিল। চারপাশ টায় চোখ বুলিয়ে নিল। দেখে মনে হচ্ছে অফিস টফিস।
আসলে সে পেছনে মাল রাখার জায়গায় লুকিয়ে ছিল।

সেখান থেকে একটু বেড়িয়ে নিজেই বলতে থাকে,
“ভাগ্যিস বুদ্ধি টা মাথায় এসেছিল। আর আয়ান টাকেও কি বলে যে ধন্যবাদ দিব। ও না থাকলে তো এখান পর্যন্ত আসতেও পারতাম না। এত আগে এই গুহার মাঝে বসে থাকলে দম আটকে কবেই মরে যেতাম। ওকে বললাম বলেই তো ডেভিল রাক্ষস বের হওয়ার সাথে সাথে আমায় ম্যাসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে। আর আমি টুক করে ওখানে বসে গেলাম। ডাইনোসর টা টেরও পায় নি। নিহাত আয়ান আমায় পছন্দ করে না হলে তো বলেই দিত। ইসস ছেলে টা কি কিউট।”
লিমা মিষ্টি একটা হাসি দেয়।
আবার বলে,

“এটা তো অফিস। কিন্তু লোক টা এখানে কেন আসল?”
লিমা আশপাশ তাকায়। তরপর উপরে তাকিয়ে নাম দেখে খুব বেশি অবাক হয়। অবাক বলতে ধাক্কা খায় সে। বড় বড় ডিজাইন করা লিখা আছে “সাফাত কোম্পানি” এখানে এই লোক টা কি করছে?
ভেবে লিমার মন আরো জট পাকিয়ে যায়। সন্দেহের মাত্রাও বেড়ে যায়।

লিমা ভেতরে যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতেই দেখে শুষ্ক আসছে প্যান্টের প্যাকেটে হাত দিয়ে। দুই তিন টা লোক তাকে দাঁড়িয়ে আবার সম্মানও দিল। লিমা কিছুই বুঝতে পাড়ল না।
সময় নষ্ট না করে দৌড়ে আবার পেছনে গিয়ে বসে পড়ল।
শুষ্ক অনেক স্পিডে গাড়ি ড্রাইভ করছে। মাঝে মাঝে খুব জোরে জোরে ব্রেক নিচ্ছে।

আর লিমা ওখানে থেকে থেকে জান তার বেহাল হয়ে গিয়েছে। শুষ্ক কে খুব বকছে।
“আরে হাতির শক্তি কেন দিচ্ছে গাড়ির উপর? এতটা রাক্ষস মানুষ হয় কি করে? নাকি গাড়ি চালাতে যানে না আল্লাহ জানে। আমার কোমর হাড় সব ভেঙ্গে তো শলা হয়ে যাচ্ছে রে। আরে গন্ডার গাড়িও থামাচ্ছে না। নিজের জান নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। আল্লাহ দয়া করো। আরে গন্ডার রে।”
লিমা ঝাঁকি খাচ্ছে আর শুষ্ক কে বকছে।

বেশ সময় নেওয়ার পর গাড়ি থামল। লিমা একটু হাফ ছেড়ে বাঁচল। ইচ্ছে করছে এখনি এখান থেকে বের হয়ে যেতে। কিন্তু রাক্ষসের মুখের সামনে যদি পড়ে? তবে তো একদম গিলেই খাবে। তার থেকে না হয় ভালো একটু বসে থাকা যাক। এই ভেবে লিমা চুপ করে মুখে হাত দিয়ে বসে আছে।
শুষ্ক গাড়ি পার্ক করে দারোয়ান কে বলল,
“সাইদুল তুই যা তো।”

“কোথায় যাবো স্যার?”
“উমম তুই এক কাজ কর তুই রেস্টুরেন্টে যা। কি কি লাগবে আমি তোকে ফোনে বলে দিব।”
“ঠিক আছে স্যার।”
সাইদুল চলে যায়। শুষ্ক ভেতরে যায়। আসার সময় আমেনা আন্টি কে চলে যেতে বলল। কাল বলেছিল তার মেয়ে অসুস্থ তাই পাঠিয়ে দিয়েছে। সাইদুল কে দিয়েও তো খাবার আনতে বলল। এটা দিয়েই চলে যাবে আজ।
শুষ্ক চাবি আঙ্গুলের ঢগায় ঘুরাতে ঘুরাতে ভেতরে চলে গেল।
লিমা দরজা টা উঁচু করে দেখে কেউ নেই। কোনো রকম সেখান থেকে বের হয়ে এলো। বিশাল এক বাড়ি। চারপাশ টা কি সুন্দর। কত গাছ অনেক টা জায়গায় শুধু গাছের কারণে সবুজ।
বিশাল জায়গা জুরে গাছ পালা সুন্দর ফুলের বাগান। সামনে বড় একটা পুল সেখানে কি সুন্দর মাছেরা দৌড়া দৌড়ি করছে। পাশেই ছোট ছোট কিসের গাছ।
বাড়ি তো নয় যেন বিলাসিতায় ভরপুর।

লিমা চারপাশ দেখছে আর অবাক হচ্ছে। পুলের কাছে গিয়ে সেখানে হাত দিলে কিছু মাছ তার আঙ্গুল ঠুকরে দেয়।
লিমা খিলখিল করে হেসে হাত তুলে নেয়।
তারপর মুখে হাত দিয়ে চারপাশে চোখ বুলায়।

“ভেতরে যাওয়া টা আমার ঠিক হবে? নাকি চলে যাবো? এত টা জায়গা রাক্ষসের ঝাঁকি খেয়ে এসে এমনি চলে যাবো? দূর গিয়ে দেখিই না গুহায় কে আছে?”
কথা গুলি বিড়বিড় করে নিজের সাথে বলেই পা টিপে টিপে লিমা ভেতরে গেল।
দরজা টা খুলে ভেতরে যায়।

ভেতরে গিয়ে আরো অবাক হয়। কি সুন্দর করে সাজানো। কত বিলাসবহুল জিনিস। কি সুন্দর ভেতরটা। লিমা ঘুরছে আর দেখছে আর অবাক হচ্ছে।
শুষ্ক তখন ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে লম্বা শাওয়ার নিচ্ছে আর মনে মনে অনেক কিছু ভাবছে।
লিমা সব ঘর দেখতে দেখতে কোণার এক রুমে চলে যায়।

শুষ্কের বিশাল এক ছবি দেওয়ালে ঝুলছে। আশেপাশে কত জিনিস। রুম টা বেশ পরিপাটি। বেডে কি সুন্দর সাদা চাদর বিছানো। দেওয়ালও সাদা। সাথে হাল্কা রঙের প্রিন্টিং। লিমার ঘর টা খুব পছন্দ হয়েছে।
দেখতে দেখতে লিমা বেশ ভেতরে ঢুকে গেছে।
ওয়াশরুম থেকে শাওয়ারের শব্দ টা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দরজা খুলার শব্দে লিমা হকচকিয়ে যায়।

তাড়াতাড়ি কোনো দিশা না পেয়ে আলমারি খুলে সেখানে ঢুকে।
শুষ্ক টাওয়াল পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। ভিজে চুল দিয়ে পানি টুপটুপ করছে। সদ্য গোসল করে আসায় তার শরীরের শুভ্রতা আরো ভেসে আসছে। সামনের চুলের পানি এসে বুক ভিজে যাচ্ছে।
রুমের আশপাশ এক বার দেখে আলমারির কাছে যায়।
আলমারি খুললে লিমা গুটিশুটি করে নিচে বসে থাকে। শুষ্কের ভয়ে জড়সড় হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।

শুষ্ক নিজের কাপড় খুঁজতে লাগে। হেঙ্গার গুলি এদিক ওদিক করতে করতে লিমার হাত পেয়ে টেনে নিজের বুকের মাঝে নিয়ে আসে।
পা দিয়ে আলমারির দরজা টা বন্ধ করে লিমা কে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
লিমা চোখ বন্ধ করে আছে। যেন এই বুঝি রাক্ষসের করাল গ্রাসে পড়ল। লিমা ভয়ে শুষ্কের বুকে মুখ লুকিয়ে আছে।

শুষ্ক অপলক লিমা কে দেখছে আর মিটমিট হাসছে।
লিমা কিছুক্ষণ বাদে আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকায়। শুষ্ক কে এই ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখতে কি করবে সে ভেবে পায় না। তবে খুব ভয় পায় সাথে লজ্জাও। এভাবে কেউ তাকায় নাকি কারো দিকে?
শুকনো ঢুক গিলে শুষ্কের দিকে তাকায়।
শুষ্কের বুক থেকে নিজেকে দূরে নিয়ে আমতাআমতা করতে থাকে,
“আ আসলে আমি না। আসছি।”

লিমা দৌড়ে চলে যেতে নিলে শুষ্ক পিছন ফিরেই লিমার হাত ধরে তাকে আটকায়। লিমা খুব ভয় পেয়ে যায়।
সাফাত আবার হেঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে আসে লিমা কে। কোমড় টেনে আরো কাছে আনে।
“প্রেয়সী দ্যান মাই আইডেন্টিটি কাম দিজ পোয়েন্ট।” (প্রেয়সী তাহলে আমার পরিচয়ের টানে চলেই এলো এখান অবধি।)
“আ আমি আ আসলে..”
“আমার প্রেয়সী।”
“ম মানে?”

“মানে তুমি আমার ভালোবাসা।”
“কি কি সব বলছেন এই সব?”
“কি সব নয় ঠিকি বলছি। আমার পরিচয় জানা এতোই দরকার ছিল বুঝি প্রেয়সী?”
“কি কিসের প পরিচয়?”
শুষ্ক লিমা কে ছেড়ে একটু দূরে যায়।
লিমা দৌড়ে দরজার কাছে গেলে দরজা আর খুলতে পাড়ে না। শুষ্ক মুচকি হেসে পেছন ফিরেই বলে,
“দ্যা কিংডম ওফ ইউর ড্রিমস দাজ নট হোয়্যাক সো রাউ।” (তোমার স্বপ্নের সাফাত এত কাঁচা কাজ করে না।)

মানুষটার কথা শুনে লিমা ভীষণ রকম অবাক হয়। ঘনঘন চোখের পাতা নাড়ে।
“লিমা লকিং দ্যা ডোর।”
“প্লি প্লিজ দরজা টা খু খুলে দিন প্রোমিজ আর কোনো দিন আসব না। আই প্রোমিজ।”
লিমার পেছন দিকে মুখ করে রাখা মানুষটা শান্ত গলায় বলে,

“হোয়াই? ডোন্ট ইউ কাম হার উইদ সো মাচ ট্রাভেল টু ফাইনড আউট মাই রিয়েল আইডেন্টিটি।” (কেন? তুমি না আমার আসল পরিচয় বের করবে বলে এত কষ্ট করে এখানে এলে।)
“ন না আমি আ আসলে আমি কখন এখানে এলাম আমি নিজেই জানি না। কিভাবে এলাম তাও জানি না। প্লিজ দরজা টা আনলক করে দিন আমি বাসায় যাবো।”

লিমার দিকে তাকিয়ে মানুষটা শান্ত গলায় বলে,
“প্রেয়সী আমি সাফাত। সাফাত চৌধুরী। আমিই তোমার সেই স্বপ্নের সাফাত যাকে দেখার জন্যে সর্বদা তুমি উদ্বিগ্ন থাকো। আমি তোমার ড্রিমবয়। যাকে সব সময় তুমি স্বপ্নে দেখে আসছো কিন্তু বাস্তবে খুঁজে চলেছো। যার অস্তিত্ব ছিল না তোমার কাছে সেই আমি আজ তোমার নয়নগোচরের দাঁড়িয়ে আছি। যাকে একটা বার দেখার জন্যে তুমি ব্যাকুল হয়ে থাকো আমিই তোমার সেই সাফাত।”
লিমা রসগোল্লার মতো চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে থাকে মানুষটার দিকে।


পর্ব ০৬

লিমা কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। তার মুখের কথাও হারিয়ে গেছে।
বিশ্বাস করতেও পারছে না। এটাই তার সেই সাফাত? লিমা চোখ বড়বড় করে সাফাত কে দেখে।

সাফাত তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার থেকেও বেশ লম্বা চড়া একটা মানুষ। টাওয়াল পেঁচিয়ে দিব্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জিম বডি চুলে সদ্য দেওয়া পানি টপটপ করে পড়ছে। চুল সামনে এলোমেলো হয়ে আছে। বুকের উপর দানাদানা পানি লেগে আছে। লাল ঠোঁটের কোণায় এক অদ্ভুত হাসি। ঘোর লাগানো চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“ক্যান নট ইউ বিলিভ মি?” (বিশ্বাস করতে পারছো না আমায়? )
“আ আপনি?”

“আই এম সাফাত। ইয়েস আই এম সাফাত চৌধুরী। আর এটা ১০০% ঠিক নয় সঠিক।”
“….
লিমা অবাক চোখ নিয়েই সাফাতের খুব কাছে যায়। পা থেকে মাথা অবধি একবার দেখে নেয়।

“আ আপনি সত্যিই সাফাত চৌধুরী?”
সাফাত মুচকি হেসে লিমার হাত ধরে নিয়ে দরজার কাছে যায়। লক অন করে তাকে নিয়ে একটা রুমে যায়। রুম টার মাঝে শুধু ইয়া বড়বড় ছবি।

সাফাত লিমা কে নিয়ে খুব বড় একটা ছবির সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড়া করায়।
লিমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সেখানে থাকা পর্দা টা সরিয়ে নেয়। লিমা অবাক হয়ে দেখছে।

প্রিন্টিং করা সাফাতের ছবি। যেখানে সাফাত নেশা ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। সাদা একটা শার্ট গায়ে দেওয়া। লিমা ছানাবড়া চোখ নিয়ে ড্যাবড্যাব করে দেখছে। নিচে গুটাগুটা অক্ষরে লেখা “সাফাত চৌধুরী”।

সারা ঘরে এমন অনেক ছবি। সাফাতের একেকটা ছবির দিকে যে কেউ এইভাবে তাকিয়ে থাকবে।

“এই গুলি আমার ড্যাড এঁকে গিয়েছিল। জন্মের কয়েক বছর পর মা মারা যায়। ড্যাড সব টা দিয়ে আমায় মানুষ করেছে। ছোট থেকে বড় করেছে। আমেনা আন্টি আমায় লালনপালন করেছে। ড্যাডও সেই আমায় একা করে ২ বছর আগে চলে গেল। এই প্রিন্টিং গুলি ৩/৪ বছরের আগের। ড্যাড যখন জানলেন ছবি আঁকা মহাপাপ। সেদিন থেকে ছেড়ে দিয়েছিল। আর সে দিনই এই ছবি টা প্রিন্টিং করে শেষ করেছিল।”
লিমা মোহ নিয়ে একেক টা ছবি দেখছে ঘুরে ঘুরে আর ছবির মাঝে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

কি নিখুঁত অঙ্কন। শিল্পকৌশল চুয়েচুয়ে পরছে।
“কাম ডেয়ার।”

সাফাত আলতো হাতে লিমা কে টেনে তার বেড রুমে নিয়ে গেল। লিমা শুধু সাফাত যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকে যাচ্ছে। তার চোখের চাওনি সাফাতের দিকে স্থির।
তাকে নিয়ে সাফাত নিজের রুমে গেল। ওয়ালেট থেকে আইডি কার্ড টা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“জাস্ট লুক এট ইট মাই কুইন।”

সাফাতের হাত থেকে লিমা আইডি কার্ড টা নেয়। সেখানে দেখতে পায় সাফাতের ছবি আর নামের জায়গায় স্পষ্ট অক্ষরে লেখা “সাফাত চৌধুরী” তার মানে এই মানুষটা সত্যিসত্যি সাফাত? তার সেই আকাঙ্ক্ষিত সাফাত?

তার এখন কি রিয়েক্ট করা উচিৎ সে সেটা বুঝতে পারছে না।
পাথরের মতো ঠাই দাঁড়িয়ে বারবার সাফাত কে দেখছে। লিমার এই পরিস্থিতি দেখে সাফাত মিটিমিটি হাসে। তারপর বলতে থাকে,

“তোমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে তো? আমি এত বড় একজন বিজনেসম্যান হওয়ার পরেও কলেজের টিচার কি ভাবে হলাম? কলেজেই কেন গেলাম? আর তোমার সাথে কেন আষ্টে থাকতাম তাই তো?”

লিমা চোখের পাতা ফেলতে ফেলতে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে।
“হুম আমি একজন টপার বিজনেসম্যান। কিন্তু নট এ টিচার। আমি আসলে প্রোফেসর পথে যুক্ত ছিলাম না তোমার কলেজে। আমি প্রিন্সিপালের সাথে শুধু চুক্তি করেছিলাম। দেশের সব স্কুল কলেজে আমি টাকা দেই। তোমাদের কলেজেও দেই। সেই জন্যে প্রিন্সিপালও সাফাতি হয় আমার সর্তে।

আর বড় কথা ইকনোমিকস ডিপার্টমেন্টে আমি অনেক কিছুই দিতে পাড়ি নিজ থেকে। কিছু টিপস তোমাদের দিলে তা ফিউচারে কাজে আসবে তোমাদের। সেই কারণে আমি জাস্ট কিছু দিনের জন্যে তোমাদের কলেজে গিয়েছিলাম। আর তোমাদের নিউ প্রোফেসর হিসেবে পরিচিত হলাম।”
সাফাতের কথা শুনে লিমা সাফাতের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।

সাফাত এতক্ষণ লিমার দিকে তাকিয়ে কথা গুলি বলছিল। এবার সে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে একটু দূরে গিয়ে বলে,

“এখন মনে মনে ভাবছো আমি কেন এমন টা করলাম। কেন ওই কলেজে পরিচয় গোপন করে গেলাম এই তো?”
লিমা কিছুই বলতে পারছে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। সাফাতের কথার উপর হুম না বলার শক্তি টাও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।
সাফাত নিজেই আবার বলা শুরু করে,

“আসলে আমি তোমাকে ঠিক আগেই দেখেছিলাম। হুম আমার মনে তুমি অনেক আগে জায়গা করে নিয়েছিলে। তোমাদের কলেজে গেলাম মাত্র ১ মাস হয়েছে। কিন্তু তুমি আমার মনে জায়গা করে নিয়েছিলে আরো ৩ মাস আগে। হ্যাঁ তিন মাস আগে আমি তোমায় প্রথম দেখেছিলাম একটা বাচ্চাদের স্কুলে।

তুমি তখন তাদের চকলেট দিচ্ছিলে। তাদের সাথে খেলছিলে নাচানাচি করছিলে। তখন তুমি নিজের মাঝে ছিলে না। তোমার মাঝে বাচ্চামি একটা স্বত্বা দেখা গিয়েছিল। আর সেটাই আমার মন টা কেড়ে নেয়। আমি তখন সেই রাস্তা দিয়েই ড্রাইভ করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এই রকম দৃশ্য দেখে আমার চোখ সেখানে আটকে যায়। তোমাকে মনের পিঞ্জরে আটকে নেই। চেয়ে ছিলাম তোমার সামনে যাবো কিন্তু সে দিন আর কি জন্যে যেন পাড়ি নি।”

সাফাত লিমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে,
“ইউ নো তোমার কারণে আমি খুব বড় একটা ডিল মিস করেছিলাম।”
লিমা তখন সাফাতের দিকে চোখ আরো বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। যেন এই তার চোখ বের হয়ে এলো।
সাফাত নিজের ব্যালকুনিতে চলে গেল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,

“সেদিন তোমাকে দেখতে দেখতে তোমার মাঝে হারিয়ে যেতে যেতে আমি এত ইমপটেন্ট একটা মিটিং মিস করাল। যার কারণে ডিল টা হলো না। অথচ এটা আমাদের জন্যে খুব দরকার ছিল। বিশ্বাস করো এত কষ্ট করলাম ডিল টার কারণে বাট সেটা হলো না তার জন্যে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট বা খারাপ লাগেনি। সে রাত টা তোমার ছবি চোখে নিয়েই কেটেছে আমার। মনে মনে তোমাকে মনের রানী করব ভেবে নিয়েছিলাম। তোমার ছবি তুলেছিলাম। যার জন্যে তোমাকে খুঁজতে আমার এক দিনও সময় লাগেনি। আমি আমার গ্যাং এর সব চেয়ে কাছে মানুষ টা কে ছবি টা পাটিয়ে দেই। তারা তোমার ডিটেল্স আমায় দেয়।”

সাফাতের প্রতিটা কথা লিমার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম করছিল। নিশ্বাস ফেলাও তার জন্যে দায় হয়ে উঠছিল। ক্রমশ দম আটকে আসছিল লিমার।

“তখন থেকে আমি তোমায় নজর বন্ধি করে রাখি। বলতে গেলে তুমি কখন কি করছো না করছো তার হিসাব রাখতাম। তার দুদিন পর আরেক টা ডিলের কারণে আমায় আমেইনুা চলে যেতে হয়। সেখানে প্রায় ২৫ দিনের মতো ছিলাম আমি। কিন্তু একটা সময়ও একটা মুহূর্ত ছিল না তুমি আমার চোখের আড়াল হয়েছো। ঠিক কি ভাবে ওই সময়ে আমি ডিল টা সামলেছি আমি জানি। এত বড়বড় কাছ করেও আমি কখনো নার্ভাস ফিল করিনি। কিন্তু তুমি মনে থাকায় অনেকটা নার্ভাস ছিলাম।

পরে তোমার কথা ভেবেই মনে শক্তি নিয়েছিলাম। ভেবেছি ডিল টা হয়ে গেলেই তোমার সামনে যাবো। তুমি আমার লাইফে হয়তো একটা আলো। তাই ডিল টা পেয়ে গেলাম। তোমার কারণে যেটা হারিয়ে ছিলাম। তার থেকেও বড় ছিল এই ডিল টা। ডিল হওয়ার পরের দিন আমি চলে এলাম। ততদিনে আমি জেনে গিয়েছিলাম সাফাত অন্তঃ প্রাণ তুমি। তাই আমি আমার পরিচয় লুকিয়ে তোমার কলেজে গেলাম। যেহেতু তুমি আমায় দেখো নি। ততদিনে আমি জেনে গিয়েছিলাম লোক মুখে আমার নাম শুনেই নাকি তুমি আমাতে প্রাণ হারিয়েছো”
সাফাত একটু নিশ্বাস নেয়। আবার বলে,

“হ্যাঁ ইনু মাফি কে আমিই মেরেছিলাম। আমার একটা গ্যাং আছে আর সেই গ্যাং এর গ্যাংস্টার আমি। আমার গ্যাং টা কোনো রকম খারাপ কাজ করে না। বরং অসহায় মানুষদের সাহায্য করে। তার জন্যে যত টাকা লাগে আমি প্রে করি। কারণ এত এত সম্পদ আমাদের বেবির কেন তার ছেলে মেয়েদেরও লাগবে না।”
সাফাতের এই কথা শুনে লিমা ভীষণ লজ্জা পায়। গাল লাল হয়ে উঠে।

সাফাত তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ টিপি দেয়।
লিমা লজ্জায় মাথা নিচু করে।
সাফাত বলে,

“এই কারণেই আমি আমার প্রাইভেসি বজায় রাখতাম। কখনো কোনো ক্যামেরার সামনে যেতাম না। মিডিয়ার সামনে যেতে আমার মুটেও ভালো লাগত না। আড়াল থেকে আমি আর আমার গ্যাং সবাই কে হ্যাল্প করি। আমাকে অনেক সময় অনেক বাজে লোকের সামনে যেতে হয়। অনেক লোকের সাথে মারামারি তেও যেতে হয়। আমাকে চেনা থাকলে অনেক প্রবলেম হতে পাড়ে তাই নিজেকে আড়ালে রাখি। তোমার কাছেও আড়াল রেখেছিলাম। কিন্তু তুমি সেই আমার পিছু নিয়ে চলেই এলে এখান অবধি। যে আমি সাফাত কে এত বড়বড় মানুষ হাতের নাগালে পায়নি। সেই আমি সাফাত নাকি একটা পিচ্চির সামনে।”

সাফাত লিমার দিকে ফিরে মুচকি হাসে।
লিমা তো লজ্জায় লাল হয়ে আছে। সাফাত এগিয়ে তার সামনে যায়।

“ময়লায় তো পুরো ড্রেস শেষ করে দিয়েছো। আলমারি তে আমার শার্ট আছে আর একটা টাউজার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। কাপড় গুলি আমাকে দিও আমি ওয়াশিং মেশিনে ওয়াশ করে দিব।”
“….
লিমা ঠিক কি বলবে না বলবে ভেয়ে পায় না। এমন লোকও দুনিয়ার বুকে আছে ভেবে লিমা খুব অবাক হয়। ঢুক গিলে। এই লোক কি না তাকে আগে থেকেই….
তার আকাঙ্ক্ষিত লোক টাই নাকি তাকে ভালোবাসে।

লিমা এই অবস্থায় সাফাতের সামনে থাকতে ইতস্তত বোধ করছে।
তাই না পেরে সে আলমারির কাছে যায়।
কি নিবে ভেবে পায় না।

সাফাত তার কাছে যায়। আলমারি থেকে সাদা একটা শার্ট বের করে দেয় সাথে একটা টাউজার।

লিমা সেই গুলি নিয়ে তাড়াতাড়ি করে ওয়াশরুমে চলে যায়। সাফাতের সামনে থাকলে বুঝি সে মরেই যাবে দম আটকে। যেমন অবাক হচ্ছে তেমনি লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় যেন লজ্জাবতী লিমার মরণ মুখে উপনীত হয়ে যাবে। এই বুঝি দমটা সাফাতের সামনেই বের হয়ে যাবে।

ঘর যেমন বিশাল ওয়াশরুমও তেমনি।

লিমা বিড়বিড় করে বলে,
“লোকটার ওয়াশরুমে এত জায়গা লাগে? এই জায়গায় কি করে যে এত বড় লাগে। এটা তো আমার শুয়ার রুমের মতো। হায় মাবুদ। আল্লাহ জানে এখানে উনি শুয়ে টুয়ে থাকে নাকি।”
লিমা ঠোঁট উল্টিয়ে তাড়াতাড়ি শাওয়াল নিয়ে নেয়।
তারপর সাফাতের দেওয়া জামা কাপড় পড়ে।

খুব অবাক হয় যেই মানুষটার জন্যে আল্লাহর কাছে এত দোয়া করল সে আজ নাকি তার জামা গায়ে জড়ালো? বিষয়টায় লিমা খুব অবাক হয়।
লিমার চুল এলোমেলো। টপটপ পানি পড়ছে।

সাফাত এতক্ষণে প্যান্ট আর কালো একটা শার্ট পড়ে নিয়েছে। হাতা গুলি বোল্ড করা। চুল গুলি উপর তুলে রেখেছে হাত দিয়ে। সেই লাগছে।
লিমা ওয়াশরুম থেকে এসে ব্যালকুনিতে যায়। সাফাত বিছানা ছেড়ে উঠে সেখানে যায়। সাফাতের সাদা ঢিলে শার্ট আর টাউজার তার উপর ভেজা চুলের টুপটুপ করা পানি তে লিমা কে বলার বাহিরে লাগছে।
হুট করে হাটু গেড়ে নিচে বসে পড়ে সাফাত।
“ইউ উইল মেরি মি মাই লিটল কুইন?”

লিমা হা করে আছে। চোখের পাতাও ফেলছে না। সেই মানুষটার সাথে বিয়ে না হলে ভেবেছে সে কোনো দিন বিয়েই করবে না। সেই মানুষটাই নাকি তাকে বিয়ের প্রোপোজাল দিচ্ছে।
লিমার চোখ দিয়ে টপটপ করে দুই ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
সাফাত উঠে বলে,

“দুনিয়াতে সাফাতের জন্যেই আল্লাহ হয়তো তোমায় পাঠিয়েছে। সেই আল্লাহ ছাড়া কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে নিতে পারবে না।”
লিমা অবাক হয়ে সাফাত কে দেখছে।

“ওয়েট করো কফি বানিয়ে আনি।”
এই বলে সাফাত চলে যায়। লিমা সেখানে দাঁড়িয়ে কান্না করে খুশির কান্না। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে কান্না করছে। আল্লাহ তার ইচ্ছে টা পূরণ করেছে। আল্লাহর কাছে চাইলেই পাওয়া যায় সব। লিমা মনে মনে ঠিক করে নেয় আর বেপর্দা চলা যাবে না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরতে হবে। আল্লাহর জন্যে বাকি জীবন টা পার করতে হবে।
ততক্ষণে সাফাত চলে এসেছে।

দুজন কফি খাচ্ছে নীরবে। কেউ কথা বলছে না। দুজনের মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব অবস্থান করছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে।
সাফাত বলে উঠে,
“মাই লিটল কুইন আর কিছু দিন পর না হয় আঙ্কেলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবো।”
এই কথা শুনে লিমা বিষম খায়। কাশতে থাকে। সাফাত তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছে,

“আর ইউ ওকে লিমা?”
“…
“পানি দেই?”

“না না ল লাগবে না।”
“শিওর?”
“হুম।”

দুজন আবার কফি খেতে থাকে।
“সাইদুল হয়তো খাবার নিয়ে চলে এসেছে। তুমি ওয়েট করো আমি আসছি।”

সাফাত কফির মগ গুলি নিয়ে চলে যায়।
একটু পর ট্রে তে করে খাবার নিয়ে আসে।

“এই গুলি খেয়ে নাও। আমি নিচে আছি। আর ওখানে তোমার ড্রেস রাখা আছে। রেডি হয়ে নাও বাসায় দিয়ে আসব গিয়ে।”
সাফাত আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায়।

সে থাকলে হয়তো লিমার অসুবিধা হবে তাই নিজেকে সামলে চলে গিয়েছে।
লিমা ভাবতে থাকে,
“লোকটা অবাকের শেষ সীমানায়। এত মানুষ দুনিয়ায় দিয়েছো আল্লাহ। তোমার সৃষ্টি কত অদ্ভুত। উনার জায়গায় হয়তো অন্য কেউ থাকলে একা একটা মেয়ে কে পেয়ে অনেক কিছুই করতে পারত। কিন্তু উনি? আল্লাহ তোমার কাছে অনেক শুকরিয়া।”

লিমা খাবার খেয়ে ড্রেস পড়ে নিচে যায়। সাফাত তখন ডাইনিং টেবিলে খাচ্ছিল।
“আর ইউ রেডি? ওকে ৫ মিনিট ওয়েট করো আসছি আমি।”
সাফাত হাত ধুয়ে উপর থেকে চাবি টা নিয়ে এলো। তারপর দুজন বেরিয়ে গেল।
লিমা সিলবেল না লাগিয়ে বসে আছে।
“আমাকে মারতে চাইছো নাকি অকালে?

সাফাতের কথায় লিমা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়।
সাফাত বলল,

“সিটবেল টা না লাগালে যেকোনো সময় অঘটন হতে পাড়ে। আর তোমার সামান্যা কিছু হয়ে গেলেও এই সাফাত বাঁচবে না।”
সাফাত নিজেই একটু এগিয়ে লিমার সিটবেল টেনে আনে। লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
লিমা জানালার বাহিরে মুখ নিয়ে ভাবতে থাকে,

“আল্লাহ লোক টা কে এত টা ভালো কেন বানিয়ে দিয়েছো তুমি? লোক টা এত টা আকর্ষণীয় কেন?”
লিমা সাফাতের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমাকে শপিং মলের সামনে নামিয়ে দিবেন।”

সাফাত ড্রাইভ করতে করতে লিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কেন? কিছু কিনবে?”
“হুম দরকার আছে।”

“ওকে আমিই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।”
“না না লাগবে আমি…”
“সুহহ। একদম চুপ। সাফাত চৌধুরীর হবু বউয়ের প্রোটেকশনের একটা ব্যাপার আছে না?”

সাফাত লিমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে মুচকি হাসে। লিমা লজ্জায় মাথা নিচু করে নেয়। তারপর মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকায়।
সাফাত মলের সামনে গাড়ি থামায়।
লিমা নেমে যায়।
“তুমি এখানেই দাঁড়াও আমি গাড়ি টা পার্ক করেই আসছি।”

“হুম।”
সাফাত গাড়িটা পার্ক করে এসে দেখে লিমা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

সাফাত গিয়ে বলে,
“চলো।”
“….
“কি হলো?”
“আমি ফোচকা খাবো।”
“হোয়াট?”

“হুম।”
“ওমন নোংরা খাবার খেতে হবে না। দেখা যাবে পেটের অসুখের কারণে বিছানা থেকেই উঠতে পারবে না।”
“না এমন কিছুই হবে না। আমি অনেক খাই “
“আর খেতে হবে না। চলো।”
“আপনি যান আমি খেয়ে আসছি।”
“কি?”

“হুম। আমি ফোচকা খাবো।”
“তার মানে তুমি খাবেই?”
“হুম। আপনিও চলুন না। অনেক মজার।”
“ওকে যাও।”
সাফাত লিমা দুজনে সেখানে যায়। লিমা এক প্লেট ফোচকা হাতে নেয়। সাফাত কে বললেও সে এসব খাবে না। তাই লিমাই খাওয়া শুরু করে।
“আপনিও নিন না একটা।”

“না আমি তোমার মতো পঁচা খাবার খাই না। তুমিই খাও।”
“উমম মুটেও তা নয়। আপনি খান দেখবেন আপনারও ভালো লাগবে।”
লিমার জোসাফাতোরি তে সাফাত একটা মুখে দেয়। সে কি ঝাল। সে একদম ঝাল খেতে পাড়ে না। ঝালে চোখ লাল হয়ে আছে। হুহা করছে ঝালের কারণে।
সাফাত কে দেখে লিমার ভয় হয়। না জানি কোন বকা দেয় এখন।

দোকানদার পানি দিলে সাফাত সে পানি খায় না। তাড়াতাড়ি গাড়ির কাছে যায় সেখান থেকে এক বোতল পানির অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে। তবুও ঝাল কমছে না।
পানি খেতে খেতে সাফাত লিমার দিকে তাকায়। মেয়ে টা কি মনের আনন্দে এক প্লেট শেষ করে আরেক প্লেট নিল। ঝালে শিশি করছে তবুও মন খুলে খেয়েই চলছে। সাফাত ঝালের কথা ভুলে লিমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইচ্ছে করছে এই ঝাল কাটাতে লিমার ওই প্রসারিত ঠোঁট কে আঁকড়ে নিতে। কিন্তু তা অসম্ভব এখন। সাফাত মুচকি হেসে সেখানে যায়।
সাফাত ১০০০ টাকার একটা নোট নিয়ে দোকানদার কে দিলে সে তা নিতে নাসাফাত হয়।
সাফাত তার কাঁধে হাত রেখে বলে,

“ভাই এই ফোচকা যে কত মেয়ের পছন্দের তা তুমি জানো। কত মানুষকে তুমি এটার দ্বারা খুশি করো বলো তো। সেটা তুমি নিজেও জানো না। বিশ্বাস করো আমি মন থেকে খুশি হয়ে এটা দিলাম তোমায়। কারণ তুমি আমার কুইন কে খুশি করেছো। রাখো।”
দোকানদার খুশি মনে টাকা টা নেয়।
আর লিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সাফাতের দিকে।


পর্ব ০৭

তারপর দুজন মিলে মলের ভেতরে গেল। লিমা বোরকার দোকানে গেল।
এত দেখেও কালো সুন্দর বোরকা পাচ্ছে না।
“লিমা তুমি পর্দা করবে? এখন থেকে সত্যিই তুমি বোরকা পড়ে নিজেকে ঢেকে রাখবে?”
লিমা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে।

সাফাত খুব খুশি হয়। তারপর হাত ধরে বলে,
“কাম ডেয়ার।”
সাফাত লিমা কে নিয়ে উপরে উঠে। সে যেতেই দোকানের লোক সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে।
সাফাতের যা লাগে এই দোকান থেকেই নেয়। বাকি কাস্টমারদের একটু পরে আসতে বলে দোকানদার।
“আসসালামু আলাইকুম স্যার।”
“ওয়ালাইকুম আসসলাম।”

“স্যার কি লাগবে বলুন।”
সাফাত কিছু না বলে দেখছিল আশপাশ তাকিয়ে।
সাফাতের এমন কান্ডে লিমা অবাক হয়।
দোকানদার বলে উঠে,
“স্যার ম্যডাম নাকি?”

সাফাত মুচকি হেসে জবাব দেয়।
“ইনশাল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।”
“স্যার কার জন্যে লাগবে? আপনার নাকি ম্যামের?”
“ম্যামের জন্যে খুব ভালো বোরকা বের করো।”

“ওকে স্যার।”
দোকানদার ভালোভালো সব বোরকা লিমার সামনে রাখে। লিমা বোরকা দেখছে।
সাফাত তিন টা কালো বোরকা হাতে নিল। তারপর একটা নেয় অনেক রঙএর মিশ্রণের। আর একটা সাদার মাঝে ছোট ছোট হাল্কা সবুজ রঙ এর ফুল সাথে লতা পাতা আর মেরুনের মিশ্রণের বোরকা নিল।
দোকানদারের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এইগুলি প্যাক করে দিন।”
লিমা এত বোরকা দেখে অবাক হয়ে সাফাত কে বলে,
“এত বোরকা? আমি এত বোরকা নিব…”
সাফাত গরম চোখে লিমার দিকে তাকায়। তারপর লিমা ঠোঁট উল্টিয়ে আর কিছু বলে না।
সাফাত অনেক গুলি স্কার্ফ আর হিজাব, খিমার প্যাক করতে বলে।
তারপর লিমার দিকে এগিয়ে আস্তে আস্তে বলে,
“যখন সেটা পড়তে ইচ্ছে করবে সেটাই পড়বে।”
“কত এলো।”

“তা জেনে তুমি কি করবে?”
“ও মা না হলে দোকানদার আমায় বেঁধে রাখবে।”
“ননসেন্স কোথাকার।”
“কেন কি করলাম?”

“আমি প্রে করে দিব।”
“কেন বোরকা কি আপনি পড়বে যে আপনি প্রে করতে যাবেন।”
সাফাত রাগে দাঁত কটমট করে চোখ লাল করে লিমার দিকে ঝুঁকে। আঙ্গুল নিজের ঠোঁটের উপর রেখে লিমা কে চুপ থাকতে বলে।
লিমা ভয়ে একটু পিছিয়ে যায়। ঠোঁট উল্টিয়ে ঘনঘন চোখের পাতা ফেলে চুপ থাকে।

সাফাত কার্ডে প্রে করে সানগ্লাস পড়ে নেয়।
ইসস মানুষটা কে সানগ্লাসে এত যে সুন্দর লাগে। তাও আবার আজ কালো শার্ট পড়েছে। চুল গুলিতে জেল দেওয়া। কালো চাঁপ দাঁড়ি গুলি মুখের সৌন্দর্য টা দিগুন করে দিয়েছে। এর উপর কালো সানগ্লাস টা যেন বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
তারপর লিমা কে নিয়ে বের হয় দোকান থেকে।

মলের নিচে নামলে সাফাতের নজর যায় এক জায়গায় অনেক লোকের সমাগম। চেঁচামেচির শব্দও শুনা যাচ্ছে।
সাফাত এড়িয়ে লিমা কে চলে যেতে চাইলে লিমা থেমে যায়।
“কি হলো? চলো।”
“ওখানে কি হয়েছে?”
“জানি না। চলো।”

“যদি কারো কোনো প্রবলেম হয়।”
কথাটা শুনে সাফাত আর নিজেকে সামলাতে পাড়ে নি। লিমার প্রোটেকশনের কথা ভুলে সেখানে গেল শপিং গুলি লিমার হাতে দিয়ে।
এক ছেলে ড্রাংক অবস্থায় এক মেয়ের হাত ধরে বাজে ব্যবহার করছিল।

ছেলের মুখ দেখে সাফাতের বুঝা বাকি নেই এটা সেই নেতার ছেলে। বকে যাওয়া ছেলে। নেতার ভয়ে কেউ কিছু বলেনি। সাফাত আরো একবার তার কু কীর্তির কথা শুনেছে। তার গ্যাং এর ছেলে ছবিও দেখিয়েছে। সাফাত থমে ছিল। আজ এমন একটা দৃশ্য দেখে রাগে রক্ত মাথায় উঠে তার। রক্ত রাগে টগবগ করছে। সবাই তাকিয়ে দেখছে। মেয়ে টার ওড়না নিয়ে টানাটানি করছে।
লিমা ভিড় ঠেলে সেখানে যায়। পিছনে লিমাও যায়।
সাফাত সরাসরি গিয়ে সেই ছেলের হাত ধরে।
ছেলেটা তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আর নেশার কন্ঠে বলে,

“হো আর ইউ ম্যান।”
“তোর জম।”
“হোয়াট?”
“মেয়ে টা কে ছাড়।”
“আরে কে রে তুই?”
“বললামই তো তোর জম।”

সাফাত তাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ছেলে কে মারতে থাকে। মেয়ে টা তাড়াতাড়ি দূরে চলে যায়। সাফাত তাকে মারছে তো মারছেই। সবাই হা করে দেখছে।
লিমা তো চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে দেখছে আর ঢুক গিলছে। মানুষটা এত টা রাগি?

সাফাত মারতে মারতে ছেলের অবস্থা বেহাল করে তুলে। শেষে দুপায়ের মধ্যবর্তী তে ছেলেটার নিম্নাঙ্গে লাথি দেয় বেশ জোরে। ছেলে ছিটকে নিচে বসে গোঙাতে থাকে।
তারপর পুলিশ কে কল দেয়। পুলিশ এসে একে দেখে ভয়ে ভয়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। সাফাত নিজের পরিচয় পুলিশ কে দিলে তারা নির্দ্বিধায় ছেলে টা কে গ্রেফতার করে।
সাফাতের সাথে হাত মিলিয়ে দারোগা বলে,

“ধন্যবাদ স্যার। আমরা চাকরিতে থাকলেও কিছু মানুষের কারণে নীরব থাকতে হয়। নিজেকে নিয়ে ভয় না পেলেও বউ বাচ্চার কথা তো বাদ দিতে পাড়ি না। আপনার জন্যে খুব সাহস পাচ্ছি।”
“উপর থেকে কল আসলে আমার কথা বলবেন। বেশি সমস্যা হলে না হয় আমাকে জানাবে আমি দেখে নিব।”
“ওকে স্যার।”
“আরেকটু ডলা দিবেন ওকে যেন আর এমন না করে।”
সাফাত ছেলে টার গালে শক্তে এক চর দেয়। লিমা ভয়ে কেঁপে উঠে। ভেতর তার শুকিয়ে আসছে।

পুলিশ ছেলে টা কে নিয়ে যায়।
লোক গুলির মাঝ থেকে একজন বলে উঠে উনি বিজনেসম্যান সাফাত চৌধুরী। এই কথা শুনা মাত্র সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মেয়েরা তার গায়ে এসে পড়ছে একটা ছবি তুলার জন্যে। বিষয় টা সাফাতের বিরক্ত লাগল। বিষয়টায় সাফাত বুঝতে পারছে না।

লিমার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো লিমার মুখটা কাচুমাচু হয়ে আছে।
সে বেশ বুঝতে পারছে লিমার এই গুলি একদম ভালো লাগছে না। সাফাত জোরে এক ধমক দেয়। তাতেই সবাই দূরে চলে যায় তার থেকে।
লিমাও এক পা পিছিয়ে পড়ে।
সাফাত লিমার হাত ধরে টেনে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়।
গাড়ি তে উঠে লিমা আরো ভয় পাচ্ছে। সাফাতের রাগি রাগি মুখ আর এলোপাথাড়ি মারের কথা মনে হচ্ছে আর সে ভয়ে কেঁপে উঠছে। শুকনো ঢুক গিলছে।
সিটবেল না লাগিয়ে ভয়ে গুটিয়ে বসে আছে সে।

সাফাত বিষয় টা বুঝতে পারছে যে লিমা তাকে ভয় পাচ্ছে। সে একটু এগিয়ে গেলে লিমা নিজের মাথা পিছনে এলিয়ে দেয় চোখ বন্ধ করে। সাফাত কিছু না বলে মনে মনে হেসে সিটবেলটা লাগিয়ে দেয় লিমার। তারপর পানির বোতল তার দিকে এগিয়ে দেয়।

“খাও।”
“এ্যা?”
“পানি খেতে বললাম।”
লিমা তাড়াতাড়ি পানির বোতল মুখে তুলে নেয়। গরগর করে অনেক টা পানি খেয়ে নেয়।

লিমার এই অবস্থা দেখে সাফাত আর সামলে থাকতে পাড়ে না। একটু শক্তে হেসেই দেয়। তবে শব্দ করে নয়। এই হাসি কে অনেক টা মুচকি হাসি হিসেবেও ধরা যায়।
“প্রেয়সী বুঝি আমায় ভয় পাচ্ছে?”
“আ আমি বাসায় যাবো।”

“আমি ভালোর খুবই ভালো। আর শক্তের জম। তাই কথা মেনে চললে আমার অন্য রূপ দেখতে পাবে না। কিন্তু কথা না শুনলে…”
“আম্মু।”
“হোয়াট?”

“আ আম্মু আমার জন্যে চি চিন্তা করছে।”
“ননসেন্স মেয়ে।”
লিমা আর একটা কথাও বলে না পুরো রাস্তায়। চুপ করে ছিল। সাফাতও তার ভয় ভাঙ্গাতে চায়নি। ভয় কি সহজ ভাবে ভাঙ্গানো যায়? ভয় এই ভাবে ভাঙ্গা যায় না।
“ভয় ভাঙ্গাতে হলে যে গভীর মুহূর্ত তৈরি করতে হয়।”
। ।

বাসায় গিয়ে লিমা যেন ভাবতেই পারছে না তার সাথে কি না হয়ে গেল। এটা সত্যিই ছিল? নিজেকেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তার।
হঠাৎ তার ফোনের ম্যাসেজ টোন বেজে উঠে।
“প্রেয়সী বুঝি আমার কথা ভাবছে?”
ম্যাসেজ টা পড়ে লিমা মুচকি হেসে দেয়। সাফাতের নাম্বার টা নতুন নাম দিয়ে সেভ করে “ড্রিমবয়”। ফেন টা রেখে দেয়। ম্যাসেজের রিপ্লে আর দেয় না।
ওযু করে এসে নামাজ পড়ে শুয়ে পড়ে।
অন্য দিনের মতো আজ আর ঘুমের মাঝে সাফাত কে নিয়ে স্বপ্ন দেখে না। আজ বাস্তবে একটু আগে সাফাতের দৃশ্য গুলি চোখে ভাসছে। কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে সে নিজেও তা হয়তো জানে না।
ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে মায়ের কাছে যায়। মায়ের সাথে গলাগলি করে কিছুক্ষণ বসে থাকে।

ঘর থেকে ফোনের আওয়াজ ভেসে আসলে তাড়াতাড়ি চলে যায়।
তার “ড্রিমবয়” কল দিয়েছে।
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসলাম। কি করছিলে?”
“আম্মুর সাথে ছিলাম।”

“ওও”
“নামাজ পড়েছেন?”
কথাটা লিমা বলেই নিজে লজ্জা পায়। কি ভাবে অনায়াসে কথা বলছে সে। চুপ করে থাকে।
ওপাশ থেকে সাফাত মুচকি হেসে জবাব দেয়।
“পড়ব।”
“…
“কথা কি উড়ে গিয়েছে?”
“…
“কাল কলেজে যাওয়ার সময় কল দিও। ইনফেক্ট আমিই থাকব ওখানে।”

“ক্লাস করাবেন?”
“না আর কলেজে ক্লাস করাব না। কাল তোমায় কিছু শীট দিয়ে দিব সে গুলি কমপ্লিট করবে।”
“ঠিক আছে।”
“মন দিয়ে পড়বে। আমার মতো হতে হবে। পরে আমাকে হ্যাল্প করবে।”
“….
লিমা চোখ গুলি বড় করে ঢুক গিলে শব্দ করে,
“এই ভীতুর ডিম। এত ঢুক গিললে চলবে?”

সাফাতের কথায় লিমার বিষম খাওয়ার উপক্রম। চোখ গুলি ডিমের মতো বড় বড় করে চেয়ে আছে।
“ওই ওই মুখে মশা ঢুকবে।”
সাফাত এই কথা বলে ওপাশ থেকে জোরে হেসে দেয়। লিমা মুখ বন্ধ করে চোখের পাতা ফেলে।

“আমার কাজ আছে। রাতে কথা হবে। পড়তে বসো। বাই।”
সাফাত ফোন কেটে দিলে লিমা ভাবতে থাকে,

“লোকটা এত টা বুদ্ধিমান কি ভাবে? আন্দাজেও ডিল ছুড়লে লেগে যায়। আসলে কি লোক টা মন পড়তে জানে? আল্লাহ জানে এমন শক্তি উনাকে দিয়েছে কি না।”
এমন করে দিন যাচ্ছে। ফোনে কথা বলা, পড়ার টিপস দেওয়া, শীট দেওয়া, উপদেশ সব মিলিয়ে সাফাত লিমা কে ব্যস্ত আর নজরে রাখে।
সেদিন রাতে সাফাত কল করে বলছিল,
“যে গুলি পড়তে বলেছিলাম সেগুলি শেষ হয়েছে তো?”

“আচ্ছা আমাকে কি আপনার রোবট মনে হয়? এত এত পড়া উপদেশ দেন কি করে? একটুও কি ভাবেন না যে আমার মতো এত ছোট একটা মেয়ে কি করে সব গুলি মেনটেন্ট করবে? এত গুলি যে দেন আপনিও কি একটু বোর হন না?”
“হোয়াট দ্যা। কি বলছো তুমি?”

সাফাতের ধমক সুরে কড়া কথা শুনে লিমা ভয় পায়। সত্যিই তো কি কথা বলে ফেলেছে। জিহ্বায় কামোর দিয়ে রাখে লিমা। না জানি কি শুনতে হয় তার।
ওদিকে সাফাতের একটু রাগই হলো বৈকি। বেচারা মুখের উপর কথা একদম বরখাস্ত করতে পারে না।

“এএ আ আসলে আমি না বাদ দিন। কি কি করছেন?”
“আসতে হবে?”
“কি?”
“তোমার বাসায় আসতে হবে?”
লিমা ভয়ে বলতে থাকে,
“কে কেন?”
“মুখের উপর কথা বলার শাস্তি দিতে।”

“….
“কি হলো?”
“আ আসলে আমি বলি না। কিভাবে যে বলে ফেললাম বুঝতে পারছি না।”

“ও তুমি বলো নি? তো কে বলল?”
“আ আসলে সত্যিই আমি বলি নি। বলেছে তো আমার ঠোঁট আর জিহ্বা। এখানে আমার দোষ কি বলুন?”
লিমার এমন ভীতু সুরে কথায় সাফাত জুরে হেসে দেয়। লিমার ভয় টা একটু কমে।
একটা মাস এমন করেই চলে গেল।
সেদিন সাফাত জানাল।

“শুনছেন আপনি?”
“হুম বলুন।”
“আমি চলে যাচ্ছি।”
সাফাতের কথায় লিমা খুব ভয় পায়।

“যাচ্ছেন মানে? কোথায় যাচ্ছেন? আপনি চলে গেলে আমার কি হবে?”
“….
লিমা নিজের কথায় খুব লজ্জা পায়। আমতাআমতা করে বলে,
“ন না আসলে আ আপনি কোথায় যাবেন আমি আসলে সেটাই জি জিজ্ঞাস করছিলাম।”
“ও তাই?”

“হুম তা তা নয় তো কি?”
“আমি তো ভাবলাম…”
“আ আপনি কি ভাবলেন?”
“আমি লন্ডন যাচ্ছি।”
“…
“কয়েক দিন পরই চলে আসব।”
“…..
“আমি জানি প্রেয়সী আমার মাঝে ডুবে থাকে। ইনশাল্লাহ এটা হয়তো আর বেশি সময়ের জন্যে হবে না।”
“….
“চিন্তা করো না ৪/৫ দিনের একটা মিটিং আছে। না গেলেই নয়। তাই তো..”
“কবে যাবেন?”
“কাল।”
“কখন?”
“দুপুরের ফ্লাইটে।”
“ও”

“হুম।”
“কল দিলে নিচে নামবে একবার দেখে যাবো।”
“….
“মন খারাপ বুঝি?”
“সাবধানে যাবেন।”
লিমা আর কিছু না বলে ফোন কেটে দেয়। খুব খারাপ লাগছে তার। তাই আর কথা বলতে চায়নি। গলাও ধরে আসছিল কষ্টের ঘোরে।
ওদিকে সাফাত মুচকি হেসে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বলে দিল, “পাগলি একটা।”

পরের দিন সাফাত লিমা কে কল দিল। লিমা ওড়না গায়ে জড়িয়ে নিয়ে উপরের ব্যালকুনিতে গেল। সাফাত একবার দেখে নিল তার প্রেয়সী কে। তারপর একটু হেসে গাড়ি নিয়ে চলে গেল।
লিমার চোখের কোণায় এক ফোটা পানি চলে হলো।
ফোনের ম্যাসেজ টোন বাজলে লিমা ব্যালকুনি ছেড়ে রুমে যায়। হ্যাঁ সাফাত ম্যাসেজ দিয়েছে।

“পাগলি কান্না করার কিছু নেই। চোখের পানি টা মুছে নিও। সাবধানে থেকো আমি হয়তো এই কদিন বিজি থাকব। একদম বেখেয়ালি হবে না। নিজের খেয়াল রাখবে আর সময় মতো পড়বে। কাঁদে না পাগলি আমার। পিচ্চির জন্যে চকলেট নিয়ে আসব।”
সাফাতের ম্যাসেজ পড়ে লিমা এক গাল হেসে দেয়। লোকটা পারেও বটে। আস্তো একটা পাগল।

পরপর ৪ দিন কেটে যায়। সত্যিই সাফাত একবারও লিমার সাথে যোগাযোগ করেনি। একটা বার কল দেয় নি।
তবে গিয়ে একটা ম্যাসেজ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল, সে সাবধানে গিয়েছে। সে যেভাবে বলেছে লিমা যেন সে ভাবেই চলে, সাবধানে যেন থাকে।
লিমা দুপুরে খেয়ে শুয়ে ছিল। কিন্তু তার ঘুম আসছিল না।
তখন ঘড়িতে ৩ টা বেজে ১৫ মিনিট। সে ফোন হাতে নিয়ে ব্যালকুনিতে যায়। যদি সাফাত ফোন করে। সে বলেছিল ৩/৪ দিন লাগবে। আজ ৪ দিন হলো এলোই না। একটা বার কথাও বলল না। লিমার খুব অভিমান হলে। পাহাড় সমান অভিমান।
মন খারাপ করে ব্যালকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে।

তার একটু পর ফোন বেজে উঠে। লিমা স্কিনের দিকে নজর দিলেই দেখে সাফাত কল দিয়েছে,
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসলাম। প্রেয়সী বুঝি খুব রেগে আছে?”

“….
“আমার প্রেয়সী কে বলে দিও তো তার স্বপ্নের মানুষটা স্বপ্ন পূরণ করতে খুব ব্যস্ত ছিল। মিটিং এর জন্যে এক দন্ড দম নিতে পাড়ি নি।”
“….
“কি হলে বলো আমার প্রেয়সী কে জানাবে তো?”
“….
“সরি প্লিজ সরি। বিশ্বাস করো খুব ব্যস্ত ছিলাম।”

“সেটা আমাকে বলছেন কেন?”
“এটা বুঝি অভিমান?”
“আমি আপনার উপর অভিমান করব কেন?”
“কারণ আমি যে তোমার মনে অবস্থান করি।”

“এত যখন বুঝেন একটু খোঁজখবর নিলে আপনার কোন ডিল টা মামার বাড়ির আদর খেতে চলে যেত?”
কথা গুলি লিমা নিজের মনে মনেই বলে।
“প্লিজ সরি। এই কান ধরছি।”
“…

“প্রেয়সীর জন্যে এতগুলি চকলেট নিয়েছি।”
“….
“তবুও মন ভরেনি?”
“….

“কাল আসছি।”
কথাটা শুনে লিমা খুশি হয় মনে মনে। কিন্তু তা বাহিরে প্রকাশও করে না। সাফাতকেও বুঝতে দেয় না। চুপ থাকে।
“কাল দেখা হচ্ছে কিন্তু।”
“লাগবে না।”
“ওকে অভিমান না হয় সামনাসামনি ভাঙ্গব।”
“….
“ওই।”
“কখন আসবেন?”
“সকালে।”
“সাবধানে আসবেন।”

“ও…”
সাফাতের কথা শেষ করার আগেই লিমা ফোন কেটে দেয়। সাফাতের রাগ হয়।
লিমা ঘরে চলে যায়। ওয়াশরুম থেকে এসে দেখে আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে।
ফোন তুললেই ওপাশ থেকে একটা সুরেলা কন্ঠ শুনা যায়।
“আসসালামু আলাইকুম। হ্যালো কে বলছেন?”

“আমার সাথে একটু দেখা করতে হবে তোমায়।”
“কে বলছেন আপনি?”
“সেটা পরেই বুঝতে পাড়বে। আমি তোমার বাসার সামনের ক্যাফে তে বসে আছি। চলে এসো। আর যদি না আসো জীবনে ঠকে যাবে।”
এই টুক বলেই অজ্ঞাত ফোন কেটে দেয়।

লিমা বুঝতে পাড়ে না কি করবে। তার যাওয়া ঠিক কি না। উনি বা কে? কিসের ঠকার কথার বলল? বেশি দূর নয় তাই লিমাও কৌতূহলের জন্যে বোরকা পড়েই নিল।
পরের দিন সকালে সাফাত বাংলাদেশে নেমেই আগে লিমার বাসার সামনে যায়।
লিমা কে বার কয়েক ফোন দেয়। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করছে না। সাফাত খুব অবাক হয়। লিমা তার কল ধরছে না? এটাও সম্ভব? যে মেয়ের মনে সর্বক্ষণ সে থাকে সেই মেয়ে কি না তার কল পিক করছে না। ভেবেই সাফাতের অবাকের সাথে রাগ হয়।
১০ টার উপরে কল দিয়েও কল রিসিভ হয় না।

সাফাত একটা ম্যাসেজ পাঠায়।
“লিমা রাগ না উঠিয়ে নিচে নামো। হাড়িআপ।”
লিমা ম্যাসেজ সিন করেও কিছু বলে না চুপ করে বইয়ে মুখ দেয়।
সাফাত আরো কয়েকবার কল দেয় লিমার কোনো সাড়াশব্দ নেই।

“২ মিনিটের মাঝে নিচে না নামলে আমি কিন্তু তোমার নাম ধরে চিৎকার করব।”
লিমা বেশ বুঝতে পাড়ছে। এই লোক কে দিয়ে সব সম্ভব। তাই লিমা না পেরেই নিচে নামল।
সাফাত দাঁত কিড়িমিড়ি করে বলে,
“কোথায় ছিলে তুমি? আমার কল কেন ধরছিলে না?”

লিমা শান্ত গলায় বলল,
“কিছু বলবেন?”
“হোয়াট ডো ইউ মিন?”

“আমি জিজ্ঞাস করেছি আপনি কিছু বলবেন আমায়?”
“তোমায় আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি না?”

“বলুন।”
“কোথায় ছিলে?”
“আমার ঘরে।”
“কল কেন ধরছিলে না?”
“এটা আমার ইচ্ছে।”

“ইচ্ছে মাই ফুট।”
“…
“এনিওয়ে এই গুলি নাও।”
“কোনো দরকার নেই।”

“মানে?”
“মানে আমি এই গুলি নিব না।”
“কেন?”
“একজন অপরিচিত লোকের কাছ থেকে আমি কিছু নিব না। নিতে চাইও না।”
“দেখো লিমা আমার রাগ উঠিও না।”
“তো আপনায় কে রাগতে বলল? প্লিজ গো।”
সাফাত দাঁত কটমট করে গাড়িতে সজোরে একটা কিল দেয়। লিমা ভয়ে কেঁপে উঠে।

লিমার দিকে ঝুঁকে কিছু বলতে গিয়েও বলে না। চুপ করে চলে যায় গাড়ি নিয়ে।
সাফাত বাথটাবে বসে আছে। শাওয়ার থেকে পানি পরছে তার সারা গায়ে। লিমার কথার ধরন আর তার ব্যবহার নিয়ে সে চিন্তিত। কি হলো? এক রাতে এক টা মানুষের এতটা পরিবর্তন কেন?
সাফাত কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না। না হদিশ মিলছে না এই কথার উত্তর গুলি।

দীর্ঘ একটা শাওয়ার নিয়ে সাফাত ওয়াশরুম থেকে বের হলো। মাথা টাও বেশ ঠান্ডা আছে। লিমার কাছ থেকে জানতে হবে কি হয়েছে।
তাই লিমা কে কল দেয় সে।
লিমা কল না ধরে কেটে দেয়।

সাফাত ম্যাসেজ পাঠায়, “প্লিজ পিকআপ দ্যা ফোন।”
লিমা কল ধরে না। এই মানুষটার কল ধরে কি হবে তার?


পর্ব ০৮

সাফাত ঠান্ডা মাথায় ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলেও এখন মাথায় আস্তেআস্তে রাগ উঠে যাচ্ছে।
কল দিচ্ছে তো দিচ্ছেই। লিমার কল ধরার কোনো নাম নেই। সাফাতের রাগ হচ্ছে অনেক। প্রায় ২০ বার কল দেওয়ার পর লিমা কল ধরে।
সাফাত মাথা ঠান্ডা রেখে বলল,
“কি হয়েছে তোমার?”

“আপনার কি হয়েছে সেটা বলুন। গাধার মতো কল কেন দিচ্ছেন?”
“কি?”
“এত বার কল কেন দিচ্ছেন?”
“আচ্ছা বলবে আমায় কি হয়েছে তোমার?”
“ধ্যাত যত্তসব ন্যাকা ন্যাকা কথা যেন কিছুই জানে না। আজাইরা লাড্ডু কোথাকার।”
লিমা রাগে ফোন কেটে দেয়। সাফাতেরও রাগ হচ্ছে। ফোন টা আছাড় দিয়ে বিছানায় ফেলে দেয়।

তারপর এত না ভেবে লম্বা একটা ঘুম দেয়।
রাতেও অনেক বার কল দেয় লিমা কল ধরে না। শেষে ফোন বন্ধ করে রাখে। এবার সাফাতের ভীষণ রাগ হয়। কিছু বলছেও না কেন এমন করছে।
পর দিন সকালে সাফাত ফ্রেশ হয়ে কলেজের সামনে যায়।
কিন্তু কলেজের সময় পের হয়ে গেছে তবুও লিমা আসছে না। হয়তো আসবে না ভেবে সাফাত গাড়ি নিয়ে অফিস চলে গেল।

লিমার কিছু ভালো লাগছে না। তাই আজ কলেজেও যায়নি। সে ভেবেয় পায় না সত্যিই মানুষ টা এমন? তবে এত দিন যে সে এই মানুষটার কারণেই অবাক হয়েছে সে কি না….
লিমা কান্না করে দেয় কথা গুলি ভেবে।
সেদিন আর কথা হয় না তাদের। সাফাত রাগে ফেটে যাচ্ছে। কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছে না।
রাতে সাফাত একা সুইমিংপুলে বসে ভাবছিল। এমন সময় তার কল আসে। তার গ্যাং এর এক জন কল দিয়েছে।
“হ্যালো।”

“বস।”
“খবার পেলি কিছু?”
“বস আপনি আসার আগের দিন ম্যাম তাদের বাসার সামনে ক্যাফে তে একজনের সাথে দেখা করেছে। আর আপনি না থাকা কালীন তিনি ঘর থেকে এক বারও বের হয়নি।”
“কে ছিল? কার সাথে দেখা করেছে?”
“বস জানতে পারলাম একজন মহিলা।”
“যত তাড়াতাড়ি পারিস মেয়ে টাকে বের করার চেষ্টা কর।”

“ওকে বস।”
“মনে রাখিস খুব তাড়াতাড়ি।”
“ঠিক আছে কিন্তু বস…”

“কি হয়েছে?”
“বস শাহিন জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে কিছুদিন হলো।”
“হোয়াট?”
“হুম। বস আপনি ব্যস্ত ছিলেন তাই বলা হয়নি। খুব রকম হাঙ্গামা করছে সে।”

“ওকে দেখছি রাখ। সবাই কে সাবধানে থাকতে বলিস।”
“ওকে বস।”
সাফাত ফোন কেটে দিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে যায়। তবে কি শাহিন ই কোনো ভাবে….
সাফাত নিজের মনে মনে অনেক কিছু ভেবে নেয়। আর সময় দেওয়া চলবে না। এর পর হয়তো খুব দেরি হয়ে যাবো। তাই আর অপেক্ষা করে সময় নষ্ট না করাই ভালো।
সাফাত মুখে এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি নিয়ে বলতে থাকে,
“মাই লিটল এঞ্জেল আসছি আমি খুব বেশি দেরি নয়। অপেক্ষা করো।”

সকালে সাফাত ফুরফুরে মেজাজে ঘুম থেকে উঠে।
শাওয়ার নেয়। প্রিন্সের মতো আজ নিজেকে সাজায়। মুখে সেই এক গালে হাসি।

লিমা ঘুম থেকে উঠে ছাদের এক কোণায় মন মরা হয়ে বসে আছে। যাকে পছন্দ করল। মনে মনে কত কিছু ঠিক করে নিল। আকাঙ্ক্ষিত মানুষ টার দেখাও পেলো। অবশেষে সেই মানুষ টা কি না…..
তবে এত দিন কি তার সাথে নাটক করল? সব তার অভিনয় ছিল? কিন্তু কি করে সম্ভব? মানুষ কি এত টাও নিখুঁত অভিনয় বাস্তবে করতে সক্ষম হয়? কেন জানি লিমার এই কথা গুলি মনে আসলেও মানতে তার খুব বাঁধা লাগে। কষ্টও হয়।

বার বার সেদিনের মেয়ে টার কথা মনে হয়। মনে হতেই সাফাতের প্রতি রাগ আর বিতৃষ্ণা চলে আসে। আবার কি ভেবে চাইলেও সাফাতের প্রতি ঘৃণা আনতে পাড়ে না। সব মিলিয়ে নাজেহাল অবস্থা তার।
যতোই হোক এত দিন তার মনের মাঝে যে ছিল তাকে কি করে…
বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে।
সেই যে লিমা ১০ টা ২০ এ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ছাদে এলো। এখনো সেই এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে একটুও নড়েনি। হয়তো এখন বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। হয়তো অনেক সময় হয়েছে সে এখানে এসেছে।
তবুও এখন যেতে ইচ্ছে করছে না তার।

তার কানে নিচ থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। তার বাবা সচরাচর এমন অট্টহাসি হাসে না। কিন্তু আজ যেন তিনি হেসে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলছে।
লিমা অনেকটা বিরক্ত আর আগ্রহ নিয়েই নিচে নামল।

ড্রয়িংরুমে গিয়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের মানুষটার দিকে।
সাফাত হাসি হাসি মুখ নিয়ে তার বাবার সাথে কথা বলছে। অন্য দিকে তার বাবা সাফাতের কথা শুনে জোরে হাসছে। রান্নাঘরের দিকে নজর দিলে দেখে তার মা খুব ব্যস্ত হয়ে কিছু করছে। হয়তো ওই লোক টা কে আপ্পায়নের ব্যবস্থা করছে।
সাফাত লিমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

এই প্রথম মনে হয় সাফাতের দাঁত বের করা হাসি দেখল লিমা। কত টা মায়া মাখানো। সুদর্শনে হাসি।
লিমা ঢুক গিলল। চোখের পাতা ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
মেয়ে কে দেখে আরমান বলল,

“আয় মা আয়।”
“….
“দেখ মা কে এসেছে। সাফাত চৌধুরী।”
লিমা বিড়বিড় করে বলছে, “আব্বু তোমার থেকে আমি ওই মানুষটাকে বেশি চিনি হাড়ে হাড়ে।”
“কিছু বলছিস মা?”
“ন না আব্বু। উনি এখানে কেন?”
“সুখবর নিয়ে এসেছে।”

লিমা ভ্রু কুঁচকে একবার সাফাতের দিকে তাকায়। সাফাত ঠোঁট চেঁপে হাসে। আবার তার বাবার দিকে তাকায়।
“কি খবর? মানে সুখবর?”
“তোর আর উনার বিয়ে।”
“কি?” বলেই লিমা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।

ওদিকে তার মা ট্রে হাতে নিয়ে এত এত নাস্তা নিয়ে এলো সাফাতের জন্যে। তা দেখে সাফাত আদিখ্যেতা দেখিয়ে বলল,
“আরে আন্টি এত কিছু আনার কি দরকার ছিল?”
“আরে না বাবা খাও খাও। আমাদের পরিবারের সদস্য হতে চলেছো। তোমাকে যত্ন তো একটু করতেই হয়।”
আরমান বলল,

“হ্যাঁ বাবা খাও। লজ্জা পেয়ো না। একটু পর থেকে তো এই বাড়ির মানুষই হয়ে যাবে। হাহাহা।”
সাফাত মুচকি হাসে। আবার লিমার দিকে তাকায়। ওদের অগোচরে এক চোখ টিপ দেয়।
লিমার খুব রাগ হয়। তার গা জ্বলে যাচ্ছে এমন কথায়। তাদের কথা শুনে লিমা হ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
“কি যা তা বলছো তোমরা?”
“যা তা মানে?”
“তা নয় তো কি আব্বু? কি বলছো তোমরা এই সব?”
“কি বলছি শুনতে পাচ্ছিস না? সাফাত বাবা তোর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।”
“মানে কি?”

“লিমা তুই কি তোর আব্বুর কথা শুনতে পাচ্ছিস না নাকি বুঝতে পারছিস না?”
“আম্মু এই সব..”
“আন্টি আঙ্কেল কি বলছে তুমি কি বুঝতে পারছো না? একটু পর আমাদের বিয়ে।” ওদের কথার মাঝে সাফাত বা হাত ডুকিয়ে এ কথা বলল।
“বিয়ে মানে কি? আপনি আর কয়টা…”

লিমার কথা শেষ করার আগে সাফাত সিনথিয়া কে কিছু শপিং এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আন্টি এই গুলি লিমা কে পড়িয়ে দিন।”

“দাও বাবা।”
সিনথিয়া শপিং গুলি হাতে নেয়। এদিকে লিমার কথা কেউ শুনতেই চাইছে না। হয়তো সাফাত নয়তো আরমান আর না হয় সিমথিয়া কোনো না কোনো ভাবে তাকে আটকিয়ে দিচ্ছে।
“নে এই গুলি পড়ে রেডি হয়ে আয়।”

সিনথিয়া লিমার হাতে ব্যাগ গুলি দিলে লিমা রাগে সেই গুলি মাটি তে ছুড়ে ফেলে ফুসফুস করতে করতে নিজের রুমে চলে যায়।
মেয়ের এমন অবস্থা দেখে সিনথিয়া বিনয়ের সাথে বলে,
“কিছু মনে করো না বাবা। আসলে ও..”
“ইটস ওকে আন্টি। ওকে আমি ভালো করেই চিনি।”

আরমান বলল,
“এই কারণেই তো তোমার হাতে ওকে দিতে আমি সময় নিচ্ছি না বাবা।”
সাফাত মুচকি হাসে। সিনথিয়া ব্যাগ গুলি নিয়ে আবার লিমার রুমের দিকে যায়।
..
আসলে সাফাত সকাল সকাল লিমার বাসায় চলে এসেছিল। আরমান আর সিনথিয়া কে নিজের পরিচয় দেয় বাসায় এসেই। সবার মুখে এত নাম ডাক শুনে তাদেরও চিনতে অসুবিধা হয় না। তারা অবাক হয়ে যত্নে সাফাত কে ঘরে নিয়ে আসে। সে লিমা কে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। লিমা কে পছন্দ করে সেটাও জানায়। তাই তারা সাফাতি হয়ে যায়।

পাত্র দেখতে শুনতে ভালো। এতো নাম ডাক লিমা কেও পছন্দ করে আপত্তি করার মানেই হয় না। তাই লিমার বাবা মাও সাফাতি হয়ে যায়।
আজ শুক্রবার। তাই সাফাত আজই বিয়ে করে নিতে চায় লিমা কে। এটা শুনে তারা অবাক হয় এত তাড়াতাড়ি..
কিন্তু পরে আর না করেনি। কারণ তাদের জানানোর মতো তেমন কেউ নেই। আর লিমা যে অবস্থায় আছে। মানে মানে বিয়ে টা হলে বাঁচে তারা। বিয়ের পরে না হয় মেয়ে এই বাড়িতেও থাকতে পাড়ে কোনো সমস্যা হবে না। বাবা মায়ের চিন্তা তো দূর হবে। এই ভেবেই অমত করে না।

একটু পর কাজি আসবে তাদের বিয়ে পড়াতে। সাফাত সব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। স্বাদে কি আর রাতের ঘুম আরাম করে চিন্তা করেছে সে?
সিমথিয়া লিমার পাশে বিছানার উপর ব্যাগ গুলি রাখে।

“মা এমন ভালো ছেলে কি আর সব সময় পাওয়া যায়? এত ভালো ছেলে তোকে পছন্দ করে বলেই তো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো। তুই মা আর অমত করিস না। সাফাতি হয়ে যা। তোর বাবাও না হলে রাগ করবে। এই গুলি পড়ে রেডি হয়ে নে।”

“আম্মু তোমরা কেন বুঝতে চাইছো না আমার কথা? আমাকে কিছু বলার সুযোগ কেন দিচ্ছো না? উনাকে পছন্দ আমিও করতাম..”
“তা হলে আর অমত না করে চুপ করে রেডি হয়ে নে।”
লিমা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে তার বাবা ঘরে প্রবেশ করেছে।

“আব্বু আমার কথাটা একটু তুমি শুনো।”
“কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। এত দিন কষ্ট করে নিজের সব টা দিয়ে একমাত্র সন্তান কে মানুষ করেছি কি এই কারণে? অন্যের সামনের মেয়ের মুখের উপর কথা শুনতে? না এমন কখনোই হবে না। যদি আমাদের মা বাবা হিসেবে সম্মান করে থাকিস তা হলে ওই ছেলেটার সামনে বেইজ্জত করিস না আমাদের। যা বলছি তাই কর। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। একটু পর কাজি চলে আসবে।”
“আব্বু ওই লোকটা আ..”

“সিনথিয়া চলে এসো। বাকি টা ওর কাছে, আমাদের যা বলার আমরা বলে দিয়েছি।”
গম্ভীর কন্ঠে আরমান কথা টা বলে চলে গেল। স্বামীর বাধ্য স্ত্রী সিনথিয়া স্বামীর কথা মতো চলে যায়। যাওয়ার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,
“জিদ না করে রেডি হয়ে নে। একা যদি রেডি হতে না পারিস তবে আরিফা কে ডেকে নে।”

এই বলে সিনথিয়া চলে যায়।
লিমার মাথাতেও আরিফা আসে। ভাবে আরিফা হয়তো কিছু করতে পারবে। তাই তাড়াতাড়ি করে আরিফা কে কল দেয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় আসতে বলে।
আরিফা বাসায় এসে সাফাত কে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়। তারপর তাড়াতাড়ি করে লিমার কাছে চলে যায়।
“লিমা লিমা।”

“তুই এলি? এতক্ষণ লাগে? এত হাপাচ্ছিস কেন? কোন পাগলা কুত্তা দৌড়ানি দিল?”
“আরে থাম না। এখন তোর এই কথা গুলি একটু বন্ধ কর।”
“আমার সব শেষ।”

“স্যার মানে তোর সাফাত চৌধুরী কে বাসায় দেখলাম আঙ্কেলের সাথে হাসছে কথা বলছে।”
“হুম রে। ডেভিল টা আমার আম্মু আব্বু কে খেয়ে ফেলেছে।”
“কি?”
“না মানে হাত করে নিয়েছে। নিজের বশে এনে ফেলেছে রে। আমি এখন কি করব?”
“কেন? কি হয়েছে বলবি তো। সব টা বল।”
“উনি আসছে আমায় বিয়ে করতে আজ।”
“হোয়াট?”

“হো বইন হো। আমার জীবন টা কয়লা। কি করব আমি?”
“মানে সিরিয়াসলি?”
“আরে এই বাইদানী তোর সাথে এখন মজা করতে আমার কোন পা টা গেছে রে?”
“উনি তোকে বিয়ে..”
“না না আমাকে না তো তোর নানি কে বিয়ে করতে আসছে। আজাইরা লাড্ডু কোথাকার।”

“না ইয়ে, তোকে বিয়ে করতে আসলে তো ভালোই। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।”
“কি করে রেডি হবো? উনি তো একটা ডেভিল।”
লিমা আরিফা কে সব টা বলে। সেদিনের পর থেকে তার মন খুব বেশি খারাপ হওয়ায় আরিফা কে সব কিছু বললেও সেই ঘটনার কথা জানায়নি। তেমন মন মানসিকতা ছিল না তার।
সব শুনে আরিফা বেশ অবাক হয়। এটাও সম্ভব? কি করে? সে হা করে তাকিয়ে আছে লিমার দিকে।

“তুই ঠিক বলছিস?”
“তা নয় তো কি? স্বাদে কি আমি উনাকে বিয়ে করতে চাইছি না? উনি তো একটা লুচ্চা। যাকে কি না এত দিন মনে প্রাণে চেয়ে এসেছে আজ তাকেই বিয়ে করতে আমার…”
“আরে আরে কাঁদিস না। চুপ কর।”

“কি করে চুপ করব বল তো? উনি কি ভাবে করতে পারল? তারপরেও আমার সাথে…”
“তুই বা কি করে শিওর হচ্ছিস মুখের কথা শুনে?”
“নিজের চোখ কেও কি অবিশ্বাস করব? এটাই বলছিস তুই আমায়?”

“না আসলে। যাই হোক এখন কি করার?”
“আমিও তো তাই ভাবছি এখন কি করার? কি করব আমি? তুই কিছু বুদ্ধি দে।”
“আ আমি?”
“এমন করে বলছিস কেন? গোবর মাথায় একটু কিছুও কি বুদ্ধি নাই? সব টাই কি ফাঁকা কলসি লুচ্চা মেয়ে?”
আরিফা লিমার কথার জবাব না দিয়ে একটু ভেবে বলে,

“এক কাজ কর এখন উনি যা বলছে তেমনি কর। পরে উনার কাছে গিয়ে না হয় সব টা জেনে নিস। যদি সত্যিই হয় তবে না হয় ডি…”
“তার মানে তুই বলতে চাইছিস আমি জেনে শুনে নিজের গলা দঁড়ির সামনে নিয়ে হাজির করব? নিজেই নিজের জীবন টা আগুনের কাছে বিলিয়ে দিব। আর বলব নে আগুন খা আমায়। খেয়ে শেষ করে ছাই করে দে।”

“দেখ এখন এই সব বলার সময় নয়। উনি যেমন মানুষ তাতে সব করতে পাড়ে। যদি সাফাতি না হস পরে উনি তোর ক্ষতি করলে? তার থেকে ভালো উনি যা বলছে তাই কর। রেডি হয়ে নে।”
“আরে ডাইনি তোকে এনেছিলাম আমায় বাঁচাতে। এখন তুই নিজেই মরণ কে উস্কিয়ে দিচ্ছিস। তুই একটা আস্তো শাকচু..”
লিমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজার ওপাড় থেকে সিনথিয়ার কথা শুনা যায়।

“কি হলে রে? হলো তোদের? আর কতক্ষণ লাগবে? আরিফা তাড়াতাড়ি করে রেডি কর ওকে। কাজি চলে আসবে একটু সময়ের মাঝে।”
“আ আন্টি হয়ে যাবে। তু তুমি যাও। আর একটু আছে।”
“তাড়াতাড়ি কর।”

বলেই সিনথিয়া চলে যায় দরজার ওপাড় থেকে।
“দেখ বইন তোর পায়ে পড়ি এখন চিন্তা ভাবনা না করে বিয়ে টা করে নে। পরে না হয় সব জেনে শুনে একটা কিছু ভাবা যাবে। তাড়াতাড়ি উঠ। তৈরি হ।”
“পরে কেন? আগে জেনে শুনে নিলে কি হয়?”

“তোর যে লাভার। সেই সময় টা পেলে তো। দেখছিস না একদিনও সময় দিল না। আজ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো। আজই বিয়ে করবে বলে সব ঠিকঠাকও করে নিল।”
“দেখ তুই উনাকে একদম কি কিছু বলবি না.”
“ওরে কতো দরদ। তাহলে রেডি হয়ে নে উনার গলায় গিয়ে ঝুঁলে পড়।”

“মুলা তুই…”
“কিছু না তাড়াতাড়ি বিয়ে করে উনার সংসার কর গিয়ে। উঠ।”
লিমা মুখ ভুতা করে আছে। আরিফা তাকে শাড়ী পড়িয়ে দিয়ে সাজাতে ব্যস্ত।
“বইন মুখ ভুতা করে রাখিস না। পরে দেখবি তোর হবু জামাই এই মুখ ভুতার কারণে আমাকেই না মেরে ফেলে..”
“সামু তুই…”

“ভুল কিছু বলি নি।”
“আমিও তাই চিন্তা করছি। কি করে ওই গ্যাংস্টারের সংসার করব? থাকব কি করে উনার সাথে এক ছাদের তলায়?”


পর্ব ০৯

সাফাত কখন থেকে বসে আছে। সামনে সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে তার শ্বশুর। মানে হবু শ্বশুর।
সাফাতের মনের মাঝে নতুন এক অনুভূতি কাজ করছে। নতুন বিয়ের অপেক্ষারত সবার মনের মাঝে যেই এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়। সাফাতের এখন তাই হচ্ছে।
অবশেষে সাফাতের অপেক্ষার তীব্র এক অজানা অনুভূতির অবসান ঘটিয়ে লিমা এলো।

সাদা এক বেনারসি গায়ে। সাদা স্টোন গুলি ঝিকঝিক করছে। গায়ে অনেক গয়না। মাথায় কি সুন্দর করে ঘোমটা দেওয়া। মুখের মাঝে হাল্কা মেকআপ। ঠোঁটে গাঢ়ো লাল লিপস্টিক। কাজল কালো চোখ গুলি কলো রঙে রঙ্গিম হয়ে আছে। লিমা কে যেন হুর লাগছে। মনে হচ্ছে আকাশ বেদ করে বেহেশতের হুর মাটিতে স্থান নিয়েছে।
চোখ এক মনে এক ধ্যানে লিমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখের পাতা নড়ছে না। একদম স্থির মায়ামি লিমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আরমান গলা কাশি দিলে সাফাতের হুশ ফিরে একটু নড়েচড়ে বসে ঠিক হয়ে।
লিমা কে আরিফা সাফাতের পাশে এনে বসায়। তবে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। লিমার গা রাগে জ্বলে যাচ্ছে। তো সাফাতের মন রোমাঞ্চে পুলকিত হচ্ছে। আড় চোখে চোখে লিমা কে দেখছে।
কাজি বিয়ে পড়িয়ে চলে যায়। সবাই মিষ্টিমুখ করে।

সাফাত তো মনের আনন্দে গপগপ করে কয়েক মিষ্টি পেটে দিয়ে দেয়। শান্তি তে মনে হয় মিষ্টি গুলি পেটে গেল। লিমা এই সব দেখে মনে মনে বলতে থাকে,
“খাও বাছাধন বেশি করে খাও। জীবনে কি আর কখনো খাইছিলা? খাও নাই তো। এখন হাতের কব্জি ডুবিয়ে খাও। ভরাসিয়াস একটা।”
সবাই এক সাথে মিলে খাবার খেতে বসে। সিনথিয়া পরিবেশন করছে।

আরমান, সাফাত লিমা আর আরিফা বসে নিজেদের মতো খাচ্ছে। লিমার এত ভার গয়না নিয়ে খাবার খেতে অনেক অসুবিধা হচ্ছে। যদিও পাশে বসে থাকা সাফাতের কারণে রাগে সে খাবার গলা দিয়ে নামাতে পারছে না। তবুও হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
কম সময়ের মাঝে সিনথিয়া বেশ রান্নাবান্না করে নিয়েছে।

সাফাত আরাম আয়েশে খাবার খাচ্ছে। আরমান আর আরিফাও মন ভরে খাবার খেতে ব্যস্ত। লিমা শুধু রাগে ফেটে যাচ্ছে।
“বুঝলে তো সাফাত বাবা তোমার কারণে আজ এত কিছু খেতে পারলাম। সিনথিয়া তো আলসেমির কারণে তেমন কিছু রান্নাও করতে চায় না।”
সিনথিয়া রাগে বলে উঠল,
“তবে কি শুধু ময়দা খেয়ে জীবন কাটাও?”

“যাই বলো আজ বেশ রান্না করেছো।”
“….
সাফাত চামচ দিয়ে পায়েস মুখে দিতে দিতে নিজের পা দিয়ে লিমার পায়ে স্লাইড করছিল।
এমন কাহিনী তে লিমা হকচকিয়ে যায়। হঠাৎ বিশম খায় খুব জোরে। সাফাত তাড়াতাড়ি তার মুখের সামনে পানি ধরে।
লিমা কাশতে কাশতে পানি না নিয়ে চোখ গরম করে সাফাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে হয়তো এটাই বলছে “ভাব দেখাচ্ছে এখন। নিজের এমন কান্ডে বিশম খেলাম এখন পানি ধরে আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে। মরণ আমার।”

লিমা কাশছে অথচ সাফাতের হাত থেকে পানি নিচ্ছে না। সাফাত লিমার থুতনিতে এক হাত ধরে অন্য হাতে পানির গ্লাস তার মুখে তুলে দেয়।
যেন ৪/৫ বছরের কোনো বাচ্চা মেয়ে কে পানি খাওয়ানো হচ্ছে।

তাদের এমন কান্ড দেখে আরিফা মুচকি হাসে।
সাফাত লিমার দিকে তাকিয়েই আছে। আরমানও সিনথিয়ার দিকে নজর দেয়। সিনথিয়া মুচকি হাসে। হয়তো দুজনে তাদের সদ্য বিয়ের পুরোনো দিনের মাঝে চলে গিয়েছে।
আরমান আর সিনথিয়ার এমন আবেগপ্রবণ চাওনি দেখে আরিফা খায় বিশম। খুব জোরে জোরে কাশি পায় তার।

তার কাশির আওয়াজে সবার ধ্যান ভাঙ্গে। আরিফা নিজেই পানির গ্লাস নিয়ে টগটগ করে পানি খেয়ে নিয়ে নিশ্বাস ছাড়ে। আরিফা মনে মনে বলে “এ কোথাই আছি আমি?”
খাওয়া দাওয়ার পর সবাই কিছুক্ষণ মিলে কথা বলে। একসময় সাফাত লিমার মা বাবা কে জানায়,
“আঙ্কেল আমি লিমা কে আজ নিয়ে যেতে চাই বাসায়।”
“আজই..”
“হুম।”

“….
লিমা আরো রেগে যায়। কটমট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
“কি? এখন আমাকে উনার সাথে যেতে হবে?”

“ছিঃ লিমা এই সব কি কথা? ঠিক করে কথা বল। ও তোর স্বামী হয়।”
“আম্মু..”

“চুপ আর একটা কথাও নয়। সাফাত বাবা এখন থেকে তোর সব। ও যা বলবে তাই করতে হবে। ওর কথা শুনে চলাই তোর কাজ এখন। ওর কথার অবাধ্য হবি না কখনো।”
“…
সিনথিয়ার কথায় সবাই যেন থ মেরে যায়। লিমা একটু পর বলতে শুরু করে,

“ওকে ফাইন। যা বলবে তাই হবে। আমি খেলার পুতুল না! আমাকে তো সব মানতেই হবে। ঠিক আছে। আমাকে বিদায় করার জন্যে উঠে পড়ে লেগে গিয়েছো না? চলে যাচ্ছি। দেখবে আমি আর আসব না। আসব না তোমাদের এই খানে। আগুনের সামনে নিয়ে গেলে না আমায় খেয়ে ফেলার জন্যে। আমি নিজেই আগুনের কাছে গিয়ে বলছি আমায় শেষ করে দিতে। না হয় ওই নরক কুণ্ডেই ঝাঁপ দিচ্ছি। ভালো থাকো তোমরা। আর কখনো আসব না এখানে।”

লিমা কথা গুলি একদমে বলে চলে যায় বাসা থেকে। আর একটুও দাঁড়ায় না সেখানে।
“আঙ্কেল আন্টি আপনারা কিছু মনে করবেন না। ও রাগে বলল কথা গুলি। রাগ কমলে ঠিক হয়ে যাবে। কাল পরশু আমি ওকে নিয়ে আসব।”
আরমান সাফাতের হাত ধরে কেঁদে দেয়। অস্পষ্ট কন্ঠে বলে,
“আমার মেয়ে টা কে দেখে রেখো বাবা। ও বড্ড ছেলে মানুষি করে।”

“চিন্তা করবেন না। আমি সব সময় ওর পাশে থাকব।”
“…..
আরমান আর কথা বলতে পাড়ে না কান্নার কারণে।

“একটা বাবা ঠিক কত টা কষ্ট করে তার বুকের ধন কে অন্যের হাতে দিয়ে দেয়। তা ‘বাবা’ রা ছাড়া পৃথিবী তে এই কষ্ট টা আর কেউ বুঝে না। হয়তো তাদের কলিজা ছিঁড়ে যায় এমন যন্ত্রণায়। নয়তো বা মনে হয় এই বুঝি দম টা বের হয়ে যাবে। প্রতিটা বাবার কাছে তার ‘মেয়ে’ সাফাতকন্যার চেয়ে কোনো অংশে কম হয় না।

সব বাবা রা চায় আমার মেয়ে টা সব চেয়ে ভালো থাকুক। স্বামীর সাথে খুব সুখে থাকুক। বাবা রা তাদের মেয়েদের কলিজা ভাবে। মেয়ে একটু কষ্ট পেলে মনে হয় বাবাদের বুকে লাগে। বিয়ের পর ঠিক এমন মুহূর্তে বাবাদের কেমন লাগে তা হয়তো কেউ লিখে প্রকাশ করতে বা অন্য কে বলে বুঝাতে পারবে না।”

আরমান সাহেবেরও হয়তো এমন লাগছে এই মুহূর্তে।
লিমার মা সাফাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কাঁধো কাঁধো কন্ঠে বলে,

“বাবা ও কিন্তু নিজের খেয়াল একদমি নিতে পাড়ে না। আমার খায়িয়ে দিতে হয়। চুল মুছে দিতে হয়। ওর সব দেখে শুনে দিতে হয়। তুমি একটু সামলে নিও। ওর একটু খেয়াল রেখো। সাবধানে যাও।”
“কোনো চিন্তা করবে না আপনারা ও আল্লাহর রহমতে ভালোই থাকবে। আসছি। দোয়া করবেন।”
সাফাত বেড়িয়ে আসে বাসা থেকে।

গিয়ে দেখে লিমা পিছনের সিটে বসে রাগে সাপের মতো ফুসফুস করছে।
সাফাত পেছনের জানালার সামনে গিয়ে বলছে,
“এই যে ম্যাম আপনি আমার ওয়াইফ। আমি আপনার ড্রাইভার নই। সামনে আসুন।”

“পারব না। আপনার ইচ্ছে হলে সামনে বসে ড্রাইভ করুন। না হলে পিছনে ঠেলতে ঠেলতে আপনার বাসায় নিয়ে যান।”
“হোয়াট?”
“…..
সাফাত আর কিছু না বলে দরজা টা খুলে। নিঃশব্দে লিমা কে কোলে তুলে নেয়।
লিমা অবাক হয়ে বলে,
“আরে আরে করছেন কি?”

“….
সাফাত আশেপাশের লোকজন কে তোয়াক্কা না করে লিমা কে কোলে নিয়ে সামনে তার পাশের সিটে বসিয়ে দেয়। লিমা ফ্যালফ্যাল করে সাফাত কে দেখছে।
তখন রাগের মাথায় অনেক কিছু বললেও এখন লিমা কান্না করছে নাক টেনে টেনে।

সাফাত ড্রাইভ করতে করতে লিমার দিকে তাকাচ্ছে। লিমা বাহিরের দিকে তাকিয়ে নাক টানছে তো কান্না করছে। সাফাত দেখলেও কিছু বলছে না। এখন একটু কান্নার দরকার তার। মন টা ভালো হবে।
সাফাতও আড় চোখে লিমা কে দেখছে। লিমার মনের পরিস্থিতি টা সে বুঝতে পারছে। নিজের বাড়ি ছেড়ে চললে সব মেয়েদের এমন হয়।
ড্রাইভ করতে করতে সাফাত টিস্যু এগিয়ে দেয় লিমার দিকে।

সাফাত গাড়ি থামিয়ে কোনো কথা ছাড়াই আবার লিমা কে কোলে তুলে নেয়।
কান্নায় চোখ লাল হওয়া লিমা অবাক হয়ে সাফাত কে দেখছে।

সাফাত সুন্দর করে লিমা কে কোলে নিয়ে তার বেড রুমে চলে যায়। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলে,
“এখানে থাকো আমি আসছি।”
সাফাত চলে যায়। একটু পর এক কাপ কফি হাতে নিয়ে রুমে আসে।

“ধরো।”
“….
“আমার দিকে তাকিয়ে না থেকে এটা হাতে নাও।”
সাফাত আবার বলল,
“কি হলে নাও।”

লিমা কথা ছাড়া সাফাতের হাত থেকে কফির মগ টা নেয়। সাফাত চুপ করে লিমা কে কোলে তুলে নেয়।
“কি হচ্ছে? একটু পর পর আমায় না বলে কোলে নিচ্ছেন কেন?”
“তোমায় জিজ্ঞেস করতে হবে বুঝি?”
“অবশ্যই করতে হবে।”
“কখনোই নয়। একটু আগে থেকেই তুমি আমার হয়ে গেছো। তুমি সব টাই এখন আমি বা আমার। আর আমার জিনিস কি করব না করব সেটা কাউ কে বলার প্রয়োজন মনে করি না আমি। মাইন্ড ইট।”
“আজব।”
“তাও ঠিক। কারণ তুমি এখন আমার অর্ধাঙ্গিনী। মানে আমার অর্ধেক অংশ।”

“….
পড়ন্ত গোধূলি লগ্ন চলছে তখন। সাফাত লিমা কে কোলে নিয়ে ব্যালকুনির দিকে চলে যায়।
অপকল লিমা কে দেখছে। যেন এটা কোনো হুর কে কোলে নিয়ে রেখেছে সে। সাফাত নেশা ধরা চোখ নিয়ে লিমা কে দেখছে। লিমার এখন বেশ লজ্জা লাগছে।
“কফি টা খাও। মাথা ব্যথা একটু কমবে।”
“….

কান্নার কারণে লিমার আসলেই মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। তাই কিছু না বলেই কফির কাপে চুমুক দেয়। এক হাতে তার কফি অন্য হাতে সাফাতের কাঁধ আগলে রেখেছে। আড়চোখে আবার দেখছেও।
“তুমি কি মানুষ না? নাকি দয়া মায়া নেই? আমি যে আছি তাও তোমাকে কোলে নিয়ে একটুও বলতে ইচ্ছে কারছে না আমায় আমি কফি খাবো কি না।”
সাফাতের এমন কথায় লিমার লজ্জা পায়। ঠোঁট উল্টিয়ে বলে,
“এটা তো আপনি আমার জন্যে এনেছেন। আপনার জন্যে তো আপনি আনেন নি। আর এটার মাঝে আমি ঠোঁটও লাগিয়ে দিয়েছে..”

সাফাত আকাশের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলে,
“তো কে বলেছে এটা না খাওয়ার কথা। আমি এটার কথাই বলেছি।”
“….
“দিবে না নাকি?”
“এটা?”
সাফাত একটু জোর নিয়েই বলে,

“তো আমি অন্যটার কথা বললাম কি?”
“….
লিমা কি করবে বুঝে পায় না।
“আপনি কি রাক্ষস?”
“হোয়াট?”
“না আসলে মানে আপনি আমার খাওয়া..”
“এটার হিসাব না হয় পরে নিলাম। আপাদত আমার মুখে কফি দাও। খুব মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করছে তোমার ওই ঠোঁ..”

কথাটা বলতে বলতে সাফাত লিমার দিকে তাকায়। লিমা ভ্রু কুঁকচে সাফাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাফাত কথা পাল্টিয়ে বলে,
“না মানে আমার খুব কফি কফি পাচ্ছে। তাড়াতাড়ি কফি মুখে মানে আমার ঠোঁটে ধরো।”
সাফাত কথাটা বলে মুচকি হাসি দেয়।
লিমা আর কথা না বাড়িয়ে সাফাতের মুখের সামনে কফির মগ ধরে। সাফাত চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। তারপর মুখ টা আরো লিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে কানের কাছে ফিসফিসানি কন্ঠে বলে,
“এই কফি তে দুনিয়ার সেরা মিষ্টত্ব রয়েছে। যা প্রেয়সীর ঠোঁটের স্পর্শে সম্ভব হলো।”
লিমা এই কথা শুনে একটা ঢুক গিল। খুব লজ্জায় মাথা নুয়িয়ে নেয়।

সাফাতের ঠোঁটে এক বাঁকা হাসির আভাস পাওয়া যায়।
লিমা কে এই ভাবে কোলে নিয়ে সাফাত প্রায় ৩/৪ ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছে। সাফাত একটুও নড়ছেও না। কখনো সাফাতের দৃষ্টি বহুদূরের ওই আকাশে স্থির তো কখনো লিমার নেশা ধরানো ঝাঁঝালো রূপের দিকে।
আর বেচারা লিমার কোমর ব্যথা করছে। মনে মনে বলছে,

“উনার কোলে থেকে আমার কোমর ব্যথা করছে উনার কি হাত পা বা কোমর কোনো টাই ব্যথা করছে না? কি স্টিল বডি মাবুদ। ডাইনোসরের শক্তি রয়েছে এই হাতির মতো জিম বডি তে।”
সাফাতের মতো লোকের লিমা কে ৩/৪ ঘন্টা কেন সারা রাত কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বোধ হয় হেলবে না। তার যে বডি। অপর দিকে তার কাছে লিমা একটা পাটশলা। ওজন বোধ হয় ৪৬ কিংবা ৪৮ হবে।
রাত যখন দশ টা বাজে সাফাত তখন লিমা কে নিয়ে ঘরে ঢুকে।
“চুপ করে বসে থাকবে একটুও নড়বে না। আসছি আমি।”

সাফাত চলে গেলে লিমা বিছানায় নড়চড়ে কোমরে হাত দিয়ে বসে। একটু জোরে জোরেই বলে,
“এ্যা বললেই হলো। নড়বে না একটুও। কেন গো? আমি কি আপনার মতো রোবট ম্যান নাকি? কোমরের নাট বল্টু নড়ে যাচ্ছে আর উনি আসছে নড়বে না নিয়ে। আল্লাহ মাবুদ এই গ্যাংস্টারের সাথে থাকব কি করে আমি? একে তো ভয় তারউপর রাগ।”
সাফাত ট্রে করে খাবার নিয়ে এলো। লিমা বেশ অবাক হয়ে। ভাবে

“উনি কি সত্যিই এলিয়েন? জাদু টাদু জানে নাকি? খাবার নিয়ে এলে কি করে?”
লিমা কৌতূহল নিয়ে বলেই বসল,
“আপনি কি এলিয়েন বা ম্যাজিশিয়ান?”
“হোয়াট?”
“না মানে এই ৫ মিনিটে যে খাবার নিয়ে এলেন।”
“তুমি কি ভাবো সবাই তোমার মতো বোকার ডিম? সবাই কি বোকার সাফাত্যের বাস করে?”
“কি? কি বললেন আপনি? আমি বোকার ডিম? তাহলে তো আপনি হাতির ডি..”

কথা টা বলতে গিয়েও লিমা থেমে যায়। পরে যদি সাফাত তাকে এই একা ঘরে পেয়ে কিছু করে বসে।
“খাবার বাহির থেকে আনিয়েছি আরো আগেই। আমি সাফাত চৌধুরী। নজর টা একটু আগে আগেই চলে আমার। খুব ফাস্ট।”
লিমা মুখ ভেংচিয়ে মনে মনে বলে,
“হুমম তা তো দেখাই আছে। এই কারণেই তো আমার সাথে অভিনয় করলেন। অন্য একজন কে ঠকালেন। আবার আমায় বিয়েও করে নিলেন।”
লিমা কে সাফাত নিজের হাতে খায়িয়ে দিতে চালইলে লিমা বলে,
“আমার হাত আছে আমি খেতে পাড়ি।”
“চুপ পিচ্চি। হা করো।”

“আ আমি পিচ্চি?”
“হা করো না হলে গালে একটা খাবে।”
লিমা বড়সড় করে হা করে। সাফাত মুচকি হেসে লিমা কে খায়িয়ে দিতে থাকে।
সাফাত নিজে খেয়ে আবার উপরে লিমার কাছে যায়। লিমা তখন বসে ছিল। চেয়ারের উপর বসে পা দুলাচ্ছিল। যার কারণে তার সাদা পা গুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সাফাত ঘরে ঢুকেই এমন দৃশ্য দেখে কাশতে শুরু করে। শুকনো ঢুল গিলে লিমার কাছে যায়।

লিমার সামনে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে যায়। লিমার হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে লিমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সাফাতের এমন চাওনি দেখে লিমা ঘনঘন চোখের কাজল কালো পাঁপড়ি ফেলে। সাফাত এটা দেখে একটু অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসে। আবার লিমার দিকে তাকায়। ঠোঁট চেঁপে হেসে লিমা কে কোলে তুলে নেয়।
“আবার কে কো কোলে..”

সাফাত লিমা কে নিয়ে ব্যালকুনিতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে তাকে নামায়।
লিমার সামনে হঠাৎ করে হাটু গেড়ে বসে পড়ে।
প্যাকেট থেকে রিং এর বক্স টা বের করে লিমার সামনে দেয়। সেখান থেকে চকচক করা ডায়মন্ডের রিং টা লিমার বা হাতের তর্জনি আঙ্গুলে পড়িয়ে দেয়। সেই হাতেই চুমু খায় সাফাত।
আর লিমা অবাক দৃষ্টিতে সাফাত কে দেখতে থাকে।
“ভালোবাসি।”
“…

“প্রাণের টুকরো টা কে খুব ভালোবাসি। তুমি আমার বউ। আমার অর্ধাঙ্গিনী। আমার জীবনের সব টা তে তুমি আছো। তুমি ছাড়া আমি আমার জীবন টা চিন্তা করতে পারি না। তুমি বিহীন আমি সত্যিই বাঁচতে পারব না। জীবনে যাই করো আমাকে ছেড়ে কখনো যেও না। আমি মরে যাবো। তুমি চলে গেলে এই দুনিয়াতে একটা নিশ্বাসও হয়তো আমি নিতে পারব না। আমায় প্লিজ তোমার বুকে ঠাই দিও। খুব ভালোবাসি তোমায়। আমি আমার জীবনের অংশ তোমাকে ভালোবাসি। তোমায় খুব বেশিই ভালোবাসি প্রেয়সী।”

লিমা শুধু ফ্যালফ্যাল করে সাফাত কে দেখছে। তার মনের মাঝে অনেক কথা জাগলেও কিছু বলতে পারছে না এখন। যেন বোবা হয়ে গেছে। গলা দিয়ে আসছেও না কথা।
সাফাত বসা থেকে উঠে লিমার পিছনে পিঠের দিকে নিজের হাত নিয়ে লিমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। ঝাপটে জড়িয়ে নেয় নিজের বুকে। বাচ্চাদের মতো কান্না করতে থাকে। লিমা কে নিজের বুকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে সাফাত।
লিমার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। সাফাতের কান্না টাও তার সহ্য হচ্ছে না। মনের মণিকোঠায় বড্ড বারি খাচ্ছে।


পর্ব ১০

লিমা এখন কি করবে বা সাফাত কে কি বলে সান্ত্বনা দিবে তা তার জানা নেই।
সে শুধু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বুকের ভেতর খুব ব্যথা লাগছে। সাফাত কে সে নিজের দুই হাতে আকঁড়েও ধরছে না। শান্ত ভাবে শুধু দাঁড়িয়ে আছে।
সাফাত লিমা কে আরো শক্তে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে কান্না করে বলতে লাগল,

“প্লিজ ডোন্ট লিভ মি। আমি মরে যাবো। প্লিজ লিমা প্লিজ ডোন্ট লিভ।”

সাফাতের এমন কাতর সর লিমার মন কে ব্যাকুল করে দিচ্ছিল।
লিমা নরম হাতে আস্তে করে সাফাত কে নিজের হাতে আবদ্ধ করে নেয়। সাফাত লিমা কে খুব শক্তে জড়িয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে কান্না করছে তো করছেই।
লিমার নরম মন মুহূর্তে মুহূর্তে কেঁদে উঠছে। চোখের কোণায় পানি ঝিকঝিক করছে।

“জানো ছোট বেলায় মা চলে গেছে আমায় ছেড়ে। বাবাও একা করে চলে গেল। আমার বলতে এখন শুধু তুমি আছো। আর কেউ নেই। দুনিয়াতে আমার আর কিচ্ছু নেই। প্লিজ লিমা আমায় ছেড়ে যেও না। প্লিজ ডোন্ট লিভ মি। বিশ্বাস করো আমি মরে যাবো।”

সাফাতের প্রতিটা কথায় লিমা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সাফাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল,
“শান্ত হোন। যাবো না। কোথাও যাচ্ছি না আমি।”
সাফাত লিমা কে বুক থেকে তুলে গালের দুই পাশে হাত রাখে।
“সত্যিই যাবে না তো? প্রোমিজ করো যাবে না আমায় ছেড়ে।”

লিমা মাথা নেড়ে “হুম” জবাব দেয়।
সাফাত লিমার নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। নিজের আষ্টেপৃষ্ঠে ঠোঁটযোগল জড়িয়ে নিয়েছে। লিমা চোখ বড় বড় করে আছে। সাফাত চোখ বন্ধ করে নিজের কাজে ব্যস্ত।
সাফাতের এমন মায়াময় মুখ দেখে লিমার ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। সাফাত কে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়।

সাফাত বেশ সময় পর লিমা কে কোলে করে বিছানায় নিয়ে যায়। দুজন এই দুনিয়ার বাহিরের জগতে বিসাফাত করছে। দুনিয়ার কোনো খেয়াল এখন আর কাজ করছে না তাদের মাঝে। তারা তো দুজন দুজনের ঘোরে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। লিমা কে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে সাফাত নিজের সাদা শার্ট গা থেকে সরিয়ে শরীর উন্মুক্ত করে নেয়। লিমার দিকে অগ্রসর হয়। লিমার দুই ঠোঁটের মধ্যখানে নিজের ঠোঁট জায়গা দেয়। লিমার হাতের মাঝে নিজের হাত রাখে। আঙ্গুলের মাঝে মাঝে আঙ্গুল দিয়ে হাতে হাত জড়িয়ে নেয়।

লিমার গলায় নিজের মুখ ডুবায়। ক্রমশ লিমার সারা অঙ্গে নিজেকে স্থাপন করে নেয় সাফাত। লিমা কে আজ পরিপূর্ণ এক অন্যরকম ভালোবাসার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সাফাত।
লিমা কে নিয়ে ভালোবাসার চূড়ান্ত পর্যায় উপনীত হতে লাগে সাফাত। ভালোবাসার অতল সাগের লিমা কে নিয়ে সাফাত ডুবে যাচ্ছে।

লিমাও যেন পরম সুখে সাফাতের উন্মুক্ত পিঠ নখ দিয়ে আঁকড়ে ধরছে। সুখের এক ভিন্নরকম ঠিকানায় দুজন পারি দেয়।
সকালের সোনালি রোদ যখন লিমার চোখ স্পর্শ করে লিমা তখন মিটমিটিয়ে উঠে।

সামনেই তাকিয়ে দেখে ধবধবে সাদা শরীরের অধিকারী সাফাত তাকে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে আছে। গায়ে নেই কোনো সুতা। উন্মুক্ত বুকের দিকে লিমা তাকিয়ে ঘনঘন চোখের পাতা নাড়ছে। সাফাতের চুল গুলি কপালে এসে পড়ছে। চিকন জাম কালো ঠোঁটের মাঝে কি সাফাত্যের শান্তির আভাস।
লিমা কে আকঁড়ে শুয়ে আছে। সাফাত কে এমন অবস্থায় দেখে লিমার বুকের ভেতর ধুকবুক শুয়ে হয়ে যায়।

টুক করে সাফাতের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট বুলিয়ে দেয়। সাফাত একটু নড়েচড়ে উঠলে তাড়াতাড়ি করে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ে লিমা। সাফাত আরো শক্তে নিজের বাহুডোরে তুলে নেয় লিমা কে।
লিমা আস্তে আস্তে খেয়াল করল তার শরীর ঠিক নেই। মুহূর্তে সব মনে পরতে লাগল তার।

নিজের মাথায় নিজেই একটা চর দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,
“ইসস কি করলাম আমি? কি হয়ে গিয়ে ছিল আমায়? আল্লাহ। তাড়াতাড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নিতে হবে। না হলে ডেভিল রাক্ষস আবার না জানি কি করে বসে।”
লিমা উঠতে গেলে সাফাত তাকে টেনে আবার শুয়িয়ে দেয়।

লিমা শুকনো ডুক গিলে চোখ বন্ধ করে নেয়। সাফাত মিটমিট করে তাকিয়ে লিমা কে দেখে একটা মুচকি হাসি মারে।
সামনের চুল গুলি কানের পাশে গুঁজে দিয়ে মুচকি হাসি হাসতে থাকে। লিমার লাল ঠোঁটে আলতো করে একটা কিস দেয়। লিমা সাথে সাথে চোখ খুলে তাকায় সাফাতের দিকে।
সাফাত এক গালে জগৎ জয়ের একটা হাসি দেয়।
লিমা সাফাত কে ঠেলে দিয়ে চাদর জড়িয়ে নেয় শরীরে। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।

“একদম আমার কাছে আসবেন না আপনি।”
লিমার কথায় সাফাত জবাব না দিয়ে অন্য দিকে ফিরে মুচকি হাসতে লাগে।
লিমা কিছু না বলে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়।
“ওয়েট। ফ্রেশ হয়ে এসে পড়বে টা কি? নাকি আমার মাথা আরো বিগড়ে দেওয়ার চিন্তায় আছো?”

সাফাত কথাটা শেষ করে জোরে হাসি দেয়।
লিমা ভ্রু ঠোঁট কুঁচকে সাফাতের দিকে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও বলে না। ভাবতে থাকে “আসলেই তো আমি বাসা থেকে কিছুই আনি নি পড়ব টা কি? এখন কি.. ছিঃ ছিঃ।”
লিমার এমন মুখ দেখে সাফাতের খুব হাসি পায়।

মুখে দুই আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট টিপে টিপে হাসতে থাকে।
লিমা মন খারাপ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

“আলমারি তে দেখো এক সাইডে তোমার যা যা লাগার সব আছে। ওখান থেকে যেটা মন চায় সেটা নিয়ে ওয়াশরুমে যাও।”
সাফাতের কথায় লিমার বেশ অবাক লাগে। লোক টা নজর কেমন। সব দিকে নজর রাখে গ্যাংস্টার টা। হয়তো কাল কেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। এই সব তো সাফাত চৌধুরীর কোনো ব্যপারই না।
লিমা আলমারি থেকে তাড়াতাড়ি হাতের সামনে যা পেয়েছে তা নিয়েই ওয়াশরুমে দৌড়।

লিমার এমন দৌড় দেখে সাফাতের খুব হাসি পায়। খুব করে হাসেও।
লিমা কালো একটা শাড়ী পড়ে বের হয়েছে। সাথে লাল গোলাপির একটা ব্লাউজ। লম্বা চুল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সাদা মুখ টা বেশ শুভ্র লাগছে।
লিমা সামনে এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দেয়। কাঁচের ও পাশ থেকে সাফাতের লাগানো সবুজ এত বড় বড় গাছ দেখা যাচ্ছে। শুধু সবুজ আর সবুজ। রোদের দেখা দিচ্ছে। লিমা এমন দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেয়। তারপর চুলের টুপটুপ করে পানি টাওয়াল দিয়ে মুচতে থাকে।

সাফাতের চোখ যেন লিমার দিকেই আটকে আছে। শাড়ী তে লিমা কে বেশ লাগছে।
মোহ ভরা চোখ নিয়ে সাফাত বিছানা ছাড়ে।
লিমার পেছনে হাত পেঁচিয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। ভেজা চুলে মুখ ডুবায়। সাফাতের ছুঁয়ায় লিমা শিউরে উঠছে। শরীর কেঁপে জ্বর আসলে যেমন হয় তারো তেমনি হচ্ছে। উষ্ণ রক্ত যেন আরো গরম হতে থাকে।
সাফাত কে কোনো রকম ছাড়িয়ে লিমা চলে যেতে নিলে সাফাত সেখানেই দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে আটকায়। হেঁচকা টানে নিজের বুকের উপর আনে।

সাফাতের উন্মুক্ত বুকের দিকে লিমা ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে।
সাফাত বুঝতে পেরে মুচকি হাসে। সাফাত সামনের চুল গুলি লিমার কানের পাশে গুঁজে দিয়ে লিমার দিকে মুখ বাড়ালে লিমার হুশ ফিরে। সাফাতের হাতের ফাঁক দিয়ে লিমা নিচে বসে পড়ে। যার ফলে সাফাতের আশা বিফলে যায়। চোখ মেলে লিমা কে না দেখতে পেয়ে সামনে তাকায়।

লিমা তার থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে চুল মুচ্ছে। সাফাত আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে এলে সে পেছনে যেতে থাকে।
যেতে যেতে একদম ধপ করে লিমা সিঙ্গেল সোফায় বসে পড়ে। সাফাত সোফার হাতলে হাত দিয়ে তার দিকে ঝুঁকে যায়। লিমা ভয়ে শুষ্ক ঢুক নেয়। চোখ মিট মিট করে।

সাফাত বেশ কিছু সময় এই ভাবেই লিমা কে দেখে।
“ভয় পেলে না তোমায় দারুণ লাগে। লাল লাল গাল লাল ঠোঁট আরো যেন রঙ্গিম হয়ে যায়। বিশেষ করে নাক টা যেন টুকটুকে গোলাপ ফুল হয়ে উঠে। আর চোখ মিটমিট করা ঘন চোখের পাতা ফেলা জাস্ট মনোমুগ্ধকর লাগে।”
সাফাত লিমার দিকে আরো ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
“এই যে বুকের বা পাশ টা দেখছো এখানে রক্ত টগবগ টগবগ করে। তোলপাড় শুরু হয়ে যায় তোমার ওমন রূপ দেখলে। ইচ্ছে করে মনে গহীনে ডুকিয়ে রাখি তোমায়। ভিন্ন দেশে চলে যেতে ইচ্ছে হয় তখন।”
সাফাত এটা বলেই মুচকি হাসি দেয়।

তারপর লিমার হাত থেকে টাওয়াল টা ছু মেরে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়।
ওয়াশরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ঠোঁটের ইশারায় কিস দেয়। আবার মুচকি হেসে ভেতরে চলে যায়।
লিমা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ঘনঘন চোখের পাঁপড়ি ফেলে।


“পিচ্চি পাকনামি করতে হবে না। চুপচাপ থাকবে। আমি ব্রেকফাস্ট করে দিয়ে গেলাম। খেয়ে নিবে। আর একটু পর আমেনা আন্টি আসবে যা খাবে বলে দিবে উনি তোমায় রান্না করবে দিবে। অসুবিধা হলে জানাবে আমায়। সাবধানে থেকো আসছি।”
সাফাত কথা গুলি শেষ করে লিমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে লিমার মাথা একটু হেলিয়ে দেয়।

সাফাত মুচকি হেসে লিমার ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেয়। কপালে চুমু দিয়ে সাফাত সোজা লিমার ঠোঁটে চুম্বন করে বসে।
লিমা বেচারা চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে।
সাফাত উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে। তারপর চলে যায়।

“ডেভিল রাক্ষস এমন কেন? উনি আস্তো পঁচা। না হলে আমায় এমন ভাবে ঠকাতে পারল? কি করে করল এমন টা? আরেক টা বিয়ে করে দিব্যি আমায় বিয়ে করে নিল। তাহলে ওই মেয়ে টার জীবন কেন নষ্ট করল? না বিষয়টা একটু দেখতে হবে।”

লিমা নিচের দিকে যায়। বড় টেবিলের উপর খাবার দেখতে পায়। তাড়াতাড়ি করে সেখানে বসে গপগপ করে খাবার খেতে থাকে।
সাফাত লিমার এমন খাওয়ার ভাব দেখে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
তার বাসা পুরো টা সিসি ক্যামেরায় আবদ্ধ। লিমা কে দেখছে আর মুচকি হাসছে সাফাত।

একটু পর আমেনা চলে এলো। লিমা কে দেখে তো তিনি অবাক।
“মা তুমি?”
“আ আপনি?”
“সাফাত বাবা আমার কথা কিছু বলেনি তোমায়?”

লিমা মনে মনে ভাবে এটাই হয়তো আমেনা আন্টি।
“আপনি আন্টি না?”
“হ্যাঁ মা সাফাত বাবা আমায় আমেনা আন্টি বলেই ডাকে।”
“ও।”
“হুম। নাস্তা করেছো?”

“জ্বি।”
“আরো কিছু খাবে?”
“না আন্টি আমার লাগলে আমি বলে দিব।”
“ঠিক আছে।”

আমেনা আন্টি ভেতরে গেলে। লিমা বসে বসে টিভি তে কার্টুন দেখছে।
হঠাৎ তার মনে হলে আমেনা আন্টি কে জিজ্ঞাস করলে অনেক কিছু পাওয়া যাবে। তাই তাড়াতাড়ি সে রান্নাঘরে যায়।
“আন্টি আন্টি।”
“হ্যাঁ মা কিছু লাগবে?”

“না। আচ্ছা আন্টি আপনি এখানে আছেন কত দিন?”
“অনেক বছর সেই সাফাত বাবা ছোটকাল থেকেই আছি।”
“তাহলে আপনি অনেক কিছুই জানবেন উনার সম্পর্কে।”

“….
“না মানে আচ্ছা বাদ দিন। আন্টি উনার কি আগে বিয়ে হয়েছিল?”
“কি বলো এই সব তুমি? সাফাত বাবা তোমায় খুব ভালোবাসে। অন্য বড়লোক ছেলেদের মতো সাফাত বাবা আজ পর্যন্ত তুমি ছাড়া কাউকেই বাসায় আনেনি।”
“….

“কি ভাবছো তুমি?”
“ন না আন্টি কিছু না।”
লিমা তাড়াতাড়ি করে সেখান থেকে চলে আসল।
মনে মনে বলতে থাকে,

“তাহলে? উনি কি সত্যিই বিয়ে করে নি? নাকি আন্টি জানে না? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কি হচ্ছে এই সব? সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে আমার।”
লিমা ভাবতে ভাবতে সকাল পার করে দুপুর গড়িয়ে দিল।
কলিংবেল বাজচ্ছে আমেনা রান্নাঘরে। তাই লিমা ভাবতে ভাবতে গিয়ে দরজা খুলে দিল। সামনে তাকিয়ে দেখে সাফাত হাতে এত্তগুলি আইসক্রিম নিয়ে এসেছে।
সাফাত কে পাত্তা না দিয়ে লিমা এক লাফ দিয়ে সেই গুলি নিয়ে সোফার দিকে দৌড়ে যায়।

সাফাত ঠোঁট উল্টিয়ে হেসে দরজা লক করে বাসার ভেতরে যায়।
লিমা কিছু না বলে বা না ভেবেই আইসক্রিম খাওয়া শুরু করে। পাশে বসে সাফাত গালে হাত দিয়ে হা করে দেখছে।
লিমার সেই দিকে কোনো নজর নেই। সে বাচ্চাদের মতো আইসক্রিম খাওয়াতেই ব্যস্ত।

তার সামনে যে একজন সুদর্শনে পুরুষ যে কি না তার হাজবেন্ট। সে বসে আছে তাকে দেখছে সে দিকে তার নেই ভ্রুক্ষেপ। সব সময় সে যেভাবে আইসক্রিম খায় সেই ভাবে খাচ্ছে।
সাফাত হঠাৎ লিমার ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে মুখ এগিয়ে আনে।
ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা আইসক্রিম টা সে জিহ্ব দিয়েই চুষে নেয়। তারপর লিমা কে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
লিমা শুকনো ঢুক গিলে। লজ্জায় আইসক্রিম গুলি নিয়ে সেখান থেকে উঠতে গেলে সাফাত তার হাত ধরে বসিয়ে দেয়।

লিমা সাফাত কে পিছন করে বসে। সাফাত লিমার সামনে গিয়ে বসে তাকে দেখছে।
লিমা আবার উল্টো হলে সাফাত তার সামনে যাচ্ছে। তিন চার বার এমন করার পর সাফাত নিজের এক হাত দিয়ে লিমা কে টেনে তার গায়ের সাথে মিশিয়ে বসায়।
“চুপ করে খাও।”
লিমা কিছু না বলেই খাওয়া নিয়ে পড়ে যায়।

“তুমি কি ভরাসিয়াস। কি পেটুক। আমি সামনে আছি তবুও আমাকে বলছো না “
সাফাত অন্য দিকে মুখ গুরায়। লিমা তার দিকে তাকায়।
“আপনি খাবেন?”
“….

সাফাত আড় চোখে তাকে দেখছে লিমা অন্য একটা আইসক্রিম নিতে গেলে সাফাত তার হাতে থাকে মুখ লাগানো আইসক্রিম নিয়ে নেয়।
তারপর লিমার ঠোঁট লাগানো সেই আইসক্রিম খাওয়ায় মেতে উঠে।
দুজন এক সাথে বসে সব গুলি আইসক্রিম খেয়ে নেয়।
সাফাত লিমার দিকে তাকালে দেখে লিমা চোখ বন্ধ করে নিজের আঙ্গুল চুষছে।

সাফাত লিমার দিকে এগিয়ে গিয়ে পুনর্বার লিমার ঠোঁটে লেগে থাকা আইসক্রিম খেয়ে নেয়। মিটমিট করে হেসে সাফাত উপরের দিকে চলে।
লিমা ব্যালকুনিতে দাঁড়িয়ে বাহিরের আবহাওয়া দেখছিল।
সাফাত গিয়ে তাকে কোলে তুলে নেয়।

লিমা হাত পা ছুড়াছুড়ি করছে। আর ভাবছে না জানি সাফাত কি করে বসে এখন।
সাফাত তাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিজে বসে। ট্রে থেকে প্লেট টেনে লিমার মুখের সামনে খাবার ধরে।
“হা করে।”
“….

“কি হলো? হা করো।”
আগের কথা মনে করে লিমা মুখ গোমরা করে অন্য দিকে মুখ ফিরায়।
“না খাবো না আমি।”
“খাবে না?”
“না।”
“না তো?”
“নাআআ।”

সাফাত সুযোগ বুঝে লিমার মুখে খাবার তুলে দেয়।
খাবার মুখে নিয়েই অস্পষ্ট সুরে লিমা বলে,

“আমি বললাম না..”
“শুহহ একটাও কথা নয়। চুপ করে খেয়ে নাও।”
অজ্ঞাত লিমা চুপ করে সাফাতের হাতে খেয়ে নেয়। পানি খায়িয়ে দিয়ে সাফাত মুখ মুছে দেয় তার।

ট্রে নিয়ে যাওয়ার আগে একটু ঝুঁকে লিমার কপালে ভালেবাসার পরশ দিয়ে চলে যায়। লিমা অবাক হয়ে সাফাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে,

“আমি কোনো ভুল ধারণা নিচ্ছি না তো? মানুষ টা কে আমি কষ্ট দিচ্ছি না তো? সত্যিই কি এই ভালোবাসার মাঝে কোনো খাঁদ থাকতে পাড়ে? সত্যিই উনি আমার সাথে এমন করতে পাড়ে কি?”


পর্ব ১১

রাতে ঘুমানোর আগে লিমার খুব অস্বস্তি ফিল করছিল। অস্থিরতার জন্যে শুতে যেতেও ভালো লাগছিল না।
অবশেষে বুকের হাজার প্রশ্ন আর অস্থিরতা নিয়ে সে ব্যালকুনিতে চলে যায়। রাতের ঘন কালো নিস্তব্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে খেলা করছিল সে।
সাফাত পেছন থেকে তার কানো এসে ফোন রাখে। আস্তে করে বলে,

“আঙ্কেল কথা বলো।”
লিমা একবার সাফাতের দিকে তাকিয়ে ফোন নেয়। বাবা সাথে খুব কথা বলে। তারপর মায়ের সাথে কথা বলে মন টা তার একটু হাল্কা হয়।
কথা শেষ করে পাশ ফিরলে সাফাত কে দেখে না।
ফোনের স্কিনে নজর দিলে দেখে লক পেপারে তার একটা ছবি। এটা সেই ছবি যেদিন সে বাচ্চাদের নিয়ে খেলা করছিল পার্কে। হয়তো সাফাত লুকিয়ে ছবি তুলেছিল।
লিমা তার নিজের ছবির দিকেই তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে। সাফাত কে নিয়ে খুব করে ভাবছে সে।
সাফাত তার হাত থেকে ফোন টা নিয়ে বিছানাট উপর ছুঁড়ে মারে।

লিমার হাত ধরে টেনে ব্যালকুনির ডিভানে বসে। নিজের কোলে লিমা কে বসায়। লিমা উঠে যেতে চাইলেও সাফাত তার কোমর পেঁচিয়ে রাখে। তাই চাইলে আর উঠা হয়ে উঠে না তার।
এক কাপ কফি তে সাফাত নিজের ঠোঁট ডুবায়। লিমা কেও কয়েক বার খাওয়ায়।
সাফাত লিমা এই এক কাপ কফিই শেয়ার করছে দুজন মিলে।
“কফির স্বাদ টা তেঁতো হয়ে যাবে যদি ওই তোমার মিষ্টত্বের ছুঁয়া না পায়।”

কথাটা বলেই সাফাত লিমার ঠোঁটে নিজেকে উৎসর্গ করে।
লিমাও কেন যেন সাফাতের এমন আচরণের প্রতিউত্তর দেয়। যার ফলে মুহূর্তে পরিবেশ টা মধুময় হয়ে উঠে।
লিমা সাফাত কে ঝাপটে ধরে।

সাফাত মুচকি হেসে তাকে কোলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়।
ভালোবাসার আরেকটা রাত দুজনে মিলে পারি দেয়। গভীর ভালোবাসায় মেতে উঠে দুজনে।

সকালে লিমা তাকিয়ে দেখে সাফাত তার বুকে মাথা রেখে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। লিমার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি আসে।
সাফাত একটু নড়েচড়ে উঠলে লিমা আগের মতো চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে।

সাফাত চোখ ডলে লিমার দিকে তাকায়। মুচকি হেসে লিমার চুল গুলি কানের পাশে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করে। মাথা এগিয়ে দিয়ে লিমার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। ফিসফিসিয়ে বলে,
“প্রেয়সী কে যে খুব ভালোবাসি।”
সাফাত তারপর উঠে যায়। ওয়াশরুমে গেলে লিমা চোখ খুলে তাকায়। খুশিতে তার কান্না চলে আসে।
“মানুষ টা তাকে এতটা ভালেবাসে। এত কেয়ার নেয়। যেন বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখলে তিনি স্বস্তি পায়। সেই মানুষটা কে কি করে অবিশ্বাস করছি? এটা কি সন্দেহ? কেন একজনের কিছু কে বিশ্বাস করে নিজের ভালোবাসা কে দূরে রাখছি আমি? খুব ভুল করছি কি আমি?”

লিমা নিজের মনে মনে কথা গুলি বিড়বিড় করছিল।
মনে মনে সে ভেবেই নিয়েছে সাফাতের সাথে এই বিষয়ে সে কথা বলবে।
সাফাত ওয়াশরুম থেকে এসে চুপচাপ রেডি হতে থাকে অফিস যেতে হবে তার।

লিমা সেই আগের মতো বিছানায় বসে আছে। গায়ের উপর চাদর টেনে মুখ গম্ভীর করে বসে আছে। লিমার মুখের ভাব আর চুপ থাকা দেখে সাফাত বলল,
“বাচাল পরী চুপ কেন?”
“…..
“রেডি থেকো মিটিং টা শেষ করে তোমায় আঙ্কেল আন্টির কাছে নিয়ে যাবো।”
“আপনার সাথে আমার কথা আছে।”

“বলে ফেলো কি কথা। কথা আছে তবে চুপ কেন প্রেয়সী?”
“আপনি আগে আরেকটা বিয়ে করেছেন?”

ততক্ষণ পর্যন্ত সাফাত রেডি হচ্ছিল কিন্তু লিমার কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়।
লিমার চোখ সাফাতে আবদ্ধ আর সাফাতের চোখ লিমা তে আসক্ত।

সাফাত প্রায় ১ মিনিট লিমার দিকে তাকিয়ে ছিল। লিমা চোখ বড়বড় করে কৌতূহলী চোখ নিয়ে সাফাতের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু সাফাত তাকে অবাক করে দিয়ে আবার নিজের মতো রেডি হওয়া নিয়ে ব্যস্ত।
“কি হলো বলুন? আমার কথার জবাব দিন।”
সাফাত হাতে ঘড়ি লাগাতে লাগে। আর বলল,
“লেইট হয়ে যাচ্ছে আসছি। যা বললাম তাই করো রেডি হয়ে থেকো।”

গাড়ির চাবি টা নিয়ে সাফাত সুসু করে বের হয়ে গেল। লিমা চোখের পানি ফেলতে থাকে। কান্না করতে করতে বলে,

“আমি জানতাম আপনি বিয়ে করেছেন। তাই চুপ ছিলেন। আপনি যদি বিয়ে না করতেন তাহলে তো আমায় বলেই দিতেন সোজা সাপ্টা কথা। আপনি একটা ঠকবাজ। আমি আপনার সাথে আর থাকব না। আব্বুর কাছে গেলে আমি আর আসব না। আমার জীবন নিয়ে আপনি ছিনিমিনি মিছে খেলা পেয়েছেন? আপনার মতো রাক্ষস কে আমি আর ভয় পাবো না। আপনি গ্যাংস্টার আছেন আপনার গ্যাং এ আমার কাছে নয়। আমি, আমি আপনাকে ডি ডিভোর্স দিব। আমার লাইফ চোরাবালি হয়ে গেল।”

লিমা মাথায় হাত দিয়ে জোরে জোরে কান্না করছে আর নিজের সাথে বিড়বিড় করছে।

সাফাত মিটিং শেষ করে ১২ টা ২০ এ বাসায় চলে আসে।
রুমে গিয়ে দেখে লিমা কান্না করছে।
“তোমায় কি বলেছিলাম আমি?”
“…..
“কি হলো লিমা?”

“আপনি আপনার লাইফ টা খেয়ে ফেলেছেন আপনি একটা রাক্ষস।”
লিমার কথা শুনে সাফাত বিশম খেয়ে যায়। শুকনো কাশতে থাকে। লিমার কাছে গিয়ে তার পাশে বসে,
“মানুষের লাইফ কি খাওয়া যায়?”
“হ্যাঁ আপনি আমার লাইফ খেয়েছেন।”
সাফাত শুষ্ক ঢুক গিলে শান্ত কন্ঠে বলে,

“কি ভাবে বলো আমায়?”
“আপনি আগে একটা বিয়ে করেছেন তাকে ঠকিয়ে আপনি আবার আমায় ঠকিয়ে বিয়ে করেছেন। আপনি একটা ঠকবাজ বাটপার।”
লিমার কথা শুনে সাফাত শান্ত থাকতে পারল না। রেগে গিয়ে লিমা কে ধমক দিল।

“শাট আপ ডেমেট। স্টপ দিজ ননসেন্স। চুপ কান্না থামাও।”
লিমা এবার ভ্যা ভ্যা করে হাতা পা ছুড়াছুড়ি করে কান্না করছে। তাকে একটা বাচ্চার মতো লাগছে।
সাফাত ধমক দেয় তো লিমা তার কান্নার জোর বাড়িয়ে দেয়।
সাফাত উপায় না পেয়ে লিমা কে কোলে তুলে নেয়। তারপর নিচে যেতে থাকে।

লিমা হাত পা নাচাতে নাচাতে,
“এই #গ্যাংস্টার কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”
“….
“আ আপনি আমায় মেরে ফেলতে নিয়ে যাচ্ছেন তাই না? আপনার গোপন কথা জেনে গিয়েছি বলে। আপনি ডেভিল জামাইয়ের মতো আমায় মেরে ফেলতে চাইছেন।”
“জাস্ট শাট আপ ননসেন্স। এখন সত্যিই মার খাবে যদি কান্না না থামাও।”

“আল্লাহ আল্লাহ আমায় বাঁচাও তুমি। এই রাক্ষসের কাছ থেকে..”
লিমার এই আবিল্লি পেঁচাল সাফাতের অসহ্য লাগছিল। লিমা কে কোলে নিয়ে থেমে যায় সে। না পেরে বলল,
“লিমা প্লিজ চুপ করো। তোমাকে তোমার বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। প্লিজ স্টপ দিজ।”

“ওও এখন আমার লাইফ টা খেয়ে আপনি আপনার আগের বউ কে নিয়ে আসবেন তাই না? আমি বুঝি না ভেবেছেন? আমি সব জানি। ওকে আসেন নিয়ে আসেন আপনার ডাইনি বউ কে। থাকব না আমি আপনার কাছে। আমি আপনাকে ডিভোর্স দিব।”
লিমার কথায় সাফাত পাত্তা না দিয়ে আবার নিজের মতো করে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

..
লিমার বাসায় গাড়ি থামে। সাফাত গিয়ে দরজা খুলে দিলে লিমা সেখান থেকে বের হয়ে আসে।

সাফাত পেছনের সিট থেকে মিষ্টি ফল যা যা এনেছে সব নিয়ে ভেতরে যায়। লিমাও যায় সাফাতের পিছুপিছু। যেন ও পথদ্রষ্টা।
লিমা কে দেখে তার বাবা মা খুব খুশি হয়। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। সাফাত সোফায় বসে আছে। লিমা মুখ ফুলিয়ে নিজের রুমে চলে গিয়েছে। লিমার মা সাফাত কে নাস্তা দেয়।
সাফাত অল্প কিছু খেয়ে বসে শ্বশুরের সাথে আড্ডা দেয়। তারপর শাশুড়ির কথায় লিমার রুমে যায়।

লিমা আয়নার সামনে বসে বসে কান্না করছিল।
“কিভাবে কান্না করো তা বুঝি আয়নার সামনে বসে বসে দেখছো?”
সাফাতের কথায় লিমা তার দিকে তাকায়।
“তবে জানো তো। কান্না করলে তোমায় পেঁচার মতো লাগে। যেন কোনো এক রামপেঁচা।”

সাফাতের কথায় এভার লিমার শরীর জ্বলে যায়। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমি এখন পেঁচা হয়ে গেলাম তাই না? জানি তো। এখন আমায় ভালো লাগে না। আপনি তো ঠকবাজ। একজন কে বিয়ে করে ঠকিয়েছন, তারপর আমায় ঠকিয়ে বিয়ে করেছেন। আপনি এখন আবার ওকে ঘরে আনবেন নাকি আরেকজনকে নিয়ে আসবে ঠকিয়ে?”
লিমা ততক্ষণে সাফাতের সামনে এসে তার কলার চেঁপে ধরে।

“হোয়াট রাবিশ? হোয়াট আর ইউ ডোয়িং ননসেন্স? জাস্ট স্টপ ইট। ডেমেট স্টপ দিজ।”
সাফাত লিমার হাত ছাড়ায়। একটু দূরে গিয়ে ভেতরের নিশ্বাস ছেড়ে দেয়। লিমা দাঁড়িয়ে এখন আরো বেগে কান্না করে।
“আপনি তাহলে সত্যিই এমন করেছে? তা না হলে..”

লিমার কথা থামিয়ে সাফাত নিজেই বলল,
“কাজ আছে আমার। পরে দেখা হবে। টেইক কেয়ার প্রেয়সী।”
ব্যাস এইটুক বলেই সাফাত ঘর থেকে বের হয়ে যায়। পিছন ফিরে আর একবারও তাকিয়ে লিমাকে দেখে না। লিমা এই ব্যবহার পেয়ে তার কলিজাটা চিঁড়ে যায়। সেখানে বসেই পড়ে কান্নারত অবস্থায়। বুক ডুকরে কান্না করছে সে।
রাত তখন কয়টা বাজে লিমার খেয়াল নেই। ঘুম টা তার হাল্কা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ একজন তার উপর ঝুঁকে আছে।
লিমা চোখ মিটমিট করে তাকায়। হ্যাঁ সাফাত নেশা ভরা চোখ নিয়ে তার উপর ঝুঁকে আছে। দুই হাত তার দুই পাশে রেখে অপলক দেখছে তাকে।
সাফাত না চলে গিয়েছিল? কখন এলো আবার? লিমা চোখ ঢলে আবার তার দিকে তাকায়।

সাফাত তো আগের মতোই তার দিকে মাতাল করা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে।
লিমা উঠে বসতে চাইলে সাফাত তাকে মানা করে। তারপর নিজেই লিমা কে কোলে তুলে নিয়ে ব্যালকুনিতে চলে যায়।

লিমা আশপাশ দেখে আরো অবাক হয়। কারণ এটা সাফাতের বাসা। তারা তো ও বাড়ি ছিল। তাহলে এখন এখানে এলো কি করে? সে তো ঘুমিয়ে ছিল তাহলে? লিমা কিছুই বুঝতে পারছে না। তারা কি চলে এসেছে? নাকি ও বাড়িই যায় নি? সব কিছু লিমা কি স্বপ্নে দেখেছিল? লিমার মাথা হ্যাংক হয়ে আসছে। এই গ্যাংস্টারের কিছুই লিমা বুঝে উঠতে পারে না। হয়তো তার বুঝার শক্তিও নেই পুরো গ্যাংস্টার টা কে।
“আমরা না..”
“চলে এসেছি।”

“ম মানে..”
“তখন দরকার ছিল তাই গিয়েছি। পরে আবার রাতে গিয়ে আন্টি আঙ্কেল কে বলে তোমায় নিয়ে এলাম এখানে।”
“কিন্তু আমি তো ঘুমে ছিলাম তাহলে কি ভাবে এল..”
“এখানে যেভাবে আছেন মহারানী সেভাবে নিয়ে এসছি আপনায়।”
“মানে আপনি আমায় আম্মু আব্বুর সামনে?”

“ইয়েস আমি আপনাকে আপনার পিতা মাতার সামনে দিয়েই আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে কোলে তুলে নিয়ে এসেছি।”
“ইউ..”
লিমা সাফাত কে এলোপাথাড়ি কিল চর দিতে থাকে। সাফাত হেসে হেসে লিমা কে নিজের কোল থেকে নামায়।
লিমা কে শান্ত করতে নিজের শক্ত বাহুডোরে জড়িয়ে নেয়।

ক্ষণিকের মাঝে লিমা শান্ত হয়ে যায়। হাত পা নাড়ানাড়ি করা বন্ধ করে দেয়।
লিমা কে নিজের বাহুডোরে জোড়ালো ভাবে আবদ্ধ করে নেয়। শান্ত কন্ঠে লিমা কে প্রশ্ন করে,
“আমার বিরুদ্ধে তোমার কি কি অভিযোগ আছে তা ব্যক্ত করো।”
“….

“প্লিজ টেল মি।”
লিমা কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার কি সব কিছু বলা উচিৎ? কেন নয়? যেখানে সাফাত নিজেই তার সম্পর্কের অভিযোগ গুলির কথা শুনতে চেয়েছে। অবশ্যই বলা উচিৎ তার।
লিমা কাঁদোকাঁদো ভাবে সাফাতের বুক থেকে সরে এলো। সাফাতের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়।
ঠোঁট উল্টিয়ে কান্না করে বলে,
“আপনি আমার আগেও একটা বিয়ে করেছেন। তাকে ঠকিয়েন।”
“তা এটা আপনায় কে বলল শুনি একটু।”

“আমি জানি। আপনি..”
“কানের নিচে একটা দিব। যা বললাম তার উত্তর দাও।”
সাফাতের ধমকে এবার লিমা জোরে কান্না করে দেয়।
সাফাত বেচারার মাথায় হাত। লিমা কে সামলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

গালের দুই পাশে হাত রেখে শান্ত হয়ে বলে,
“তুমি না আমার জানপাখি। আমার কলিজা। বলো তোমায় কে বলল।”
“যেদিন আপনি বিদেশ থেকে ফিরবেন বলে আমায় কল করে জানিয়েছেন। সেদিন আমার ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। আমায় বলা হয় আমি যেন আমাদের বাসার সামনের ক্যাফেতে যাই। না হলে পরে পস্তাতে হবে। আগ্রহ নিয়ে বোরকা পরে গেলাম সেখানে। সেখানে এক মহিলা আমার জন্যে বসে ছিল।
আপনার সম্পর্কে অনেক কথা বলে আমায়। সব মিলে গিয়েছিল। আপনি নাকি তাকে বিয়ে করেছেন, তার সাথে ১/২ মাস সংসার করছেন। আরো কত কি। আমি বিশ্বাস করছিলাম না বলে আপনাদের বিয়ের পেপার দেখায় আমার। আর তা দেখেই বিশ্বাস করি। আর আপনাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করি।
আপনায় আমি মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসি। আপনাকে নিয়েই আমি বিয়ের স্বপ্ন দেখতাম। সেই আপনি আমায় ঠকালেন।”
এই বলে লিমা আরো জোরে জোরে কান্না করা শুরু করে দেয়।
সাফাত তাকে শান্ত ভাবে বলে,

“হায় আল্লাহ এত বোকা তুমি? আসলেই তুমি বোকার ডিম একটা। ওটা বিশ্বাস করে আমার সাথে এমন করছো তুমি? ওই কাগজ তুমি বিশ্বাস করে নিলে লিমা?”
লিমা নাক টেনে জবাব দেয়,
“তো? নিজের চোখ কে কি করে অবিশ্বাস করব?”

সাফাত নিজের প্যান্টের প্যাকেট থেকে একটা পেপার বের করে লিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“এই সেই পেপার তো?”
লিমা চোখ মুছে সেই পেপার হাতে নেয়। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে বলে,
“হ্যাঁ এটাই তো সেই পেপার। আপনার সাইনও আছে আর ওই মেয়েটারও।”
“হায়রে বুদ্ধু। এটা আমার নকল করা সাইন।”
“কি?”
“জ্বি। তুমি ছাড়া আমার দুনিয়াতে কেউ নেই তা আমার শত্রু শাহিন জেনে যায়।”
লিমার গালের হাতে হাত রেখে সাফাত আবার বলে,
“তুমি যে আমার লিটল এঞ্জেল। আমার কলিজা আমার সব টা দুনিয়া তা শাহিন জেল থেকে এসে জানে। আমার উইক পারসোন তুমি তাই তোমাকে তার খেলার গুটি হিসেবে নিয়ে আমায় শেষ করতে চেয়েছে। ‘অদম্য মানুষকে দমন করতে হয় তাদের উইক পারসোন দিয়ে। ‘ শাহিনও সেই পথ বেঁচে নিয়েছে।

তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে আমায় আঘাত করতে চেয়েছে। ভেবেছে তুমি চলে গেলে আমি দুর্বল হয়ে যাবো। সহজে তার পথ থেকে আমায় সরিয়ে দিতে পারবে। তাই তার গালফ্রেন্ড কে দিয়ে এমন একটা নাটক সাজিয়েছে আমার নকল করা সাইন দিয়ে যেন তুমি আমার থেকে দূরে চলে যাও। ও কিন্তু ওর চালে সফল হয়ে যেত। যদি না আমি এমন কিছু একটা আঁচ করে বিয়ে টা না করতাম। আমি জানি বিয়ে ছাড়া তোমার রাগ আমি ভাঙ্গাতে পারতাম না। কারণ তাহলে তোমার গভীরে প্রবেশ করতে হতো আমায়। যা বিয়ের আগে যিনা হতো। তাই সিদ্ধান্ত নেই বিয়ে করি আর শাহিনের প্লেনে পানি ঢেলে দেই।”
লিমা ফ্যালফ্যাল করে সাফাতের দিকে তাকিয়ে আছে। লোক টা বলছে কি?

“বিশ্বাস হচ্ছে না তো? জানি হবে না। জাস্ট এ মিনিট।”
সাফাত নিজের ল্যাপটপ অন করে। কানে ইয়ারফোন নিয়ে বলে,
“ভিডিও অন কর “
সাথে সাথে ল্যাপটপের স্কিনে ভিডিও অন হয়ে যায়।
সেখানে তারি নামের মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে। যে কি না লিমা কে বলেছিল তার সাথে সাফাতের বিয়ে হয়েছে।
লিমা চোখ মুছে অস্পষ্ট কন্ঠে বলে,
“এটা তো ওই মেয়েটা।”

“তোমার যা জিজ্ঞেস করার করো ওকে।”
“….
লিমা চুপ থেকে কিছু বলার আগে মেয়ে টা বলল,
“প্লিজ আমায় ছেড়ে দিতে বলো লিমা। আমার কোনো দোষ নেই আমি তো শাহিনের কথায় এমন করেছি। ওকে তো নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। তাই এমন করেছি। ও যা বলেছে তাই করেছি। সাফাত চৌধুরীর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। বিয়েও হয়নি কখনো। এটা একটা মিথ্যা নাটক ছিল তোমার থেকে সাফাত চৌধুরী কে আলাদা করার। আর শাহিন আমাকে আর তোমাকে এই খেলার গুটি বানিয়েছে। দেখো আমার আর শাহিনের সব ছবি। আমার কোনো দোষ নেই। প্লিজ আমায় ছেড়ে দিতে বলো।”

তারি নিজের ফোনের ছবি দেখাতে লাগল যেখানে শাহিন আর তার অন্তরঙ্গের ছবি ভরপুর।


পর্ব ১২

লিমা কি বলবে না বলবে ভেবে পায় না। ছলছল করা চোখ নিয়ে সাফাতের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকে।
এই মানুষ টাকেই কি সে অবিশ্বাস করে গেল? যে কি না নিঃস্বার্থ ভাবে তাকে ভালোবেসে গেছে। তাকে পাওয়ার জন্যে কত কিছুই না করল। মিথ্যে প্রোফেসর সাজা, তাকে এক দিনেই বিয়ে করে নেওয়া। আর এই মানুষ টা কে কি না সে….
সাফাত ল্যাপটপ টা বন্ধ করে পাশের টেবিলে রাখে।

ঘুরতে না ঘুরতে লিমা এসে তাকে ঝাপটে ধরে। শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ করে নেয় নিজের ভালোবাসা কে।
সাফাতের চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। লিমা অঝরে কান্না করতে থাকে। মুহূর্তে মুহূর্তে সাফাত কে শক্তে জড়িয়ে নিচ্ছে। সাফাতও লিমা কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়ে চোখের পানি ফেলছে।
সাফাত একসময় শব্দ করে লিমার গলায় নিজের মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে থাকে।

সব মিলিয়ে লিমার বুক ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। যেন কেউ তার বুক দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিচ্ছি। প্রতিনিয়ত আঘাত করছে তার বুকের ভেতরটা কে। সাফাতের ফুঁপিয়ে কান্না টা যে লিমার গহীনে কি প্রভাব ফেলছে আর কত টা যন্ত্রণা দিচ্ছে তা লিমা বলে প্রকাশ করতে পারবে না কখনো। মনে হচ্ছে আজরাইল বুঝি এই তার জান কবচ করছে। এখনি মনে হয় তার দেহ থেকে প্রাণ পাখি টা উবে যাবে।
লিমার এমন কষ্টে শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে যায়। আস্তে আস্তে তার শরীর যেন নেতিয়ে পড়ে। সাফাতের বুকে হেলে যায় সে।

লিমা কে এই অবস্থায় দেখে সাফাত দিশেহারা হয়ে যায়। কষ্ট তার আরো বেড়ে যায়।
লিমা কে কোনো রকম কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে যায়। চোখ মুখে পানির ঝাপটা দেয়। হাত পা ঠলতে থাকে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না তার। কোনো রেসপন্স নেই লিমার। ক্রমশ শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। সাফাতের ভেতর ঘরে ভয় ঝেঁকে বসেছে।

সাফাত এবার উপায় না পেয়ে লিমার মুখের কাছে যায়। ঠোঁট দুটি হাল্কা ফাঁক করে তার মাঝে নিজের ঠোঁট লাগিয়ে দেয়। নিজের নিশ্বাস টা লিমার গহীনে ছেড়ে দেয়।
বার কয়েক সাফাত এই প্রথায় অবলম্বন করে। লিমা কে অনেক ডাকে। খুব বেশি কান্না করছে সেই সময়ে সে।

“প্লিজ মাই লিটল এঞ্জেল। আমার বউ প্লিজ আমি বাঁচব না তুমি ছাড়া। তাড়াতাড়ি উঠো। লিমা উঠে পড়ো প্লিজ আমায় আর একটা কষ্ট দিও না যেটার কারণে আমি উন্মাদ কিংবা মরে যাই। লিমা উঠো। আল্লাহ তুমি আমার লিমা কে ঠিক করে দাও। দোহাই তোমার আমার বউ কে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। দয়া করে আল্লাহ আমায় একা করে দিও না।”
লিমার মুখে আবার নিশ্বাস ছেড়ে দেওয়া হয়। বার কয়েক দেওয়ার পর লিমার কাশতে থাকে।

শরীর তার বড্ড ক্রান্ত। লিমার মাথা সাফাত নিজের বুকের সাথে চেঁপে ধরে কান্না করতে থাকে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে।

লিমা হাত দিয়ে ইশারা করে পানি দেওয়ার জন্যে। সাফাত পাশ থেকে গ্লাস নিয়ে তার মুখের সামনে ধরে। লিমা বেশ খানেক পানি খেয়ে একটু বড় করে নিশ্বাস নেয়।
সাফাতের কান্না দেখে সে সাফাত কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়।
এবার সাফাত শক্ত গলায় বলে,
“ওই আর কাঁদবি না। কাঁদলে এবার মেরেই ফেলব।”

লিমা সাফাত কে খামছে ধরে। সাফাতের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে চোখের পানি ফেলে।
সাফাত তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মাথায় গভীর চুমু দেয়।
“প্লিজ বউ কেঁদো না আমার। শরীর খারাপ করবে। কাল সকালে ডাক্তার এসে দেখে যাবো।”

“না।”
“কেন না?”
“ঔষধ!”
“কিসের ঔষধ?”
“আমি ঔষধ খেতে পাড়ি না। ডাক্তার আনতে হবে না।”

সাফাত এক গাল হেসেই বলে “পিচ্চি একটা।”
লিমা কে কিছু খায়িয়ে দেয়। তারপর একটুু জুস জোর করে খাওয়ায়।

সাফাতের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে লিমা। সাফাত হাত বুলিয়ে দিচ্ছে লিমার ঘন কালো লম্বা কেশে। সাফাত কে জড়িয়ে ধরে লিমা বলে,
“সরি।”
“….
“জনাব শুনছেন? আমি দুঃখিত।”

“….
“জনাব।”
“….
“জনাব বুঝি রাগ করল?”

“হুম।”
“আমি তা ভাঙ্গাতে চাই।”
“তাহলে যে লাগবে।”
“কি লাগবে?”
“মিষ্টি।”

“ওকে আমার বর আপনি বসেন আমি নিয়ে আসছি।”
লিমা উঠতে চাইলে সাফাত তার হাত টেনে নিজের বুকের উপর ফেলে।
“আমি ওই মিষ্টির কথা বলি নি আমি এই মিষ্টির কথা বলেছি।”
মুহূর্তে লিমা নিজের ঠোঁটযোগলে সাফাতের ঠোঁটের মধ্যভাগে আবিষ্কার করে।

সকালে সাফাত মিটমিট করে তাকিয়ে দেখে লিমার বুকের গহীনের সে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে রয়েছে। সাফাত মুচকি হেসে লিমা কে আরো শক্তে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।
লিমার কপালে আলতো একটা চুমু দিয়ে উঠে যায়।
সাফাত ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে লিমা দুই হাত দুই দিকে উঁচু করে হাই তুলছে আর শরীর মুড়ামুড়ি করছে।
লিমার এমন করা দেখে সাফাত মুচকি হাসে।
“আমার জনাবার ঘুম বুঝি ভাঙ্গল?”

“জ্বি আমার জনাব।”
“শুভ সকাল মাই লিটল এঞ্জেল।”
“আপনাকেই শুভ সকাল মাই ড্রিমবয়।”
সাফাত শব্দ করে হেসে দেয়। লিমাও শরীর মুড়িয়ে হাসতে থাকে।
“আমার জান টার ঘুম সব টা ভেঙ্গেছে নাকি আরো বাকি আছে।”

“জ্বি না আমার জামাই।”
“বউ তাহলে আপনি যান গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসেন।”
“আপনার জন্যে নাস্তা বানাতে হবে না?”

সাফাত লিমার কাছে গিয়ে দুই হাতে তার গাল টেনে দিয়ে বলে,
“ওরে আমার পিচ্চি বউ রে। তুমি যাও। ব্রেকফাস্ট টা আজ আমি করে দিচ্ছি।”
“কিন্তু..”
“তুমি তো কিছু পারো না। তবুও কাল থেকে তোমার যা ইচ্ছা করো। আস্তে আস্তে পারবে। জানো তো বউয়ের হাতের রান্নায় বিশেষ স্বাদ আছে।”
“ওরে আমার পাগল জামাইরে।”

লিমা দাঁত বের করে হেসে ছুটে ওয়াশরুমে চলে গেল।
সাফাত হেসে “পাগলি” বলে কিচেনের দিকে হাটা শুরু করে।
..

দুজন মিলে ব্রেকফাস্ট করে নেয়।
লিমার গালের পাশে দুই হাত রেখে নরম সুরে সাফাত বলে,
“জান আমার সাবধানে থেকো।”
“কেন?”
“শাহিন জেনেছে যে তার নাটক আমি ধরে ফেলেছি। আই নো ও এখন চুপ থাকবে না। কিছু একটা তো করবেই।”
“….

“কলিজাটা তোমাকে নিয়েই আমার চিন্তা। ভেবেছিলাম আন্টি আঙ্কেলের কাছে তোমায় রেখে আসব। পরে ভেবে দেখলাম সেটা আরো রিস্ক হয়। উনাদের ঝুঁকি বাড়বে। এই বাড়ি তে আমি তোমায় প্রটেকশনে রাখব গার্ড দিয়ে। আল্লাহর রহমতে কিছু হবে না প্রেয়সী চিন্তা করো না।”
সাফাত কথা শেষ করে লিমার কপালে চুমু দেয়।
“সাবধানে থাকবে। ভালো না লাগলে বা কিছু হলে সাথে সাথে আমায় কল দিবে।”
“তুমিও সাবধানে থেকো।”

“আল্লাহ আমার বউ আমায় তুমি করে বলল। আর আমি সাবধানে না থেকে পাড়ি?”
“না আসলে ইয়ে..”
“পাগলি তোমার মুখে তুমিটা বড্ড শোভা পায়।”
লিমা মুচকি হাসে।
সাফাত আরেকটা চুমু দিয়ে “সাবধানে থেকো প্রেয়সী” বলেই চলে যায়।

লিমা এত বড় বাসায় একা বসে আছে। ভয়ও লাগছে তার। কি করবে না করবে ভেবে পায় না। বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক কাজ করছে।
সাফাত কি বলল? শাহিন যদি.. সত্যিই যদি এমন কিছু হয় তবে?
ভেবেই লিমার ভেতর আত্মা শুকিয়ে চৌচির হয়ে উঠছে।
লিমা এত বড় বাড়ি তে একা এদিক ওদিক যাচ্ছে। উপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পায় অনেক গুলি গার্ড বাড়ি বেষ্টন করে রেখেছে। তার সেফটির জন্যে সাফাত এমন ব্যবস্থা নিয়েছে। লিমা মুচকি হাসি দেয় সাফাতের ভালোবাসা ময় দায়িত্ব দেখে।

দুপুর তখন ১ টার উপরে। আমেনা আন্টি রান্নাঘরে কাজ করছে লিমা সোফায় বসে কার্টুন দেখছে।
হাঠৎ লিমা অনুভব করল কেউ একজন পিছন থেকে তার মুখ চেঁপে ধরেছে।

সাফাত হলে তো তাকে এত কষ্ট দিয়ে মুখে চাঁপ দিয়ে ধরত না। সে তো আলতো ভাবে লিমা কে ধরবে। যেন ব্যথা না লাগে। তাছাড়া সাফাতের ছুঁয়া সে অনুভব করতে পারে।
লিমার খুব কষ্ট হচ্ছে। চিৎকার দিতেও পারছে না। দম টা তার আটকে আসছে। চোখ গুলি ঝাপসা দেখতে শুরু করেছে।
ঝাপসা চোখেই দেখতে পাচ্ছে আমেনা আন্টি হয়তো চিৎকার দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

লিমার আর অবশিষ্ট শক্তি ছিল না। পিটপিট করে চোখের পাতা সে নিমিশেই বন্ধ করে দিল। তারপর বাকি টা আর মনে নেই লিমার।
সাফাত অফিসে একটার পর একটা মিটিং শেষ করে নিজের রুমে এলো।
চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। এমন সময় তার ম্যানেজার এলো ফাইল নিয়ে। ইমপটেন্ট ফাইল তাই সে দেখতে লাগল। কাজের প্রতি সাফাত পারফেক্ট। অদম্য সাহস আর মনোবল নিয়ে সে কাজ করে।
ফোন বাজলে সাফাত ফাইলের দিকে মুখ নিয়ে তা রিসিভ করে।
“কিরে গ্যাংস্টার?”

ওপাশের কন্ঠ শুনে সাফাতের রাগ উঠে যায়। তার বুঝতে বেশি সময় লাগল না এটা শাহিনের কন্ঠ।
“তুই? তুই আমার কেন কল করেছিস? এত কিছুর পরেও নিজেকে শু..”

“আরে ওয়েট ওয়েট মাই ব্রাদার। গলা এত উঁচু কেন? গলা নামিয়ে কথা বলো।”
“তুই কেন আমার কল..”
“তোমার দুনিয়া আমার কাছে। ইয়েস তোর জানপাখি এখন আমার খাঁচায় বন্ধি।”

সাফাত এমন একটা কথা শুনে কি বলবে ভেবে পায় না। হৃদপিন্ড তার কাজ করা যেন বন্ধ করে দিয়েছে। মুহূর্তে তার পৃথিবী আঁধার কালো হয়ে এলো। যেটা ভয় পেয়েছে সেটাই হলে। নিজেকে নিয়ে সে কখনোই চিন্তিত বা ভয়ে থাকে না। তার সব ভয় তার সব চিন্তা শুধু লিমা কে নিয়ে। লিমা যে তার গুটা দুনিয়া।

সাফাতের কথা লেগে আসছে। মুখ দিয়ে কি বলবে তাও ভেবে পাচ্ছে না। পায়ের নিচ থেকে মাটি তার যেন সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
লেগে আসা গলায় সাফাত বলল,
“দে দেখ শাহিন ওকে তুই ছে ছেড়ে দে। ওর সাথে তো তোর ক কোনো শত্রুতা নেই। ওকে ছেড়ে দে।”

“এই প্রথম, জানিস এই প্রথম তোর গলায় আমি ভয় শুনতে পেলাম।”
“…..
“কি যে শান্তি লাগছে না আমার কি বলব তোকে। তোর কন্ঠে ভয়? কিভাবে সম্ভব? আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না জানিস।”
“দেখ শাহিন তুই লিমা কে ছেড়ে দে।”
“কুল কুল। এত তাড়া কিসের? সবে তো শুরু। মাত্র তোর জানপাখি কে আমার কাছে আনলাম। আরো তো কত কি বাকি।”
“মানে?”
“গলা নামিয়ে। কান টানলে মাথা আসে। যেই এড্রেস দিচ্ছি তাড়াতাড়ি চলে আয়। তোকে আমার খুব দরকার। বেশ কিছু দিন হয়ে গেল তোর সাথে সামনাসামনি কথা হয় না আমার। চলে আয়। আর ভুলেও ফের পুলিশ নিয়ে আসিস না। তাহলে কিন্তু তোর দুনিয়া কালো হয়ে যাবে। মানে তোর লিমা কে…”
“শাহিন না। না শাহিন তুই কিছু করবি না। আমি আসছি। লিমা কে কিছু ক…”

সাফাতের কথা শেষ হতে না হতেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে যায়।
সাফাত দিশেহারা হয়ে যায়। কি করবে তার মাথা কাজ করছিল না। শুধু ছটপট করছিল। লিমা কে ঘিরে যে সে বেঁচে আছে। সাফাত আর ভেবে সময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়ে।
শাহিনের ম্যাসেজ করা এড্রেসের দিকে ছন্নছাড়া হয়ে গাড়ি চালাতে লাগে।
এই মুহূর্ত সে এক দিশেহারা উন্মাদ।

সাফাত দ্রুত সেই এড্রেস অনুযায়ী চলে যায়। একটা নিরিবিলি জায়গা। আশপাশে অনেক গাছ। পুরান এক বাড়ির সামনে সাফাত তাড়াতাড়ি করে ব্রেক কষে।
দরজার সামনে দুজন সাফাত কে চেক করল। তারপর ভেতরে পাঠিয়ে দিল।
সাফাত দৌড়ে ভেতরে চলে যায়।
শাহিন তখন বসে বসে ভিলেন হাসি হাসছিল।

লিমার হাত পা বাঁধা। মুখের মাঝে কাপড় পেঁচিয়ে রেখেছে। কান্না করার কারণে মেয়েটার চোখের নিচে একটু সময়েই কালো দাগ পড়ে গেছে। চোখ গুলি লাল আর ফোলা। মনে হয় ভয়ে খুব কেঁদেছে।
সাফাত কে দেখে লিমা হাত পা বাঁধা অবস্থায় চেয়ার থেকে উঠার চেষ্টা করছে। আর বৃথা কথা বলার।
লিমার এই অবস্থা দেখে সাফাতের বুকের ভেতর মুচড় দিয়ে উঠে। ভেতরে পর পর ছুইনুাঘাত করার মতো কষ্ট হচ্ছে। তোলপাড় শুরু হয়ে গেল তার মাঝে। লিমার জন্যে ভেতর থেকে শুধু হাহাকার আসছে তার।

“আরে আরে পাখি এত ফরফর করছো কেন? তোমার জানের স্বামী তো সবে এলো। আগে ওকে একটু বিশ্রাম করতে দাও হাহাহা।”
শাহিনের কথায় সাফাতের খুব রাগ হয়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়।

“দেখ শাহিন তোর যা করার আমার সাথে কর। প্লিজ ওকে ছেড়ে দে। বাসায় পৌঁছে দিয়ে আয়।”
“বাসায়? হাহা হাহাহা। তোকে ভয় পেতে দেখে না আমার খুবি ভালো লাগছে জানিস? এত বছরেও তোর চোখে এক দিন ভয়ের কোণা পর্যন্ত দেখিনি। আর আজ ওর জন্যে তোর চোখে আছে শুধু ভয়। আর ভয় মুখেও জড়তা। হাহাহা।”

“দেখ শাহিন আমি তোর কাছে ইনুোয়েস্ট করছি তোর যা ইচ্ছা আমার সাথে কর। মার ধর যা ইচ্ছা কর। শুধু লিমা কে ছেড়ে দে। সেফটলি ওকে বাসায় পৌঁছে দে।”
“আরে দাঁড়া না। তোর বউয়ের সাথে কিছু একটু করতে দে”

এভার সাফাত রাগে ফেটে যায়। শাহিনের দিকে তেড়ে আসতে চায়লে শাহিন বাঁধা দেয়।

লিমা এখন ভয়ে আরো কাঁদতে থাকে। সাফাতের দিকে অসহায় দৃষ্টি দেয়। লিমার এই চাওনি সাফাতের ভেতর পর্যন্ত পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এই মুহূর্তে তার নিজেকে দুনিয়ার সব চেয়ে অসহায় লাগছে।
“এ্যা এ্যা। না এমন ভুল ভুলেও করিস না। ভুলে যাস না তোর লিমার জানপাখি কিন্তু আমার হাতের মুঠোয়। শুধু একটা..”
শাহিন গান তাক করে লিমার মাথায়। ভয়ে লিমার ভেতর টা কেঁপে উঠে। চোখ বন্ধ করে নেয়।
“না শাহিন না। এমন কিছুই করবি না তুই। প্লিজ তোর কাছে ইনুোয়েস্ট করছি লিমার কিছু করিস না। ওকে ছেড়ে দে তুই।”
“ছেড়ে দিব?”

“শাহিন ওর সাথে তো তোর কিছু শত্রুতা নেই। যা আছে তা আমার সাথে। তাহলে ওর সাথে..”
“ও? ও তো তোর দুনিয়া। তোর পরাণ পাখি। ওকে কষ্ট দিলেই তো তুই কষ্ট পাবি। তোর জান টা যে ওর ভেতর। ওকে শেষ করে দিলেই তুই শেষ হয়ে যাবি।”
সাফাত কিছু বলে না। নিজেই নিজেকে একটু সান্ত্বনা দিচ্ছে। নিজেকে ঠিক করে নিচ্ছে। এখন তার রাগ বা মাথা গরম করলে চলবে না। তার একটু ভুলে মারাত্মক কিছু ঘটে যাবে। ঠান্ডা মাথায় সব টা সামাল দিতে হবে।

সাফাত আড় চোখে তার ঘড়ির দিকে তাকায়। এখনো ১০ মিনিট বাকি আছে। শাহিন কে এই সময় টা কথার মাঝে ব্যস্ত রাখতে হবে।
লিমা কে সেইভ করে যা করার করতে হবে। এর আগে কিছুই করা যাবে না।


পর্ব ১৩(অন্তিম পর্ব)

সাফাত শান্ত কন্ঠে শাহিন কে বলল,
“দেখ তুই কি চাস আমায় বল।”

শাহিন তাচ্ছিল্য সুরে বলে,
“কি চাই? আমায় এখন বলছিস আমি কি চাই? কেন এখন তুই বিপদে পড়েছিস? অসহায় হয়ে গেছিস?”
“হাতি কাঁদায় পড়লে চামচিকাও লাথি মারে। প্রবাদ বাক্য টা শুনেছিস তো?”

“কি বলতে চাইছিস তুই?”
“আমি কিছুই বলতে চাইছি না। আচ্ছা তোর গার্লফ্রেন্ডকেও তো তুই ভালোবাসি তাই না? জানিস ও কোথায় আছে?”
শাহিন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলে,

“কোথায় আছে?”
“ও এখন আমার কাছে আমার বন্ধি হয়ে আছে।”
“….
“ওকে বাদ দে। চল তুই লিমা কে ছেড়ে দে। আর আমি তিরা কে। কি বলিস?”
“…..

“কি রে শাহিন ভাবছিস নাকি?”

“তিরা কে আমি ভালোবাসি ঠিকি। কিন্তু এখন ওর থেকেও আমার দরকার আর প্রয়োজন প্রতিশোধের। আমি ওকে নিয়ে এখন ভাবছি না।”

“জানতাম আমি এমন টাই বলবি। আরে তুই তো মেরুদণ্ড হীন। ভালোবাসা তেই পারিস না। কাপুরুষের মতো অন্য কে হাতিয়ার বানিয়ে আমার সাথে লড়তে আসছিস।”
সাফাত বেশ বুঝে পারছে তার কথায় শাহিন রেগে যাচ্ছে। সে এটাই চাইছিল।

লিমা নির্বাক হয়ে শুধু দুজন কে দেখছে। সাফাত শাহিনের আড়ালে লিমা কে চোখ দিয়ে ইশারায় আশ্বস্ত করেছে। তাই সে চুপ আছে।
শাহিন রাগে লিমার মাথায় আবার জোরেশোরে বন্দুক ধরে। সাফাত তড়িঘড়ি করে বলল,

“আরে আরে এত তাড়াতাড়ি গেইম শেষ করে দিচ্ছিস? কোনো টুইস্ট ছাড়াই? সো সেড। ছিঃ শাহিন তুই গেইম কন্টিনিউ করতেই জানিস না অথচ #গ্যাংস্টার এর সাথে খেলতে চলি এলি।”
শাহিন এবার দূর থেকে সাফাতের দিকে বন্দুক ধরে।

“কি ভাবিস কি তুই? খুব বড় গ্যাংস্টার হয়ে গেছিস? আড়াল থেকে গ্যাং নিয়ে শুধু মানুষ কে সাহায্য করিস। গ্যাং চালাস বলেই তুই মস্ত বড় গ্যাংস্টার হয়ে গেছিস না? আমি চাইলেই সব খেলা তোর সব পাওয়ার শেষ করে দিতে পাড়ি এই মেয়ে টা কে মেরে। ওর জান আমার হাতে। তবুও বড় বড় কথা বলছিস?”

“আমি আজো বুঝতে পাড়লাম না আমি প্রতি এত রাগ ক্ষোভ কেন তোর? আর কি বললি? তুই নিজেও জানিস আমি কত বড় গ্যাংস্টার। আর কত বড় গ্যাং চালাই।”

“জানিস না তুই তোর প্রতি এত রাগ কেন আমার? নাকি ভং করছিস? ভাব কম দেখা। আমার চাঁদা তুলা, আমার ২ নাম্বারি ব্যবসা, মদের কারখানা, হিরোইন তৈরির গুদাম, ইয়াবা ব্যবসায় সব তুই নষ্ট করেছি। তবুও ভং করছিস? ভালো মানুষি দেখিয়ে নিজের গ্যাং এর সাথে আমার সব শেষ করে দিলি। সব শেষে তুই আমায় পুলিশের কাছে দিলি। ১ টা বছর। ১ টা বছর আমি জেলখানায় ছিলাম। তার শোধ আমি নিব না ভেবেছিস? সব মনে আছে আমার। আর তার প্রতিশোধ তো আমি নিবোই সাফাত গ্যাংস্টার।”

সাফাত আবারও ঘড়ির দিকে তাকায় আড়চোখে। ১০ মিনিট তো শেষ এখনো কেন আসছে না? সাফাত চুপ করে মনে মনে টাইম গুনতে লাগল।
তারা যেই রুম টায় আছে সেখানে তারা চারজন ছাড়া কেউ নেই।

সাফাত লিমা শাহিন আর একটা তার সাথে থাকা চামচা দাঁড়িয়ে ছিল। বাকিরা বাহিরে পাহারা দিচ্ছিল। সাফাত কে বিশ্বাস করা যায় না। সব করতে পাড়ে ও।
শাহিন বক বক করছিল। এমন সময় তার গ্যাং এর লোক রুমে ঢুকে গেল।

শাহিন তাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝার আগেই সাফাত দৌড়ে গিয়ে লাথি মেরে তার হাতে থাকা বন্দুক টা ফেলে দেয় মাটি তে।
সাথে সাথে সাফাত নিজের বা হাত দিয়ে শাহিনের দুই হাত পেছন থেকে পেঁচিয়ে নেয়। আর ডান হাত রাখে গলা পেঁচিয়ে। শাহিন নড়বার শক্তি টাও পাচ্ছে না।
দুই হাত সাফাত পেঁচন থেকে পেঁচিয়ে রাখার কারণে তার দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে।

“তুই কি ভেবেছিস? সাফাত এত কাঁচা দান চালবে খেলায়? আমি তোর মতো কাঁচা খেলোয়াড় নই। আমি #গ্যাংস্টার সাফাত চৌধুরী। তোর মতো মশা আমার হাতে কিছুই না। নিহাত লিমা কে আটকে রেখেছিলি। তাই তোর সাথে গেইমের মাথায় যেতে একটু সময় নিয়েছি। না হলে তোর মতো মশা কে সাফাত কখনই হাতের থাপ্পড় দিয়ে পিষে দিত।”
“র সাফাত ছাড় আ আমায়।”

“ছাড়ব? তোকে? লিমা কে ছেড়ে ছিলি তুই?”
“…..
সাফাত রাস্তায় আসার সময় তার গ্যাং কে কল দিয়েছিল। কয়েকজন মিলে সেই ঠিকানায় আসতে বলেছিল।

কিন্তু এখন সে দেখতে পাচ্ছে তার পুরো গ্যাং চলে এসেছে। মানুষ গুলিও তাকে বড্ড ভালোবাসে। ভালোবাসবেই বা না কেন? তারা তো কোনো খারাপ কাজ করে না। বরং তার বিরুদ্ধে যায়।
সাফাত বলে রেখেছিল কিভাবে কি করতে হবে। আস্তে আস্তে কোনো শব্দ ছাড়া একেক টা কে সরাতে হবে। আর কয়েক জন তো টাকার কাছেই কাবু ছিল।
না হলে লিমার কিছু করে ফেলবে শাহিন।

সাফাত শাহিন কে ধরে রেখেছে। আর তার চামচা কে অন্যজন।

সাফাত চোখের ইশারায় বুঝাল লিমার বাঁধন খুলে দিতে। কিছু লোক এসে লিমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়। বাকি টা লিমা নিজেই করেছে।
সাফাত লিমার দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করে এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে।

লিমা কান্নারত অবস্থায় মাথা দিয়ে না করে। এবার সাফাত অনেক রাগি লাল লাল চোখ নিয়ে লিমার দিকে তাকায়। সাফাতের চোখ দেখে লিমা ভয় পায়। যার ফলে সে দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়।
শুরু হয় তুমুল মারামারি। শাহিন কে এলোপাথাড়ি মারছে সাফাত।
“তোর কলিজা টা কত বড়। তুই আমার জানে হাত দিয়ে দিলি।”
“তোর সাহস দেখে অবাক না হয়ে পারছি না।”

“আমি বলেছিলাম তো লিমা কে ছেড়ে দিতে। কিন্তু তুই? ..”
“তুই মজা নিয়েছিলি না আমার সাথে? লিমা কে আটকে রেখে ভেবেছিলি আমায় শেষ করবি?”
“তোর কলিজা টা কত টা বড় আমি দেখতে চাই তুই আমার বাড়ি গিয়ে আমার বউ কে তুলে আনলি..

সাফাত কথা গুলি বলছে আর শাহিন কে ইচ্ছা মতো মারধর করছে।
এক পর্যায় দেখা হলো শাহিনের অবস্থা খারাপ আবার পুলিশও চলে এসেছে। সাফাত পুলিশ দেখে অবাক। কারণ সে তার গ্যাং কে এমন কোনো কথাই বলেনি।
সাফাত তবুও মারছে শাহিন কে। কথা বলার সুযোগ টাও দিচ্ছে। রাগে শুধু হাত চালাচ্ছে।

“বস থামেন। পুলিশ এসেছে। আর সরি। আপনায় না বলেই আমরা এটা করেছি।”
তিয়াসের কথায় সাফাত কর্ণপাত করল না। না করল পুলিশ কে ভ্রুক্ষেপ।

পুলিশ আর তার লোকজন এসে সাফাত কে ধরে শান্ত করে। আর শাহিন কে হাতের কাছে রাখে।
সবাই সাফাত কে শান্ত হতে বলছে।
কিন্তু সাফাত বারবার শাহিন কে মারতে চাইছে। তার বউের গায়ে হাত দিয়েছে। সাহস কত?

শাহিন এই অবস্থাতেও তার পাশের পুলিশ কন্সটেবল কে ধাক্কা দিয়ে তার থেকে দূরে ফেলে দেয়। মাটিতে থাকা বন্দুক টা নিজের হাতে তুলে সাফাতের দিকে তাক করে।
সবাই চুপ। পুলিশ সাফাতের গ্যাং সাফাত নিজেও স্তব্ধ হয়ে আছে।
“শাহিন। শাহিন বন্দুক নামা।”

“তুই কি ভেবেছিস? আমি জেলে যাবো আর তুই দুনিয়াতে বেঁচে থাকবি? না সাফাত শাহিন তা হতে দিবে না।”
“শাহিন বন্দুক রাখ। দেখ এখানে পুলিশ আছে।”
কিছু পুলিশ শাহিনের দিকে বন্দুক ধরে রেখেছে। সুযোগের অপেক্ষা করছে। ঝোপ বুঝে কুঁপ।

শাহিন একবার সাফাতের দিকে বন্দুক নেয় তো আবার যে এগিয়ে আসতে চায় তার দিকে।
“গুড বাই গ্যাংস্টার সাফাত চৌধুরী।”
শাহিন কথাটা বলে দম নেয়। সাথে সাথে দুই টা গুলির আওয়াজ হয়। সব কিছু নীরব নিস্তব্ধ হয়ে উঠে মুহূর্তে।
..
লিমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে গুলির আওয়াজে চিৎকার দিয়ে উঠে।
দৌড়ে ভেতরে ডুকে আরেকটা চিৎকার দিয়ে সেন্সলেস হয়ে যায়।

গুলি দুইটা শাহিন আর সাফাতের লেগেছিল। শাহিন কে পুলিশের একজন হাতে গুলি করেছিল যাতে গুলি টা ফেলে দেয় আর সাফাত বেঁচে যায়।
কিন্তু শাহিন নিজের হাতে গুলি খাওয়ার পর হাত নিজের কন্ট্রোলের বাহিরে যাওয়ায় তার হাতে থাকা বন্দুক থেকেও বেগে গুলি বের হয়ে যায়।
যা সাফাতের বা হাতের বাহুতে লাগে। সাথে সাথে কলকলিয়ে গরম রক্ত ঝরতে থাকে।
লিমা সাফাতের হাতের অবস্থা দেখে জ্ঞান হারায়।

সাফাত চোখ মুখ খিঁচে কোনো রকম লিমা কে ডান হাতে ধরে নিজের বুকের সাথে আকঁড়ে নেয়।
ইশারা দিয়ে পানি আনতে বললে সাফাত লিমার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়।

লিমা মিনমিন চোখ নিয়ে সাফাতের দিকে তাকায়। সাফাতের হাতের অবস্থা দেখে লিমা চিৎকার করে কেঁদতে থাকে।
সাফাত আর নিজের মাঝে থাকতে পাড়ে না। ঢলে পড়ে যায়।
সবাই ধরাধরি করে গাড়ি নিয়ে বের হয়।

লিমার কোলে সাফাত শুয়ে আছে। চোখ তার বন্ধ। হাত দিয়ে অঝরে রক্ত পড়ছে। সাফাতের কোট ভিজে গেছে। সাথে লিমার জামাও। অনেক রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
সাফাত কে বুকের সাথে চেঁপে ধরে লিমা কান্না করতে থাকে।
বেশ সময় যাওয়ার পর সাফাত আবার টিপটিপ করা চোখ নিয়ে লিমার দিকে তাকায়।

নিজের রক্তাক্ত হাত টা লিমার হাতের সাথে মিশিয়ে নেয়। চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে ক্ষীণ সুরে বলতে লাগল,
“রা লিমা।”
“কিছু হবে না তোমার তুমি ঠিক হয়ে যাবে। আর একটু সময়।”
“রা লিমা তোমায় খুব ভালোবাসি।”

“….
লিমার বুক চিঁড়ে কান্না আসছে।
“প্রেয়সী আ আমি যদি বে বেঁচে না থাকি। তবুও তোমার কোনো র রকম কষ্ট হবে না। আমার লো লোক গুলি তোমার ভালো থাকার ব্যবস্থা করে দিবে।”
“চুপ একদম চুপ তুমি। একটা কথাও বলবে না। আমার শুধু তোমাকে চাই শুধু তোমাকে। তোমাকে চাই মানে চাই। আমার জন্যে তুমি সুস্থ হবে। ইনশাল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। প্লিজ জান এমন বলো না।”
“ভালোবাসি তোমায় খুব ভা ভালোবাসি লিমা।”

সাফাত আবার চোখের পাতা বুজে নেয়। লিমা গলা ফাটিয়ে কান্না করছে। সাফাত কে বুকের সাথে ধরে শুধু কান্না করছে আর মনে মনে আল্লাহ কে ডাকছে।
তার একটু পর হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামে। সাফাতের লোক জন আবার ধরে তাকে ভেতরে নিয়ে যায়।
ডক্টর দেখেই বলে,
“ও মাই গড। ইমিডিয়েটলি উনাকে ওটি তে নিতে হবে। শরীর থেকে অনেক রক্ত চলে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি করুন। আড়িআপ।”
ডক্টর সাফাত কে নিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছিল।

লিমার মনে হচ্ছিল তার বুক চিঁড়ে কেউ তার জান টা নিয়ে যাচ্ছে। সাফাতের হাত টা শক্ত করে ধরে ছিল।
আস্তে আস্তে সাফাত কে তারা নিয়ে গেল। হাতের বাঁধনও ছুটে গেল। তার হাত টাও কেমন ঠান্ডা হয়ে আসছিল। লিমার বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগল। অজানা ভয়ের ঝড়। এই ঝড়ই বোধহয় তাকে তোলপাড় করে নিবে। ছন্নছাড়া হয়ে যাবে না তো?
লিমা ওটির সামনে বসে কান্না করছে আর মনে মনে দোয়া পড়ছে।

প্রায় ১ ঘন্টা পর একজন ভেতর থেকে এলো। ওটির সামনে তখন ভিড়। সাফাতের গ্যাং এর সব ছেলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
ডক্টর এসেই বলল,
“উনার বাড়ির লোক কে এখানে?”

ডক্টরের কথায় সবাই তার দিকে চলে যায়। ডক্টর কে ঘিরে রেখেছে। সবাই অনেক প্রশ্ন করছে, সাফাত কেমন আছে। কি হলো, ঠিক আছে কি না।
ডক্টরের ধমকে সবাই চুপ হয়ে গেল। লিমা ডক্টরের সামনে যায়।
“আমি উনার ওয়াইফ। কি হয়েছে আমায় বলুন। কেমন আছে ও?”

“দেখুন আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুই ব্যাগ AB পজেটিব রক্তের ব্যবস্থা করুন। আধ ঘন্টার মাঝে নিয়ে আসুন প্লিজ। না হলে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। যা করার তাড়াতাড়ি করুন।”
ডক্টর আবার ভেতরে চলে গেল।
লিমা ধপ করে বসে চিৎকার করে কান্না করছে। তার রক্তের সাথে সাফাতের রক্তের মিল নেই। না হলে নিজের সমস্ত রক্ত দিয়ে সাফাত কে বাঁচাত লিমা।
লিমার চিৎকার যেন হাসপাতাল কে কাঁপিয়ে তুলছে। হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কান্না করেই চলছে মেয়েটা।
“ম্যাম। আপনি চিন্তা করবেন না। কান্না থামান।”
“ম্যাম আমরা আছি তো। চিন্তা নেই।”

“আমরা কিছু একটা করছি ম্যাম আপনি ভেঙ্গে পড়বেন না।”
“বস কে আমরা আমাদের জীবন দিয়েও সুস্থ করব ইনশাল্লাহ। আপনি কাঁদবেন না ম্যাম। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। আমরা দেখছি।”
একেক জন একেক কথা বলে লিমা কে সান্ত্বনা দিচ্ছে। লিমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
সাফাতের গ্যাং এর বেশির ভাগ লোক এখন নেই। রক্তের সন্ধানে চলে গেছে।

কিছু লোক হাসপাতালেই আছে। তবে ফোন দিয়ে নানান জায়গায় রক্তের জন্যে যোগাযোগ করছে।
লিমা খুব অসহায়। তার কিছুই করার নেই। জন্ম মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে। এখানে কারো কিছুই করার থাকে না। আল্লাহ যখন যাকে পছন্দ করে তাকেই নিয়ে যায়। লিমার এখন আল্লাহর নাম নেওয়া ছাড়া আর কোনো কিছু করার নেই। কান্না করছে দোয়া পড়ছে আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই। তার ভালোবাসা তার স্বামী যেন ঠিক হয়ে যায়।
৩০ মিনিট হওয়ার পরপর সাফাতের গ্যাং এর লোক ৩ ব্যাগ রক্ত আনে।

ডক্টর সাথে সাথে তা নিয়ে ওটি তে ঢুকে যায়।
“ম্যাম আপনি চিন্তা করবেন না। ইনশাল্লাহ বস ঠিক হয়ে যাবে।”
“বস কখনো কারো ক্ষতি করেনি। উনার কোনো ক্ষতি আল্লাহ করবে না।”
“ম্যাম আমাদের সবার এত ভালোবাসা মিথ্যে হতে পাড়ে না। আমাদের দোয়া আল্লাহ নিশ্চয় শুনবে। ইনশাল্লাহ বস ঠিক হয়ে যাবে।”
ওদের কথা গুলি লিমার মন কে যেন একটু শক্ত করছে।

লিমা অনবরত কান্না করছে। আর দোয়া করছে সাফাতের জন্যে।
তার আরো আধঘণ্টা পর ডক্টর বের হলো ওটি থেকে।
“আল্লাহর রহমতে উনি এখন সুস্থ আছে। আল্লাহর অশেষ কৃপা। রক্ত চলছে আরো কিছুক্ষণ পর উনাকে কেবিনে দেওয়া হবে। বাকি টা আল্লাহর ইচ্ছা।”
ডক্টর চলে যায়। সবাই স্বস্তির নিশ্বাস নেয়।

লিমা হাজার বার কোটি বার আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।
বেশ সময় যাওয়ার পর সাফাত কে কেবিনে দেওয়া হয়। সাফাতের হাত টা লিমা শক্ত করে ধরে রেখেছে। সাফাত ঘুমাচ্ছে। একে একে তার গ্যাং এর সবাই গ্যাংস্টার কে দেখে যাচ্ছে।
সারারাত সাফাত আর ঘুম থেকে উঠে নি। চোখ মেলেও তাকায়নি।

লিমা সারারাত সাফাতের পাশে বসে ছিল। সাফাতের হাত টা খুব শক্তে ধরে রেখেছিল তার অর্ধাঙ্গিনী।
সকালে সাফাত মিটমিট করে তাকাতেই বুকে ভার কিছু অনুভব করে।
ভালো করে তাকিয়ে দেখে লিমা তার বুকে ঘুমিয়ে আছে। সাফাত মুচকি হেসে লিমার মাথায় চুমু খায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে লিমার ঘুম হাল্কা হয়ে যায়।
ধরফড়িয়ে সাফাতের বুক থেকে উঠে,
“তুমি ঠিক আছো?”
“….

“আসলে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি…”
লিমার কথা শেষ করার আগে সাফাত আবার এক হাতে লিমা কে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
লিমাও মুচকি হেসে সাফাতের বুকের লেগে থাকে।
সাফাত লিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“পাগলি খুব ভালোবাসি তোমায়।”

“….
“সারারাত ঘুমাও নি বুঝি?”
রানও মাথা তুলে বলে,
“স্বামীর এই অবস্থা থাকলে কোনো বউ ঘুমাতে পাড়ে না।”
“ওরে আমার পিচ্চি বউ টা রে।”

“তুমি থাকো আমি তোমার গ্যাং এর লোক কে জানাই তাদের গ্যাংস্টার চোখ মেলেছে।”
“ওরা কি হাসপাতালে?”
“তাহলে? সারা রাত সবাই এখানেই ছিল। ইনফেক্ট শুরু থেকেই ছিল। সবাই তোমার কেবিনের সামনে আছে হয়তো। ডক্টর এতো করে বলল সবাই কে কেবিনের সামনে না আসতে কে শুনে কার কথা?”
“বলো কি?”

“তবে আর কি? ডক্টর ২ ব্যাগ রক্তের কথা বলেছিল তোমার তাও আধঘণ্টার মাঝে। তোমার লোকজন তার আগেই ৩ ব্যাগ রক্ত নিয়ে এসেছে।”
“ওদের ডাকো।”

“হুম।”
লিমা সবাই কে গিয়ে বলতেই পিঁপড়ার মতো হুড়মুড়িয়ে পড়ে সাফাতের দিকে। সবাই এক সাথে সাফাতের বেডের কাছে চলে যায়। এমন অবস্থাতেই সাফাত কে জড়িয়ে ধরে সবাই চোখের পানি ফেলে।
ওদের এই ভালোবাসা দেখে সাফাত নিজেও ঠিক থাকতে পাড়ে না। আবেগপ্রবণ হয়ে কান্না করে দেয়।
সাফাত কে ৩ দিন হসপিটাল রাখা হয়। তারপর লিমা সাফাত আর সবাই কে নিয়ে বাড়ি যায়।

এক সপ্তাহর উপর লিমা নিজের সব টা দিয়ে সাফাতের যত্ন করে। সাফাতও সুস্থ হয়ে উঠে। এর মাঝে লিমার বাবা মা এসে এসে সাফাত কে দেখে যায়।
সাফাত লিমা সাইরুর এক হোটেলের ব্যালকুনিতে বসে আছে।

বেড়াতে এসেছে এখানে লিমা কে নিয়ে। বউ কে নিয়ে সফর দেওয়া তো সুন্নত। আমার বিশ্ব নবীও উনার স্ত্রীদের নিয়ো বিভিন্ন দেশে সফর দিতেন।
দুজনেই ব্যালকুনিতে বসে আছে। ডিভানের উপর আধো শোয়া সাফাত কে ঘেষে লিমাও বসে আছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা মুগ্ধ হচ্ছে। নীরবে যেন তারা তারাদের সাথে কথা বলছে। দুজনেই চুপ।
সামনে কফি রাখা। এক কাপ কফি। সাফাত সেই কফি হাতে তুলে নেয়। কফির মগে চুমুক দেয়। লিমার কোমর টেনে লিমাকেও আরো কাজে নিয়ে আসে। কফির মগ তার দিকে এগিয়ে দেয়।
লিমা মুচকি হেসে তা গ্রহণ করে। কারণ এটা সাফাতের অভ্যাস। এক কাপ কফিতে সে যেন লিমা কে খুঁজে পেতে চায়।

সাফাত উঠে বসে। লিমার গায়ে দেওয়া চাদরের মাঝে সেও ঢুকে পড়ে। লিমা কে মুচকি হেসে নিজের উষ্ণ উমে নিয়ে আসে। লিমাও মুচকি হেসে সাফাতের বুকে মাথা রাখে।
হীম শীতল বাতাস বইছে চারিদিকে।

হোটেলের লাইটের আলো তে চারপাশের প্রকৃতি আবছা দেখা যাচ্ছে। দুজনেই তাকিয়ে আছে তার দিকে।

সাফাত হঠাৎ লিমার কানের পাশে হাত গুঁজে দিয়ে লিমা কে টেনে আনে। লিমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করে দেয়। গভীর চুম্বনে তলিয়ে যায় দুজনে।
সাফাত লিমা কে ছেড়ে মুচকি হাসে। লিমাও এক মারাত্মক রকম লজ্জাময় হাসি হাসে।

“লজ্জাপরীর ওই লজ্জামাখা রঙ্গিন হাসি টা ভীষণ ভালোবাসি। ওই হাসি আমার দুনিয়া আলোকিত করে তুলেছে। ভালোবাসি লিমা।”
সাফাত আবার কফির মগে ঠোঁট লাগায়। সেই কফি লিমার দিকে এগিয়ে দেয়।
এক কাপ কফি তে দুজন দুজনকে খুঁজে চলার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

সমাপ্ত

লেখাঃ সাবরিহা সাদি (সাদিয়া)

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “গ্যাংস্টার লাভ স্টোরি (বাংলা)” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ুন – অভিমানী ভালোবাসার গল্প