ভালোবাসার গল্প

সত্যিকারের জীবনের গল্প – সার্টিফিকেট | Real Life Story Bangla

সত্যিকারের জীবনের গল্প

সত্যিকারের জীবনের গল্প – সার্টিফিকেট: সময়টা ২০১৭। হাতে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে বসে আছে জিনিয়া। কিন্তু সে এবারও ফেল। এই নিয়ে মোট তিন তিন বার ফেল করল সে। চোখ দিয়ে তার টপটপ করে পানি পড়ছে। কষ্টে ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু সে কষ্ট প্রকাশ করার মতো ভাষা তার কাছে নেই। এ কষ্টের মাঝেই জিনিয়ার মা এসে মেয়ের অবস্থা দেখে ঝংকার দিয়ে উঠল।

জিনিয়ার মাঃ কি! এইবারও ফেল। শংখনী মান ইজ্জত যা ছিল সব শেষ করে ফেললি।

মাথা নিচু করে বসে আছে জিনিয়া। মায়ের এসব কথা নতুন নয়। গত দুই বছরেও একই কথা শুনতে হচ্ছে তাকে। ঠাসসস! গালে হাত দিয়ে মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকাল সে।

জিনিয়ার মাঃ তুই জীবনেও পাশ করতে পারবি না। এখন তোকে কে বিয়ে করবে? হায় হায় সমাজে মুখ দেখাতে পারব না তোর জন্য।

জিনিয়াঃ মা একটা সার্টিফিকেটই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে না। আমি মানুষ হিসেবে কি আমার কোন মূল্য নেই? আজ যদি আমি পাশ করতাম তাহলে কি এই কথাগুলো বলতে পারতে।

জিনিয়ার মাঃ করলে বলতাম না। কিন্তু তুই তো করিসনি। এখন বর্তমান যুগে মেট্রিক পাশের কি মূল্য তুই জানিস! কোন জায়গায় মেয়ে দেখতে গেলে প্রথমে কি জিজ্ঞেস করে? মেয়ে কি পাশ? আর তোরে দেখতে এলে কি কমু তিন তিন বার মেট্রিক ফেল।

জিনিয়ার মা চলে গেল আরও কতগুলো কথা শুনিয়ে। জিনিয়ার বাবা এসে জিনিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল
জিনিয়ার বাবাঃ ভেবেছিলাম তুই পাশ করবি মা। কিন্ত না করিস নি। তোরা দুই বোনের পড়ালেখার খরচ যে আমি কত কষ্ট করে জোগার করতাম সেটা শুধুমাত্র আমিই জানি। এখন আমি যেটা বলব তোকে কিন্ত সেটাই শুনতে হবে।

জিনিয়া তার বাবাকে জরিয়ে ধরে হাউকাউ করে কেঁদে দিল
জিনিয়াঃ বাবা আমি পারলাম না। জানো বাবা আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্ত পাশ করতে পারলাম না। আমি কি করব বলোতো?

জিনিয়ার বাবা চলে গেল। জিনিয়া বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কালো মেঘটা কি ভাবে চোখের আড়ালে ঘায়েল হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ জোরে মেঘের গর্জন শুনা যাচ্ছে। এক দৃষ্টিতে প্রকৃতির খেলাগুলি দেখছে। তার জীবনটাও তো এরকমই। কি থেকে কি হয়ে গেল। একটা দমকা হাওয়া এসে সব কিছু তচনচ করে দিয়ে চলে গেল। চোখ দুটো ফুলে গেছে। আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না। বৃষ্টি একটু কমেছে।

বিকালে….

রুমে প্রবেশ করল জিনিয়ার মা একটা শাড়ী দিয়ে গেল। শুধু বলেছে তাড়াতাড়ি শাড়ীটা পড়তে। জিনিয়া কিছুই বুঝতে পারছে না। ওর মা কি করতে চাইছে?

জিনিয়ার মাঃ কিরে শাড়ীটা এখনও পড়লি না।

জিনিয়াঃ শাড়ী পড়ব কেন?

আর কিছু বলতে না দিয়ে

জিনিয়ার মাঃ তোর রফিক কাকু একটা বড় ঘর নিয়ে এসেছে। ছেলে নাকি একবার বিয়ে করেছিল। একটা দুই বছরের বাচ্চা রেখে। বউটা চলে গেছে। এখন আবার বউ খুজছে। ইতালি থাকে। তোরে ওখানে নিয়ে যাইব।

জিনিয়াঃ মা তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একটা বিয়ে করা লোক যার দুই বছরের একটা বাচ্চা আছে তার সাথে আমার বিয়ে দিতে চাইছ।

জিনিয়ার মাঃ তোরে কে নিবে শুনি। চুপচাপ শাড়ীটা পড়। তা না হলে আমি কি করব তা আমিই জানি। (চোখ রাঙিয়ে)

জিনিয়ার বাবা এসেও একই কথা বলল। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল জিনিয়া। ফেল করার কষ্টটা এখনো একটুও কমে নি। তার উপর আবার বিয়ে। জিনিয়া শাড়ী পড়তে না চাইলেও জোর করে শাড়ীটা পড়িয়ে দেয় তার মা।

পাত্র পক্ষ এসেছে দেখতে। সামনে বসানো হয়েছে জিনিয়াকে। সবাই দেখে মাশাল্লাহ ভালোই বলল। যখন জিজ্ঞেস করল তুমি কি পাশ? জবাব দিতে পারেনি জিনিয়া। যদিও বিষয়টা জানত। জিজ্ঞেস না করলেও পারত। কিন্ত কথায় আছে ” কুকুরের লেজ কখনো সোজা হওয়ার নয়” মানুষ জানে তাকে এই কথাটা বললে সে কষ্ট পাবে। তবুও বারবার একই কথা বলে কষ্ট দেয়।

দৌড়ে রুমে এসে দরজাটা লাগিয়ে দিল জিনিয়া। বালিশে মুখ গুজে কাঁদছে। জিনিয়ার মা বাবা হাতে পায়ে ধরে বিয়ে টা ঠিক করল। দুইদিন পর বিয়ে।

জিনিয়াঃ সবাই আমাকে ফেলে দিতে পারে। কিন্ত জিহাদ আমাকে কখনোই ফেলবে না। কালকেই দেখা করব। কিন্ত জিহাদ তো একবারও আসল না আমার খবর নিতে। হয়তো জরুরী কোন কাজে আটকে পড়েছে। তাই আসতে পারেনি। হ্যা কালকেই আমি ওর সাথে দেখা করব।

সকালে………

একটা খোলা মাঠে দাড়িয়ে আছে জিনিয়া। সামনে জিহাদ যাকে জিনিয়া অনেক ভালোবাসে। জিহাদও ওকে ভালোবাসে। মুখটা কালো করে দাড়িয়ে আছে জিহাদ।

জিহাদঃ যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। আমার টাইম নেই।

জিনিয়াঃ জিহাদ আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। প্লিজ, তুমি কিছু কর।

জিহাদঃ তাহলে তো ভালোই হলো। বিয়ে করে সুখী হও।

জিনিয়াঃ এটা তুমি কি বলছ জিহাদ? আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। তাও লোকটার একটা বাচ্চা আছে দুই বছরের। আর তুমি বলছ…… এটা তুমি বলতে পারলে।

জিহাদঃ তোমাকে আর কে বিয়ে করবে, শুনি? তিন তিন বার এসএসসি ফেল করেছ তুমি। তোমার সাথে দুই বাচ্চার বাপকেই মানায়।

জিনিয়াঃ তুমিকি আমাকে ভালোবাসনা। প্লিজ, মজা করো না। চলো আমরা পালিয়ে যাই। ( জিহাদের হাত ধরে)

ঝটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নেই জিহাদ। তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়ে।

জিহাদঃ তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব। ভাবলে কি করে? আজকে একটা সত্যি কথা বলছি, তোমাকে আমি কখনোই ভালোবাসিনি। তিয়াসের সাথে বাজি ধরেই একটিংটা করেছি। কেননা, তুমি পুরো স্কুলের টপ সুন্দরীদের মধ্য একজন। তাই তোমাকে পটিয়েছি। তিয়াসের সাথে আমি ডিলে জিতে গেছি। (হাসতে হাসতে)

জিনিয়াঃ জিহাদ হচ্ছেটা কি? এখানে তিয়াস কোথা থেকে আসছে? প্লিজ, ইয়ার্কি বাদ দাও। আমার ভালো লাগছে না।

কথা থামিয়ে দিয়ে।

জিহাদঃ কি যোগ্যতা আছে তোমার আমার বউ হওয়ার। এসএসসি পাস ইতো করতে পারলে না। তোমার কোন সার্টিফিকেট নেই। সমাজে মুখ দেখাতে পারব না তোমাকে বিয়ে করলে। আমাদের রিলেশন আজকেই শেষ তুমি আমার সাথে কোনো যোগাযোগ করার ট্রাই করবে না এই আমি বলে দিলাম। তোমার চাইতে তো নিলা অনেক ভালো।

জিনিয়াঃ জিহাদ আমার কথাটা শুন। আজ যদি আমার সার্টিফিকেট থাকত তাহলে তুমি আমাকে এসব কথা বলতে পারতে না। অনেক বড় ভুল করলে তুমি জীবনে পস্তাতে হবে তোমাকে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।

জিহাদঃ এই তো লাইনে এসেছ। তুমি কি ভবিষ্যতে প্রসিডেন্ট হবে যে আমার পস্তাতে হবে। হাসালে তোমার মতো একজন ফেইলারের সাথে আমি কেন কেউই রিলেশন রাখবে তো দূরে থাক কেউ তো বিয়ের নামও নিবে না। যাইহোক ভালো থেক দুই বাচ্চার বাবাকে নিয়ে খুব শিঘ্রী যাতে শুনি আঙ্কেল হব।

জিনিয়া শুধু অবাকই হলো এটা কি সে জিহাদ যে জিনিয়াকে পাগলের মতো ভালোবাসত। বাড়ীর সামনে রাতের পর রাত দাড়িয়ে থাকত একটু কথা বলার জন্য। জিহাদ চলে গেল আরো অনেক অপমান করে। জিনিয়া একটা চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল মাটিতে। কেউ একজন দূর থেকে দেখছে। ভিতরে ভিতরে কষ্টে পুড়ে যাচ্ছে। সেটা আর কেউ নয় তিয়াস।

তিয়াস জিনিয়ার সামনে এসে টেনে তুলে দাঁড় করালো।

জিনিয়া তিয়াসের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে চলে আসতে নিলে….

তিয়াসঃ জিনিয়া প্লিজ, আমার কথাটা শুন। তুমি জিহাদকে যা বলেছ আমি সব শুনেছি। আমি বলছি কি…(হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়ে)

জিনিয়াঃ আমি এখন আসি।

তিয়াস কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না। কেননা, জিনিয়া তিয়াসকে দেখতেই পারে না। তিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। চলে গেল জিনিয়া। বাড়ীতে আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেল। বিয়ের নিয়ম কানুন। সহ্য করতে পারছ না জিনিয়া। সিদ্ধান্ত নিল মরে যাবে কিন্ত মরে গেলেই কি সব কিছু সমাধান হবে। না হবে না এটা ভুল সিদ্ধান্ত। মনটাকে শক্ত করল জিনিয়া আমি সৃষ্টির সেরা জীব কেন নিজেকে এভাবে। শেষ করতে যাব।

জিনিয়াঃ মা মা তুমি কোথায়? বাবা আমার কিছু কথা আছে আপনাদের সাথে।

জিনিয়ার মাঃ হ্যা বল। (মেহেদী বাটতে বাটতে)

জিনিয়াঃ আমি এই বিয়ে করব না।

জিনিয়ার মা প্রচুর রেগে যায়। মেহেদী রেখে উঠে এসেই ঠাসসসস। থাপ্পড় মারল ঠিকই কিন্তু জিনিয়া একটু ও অবাক হলো না। সে জানত এমনটাই হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না।
জিনিয়ার মাঃ আরেকবার যদি এই কথাটা বলেছিস না তোরে মেরে ফেলব। কে নিবে তোকে?

জবাবে কিছুই বলেনি জিনিয়া।

জিনিয়াঃ এতকিছু আমি জানি না বা জানতে চাইও না। আমি এই বিয়ে কিছুতেই হতে দিব না এটা আমার শেষ কথা।
জিনিয়ার মাঃ বিয়ে যদি তুই না করিস তাহলে এখনই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে তোকে।

জিনিয়াঃ ঠিক আছে, এখনই চলে যাব।

রাত আটটা….

জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জিনিয়া। থাকবে না আর এই বাড়িতে। পেছন থেকে বাবার ডাক।

জিনিয়ার মাঃ যা যা আর কই যাবি? একটু পরই আবার ফিরে আসবি। এসব ডং দেখানো হচ্ছে।

জিনিয়ারঃ আর কোন দিন ও ফিরে আসব না আমি এই বাড়িতে।

জিনিয়ার বারবার কম্পিউটারের কথা মনে পড়ছে। জিনিসের প্রতিও ভালোবেসে ফেলেছে এই বাড়ি এই ঘড়। শৈশব থেকে এতটুকু বড় হওয়া সব কিছু কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে হাটছে বোরকা পড়া হাতে একটা ব্যাগ কান্নার বেগটাও বেড়ে গেল। আজ যদি পাশ করত তাহলে তার জীবন টাও আর পাঁচটা মেয়ের মতো সুন্দর হতো। এসবই ভাবতে ভাবতে হঠাৎই ধাক্কা খেল কিছু একটার সাথে। চোখ তুলে দেখল তিয়াস দাড়িয়ে। পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই….

তিয়াসঃ জিনিয়া প্লিজ, আমার কথাটা শুন। আমি তোমাকে ভালোবাসি। জিহাদের মতো আমি তোমাকে নিয়ে উপহাস করব না।

জিনিয়াঃ আপনার কথা শেষ। এবার আমি আসতে পারি।

তিয়াসঃ জিনিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার সার্টিফিকেট কে নয়। প্লিজ, তুমি যেও না। আমি তোমাকে কখনো হার্ট করব না।

জিনিয়াঃ দয়া করে আমাকে আটকাবেন না। ফিরব একদিন। আমি সেদিন নাহয় আপনার কাছেই ফিরব।

তিয়াস অনেক জোরাজুরি করেও আটকাতে পারেনি জিনিয়াকে। চলে গেছে সে। বাসস্ট্যান্ডে এসে বসে আছে একটা বেঞ্চিতে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ব্যাগটা পাশে রেখে আশেপাশে একবার তাকাল। মাথায় হাত দিয়ে দুইহাত চোখ ডেকে কাঁদছে। তখনই মস্তিষ্ক মনে করিয়ে দিল। কাঁদলে চলবে না। চোখটা মুছে মুখের নেকাবটা ভালো করে লাগাল। মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা।

“ফিরে আসব একদিন আমি এই কিশোরগঞ্জ শহরে। সেদিন আমি একা থাকব না। আমার সাথে থাকবে আমার সার্টিফিকেট।”

নোটঃ ফেইলার একটা মেয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই।তার জীবনে সূচনা হয় নতুন একটা অধ্যায়। বিশ্ব কে তাক লাগিয়ে দেই। জাজমেন্টাল সমাজকে প্রুভ করিয়ে ছাড়ে। একটা সার্টিফিকেট কখনো কারো ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। সাথেই থাকুন। আশা করি, আপনাদের ভালো লাগবে।

সার্টিফিকেট
Ayesha Ariya Afiya
Part – 2

মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা….

“ফিরে আসব একদিন আমি এই কিশোরগঞ্জ শহরে। সেদিন আমি একা থাকব না। আমার সাথে থাকবে আমার সার্টিফিকেট।”

একজোড়া পা দেখতে পেল জিনিয়া। চোখ তুলে তাকিয়ে একটু ভয় পেল। কতগুলো বখাটে খারাপ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

জিনিয়াঃ কি চাই এখানে? (ভয়ে ভয়ে)

বখাটেঃ কি চাই, তুমি জানো না? টিয়া পাখি তোমাকে চাই।

বলেই বাজে ভাবে হাসতে লাগল। রাত আনুমানিক নয়টা। তার উপর একলা একটা মেয়ে। জিনিয়া আস্তে আস্তে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই। হাত সামনে ধরে আটকিয়ে দেই।

বখাটেঃ টিয়া পাখি কোথায় যাচ্ছ? উফফফ এত ভয় পেলে চলে। চলো আমাদের সাথে।

জিনিয়ার হাতটা ধরতে গেলেই কেউ একজন বখাটের হাত ধরে ফেলে।

তিয়াসঃ এতই যখন টিয়া পাখির শখ তো বিয়ে করে। নিজের প্রিয়তমাকে টিয়া পাখি ডাকিস।

অগ্নি মূর্তি ধারণ করে দাড়িয়ে আছে তিয়াস। জিনিয়া তিয়াস কে দেখে আরও ভয় পাচ্ছে।

বখাটেঃ এখান থেকে চুপচাপ কেটে পর তা নাহলে জান নিয়ে ফিরতে পারবি না।

তিয়াসঃ তাই নাকি!

পিটাতে শুরু করল তিয়াস। তিয়াস একা আর বখাটেগুলো চারটা কেউ পারছে না। তার উপর আবার সবগুলো ড্রিংক করা অবস্থায় কিভাবে পারবে? মেরে একেবারে তক্তা বানিয়ে ফেলেছে সবগুলো কে। তিয়াসকে একটা পাঞ্চ দিয়েছে নাক বরাবর। রক্ত পড়ছে তিয়াসের নাক দিয়ে।

জিনিয়ার কাছে তিয়াস গিয়ে দাঁড়াল। ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে দাড়িয়ে আছে।

তিয়াসঃ ভালোবাসি তো তোমাকে। তাই একা ছেড়ে দিতে পারলাম না। চলো, আমার সাথে।

জিনিয়াঃ আমি যাব না।

তিয়াসঃ কেন? তুমি এখন এত রাতে কোথায় যাবে?

জিনিয়াঃ যেদিকে দুই চোখ যায় সেদিকেই যাব। আপনি চলে যান।

তিয়াসঃ আমি তোমাকে একা রেখে যাব না। প্লিজ, আমার সাথে আমার বাড়িতে চল।

জিনিয়াঃ আমি ঢাকা চলে যাব। আপনি যেতে পারেন। আমাকে নিয়ে যদি আপনি আপনার বাড়ি তে যান তাহলে লোকে মন্দ বলবে। একটা অবিবাহিত মেয়ে আমি। আপনি যান। আমার কথা আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।

তিয়াসঃ তুমি যদি রাজি থাক তাহলে আমি এখনই তোমাকে বিয়ে করতে রাজি আছি।

জিনিয়া চোখ বড় বড় করে তিয়াসের দিকে তাকাল। তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিল।

জিনিয়াঃ আপনি বিয়ে করবেন আমাকে। যেখানে নিজের মা বাবাই আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আঁটকায়নি। অবশ্য ওনারা তো আর আমার নিজের বাবা মা না।

তিয়াসঃ জিনিয়া প্লিজ, এসব কথা বাদ দাও। তুমি আমার সাথে চলো। কেউ কিচ্ছু বলবে না।

জিনিয়াঃ আমি যাব না।

তিয়াসঃ যাবে না, ঠিক আছে।

বলেই কোলে তুলে নিল।

জিনিয়াঃ আরে কি করছেন, নামান আমাকে? নামান বলছি।

তিয়াসঃ আমি ধরলে ভালো লাগে না। জিহাদ ধরলে তো ঠিকই ভালো লাগে। নামানোর কথা বললে নিচে ফেলে দিব। তখন নিশ্চয়ই ভালো হবে না।

জিনিয়াঃ আচ্ছা, ঠিক আছে। নামান। আমি আপনার সাথে যাব।

তিয়াস নামিয়ে দিল। ব্যাগটা নিয়ে জিনিয়াকে বলল, পেছনে পেছনে আসতে। জিনিয়া বাধ্য মেয়ের মতো তিয়াসকে ফলো করছে।

তিয়াসঃ মা দরজাটা খুলো। জিন্নাত, এই জিন্নাত।

জিন্নাত দরজাটা খুলে দিল। তিয়াসের সাথে জিনিয়াকে দেখে অবাক হলো জিন্নাত।

তিয়াসঃ মা মা দেখ ভাইয়া কাকে নিয়ে এসেছে?

তিয়াসের মা এসে দেখে তিয়াসের সাথে বোরকা পড়া কেউ একজন। জিনিয়াকে দেখে এক প্রকার রেগে গেল।

তিয়াসের মাঃ এটা কে তিয়াস? কাকে নিয়ে এসেছিস তুই? আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললি। এটা কি হলো গো, আল্লাহ গো।

তিয়াসঃ মা মা আমার কথাটা শুন।

তিয়াসকে কিছু বলতে না দিয়ে। ঠাসসসসস!

তিয়াসের মাঃ কি শুনব, বল? একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিস। আবার বলছিস তোর কথা শুনতে। কোন অপয়্যা মেয়ে এল গো আমার সংসারে।

তিয়াস গালে হাত দিয়ে জিনিয়ার দিকে তাকাল। মেয়েটা নিঃশব্দে কাঁদছে। চলে আসতে নিলেই হাত ধরে ফেলে তিয়াস।

তিয়াসঃ মা না বুঝে শুনে কথা বলাটা তোমার ঠিক হয়নি। ও জিনিয়া, জিন্নাতর বান্ধবী। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে ওর মা বাবা। এত রাতে কোথায় যাবে? তাই আমি নিয়ে এসেছি। আর তুমি যা নয় তাই বলছ।

জিন্নাতঃ আরে জিনিয়া তুমি! আমি তো তোমাকে চিনতেই পারিনি। আস আস ভিতরে আস। মা ও আমার বান্ধবী, জিনিয়া। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম।

তিয়াসের মার আহজারি একটু কমল। মহিলা যা শুরু করে দিয়েছিল। জিনিয়াকে নিয়ে জিন্নাত নিজের রুমে গেল। টিনের ঘরটায় তিনটা রুম। বাবা মা বোন জিন্নাত কে নিয়ে তিয়াসের পরিবার। কোন রকমে চলাফেরা করে তারা।আশেপাশের মানুষ এসে হাজির কি হয়েছে এটা দেখতে। জিনিয়াকে দেখে কত কথাই না শুনাল।

জিনিয়া বিছানার উপর বসে আছে। জিন্নাত এক প্লেট খাবার এনে দিল জিনিয়াকে খেতে। প্রচন্ড খিদা ছিল জিনিয়ার। তাই সাত পেচ না ভেবে খেয়ে নিল। তিয়াস অনেক বার উঁকি ঝুকি দিয়েছে জিনিয়ার সাথে কথা বলতে। কিন্ত সেই সুযোগ আর হয়নি। অনেক রাতে বাড়ি ফিরল তিয়াসের বাবা। তিয়াসের মায়ের কাছ থেকে সব কথা শুনে প্রথমে রাগ হলেও পরে কিছু বলেনি।

জিন্নাতর সাথে ঘুমিয়েছে জিনিয়া। বালিশটা অর্ধেক চোখের পানিতে। তিয়াস এবার অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্সে এডমিশন নিয়েছে। জিন্নাত অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে এবং জিনিয়ার ক্লাস মেট।

সকালে চারদিকে আযান পড়ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। জিনিয়া দুইটা চিঠি লিখে ব্যাগটা নিয়ে বোরকা পড়ে বেরিয়ে পড়ল। অজানার উদ্দেশ্য কোথায় যাবে, কি করবে কিছুই তার জানা নেই। একটা চিঠি জিন্নাতর ওড়নায় বেঁধে রেখে এসেছে। আরেকটা দরজার নিচ দিয়ে তিয়াসের রুমে রেখে এসেছে। কিশোরগঞ্জ থেকে উঠে পড়ল বাসে। মাত্র পাঁচটা বাজে। ফিরে তাকাল একবার। মনে মনে বলল,

“এই পরিবেশ, এই শহর ছেড়ে যেতে চাইনি আমি। কিন্ত যেতে হচ্ছে আমাকে। কেননা আমি একজন ফেইলার। তবে ভয় নেই। ফিরে আসব একদিন। খুব শিঘ্রী।”

বাস চলতে শুরু করল। অজানার উদ্দেশ্য দীর্ঘ একটা নিঃশব্দ ছেড়ে সিটে হেলান দিয়ে দু’চোখ বন্ধ করে রাখল জিনিয়া।

সারা রাত ঘুমায়নি তিয়াস। জিনিয়াকে নিয়ে হাজার হাজার স্বপ্ন বুনেছে। দ্রুত ঘুম থেকে উঠে পড়ল। জিন্নাতর রুমে উঁকি দিল বাট দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আবারও নিজের রুমে ফিরে গেল। পায়ের নিচে কিছু একটা খচখচ করছে দেখে নিচে তাকাল। একটা চিরকুট। তিয়াসের কেমন জানি লাগছে! চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।

আপনাকে কি বলব বা কি বলা উচিত বুঝতে পারছি না। কেন এত ভালোবাসেন আমাকে? আপনাকে আমি কত অপমান করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, শুধুমাত্র জিহাদের কথা শুনে নিজের মন থেকে করিনি। হ্যা, এটা ঠিক। আমি আপনাকে দেখতে পারি না। তবে কালকের ব্যবহারেই বুঝলাম, আপনি আমাকে কতটা ভালোবাসেন। আমার অবস্থা দেখে আপনার উপহাস করা উচিত ছিল। কিন্ত সেটা না করে আরও উল্টো বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলেন। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। কালকের ব্যবহারেই আপনাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি। অসহায়ের সময় যে পাশে দাঁড়ায় তার কথাই মানুষ মনে রাখে। আমিও ভুলব না আপনার কথা। চলে যাচ্ছি অজানার উদ্দেশ্য। কেননা, আপনাদের ঘরেই তো “নুন আনতে পান্তা ফুরাই”। ফিরে আসব একদিন আমি। সেদিন আপনার কাছেই ফিরব।”
ভালো থাকবেন।

ইতি
জিনিয়া

তিয়াস কি বলবে বুঝতে পারছে না। এখন ছয়টা বাজে দ্রুত এক দৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে গেল। কাউন্টারের লোককে জিজ্ঞাসা করল।

তিয়াসঃ আচ্ছা, একটা মধ্য বয়সী মেয়ে বোরকা পড়া এমন কেউ কি এখানে এসেছিল। (উত্তেজিত হয়ে)

কাউন্টারের লোকঃ জি, একটা মেয়ে বোরকা পড়া, হাতে একটা ব্যাগ সকাল পাঁচটার বাসে উঠে চলে গেছে।

তিয়াসঃ কিহহহ চলে গেছে। আচ্ছা, এই বাসটা লাস্ট কোথায় গিয়ে থামবে?

কাউন্টারের লোকঃ কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা।

তিয়াসঃ ঢাকা আ আ আ… তুমি চলে গেলে জিনিয়া। এত কাছে থেকেও তোমায় আমার করতে পারলাম না। চিঠিটার দিকে তাকাল স্পস্ট করে লেখা “ফিরব একদিন আমি সেদিন আপনার কাছেই ফিরব।”

ফিরে এল বাড়িতে। আগে তো জিনিয়াকে দূর থেকে দেখত তাও ভালো ছিল। দেখতে পারত কিন্তু এখন তো আর কোন দিন দেখতে পারবে কিনা সেটাও সন্দেহ। বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না। কিন্তু ভিতরটা কষ্টে জ্বলে যাচ্ছে।

জিন্নাত ঘুম থেকে উঠে জিনিয়াকে পাশে না পেয়ে ভাবল, জিনিয়া নিশ্চয়ই মায়ের কাছে। কিন্তু ব্যাগটাও নেই বোরকাও নেই। ওড়নাটা কেমন যেন বলা বলা লাগছে। কিছু একটা বাঁধা তাড়াতাড়ি জটটা খুলল।

প্রিয় বোন,
জিন্নাত তোকে আর কি বলব, বল। যেখানে নিজের বোনই আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নিজে খেয়েছে। অথচ আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেনি আপু তুই খাবি। সেখানে তুমি নিজে না খেয়ে তোমার খাবারটা আমাকে দিয়ে দিয়েছ খেতে। আসলে আমি সারাদিন কিছু খাইনি তো। তাই তোমাকে আর জিজ্ঞেস করিনি তুমি খেয়েছ কিনা। তুমি আমার বান্ধবী তুমি আমার বোন। আমি তোমাকে বোন বলেই ডাকলাম। চলে যাচ্ছি। খুব কষ্ট দিলাম তোমাদের একদিন। পাড়া প্রতিবেশী অনেক কথা আমার জন্য তোমাদের শুনিয়েছে। সেজন্য আমি খুবই দুঃখিত। আমার জীবনে একটাই কষ্ট আমার মা বাবা নেই। আর যাদেরকে মা বাবা ডাকি তারাই আমাকে একবার বুঝতে চেষ্টা করল না। তোমার মায়ের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। ওনার জায়গায় আমি থাকলেও এটাই করতাম। যাই হোক, অনেক কথাই বললাম তোমার ভাইয়াকে দেখে রেখ। আর তুমি ভালোভাবে পড়াশোনা কর। এই দুনিয়াতে একটা পাসের সার্টিফিকেট ছাড়া কোন দাম নেই। ভালো থেকো বোন।”

জিনিয়া

জিন্নাত না চাইতেও কেঁদে দিল। আসলে রাতে জিন্নাত না খেয়ে জিনিয়াকে তার খাবারটা খেতে দিয়েছে। সেটা জিনিয়া দেখেছে কিন্ত কিছু বলেনি। তার প্রচুর খিদা ছিল।

সকাল নয়টা…

বাস এসে থামল এয়ারপোর্টের সামনে। একে একে সকল যাত্রীরা নেমে পড়ল জিনিয়াও বাসের টাকা দিয়ে নেমে পড়ল। নেমে তো পড়েছে কিন্ত এখন যাবে কোথায়? ব্যাগটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। যার কেউ নেই তার আল্লাহই আছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে এখনও হাঁটছে জিনিয়া। রাস্তা পাড় হওয়ার সময় এক মাইক্রোর সামনে এসে ছিটকে পড়ে জিনিয়া। সাথে সাথে ব্যাগটা হাত থেকে পড়ে যায় জিনিয়া সেন্সলেস হয়ে পড়ে। কার থেকে একজন ভদ্র লোক আর ভদ্র মহিলা বেরিয়ে এসে তাড়াতাড়ি করে হসপিটালে নেয় জিনিয়াকে। ডাক্তাররা ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে।

সেন্স ফিরে নিজেকে হসপিটালের বেডে আবিষ্কার করল জিনিয়া। মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা। এক ভদ্র লোক আর এক ভদ্র মহিলা এসে জিনিয়াকে নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করল। জিনিয়া সবকিছু খুলে বলল।

ভদ্রলোকঃ এখন তুমি কোথায় যাবে?

জিনিয়াঃ যেখানে দুই চোখ যায়, সেখানেই যাব।

ভদ্রমহিলাঃ তা আর দরকার হবে না। আমাদের বাড়িতেই তুমি থাকতে পারবে।

জিনিয়াঃ আমাকে শুধু আপনাদের বাড়িতে থাকতে দিবেন তাহলেই চলবে। আমি সব কাজ করতে পারি। মাস মাসে বেতন দেওয়া লাগবে না।

জিনিয়াকে ভদ্রলোক বাড়িতে নিয়ে গেল। বাড়িতে ওনার একটা দুই ছেলে আর দুইটা মেয়ে। একটা মেয়ে শুধু থেকে পড়ে ওদের ফুফাত বোন।

জিনিয়াকে কাজ দিয়েছে শুধু বাগানে পানি দিবে আর রান্নার কাজে ভদ্র মহিলাকে একটু সাহায্য করবে এতটুকুই। ছোট ছেলেটা শুধু জিনিয়াকে দিয়ে নিজের কাজ করায়।

ছেলেটার ভালো লাগতে শুরু করেছে জিনিয়াকে। খারাপ নজরে নই ভালো নজরেই তাকিয়ে থাকে জিনিয়ার দিকে। এভাবেই কেটে গেল ছয়টা মাস। কিন্ত কে জানত এটাই হবে তার কাল।

ভদ্র মহিলাঃ জিনিয়া জিনিয়া (জোরে জোরে চিল্লিয়ে)

জিনিয়াঃ হ্যা খালাম্মা কন।

ভদ্র মহিলাঃ আমার চেইনটা কোথায় রেখেছিস? তাড়াতাড়ি বের করে দে। (রেগে)

জিনিয়াঃ খালাম্মা আপনার চেইন কোথায়? আমি কেমনে কমু? (অবাক হয়ে)

বাড়িতে পড়তে এসেছে ওই মেয়েটা বলল, মামি আপনি ওর ব্যাগ চ্যাক করেন তাহলেই হবে। এই মেয়ে এমনি এমনি স্বীকার করবে না।

ভদ্র মহিলা এটাই করল। আর কাকতালীয় ভাবে পেয়েও গেল। ঠাসস ঠাসস!

গালে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে জিনিয়া। ঐ মেয়েটা হাসছে। ও নিজেই রেখেছে জিনিয়ার ব্যাগে। যাতে চোর সাজিয়ে বাড়ি থেকে বের করা যায়।

ভদ্র মহিলাঃ তুই তো একটা ছোট লোক। আমার আগেই বুঝা উচিত ছিল। তোদের কাজই এরকম। কতদিন ভালো নাটক করে তারপর বাড়ি থেকে জিনিস নিয়ে যায় পালিয়ে।

জিনিয়াঃ খালাম্মা, আপনি এসব কি বলছেন? আমি চুরি করিনি, বিশ্বাস করুন।

ভদ্র মহিলাঃ বিশ্বাস আবার তোকে! এখনই আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা বলছি। এই দাড়োয়ান ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন।

জিনিয়াঃ খালাম্মা, তার আর দরকার পড়বে না। আমি এখনই চলে যাচ্ছি। তবে একটা কথা বলি, আমি চুরি করিনি।

ভদ্রমহিলাঃ কি প্রমাণ আছে যে তুই চুরি করিসনি। হাতে নাতে ধরা পড়েছিস তুই, এখনই চলে যা বলছি।

জিনিয়াঃ হ্যা ঠিকই কোন প্রমাণ নেই তবে আমার ঘাড়ে দুজন ফেরেশতা আছে তারাত ঠিকই লিখে রাখবে। আজকে আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলাম না ঠিকই কিন্ত আপনার সাথে আমার হাশরের ময়দানে দেখা হবে। সেদিন সবার সামনে আল্লাহ তায়ালা প্রমাণ করে দিবে আমি চুরি করিনি।

জিনিয়া বেরিয়ে পড়ল। গেটের বাহিরে এসে বোরকাটা পড়ে ফেলল। হাঁটছে মনে মনে মা বাবা কে মনে পড়ছে। তারা থাকলে আজ গমণটা হত। রাত সাতটা বাজে জিনিয়া এখনও হাঁটছে কোথায় যাচ্ছে তার কোনো ঠিক নেই। হাটতে হাটতে চলে এসেছে নির্জন স্থানে। ভয় পাচ্ছে জিনিয়া। একদল মাতাল ছেলে ড্রিংক করে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে।

জিনিয়াকে এখনও দেখেনি তারা। জিনিয়া ভয়ে কাচুমাচু হয়ে দেওয়ার সাথে প্রায় লেপ্টে গেছে। মাতাল গুলা জিনিয়াকে দেখার আগেই।

“পেছন থেকে কে যেন জিনিয়ার মুখ চেপে ধরে রুমের ভিতরে নিয়ে গিয়ে দরজাটা খট করে লাগিয়ে দিল।”

চলবে…….

সার্টিফিকেট
Ayesha Ariya Afiya
Part- 3

মাতালগুলো জিনিয়াকে দেখার আগেই…

“পেছন থেকে কে যেন মুখ চেপে ধরে একটা রুমে নিয়ে দরজাটা খট করে লাগিয়ে দিল।”

মানুষটি চটপট রুমের লাইটটা জ্বালাল। জিনিয়া দেখে অবাক হলো।

জিনিয়াঃ কে আপনি?

মেয়েটিঃ আমি মেহেরুন, তোমার একটা বোন বললেই চলবে।

জিনিয়াঃ আপনি আমাকে কি করে…(আর বলতে না দিয়ে)

মেহেরুনঃ এখন রাত দশটা বাজে। আসলে আমি পড়া শেষ করে প্রতিদিনই বেলকনিতে আসি। আশেপাশের পরিবেশটা এনজয় করার জন্য নিচে চাইলাম। দেখি তুমি দেওয়ালের সাথে লেপ্টে আছ। তাই তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে তোমাকে মাতালগুলার হাত থেকে বাঁচালাম।

জিনিয়াঃ ওওও আপনাকে যে কি বলা উচিত আমার বুঝতে পারছি না।

মেহেরুনঃ আচ্ছা, এসব বাদ দাও। এখন এখান থেকে চল।

জিনিয়াঃ কোথায় যাব?

মেহেরুনঃ তো তুমি এত রাতে কোথায় যাবে? আমার সাথে আস উপরে যাই।

মেহেরুন চলে যাচ্ছে। বাট জিনিয়াকে আগের মতই দাড়িয়ে থাকতে দেখে।

মেহেরুনঃ ভয় নেই আমি তোমার গলা কাটব না উপরে চল এখানে থাকা যাবে না (মৃদু হেসে)

জিনিয়া পেছন পেছন মেহেরুনর পেছনে গেল।একটা রুমে ঢুকল।

মেহেরুনঃ এই শম্পা। শিরিন। রুমি এদিকে আস।

এই দেখ (জিনিয়াকে দেখিয়ে) ও হলো আমাদের একটা বোন। আচ্ছা, তোমার নাম কি?

জিনিয়াঃ নুসরাত জাহান জিনিয়া।

তারপর মেহেরুন আপু সব খুলে বলল সবাইকে। এটা পাঁচ তলা ভবন। এখানে বাসা ভাড়া থাকে অনেক মেয়েরা তারা অনার্স দ্বিতীয় বছরের স্টুডেন্ট।

শম্পাঃ চিনি না, জানি না এই মেয়েকে কি রাখাটা ঠিক হবে আমাদের সাথে। (মেহেরুন আপুর কানে কানে)

শিরিনঃ শম্পাের কথায় আমিও একমত।

রুমিঃ আমিও একই কথা বললাম, মেয়েটাকে রাখাটা কি ঠিক হবে আমাদের সাথে!

মেহেরুনঃ হেই গাইস স্টপ প্লিজ। একটা মেয়ে বিপদে পড়েছে। আর তোমরা এসব কথা বলছ। আমি নিজে এখানে এনেছি মেয়েটাকে। জিনিয়া নিজে থেকে আসেনি। মাতালগুলা যা নয় তাই করতে পারত ওর সাথে বুঝলে। তোমাদের যদি আপন বোন হত তাহলে এই কথাগুলো বলতে পারতে।

সবগুলো মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। জিনিয়া সব শুনেছে।

জিনিয়াঃ এবার আমি আসি আপু আপনি আমার ইজ্জত বাঁচালেন। তা না হলে কালকে টিভিতে আমাকে দেখাত অজ্ঞাত লাশ হিসেবে।

শম্পাঃ চুপ, কোথায় যাবি তুই? আমাদের সাথেই থাকবি, বুঝলি। (জিনিয়ার মুখ চেপে ধরে)

অতঃপর সবাই এসে জিনিয়ার মাথায় হাত বুলাল।

শিরিনঃ বোরকাটা খুলে ফেল এখানে তো কেউ নেই।

রুমি জিনিয়ার ব্যাগটা জায়গায় নিয়ে রাখল। ওরা নিজেরা রান্না করে খায়। সবার খাবার থেকে জিনিয়াকে খেতে দিল। অতঃপর কালকে তোমার সব কথা শুনব বলে নিচে বিছানা পেতে সবার সাথে ঘুমিয়ে পড়ল জিনিয়া।

সকালে…

শিরিনঃ আচ্ছা জিনিয়া, তুমি এতরাতে এখানে কি করে এলে, বলত?

সব খুলে বলল সবাইকে।

রুমিঃ কেঁদো না, বোন। সবার ভাগ্য তো আর সব কিছু থাকে না। হয়ত এমন কিছু আছে তোমার মাঝে যেটা অন্য কারো মাঝে নেই।

মেহেরুনঃ আমিও রুমিের কথায় একমত।

শম্পাঃ তাহলে তিয়াসকে কেন রেখে এসেছ? সে তো তোমাকে ভালোবাসত। (হেসে)

জিনিয়া উঠে জানালার গ্লাসটা খুলে দাড়িয়ে বলতে শুরু করল,

জিনিয়াঃ হ্যা ঠিকই বলেছেন। লোকটা আমাকে অনেক ভালোবাসত। এমনকি এখনও বাসে। কিন্ত ওনাদের পরিবারে অনেক অভাব। তিনবেলা খেতেই হিমশিম খায়। তারপর আবার আমি একজন ফেইলার যে কিনা ওদের উপর বসে বসে খাব।

রুমিঃ এভাবে বলনা প্লিজ, লোকটা সত্যিই তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তুমি বরং তার কাছে ফিরে যাও।

জিনিয়াঃ যাব তো, সাথে আরও অনেক কিছু নিয়ে যাব। আমি তো কথা দিয়ে এসেছি “ফিরব এখনও সময় আসেনি। যেদিন আসবে সেদিনই ফিরব। (চোখের পানি মুছে)

সবাই একসাথে বলআমরা আছি তোমার সাথে।

জিনিয়ার কাঁধে হাত রেখে।

জিনিয়ার জীবনের যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই। নিচে সবাই মিলে একবার টিউশনি করাত। কিন্ত এখন পড়াশোনার চাপে পড়ে সেটা বাদ দিতে হয়েছে। জিনিয়া কে শম্পা ধরল টিউশনি করাতে। ও তো সারাদিন বাসাই বসে থাকে ক্লাস প্লে নার্সারীর বাচ্চাদের তো পড়াতেই পারবে। শুরু করে দেয়। এভাবেই কাটছে দিনগুলো। জিনিয়া মাসে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা টিউশনি করে পায়। কিন্ত একটা টাকাও নিজের কাছে রাখে না সব আপুদেরকে দিয়ে দেই। জিনিয়া ভাবছে এভাবে হবনা। অন্য কিছু করতে হবে ওকে।

রুমিঃ কি রে, হলো। এখনও যদি ইজ্ঞিনটা না ঠিক করতে পারিস তাহলে কিভাবে ভার্সিটিতে প্রেজেন্টেশন করে দেখাব।

কেউই পারছে না। জিনিয়া ভালো ভাবে খেয়াল করল অতপর মুচকি হাসল।

মেহেরুনর থেকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে আবার ইজ্ঞিনটা খুলল। তারপর আবার আস্তে আস্তে জোরা লাগাল। একটা আলাদা তার লাগাতেই ফট করে আলো জ্বলে উঠল।

শিরিনঃ আমরা এতক্ষণ চেষ্টা করলাম, পারলাম না। আর তুই করে ফেললি। এটা কি করে সম্ভব বলত?

জিনিয়া মুচকি হেসে দেখাল কিভাবে করল এটা। শুরু হয় নতুন পথচলা। সারাদিন তারা মাথা খাঁটিয়ে তৈরি করল একটা ইঞ্জিন। যেটার পুরো খরচ ও নিজেই দিয়েছে টিউশনি করে টাকা জমিয়ে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় নাম ছড়িয়ে পড়ে নুসরাত জাহান জিনিয়ার। এই চার বছরে নিজেকে যে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে সেটা শুধু ও নিজেই জানে। বাংলাদেশের বিজ্ঞান জাদুঘরে তৈরি করা হয় জিনিয়ার বানানো প্রথম ইজ্ঞিন। দেখা গেল ইঞ্জিনটা ঠিক ঠাকই কাজ করছে। জিনিয়া প্রথম তৈরি করেন এনালিটিক্যাল ইজ্ঞিন। অতঃপর জিনিয়াকে কাতারে চল্লিশ তম বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশ থেকে জিনিয়া প্রতিনিধিত্ব করেছে। বিজ্ঞানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নুসরাত জাহান জিনিয়া। তিয়াস খবর টা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। কোথায় বা কোথায় খুঁজেছ জিনিয়াকে কিন্তু পায়নি।

ব্রেকিং নিউজ…

কাতারে চল্লিশ তম বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে বাংলাদেশের মেয়ে নুসরাত জাহান জিনিয়া। পঞ্চাশ টা দেশের বিজ্ঞানীকে পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছে জিনিয়া। পুরো বিশ্ব জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ওনার সাথে কথাপোকথনও হয়েছে। কিভাবে এতটা পথ এলেন সব কিছু খুলে বললেন সাংবাদিকদের। সাথে ট্রফি একহাতে সার্টিফিকেট।

হাসজ্জোল জিনিয়া এখন তার নামের সামনে যোগ হয়েছে বিজ্ঞানী। তিয়াস অনেকবার ট্রাই করেছে জিনিয়ার সাথে দেখা করার। কিন্তু সেই সুযোগ হয়ে উঠেনি। প্রায় বিশটা দেশ ঘুরেছে জিনিয়া। প্রত্যেকটা দেশের বিজ্ঞানীরা ওর সাথে হার মেনেছে। এই চার বছরে বিশ্ব কে তাক লাগিয়ে দিয়েছে নুসরাত। জয় করে নিল কোটি কোটি ভক্তের মন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির বিজ্ঞান একাডেমি তেও তার বানানো এনালিটিক্যাল ইজ্ঞিনকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে।

বর্তমানে জিনিয়া লন্ডনে আছে। লন্ডনের বিজ্ঞান জাদুঘরে জিনিয়ার এবং আর দুজন বিজ্ঞানী মিলে তৈরি করে নতুন একটি ইজ্ঞিন। যেটা জিনিয়ার ইজ্ঞিন হিসেবে স্মৃতির পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ ফিরছে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশ সরকার জিনিয়াকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় গনভবনে ডেকে পাঠান। লন্ডন থেকে ফিরেই চলে যান গণভবনে বাংলাদেশ সরকারের।

সাথে দেখা করেন প্রায় একঘন্টা কথা বলেন জিনিয়া। একটা বাড়ি গিফট করেন প্রধান মন্ত্রী। ঢাকা উত্তরাতেই থাকে এখন জিনিয়া তার সার্টিফিকেটের আজ অভাব নেই। নেই কোন ট্রফির অভাব। যখন পুরো বিশ্ব কে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তখনও জিনিয়া ঐ বাসা ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকত। সেকারণে প্রধান মন্ত্রী বাড়ির দলিল জিনিয়ার হাতে তুলে দেই।
কোটি কোটি টাকার মালিক এখন বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়া। এখন সময় এসেছে নিজ শহরে ফিরে যাওয়ার।

বাড়ির ঠিকানা পেয়ে জিনিয়ার সাথে দেখা করতে পারবে বলে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল তিয়াসের।

চলবে……

নোটঃ ক্লাস eight ফেল করে যদি মিলিওনিয়র হতে পারে তাহলে ssc. ফেল করে বিজ্ঞানী হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। জিনিয়ার প্রতিভা অনেক আগের থেকেই ছিল। কিন্ত তা এতদিনে প্রকাশ পেয়েছে।

সার্টিফিকেট
Ayesha Ariya Afiya
Part – 4

তিয়াস রওনা দিল ঢাকার উদ্দেশ্যে। যেভাবেই হোক জিনিয়ার সাথে দেখা করতেই হবে। সেই ক্লাস সিক্স থেকে ভালোবাসে যে খুব। তখন তিয়াস সবেমাত্র নাইনে পড়ে। জিনিয়া ছিল খুব সুন্দর। এখনও ওর চেহারা দেখলে যে কেউ মায়ায় পড়ে যাবে। তিয়াস বর্তমানে কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজের একজন প্রফেসর। এই কলেজেই পড়াশোনা করেছে। আবার এই কলেজেই প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে।

তিয়াসঃ জিনিয়া কি আমাকে চিনবে নাকি চিনেও না চেনার ভান করবে। করলে করতেও পারে। ও তো এই পর্যন্ত এক বারও আমার খোঁজ নেয়নি। বিশ্ব মাতানো একজন বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত আমাকে নাও চিনতে পারে। তবে আমি জিনিয়ার সাথে দেখা করেই ছাড়ব। (মনে মনে)

রুমের থাই গ্লাসটা সরিয়ে দাড়িয়ে আছে জিনিয়া। অনেক দীর্ঘ একটা শ্বাস নিল। আজ প্রচুর মনে পড়ছে। জিন্নাত আর তিয়াসের কথা। চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই নাসরীন ধরে ফেলল।

নাসরীনঃ কাঁদছিস কেন পাগলী? একদম কাঁদবি না। বিজ্ঞানীদের কান্না মানায় না। (চোখ দুটি মুছে দিয়ে)

জিনিয়াঃ আমি তো সুখে কাদছি, আপু। তোমরা না থাকলে আজ আমি এখানে দাড়িয়ে থাকতাম না। জান আপু, লোকটার কথা না আমার খুব মনে পড়ছে। কবে থেকে দেখি না। সেজন্যই মনটা একটু খারাপ।

নাসরীনঃ এসব কথা বাদ। আচ্ছা তুই এখনও কিশোরগঞ্জ যাচ্ছিস না কেন, শুনি?

জিনিয়াঃ আপু আমি চাইছি নিজেকে প্রস্তুত করে যেতে। তিয়াসকে বিয়ে করে তার স্বামীর অধিকার যাতে দিতে কোন রকম পিছুটান না থাকে সে কারণে। এতদিন আমার উপর অনেক ঝড় গেছে। আমার লাইফ রিস্কও ছিল। কিন্ত এখন পুরো পুরি সেইফ আর আরেকটা কারনে যাইনি।

আর বলতে না দিয়ে।

নাসরীনঃ তাহলে এবার আমি খালামণি হতে পার। (জিনিয়াকে জরিয়ে ধরে)

জিনিয়াঃ কি যে বলনা আপু। (লজ্জা পেয়ে)

শম্পাঃ হয়েছে হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবে না। আমরা সব শুনেছি।

শিরিন, মেহেরুন, শম্পা সবাই এসেছে।

জিনিয়াঃ আরে আপু তোমরা কখন এলে? (সবাইকে জরিয়ে ধরে)

মেহেরুনঃ অনেক ভালো আছি।

শিরিনঃ তা এবার নিশ্চয়ই আমরা খালামণি হতে পারব কি, তাইতো।

জিনিয়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। জিনিয়া সোফায় বসে আপুদের সাথে কথা বলছে। এরই মধ্য সিকিউরিটি গার্ড এসে হাজির।

সিকিউরিটিঃ ম্যাম আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে।

জিনিয়াঃ কে সে, আর নাম কি?

সিকিউরিটিঃ নাম বলল জিহাদ।

জিহাদের কথা শুনে জিনিয়ার মেজাজের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রী।

জিনিয়াঃ আমি কারো সাথে দেখা করতে পারব না বলে দিয়েন।

সিকিউরিটিঃ ম্যাম বলেছি, কিন্ত লোকটা যাচ্ছে না।

জিনিয়াঃ না যেতে চাইলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিন, বুঝলেন। আর আজকে আমি কারো সাথে দেখা করতে পারব না।

সিকিউরিটিঃ ওকে ম্যাম।

জিহাদ যেতে না চাইলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় সিকিউরিটি গার্ডসরা। সিকিউরিটি গার্ডস মোট বিশ জন এবং দশ জন সার্ভেন্ট এটা সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। জিনিয়াকে প্রটেক্ট করার জন্য।

সার্ভেন্টঃ ম্যাম ডাইনিং টেবিলে আসুন, খাবার রেডি।

জিনিয়াঃ আপনি যান, আমি আসছি।

সকালে নাস্তা করে জিনিয়া ফোনের স্কীনের দিকে এক নজরে তাকিয়ে দেখছে। বিকালে সাক্ষাৎকার আছে ওর। প্রায় দুই শত সাংবাদিকের সামনে তার জীবনের করুন কাহিনী তুলে ধরবে এবং তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিবে। তিয়াসের ফটো টাকে ভালো করে দেখছে জিনিয়া। হঠাৎ করে একটা চুমু দিল স্কীনে। জিনিয়া ফোন ইউস করে শুধুমাত্র তিয়াসের ফটো দেখার জন্য।

জিনিয়াঃ আমি খুব শিঘ্রী আসব আপনার কাছে। নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমি আপনাকে ভুলে গেছি। ভাবাটা স্বাভাবিক। আমি একবারও আপনার সাথে যোগাযোগ করিনি। প্রব্লেম নাই ভালোবাসা দিয়ে সব পূরণ করে ফেলব।

কথাটা বলেই অনেক লজ্জা পেল জিনিয়া।

তিয়াসঃ এই যে এটা কি বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়ার বাসা।

দাড়োয়ানঃ জি, এটাই ওনার বাসা।

তিয়াসঃ আমি ওনার সাথে একটু দেখা করতে চাই। প্লিজ একটু বলুন যে তিয়াস এসেছে তাহলেই হবে।

দারোয়ানঃ ম্যাম নিষেধ করে দিয়েছে। আজকে কারো সাথে দেখা করতে পারবে না।

তিয়াসঃ প্লিজ আপনি শুধু বলুন তিয়াস এসেছে তাহলেই হবে। (অনুরোধ করে)

তিয়াসের জোরাজুরি তে সিকিউরিটি গার্ড জিনিয়াকে বলল একজন এসেছে দেখা করতে।

জিনিয়াঃ আপনি বলে দিন আমি কারো সাথে দেখা করতে পারব না।

সিকিউরিটিঃ ম্যাম আপনি নামটা তো শুনবেন।

জিনিয়ার ফোন আসাতে নাম না শুনেই চলে গেল। তিয়াসের মনটা ভেঙে গেল।

তিয়াসঃ জিনিয়া ভালো থেক চলে যাচ্ছি আমি। একটু দেখা করলে কি এমন হত। তুমি তো এখন অনেক বড়লোক হয়ে গেছ কি করে চিনবে আমাকে। বেহায়ার মতো এলাম তোমার সাথে দেখা করতে। আমার তো বুঝা উচিত ছিল তুমি একজন বিজ্ঞানী। না না শুধু বিজ্ঞানী না। বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়া।

তিয়াস চোখের পানি মুছে চলে গেল এক বুক কষ্ট নিয়ে। তিয়াসকে অনেকে বলছে বিয়ে করে নিতে। কিন্ত জিনিয়াকে ছাড়া ও কাউকেই বিয়ে করবে না। সাফ জানিয়ে দেই সবাইকে। কলেজর অর্ধ শতাধিক মেয়েরা তিয়াসের প্রতি Crush। তিয়াস স্যাম বর্ন চোখে মোটা ফ্রেমের একটা চশমা। অত্যন্ত নম্র ভদ্র যা দেখে সবাই ওর প্রতি দুর্বল। আর সবচেয়ে বড় কথা আনম্যারিড স্যারদের সবাই একটু ভাব নেওয়ার চেষ্টা করে।

জিনিয়াঃ আচ্ছা ঐ লোকটা কে ছিল? আর নাম কি মাইক ফোন দিয়েছিল সেজন্য কিছু শুনতে পাইনি।

সিকিউরিটিঃ ম্যাম তিয়াস।

জিনিয়া বসা থেকে উঠে দৌড় দিল গেইটের কাছে। পাগলের মতো খুঁজছে তিয়াসকে।

জিনিয়াঃ আঙ্কেল লোকটা কি চলে গেছে মানে তিয়াস।

দারোয়ানঃ হ্যা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল, লোকটা। আচ্ছা মা তোমার কি আপন কেউ ছিল। ছেলে টাকে দেখে অনেক ভদ্র মনে হলো।

জিনিয়াঃ হ্যা আমার খুব আপন মানুষ ছিল।

সোফায় বসে মাথাটা নিচু করে বসে আছে। এত কাছ থেকে ও তিয়াসকে দেখতে পারল না। সব হয়েছে জিহাদের জন্য। ব্যাটাকে সামনে পেলে আস্ত রাখত না জিনিয়া। সেজন্য ই চলে যেতে বলেছে। জিনিয়া চায়না কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতে। এমন সময় উকিল সাহেবের আগমন।

জিনিয়াঃ আরে আপনি বসুন। পেপারস সব রেডি তো। কোন কিছু যাতে বাদ না থাকে।

উকিলঃ জি ম্যাম। কোন কিছু বাদ নেই। আপনি নিজে দেখতে পারেন। আপনার ব্যাংক একাউন্ট থেকে এই বাড়ি গাড়ি সব কিছুর পেপারস এখানে আছে। কিন্ত আপনি এসব কার নামে লিখে দিবেন।

জিনিয়াঃ তার কৈফিয়ত নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দিতে বাধ্য নই। নাসরীন আপু ওনার পাওনাটা মিটিয়ে দাও তো।

রেডি হয়ে গেল জিনিয়া। বোরকাটা পড়ে হাতে পায়ে মোজা পড়ে নিল। জিনিয়া বিজ্ঞানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরও বোরকাই ওর একমাত্র সম্বল ছিল। মোটকথা নারীদের সৌন্দর্য বোকরার ভিতরেই সুভা পাই। বেরিয়ে পড়ল কারে চড়ে বসল। চারটা গ্রুপ মিলে গিফট করেছে জিনিয়াকে প্রাইভেট কার। পৌঁছে গেল সোভায় তবে বারবার তিয়াসের কথাটা মনে পড়ছে।

একজন এসে বলল, “ম্যাম প্লিজ টেইক ইয়োর সিট।”

জিনিয়া বসে পড়ল। তার নাই কোন মেকাপ, নাই কোন অহংকার। শুধু চোখে মুখে মায়ার ছাপ জিনিয়া স্টেজে বসা পাশে আরেক জন মহিলা। আর নিচে শত শত সাংবাদিক ক্যামেরা মেন আসতে না আসতেই ফটো তুলা শুরু করে দিয়েছে। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে জিনিয়ার।

সাংবাদিকঃ শুভ জন্মদিন ম্যাম। আজ আপনার জন্মদিন উপলক্ষেই এই আয়োজন। যদিও আপনি এসব পছন্দ করেন না। তবুও আমাদের তরফ থেকে এতটুকু করতেই পারি।

জিনিয়াঃ জি ধন্যবাদ। (হাসি মুখে)

জিনিয়ার ২৩ তম জন্মদিন আজ সে উপলক্ষে সাংবাদিকরা মিলে এখানে ইনভাইট করেছে। জিনিয়া আসতে চাইনি কিন্ত মুখের উপর নাও করতে পারিনি। পুরো বিশ্ব জিনিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কি অপরুপ চেহারা তার কোন শিক্ষা গত যোগ্যতা নেই। অথচ ভাগ্যের জোরে আজ এখান বসে আছে। যেখানে বাংলাদেশের গণ্য মাণ্য ব্যক্তিরা এসে সাক্ষাৎকার দেয়। সেখানে তিন তিন বার এসএসসি ফেল করা মেয়েটা বসা। আল্লাহ চাইলে কি না করতে পারে জিনিয়ার তার প্রমাণ প্রত্যেকটা মানুষ টিভির দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়া আজ তার জীবনের করুন কাহিনী বলবে। বিশ্ব আজ তারই মুখ পানে তাকিয়ে আছে। তিয়াসও দেখছে তার ভালোবাসা কে।

সাংবাদিকঃ তো ম্যাম আজকের দিনটা নিয়ে আপনার কি ইচ্ছা ছিল যদি বলতেন?

জিনিয়াঃ সত্যি বলতে কি, আমার জন্মদিন নিয়ে কোন দিন কোন আগ্রহ ছিল না। আর আজও নেই। কেননা, আমি একজন মুসলমান এবং আমার ধর্ম ইসলাম।

রিপোর্টারঃ ম্যাম আপনি বিজ্ঞানী হওয়ার পেছনে কার বেশি অবদান ছিল এবং কে আপনাকে সাপোর্ট করেছে সবচেয়ে বেশি?

জিনিয়াঃ সাপোর্ট বলতে আমার চার আপু আগেও আপনাদেরকে বলেছি।

রিপোর্টারঃ আপনার বাড়ি আপনার পিতা মাতার সম্পর্কে কিছু বলুন?

জিনিয়াঃ আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জ। আমার বাবা ছিল সরকারি গুরুদয়াল কলেজের একজন টিচার, মা ছিল গৃহীনি। আমার যখন পাচ বছর বয়স তখনই বাবা হার্ট এ্যাটাক করে মারা যায়। তার এক বছর পর মাও বাবার সাথে হ্যান্ডসেক করে। আমার আপন কেউ না থাকায় দূর সম্পর্কের একজন আত্মীয়ের বাড়িতে বড় হই। ওনাদের কেই মা বাবা ডাকতাম।

জিনিয়া কথাটা বলেই কেঁদে দেয়। পুরো বিশ্ব কাঁপানো মেয়েটা কাঁদছে। তিয়াসের বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে জিনিয়ার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না দেখে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিল জিনিয়া।

জিনিয়াঃ আপনারা question করতে পারেন।

সাংবাদিকঃ ম্যাম আপনাকে নিয়ে তুমুল ঝড় বইছে মিডিয়া পাড়ায়। তাও আপনি সমালোচকদের কিছু বলছেন না কেন?

জবাবে জিনিয়া বলে,

জিনিয়াঃ দেখুন মিস্টার সায়ান, আমাকে অনেক ভাবে হার্ট করে কথা বলেছে। এমনকি কালকে ফোন দিয়েও বিজ্ঞান সম্বন্ধে অনেক আজেবাজে কথা বলেছে। আমি কিছু বলিনি বলতে বলার প্রয়োজন মনে করিনি। এই লোকের সাথে কথা বলার কোন ইচ্ছা আমার নেই।

সাংবাদিকঃ তারমানে কি ওনার দেওয়া সব অপবাদ আপনি মেনে নিচ্ছেন?

ক্ষেপে যায় জিনিয়া। অবশ্য যাতে রাগ উঠে সেজন্যই কথাটা বলা হয়েছে। তাও নম্র ভাবে অত্যন্ত শান্ত গলায় জবাব দেয়।

জিনিয়াঃ সত্যি বলতে আমি কোন কুকুরের সাথে কথা বলতে চাই না। মিস্টার সায়ান আমি আপনাকে কুকুরের সাথে তুলনা করলাম। আপনি নিজে একজন বিজ্ঞানী হয়ে কি করে আমার সমালোচনা করতে পারেন। অবশ্য আমি অনেক সময় অবাক হই আমাকে নিয়েও সমালোচনা করার মানুষের অভাব নেই।

পুরো সভা স্তব্ধ। কেউ ভাবেনি জবাবটা এমন হবে। সব সময় জিনিয়াকে হেয় করে কথা বলে সায়ান এবং তার চামচারা। এবার দাঁত ভাঙা জবাব জিনিয়া নিজেই দিল।

জিনিয়াঃ আমার মনে হয় ওনি আমাকে পছন্দ করে যে কারণে ফোন দিয়ে বিভিন্ন পেপারে আমার নামে সমালোচনা করে। ওনি তো বুঝতেই পারছেন আমি কোন কুকুরের সাথে কথা বলতে চাই না। তো বার বার কষ্ট করে কেন আমার পেছনে লাগতে আসে। অবশ্য আমি তো অনেক সুন্দরী।

সায়ান টিভিতে দেখছে জিনিয়া কিভাবে তার মান ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে দিল। ছি ছি কি লজ্জা!

রিপোর্টারঃ ম্যাম তার মানে আপনি মিস্টার সায়ানকে কুকুরের সাথে তুলনা করলেন?

জিনিয়াঃ জি, মিস্টার সায়ানের যদি বিজ্ঞান বুঝাতে এতই ভালো লাগে তো বাংলাদেশে একটা বেসরকারি চ্যানেলে প্রতিদিন এক থেকে দুই লাইন বাংলাদেশের মানুষকে বিজ্ঞান বুঝাক। শুধু শুধু আমার মতো সুন্দরী মেয়ের পেছনে কেন লাগতে আসে। আসলে কি বলুন তো, কুকুরের লেজ কখন সোজা হওয়ার নই আর এটা কখন সোজা হবেও না।

জিনিয়া সায়ানকে হেয় করেই কথাটা বলেছে। ব্যাটার সব শেষ ইশশ জিনিয়ার পেছনে লাগতে এসেছে। বুঝ এবার ঠ্যালাপাবলিক প্রচুর ক্ষেপে গেছে সায়ান বেচারা ভয়ে কাচুমাচু কেননা পাবলিকের হাতের মাইর এখন নিশ্চিত ভেবেছে জিনিয়া একা যা ইচ্ছা বলবে কিন্ত পুরো বাংলাদেশর মানুষ যে তার পক্ষে সবাই মিলে তো আর একা না।

রিপোর্টারঃ আপনার লাইফ সম্পর্কে কিছু বলুন?

জিনিয়া প্রথম থেকে সব টুকু বলল। অনেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

জিনিয়াঃ কেউ একজন বলেছিল, তোমার কপালে দুই বাচ্চার বাপকেই মানায়। তোমার সাথে রিলেশন রাখবে তো দূরে থাক কেউ তোমার মতো মেয়ে কে বিয়েই করবে না। (মৃদু হেসে)

জিনিয়াঃ কারো বাসা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল। আমাকে বলেছিল, ‘আমি নাকি চোর। চেইন চুরি করেছি।’

ঐ বাসার সবাই দেখছে। ভদ্র মহিলা মাথা নিচু করে বসে আছে। কি লজ্জা, শয়তান মেয়েটাও দেখছে।

জিনিয়া একটু দম নিয়ে পুরো বিশ্ব কাপছে তার উত্তর শুনে।

রিপোর্টারঃ ঐ লোকের নামটা কি বলা যাবে যারা আপনার সাথে বাজে বিহেভ করেছে?

জিনিয়াঃ স্যরি আমি বলতে পারব না। যারা এমন করেছে তারা তো আমার কথাগুলো শুনছে এবং দেখছেই। আজ এত এত পার্সেল আসে যা অনেক আমি এখনও দেখাই হয়নি। বেশির ভাগই ডায়মণ্ডের নেকলেস সেট, কানের দুল, আংটি। এসব আমার ভালো লাগে না এসব পড়তে। একটা রুমে তালাবদ্ধ আছে সব গুলো পার্সেল।

আবারও বলতে শুরু করল।

জিনিয়াঃ কেউ একজন বলেছিল, ‘খুব শিঘ্রী যাতে আঙ্কেল হব শুনতে পারি। সেটা খুব শিঘ্রী পূরণ হবে ইনশাআল্লাহ। (লজ্জা মাখা মুখে)

তিয়াস অবাক হলো। জিনিয়া কাকে বিয়ে করবে। জিহাদ দেখছে শুনছে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল সেদিন। জিহাদকে সিকিউরিটি গার্ডসরা।

রিপোর্টারঃ তারমানে কি ম্যাম আপনি খুব শিঘ্রী বিয়ে করে ফেলবেন।

জিনিয়াঃ জি, তবে এখনও সেটা ফাইনাল হয়নি। যদি হয় তো আপনাদের অবশ্যই জানাব।

সাংবাদিকরা সব কিছু নোট করছে। প্রত্যেকটা চ্যানেলে দেখাচ্ছে জিনিয়াকে।

জিনিয়াঃ কেউ একজন বলেছিল, ‘তুমি কি প্রেসিডেন্ট হবে যে আজ তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি বলে পস্তাতে হবে।’ লোকটা আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করেছিল। তাও আবার আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে বাজি ধরে। আর আজ আমাকে প্রপোজাল ঠিক তেমনই অফার দিচ্ছে। প্রতিদিনই পার্সেল আসে কেউ কেউ ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাব দেই। কিন্ত আমি সরাসরি মানা করে দেই।

রিপোর্টারঃ আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন কিংবা করতেন প্লিজ বলুন। এটা আমার প্রশ্ন না শত শত মেয়েদের প্রশ্ন?

জিনিয়া কিছু বলছে না তিয়াস রিমোট খুজছে তারাতারি টিভি অফ করতে। কেননা, তিয়াস জিনিয়ার মুখে জিহাদের নামটা শুনতে পারবে না। তিয়াসকে বিশ্ব কে গোটা বাংলাদেশ কে অবাক করে দিয়ে।

জিনিয়াঃ আমার লাইফে একজনই ছিল এবং এখনও আছে থাকবে। সে আমার মনের মানুষ আমার ভালোবাসা তিয়াস রহমান।

তিয়াস নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। জিনিয়া ওকে ভালোবাসে। এখনও মনে রেখেছে। জিনিয়া সবাইকে আরো অবাক করে দিয়ে। ফোনের স্কীনটা সামনে ধরল। তিয়াসের ফটো।

জিনিয়াঃ যাকে আমি ভালোবাসি এই সে তিয়াস রহমান। আমি টাচ মোবাইল ইউজ করি শুধুমাত্র তিয়াসের ফটো টা দেখার জন্য। এই ফোনটা আমাকে মাইক দিয়েছে ওনি যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। আমাকে বাটন ফোন ইউস করতে দেখে ফোনটা গিফট করে ছিল। আজ ও এসেছিল কিন্ত আমি ব্যস্ত থাকায় দেখা না করেই সিকিউরিটি গার্ড তাড়িয়ে দিয়েছে খুব কষ্ট লাগল আমার। ও হয়ত ভাবছে, আমি ওকে ভুলে গেছি কিন্ত না। আজকে একটা সত্যি কথা বলছি। তিয়াস শুনছেন আপনি নিশ্চয়ই টিভির সামনে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁদছেন। জানেন প্রথমে যখন স্বীকৃতি পায় আমি একজন বিজ্ঞানী সেদিন ই ইচ্ছা ছিল আপনার সাথে দেখা করার। আপনাকে বিয়ে করে স্বামীর অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু….

জিনিয়া কাঁদছে এই কান্নার বাঁধ থামছে না।

জিনিয়াঃ একদিন লন্ডনে সেন্সলেস হয়ে যায়। মেডিকেল রিপোর্ট আসে আমার মাথায় টিউমার। আমি বাঁচতেও পারি আবার মারাও যেতে পারি কথাটা শুনে ভেঙে পড়েছিলাম আমি। কদিন আগে লন্ডনে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র অপারেশন করানোর জন্য এই ছোট্ট জীবনের সাথে আপনাকে জরিয়ে কি লাভ। তাই নিজেকে সামলে নিতাম সব সময়। যাতে আপনার মনে হয় আমি আপনাকে ভুলে গেছি। আর আপনি আমাকে ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হবেন।

প্লিজ আজকের মতো এখানেই শেষ। অন্য আরেক দিন আপনাদের সাথে কথা হবে।

কাঁদতে কাঁদতে সভা থেকে বেরিয়ে আসে জিনিয়া। বাসায় এসে রুমে ধপাস করে শুয়ে পড়ে বোরকা না খুলেই। তিয়াস ভাবতে ও পারেনি এতকিছু হয়ে গেছে। আর ও কিনা কত কিছু ভেবেছে জিনিয়ার ব্যাপারে।

তবে জিনিয়া তিয়াসকে ভালোবাসে এতেই তিয়াস খুশি।

জিনিয়াকে ইনভাইট করেছে, কিশোরগঞ্জের কয়েকটা স্কুল এন্ড কলেজে কালকেই যেতে হবে। আজকে রাতটা যেনা কাটছে না। জিনিয়ার কখন নিজ শহরে ফিরবে কখন তিয়াসের সাথে দেখা হবে। কালকেই রওনা দিবে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্য।

তিয়াসেরর ফোনে একটা মেসেজ দিল জিনিয়া।

“বলেছিলাম, একদিন আপনার কাছে ফিরব। সেই সময় এসে গেছে। কালকের জন্য স্যরি। আমাকে প্রথম অভিনন্দন যাতে আপনি আমাকে দেন। আজকে আর কথা বলব না। কালকে আপনার সাথে আমার কথা হবে। একটা সারপ্রাইজ আছে আপনার জন্য।”

জিনিয়া

মেসেজ টা পড়ে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না তিয়াস।

সকালে হেডলাইনে দেখাচ্ছে মিস্টার সায়ানের বাড়ি পাবলিকে ইট দিয়ে ভাঙ্গচুর করেছে। সায়ানকে অবশ্য পাইনি ব্যাটা বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে। তা নাহলে পাবলিকে পিটিয়ে নাজেহাল অবস্থা করত। আর জীবনে লাগতে আসবে না জিনিয়ার সাথে।

সকাল ১০ টা….

খুশির ঠ্যালায় কিছু খেতেও পারেনি জিনিয়া। দ্রুত পেপারস গুলা আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে ভরে নিল। বোরকা টা পড়ে হাতে পায়ে মোজা লাগিয়ে নিল। দেন বেরিয়ে পড়ল। এয়ারপোর্ট গিয়ে আবার জ্যাম সাংবাদিকদের সাথে কোন কথা না বলে ভিতরে চলে গেল জিনিয়া। ভিআইপি পার্সন সবাই অনেক সম্মান দিচ্ছে। টিকিট আগে থেকেই কাটা ছিলসাথে শিরিন। নাসরীন আর জিনিয়া তারা তিনজনই যাবে। অন্য দিকে তিয়াস অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জিনিয়ার আসার পথ চেয়ে কখন আসবে আর মন ভরে দেখবে। সিকিউরিটি হিসেবে প্রথমে rab গেল হেলিকপ্টারে। তারপর জিনিয়া যাবে তারপর আবারও rab ফোর্স প্রচুর সিকিউরিটি গার্ডস দিচ্ছে জিনিয়াকে। কেননা, জিনিয়া বাংলাদেশের সুনামধন্য মানুষের মধ্যে একজন। ওর শত্রুর অভাব নেই।

হেলিকপ্টারে উঠে পড়েছে জিনিয়া। খুব খুশি লাগছে তার এই সেই শহরে যাচ্ছে। যেখান থেকে প্রায় চার বছর আগে ঘুটঘুটে রাতের অন্ধকারে চলে এসেছিল ভাগ্যের সন্ধানে। উড়াল দিল কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্য বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়ার নিজ শহরে। আজ তার কত সুনাম হাজার হাজার মানুষ জিনিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে কখন আসবে জিনিয়া কখন দেখবে তাকে। কিশোরগঞ্জের মেয়ে যেকিনা ফেইলার হয়েও বিশ্ব কে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

চলবে……..

সার্টিফিকেট
Ayesha Ariya Afiya
Last – Part- 5

জিনিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ তার কত সম্মান কত ইজ্জত আরও কত কিছু। উপর থেকে দেখা যাচ্ছে দালান কোটা গুলো পিঁপড়ার মতো বেশিক্ষণ সময় লাগল না কিশোরগঞ্জে পৌঁছাতে। হেলিকপ্টার নামল গুরুদয়াল কলেজ মাঠে। কলেজের প্রন্সিপালরা এগিয়ে এসে অভিনন্দন জানাল। তিয়াস অনেক দূরে দাড়িয়ে দেখছে জিনিয়াকে এখনও সামনে আসেনি। জিনিয়া নেওয়া হলো স্টেজে স্বসম্মানে তিয়াসকে দূরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে প্রচুর রেগে গেছে বলেছিল কি আর তিয়াস করল কি।

প্রায় দশমিনিট কথা বলল জিনিয়া অতপর তিয়াস সামনে এলো।

জিনিয়াঃ কেমন আছেন আপনি? (তিয়াসের মুখের দিকে তাকিয়ে)

তিয়াসঃ আলহামদুলিল্লাহ ভালো যেমন রেখে গিয়েছিলে। (চোখ দুটো ছলছল করে)

আজকে দুজনের দুজনকে দেখে যেন আয় মিটছেনা। একজন আরেক জনকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

জিনিয়াঃ কারে উঠুন।

তিয়াসঃ কেন?

জিনিয়াঃ যেটা বলছি সেটা করুন।

তিয়াস জিনিয়ার পাশে বসে পড়ল ওদের সম্পর্কর কথা সবাই জানে। গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে এখন যাচ্ছে জিনিয়ার স্কুলে। তিয়াসের ঘাড়ে মাথাটা রাখল জিনিয়া। তিয়াস জিনিয়ার মুখে শুধুমাত্র একটু তফাৎ পৌঁছে গেল। স্কুলে যেখানে একসময় আসলে বলত এই যে দেখ জিনিয়া আসছে। এবারও মনে হয় পরীক্ষা দিবে হাসাহাসি করত মেয়েরা স্কুলের স্যাররাও এমন ধরনের কথাই বলত লজ্জা দিত। আজ সেই স্কুলেই তাকে সম্মানের সহিত গ্রহণ করছে। মানুষ পারে না এমন কোন কাজ নেই।

তিয়াসঃ জিনিয়া, তুমি জানতে একদিন বিজ্ঞানী হবে।

জিনিয়া মাথা নাড়াল।

তিয়াসঃ কিন্তু এটা কি করে সম্ভব।

জিনিয়াঃ এসবের প্রতি আমার ছোট বেলা থেকেই আগ্রহ ছিল কিন্তু।

কিছু বলার আগেই কার থামল স্কুল মাঠে। চারদিকে হৈ হুল্লোড় চলছে জিনিয়া এসেছে।

জিনিয়াকে স্কুলের পক্ষ থেকে একটা ট্রফি দিল।

জিনিয়া স্টেজে দাড়িয়ে বলল নিয়ের হাত থেকে এটা নিবে। অতপর সবাই তিয়াসকে রিকুয়েষ্ট করল স্টেজে উঠে তিয়াস জিনিয়াকে ট্রফিটা দিল।

বেরিয়ে পড়ল অজানা গন্তব্য।

তিয়াসঃ এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?

জিনিয়াঃ সেটা গেলেই দেখতে পারবেন। আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।

কার থামল একটা কাজী অফিসের সামনে।

জিনিয়াঃ সই করুন।

তিয়াসঃ কিসের পেপার এটা।

জিনিয়াঃ আমাদের বিয়ের পেপার।

তিয়াসঃ বিয়ে মানে। (অবাক হয়ে)

জিনিয়াঃ তো বিয়ে না করে কি বাসর করবেন নাকি ব্যাটা লুচু। (কানে কানে)

জিনিয়ার কথাগুলো সব তিয়াসের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।

জিনিয়াঃ ওকে আপনাকে বিয়ে করতে হবে না৷। আমি নাহয় জিহাদকেই।

বের হওয়ার জন্য পা বাড়াবে এমন সময়।

তিয়াসঃ জিহাদ কি হ্যা, জিহাদ কি মেরে ফেলব জিহাদের নাম মুখে নিলে।

দুটো ঝগড়া করছে আর কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় এনে ড্যাবড্যাব করে দুজনের ঝগড়া দেখছে।

তিয়াসঃ এত গুলা পেপারস কেন?

জিনিয়াঃ সেটা আপনার না জানলেও চলবে।

বিয়ে হয়ে গেল দুজনের বাহিরে এসে শিরিন আর নাসরীন কয়েকটা ফটো তুলে সাংবাদিকের কাছে মেইল করে দিল। তিয়াস জিনিয়াকে বাড়িতে নিয়ে গেল।

জিনিয়াঃ কেমন আছ জিন্নাত? মা আপনি কেমন আছেন?

জিন্নাতঃ ভাবি।

তিয়াসের মাঃ আমাকে মাফ করে দিস মা। আমি না বুঝে তোকে অনেক কথা শুনিয়েছি।

জিনিয়াঃ বিশ্বাস করুন, আমি কিচ্ছু মনে করিনি। আপনার জায়গায় আমি থাকলেও এটাই করতাম।

জিন্নাতঃ ভাবি ভিতরে আস।

পাড়া প্রতিবেশী এসে হাজির জিনিয়ার মা বাবা এবং বোনও এসেছে। সবাইকে মাফ করে দিয়েছে জিনিয়া। তিয়াসের রুমে জিনিয়াকে রেখে জিন্নাত কেটে পড়ল। তিয়াস রুমের সামনে পাইচারি করছে ডুকবে কি ডুকবে না। দরজা ঠেলে রুমে ডুকতেই একগুচ্ছ আলোক রশ্মি এসে তিয়াসের চোখে মুখে পড়ল। জিনিয়া একটা টর্চ লাইট আবিষ্কার করেছে যেটার পাওয়ার বিপুল কারও চোখে মুখে পড়লে সাথে সাথে চোখ দুটো অফ হয়ে যায়।

জিনিয়াঃ তা কি মিস্টার বাসর করার এত তাড়া।

তিয়াসঃ অনেক কাঁদিয়েছ আজকে আর ছাড়ছি না তোমায় নিজে এসে যখন ধরা দিয়েছ। (ডেভিল স্মাইল)

জিনিয়াঃ তাই বুঝি মিস্টার কানা।

তিয়াসঃ কিহহ আমি কানা।

জিনিয়াঃ তো কি।

তিয়াসঃ আচ্ছা বাদ দাও তোমার বিজ্ঞানে কানাকে কিভাবে সম্বধন করে শুনি।

জিনিয়াঃ দেখবেন।

ধাক্কা মেরে বেডে ফেলে দিল তিয়াসকে। নিজের ঠোঁট জোড়া দিয়ে তিয়াসের ঠোঁটে মিশিয়ে দিল। তিয়াস চোখ বড় বড় করে দেখছে জিনিয়াকে।

তিয়াসঃ কি করছ আরি আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারব না।

জিনিয়াঃ কে বলেছে নিজেকে কন্ট্রোল করতে।

তিয়াসঃ তাই নাকি!

শীতের রাত প্রচুর ঠান্ডা পড়েছে। বাহিরে দুজন মানুষ এক জন আরেক জনের ভালোবাসায় শিহরিত হচ্ছে। মিলিত হলো দুটি দেহ দুটি মন। যার অপেক্ষায় ছিল এতদিন। ভালোবাসার মায়াজালে জরিয়ে নিল দুজন দুজনকে।

সকালে….

জিন্নাতঃ এই ভাই আর কত ঘুমাবি। এবার তো উঠ। ভাবি তুমি নিশ্চয়ই সারা রাত ঘুমাতে পারনি। আহা কি কষ্ট।

জিন্নাতর চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভাঙ্গল। তাদের সকাল আটটা বেজে গেছে এখনও ঘুমিয়ে আছে দুজন।

জিনিয়াঃ এই যে মিস্টার কানা হা করে কি দেখছেন? এবার ছাড়ুন আমাকে।

তিয়াসঃ নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে। তারপর আমাকে বলতে এস ওকে। (চুমু দিয়ে) মর্নিং কিস।

তিয়াসের কথায় জিনিয়া লজ্জা পেল।

তিয়াসঃ কে যেন মিডিয়ার সামনে বলেছিল কাকে যেন আঙ্কেল বানাবে।

জিনিয়াঃ আমাকে ট্যাপে ফেলে এখন কীর্তন গাওয়া হচ্ছে। বারি মেরে মাথা ফাটিয়ে দিব বলে দিলাম ছাড়ুন বলছি।

তিয়াসের মা, বাবা, জিন্নাত, জিনিয়ার মা, বাবা সবাইকে নিয়ে চলে আসে ঢাকায়। দিনগুলো এভাবেই কাটছে দুষ্ট মিষ্টি খুনসুটি তে। তিয়াস ট্রান্সফার করে ঢাকা চলে আসে জিহাদ কম চেষ্টা করেনি জিনিয়াকে বসে আনতে বাট ফেল।

তিয়াসঃ জিনিয়া তোমার কানাডায় না গেলে হয়না।

জিনিয়াঃ বাঁধা দিয়েন না আমাকে যেতেই হবে।

জিনিয়া সকল প্রপারটি তিয়াসের নামে করে দিয়েছে। কোন কিছু ওর নিজের নামে নেই।

এয়ারপোর্টে এসে ভিতরে ঢুকবে জিনিয়া এমন সময় তিয়াস দূর থেকে ফ্লায়িং কিস ছুঁড়ে দিল। সাংবাদিকদের চোখ এড়ায়নি, না এড়িয়েছে ক্যামেরা মেনের চোখ। দুই দিনের সফর। বিয়ের পর একটা ফটোতে জিনিয়াকে দেখা যাচ্ছে ল্যাপটবে কাজ করছে। আর তিয়াস গালে হাত দিয়ে জিনিয়াকে দেখছে। আরেকটা ফটোতে তিয়াস ফোন টিপছে। আর জিনিয়া তিয়াসের দিকে মুখটা ফ্যাকাশে করে আছে। ফটোটাতে এটাই ফুটে উঠেছে। তিয়াস ফোনে সময় দিচ্ছে বাট জিনিয়াকে সময় দিচ্ছে না।

জিনিয়া আবারও ফিরে এল বাংলাদেশে। বর্তমানে রোবট আবিষ্কার কাজে মগ্ন আছে বিজ্ঞানী। হঠাৎই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায় জিনিয়া।

ডাক্তারঃ ভয়ের কোন কারণ নেই। এই যে কয়েকটা টেস্ট লিখে দিলাম। কালকে মেডিকেলে গিয়ে করিয়ে নিবেন। বেশি রাত জাগবেন না আপনার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না।

মেডিকেল রিপোর্টে এসেছে পজিটিভ খুশির জোয়ার বয়ে যাচ্ছে বাড়িতে। আর খবরটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। অলরেডি প্রত্যেকটা মানুষের কমেন্ট কংগ্রাচ্যুলেশন।

জিনিয়াঃ আপনি খুশি তো।

তিয়াসঃ মিসেস রহমান সেটা কি মুখে বলতে হবে।

তিয়াস ছোট্ট করে একটা চুমু দিল জিনিয়ার কপালে।

মুভি শেষ (ও আপনাদের তো বলাই হয়নি এতক্ষণ কিন্তু আপনারা সবাই মুভি দেখছিলেন)

জিনিয়া, তিয়াস, তিয়াসের মা, বাবা, জিনিয়ার মা, বাবা সবাই উঠে পড়ল। জিনিয়া বেলকনিতে গিয়ে দাড়িয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে প্রাকৃতিক পরিবেশটা উপভোগ করছে। চোখের কোণা বেয়ে পানি পড়ছে।

তিয়াসঃ জিনিয়া তুমি কেন কাঁদছ? দেখ, আজ তুমি তিন তিন বার ফেল করে ও বিশ্ব কে দেখিয়ে দিয়েছ একটা সার্টিফিকেট কখনও কারো ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। আর দেখ নিরব কাঁদছে।

জিনিয়াঃ নিরব (জিনিয়া তিয়াসের ছেলে) কোথায়? ওকে ঘুম পাড়ান আপনি। আমি এখানে দাড়িয়ে থাকব।

আধা ঘন্টা পর তিয়াস পেছন থেকে জিনিয়াকে জরিয়ে ধরল। সাংবাদিকরা ভীড় করছে গেইটের বাহিরে।

জিনিয়ার জীবনি নিজে এই পর্যন্ত বিশটি মুভি নির্মাণ হয়েছে। আর মুভির নাম “সার্টিফিকেট” এতক্ষণ আপনারা সার্টিফিকেট মুভিটাই দেখছিলেন। বলিউড, টালিউড, টলিউড সব জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বলিউডে আয় করেছে ৩০০ কোটি রুপি বিলাশ বহুল মুভি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অবশ্য প্রথমে সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিতে চাইনি। কেননা মুভিটাতে পরিচালক জিনিয়ার জীবনিকে আরেকু ভিন্ন ভাবে সাজিয়ে ছিল। তাই এইটুকু কেটে তারপর সেন্সর ছাড়পত্র পাই মুভিটি। মুভির নিচে অসমাপ্ত লিখা কেননা জিনিয়া তার জীবনি একটা ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে ছিল। সে তার জীবনির নিচে লিখেছিল অসমাপ্ত। English For today ক্লাস সিক্স এর প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপানো হয় জিনিয়ার জীবন কাহিনি। আই সিটি বইটাতেও বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়ার এনালিটিক্যাল ইজ্ঞিন সম্পর্কে লেখা হয়েছে। জিনিয়ার জীবনি পুরো বিশ্ব আজ পড়ছে। দেখছে কিভাবে জীবন যুদ্ধে জয়ী হলো।

আবারও এসেছে একজন পরিচালক। এসে সুন্দর করে লিখে অনুমতি নিতে এসেছে মুভির নির্মানের জন্য। জিনিয়া লেকটার জন্য সার্ভেন্টদের ইশারা করতেই সার্ভেন্টরা খাবার সাজিয়ে দিয়ে গেল। জিনিয়া পুরোটা পড়ল একটা জায়গায় চোখ আটকে যায়। সব শেষে লেখা সমাপ্ত। পেন দিয়ে একটানে কেটে নিজে লিখে দিল অসমাপ্ত।

পরিচালকঃ স্যরি ম্যাম আমার ভুল হয়ে গেছে। বুঝতে পারিনি।

জিনিয়াঃ ইটস ওকে।

আজ প্রত্যেকটা সমাজে রাষ্ট্রে পরিচিত নুসরাত জাহান জিনিয়া। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার যুবকের কর্ম সংস্থান হয়েছে জিনিয়ার ইঞ্জিন ব্যবহার করে। যেটা অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্ত এখন বাংলাদেশেই পাওয়া যায় কোটি কোটি টাকা আজ তার ব্যাংক একাউন্টে। আল্লাহ চাইলে কি না হয়। জিনিয়ার জীবনি পড়ে মেয়েরা আজ নিজেকে একটু হলেও স্বাবলম্বী ভাববে। তিয়াস বলেছিল, জিনিয়াকে পড়াশোনা করতে। আর জিনিয়া জবাবে বলেছে, আমাকে দেখে এই সমাজ এই রাষ্ট্রের মানুষ শিখবে। যে দিন বার এসএসসি ফেল করেও ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় তার নাম বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়া।

জিনিয়া শুধু কিশোরগঞ্জের গর্ব না জিনিয়া বাংলাদেশের গর্ব। জাজমেন্টাল সমাজ আজ নিশ্চুপ একটু হলেও ধারণা পাল্টিয়েছে তাদের জিনিয়াকে দেখে।

ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে রয়ে গেল জিহাদের মতো একজন প্রমিক যে কিনা তার প্রমিকার অসহায়ের সময় তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। থেকে গেল জিনিয়ার দূর সম্পর্কের মা বাবার কথা। থেকে গেল ঐ বাড়ির শয়তান মেয়ে ভদ্রলোক ভদ্রমহিলার কথা। যারা কোন কিছু বিবেচনা না করে জিনিয়াকে চোর বলে সাবস্ত করেছিল। থেকে গেল তিয়াসের মতন একজন খাঁটি প্রেমিক যে কি না অসহায়ের সময় জিনিয়াকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মোরাতে চেয়েছিল। থেকে গেল জিন্নাতর কথা যে কি না নিজে না খেয়ে জিনিয়াকে খেতে দিয়েছিল।

বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়ার কয়েকটি উক্তি রয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়।

  • মানুষ কখনও হারে না হারতে পারেনা। হয়তো বা তুমি জিতবে নয়তো বা তুমি শিখবে।
  • যে গাছের ফল বেশি মিষ্টি সেই গাছে ঢিল পড়ে বেশিদুনিয়াতেও ভালো হয়ে চলতে গেলে কষ্ট বেশি।
  • ধান গাছের ফাঁকে ফাঁকে কিছু কিছু আগাছা তো থাকবেই। সেটা স্বাভাবিক কিন্ত আগাছা গুলো কে কখনো মাথা উঁচু করতে দিবেন না। তার আগেই ছেঁটে ফেলবেন।
  • কুকুরের লেজ কখনো সোজা হওয়ার নয় আর কখনো সোজা হবেও না। কুকুরের লেজ সোজা করা মানুষের কাম্য নয়। কুকুর তো ঘেউ ঘেউ করবেই তাই বলে আপনি থেমে থাকবেন না এগিয়ে যান।
  • পাছে লোকের কথায় কান দিবেন না। কুকুর কামড় দিলে আপনি ও যাবেন না কামড় দিতে। তাহলে মানুষ আর কুকুরের মধ্য কোনো তফাত থাকবে না। আমরা ” আশরাফুল মাখলুকাত” সৃষ্টির সেরা জীব কথাটা ভুলে যাবেন না।
  • একটা সার্টিফিকেট কখনো কারো ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। কেননা, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের ভাগ্য জন্মের ৭০ হাজার বছর আগেই তৈরি করে রেখেছে।
  • শুধুমাত্র এলার্জি তে চুলকানি হয়না কিছু কিছু মানুষের অন্যের ভালো দেখলেও চুলকানি হয়।
  • আপনি গরীব পরিবারে জন্মেছেন এটা আপনার দোষ নয়। আপনি নিজেকে অহংকারী ভাবেন এটা দোষ।
  • চলার পথে যদি বাঁধা আসে তাহলে সেই বাঁধাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়ে নিজের লক্ষ্যে স্থির রেখে এগিয়ে যান। সফল একদিন আপনি হবেনই।
  • ফেল করেছেন বলে আত্মহত্যার পথ বেছে না নিয়ে। আপনার মধ্যে কি প্রতিভা আছে সেটা খুঁজুন উপরওয়ালা কখনো কাউকে নিরাশ করে না। হয়তো আপনার মধ্য এমন কিছু আছে যা অন্যর মধ্য নেই।

আবারও ভীড় করছে সাংবাদিকরা তিয়াস জিনিয়াকে নিয়ে বসে আছে বেলকনিতে। তিয়াস জিনিয়ার চশমাটা ঠিক করে দিয়ে দুই গালে ধরে একটা চুমু দিল কপালে। জিনিয়ার চোখ থেকে পানি পড়ে তাই চশমা ব্যবহার করতে হয়। আজ অনেক শিরিন জিনিয়া স্বামীর সাথে সুখে সংসার করছে। তাদের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে এসেছে নিরব বিশ্ব কে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। জাজমেন্টাল সমাজকে প্রুভও করিয়ে ছেড়েছে একটা “সার্টিফিকে” কখনও কারো ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। তার জীবনের অবিস্মরণীয় এবং স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে মুভি “সার্টিফিকেট”।

বিজ্ঞানী নুসরাত জাহান জিনিয়া বারবার একটা কথাই বলেছিল “আমার জীবনির শেষে কখনও সমাপ্ত শব্দটা থাকবে না।”

সার্টিফিকেট
Ayesha Ariya Afiya

আরো পড়ুন- টিউশন স্যারকে ভালবাসা পর্ব ১

Related posts

স্যার যখন বর – নতুন ভালোবাসার গল্প | Sir Love Story

valobasargolpo

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প – ভাইয়ের বন্ধু বর পর্ব ১২ | Love Story

valobasargolpo

Leave a Comment

error: Content is protected !!